A reader par excellence

From Krishnagar, West Bengal, she, Sonali Chakraborty,  crossed two rivers on boats, took a taxi and reached Dumdum airport for a flight to Mumbai and met Malay Roychoudhury just for a day. She collected more than twenty books written by Malay and went back the same day. 

…………………………………………………………………………………………

যেমত নেশাতুর হরিণীর তারারন্ধ্র স্থির ও উদাস থাকে বিশালতায়

প্রায় বছর আড়াই পর আবার উঠোন ভাঙতে গিয়ে প্রথম জানা গেলো কখন গালিব বলেছিলেন “কিতনি খউফ হোতে হ্যায় শাম কে অন্ধেরো মে, পুছ উন পরিন্দো সে জিনকে ঘর নেহি হোতে”। নিজের হাজার ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে প্যাকিং, বোর্ডিং পাস, কার্ড ব্যালেন্স চেক করে মেয়েকে ছেড়ে দেওয়ার আগে “জাস্ট ঘুমোতে যাওয়ার সময় gdn8 টা লিখে ঘুমোবে যদি ঘুমোতে মনে থাকে” বলে আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে সোজা নিজের দুর্গে ফিরে যাওয়ার প্রবল পুরুষটি আর দাঁড়িয়ে থাকবে না ব্যালকনিতে যখন আমি ফিরবো…

খুব সহজ ছিলো না তাই এই সফর অথচ যেতে আমায় হতোই। ভাঙা বাতিঘর থেকে নাড়ি কাটা সূর্যকে দেখার জন্য যে নশ্বরতা, তার দায় থাকে। রামধনু দিয়ে কাজল পরে যে ফ্লাইটে উঠেছিলাম বৃষ্টি আর বিদ্যুত তাকে ধুয়ে কিছু অতিরিক্ত ক্লান্তি আঁকতে পেরেছিলো মাত্র। যে কোনো ডানার উড়াল আকাশের ব্যক্তিগত ভালো লাগার তালিকায় আছে, ঝড়ে যে উড়োজাহাজ আটকে না থেকেছে, তার যাত্রী না হলে এই প্রসঙ্গে সম্যক জ্ঞান জন্মায় না।

কিংবদন্তী যে প্রেমিক তাঁর মাথা কেটে আমায় পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পায়ে একবার হাত না রাখলে অপরাধ হয় অথচ তিনি যেহেতু বললেন “আর তো দেখা হবে না”, বরাবরের উন্মাদিনী আমার ভিতরে জিহাদ এলো তাঁকে ভুল প্রমাণের, সুতরাং প্রণাম করিনি, আবার দেখা হবে এই বিশ্বাসে।

প্রেমে পড়ার মতো ভয়ঙ্কর সুন্দরী দুই বিদুষী একত্রে ছিলেন, শীলা দি ও নূপুর দি, আমার ভিতরের তরঙ্গে “ইন্দুবালা গো, তুমি কার আকাশে থাকো, জোছনা কার মাখো” বাজছিলো, সামনে মলয় আর অর্ঘ্য দা ছিলেন বলে প্রকাশ করা গেলো না সেভাবে, কপাল। ও হ্যাঁ, আমি জাতিস্মর নই, নিয়তি নিজে লিখি তাই প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অর্ঘ্য দা ও নূপুর দির সঙ্গে পরবর্তী জন্মের মৌ সই করা আছে।

এতো বই পাওয়া হলো আদর টইটই চকোলেট (আমি বৃদ্ধা হইলেও কিছু কিউটস্য বন্ধু আমার আছে) সহ, দেবদূত বিরাট একটি ব্যাগ কিনে দিলেন ছত্রপতি থেকে আমার করুণ অবস্থা দেখে, সেও উপহারই। জানলাম এখন আর আমরা ভারতীয় এয়ারপোর্টে বসি না, ‘আদানী লাউঞ্জ’ এ রেস্ট করি, এও জানা হলো ভিস্তারা দীর্ঘ যাত্রায় খেতে দেয় না, ‘হিন্দু মিল’ সার্ভ করে। এই দেশ বিচিত্র ছিলোই কিন্তু দিনে দিনে আমার বড় অপরিচিত হয়ে উঠছে সেলুকাস, কোথা যাই বলো তো?

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কেদার ভাদুড়ীর সাক্ষাৎকার ও কবিতা

কবি কেদার ভাদুড়ীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরী

প্রথম অংশ

( এই সাক্ষাৎকার কেদার ভাদুড়ীর গাঙ্গুলিবাগান-এর একরুমের ঘরে ১৯৯৮ সালে নেয়া । প্রথমে ‘মহাদিগন্ত’ ও পরে ‘বোধ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল  ।  একা থাকতেন, নিজেই রান্না করতেন, বাসন মাজতেন, ছাত্র-ছাত্রী পড়াতেন, রাতে মদ খেতেন আর কবিতা লিখতেন । নাকতলা স্কুলের খ্যাতনামা ইংরেজি-শিক্ষক ছিলেন । বলতেন, সিপিএম বিরোধী বলে ওনার পেনশন আটকে দেয়া হয়েছে। হাত কাঁপতো বলে শেষ দিকে কলম ধরে লিখতে পারতেন না । ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেন, লিখে দেবার জন্য । এক ছাত্রীর প্রেমে পড়েন, সে গর্ভবর্তী হয়ে গেলে তাঁকে বিয়ে করার জন্য প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন । ছাত্রী-স্স্ত্রীর বয়স তাঁর প্রথম পক্ষের ছেলের চেয়ে কম ছিল। প্রতিবেশীরা দ্বিতীয় স্ত্রীকে তাঁর নাতনি ভাবতো বলে গাঙ্গুলিবাগানের বাসায় আসতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন ; ছাত্রী-স্ত্রী মফসসলের কোনো স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পেয়েছিলেন । ছাত্রীর সঙ্গে প্রেম আর তাঁকে বিয়ে করা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি । আমি আর কবি-সম্পাদক উত্তম দাশ প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা যেতুম কেদারের দশ-স্কোয়ারফুট ঘরে আর তিনজনে মিলে মদ খেয়ে নাচতুম । উত্তম দাশের বাড়িতে ভালোমন্দ রান্না হলে নিমন্ত্রণ পেতেন ; মাঝেমধ্যে আমিও পেতুম । এক-কালের উদ্বাস্তুদের মাথা গোঁজার ঠাঁই গাঙ্গুলিবাগান ভেঙে আবাসন উঠেছে । কেদারের জন্ম ১৯২৫ সালের একুশে জুন আর মৃত্যু ২০০২ সালের দোসরা মার্চ । ওনার কাব্যগ্রন্হগুলো পুনঃপ্রকাশিত হওয়া দরকার । )

মলয় : কেদার, আমি আপনার সাক্ষাৎকার নিওতে চাইছি, এ ব্যাপারটা সম্ভবত বিসদৃশ ঠেকছে আপনার। আপনার আর আমার পাঠকদেরও সেরকম ঠেকবে হয়তো । আমি কিন্তু সাক্ষাৎকারটা নিচ্ছি আমার নিজের কারণেও বটে । এর আগে আমি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলুম দীপঙ্কর দত্তর । আমি নিশ্চিত যে দীপঙ্করের নাম শোনেনমি । দীপঙ্করও আপনার লেখা পড়েছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে আমার । পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যজগতের শাসক সম্প্রদায় যে একশৈলিক আধিপত্যবাদী অনুশাসন চাপিয়ে দিতে চাইছেন, কেবলমাত্র মিডিয়া-অ্যাকাডেমি-সরকারের মাধ্যমেই নয়, লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমেও, তা কোনো-কোনো কবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন । আর তা করছেন যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে । কেননা সমালোচকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজে শেখা বিদ্যায়তনিক জ্ঞানকাঠামোর বাইরে বেরোতে পারেন না বলে কবিরা থেকে যান প্রান্তিক । তাছাড়া সাহিত্যজগতের শাসকদের নিজস্ব বহুবিধ স্বার্থ তো আছেই, বিশেষ করে আর্থিক ও রাজনৈতিক । আমি এসট্যাবলিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান শব্দটা প্রয়োগ করছি না, কেননা পশ্চিমবঙ্গে ভালগার মার্কসিস্টরা, যাঁরা এতাবৎ প্রচার করে এসেছেন যে ‘গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো’, তাঁরা আনন্দবাজার প্রাইভেট লিমিটেডকেই প্রতিষ্ঠান বলে চালিয়েছেন ।। আমি ব্যাপারটা অতো সহজ বলে মনে করি না । আর আপনি তো আর প্রতিষ্ঠানবিরোধী নন । প্রতিষ্ঠান আপনাকে ‘ভেন্ন’ করেছে । সে যা হোক । আমার কথাটা বলি । আমি কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ লিখেছি । গোটা পনেরো সাক্ষাৎকার দিয়েছি । কিন্তু সাক্ষাৎকার নেবার চেয়ারটায় বসার অভিজ্ঞতা নেই । এ-ব্যাপারটাও ঝালিয়ে নিতে চাই ।  আপনি বয়সে আমার চেয়ে দেড় দশক বড়ো। দীপঙ্কর আমার চেয়ে অনেক ছোটো । আপনার  কিছু বলার আছে ? না পরের প্রশ্নে এগোই? 

কেদার : মলয়, এ পর্যন্ত আমার সাক্ষাৎকার কেউ-কেউ নিতে চেয়েছে কিন্তু নেয়নি । তুমিই প্রথম আমার সাক্ষাৎকার নিতে চলেছ । এতো আনন্দেই ব্যাপার । সুতরাং বিসদৃশ ঠেকবে কেন ? আমার ? তবে অনেকেরই গা জ্বালা করবে । পেটে খিঁচ ধরবে । কফ নামক এক মুদ্রাদোষে আক্রান্ত হতেও পারে বা । কেননা তুমি শুধু হাংরি নও, অ্যাংরিও বটে । আমার তো তাই মনে হয় । অনুমান, অনুমানই । সত্যিও হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে । দীপঙ্কর দত্তের নাম আমি শুনিনি, তাই নাকি ? বহু মাস, বহু বছর ধরে ও তার কাগজ ‘জোরো আওয়ার’ আমাকে পাঠাতো, পাঠিয়েছে । এখন অবশ্য পাঠায় না । তারও কারণ আছে । এখানে বলব ? না, এখন বলব না । এসট্যাবলিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান শব্দ দুটোয় আমো কোনো দিনই পরোয়া করিনি, করিও না । ওরা মানুষ না জন্তু ? সে বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে । প্রতিষ্ঠান আমাকে ‘ভেন্ন’ করেছে ! ছিলাম কখন ? ‘দেশে’ এ পর্যন্ত আমার চারটে, মাত্র কবিতা ছাপা হয়েছে । তাতে ‘দেশ’ উদ্ধার হয়ে গেছে বলেই আমার ধারণা । কারণ ওই ‘দেশ’ পত্রিকার এক সংখ্যায় কবি কাম প্রাবন্ধিক জগন্নাথ চক্রবর্তী আমার ও অন্যান্যদের কবিতা নিয়ে অনবদ্য এক আলোচনা করেছিলেন, তা পড়েছি । কথা হলো আমি ওই কবিতা এবং ছাপা হলো না এমন অনেক কবিতাই ডাকে পাঠিয়েছিলাম । বাই পোস্ট । পয়সা খরচ করে । তবে ওই যে বলছ ‘ভেন্ন’ করেছে । ‘ভেন্ন’ কথাটা শুনে আমার খুব মনে-মনে হাসি পেলো । বেড়ে বলেছো । ‘ভেন্ন’ ! আসলে কী জানো ? আমার তো মনে হয় কেউ-না-কেউ বা অনেকেই দাদাদের কাছে গিয়ে চুকলি কেটেছে । এছাড়া তো আমি আর কোনো কারণ দেখিনে । ১৭৮২ সালে রবিনসন বা রবার্টসন, বা ওই রকমই হবে । মনে পড়ছে না ঠিক । তবে সালটা ঠিক । উনি স্টাডি করে বাঙালির দুশো বিরাশিটা নেতিবাচক দিক দেখিয়েছেন । তার মধ্যে চুকলি অন্যতম । এখ আরো দুশো একাশিটি । কি-কি গবেষণা করো গুরু ? আমাদের অনেকের ধারণা যে গুরু সব সময়েই বয়সে বড়ো হয় । এক্ষেত্রে নয় । ‘গু’ মানে তো জানো, অন্ধকার । আরো অনেক কিছু হয়, হাগু-টাগু জাতীয় । সেসব বলছি না । ‘রু’ মানে যা অন্ধকার দূর করে বা যিনি অন্ধকার দূর করেন । সেজন্যই তো তোমাকে ‘গুরু’ বললাম । Don’t take it otherwise. এবারে তোমার পরের প্রশ্ন, না ছোটোখাটো এক নিবন্ধে যাই, কেমন ?

মলয় : আপনার জীবন তো বেশ কার্নিভালেস্ক । জন্মেছেন কলকাতায় ১৯২৫ সালের রাবীন্দ্রিক বর্ষায় । পড়াশুনা শুরু করেছিলেন রাজশাহি শহরের জীবনানন্দীয় পাঠশালায় । ১৯৩৯ সালে সুনীল গঙ্গোর ফরিদপুরের কণকদ্বীপে গিয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন । মালদায় এসে ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিক দিলেন । কলেজে কোথায় ভর্তি হলেন ? মালদাতেই ? তারপর ১৯৪৪ সালে নেভিতে যোগ দিলেন, ক্যাডেটদের সঙ্গে আন্দোলন করলেন আর বরখাস্ত হলেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান এয়ারফোর্স বেসে দমদমে যোগ দিলেন আণ্ডারক্যারেজ রিপেয়ারার হিসেবে । ১৯৪৮ সালে জয়েন করলেন ব্রিটিশ এয়ারফোর্সে । আট-নয় বছর চাকরি করে সেখানে গোলমাল বাধিয়ে কোর্ট মার্শালে চাকরি হারালেন । এর মাঝে কখন যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারে ওভারসিয়ার হয়ে গোল্ড মেডালও পেয়েছিলেন । প্রাইভেটে আই.এ. পরীক্ষা দিলেন ১৯৫৭ সালে । ওই বছরেই শেষের দিকে চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালে ডায়েটিশিয়ানের চাকরি নিলেন । ছেড়ে দ৮ইয়ে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত বেঙ্গল পটারিজে সুপারভাইজারের কাজ করলেন আর তার মধ্যেই বি.এ. পাশ করলেন । ১৯৬৩ থেকে টানা তিরিশ বছর শিক্ষকতা করলেন নাকতলা হাইস্কুলে । ইতিমধ্যে ১৯৬৮ সালে এম’এ. পাশ করেছিলেন । আপনার প্রথম স্ত্রী নমাসে-ছমাসে একদিন আসতেন, কলকাতায় কাজ থাকলে । প্রথম স্ত্রী থাকা সত্বেও নাতনির বয়সী ছাত্রীর প্রেমে পড়ে বিয়ে করলেন, কেননা সে অন্তসত্বা হয়ে গিয়েছিলেন । তিনিও আপনার সন্তানকে নিয়ে আসেন না লোকলজ্জার ভয়ে । পরিবারহীনতা, গাঙ্গুলিবাগানের এই একঘরের ফ্ল্যাটে, যে অবস্হায় আপনি নিজেকে পাচ্ছেন বা রাখছেন, তা কিন্তু আপনার কবিতাকে পেড়ে ফেলতে পারেনি । মনে হয়, পরিবারহীনতা, যোগাযোগহীনতা, স্বজনহীনতা, বন্ধুহীনতা, এগুলো বরং উল্টে আপনাকে আহ্লাদিত করছে, যার দরুণ আপনি অজস্র প্রতিস্ব ক্রিয়েট করে আহ্লাদের একটা কারেন্ট বজায় রাখেন প্রতিটি কবিতায় । আধুনিকতাবাদী অনুশাসনে, যা বোদলেয়ার থেকে শুরু হয়ে টি.এস.এলিয়ট প্রমুখের হাই মডার্নিজমে পৌঁছেছিল, আহ্লাদের অনুমোদন ছিল না । আপনি কিন্তু অবিরাম বজায় রেখে গেছেন প্রতিটি কবিতায় । জীবন যাপনের ঝুঁকি এক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছেন, জেনে বা অজান্তে, নাকি ?

কেদার : আপনার জীবন তো বেশ কার্নিভালেস্ক । ভালোই বলেছ । একবার, একবার কেন বহুবার, বহুজনকে বলেছি, এক বছর সময় দিলাম, বেশিও নিতে পারো, চিন্তাভাবনা করে এমন একটা অভিজ্ঞতার কথা বলো, যা আমার জীবনে ঘটেনি । পারলে পিটার স্কট খাওয়াবো । পারেনি । ‘রাজশাহি’ কেন ? হবে তো রাজসাহী । যা আমি লেখেছি সারাটা জীবন । রাজসাহী শহরের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এই বানানই ছিল এবং আছে । নাটোরের মহারাজা রামজীবনের জমিদারির নাম ছিল রাজসাহী । বিস্তৃতি ছিল ১২,৯০৯ বর্গ মাইল, আর আয় ছিল সিক্কা ২,৭০২,৪০০ টাকা । ভাবো । জীবানন্দীয় পাঠশালা বলছ। কাব্যি করছ ? আমার তো পাঠশালার নাম ছিল ‘সাবিত্রী শিক্ষালয়’ । তার আগে অন্যান্য পাঠশালায় পড়েছি । এমনকী কাশীতেও, বাঙালিটোলায়, সেই প্রথম । মালদায় কেন ? অথচ মালদায় । আসলে চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে ম্যাট্রিক পাস করি । ম্যাট্রিকে স্কলারশিপ পেয়েছিলাম বলে রাজসাহী গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হতে হলো । নিলাম  বিজ্ঞান । ওই সময়ে ওই কলেজে কবি উত্তম দাশের মা, মানে মাদার-ইন-ল ভর্তি হয়েছিলেন । তখন আলাপ হয়নি । মেয়েদের জন্য বিরাট বিরাট ব্যারিকেড বসানো হতো ক্লাসরুমে । তাই ! এখন  হয়েছে । ‘সুনীল গঙ্গো’ কেন ? তেল দিচ্ছ ? যাই হোক, আমাদের গ্রামের নাম ছিল, এখনও বোধহয় আছে, কৌড়কদি । কণকদ্বীপ নামক পদার্থটির অপভ্রংশ । ‘ক্যাডেট’ নয় । নেভিতে রেডিও মেকানিক হিসেবে যোগ দিই । আমেরিকান এয়ারফোর্স থেকে যুদ্ধশেষে গোল্ড মেডাল পেয়েছি । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে নয় । তারই মুনাফায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাব-ওভারসিয়ার । বছর আড়াই কাজ করে ছেড়ে দিই । লোকে বলে কোর্ট মার্শাল । আসলে রাজনীতির কারণে দিল্লিতে চোদ্দ দিন চোদ্দ রাত জেরায় জর্জরিত হয়ে চাকরি নট । অফিশিয়ালি ডায়েটিশিয়ান নয় । বাস্তবে কিন্তু তাই । শুধু ক্যানসার হাসপাতালে নয়, সেবাসদনেও । দেশবন্ধুর বাড়িতে কাজ করে ঘুষ নেবো ? অঢসম্ভব । ভাবনায় আসে না । তাই আবার চাকরি ছেড়ে দিই । ১৯৬৮ সালে কোনো পরীক্ষাই দিইনি সুতরাং এম.এ. পাশ করার প্রশ্নই ওঠে না । আসলে আমি ইংরেজিতে অনার্স এবং ইংলিশ ইন্স্টিটিউট থেকে ড.ই.এল.টি. – ব্যাস । তুমি বলছো ‘পরিবারহীনতা, যোগাযোগহীনতা,স্বজনহীনতা, বন্ধুহীনতা, এগুলো বরং উল্টে আহ্লাদিত করেছে আপনাকে ।’ এগুলো সবই একদিকে সত্যি, অন্যদিকে নয় । গোটা পৃথিবীর মানুষজনই, জন্তুজানোয়ার, গাছপালা, বৃক্ষলতা, এরা সবই আমার পরিবারভুক্ত বলেই আমি মনে করি । লোকে অবশ্য পাগল-টাগল এরকমকিছু একটা বলবে । বলুক । বলে-ও । একটা ইন্টারন্যাশানাল আউটলুক না থাকলে প্রকৃত কবি হওয়া যায় না । বিশ্বাস । এই আইডিয়া কিন্তু মোটেই বানানো নয় । সহজাত । মাতৃগর্ভ থেকে উৎসারিত । বিলিভ ইট অর নট । তাইই । তুমি বলছ ‘আহ্লাদ’। আমার কবিতা পড়ে তোমার তাই মনে হয়েছে বোধহয় । আসলে আমি যন্ত্রণায় নীল হয়ে আছি সব সময় । এসব দেখতে হলে একটি তৃতীয় চক্ষু চাই । আমার মনে হয় আমার তা আছে । বৈশিষ্টটা তাই । 

মলয় : আপনার যৌনজীবন সম্পর্কে নানা কানাঘুষা শোনা যায় । ‘জাস্ট ডু ইট টু মি’ ধরণের অভাবনীয় ঘটনা । এখন তো সত্তর পেরিয়েছেন । একটু স্মৃতিচারণ করুন না, শোনা যাক ।

কেদার : ‘আপনার যৌনজীবন নিয়ে কিছু কানাঘুষা শোনা যায় ।’ কবি মাত্রেই এক ধরণের অ-সামাজিক জীব । তাও আবার বাঙালি । তাও আবার যৌন । কানাঘুষা করবে না ? স্ল্যাণ্ডারিঙ? জেনে রাখো, হাফ আ ট্রুথ ইজ অলওয়েজ আ গ্রেট লাই । প্রবচন । ভালোবাসা, কবিতা, রোমান্টিকতা ছাড়া এ জীবনে আর কিছু নাই । আমার জীবনে ছেলেরা যেমন এসেছে, মেয়েরাও তেমনি । এখনও আসে । যৌনতা কি জীবন থেকে আলাদা কিছু ? এতো আগ্রহ কেন তোমার ? কই, আমার রাজনৈতিক জীবন সম্বন্ধে তু কিছুই বলছ না ? ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে চাপাই নবাবগঞ্জ শহরটা তিন দিন বস্তুত অধিকার করে রেখেছিলাম আমরা ক’জন স্কুলের ছেলেরা । ধরা পড়িনি । পড়লে ভালো হতো । এখন ফ্রিডাম ফাইটারের পেনশনটা অন্তত পেয়ে যেতাম । অন্তত বেশ কয়েক ডজন পিটার স্কটের বোতল এসে যেত ঘরে । আপসোস করছি না । কিন্তু ঘটনাটা তাইই । একেক দিনে একেকটা কবিতার বই বেরিয়ে যেতো । কলমে, আড়াই ঘণ্টায় সাতান্নটা কবিতা লিখেছি । রেকর্ড । প্রয়াত কবি অশোক চট্টোপাধ্যায় তার কয়েকটা পড়েই মুগ্ধ । পরে আলাপ । খোজারা কি খুব ভালো কবিতা লেখে ? কখনও ? কবিতা লিখতে হলে বীর্যবান হতে হয় মলয় । বীর্যবান । জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করতে হয় । তেরোবার, ঠিক তেরোবার, মৃত্যু নামক মাগিটা বুকে হিসসস তুলে বেরিয়ে গেছে । অভাবনীয়ভাবে বেঁচে গেছি, রয়েছি, এখনও । ‘মনে হয়’ কেন ? আমি নিশ্চিত । রবার্ট ক্লাইভ দুবার এভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন । তৃতীয়বার নয় । তুমি জানো ? পরিশেষে বলি । তোমার হয়তো কাজে দেবে । অ্যাডমিরাল রিকোভার, ফাদার অব আমেরিকান নিউক্লিয়ার নেভি, একবার বলেছিলেন, Great minds discuss ideas, average minds discuss events, small minds discuss people. সুতরাং কানাঘুষা যারা করে থাকে তাদের Sexually perverted বললে কি খুব মিথ্যে বলা হবে ? ‘কানাঘুষা’কে ইংরেজিতে কী বলে ? Hearsay. এবং কোনো আদালতেই  ethical, moral অথবা legal কোনো আদালতেই ধোপে টেকে না । 

মলয় : টাক পড়ে গেছে বলে ইনহিবিশান আছে ? আপনার যৌন এক্সপ্লয়েটগুলোয় অসুবিধে হয়নি টাকের জন্য ? আমি তো আমার টাকপড়া চেহারা ভাবতেই আতঙ্কিত বোধ করি । টাকমাথা কবি, কেমন যেন আধুনিকতাবাদী মিসনোমার । অনেকে বলেন যে বয়স অনুযায়ী কবিতাভাবনায় পরিবর্তন দরকার । যেমন কবিরুল ইসলাম বলেছেন যে, আমার কবিতায় যৌনতা থাকাটা এই বয়সে অনুচিত । বয়স অনুযায়ী পালটাতে হবে, এভাবনাটা আধুনিকও নয়, বলা যায় প্রাগাধুনিক । আপনি তো শারীরিকভাবেও, মানে অ্যাপিয়ারেন্সের দিক থেকে, বেশ কিছুকাল যাবৎ কান্তিচ্যূত, কিন্তু যৌনতামুক্ত করেননি নিজেকে, বা করতে পারেননি । নিজেকে নিয়ে ভেবেছেন কখনও এভাবে ? কলকাতায় কবিতার রাজনীতির মাঝে সতত নেশাগ্রস্ত কবিরা নিজেদের সম্পর্কে যেটুকু ভাবেন, তা সামনে সাহিত্যসমাজটাকে দাঁড় করিয়ে । আপনি একা নিজেকে অ্যাসেস করেছেন কখনও ? আপনার সামনে কেউ নেই, পাঠক নেই, তেমনভাবে ?

কেদার : Euphemism বোঝো না ? অতো টাক-টাক করছ কেন ? বলতে পারো না, উদাত্তকপাল? আমার যতোদূর মনে পড়ে সক্রেটিসেরও উদাত্তকপাল ছিল । ঈশ্বরচন্দ্রেরও । নেতাজীরও । আমার জানা অন্তত শ’খানেক গ্রেটদের নাম করতে পারি । আসলে উদাত্তকপাল মায়েরই স্নেহভার । উদাত্তকপাল মাতৃকুলজাত । তাকে অবহেলা করি কী করে বলো ? কবিরুল ইসলাম কী বলেছেন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । আমি জানি, আমার ভিতরে আরেক কেদার বাস করে । তার বয়স কিছুতেই চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয় । কমও হতে পারে । তার তো উদাত্তকপাল দেখি না । অভাবনীয় ? আর অ্যাসেস ? একথাটি বলছো ?  আমাদের সাহিত্যসমাজটিকে জানিনে, জানতেও চাইনে । আরে, আমার পাঠক থাক বা না থাক, উত্তম তো আছে, উত্তম দাশ । কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, পি.এইচ.ডি., রিডার। দ্যাখোনি ? প্রতি সংখ্যায় আমার কবিতা প্রথমেই ছাপা হয় । এ তার মহত্ব । মহত্বই বলব । আমি বলিনি কখনো । এই তো সন্মান । আর কী চাই ? চাই নাকি ? নিজেই জানি না । আর ‘কান্তিচ্যূত’ বলছ ? তা তো হবোই । কাল সবকিছুই খায়, খেয়ে ফ্যালে । এই হলো জাগতিক নিয়ম । উপেক্ষা করতে পারি । কিন্তু লঙ্ঘন করতে পারি না ।  এবং এক মজার কথা হলো – মজার কথাই বলি । ক্লাস টুয়েলভে ইংরেজির ক্লাস নিতে-নিতে সুদেষ্ণা নামে এক মেয়ে, সুদেষ্ণাই বটে । বলেছিলো : ‘স্যার, একটা চোস্ত জিনস পরবেন, একটা ঝকঝকে নতুন । তিন হর্স পাওয়ারের একটা বাইক নেবেন । ঋভালা দেবেন । আমাদের মতো যেকোনো মেয়েকেই পেছনের সিটে তুলে নিতে পারবেন, এখনও।’ আরেকজনের কথা বলি । সেও দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তো, এই কিছুদিন আগেও । বলেছিলো, কথায় কথায় বলেছিলো, ‘মেয়েদের পেতে হলে.স্যার, স্রেফ হরণ করতে শিখতে হয় । মেয়েরা বলুক বা না বলুক, মনে মনে এই চায়, জানেন ?’ এতে আমার অবশ্য কিছু যায় আসে না । কিন্তু ওদের মানসিকতা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায় । কথাটা পরে ভেবে দেখেছি, ইতিহাসগতভাবে ঠিক । অতো কান্তি-টান্তির দরকার নেই, যা দরকার তা হলো শক্তির । বলো আমি ‘শক্তিচূত’ হয়েছি ।

মলয় :  আপনার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল হাতে লেখা মশাল পত্রিকায় ১৯৩৬ সালে, মানে এবারো বছর বয়সে, সম্পাদক ছিলেন অমিয়কৃষ্ণ সান্যাল ।  বাঙালি কিশোরের টিপিকাল অভিব্যক্তি । ১৯৪৯ থেকে রেগুলার কবিতা লেখা শুরু করলেন । বেঙ্গল পটারিজ আর এয়ারফোর্সের হাউস ম্যাগাজিনেও লিখেছেন । তখন তো এখনকার মতন লিটল ম্যাগাজিন ছিল না । ছটফটানি সামলাতেন কোন উপায়ে ? আপনার প্রথম বই ‘শুকনো জল’ বেরিয়েছে বহু পরে, ১৯৬৯ সালে । এতো দেরিতে কেন ? সম্ভবত এই গ্রন্হের জন্যই আপনাকে ছয়ের দশকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, নইলে একাধবছর পরে বের করলে সত্তর দশকের তালিকায় যেতেন । ছয়ের দশকের যে-দুটি পরস্পরবিরোধী ধারা আছে, কাঠের পা-অলা কবি এবং ঘোড়ার পা-অলা কবির, আপনি বোধহয় তার মাঝের লিংক । ওই ভাঙনের জায়গাটাই নৈতিক-নানন্দনিক জলবিভাজক, আধুনিকতাবাদী মানদণ্ডগুলো ভেঙে ফেলার কাজ আরম্ভ হয়েছিল । আপনার দ্বিতীয় বই ‘পাথরের স্লেট’ ১৯৭৪ সালে, ‘চারপুরুষ এক নারী’ ১৯৮০ সালে, ‘তিন ভূবনের প্রেম’ ১৯৮২ সালে আর ‘এই তো ঠিকানা’ ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল । তারপ[র বোধহয় বেরোয়নি কোনো বই । 

কেদার : প্রথমে কারেক্ট করে দিই । অমিয়কৃষ্ণ সান্যাল নয় । অমলকৃষ্ণ সান্যাল । পরে লেখক অমল সান্যাল । সেন্ট লরেন্স স্কুলের মাস্টারমশায় ছিলেন । প্রয়াত হন ১৯৮৭ সালে । ওনার অনেকগুলো বই আছে । শেষ বই কণকদীপ’ । উপন্যাস । পুনাতে থাকতে, সেই ১৯৪৯ সাল থেকে কবিতা লিখতে শুরু করি । গড়ে দুটো করে প্রতিদিন । আজ ১৯৯৯ সালে বছর পূর্তি শুরু করি । এই উপলক্ষে খাওয়াবে না? স্কচ ? সত্যি কথা বলতে কি ছাপানোর জন্য ‘ছটফটানি’ কোনোদিনই অনুভব করিনি । এয়ার ফোর্সের কিছু-কিছু বন্ধুদের শোনাতাম । কেউ কেউ কোনো কোনো কবিতায় আবার সুর দিতো হারমোনিয়াম ও তবলায় । ব্যাস, এইটুকুই । ১৯৬৯ সালেও ‘শুকনো জল’ বেরোতো না যদি না নাকতলা স্কুলের ইংরেজির মাস্টারমশায় অশোক ঘোষ উদ্বুদ্ধ করতেন ।  তখন পর্যন্ত, জানতাম না বাংলায় কে কে কবিতা লিখছেন। তাদের কাঠের পা নাকি ঘোড়ার পা আছে বা নেই খোঁজই রাখতাম না । রাখার প্রয়োজনও বোধ করিনি কখনও । এই হিসেবে বাংলার কাব্যজগতে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত এই আমি । পরে, ১৯৭১ সালে স্বনামধন্য দেবকুমার বসুর সঙ্গে আলাপ হয় । আলাপ অবশ্য একটু-আধটু এর আগেও হয়েছে । ১৯৭১ সালে গভীর । দুজনে মিলে ‘সমায়ানুগ’ পত্রিকা বের করি । ক্রমে অন্যান্য পত্রিকায় আমার কবিতা বের হতে থাকে । এবং পরিচয়ও হতে থাকে অনেকের সঙ্গে । কিছু-কিছু নাম বলি । উত্তম দাশ, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়, পরেশ মণ্ডল, অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়, রবীন সুর, আনন্দ ঘোষ হাজরা, অভিজিৎ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, অতীন্দ্রিয় পাঠক, ঈশ্বর ত্রিপাঠী এবং আরো আরো আরো । আইপারবোলিক হয়ে গেল না । হলো । কিন্তু সেটাও তো ভাষারই অলঙ্কার ।  ‘ণেতিক-নান্দনিক জলবিভাজক ও আধুনিকতাবাদী মানদন্ডগুলো ভেঙে ফেলার কাজ আরম্ভ হয়েছিল’ । বলেছো । আমি কিন্তু এসবের কোনো খবরই রাখি না । ইহাই আমার কৃতি, প্রকৃতি । আন্দোলনের মাধ্যমে আধুনিকতাবাদী হওয়ার কোনো চেষ্টাই আমার নেই । শব্দই আমার সুর, শব্দি আমার লয় । মন যা বলে তার লক্ষ-কোটি ভাগের একভাগ আজ তক লিখেছি কিংবা লিখে ফেলেছি । শতশত কবিতা চুরি হয়ে গেছে, স্রেরফ চুরি । সহস্র সহস্র কবিতা উইপোকায় খেয়েছে । কোনো ক্ষোভ নাই । কোনো দুঃখ নাই । মহাকালের ঘোড়া আসছে টগবগিয়ে । কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে তার হদিশ পাবো না । তবে একটা যন্ত্রণা আছে । লক্ষ কোটি ভাগের একভাগ কেন, তার বেশি নয় কেন, তারই । সেকথা থাক । ‘এই তো ঠিকানা’ বেরোবার আট বছর পরে উত্তম দাশের প্ররোচনায় এবং তারই তত্ত্বাবধানে এবং তৎপরতায় ১৯৯১ সালে বেরোয় ‘নির্বাচিত কবিতা’ । এই বই বেরোবার পর আমার খ্যাতি বোধহয় বেড়েই গেছে । বেশ কয়েকটা পুরস্কার পেয়ে গেলাম কিনা, তাই । আলসেমির একটা সীমা আছে । অন্যকে দোষ দিই না, নিজেকেই । প্রতি বছরই আমি একটা করে বই বের করতে পারি । অনায়াসেই । মনে হচ্ছে কপাল খুলেছে একটু, আমার । একজনকে পেয়েছি, ভারি ইনটেলিজেন্ট এবং সুন্দর । আমার প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে বন্ধু । সেই কপি করে দেবে । মনে হয় । নাম অর্ঘ্য বাগচী । বারিন্দির । দেখি কী হয় । দু’হাজার সালে বইমেলায় এবং যদি বেঁচে থাকি, তার পরেও ।

মলয় : আপনার ঘরে খবরের কাগজ বা নিউজ ম্যাগাজিন দেখি না । আপনি কি সংবাদপত্র পড়েন না ? বাংলা খবরের কাগজগুলো অবশ্য নিজের নিজের বাস্তবতা বানায় । ‘বর্তমান’ পড়লে সঙ্গে ‘গণশক্তি’ পড়তে হবে । ‘আনন্দবাজার’ পড়লে সঙ্গে ‘আজকাল’ পড়তে হবে । তারপরেও প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবেন না । সত্যের মালিকানা কেবল ক্ষমতাধিকারীর । বাচ্চাদের বসে আঁকো প্রতিযোগীতার মতন বয়স্কদের নিজে খবর বানাও প্রতিযোগীতায় টেনে নামায় সংবাদ-মাধ্যমগুলো । তার ওপর কাদের বানান সঠিক আর কাদের ভুল সে আরেক নরক । আপনার কি মনে হয়, সংবাদ মাধ্যমের বানানো হাইপাররিয়্যালিটি  আপনার ইম্যাজিনেশনের জগতে হস্তক্ষেপ করে ? নাকি, এমনিই পড়েন না ? জাস্ট বোরড অফ এভরিথিঙ । আমার কথা যদি বলেন, আমি সংবাদপত্র আর নিউজ ম্যাগাজিন তো পড়িই, আমি বিবিসি, সিএনএন, জিটিভি, আইআইডাবল্যু, স্টার নিউজ চ্যানেলগুলোও সারফিঙ করি । আপনার তো টিভিটাও খারাপ হয়ে পড়ে আছে দেখলুম । ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি এসব চ্যানেলগুলো দ্যাখেন, নাকি কেবল ‘দূরদর্শন’? আমার তো কেমন সন্দেহ হয় যে আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্লক করে নিয়েছেন । হয়তো আপনার কবিতার ফুর্তি বানাতে অমন ব্লকেজ দরকার । কিন্তু সাহিত্যজগতে এই মুহূর্তে কী ঘটছে তা জানার জন্যেও তো প্যারিস রিভিউ, টাইমস লিটেরারি সাপলিমেন্ট, এপিআর, পোয়েট্রি, লন্ডন ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে অন্তত চোখ বোলাতে হবে ! সাহিত্য সম্পর্কে বিদ্যায়তনিক চিন্তাধারা ওব্দি পুরোপুরি পাল্টে যাচ্ছে । কবিতা, নাটক, উপন্যাস, সমালোচনা ইত্যাদি বিভিন্ন জঁরের আধুনিকতাবাদী, মতান্তরে সাম্রাজ্যবাদী, বৈধতার ও নৈতিকতার ভিত্তিটাই তো বদলে যাচ্ছে । আপনি কি এসমস্তকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান । থাকতে চান আপনার ফুর্তিবাজ কাব্যজগতে ?

কেদার : উরিব্বাবা ! অনেকগুলো নাম করে ফেলেছো ! এর অনেকগুলোর নামই শুনিনি কখনও । তুমি বলছ, সাহিত্য সম্পর্কে বিদ্যায়তনিক চিন্তাধারা ওব্দি পুরোপুরি পাল্টে যাচ্ছে । ঠিক । এই পাল্টে যাওয়াটাই তো ভেরি ন্যাচারাল । আমি চাইলেও যাবে, না চাইলেও যাবে । নেচার কে কি কখনও অস্বীকার করা যায় ? গেলেও যাওয়া কি উচিত ? সারফিং করার জন্য আমার আরেকটি টিভি আছে, তার নাম ‘সময়’ । সেই আমাকে সব জানিয়ে দেয় । সবকিছু । আমি তো লিখব শুধু কবিতা । এখন । আগে গদ্যও লিখেছি অনেক । তার অনেকগুলি ম্যানিফেস্টো । কিছু বেরিয়েছিল, বেশ কিছু ‘সময়ানুগ’-এ। আর কিছু ‘ব্যতিরেক’ পত্রিকায় । ‘ব্যতিরেক’ পত্রিকা বিপ্রতীপ গুহ, শুভানন রায় আর আমিই চালাতাম । পরমহংস রামকৃষ্ণদেবের নাম শুনেছো কখনও ? তিনি বলেছিলেন, “খবরের কাগজ একজনকে পাঁঠা করার পক্ষে যথেষ্ট । আমি রামকৃষ্ণদেব নই । খবরের কাগজ কখনো রাখি কখনো রাখি না । আর ‘গণশক্তি’ পড়লে আমার সর্বাঙ্গে র‌্যাশ বেরোয় । তুমি  যাই মনে করো আর তাই মনে করো । সত্যি । বেটাদের সঙ্গে অনেক অনেক অনেক বছর কাটিয়েছি । অভিজ্ঞতার কি কোনও দাম নেই ! নাকি ? ফুর্তিবাজ জগৎ কেন বলছ ?  বারে, বারে । পাঁঠাকে ধরে আড়াই প্যাঁচ যখন বধ করে কসাই তার ছটফটানি লক্ষ্য করেছ কখনও । শালা শুয়োরের জগতে আমি এক পাঁঠা । কলজে থেকে বেরিয়ে আসে এক নিখাদ যকৃৎ । রঙ তার সেই নারীটির মতো । আমি ছটফট করি, কাতরাই, কেউ কিছু খবর রাখে না । কেননা ঘরে থেকেও আমি একা । একাই । আসলে নারীরা ঠিক জলের মতো । বর্ণ নেই । নিমকের মতো । কোনো স্বাদ নেই । স্বাদিষ্ট হয় তখন যখন আমি, আমিই গ্রহণ করি তাকে । ভারতে গান্ধিজি না এলেও, সূর্য সেন না এলেও, নেতাজী না এলেও, বিশ্বাস করি, পরিপূর্ণ বিশ্বাস করি, একদিন-না-একদিন-না-একদিন ভারতবর্ষ স্বাধীন হতোই । তুমি এক ছাগল । এই সম্বোধনে তুমি আবার কিছু মনে করলে না তো ? যাকে খুউব ভালোবাসি তাকে মুখ ফসকে বলে ফেলি । এই বিশেষত্ব । এসবের কোনো খবরই রাখো না । আমি যদি সমালোচক হতাম তবে ওইসব ম্যাগাজিনগুলোয় অন্তত চোখ বোলাতাম । আমি যা করি তা হলো এই । ধ্যান । নির্জনতায় ধ্যান । ধ্যান মানে খুব সহজ, আবার কঠিনও । এক জায়গায় বসে মনকে মননশূন্যতায় নিয়ে যাওয়া চাই । কিম্বা যেকোনো একটি দৃশ্যে বা বস্তুতে অপলক অনেকক্ষণ দৃষ্টি রাখা চাই । এরকম বেশ কয়েকমাস অভ্যাস করলেই কে যে শেয়াল আর কেই বা সিংহ মুখ দেখেই চেনা যায় । অদ্ভুত এক শক্তিস্ফূরণ হয় তাতে । ফলে কবিতা বা যেকোনো শিল্পের অবস্হান সর্বকালীন এবং সর্বগ্রাসী হয়ে পড়ে । আমি যে একা থাকি বা থাকতে হয় আমার পক্ষে ও দুটোই — নির্জনতা এবং ধ্যান, বেশ সহজলভ্য । তুমি এসব একটু প্র্যাকটিস করে দ্যাখোই না কী হয়।

মলয় : কবি-লেখকদের ঘর দেখেছি বইপত্তরে ছড়াছড়ি । আপনার ঘর দেখছি একেবারে ফাঁকা । কড়িকাঠের কাছে তাকটায় যেসব বইপত্র অগোছালো রাখা, তা বোধহয় আপনার রান্নাঘরের ধোঁয়ায় বহুকাল যাবত বোরখা পরে বসে আছে । কিছু বই বোধহয় আপনার নিজের, দপ্তরির প্যাকিঙের মধ্যেই রয়ে গেছে । আপনি বইপত্র সংগ্রহ, রেফারেন্সের জন্য রাখা, পরে আবার পড়া, এগুলো করেন না সম্ভবত । বইটই পড়েন ? ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ন্যাশানাল লাইব্রেরি, সাহিত্য পরিষৎ যান ? লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা পত্রিকা পাঠান ? আমি কিন্তু বইপত্র-পত্রিকা সংগ্রহ করি না । পড়া হয়ে গেলে আগ্রহীদের দিয়ে দিই । পাটনায় অবশ্য আমার ভালো ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল ।গিন্সবার্গ, জেমস লাফলিন, ফেরলিংঘেট্টি, হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, কার্ল ওয়েসনার, মার্গারেট র‌্যানডাল, ক্যারল বার্জ, ডিক বাকেন এঁরা অজস্র বই পাঠিয়েছিলেন । আমি লখনউ চলে গেলুম, বাবা-মা মারা গেলেন, তারপর এদেশে দুষ্প্রাপ্য বইগুলো চুরি হয়ে গেল । কলকাতায় যখন ১৯৯৪ সালে মুম্বাই থেকে এলুম, তখন শুনলুম অধিকাংশ বই মেরে দিয়েছিল দাদার এক ভায়রাভাই রঞ্জু ভট্টাচার্য, যেহেতু বই চুরি করাটা আধুনিকতাবাদী সদর্থক মূল্যবোধ । আমাদের উত্তরপাড়ার আদিবাড়িতে বিরাট একটা সিন্দুকে তালপাতার অমূল্য সব পুঁথি ছিল । ঠাকুমা মারা যেতে সেগুলোও হাপিশ । পড়াশুনা অবশ্য ছাড়িনি । লেখালিখির চেয়ে পড়াশুনা আমি বেশি করি । আপনি তো একা থাকেন, পড়াশুনা ছাড়া তো বেশ ভয়াবহ হবে প্রতিদিনের সময় কাটানো । তার ওপর হাত কাঁপে বলে লিখতে পারছেন না কিছু । এ তো চরম দুর্দশা । মোকাবিলা করছেন কী ভাবে ? কবে থেকে চলছে ? কেনই বা ?

কেদার : আমার একটা নেশা ছিল । বই কেনা । বই কেনা । বই কেনা । কিন্তু ওগুলো কবি উত্তম দাশের মতো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখবো সেই প্রতিশ্রুতি আমার ছিল না কখনও, নেইও । তার অনেকগুলি উইপোকায় খেয়েছে । অনেকগুলি, তোমার মতোই, হাপিশ । আবার অনেকগুলো অন্যদের দিয়ে দিয়েছি । উপহার । এখন অবশ্য কিনিনা বিশেষ । খুব কাছেই আমার এক বন্ধু থাকে । সুভাষকুমার মজুমদার । মাস্টারমশায়, বিয়ে-থা করেনি । একা । তারও ওই রোগ । কতো লক্ষ টাকার বই কিনেছে ও-ও জানে না । দরকার পড়লে যেকোনো বই যেকোনো সময়ে যে কোনো মুহূর্তে নিয়ে আসতে পারে ।  না থাকলে নিজে কিনে এনে দেয় । এমন । সেদিন চেলেনি পড়লাম । তার ডায়রি । ওই একটা বই পড়লেই ইতালির মধ্যযুগটা, ভয়ঙ্কর মধ্যযুগটা, বেশ জানা যায় । আসলে আমি যেসব বই পছন্দ করি, তা হলো সত্যি সত্যি সত্যি যা তাই । যেমন—ইতিহাস। নেপোলিয়ান অবশ্য বলেছিলেন ‘What is history but a fable agreed upon ?’ আবার মজাটা দ্যাখো, আনাতোল ফ্রাঁ বলেছিলেন ‘All the historical books which contain no lies are extremely tedious.’ যেমন ভূগোল, যেমন ভ্রমণ বৃত্তান্ত – মার্কো পোলো, স্টিভেনসন, ক্যাপ্টেন স্কট, কতো আর নাম বলব, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি ! যেমন দর্শন, দর্শনের বই । যেমন অটোবায়োগ্রাফি। উপন্যাস ও গল্প একসময়ে অনেক পড়েছি। যেমন টলস্টয় । ডস্টয়েভস্কি । জ্যাক লণ্ডন । অসকার ওয়াইল্ড । এমন এমন অনেক । ডান হাত কাঁপে। বাঁ হাত একটু । কবিতা তো লিখি । ওই বাঁ হাত দিয়েই কাজ সেরে ফেলি । কপি করার জন্য অবশ্য ছাত্ররা আছে । ছাত্রীও । একে চরম দুর্দশা বলছ কেন ? কতোজনের তো দুটো হাতই নেই ! তারা আবার পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দেয় । দেখেছি । এভাবেই মোকাবিলা । অনেক বছর থেকে । আর ‘কেনই বা’ ? ঈশ্বরের ‘আশীর্বাদ’ ছাড়া আর কী-ই বা বলি ! 

মলয় : জীবনে প্রথম যে গালাগালটা খেয়ে স্তম্ভিত হয়েছিলেন, সে-ব্যাপারটা একটু বলুন । আমার শৈশব কেটেছে পাটনা শহরের ইমলিতলা নামে এক ক্রিমিনাল এলাকায়, কাহার-কুর্মি-দুসাধ অধ্যুষিত দাগি পাড়ায় । তাই গালাগাল ব্যাপারটায় আক্রান্ত হয়ে ইনোসেন্স মুক্তির অভিজ্ঞতা আমার নেই । আপনি তো রাজসাহিতে ঘোড়ামারা গ্রামে ছেলেবেলা কাটিয়েছেন । প্রথম গালাগালের ধাক্কার তীব্রতা, যা দিয়ে মানবসমাজে আপনার আধুনিকতাবাদী ইনিশিয়েসন হলো, সে-অভিজ্ঞতার কথা বলুন একটু । লেনি ব্রুসের প্রথম শোনা আর প্রথম দেয়া গালাগালের জীবনে ভূকম্পন-ঘটানো একটা লেখা পড়েছিলুম, বছর তিরিশেক আগে । অসাধারণ মনে হয়েছিল । বাঙালি কোনও লেখক বা কবির অমন অভিজ্ঞতার বয়ান কোথাও পড়েছি বলে মনে পড়ছে না । আপনারটা শোনা যাক ।

কেদার : মহাভারতে কর্ণের চরিত্রে যা-যা বৈশিষ্ট্য ছিল তার অনেকগুলো আমারও । বোধহয় । ভেবে দেখেছি বহুবার, সংখ্যাতত্বের দিক দিয়েও এক । সূর্য ও ইউরেনাসের প্রভাব প্রকট । এখন কর্ণের জীবনটা জানা থাকলে আমার জীবনটাও জানা হয়ে যাবে, অনেকটা । বৃষকেতুকে বধ করে কর্ণ যেমন, আমিও তেমন । ঘোড়ামারাটা গ্রাম নয়, একটা পাড়া, রাজসাহি শহরের । তখনও ক্লাস ওয়ানে উঠিনি । পাড়ার এক ভদ্রলোক আমাকে একদিন– এখন আমাকে যা দেখছো, রূপে, তেমন নয়–এতই ফরসা ছিলাম যে মাকে ডাক্তার ডাকিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছিল, রোগটোগ নয়তো ! এতো ফরসা হয় কী করে ?—জিজ্ঞাসা করেছিল, খোকা তোমার বাবার নাম কী ? এমন অদ্ভুত প্রশ্ন আমি জীবনে শুনিনি । হকচকিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘কেন, বাবা’ । বাবার যে একটা নাম থাকতে পারে সে বোধ তখনও হয়নি । অবশ্য এর পেছনে অনেক কারণও আছে । বললে বড়ো গল্প হয়ে যাবে । থাক । একদিন সকালে বাজারের ব্যাগ হাতে বাজার যাচ্ছিলাম । তখন টুতে পড়ি । আমার উল্টো দিক থেকে আমারই বয়সী একটা ছেলে আসছিল । চেনা নয় অথচ চেনা । আলাপ-টালাপ হয়নি কখনও । কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ ছেলেটা বলে উঠলো ‘শা-লা’ । শুনে আমি স্তম্ভিত । বিস্মিত । কা্ছে কেউ নেই যে ও অন্য কাউকে ও-কথা বলেছে । মুখ দিয়ে ‘শালা’ কথাটা বলা যায়, এ যে কী বিস্ময়, এবং অশ্লীল । মুখের মধ্যেই যে ভগবান থাকেন, এ বোধ অন্তত তখনো ছিল । নইলে গালের ওপর একটি চড়ে পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট দাগ ফেললাম কী করে ? যা হোক, ছেলেটি কেঁদে ফেললো । আমিও অনেক দূর এগিয়ে গেছিল যখন এগিয়ে গেছি তখনও ছেলেটা ওখানে দাঁড়িয়েই আবার বললে, ‘শা-লা’ । আমি শুনলাম, দাঁড়ালাম, ঘুরে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম আস্তে-আস্তে । ও কিন্তু পালালো না । সহজেই পালিয়ে যেতে পারতো । দৌড়ে । আমিও গিয়ে আবার একটা চড়, আরো জোরে । এরকম বারবার তিনবার । ওর চোখে জল, টপ টপ করে ঝরে পড়ছে, এখনও দেখছি । এই চুয়াত্তর বছর বয়সেও । ভাবছি, মেরে কাউকে কিছু শেখানো যায় না । এই শিক্ষাই আমার জীবনে প্রথম শিক্ষা । এখন অবশছ ‘শালা’ কেন, আরো ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ স্বচ্ছন্দে বসিয়ে দিই । যেমন 

‘সারা দেশ মাগী হলে আমি তবে গডসে হয়ে যাবো।

গুলি করবি ? ফাঁসি দিবি ? আয় শালা, গুলি করে দেখ

রক্তবীজ, রক্তবীজ, ওরে শালা রক্তবীজ আমি’

এটা একটা সনেটের শেষ তিন লাইন । ছোটোবেলায় ভগবান ছিলাম । এখন ভুত হয়ে গেছি ।

মলয় : আপনি তো একা একা প্রতিদিন মদ খান বলে মনে হয় ল হুইস্কি সম্ভবত । ছয়ের দশকে আমরা যখন খালাসিটোলা, বারদুয়ারিতে মদ খেতে গেছি, তখন কখনও দেখিনি আপনাকে । আমি এখন আর দিশি মদ খাই না । মুম্বাইতে থাকার সামাজিকতার অভ্যাসের দরুন প্রতিদিন দেড় পেগ হুইস্কি খাই । নানান হুইস্কি এসেছে বাজারে । রাতে মদ না খেলে, কিছু একটা করা হয়নি, এরকম ভীতি বোধ হয়কি ? মানে, মদ কি অজুহাত হিসেবে খান ? অনেক কবি সাহিত্যিক মহলে মাতলামিকে ডিসকোর্স হিসেবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন । অন্যান্য নেশা করেছেন ? হার্ড ড্রাগস ? ট্র্যান্স, ডিলিরিয়াম, হ্যালুশিনেশানের অভিজ্ঞতা আছে ?

কেদার : বারদুয়ারি ! রানি রাসমনির বাড়ির কাছেই । ছয়ের দশকে অবশ্যই কবিতা লিখতাম । কোনো কবির সঙ্গেই আমার আলাপ ছিল না । একেবারেই । তখনও বারদুয়ারিতে গেছি । দুচারদিন । কিন্তু খালাসিটোলা নামটা শুনেছি । ঠেকটা যে কোথায়, জানতাম না তখনও । জানার চেষ্টাও করিনি । কখনও । ১৯৭৪ সালে ‘পাথরের স্লেট’ বেরোবার পর কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত আমাকেওখানে প্রথম নিয়ে যায় । । আরে ! ১৯৪৩ থেকে ১৯৭৪ ওই খালাসিটোলার পাশ দিয়ে গেছিও, এসেছি বহুবার । বুঝতেও পারিনি ওখানে এরকম একটা বিরাট ঠেক রয়েছে । আশ্চর্য । ১৯৪৫ সালে আমেরিকান সোলজারদের পাল্লায় পড়ে, কয়েকদিন জিন খেয়েছি, ক্যান বিয়ার খেয়েছি শুয়োরের মাংস ফ্রাই করে । ১৯৪৫ সালের আগস্টে যুদ্ধ তো বন্ধ হয়ে গেলল মহাযুদ্ধ । তারপর দুতিন দিন । দুএক পেগ, ফরেন । যেমন হোয়াইট হর্স, রেড লেবেল । তিন টাকা পেগ । মনে আছে । কেন খেয়েছি ? আমার তো মনে হয় মনের মধ্যে প্রেম নামক যে অদ্ভুত জীবটি আছে তারই দুপাশে দুটো ডানা গজানোর ব্যর্থতম প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয় । ১৯৫১ সালে যখন শ্রীনগর গেলাম, দেখি মিউল রাম-এর ছড়াছড়ি । তাও ফ্রি । সুতরাং অল ইন্ডিয়া ক্লাসে, যেখানে সব রাজ্যেরই ছেলে ছিল, জমাটি আড্ডা হতো । অফ ডিউটিতে ।  সুতরাং ওই শীতের মধ্যেই প্রথমে একটু-আধটু । তারপর পাঁইট পাঁইট । ভুখারিতে, মানে টিনের ফায়ার প্লেসে, মাংস গরম হতো, চাপাটি হতো, প্রায় নরক গুলজার । ১৯৫৬ সালে Fired ; চাকরি নেই, মদ খাবো কি ! বাপের হোটেল নেই ; মদ খাবো কি ! দুচারটে বড়োলোকের বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াই । তাও আবার তারা মাইনে দেয় না । উল্টে যায় । বাস ভাড়া । মদ খাবো কি ! নেশা যখন ভুলতে বসেছি, তখনই ভুল ভাঙলো। ঈশ্বর আছেন তাহলে । চাকরি মিললো । মিললেও কোনো বন্ধু নেই, কোনো প্রেম নেই, কোনো সম্পর্ক নেই, শুধু দেখভাল করেন ভাগ্য । 

মলয় : আধুনিকতাবাদী তত্ব অনুযায়ী স্কুল শিক্ষকরা তো মানুষ গড়ার কারিগর । তাদের কাজ সবাইকে পিটিয়ে একইরকম মানব বানানো । তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গে স্কুল শিক্ষকরা তো এসট্যাবলিশমেন্ট নামের অক্টোপাসের বিষাক্ত শুঁড়গুলোর অন্যতম । তাহলে আপনার এমন অবস্হা কেন ? গাঙ্গুলিবাগানের এই ছোট্ট অন্ধকার ঘরে সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন । শুনছি শাসক বিরোধিতার জন্য পেনশনও আটকে দিয়েছে নাকতলা হাইস্কুল । শৈলেশ্বর ঘোষকে দেখেছি গেটঅলা বড়ো বাড়ি বানিয়েছে দেবদারু গাছে ঘেরা, বইয়ের মলাটে ভিকিরির ছবি থাকলেও পনেরো হাজার টাকা খরচ করে আমাকে গালমন্দ করে পুরো একটা গাঁজাখুরি বই লিখে ফেলেছে আরেক স্কুল শিক্ষক বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে । স্কুল শিক্ষক পপদীপ চৌধুরীকেও দেখেছি রিজেন্ট পার্কের সুন্দর ফ্ল্যাটে এয়ার কাণ্ডিশানার লাগানো ; বাংলা-ইংরেজি-ফরাসি তিনটে ভাষার পত্রিকা ‘ফুঃ’ নিয়মিত প্রকাশ করে । সুভাষ ঘোষ সিপিএমের চন্দননগর লোকাল কমিটির সদস্য । কিন্তু আপনার চলেই বা কীভাবে ? এরা তো আনন্দবাজারকে এসট্যাবলিশমেন্ট চিহ্ণিত করে সাহিত্য অকাদেমি, বাংলা অ্যাকাডেমি, সিপিএম, লোকাল কমিটি সবাইকে তোয়াজ তদবিরে রেখেছে । আপনি ক্ষমতাকেন্দ্রেরই বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছেন । আপনি কি ভাবছেন কথোপকথনের সময়ে যেসব আক্রমণ-আগ্রাস চালাচ্ছেন, সেগুলো মালিক বাহাদুরদের কানে পৌঁছোয় না? সারা পশ্চিমবঙ্গে স্কুল শিক্ষকরা যে আখের গোছানো কোম্পানি প্রায়ভেট লিমিটেড খুলেছে তার শেয়ার হোল্ডার হলেন না কেন ? কবি কেদার ভাদুড়ী কী চাইছেন ? কী প্রমাণ করতে চান ? আত্মনিরুপণের কোন মাত্রা ব্যাখ্যা করতে চান নিজের কাছে, পাঠকের কাছে ? নাকি রিজাইনড টু ফেট?

কেদার : এতোক্ষণে মলয় রায়চৌধুরীকে মলয় রায়চৌধুরী বলে চেনা গেল । তুমি তো জবরদখল কলোনিতে এসে  কয়েক বছর মাত্র আস্তানা গেড়েছ । কী করে জানবে জবরদখল কলোনির মানুষজনের নোংরাতম ইতিহাস ? তার মধ্যেই কাটাতে হলো । গাঙ্গুলিবাগানের সরকারি বস্তির এক চিলতে এক ঘরে। প্রায় একচল্লিশ বছর এখানে আছি । কুড়ি টাকা ভাড়া । জাস্ট কুড়ি । তাও আবার দেয় না বা দিতে পারে না ষাট শতাংশ মানুষ । তাদের মধ্যে অনেকেই অন্য জায়গায় ফ্ল্যাট কিনেছে, ওঠে না । বাড়ি বানিয়েছে, যায় না । মোটর সাইকেল, স্কুটার, এমনকি মোটর গাড়িও আছে অনেকের । ঘরের সামনে একটা ছোটো বাগান করেছিলাম, হাজার টাকা খরচ করে । বালতি বালতি সিমেন্টের চাঙড় তুলেছিলাম।পরিশ্রম । রঙ লাগিয়েছিলাম । আমার ঘরে তো এর আগে দুতিনবার এসেছো । লক্ষ্য করোনি বুঝি ? ওটা এখন একটা ডাস্টবিন । নোংরা ফেলছে তো ফেলছেই । ওখানেই । বোকার মতন বেশ কয়েক বছর টাকা দিয়ে পরিষ্কার করাতাম । এখন বুদ্ধির জল এসেছে মাথায় । কাজের লোককে বলেছিলাম ভেঙেটেঙে তুলে নিয়ে যা । খুঁটিগুলো, কাঠগুলো যা সব আছে নিয়ে যা । নিচ্ছে । কিছু কিছু । বেশ কয়েকদিন পরই দেখবে ফরসা । তবে আমি খুশি । বিশটাকা ভাড়ায় আর কোনো ফ্ল্যাট কলকাতায় আছে নাকি ? চব্বিশ ঘণ্টা জল, বিদ্যুৎ । এখন অবশ্য ওই বিশটাকাও সরকার নেয় না । মহানুভবতা নয় । উচ্ছেদের নোটিস দিয়েছে । কিন্তু কেউ ওঠেনি । উঠবেই বা কোথায় ? বাড়িভাড়া নিলে হাজার দুয়েক টাকা মাসে-মাসে গচ্চা । আমরা রিফিউজি না ! সোজা কথা ! এদের নাইনটিনাইন পারসেন্ট লোকও কোনো দিন পূর্ববঙ্গে থাকতে, চারতলা বাড়ি চোখেও দ্যাখেনি । আর ‘কবি কেদার ভাদুড়ী কী চাইছেন’? কি আর চাইবো ! দশদিন আর দশরাত্রি সমানে অনশন করেছি ওয়েলিংটন স্কোয়ারে । জেলে গেছি বার বার । আর্মিতেও একবার ঢুকতে গিয়েছিলাম । পালিয়েছি । দুনম্বর এগজিবিশান রোড, পাটনা থেকে । পছন্দ হলো না । পালিয়েছি । ঢ্যাম ঢ্যাম ভি.ভি.আই.পির সঙ্গে সংঘর্ষে এসেছি । প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর টনক নড়ে গিয়েছিল । শত-শর রাজনৈতিক কারণে, তাদের মধ্যে অনেকেই, কেদার ভাদুড়ীর হাল-হকিকৎ জানিয়েছিল । অনেকে বলতে যারা আমাকে চিনতো তাদের কথাই বলছি । আমিই একমাত্র ব্যতিক্রমী পুরুষ যে একজনের নামও প্রকাশকরেনি । করলেও, ‘আর করিব না’ এই বণ্ড লিখে দিলে কর্পোরাল কেদার ভাদুড়ীর চাকরিটা অন্তত বাঁচতো । ‘কেদার ভাদুড়ী কী চাইছেন?’ আমি কিছুই চাইছি না । আমি শুধু আমার মতনই বেঁচে থাকতে চাই । আমাদের ছোটোবেলায় অলিখিত এক অনুজ্ঞা ছিল । একজনের সঙ্গে একজনই লড়তো । রাইট অর রঙ । যে জিততো, মেনে নেয়া হতো । এখন পাঁচশোজন এসে পেটায় । খুন হলে গণপ্রহারে মারা গেছে এইসব বলে । আবার ছাপ দেয়, সমাজবিরোধী । গণপ্রহারের একটা সুবিধে আছে । মামলা-টামলা হয় না । এখানে আমি অন্তত বিশ-বাইশজনকে খুন হতে দেখেছি । আমিও হতাম । হইনি । অনেকেই চুপিচুপি জ্ঞান দিয়েছে, কেটে পড়ুন মশাই, কেটে পড়ুন । তাও চুপিচুপি । পালানো জিনিসটাই তো শিখিনি কোনোদিন । ফিল্ড মার্শাল মন্টেগোমারির ভাষায় একে বলে A successful retreat. তবুও দ্যাখি কি সুন্দর বেঁচে আছি । সোজাকথা স্পষ্টভাবে বলছি । ভাগ্যদেবীকে মানি । I believe in faith. তবে  fatalist নই । একটা ছোটো ঘটনা বলি । ১৯৬৫ সালে ফাইভে এসে ভর্তি হলো । চোখে পড়ার মতো নয় । সেই ছেলেই দেখি হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফার্স্ট হলো । হাফ ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হলে তো কোনো প্রাইজ নেই । আমি তাকে হাজরার মোড় থেকে একটা পাঁচ-ছটাকা দামের ফাউনটেন পেন কিনে ক্লাসের মধ্যে উপহার দিয়ে বসলাম । পরের দিনই একঠোঙা লজেন্স ও একটা চিঠি । লজেন্স তো বেটে দিলাম দুটো-দুটো করে ক্লাসের সব ছেলেকে । দেখলাম ওর বাবা একজন মাস্টারমশাই । মেট্রোপলিটান স্কুলের ।  ফ্রিডাম ফাইটারও । স্বাধীনতা সংগ্রামী । লিখেছেন, অনেক অনেক কথার মধ্যে একথাও লিখেছেন, “আমি বিশ্বাস করি না সমগ্র ভারতবর্ষেও আপনার মতো আর দ্বিতীয় কোনো মাস্টারমশায় আছেন।” পরবর্তীকালে দেখা গেলো, He never stood second from five to Higher Secondary. নাম অভিজিৎ গুহ । ব্যাঙ্কের ম্যানেজার । বস্তি জেলায়, উত্তরপ্রদেশে। কবি । তার একটা সনেট ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকায় বেরিয়েছে কয়েক সংখ্যা আগে । এটাকে কি ‘প্রাপ্তি’ বলব না ?  এই রকম বেশ কিছু প্রাপ্তি নিয়ে বেঁচে আছি । এখনও । তোফা ।

মলয় : আধুনিকতাবাদী সমাজে ডিসেন্ট অর্থাৎ মতের অনৈক্যকে নষ্ট করার প্রথম অস্ত্র হলেন স্কুল-শিক্ষকরা । যার সঙ্গে মতের মিল হচ্ছে না, সেই বালক-কিশোরকে বাধ্য-বশ্য করেন তাঁরা । বস্তুত ইংরেজরা আসার আগে নিল ডাউন বা স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ জাতীয় নির্দিষ্ট অপমানজনক শাস্তি ছিল না । স্বাভাবিক কারণে আধুনিকতাবাদের বিরোধিতায় ছাত্ররা বিভিন্ন উপায় বের করে ফেলেছে যাতে বাধ্য-বশ্য হওয়া প্রতিরোধ করা যায় । তাছাড়া শিক্ষরাও যে উত্তরআদর্শবাদী জীব, তার পরিচয় তারা পাচ্ছে অহরহ । মানব জীবনে বালক-কিশোরের প্রবেশকালীন এই সমস্যাকে কী ভাবে ট্যাকল করেছেন ? কোনও কবিতায় এই টেনশনটা দেখলুম না তো !  নাকি কবিতার জগতকে এই এলাকাটার বাইরে রাখতে চেয়েছেন ? কিন্তু কবিতার জগত তো কফিহাউস, মিডিয়া দপতর বা লিটল ম্যাগ আড্ডা নয় । আপনি তো বাংলা-ভাষাভাষি জগতের অধিবাসী । বাংলাভাষা জগতটাই তো আপনাকে পড়ছে অবিরাম । বাঙালির ভাষা-ব্রহ্মাণ্ডে শিক্ষক ও কবি কেদার ভাদুড়ী তো জীবনের অধিকাংশ তেজ আর সংসাধন খরচ করেছেন । তাহলে ?

কেদার : তুমি আর কয়টি কবিতা পড়েছ আমার ? দুশো ? পাঁচশো ? তার বেশি কখনই নয় । আমার কবিতার সংখ্যা কতো তা আমি নিজেই জানি না । বারো-চোদ্দো-পনেরো-আঠারো হাজার তো হবেই । তাহলে ? ট্যাকল করেছি ভালোবাসা দিয়ে ও বন্ধু হিসেবে মিশে । শাস্তি দিইনি তা নয় । ঢ্যামঢ্যাম বড়ো লোকদের ছেলেরা যখন উন্নতনাসা হয়ে থাকতো তখন ক্লাসরুমে এমন পিটিয়েছি যে আলিপুর ক্রিমিনাল কোর্টে আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হলো । কয়েকবার । একটি কেসে, মনে আছে, এক জজসাহেব মন্তব্য করেছিলেন, ‘I am biased. অন্য ঘরে মামলা নিয়ে যান মশাই ল কী করেন ? কাপড়ের ব্যবসা ? তাই করুন গিয়ে । মাস্টারমশাই পিটিয়েছে বলে মামলা ? মাস্টারমশাই ছাড়া আর কে পেটাবে ? অ্যাঁ ?’ এরকম খুচরো খবর আমি অনেক দিতে পারি । তাহলে ?

মলয় : শিক্ষক-অধ্যাপকদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায় । মানে, কবি-লেখকদের কথা বলছি আমি । তাঁরা অনেকেই, নিজেকে, পাঠকদের, আর ছাত্রদের ঠকান । যেমন ক্লাসরুমে জসীমুদ্দিন, গোলাম কুদ্দুস, কুমুদরঞ্জন প্রমুখের পক্ষে ভ্যালু-জাজমেন্ট দেন, আর লেখার সময়ে বা নিজের লেখার বৈধতা প্রমাণের জন্য ওনাদের নান্দনিক মূল্যবোধের বিরোধিতা করেন । যে শিক্ষক-অধ্যাপকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঘোষণা করেন, তাঁরা সিপিএমের সভায় হাত তুলে-তুলে ইনক্লাব জিন্দাবাদ চেল্লান । অনেকে নিজেদের লেখাকে বলেন আণ্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য, আর সরকার বা অকাদেমির ল্যাজ ধরের তরে যাবার তালে থাকেন । অনেকে ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের জয়ধ্বনি করেন অথচ বাইরে পাঠকদের কাছে এঁদের ডাউনগ্রেডিঙ করেন । বুদ্ধদেব বসু এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ । ওনার ‘সাহিত্যচর্চা’ প্রবন্ধে উনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন, “সত্যি বলতে, মাইকেলের মহিমা বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তি, দুর্মরতম কুসংস্কার । কর্মফল তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে ভুল স্বর্গে, যেখানে মহত্ব নিতান্ত ধরে নেওয়া হয়, পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক বাঙালি পাঠক মাইকেলের রচনাবলী পড়ে এ-মীমাংসায় আসতে বাধ্য যে তাঁর নাটকাবলী অপাঠ্য এবং যে-কোনও শ্রেণীর রঙ্গালয়ে অভিনয়ের অযোগ্য, ‘মেঘনাধবধ’ কাব্য নিস্প্রাণ, তিনটি কি চারটি বাদ দিয়ে চতুর্দশপদী পদাবলী বাগাড়ম্বর মাত্র, এমনকি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যেও জীবনের কিঞ্চিৎ লক্ষণ দেখা যায় একমাত্র তারার উক্তিতে ।” এগুলো কোনও ছাত্র পরীক্ষার খাতায় লিখলে আপনারা তাকে নির্ঘাত ফেল করিয়ে দেবেন । শিক্ষক-অধ্যাপক কবিদের এই ডুয়ালিটি বা চরিত্রে কারচুপি কেন ? নিজের সমাজ আর নিজেরকবিতাকে তাঁরা কি একই জ্ঞানপরিধির অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না । মাইকেল আর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার অবস্হান ?

কেদার : মাইকেলের জীবনধারা আমার ভালো লাগে । গুরুর সঙ্গে গোমাংস খেতেন কিনা জানি না, ওল্ড মিশন চার্চে ধর্মান্তরের ব্যাপারটাও মেনে নিতে পারি । একদিক থেকে । রেবেকাকে ছেড়ে হেনরিয়েটাকে নিয়ে পালিয়ে আসাটাও । ইংরেজি ভাষাটা ভালোই শিখেছিলেন । ট্যালেন্টেড নিঃসন্দেহে। স্কুলে, কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ওঁর বই পড়ানো না হতো, বাই ফোর্স, তবে কয়জন বাঙালি পকেটের টাকা খরচ করে বই কিনে পড়তেন জানি না । পয়ারকে ব্ল্যাংকভার্সে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সনেটকে বাংলা সাহিত্যে আমদানি করেছিলেন । প্রথম । মানতেই হয় । দুতিনটে সনেট ছাড়া আর সবই অপাঠ্য । বিদ্যাসাগরমশাই না থাকলে, প্রাতঃস্মরণীয় বিদ্যাসাগর, কী যে ওতো বলা যায় না । এবারে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ । কবিতা ? আট-দশটা । গানে ? সারা জীবন ডুবে থাকা যায় । সারাটা জীবন । গল্পে ? তুলনাবিহীন । গীতাঞ্জলিতে ওঁর নোবেলপ্রাপ্তি, এখনও আমার লজ্জা হয় । গল্পেই পাওয়া উচিত ছিল । ওঁর ভাষাজ্ঞান অসাধারণ । ভাষাগত জ্ঞান, তাও অসাধারণ । গরুকে গোরু প্রথম লিখেছিলেন বলে কি যাতনাই না সহ্য করতে হয়েছিল । বাংলা ছন্দে কেউ আর ওঁর পদধূলিরও যোগ্য নয়। নির্মাণেও তাঁর কৃতিত্ব, ভাবতে বসলে আমার ব্যকরণ ভুল হয়ে যাবে । সুতরাং গুরু থেকে গুরুদেবে উত্তরণ যথার্থই । ওই সময় । ওই স্হান । ওইসব পাত্রমিত্র । ওই স্বর্ণসিংহাসনে অবস্হান করতেন বলেই, বুঝে নাও, দ্বিতীয়বার বিবাহের দিকে যাননি । এটা আমার ব্যক্তিগত মত । তাছাড়া মননে কি কাদম্বরী দেবী ছিলেন না ? ‘তুমি কি কেবলি ছবি। শুধু পটে লিখা ?’ ‘দ্রুত হাঁটছে, পা রয়েছে স্হির।’ এ ধরণের কবিতা কি লিখতে পারতেন না ? আসলে ভয় । সিংহাসনচ্যূতির ভয় । ভয়ানক ।

মলয় : আপনার ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটার ভূমিকায় বছর দশেক আগে উত্তম দাশ লিখেছিলেন যে, আপনি একজন প্রতিভা এবং এই জন্য অবহেলিত ও অবাদৃত যে, বঙ্গভূমিতে প্রতিভার বিচার ঠিক মতন হয় না । উনি এও লিখেছিলেন যে, এমন একদিন আসবে যেদিন আপনার দিকে সিংহাসন এগিয়ে দেয়া হবে । কারণ হিসেবে উনি লিখেছিলেন, ওনার কথাই বলছি হুবহু, “বাংলা কবিতায় নিজস্ব এক পঠনভঙ্গীর প্রতিষ্ঠা কেদারের স্বকীয়তার দান । তাঁর নিজস্ব উচ্চারণ গেঁথে থাকে, যাকে শব্দবন্ধ বাক্যবিন্যাস থেকে আলাদা করা যায় না ; করলে তাঁর কবিতার রহস্যই যেন হারিয়ে যায় । এজন্যে এক বিশেষ ভাষাভঙ্গী আবিষ্কার করেছেন কেদার । বাংলা কবিতার শব্দবন্ধের প্রায় বিপর্যয় থেকেই পপতীত হয় এক ভিন্ন জাতীয় অর্থবোধ।” সত্যি বলতে কি প্রতিভা জিনিসটা যে ঠিক কী, এবং কবিতা লেখার সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কিনা, ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার নয় । আপনি অবহেলিত আর অনাদৃত সিম্পলি বিকজ আপনি আধুনিকতাবাদের প্রধান নির্দেশ মানছেন না একেবারেই । আধুনিকতাবাদী অনুশাসন অনুযায়ী প্রতিটি কবিতাকে হতে হবে একশৈলিক আর্টপিস বা শিল্প এবং তার জন্য রচনাটিকে হতে হবে গম্ভীর এলিটিস্ট একটি একক, তার সুস্পষ্ট আদি-অন্ত লজিকাল লিনিয়রিটি থাকবে । আপনি প্রতিটি কবিতাকে উপস্হাপন করছেন বাচনিক যৌগ হিসেবে, যার আদি কোনও এক অস্পষ্ট কালখণ্ডে থেকে থাকবে । প্রতিটি কবিতার প্রথম পংক্তি এবং সেই অতীত অজানা ঘটনার অনিশ্চয়তার মাঝে তৈরি স্পেসটায় পাঠককে ঠেলে দিচ্ছেন আপনি । হিন্দুদের দেবী-দেবতারা যেমন জয়দেব বা বড়ু চণ্ডিদাসের সময়ে মন্দিরে অধিষ্ঠানকালে ছিলেন আদিহীন-অন্তহীন, কিন্তু ইংরেজ আর মার্কিনীরা তাঁদের উপড়ে বা মুণ্ডু কেটে নিয়ে গিয়ে সংগ্রহালয়ে আর্টপিস বানায় । আপনি তো সীমা লঙ্ঘন করছেন, নান্দনিক সীমাকে অস্পষ্ট করে দিচ্ছেন । দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনার কবিতার শিরোনাম দিয়ে কবিতার কেন্দ্র বা বিষয় চিহ্ণিত হয় না । মানে, শিরোনামটা কবিতার টাইটেল হোল্ডার নয় । যার দরুণ পাঠক প্রথম পংক্তির পরও প্রবেশপথ খুঁজে বেড়ায় । আপনার ১৯৬৯ সালে পপকাশিত ‘শুকনো জল’ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি কবিতার আদরায় রয়েছে বৈশিষ্ট্যগুলো । এ-ব্যাপারে আপনি ভেবেছেন কিছু ? ভাবার দরকার মনে করেছেন ? আমার কথা যদি বলেন, আমি নিজেকে অবহেলিত বা অনাদৃত মনে করি না । কারণ আমি একজন OUTSIDER.

কেদার : আমি যখন কবিতা লিখতে শুরুকরি, তার হাজার বর্গমাইলের মধ্যেও এমন কেউ ছিল না যার কাছ থেকে আমি অণু-পরিমাণ গাইডেন্স পেতে পারি । আমার তখন ২৪ বছর বয়স, ১৯৪৯ সালে । ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত আমি শুধু আমার মতো করেই লিখে গেছি । আমার মতো মানে আমার মধ্যে আর এক ‘আমি’ আছে । আসলে সেই লিখতো । মনে হয়েছিল, এখনও হণ, যে, আমি মানুষটা তিন জনের মিশ্রণ । বুগোর জাঁ ভালজাঁ, ডিকেন্সের কপারফিল্ড আর শরৎবাবুর ইন্দ্রনাথ । সুতরাং অভিজ্ঞতা এবং যন্ত্রণা কতো গভীর এবং কতো বিস্তৃত হতে পারে, ব্যাপক, কল্পনাও করতে পারবে না এমন একজন বাঙালি আমি । শিল্প হলো কি হলো না, আধুনিকতাবাদের প্রধান নির্দেশ মানছি কি মানছি না, এসবে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । ছিলও না । কোনোদিন । আমি কি নিজেকে অবহেলিত বা অনাদৃত মনে করি ? একেবারেই না । আমারই কবিতা অন্যের নামে ছাপিয়ে দিয়ে দেখলাম, কাব্যগ্রন্হটির মধ্যে ওটাই, সমালোচকদের মতে, ওটাই দ্য ভেরি বেস্ট ।এরকম আরো একটা । একটি মেয়ের নামে শতকার ৯৯.৯শতাংশ লেখা একটা কবিতা পাঠিয়ে দিয়ে দেখি বড়ো বড়ো ম্যাগাজিন থেকে সম্পাদকদের বিনীত অনুরোধ আসছে, এই তো লেখা ! এমন লেখা চাই । চাই-ই । অনেক কলেজের অধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, লিখিত জানিয়েছেন, ভাদুড়ী ইজ গ্রেট, শিয়োরলি গ্রেট । চাকরি ছেড়ে দিয়ে আপনার পেছনে চব্বিশ ঘণ্টাই আমার ঘোরা উচিত, জানা উচিত কী করে লেখেন এসব কবিতা ! ভারত কাঁপানো কোনো পুরস্কার পাইনি বটে, শত শত ছেলের ভালোবাসা পেয়েছি । কবিতায় আকৃষ্ট করেছি। এও কি কম কিছু ? আমি মনে করি কোনো কবিতারই কোনো শিরোনাম যথাযথ হতে পারে না । নাম্বার দেওয়া উচিত । শেক্সপিয়র যেমন দিয়েছেন ১,২,৩…। নামও দেওয়া উচিত নয় । গাড়িতে যেমন নাম্বার থাকে অনেকটা তেমনি । কে শক্তি, কে সুনীল, কে জয়, কে মলয়, আর কেই বা উত্তম কেউ জানলো না । বোঝা যেতো তখন ব্যাপারটা । আর পঠনভঙ্গীর কথা ? এমন সব কবিতা আছে আমার, আমি ছাড়া আর কেউ ঠিক মতো পড়তে পারবে না । পারে না । দেখেছি । একবার ঋষিণ মিত্র আমার এক কবিতায় সুরারোপ করেছিল । তখন বুঝেছি কবিতাও মার্ডার হতে পারে । বলিনি, কিছুই বলিনি । কেননা এমন কোনো আদালত নেই যেখানে এই খুনের মামলার বিচার হবে । একটা কবিতা যখন একবার পড়েই লোকে বুঝে যায় তখন বাঁদরামির নীল ইতিহাস আমার জানা হয়ে যায় । এছাড়া আর যা-যা বলছ, মানছি । আসলে কবিতা তো মেয়েমানুষ। যদি সুন্দরী হয় তো কথাই নেই । হাজার দৃষ্টিকোণ থেকে হাজার লোক হাজার ভাবে নিতে পারে । নেয়ও । তাই না ?

মলয় : আধুনিকতাবাদী অনুশাসন অনুযায়ী প্রতিটি কবিতার একটি বিষয়কেন্দ্র থাকা দরকার, অনেকটা সাম্রাজ্যবাদে সম্রাটের মতন, বা রাষ্ট্রের রাজধানির শাসনের মতন । তার ভাব, অর্থাৎ ক্ষমতাকেন্দ্রটির ভাব, এমন হবে যে তাকে সম্প্রসারিত করা যাবে, সাম্রাজ্যবাদের বা নয়া-ঔপনিবেশিকতার বিস্তারের মতন ।এই ভাবটি আবার অপরিবর্তনীয়, সব্বাইকে তা মেনে নিতে হবে, শাসকের হুকুমের মতন । অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিরোনামটির সাহায্যে আধুনিকতাবাদী কবি তাঁর ক্ষমতাকেন্দ্রটি চিহ্ণিত করতেন, সম্রাটের মুকুট বা দেশনেতার হোয়াইট হাউস-ক্রেমলিনের মতন। আপনার কবিতায়, অধিকাংশ কবিতায়, অমন বিষয়কেন্দ্রের উপস্হিতি নজরে পড়ে না । দ্বিতীয়ত, কবিতার যেটুকু ভাব আঁচ করা যায়, তার সঙ্গে শিরোনামের মিল সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না । তৃতীয়ত, প্রকরণকৌশলের ফুর্তিবাজ বাচনিকতার কারণে, ভাবের ওটুকু রেশও ডিসপ্লেসড হয়ে যায় । অর্থাৎ, চালু সার্কলে আপনার স্বীকৃতি না পাওয়ার এ-ও এক কারণ । কেননা, কবিতা যে ভাববিশেষের যৌক্তিক রূপ হিসেবে না-ও উপস্হিত করতে পরেন কবি, আর কেন্দ্রটির বহুবিধ ট্যানজেন্ট রূপে তাকে গড়তে পারেন, তা আপনি কবিতার পর কবিতায় দেখিয়ে যাচ্ছেন । কিন্তু তা সত্বেও আধুনিকতাবাদীরা আপনাকে শৈলীনির্মাতা বলে মানছেন না । শৈলী বা ব্র্যাণ্ডিঙ -এর শিরোপা এই জন্য দেয়া হচ্ছে না যে, একটা কবিতা, পাঠকের কাছে ওয়ান মর্সেল ভোগ্য কমোডিটি হয়ে উঠতে পারছে না । কমোডিটি না হলে ব্র্যান্ডিঙ হয় না । জানি না এ-ব্যাপারগুলো ভেবেছেন কি না । মঙ্গলকাব্য বা পদাবলী রচয়িতাদের ব্র্যাণ্ডিঙ সম্ভব ছিল না । লক্ষ্য করবেন যে তাঁদের কাব্য ইষ্টদেবতায় নিবেদিত বা কোনও দেবী বা দেবতার স্বপ্নাদেশে লেখা । রচনার অথরিটির উৎস ছিলেন সেই দেবী বা দেবতা, লেখক নিজে নয় । আধুনিকতাবাদে লেখক  হয়ে উঠলেন নিজেই নিজের লেখার অথরিটি । মানে, একটা কবিতার বিষয়কেন্দ্রের, যে কেন্দ্রটি থেকে আবার উৎসারিত মানে অপরিবর্তনীয়, তার নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে উঠলেন । আধুনিকতাবাদী কোকেন হেরোইনে অভ্যস্ত পাঠক বা সমালোচক, যদি দেখেন যে তাঁর কাঙ্খিত কেন্দ্রটি নেই, তাহলে আপনার কবিতা সম্পর্কে মিডিয়া-অকাদেমি-সরকারের কর্তাদের উইথড্রল সিম্পটমকে দোষ দেয়া যায় না । কেন্দ্রটিকে শক্ত-সমর্থ করার জন্য পংক্তির পর পংক্তি বসিয়ে রেললাইন বরাবর কবি লজিকালি শেষ পংক্তিতে পৌঁছোন । সাধারণত আধুনিকতাবাদী কবিতায় সেটাই টারমিনাস । আপনার কবিতা সেভাবে টার্মিনেট করে না । এমনকি ফুর্তি বজায় রেখে পরের কবিতায় চলে যাওয়া যায়, একের পর এক কবিতায়, আহ্লাদের ব্যাপক গেমপ্ল্যানের দরুন । আপনি এব্যাপারে নিজের দিকটা একটু বলুন ।  আমার সঙ্গে অ্যাগ্রি করার দরকার নেই ।

কেদার : ধরো, যারা আছে তারা সবাই মরেছে । ধরো, ওই সময় বা ওরও বেশি, ৫০ কি ৬০, ধরো, আর, যদি আমি আমার অপ্রকাশিত কিছুটাও প্রকাশ করে যেতে পারি তাহলে মূল্যায়ন জিনিসটার তখনি মূল্যায়ন হতে পারে । কবি জীবনানন্দের জীবনে অনেকটা তাই ঘটেছে । আমার বিশেষভাবে ভালো-লাগা একটা কবিতা, ‘আট বছর আগের একদিন’ পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক সুধীন দত্তসাহেব ছাপেননি । বলেছিলেন, ওটা কবিতাই হয়নি । ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর হাত দিয়ে । আর আহ্লাদ বলছ ? ফুর্তি বলছ ? কই, আমি দেখি না তো ! চোখের জলের টসটসানি দেখোনি কি কোনোদিন ? আমারই দুর্ভাগ্য ! ব্যাস, আমার জবাব হয়ে গেল ।

কেদার ভাদুড়ীর কয়েকটি কবিতা

হঠাৎ পুস্পিতা

………………….

হঠাৎ পুষ্পিতা এসে বললো‌: দেখুন স্যার,

আমাকে না জানিয়ে অনেকেই প্রপোজ করে, কি করি?

বললাম‌: করবেই তো

মেয়েরা প্রপোজিত হবে, তবেই না মেয়ে !

পুষ্পিতা কি এমনই হয়েছো?

ভ্রুণ থেকে ভ্রুণাতীত, জন্ম থেকে জন্মাতীত তুমি

প্রজাপতি আসুক, কী আছে !

একদিকে প্রজা, অন্যদিকে পতি, দ্বৈতবাদ, সেইতো সুন্দর।

পুষ্পিতা বললো, কি কথা ! অনন্য। অন্যতর স্বাদ।

তখুনি ঘরে ঢুকলো একফালি অন্ধকার, একফালি পোড়-খাওয়া পূ্র্ণিমার চাঁদ।

___________

চুমো কনজিউমার গুডস্

……………………………..

বাবা বলেছিলেন, অত গল্প পড়িস কেন, খোকন?

সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে মেশ, দেখবি গায়ে গল্প লেখা থাকে।

সেই থেকে আজতক আমি গোগোল পড়িনি

সেই থেকে আজতক আমি জ্যাক লন্ডন

সেই থেকে আজতক আমি টেগোরের গল্পগুলো

চেকভের গল্পগুলো লু শ্যুনের গল্পগুলো মোপাসাঁ ইস্তক।

শুধু একবার চুরি করে ভিক্টর হুগোর গল্প

সেই-যে-সেই ছেলেটি, দ্বীপের মেয়েটি,জাহাজডুবি……….

যাচ্চলে, মনে নেই।

মনে থাকে কি কখনো এইসব বাঁদরের, ইঁদুরের গল্প?

রোমানফ কী বলেন? টলস্টয়? আনাতোল কী বলেন? ডুমা?

বৃদ্ধ মানুষটি এবং সমুদ্রের গল্প লিখে যে ছেলেটি গুলি খেলো, সেও

রেমারএ কী বলেন? টুর্গেনিভ কী বলেন? মম?

খেজুরগাছের দেশে মাদী চিতাবাঘের পাল্লায় টুঁটিকাটা ছাড়া

উপায় থাকে না।

উপায় কি থাকে না কখনো? আমি শুধু দুটি, দুটি মাত্র স্টেট এক্সপ্রেস খাইয়ে

রুশী মেয়েটির গায়ে গল্প পেয়েছিলুম, দু’গালে দ? চুমো।

_____________

একটি চুমোর জন্য আমি

…………………………….

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি রাজত্ব ছেড়েছি

রাঁধুনীকে বলি আমি, আহা গিন্নি রান্নাঘর দেখ

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি সাম্রাজ্য ছেড়েছি

ধোপানীকে বলি আমি, আহা গিন্নি স্নানঘরে যাও

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি সাম্রাজ্য বেচেছি

চাকরাণীকে বলি আমি, আহা গিন্নি ঘরদোর মোছো

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি রাজত্ব ছেড়েছি

সেবিকাকে বলি আমি, আহা গিন্নি মাথা টেপো দেখি

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি অপমানি হব

রক্ষিতাকে বলি আমি, আহা গিন্নি আলোটা নিবাও

তোমার একটি চুমুর জন্য আমি অপমানি হব

বিয়োনিকে বলি আমি, আহা গিন্নী গর্ভবতী হও

তোমার একটি চুমোর জন্য আমি মৃত্যুমুখি হব

রাজত্ব সাম্রাজ্য ছেড়ে আমি নরকে পৌঁছবো

___________

মোহ

…….

চারিদিকে বৃক্ষ অগুনতি। তারই একটা হেভেনলি ফ্লেইম,

ফ্লেইম? না ইনফার্নো?এই জেনে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে

ইন্ডিয়ান লেবার নামের, পাশে লুকিয়ে হঠাৎ……….

হঠাৎ্ই শুনতে হ’লো সেই স্বর, বাংলায়‌: অসভ্য!বাঁদর!

মাধোরায়, গুর্জরদেশের এই মন্দিরের পাশে

যে অরণ্য আছে সহস্র শিল্পের, শিল্পের কর্মের,

নবম কি একাদশ শতকের, আমি শুধু তার

স্তনের উজ্বল মসৃণতা দেখেছিলুম ব’লেই

হাত দিয়ে, বাঁ হাত দিয়ে, ছুঁয়ে, মসৃণতা

দেথেছিলুম ব’লেই শুনতে হ’লো সেই স্বর বাংলায়‌: অসভ্য, বাঁদর!

কিন্তু বাংলায় কেন? গুর্জরদেশের ভাষা ওকি ভুলে গেছে, মেয়ে?

উৎকল দেশেও তাই, একবার, কোনারক, সূর্যের মন্দিরে,

বিজয়নগরে, কেশব মন্দিরে, মদনিকা, আর্শিতে যখন

মুখ দেখেছিলো একা, হঠাৎ তখুনি স্তনে হাত রেখেছিলুম ব’লেই………

আহা, মামাল্লাপুরমেও তা। লালচে, কালো, সাদা পাথুরে মেয়েরা

ভাবতে ভাবতে লজ্জা, না লজ্জা নয়, শরমে মরে যাই শুধু।

কেননা, আমার ভিতরে যে মেয়ে থাকে, চুল বাঁধে, নাচে, গায়

স্তনে সর মেখে শুয়ে থাকে, উপন্যাস পড়ে, পিয়ানো বাজায়,

পার্টিতে চিকেন স্যুপ খায়, হরিদ্বারে গিয়ে পিদিম জ্বালিয়ে

পিতৃপুরুষের দায়ে একবার ভাসিয়েছিলো গঙ্গায়, সেই।

___________

অনিবার্যকারণবশত

…………………………..

অনিবার্যকারণবশত

আমি কাল দিব্য আঁধারে গাছের তলায় দাঁড়াতে পারিনি রাধে।

বেলগাছে ভূত থাকে, থাকেনা কি? ব্রহ্মদত্যি, এ কথা তো জানা,

কিন্তু যেটা জানা ছিলোনা তা’হলো তার পক্ক বিম্বাধর ফল, লোভ

পয়োধরা তুমি, পয়স্বিনী, অববাহিকায় আছো।

থাকো, কিন্তু ক্ষমা করবে তো, বলো? অনিবার্যকারণবশত

তুমিও তো একদিন এইদিন এতোদিন, আহা—

অনিবার্যকা-র-ণ-ব-শ-তঃ।

___________

লিপস্টিক

……………

আমি এক গো-পন্ডিতের মতোই বুরবাক।

ছেলেরা চুল কাটে

মেয়েরা চুল রাখে, কেন?

ছেলেরা ধুতি পরে

মেয়েরা শাড়ি পরে, কেন?

ছেলেরা দেড় মিটারের জামা পরে।

মেয়েরা কোয়ার্টার মিটারের

জামা পরে কেন?

রহস্য বুঝিনি।

___________

এইসব ব্রতকথা

……………………

এতদিন আমি তাই ছিন্ন কন্থা সোহাগে ভরেছি

দুধেল ওয়ারে যেন, ভারতীয় রিঠে দিয়ে কাচা।

কে বানিয়েছিল, বুনেছিলো ঘুঘুসই চিত্র দিয়ে?

দেবযানী? শাড়ির সবুজ সুতো লাল সুতো নীল

উঠিয়ে উঠিয়ে? ধৈর্যের পুরাণ থেকে নাদব্রহ্ম

শুনে শুনঅ? ছুঁচ তার কতবার ফুটে গেছে, ব্যথা,

আঙুলের অগ্রভাগে রক্তবিন্দু চুষে নিয়ে শে্ষে

হেসেছিলো মৃদু জ্যোৎস্না, তালপাতা শুয়েছিলো পায়ে।

এইসব ব্রতকথা শতাব্দীর শুরু হ’তে শেষ।

এখন? চন্দনা নদীটির কাছে কোনো ঘর একা

দাঁড়িয়ে থাকেনা দেখি, কদলীবৃক্ষের মাথা, ভ্রাতঃ

দোলেনা বাতাসনির্ভর, বলেনা চন্দনা নদীটি

কবে বুঁজে গেছে, মেঠো ঘেরি সরে গেছে, মেছুয়ারা

ভাটিয়ালি ভুলে গেছে, সুজন নাইয়া আজ কই?

____________

ক্যাপ্টেনের নাম কেন্ রবিনসন

………………………………………

বাংলা বলতে জানেন হিন্দিও

চোস্ত উর্দুতে কথা বললে বোঝাই যায় না

অ্যাংলো ইন্ডিয়ান

ক্র্যাক পাইলট বলে তাঁর নাম আছে

এয়ার পকেট পেলেও

বাম্প করে না তাঁর কাইট—

ডি.সি. ফোর হান্ড্রেড ফোর

শুক্কুরবারের ফ্লাইটে তাঁর কায়রো যাবার কথা

মাঝখানে কুয়ায়েত

নাবতে হবে

কাইটে পেট্রোল ভরা হয়ে গেছে

থাউজেন্ডস্

অ্যান্ড থাউজেন্ডস্ অব লিটারস্

হান্ড্রেড অকটিন

এখন এখন শুধু

ফ্লাইং কনট্রোল থেকে সিগন্যাল স্রেফ বাকি

রেডি থামস্ আপ

একটা টিহি-টিহুউউ শব্দ করে জেট

ডি.সি. ফোর হান্ড্রেড ফোর উড়ে গেল

তিরিশ নম্বর সীটে তিরিকলাল বললেন

আপেলের রস

তেত্রিশ নম্বর সীটে বাচ্চা ছেলেটা

বমি করল

এয়ার হোস্টেস মিস স্যানিয়াল

অদ্ভুত তৎপরতায়

বমি আর আপেলের রস

সামাল দিয়ে উঠল

ককপিটে তখন কেন রবিনসন

কো-পাইলটকে বললেন

হোলড্ দ্য জয়স্টিক

ড্রাইভ স্ট্রেট অ্যাহেড

তারপর

আরব সাগরের সবটুকু ব্লু ক’রে

স্কাইকে স্কাই ক’রে ফরেনসিক

ইন্টারকমে বললেন, মিস স্যানিয়াল

সী মি অ্যাট ওয়ানস্

বমি আর আপেলের রস

ব মি আ র আ পে লে র র স

মিস স্যানিয়াল ইন্টারকমেই উত্তর দিলেন

স্যর, আয়াম অফুলি বিজি, অফুলি……….

তিন মিনিটে তিন ক্যান

ফরাসী শ্যাম্পেন গলায় ঢেলে

কেন্ রবিনসন

গকগক্ করে দরজা খুললেন

গকগক করে লাফিয়ে পড়লেন

উইদাউটা প্যারাশুট

ডি.সি. ফোর হান্ড্রেড ফোর উড়ে গেল

নিচে নীল সমুদ্র

সবুজ আয়নার মতো ছড়িয়ে আছে

দিগদিগন্ত

কেন্ নাবতে লাগলেন

একটা শকুন এসে বলল

হাই, মে আই ইট ইনটু ইউ

কেনের টিউনিক উড়ে গেল

একটা চিল এসে বলল

লুক্ দিসিজ হাউ উই সুপ

কেনের ট্রাউজার্স খুলে গেল

বাজপাখি যে বাজপাখি

দ্য ডিউফল হক্

সেও বলল

কাম্ অন্, টেক আউট ইয়োর

আন্ডার ভেস্টস, উইল ইউ

কেন্ ন্যাংটো হয়ে গেল

সূর্য তখন ডুবুডুবু ডুবছে

চাঁদ তখন উবুউবু উঠছে

ঠিক তখনি

বিশ হাজার ফিট নিচে সমুদ্রের বুকে

বিশ ফুট জল লাফিয়ে উঠল

বলল, কাম্ ইন চাম, কাম্ ইন

দু-ফিট সমুদ্রের তলে

দুটো সার্ডিন খেলা করছিল

একজন আরেকজনকে চোখ টিপে বলল

দেখেছে

তিন ফিট সমুদ্রের তলে

তিনটে হেরিং তিনশো মালিক তাড়া করছিল

একটু দাঁড়াল

তারপর তার চোখে এইসা ঢুঁ মারল যে

চোখ গলে গেল

পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একটা অক্টোপাস

শুঁড়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল

আ উইন্ডফল

পৃথিবীর মাটি

পৃথিবীর আকাশ জল

টলটল করলেও

সময়ে সময়ে টলোমল

পরদিন খবরের কাগজে বরুল

দ্য পাইলট অব দ্য ডি.সি. ফোর হান্ড্রেড ফোর

ওয়াজ হাইজ্যাকট ইন দ্য মিড এয়ার

আমরা ফ্লাইং সসারের কথা

ভাবতে বসলুম

কেউ জানল না

কেউ জানল না কেউ

শুধু আমিই জানলুম—

দ্য কো-পাইলট

আমিই জানলুম

আ উইন্ডফল

মিস স্যানিয়াল এখন

আঃ আমিই জানলুম

আ উইন্ডফল

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

নিজের সাক্ষাৎকার নিজে নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরীর আত্মসাক্ষাৎকার

( এই সাক্ষাৎকারের ধারণাটি ‘দাহপত্র’ পত্রিকার সম্পাদক কমলকুমার দত্তর । তিনিই প্রস্তাব দেন যে নিজের সঙ্গে নিজে কারোর সাক্ষাৎকার নেবার নজির সম্ভবত বাংলায় নেই । মলয় রায়চৌধুরীকে তিনি প্রস্তাব দেন যে তিনি নিজের সঙ্গে নিজের একটি সাক্ষাৎকার তৈরি করুন যা তাঁর লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে । তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি সাহিত্যিক মহলে অভাবনীয় সাড়া ফেলেছিল ।কারণ এই ধরণের সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম । সে-কারণে ২০০৪ সালের কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় তিনি এটি গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেন । এখানে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হল । )

প্রশ্ন: তুমি তো বহু সাহিত্য পত্রিকায় ইনটারভিউ দিয়েছ । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে দিয়েছ । বহির্বাংলার বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে দিয়েছ। পোস্টমডার্ন সাহিত্যভাবনা সম্পর্কে দিয়েছ । ইংরেজি আর হিন্দি পত্রিকায় দিয়েছ । চাকরি পাবার জন্যে, চাকরিতে পদোন্নতির জন্যে দিয়েছ । তাছাড়া তুমি স্বদেশ সেন, কার্তিক লাহিড়ি, দীপঙ্কর দত্ত আর সুবিমল বসাকের সাক্ষাৎকার নিয়েছ । যখন তুমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর ফয়জাবাদ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ডায়রেক্টর ছিলে, তখন তুমি ক্লার্ক আর অফিসার পদে কর্মী নিয়োগের ইন্টারভিউ নিতে । সাক্ষাৎকার দেবার আর নেবার বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা তোমার হয়েছে । এখন কেউ যদি তোমাকে বলেন যে তুমি নিজের একটা সাক্ষাৎকার নাও, কিংবা তুমি নিজেকে একটা ইন্টারভিউ দাও, তাহলে তোমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? তোমার মনের মধ্যে যা ঘটতে থাকবে, তা তুমি কীভাবে সামাল দেবে ?

উত্তর: বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো, যিনি বা যাঁরা সাক্ষা৭কারগুলো নিয়েছেন, তা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থন যোগাবার জন্যে নেওয়া, বিশেষ করে হাংরি আন্দোলন নিয়ে যে সাক্ষাৎকারগুলো তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা নিয়েছেন, সেগুলো । প্রায় সবই মোটিভেটেদ । সকলেই মোটামুটি একটা হাংরি ইমেজ নির্মাণ বা অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে রচিত আমার লেখাপত্র সম্পর্কে কোনোও বিশ্লেষণভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেননি তাঁরা । অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে আমার বইটই পড়ে নিজেদের প্রস্তুত করেননি । আমার ডিসকোর্সের পরিবর্তে, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা নিজেদের ডিসকোর্সকে জায়গা করে দিতে চেয়েছেন ।ম পোস্টমডার্ন ভাবনা নিয়ে যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি জানার জন্যে, এবং পাঠকদের সঙ্গে বিষয়টির পরিচয় করাবার জন্যে নিয়েছেন । সাকআৎকার কীভাবে নেয়া উচিত, তা স্পষ্ট করে দেবার জন্যেই আমি কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলুম । তবে, বহুল-প্রচারিতদের সাক্ষাৎকার আমি নিইনি, কেননা তাঁরা মিথ্যায় গড়া সাবজেক্ট-পজিশানের কারবার করেন । গ্রামীণ ব্যাঙ্ক দুটোর কর্মী নিয়োগের জন্যে ইন্টারভিউ নেবার জন্যে আমায় নিজেকে পড়াশুনা করে যোগ্য করে তুলতে হয়েছিল । এখন তুমি যেই বললে নিজেই নিজের সাক্ষাৎকার নেবার কথা, আমার মনে হল, ব্যাপারটা অ্যাবসার্ড, কেননা যে নিচ্ছে তার এবং যে দিচ্ছে তার, এই স্হিতিটা তো দুটি সাবজেক্ট পোজিশানের বাইনারি অপোজিট নয় । একাধিক সাবজেক্ট পোজিশান রয়েছে, এবং প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে, যে-অবস্হায় এক্সটেমপোর জিনিস বেরোতে পারে বলে মনে হয় না । ব্যাপারটা আমার কাছে ওই সাবজেক্ট পোজিশানগুলোর ওপনিং আপ প্রক্রয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সমস্যা হল যে, এই ওপনিং আপ তো বিশাল, তাকে তো কিছুক্ষণ বা কয়েকদিনের চিন্তা পরিসরে ছকে ফেলা যাবে না । তার ওপর, যাকে দ্বিপাক্ষিক ডিসকোর্স হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তার মধ্যে দুটি পক্ষই এমনভাবে গড়ে উঠতে পরে যে, সাক্ষাৎকারের বদলে তা হয়ে দাঁড়াবে আত্ম-বিশ্লেষণ । ফলে সাক্ষাৎকারের genreটাকে subvert করে ফেলা হবে । তার মানে, একটা formless সাহিত্য-সংরূপ চাগিয়ে উঠবে, যাকে define করা কঠিন । বিজ্ঞানী মণি ভৌমিক যাকে বলেছেন বুদ্ধিমত্তার manifest শেষাবধি সেরকম একটা আদল-আদরা পাবে ।Syncretism দিয়ে সামাল দিতে হবে, যে প্রক্রিয়ায় জীবনের সবকিছু সামাল দিচ্ছি ।

প্রশ্ন: মাঝে-মাঝে অফিসের কাজে তুমি মুম্বাই থেকে পশ্চিমবাংলায় আসতে । পঁয়ত্রিশ বছর পরে পাকাপাকি কলকাতায় থাকতে এসে তোমার মনখারাপ হয়ে গেল কেন? তোমার আত্মীয় পরিজন, সাবর্ণ চৌধুরী ক্ল্যান, বন্ধুবান্ধব, সবায়ের সঙ্গে আবার দাখাসাক্ষাৎ হল, পাণিহাটি-কোন্নোগর-উত্তরপাড়ার কৈশোরের সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে দেখা হল, তা সত্বেও তোমার মন কেন পীড়িত বোধ করতে লাগল ? মনে হল যে তোমার মস্তিষ্কের মধ্যে আবাল্য লালিত দেশের বাড়িতে তুমি ফেরোনি ?যেখানে ফিরেছ, তা অন্য ভূখণ্ড ? যাদের মাঝে ফিরেছ, তারা সম্পূর্ণ অন্য লোক ? যা লাগবে বলবেন কাব্যগ্রন্হে তুমি এই মননস্হিতি আর্টিকুলেট করলে, কিন্তু বুঝতে পারলে যে, যাদের পক্ষে ওই পাঠকৃতি প্রবেশযোগ্য ছিল, সেই আদি ভূমিজ পশ্চিমবঙ্গবাসী নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে ? এই পীড়া তো নিরাময়ের অতীত ! কী করবে তুমি?

উত্তর: আমার এই দেশাত্মবোধ এতই বিমূর্ত আর জটিল যে, অনেক সময়ে আমার মনে হয়, আমার পীড়া আমারই সৃষ্ট । এ-জিনিসটা দেখনসই বাঙালিয়ানা নয় । কিংবা এমনটাও নয় যা আমার আত্মীয়-জ্ঞাতিরা বলে থাকেন, যে, রিফিউজিরা এসে আমাদের পশ্চিমবাংলাকে ধ্বংস করে দিলে । বস্তুত অন্য শব্দ না পেয়ে আমি দেশাত্মবোধ শব্দটা প্রয়োগ করছি । পাকাপাকি ফিরে আসার পর, মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে মুম্বাইতে বা মেয়ের কাছে আহমেদাবাদে যাই, আমি বুঝতে পারি, আমি এই পীড়া নিজের সঙ্গে নিয়ে বেড়াই । জলাঞ্জলি উপন্যাসের শেষার্ধে এবং নামগন্ধ উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু বোধটা এমনই অ্যাবসট্র্যাক্ট যে অনায়ত্ত রয়ে গেল । ব্যাপারটা পারক্য, এলিয়েনেশন, একাকীত্ব, মন ভালো নেই ধাঁচের নয় । অ্যানুই নয় । একে শেয়ারও করা যায় না । আমার মনে হয় মুম্বাই থেকে মাঝে-মধ্যে পশ্চিমবাংলায় অফিসের কাজে আসার সময়ে আমি এই পীঢ়া-বোধটা পিক আপ করেছি । বাঙালির সঙ্গে বাঙালি মন খুলে কথা বলে না টের পাবার পর আমি এম আর চোওধারি হয়ে হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলতুম । মুর্শিদাবাদ-মালদা জেলায় উর্দুভাষী মুসলমানের মতন কথা বলেছি । দাড়ি রাখার সূত্রপাত এই ক্যামোফ্লেজের প্রয়োজন মেটাতে । সাহিত্যিকদের সঙ্গে পারতপক্ষে মেলামেশা করতুম না । কেউ আমায় চিনত না বলে অসুবিধা হয়নি । এলডিবির ম্যানেজিং ডায়রেক্টর প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ আমার পাশে বসে সরকারি মিটিঙেও জানতে পারেননি । আর কোনও কবি বা লেখক এই পীড়ায় আক্রান্ত কি না জানি না । এ কোনোও অসুখ নয় । একজনকে গভীর ভালোবাসতুম, অথচ এখন দেখে আর তার সঙ্গে বাস করে, বুঝতে পারছি না সে-ই কি না, অথচ তার কাছেই তো এসেছি । বাইরে না গিয়ে টানা এখানে থেকে গেলে এরকমটা হতো না হয়তো । যাঁরা সেই তখন থেকে পশ্চিমবাংলার সাথাসাথা মেটামরফোজড হয়েছেন, বা মেটামরফোসিস প্রক্রিয়াটিতে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের এই পীড়ার বোধটা জন্মায়নি । না লেখকদের, না আলোচকদের । আমার তাই সন্দেহ থেকে যায় যে আমার পাঠকৃতি আর পাঠক-আলোচকদের মাঝে ওই পীড়া একটা অনচ্ছ দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তো ? কেননা, এমনিতেই আমার পাঠকৃতির আগেই আমার ইমেজ—কালীকৃষ্ণ গুহের কাছে একরকম, অনিকেত পাত্রের কাছে একরকম, আবার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে আরেকরকম—পাঠকের কাছে পৌঁছে ভ্যারিয়েবল ইন্টারপ্রিটেশনের সম্ভাবনা গড়ে ফ্যালে, যা আসলে পাঠকের নিজের চাহিদা মেটাবার জন্যে । পাঠকৃতির উদ্দেশে নয় । সম্ভবত গ্রহণ-বর্জনের বৈভিন্ন্যের নিরন্তর টানাপোড়েনে পাঠকৃতি-বিশেষ তার নিজের পরিসর অহরহ গড়ে নিতে থাকে । তার কিনারায় গালে হাত রেখে বসে থাকা ছাড়া আমের কিছু করার নেই ।

প্রশ্ন: তুমি তোমার কবিতা অনুশীলনে ফর্ম, কনটেন্ট, মিঊজিকালিটি এসব নিয়ে প্রথম থেকেই ভেবেছ কী? এগুলো আলাদা-আলাদা ভেবেছ কী ? নাকি একটা কবিতাকে এককসমগ্র উৎসার ভেবে ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠতে দিয়েছ? প্রশ্নটা এই জন্যে করতে হল যে একটা একঘেয়ে আদল না থাকলে সেই কবির কাজগুলোর একঘেয়েমির ছাপ পাঠকের মগজে বসতে পারে না বলে পাঠক তোমার কাব্যজগত সম্পর্কে পাকাপাকি ধারণা তৈরি করার বদলে কনফিউজড হয়ে যান । রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, নজরুল, বিষ্ণু দে, সমর সেন, আলোক সরকার, যাঁর কবিতার দিকে তাকাও, দেখবে যে তাঁরা অনুশীলনের মাধ্যমে নিজস্ব একঘেয়েমি গড়ে তুলেছেন যার ছাঁচে তাঁদের যে কোনোও কাব্যিক ডিসকোর্স ঢালাই করে দিয়েছেন । অথচ তোমার প্রথম কাব্যগ্রন্হ শয়তানের মুখ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্হ জখম একেবারে আলাদা । তারপর প্রকাশিত হল মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর যার সঙ্গে সামান্যতম মিল নেই জখম কাব্যগ্রন্হের । এরপর বেরোল হাততালি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর বইটার কবিতাগুলো থেকে । তোমার সাম্প্রতিক কৌণপের লুচিমাংস পর্যন্ত এই ব্যাপারটা লক্ষ করা গেছে । সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা দখলের জন্যে প্রধান ব্যাপার হল একঘেয়েমি, যাকে ইউরোপে বলা হয়েছে কবির মৌলিক শৈলী । সর্বজনস্বীকৃত সেই পথ অগ্রাহ্য করে তুমি ভুল করে যাচ্ছ না কি ?

উত্তর: ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে আমাদের সংস্কৃত শিক্ষক বলেছিলেন, “আরে ইংরেজদের বুকে অত দম আছে নাকি যে বেদ-উপনিষদের মতন শ্লোক লিখবে বা গীতা মতন কাব্য লিখবে ? শিতের দেশের লোক, চান-টান করে না, একটুতেই দম ফুরিয়ে যায় বলে অমন কবিতা লেখে, যেন ছুটতে ছুটতে দম নিচ্ছে ।” কালিদাসের আড়াল নিয়ে তুমুল আক্রমণ করতেন টেনিসন, কীটস, শেলি প্রমুখকে । তখন অত না বুঝলেও, ব্যাপারটা আমার মাথায় থেকে গিয়েছিল । যখন কবিতা লেখা আরম্ভ করলুম, গোগ্রাস বইপোকা ছিলুম বলে, য়েশ পড়াশোনা করে ফেলতে পেরেছিলুম যাতে পয়ার ফাটিয়ে বেরোতে পারি । আমার মনে হয়, কবিতায় একঘেয়েমি বজায় রাখার জণভে একটা টিপিকাল বাল্যকালীন আত্মপরিচিতির সঙ্গীতজগত দরকার হয়, যা অগ্রজ বাঠালি কবিদের মতন আমার ছিল না । দাদারও ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি, জানোয়ার এবং আমার ভিয়েতনাম কাব্যগ্রন্হ তিনটের মধ্যে একঘেয়েমির মিল নেই, যা দাদার বন্ধু দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপধ্যায় প্রমুখের কবিতায় আছে । বিহারিপাড়ার অন্ত্যজ লোকসঙ্গীত, শিয়া মুসলমানদের গজল, নাথ, কাওয়ালি, মিশনারি স্কুলে চার্চ কয়্যার, রামমোহন রায় সেমিনারিতে ব্রাহ্মসংগীত, বাবার দোকানের কর্মী ডাবরের রহিম-দাদু-কবীর, বাড়ির কাজের লোক শিউনন্নির রামচরিতমানস, বঢ়জ্যাঠার আঙুরবালা-শু্ভলক্ষ্মী, বড়দি-ছোড়দির খেয়াল-ঠুমরি, জ্যাঠাইমার নানারকম পাঁচালিগান, সতীশকাকার চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে মন্ত্রৌচ্চারণ, এই পলিমরফাস মিউজিকালিটিতে আমার বাল্যকাল কেটেছে । এই অধম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় আমি ব্যাপারটাকে চেহারা দেবার চেষ্টা করেছি । একটা পলিসোনিক পরিমণ্ডলে বড় হওয়ায় এক কাব্যগ্রন্হ থেকে পরের গ্রন্হে পরিবর্তনটা মনে হয়েছে অপরিহার্য । তা নইলে একটা নতুন বই বের করার দরকারটাই বা কী? পাঠক নামক একজন অপরকে সামনে দাঁড় করিয়ে, নিজের কাব্য টেক্সটের দশহাজার কিলোর একঘেয়ে হাতুড়ি ঠুকে যাচ্ছি বছরের পর বছর, ওটা আমার ভাষা-প্রযুক্তির অন্তর্গত ছিল না কখনও । কবিতা পড়তে শুরু করে বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখের ভাষা-স্ট্রাকচারকে মনে হয়েছিল আউট অ্যান্ড আউট বুর্জোয়া । ভিরমি খেয়েছিলুম দাদার কাছে শুনে যে ওনারা মার্কসবাদী । তারপর তো নকশাল কবিদের দেখলুম যারা কবিতা লিখেছেন কুলাক-বাড়ির ভাষায় । আসলে সবাই ভেবেছেন কী বলছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । তাই যদি হবে, তো কবিতা লেখা কেন? অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্র্যভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব প্রমুখ বাঙালিরা তো ওসব বলে গেছেন বহুকাল আগে । বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন, “ও ওইসব কালচার-ফালচার নিয়ে থাকে ।” কথাটা আমায় স্ট্রাইক করেছিল । বঙ্গসংস্কৃতির দুটো বর্গ আছে । রবীন্দ্রনাথ থেকে শঙ্খ ঘোষ হয়ে হাল আমলের বহু কবি হলেন কালচারের মানুষ, যাঁদের কবিতায় একঘেয়েমিটা কালচার দ্বারা নির্মিত । আমি আর আমার মতন কেউ-কেউ হলেন ফালচার বর্গের মানুষ, যাঁরা একঘেয়েমি না কাটাতে পারলে পাগল হয়ে যাবেন । ফালচার বলতে আমি ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্পেসটার কথা কেবল বলছি না । আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন ব্রাহ্ম বলে । পিরিলি বাউনদের বজরা উত্তরপাড়ার গঙ্গায় ভাসলে স্নান অর্ধসমাপ্ত রেখে ঠাকুমার পাল্কি ফিরে আসত । সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ ছিল কেননা তা লোচ্চাদের তামাসবিনি । অথচ পাশাপাশি মিশনারি স্কুল আর ব্রাহ্ম স্কুলও ঘটেছে । এই ইরর‌শানালিটি দিয়ে ডিফাইন করতে হবে ফালচার ব্যাপারটাকে । নিজেরা ফালচার বর্গের হয়েও আমি আর দাদা যে লেখালিখি আরম্ভ করলুম, তার কারণ অবশ্য মামার বাড়ির উচ্চমধ্যবিত্ত কালচার । ফালচারজগৎ এবং কালচারজগতের মাঝে যোগসূত্র ছিলেন শৈশবে পিতৃহীন আমার মা । আমি তো আর কোনো কবি-লেখকের কথা জানিনা, যাঁর সাবজেক্ট পোজিশানগুলো এরকম স্পেস আর টাইমে গড়ে উঠেছে । কালচার এমনই এক বাঙালিয়ানা যে-পরিসরে কখনও তুর্কি, কখনও ইরানি, কখনও ব্রিটিশ, কখনও সোভিয়েত, কখনও মারোয়াড়ি তাপের আঁচ কাজ করে গেছে বলে তা বেশ সুশৃঙ্খল । ফালচার জায়গাটার লোকটা বাঙালি বলে তার বিশৃঙ্খলা দিয়ে বাঙালিয়ানা সংজ্ঞায়িত; কোনোও সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় সীমানা নেই । আমার ফিকশানে বহু চরিত্রের নির্গুণ বৈশিষ্ট্য এই সীমাহীনতার বোধ থেকে এসেছে । আমাদের উত্তরপাড়ার বাড়িটা শুনেছিলুম কোনও তুর্কি স্হপতির নকশা অনুযায়ী তৈরি, ইজিয়ান সমুদ্রের পূর্বপাড়ের ভিলাগুলোর আদলে; তিনশ বছর আগে বাড়ির সামনে দিয়ে গঙ্গা বইত । বাড়িটায় পঞ্চমুণ্ডের আসন ছিল; আর সেই জায়গাটায় বসে ছোটোবেলায় বেশ ফালচারি ফিল নেয়া যেত । সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রমুখের সাইকিতে এরকম প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা সম্ভব কি? এই সাবভারসিভ ফালচার? নেই, সম্ভব নয় । তাঁরা সমন্বিত চেতনার ইউনিফায়েড সেল্ফের বাইরে বেরোতে অপারগ । তান্ত্রিক নকশা-আঁকা লাল সিমেন্টের চারকোণা জায়গায় স্রেফ কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থেকে যে নানা সাবজেক্ট পোজিশান স্পষ্ট হয়, ভয়ের, অতীতের, শবের, ধর্মের, নেশার, তন্ত্র নামক অনচ্ছ ধারণার, যৌনতার, এবং এ-ধরণের পাঁচমেশালি ফালচারি পরিচিতি, তা থেকেই তো জেনে গিয়েছিলুম যে শৈলীর একঘেয়েমি চলবে না । একটা বইয়ের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা পুরোনো হয়ে গেলে পরের বইতে যেন বোঝা যায় যে দুটি কাব্যগ্রন্হের মাঝে এক বা একাধিক সাইকো-লিংগুইস্টিক রাপচার্স ঘটে গেছে । আমার সাইকো-লিংগুইস্টিক স্পেসটাও মাইগ্রান্ট, কিন্তু সে মাইগ্রান্সি দেশভাগোত্তর রিফিউজি পরিবারের কবি-লেখকদের থেকে ভিন্ন, কেননা আমার মধ্যে রিরুটিঙের উদ্বেগ ছিল না, নেই । আমার মাইগ্রান্সি বজায় আছে । রিরুটিং পাকা হতেই রিফিউজি পরিবারের কবির মাইগ্রান্সি হাপিস, এবং তাঁরা একঘেয়েমির খপ্পরে । মনে হয় যে একঘেয়েমির ছকে পড়ে গেলে আমার কবিতা লেখা ফুরিয়ে যাবে । কবিতা লেখা বেশ কমে এসেছে । পত্রিকাগুলো চায়, কিন্তু ছকের মধ্যে থেকে যাচ্ছে বলে বাতিল করে দিতে হচ্ছে । একইরকম কবিতা অনেকে হুহু করে দিনের পর দিন কীভাবে লিখে যান, কে জানে! অধিকাংশ বিদ্যায়তনিক আলোচক এখনও ইউরোপে উনিশ শতকে শেখানো লেখককেন্দ্রিক আলোচনাপদ্ধতিতে আটক, আর কেবল সময় সময় সময় সময় বকে যান । আলোচনা যে পাঠবস্তুকেন্দ্রিক হওয়া উচিত, স্পেস স্পেস স্পেসের ভাবনা ভাবা দরকার, তা এখনও খেয়াল করে উঠতে পারেননি আলোচকরা । এখনও তাঁরা ইউরোপীয় অধিবিদ্যার মননবিশ্বের কারাগারে নিজেরা নিজেদের পায়ে বেড়ি হাতে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছেন ।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতা , এই দুটি ধারায় তুমি গ্রেপ্তার হয়েছিলে । তোমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেপ্টেম্বর ১৯৬৪তে । তোমাকে চার্জশিট দেয়া হল আর তোমার বিরুদ্ধে মকদ্দমা আরম্ভ হল মে ১৯৬৫তে । এই নয় মাস কলকাতার মিডিয়া আর কফিহাউস-বুদ্ধিজীবিরা অবিরাম প্রচার চালিয়েছিলেন যে তোমার বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা পোরনোপুস্তক লেখার অভিযোগ উঠেছে । তুমি যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সে খবর মিডিয়া বেমালুম চেপে গিয়েছিল ওই নয় মাস । বিদ্ধদেব বসু এবং সমরেশ বসুর বিরুদ্ধে যে মকদ্দমা হয়েছিল, ওনাদের বিরুদ্ধে কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল না । তোমার বিরুদ্ধে সিরিয়াস অভিযোগ ছিল বলে তোমাকে আর তোমার দাদাকে জেরা করেছিল একটা ইনভেস্টিগেটিং বোর্ড যাতে সদস্য ছিলেন পুলিস, সেনা, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপতরের উচ্চপদস্হ আধিকারিকরা । মামলা রুজু হতে তুমি দেখলে যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নেয়া হয়েছে, এবং চার্জশিট দেওয়া হয়েছে অশ্লীল কবিতা লেখার ধারায় । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নায়া হয়েছে দেখে তোমার মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল কেন? এ-রাষ্ট্র তো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সরকার নয় যে তুমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা করে গর্ববোধ করবে ? তোমার নিজেরই স্বদেশী উত্তরঔপনিবেশিক সরকার ! তোমার তো ভারমুক্ত বোধ করা উচিত ছিল । পরিবর্তে তুমি বিষণ্ণ হলে ?

উত্তর: স্বাধীনতা লাভের পর একজন কবির বিরুদ্ধে প্রথম রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলা হল । সারা ভারতবর্ষে প্রথম । কেবল কবিতা বা গল্প নিয়ে নয়, আমি রাজনীতি আর ধর্ম নিয়েও ম্যানিফেস্টো বের করেছিলুম, যা কোনও বাঙালি কবি তার আগে করেননি । ফলে রাষ্ট্রের টনক নড়ে গেল । রাষ্ট্র তো একটা অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম, যেটা চালায় একদল লোক । সেই লোকগুলো, যারা যখন মসনদে বসে, নিজেদের রাষ্ট্র বলে মনে করে । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলতে প্রখৃত পক্ষে বোঝায় মসনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র । যারা মসনদে বসে, তারা সবসময়ে পায়া টলে যাবার আতঙ্কে ভোগে । মসনদ বিরোধিতাই হল এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতা । আমি তো স্বঘোষিত এসটাবলিশমেন্ট বিরোধী । অভিযোগটা ছিল তার স্বীকৃতি । তাই মন খারাপ লেগেছিল । আসলে আঘাতটা যাঁদের দিয়েছিলুম, সেই সব মন্ত্রী, প্রশাসনিক আমলা আর পুলিসের কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, অভোযোগের প্রমাণ যখন আদালতে পেশ হবে, তখন সাধারণ মানুষ তাঁদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে । মসনদের কেদারায় আসীন লোকগুলোর মগজে আমি অস্হিরতার বোধ চালান করে দিয়েছিলুম, তাঁদের আত্ম্ভরী ক্ষমতায় ঘা মেরে, মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রী, মুখ্য ও অন্যান্য সচিব, জেলাশাসক, পুলিশের কমিশনার ও আই জি, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও বুদ্ধিজীবীদের কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে, রাক্ষস-অসুর-জানোয়ার-জোকার-মিকিমাউসের মুখোশ পাঠিয়ে, যার ওপর ছাপিয়েছিলুম একটি বার্তা: দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন । প্রশাসনের ক্রুদ্ধ নি-জার্ক প্রতিক্রিয়ার কথা পুলিশ কমিশনার নিজে আমাকে আর দাদাকে বলেছিলেন । এখন তো বিরোধীপক্ষের লোকেরা প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে বলছে মুখৌটা বা মুখৌশধারী, বলছে মুখোশ খুলে ফেলুন । অনেকে তখন হ্যা হ্যা হি হি করেছিলেন, কেননা তাঁরা টের পাননি যে এসটাবলিশমেন্টের দাঁতকে শক্ত আর নখকে তারাল করে রেখে গেছে ইংরেজরা । তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন যখন নকশালর আন্দোলনে অংশ নেয়ায় অত্যাচারিত হলেন ও গুমখুন হলেন কবি ও লেখকরা । আরও বেশি করে টের পেলেন এমার্জেন্সির সময়ে যখন পচা আলুর চটের বস্তার মতন জেলের ভেতর নিক্ষিপ্ত হলেন লেখক ও সাংবাদিকরা, আর অশিক্ষিত লোকেদের দ্বারা প্রকাশিতব্য পাঠবস্তু অনুমোদন করাতে হল, কারা গারে দাগি আসামির মতন দাড়ি বাড়াতে হল গৌরকিশোর ঘোষকে, পালাতে গিয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলেন জ্যোতির্ময় দত্ত।মুখোশধারী অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম যে একই আছে, তা অভিজিৎ সিংহের আত্মহত্যায় আবার প্রমাণিত হল চল্লিশ বছর পর । তাত্বিক বিপ্লব আজকের দিনে বুদ্ধিবৃত্তির ভাঁোতামাত্র জেনেও, অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেমের নি-জার্ক প্রতিক্রিয়া যে একই আছে, তা টের পাওয়া যায় মসনদের আতঙ্কবোধ থেকে, যখন তা কচি কচি ছেলেমেয়েদের এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতাকে ভয় পেয়ে মাঝরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে নখদন্ত দেখায় । পচনের এই প্রক্রিয়াকে আমি কিছিটা ধরার চেষ্টা করেছি নখদন্ত সাতকাহনে । বাঙালদের যে নেতারা ১৯৫০ সালে সংবিধান পুড়িয়েছিল, আজ তাদের কুর্সি নড়বড় করছে মনে হলেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ধুয়ো তোলে । নবদ্বীপের গাণ্ডীব পত্রিকায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কনসেপ্টটাকে রিডিকিউল করে টুসকি অবিনির্মাণ শিরোনাঞে একটা পোস্টমডার্ন ছোটগল্প লিখেছি ।

প্রশ্ন: তোমার প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতার বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনের সময়ে অশ্লীলতার আরোপে মামলা হয়েছিল । সাহিত্যে অশ্লীলতা তখন নেতিবাচক ছিল । তোমার লেখালিখিতে অত্যধিক যৌনতা থাকার অভিযোগও উঠেছে । তোমার লেখালিখির জন্যেই তো হাংরি আন্দোলনকে অনেকে বলতেন যৌন ক্ষুধার আন্দোলন । তোমার নান্দনিক অবস্হান আর নৈতিকতা নিয়ে এরকম নেতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও তুমি মনে-মনে আনন্দ পেয়েছ । সমাজকর্তারা, সাহিত্যবেত্তারা, তোমার পাঠকৃতিকে অশ্লীল বললেন, যৌনতার বাড়াবাড়ি বললেন, ইমমরাল বললেন, অথচ গোপনে-গোপনে সে-কারণে তুমি গর্ববোধ করলে ! এটা পারভার্সান ছাড়া কী?

উত্তর: ব্রাহ্ম স্কুলে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল পাঠ্য ছিল । বাংলার শিক্ষক অধিকারীবাবু একদিন সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে জানিয়েছিলেন, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর-এর কোন অংশগুলোকে বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ, জেমস লঙ প্রমুখ অশ্লীল ঘোষণা করেছেন । উনি ভারতচন্দ্রকে ডিফেন্ড করে ব্রাহ্ম এলিটিজমকে আক্রমণ করেন, যা প্রধানশিক্ষকের কানে পৌঁছোলে অধিকারীবাবুকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল । আমি ভারতচন্দ্রের পক্ষে চলে গিয়েছিলুম অন্নদামঙ্গল-এর তৃতীয় অংশ মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান পড়ার সময়ে, কেননা আমার পূর্বজ লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী ছিলেন প্রতাপাদিত্যের প্রধান অমাত্য । আমার লেখায় যৌনতা আরোপিত নয় । কিন্তু অশ্লীলতা-যৌনতার অভিযোগে আমি ভারতচন্দ্রের ডিসকোর্সের পরিসরটা, যা এখন বুঝতে পারি প্রাগাধুনিক-প্রাকঔপনিবেশিক বলে, রিগেইন করে নিতে পেরেছিলুম । ভারতচন্দ্র-এর রচনায় যৌনতাকে আক্রমণের সূচনা করেছিল ব্রিটিশ অধ্যাপকরা । আর সাবর্ণ চৌধুরীরা গরিব হয়ে গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সাম্রাজ্যবাদী ধাক্কায়, যখন ওরা কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর নিয়ে নিল । আমার মধ্যে, অভিযোগগুলো শুনে, বদলা নেবার গোপন গর্ববোধ চাগিয়েছিল । পার্ভারসান যে মনে হয় না, তারও কারণ আছে । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কিপার অব পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার ছিলেন । পরীক্ষা-পরবর্তী স্কুলছুটিতে ওনার সাইকেলের কেরিয়ারে বসে প্রায়ই পাটনা মিউজিয়ামে যেতুম। স্কাল্পচার বিভাগে নানা ঢঙের নগ্ন-ন্গিকা অবাধে দেখে বেড়াতুম । দেখতুম যে পুরুষরা খাঁজকাটা যোনি বা স্তনের বোঁটায় টুক করে হাত দিয়ে নিচ্ছে বা ঠোঁট ঠেকাচ্ছে । মেয়েরা একই ব্যাপার করছে গ্রিক পুরুষের লিঙ্গ নিয়ে । হাত ঠেকিয়ে, চুমু খেয়ে সেসব অংশগুলোকে একেবারে চকচকে করেদিয়েছিল দর্শনার্থীরা । এখন মিউজিয়ামে নানা নিষেরধ হয়েছে যা তখন ছিল না । আমি প্রতাপাদিত্যের চেয়ে প্রাচীন সময়ে চলে যেতুম, যখন মেগাসথিনিস কয়েক হাজার গ্রিক তরুণী এনে পাটনায় তখনকার ক্ষমতাসীনদের বিলিয়েছিলেন, কিংবা যখন গ্রিক সম্রাট মিনান্ডার পাটনা শহরে আগুন ধরিয়ে লন্ডভন্ড করার পর অনুতপ্ত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । অতীতের সঙ্গে আমার যা যোগসূত্র, আমি জানতুম, জানি, অভোযোগকারীদের সেরকম যোগসূত্র নেই । আমার কাছে তারা সদ্যভূমিষ্ঠ । মিউজিয়ামে বড়জ্যাঠার অফিসঘরে একাধিক নিউড পেইনটিং ছিল, যার একটা আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর আঁকা । ঠাকুর্দা ছবি আঁকা আর ফোটো তোলা শিখেছিলেন লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটর জন লকউড কিপলিঙের কাছে । ইনি সম্ভবত রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা, যাঁর সুপারিশে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতা মিউজিয়ামে সহকারী কিউরেটর হয়েছিলেন । ঠাকুর্দার আঙকা নিউডটা সম্পর্কে বড়জ্যাঠার গর্ববোধ ছিল । প্রত্যেক সদ্য-পরিচিতকে বলতেন ছবিটা ওনার বাবার আঙকা । ফলে আমার একটা ঐতিহাসিক সাপোর্ট সিস্টেম রয়েছে । হাংরি মকদ্দমার সময়ে বড়জ্যাঠা-বাবা-কাকারা আমায় টোটাল সাপোর্ট দিয়েছিলেন । বাবা তো পাটনা থেকে আদালতে এসেওছিলেন হিয়ারিঙের সময়ে বারকয়েক । আহিরিটোলা থেকে পিসেমশায়ও আসতেন ।

প্রশ্ন: তুমি তো রান্নাবান্না কর । সাধারণ বাঙালি রান্না রাঁধতে জান । অধিকাংশ কবি-লেখক যখন রান্না করা, বাসন মাজা, ঝুল ঝাড়া ইত্যাদি কাজকে অবমাননাকর মনে করেন, তখন তুমি রান্না-বান্নার কথা খোলাখুলি বলো কোন সাহসে? তাও আবার সংবাদপত্রের শৌখিন রান্না নয়, রোজকার রান্না । বিশুদ্ধ শিল্প, উত্তরণ, নান্দনিক বোধ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে রান্নাবাড়ি ব্যাপারটা কি স্ববিরোধী নয় ? একদিন তুমি যখন ফ্যান গালছিলে, তখন মাঝি পত্রিকার সম্পাদক টেলিফোনে সেকথা শুনে স্তম্ভিত হয়েছিলেন, বিশ্বাস করতে পারেননি । নখদন্ত সাতকাহনের প্রতি পৃষ্ঠায় তোমার রান্নার রেফারেন্স আছে । ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস উপন্যাসে বিসদৃশ মেনু আছে । জলাঞ্জলি উপন্যাসে সেক্সুয়াল অ্যাক্ট বর্ণনা করেছ রান্না প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আর তদ্বারা আক্রমণ করেছ সংবাদপত্রের শ্রখিন রন্ধনকর্মকে । নামগন্ধ উপন্যাসে রান্নাবান্নায় লুকিয়ে থাকা শ্রেণি বিভাজন অন্তত দুবার তুমি স্পষ্ট করেছ । তোমার কবিতাতেও রান্না বা কুইজিনের প্রসঙ্গ থাকে । তোমার আলোচকরা কেউই এই ব্যাপারটা ধরতে পারেননি দেখে তোমার অবাক লাগেনি? রান্না করতে শিখলে কোথায় ?

উত্তর: ইমলিতলায় হিন্দু-মুসলমান সবায়ের হেঁসেলে ঢোকার অবাধ অধিকার ছিল । রান্নাবাড়ির সাংস্কৃতিক পাথফক্যের ব্যাপারটা মগজে স্হান করে নিতে পেরেছিল । কুড়িজনের পরিবারে রান্নাঘরের ইনচার্জ ছিলেন মা। বাবা আর ছোটকাকা বিশুদ্ধ শাকাহারি ছিলেন । ইমলিতলার বাড়িতে কেবল পাঁঠার মাংস, হাঁসের ডিম, আঁশযুক্ত মাছ অনুমোদিত ছিল । প্রতি রবিবার ও ছুটির দিন বড়জ্যাঠা রাঁধতেন ওনার সাবর্ণ চৌধুরী স্পেশাল, যার তিনটে আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে । বাদাম কিসমিস খোয়াসহ যাবতীয় আনাজ দিয়ে সোনামুগ-আতপচালের মিষ্টি ভুনি খিচুড়ি; ঘিয়ে ভাজা তেতো-বর্জিত আনাজ দুধে সেদ্ধ করে ফোড়ন-তেজপাতার ওপর নারকোল কুরো দেয়া মিষ্টি শুক্তো; এবং বাঁধাকপি-ফুলকপি আলুতে ভেটকিটুকরো গরম মশলা দিয়ে মাখোমাখো তরকারি । ইমপ্রেশানিস্টিক মাইন্ড বলতে যা বোঝায়, তাতে এই পুরো সিনারিওটার ছাপ পড়েছে, যেটা ধরার কিছুটা চেষ্টা করেছি এই অথম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকতে গিয়ে যখন নিষেধ ভাঙার, সীমালঙ্ঘনের, যথেচ্ছাচারের পর্ব শুরু হল, তখন সহপাঠী তরুণ-বারীন-সুবর্ণর সঙ্গে যা ইচ্ছে খাওয়া আর রাঁধার স্বাধীনতা পেয়ে গেলুম । প্রতিবেশি এক মুসলমান চুড়িওয়ালা অনেক পদ রাঁধতে শিখিয়েছিল । আমার স্ত্রী বাড়িতে মারাঠি পদগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে । লখনউতে দেড় বছর তেলেগু আবদুল করিম, পাঞ্জাবি মদন মোহন, কর্ণাটকি শেট্টিখেড়ে প্রভাকরা আর কোংকনিয় কুরকুটে একটা ফ্ল্যাটে ফোর্সড ব্যাচেলর হয়ে নিজেরা পালা করে রাঁধতুম । রান্না ব্যাপারটা যে যৌথজীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ, এবং আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জলবিভাজক, তা পিক আপ করেছি অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তরে । বাঙালি লেখক-শিল্পীরা রান্নাকে ডিসকোর্স হিসেবে নেন না সম্ভবত উনিশ শতকের প্রধান পুরুষদের যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার ফলে। তার ওপর শ্বেতাঙ্গ পিতৃতন্ত্রের যে আদল-আদরা ইংরেজরা আমাদের সাহিত্যে চাপিয়ে গেছে, তাকে ডিকলোনাইজ করার জন্যে আমার মনে হয়েছে রান্নাবান্নার ব্যাপারটা একটা প্রধান হাতিয়ার। দাদা অবশ্য আমার চে্যে ভাল আটপৌরে রান্না জানে, আর বাবার কাছে শাকসব্জি আনাজপাতির আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ শেখার ফলে রান্নাবাড়ির বাঙালিয়ানা ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে। ইমলিতলার রান্নাঘরে কোনবারে আর কোন তিথিতে কী-কী খেতে নেই, তার তালিকা থাকত, আগের বছরের পাঁজির ছেঁড়া পাতা । রান্না ব্যাপারটায় জীবনের সবকিছুই তো আছে ইনক্লুডিং সেক্স । আলোচকদের চোখে পড়েনি তার কারণ তাঁরা কেবল খাবার মধ্যে আটক, তার আগের পর্বের কর্মকান্ডেই যে তাঁদের সমাজটির নিবাস, তা অনুভব করেননি । বুদ্ধিজীবী যদি মাল্টিডিসিপ্লিনারি না হয়, তাহলে সাহিত্যের পুরো এলাকাটা খণ্ডিত করে ফ্যালে ।

প্রশ্ন: পোখরানে আনবিক বোমা ফাটাবার পর অনেক প্রতিবাদ হল, কবিতা লেখালিখি হল, গলা-কাঁপানো বক্তৃতা হল । এবারেই বেশি হল । প্রথমবার যখন ফাটানো হয়েছিল, তখন এতটা চেঁচামেচি হবনি । তুমি কেন আর সবায়ের মতন এর বিরুদ্ধে পদ্য বা গদ্য লিখলে না? ক্যাসেট বের করলে না? প্রথমবারও করোনি । এবারও করোনি। তুমি কি প্রসঙ্গটা থেকে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখছ?

উত্তর: তলিয়ে না দেখে কোনও কিছু ঘতলেই যারা গদ্য-পদ্য-গান-আঁকার মাধ্যমে একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাঁরা ইনটেলেকচুয়াল বাফুন । ভারতের আণবিক বোমা তৈরি নিয়ে আমেরিকান, পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ গবেষক এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লেখা বেশ কিছু বই আছে । প্রতিটিতেই বলা হয়েছেযে, ভারতীয় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের অগোচরে, হোমি ভাবার সময় থেকে, বিজ্ঞানীদের একটা ছোট গোষ্ঠী আণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে নিজেদের জাহির করা । বাজেট বরাদ্দের দাবি ফি-বছর বাড়তে থাকায় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের সন্দেহ হতে তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানায় । কেননা বিভাগটা তাঁর অধীনে । প্রতিরক্ষমন্ত্রী ও সেনা জানত না । ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে তরিৎকর্মা বিজ্ঞানীরা তাঁকে নানা তর্কে রাজি করিয়ে ভূগর্ভে বিস্ফোরণ ঘটাল । বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখে বিজ্ঞানীদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা । সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে পড়ায়, চিন নিউট্রন বোমা তৈরি করে ফেলায়, এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে, বিজেপি দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটায় । মানবিকতার দৃষ্টিতে আণবিক বোমার তুলনায় ঘৃণ্য আবিষ্কার দ্বিতীয়টি নেই । কিন্তু রিয়াল পলিটিক ভিন্ন কথা বলে । বাঙালি রাজনীতিকরা ছেঁদো দলাদলির সময়ে রিয়াল পলিটিক করেন, অথচ বিশ্বের ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে বিমূর্ত মানবতাবাদ ফলান । বুশ-ব্লেয়ার মাস্তানি ফলিয়ে যেভাবে ইরাকে যুদ্ধ করতে ঢুকে পড়ল, সাদ্দাম হুসেন চৌসেস্কুর মতন একজন নৃশংস অত্যাচারী তিলে খচ্চর একনায়ক মেনে নিয়েও বলতে হয়, যে, ইরাকের কাছে আত্মরক্ষার অস্ত্র থাকা প্রয়োজন ছিল । ইউ এন ইন্সপেক্টর-ফেক্টর সব ফালতু । বুশ আর তার কুবের বন্ধুরা ইরাক আক্রমণ আর দখলের ছক বহু আগে করে রেখেছিল, এমনকী কে কী পাবে সেটাও । হয়ত কখনও ইরাক দখল করবে ভেবে ওদের আণবিক পরিকাঠামোটাও বোমা ফেলে বহুকাল আগে ওড়ানো হয়েছিল । ভারত আগে থাকতে মিসাইল প্রযুক্তিতে উন্নতি করে তারপর বোমা ফাটিয়ে অন্তত এটুকু হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখতে পেরেছে যে, তার কিছু হলে অন্তত এক হাত দেখে নেবে । চিন যেমন নিউট্রন বোমা বানিয়ে ফেলেছে, ভারতেরও তা তাড়াতাড়ি করে ফেলা দরকার । জেন-এর মিলিটারি ম্যাগাজিন অনুযায়ী, আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিটি দেশের মিসাইল কলকাতার দিকে তাক করা আছে, কেননা একটিমাত্র চোটে সবচেয়ে বেশি নাগরিকে এখানে যেভাবে ছাই করা যাবে, তা অন্য শহরে সম্ভব নয় । ইরাক যুদ্ধের ফলে বহু দেশ এবার গোপনে মারণাস্ত্রের ভাঁড়ার গড়বে, সম্ভবত একজন বয়ে নিয়ে যেতে পারে এমন গণবিদ্ধংসী অস্ত্র । পদ্য-যোগাড়েরা তাদের হেড মিস্ত্রিদের যুগিয়ে যাবে গলা-কাঁপানো পদ্য । আমেরিকার বিশ্ববাজার আছে, তো পদ্য যোগাড়েদের আছে বুকনিবাজার । সম্প্রতি টিভিতে দেখলুম তথাকথিত নকশালপন্হী একদল পাঁচফুটিয়া ছেলেমেয়ে শেক্সপিয়ার সরণিতে একটা দোকানে এই অজুহাতে ভাঙচুর করল যে তারা মার্কিনী জুতো বিক্রি করে । একটি মেয়ে জিন্সের টপ আর টাইটবটম পরে ভাঙচুর করছিল । অর্থাৎ সে নিজেই মার্কিনী পোশাকে ছিল । অর্থনীতি সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই ছেলেমেয়েগুলোর । দোকানটা মারোয়াড়ির, টাকা তার, জুতোগুলো ভারতীয় শ্রমিকরা বানায় । ওসব না করে ওদের উচিত ছিল ফিদাইন হয়ে ইরাকে লড়তে যাওয়া । ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা লড়তে গিয়েছিল । যে নেতার কাজ অপছন্দ হতো, তিনি যে দেশেরই হোন, অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁদের যাচ্ছেতাই চিঠি লিখত ।

প্রশ্ন: তোমার জন্মের এক মাস আগে জার্মানি আর সোভিয়েত রাশিয়া পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল । সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল সেই যুদ্ধে, দু কোটি কেবল সোভিয়েত রাশিয়ার । তুমি যখন ক্যাথলিক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছ, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল যার ফলে তিন লক্ষ মানুষ মারা যান । তোমার যখন এক বছর বয়স, তখন ছাব্বিশ হাজার মানুষকে পোল্যান্ডের কাতি জঙ্গলে স্তালিনের নির্দেশে খুন করা হয়েছিল । ষাট লক্ষ ইহুদিকে বিষাক্ত গ্যাসে আর ইনসিনেটারে পুড়িয়ে মেরেছিলেন হিটলার । কত লক্ষ বিরোধী-নামাঙ্কিত মানুষকে স্তালিন, কাম্পুচিয়ার পল পট, জানারাল পিনোশে, ইদি আমিন, সুহার্তো, ট্রজিলিও, মোল্লা ওমর, দুভালিয়ের, টিক্কা খান, বিদেশের মাটিতে বাবা বুশ ছেলে বুশ মেরে ফেলেছেন । তোমার জীবদ্দশায় লক্ষ-লক্ষ মানুষকে একযোগে মেরে ফেলার জন্যে অ্যানথ্রাক্স, স্মল পক্স, বটুলিনাম, রাইসেন, টুলারেনসিস, নিউমোনিক প্লেগ, মাস্টার্ড গ্যাস, সারিন গ্যাস ইত্যাদি মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও প্রয়োগ হয়েছে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনোও না কোনোও আদশফের নামে গণহত্যাগুলোকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে । সারাটা জীবন অমন দূষণের ভেতরে বাস করে তুমি নিজেও কি দূষিত হয়ে যাওনি? তোমার কি সন্দেহ হয়না যে অমন দূষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাটাই বরং অপরাধ? এরকম আবর্তে বসে কবিতা লিখতে অপরাধ বোধ কর না? কেমন মানুষ তুমি?

উত্তর: হ্যাঁ । নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নৃশংসতার যে সামগ্রিক ডিসকোর্সের সঙ্গে জন্মাবধি পরিচিত হয়ে চলেছি, এবং যেভাবে তা দেশে দেশে রাষ্ট্রীয়, জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, এথনিক, ট্রাইবাল, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, আর্থিক বৈধতা পেয়েছে, তা ব্যক্তির অন্তরাত্মা ধাঁচের ধারণার অ্যাবসার্ডিটিতে আমি আক্রান্ত । হত্যাযজ্ঞ একজনের কর্মকাণ্ড নয় । তা অজস্র মানুষের আনুগত্যের যান্ত্রিক দক্ষতা থেকে উপজাত । জনমুক্তি, মানবতাবাদ, মানুষই পৃথিবীর কেন্দ্র, কমরেড তুমি নবযুগ আনবে, মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ, সততা, উত্তরণ, ধ্রুবসত্য, যুক্তিপ্রাণতা, ইতিহাসের প্রগতি, সার্বভৌম একক মন, ব্যক্তিচেতনা, বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক সুস্হতা ইত্যাদি, গ্রমীণ লিটল ম্যাগাজিনের অজ্ঞান-অবোধ ডিসকার্সিভ স্পেস হিসেবে কেবল টিকে আছে । আমি যে কেবলমাত্র সন্দেহে আক্রান্ত, সেখানেই যে এই প্রবলেম্যাটিকের সমাপ্তি, তা কিন্তু নয় । পশ্চিম বাংলার ম্যাক্রোলেভেল ও মাইখপলেভেল ঘটনাবলীর দ্বারা প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে বাগাড়ম্বরের ইডিয়সি । যারা বলেছিল যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এসট্যাবলিশমেন্টকে ধ্বংস করাটা সাম্যবাদের অভিমুখ, তাদের তো চেয়ারে বসে-বসে ফিসচুলা হয়েগেছে । আমাএ সাবজেক্ট পোজিশান ওই উনিশ শতকীয় এনলাইটেনমেন্টের পৃষ্ঠপটে যদি দূষিত মনে হয় তো তার উৎসসূত্র ওই একই ডিসকোর্স । বদ্ধ উন্মাদ বা খবরের কাগজে ঘটনা-নির্লিপ্ত প্রবন্ধ-লেখকরাই শুধু নিজেদের দূষণমুক্ত মহাপুরুষ বলে মনে করতে পারেন, কেননা তাঁদের যন্ত্রণায় ছটফট করার প্রয়োজন হয় না । আমি তাই আমার এই সাবজেক্ট পোজিশানকে পারক্য আক্রান্ত বা এলিয়েনেটেদ বলব না । কেননা, তুমি যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছ, সে single agent নয়, তার ‘অ্যানোমি’ ঘটা সম্ভব নয় । আমি যে আপোষ করিনা, আর dissenting voice গুলো বজায় রাখতে পেরেছি, তাও কিন্তু আমার সাবজেক্ট পোজিশানকে অবিরাম যাচাই করতে থাকার কারণে । অমন জাগতিক ধ্বংসকাণ্দের মাঝে জন্মাবধি বাস করে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখার নৈতিক প্রয়োজনীয়তার সন্দেহটা থেকেই যায় । সাহিত্য ব্যবসায়ী হলে নিরেট অজ্ঞানতার কোকুনে সন্দেহহীন আরামে থাকতুম । সন্দেহহীন হওয়াটা, আমার মনে হয়, ক্রমিনালের মতন আচরণ হয়ে যাবে । যদিও জানি যে আমার ভাবনাচিন্তার চাপটাই আমার হার্ট অ্যাটাক দুটোর অন্যতম কারণ ।

প্রশ্ন: তুমি যখন থেকে লেখালিখি করছ, তখন থেকেই জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দেবার বিরোধিতা করে আসছ । কলকাতায় ফিরে আসার পর সাবর্ণ চোধুরী পরিবার পরিষদে অংশ নিয়েছ, যাতে জোব চার্ণককে পিতৃত্ব দেয়া নাকচ হয় । প্রথম সাবর্ণ চৌধুরী লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর জীবন নিয়ে লিখেছ কবিতীর্থ পত্রিকায় । নবম শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত নিজের সাবর্ণ চৌধুরী লিনিয়েজ নিয়ে দিশা পত্রিকায় লিখেছ । এটা কি তোমার পোস্টকলোনিয়াল ডিসকোর্স ? নাকি জোব চার্ণককে উৎখাত করার মধ্যমে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলে? কেননা রাধাকান্ত দেবের পরিবার সুতানুটি পরিষদ জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দিতে উঠে-পড়ে লেগেছিল । আর রাধাকান্ত দেবের পূর্বজই ক্লাইভকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে, আর্থিক ও স্ট্র্যাটেজিক সাহায্য করেছিল । ইংরেজ ও নবাবপক্ষের অবর্তমানে, তাদের লড়াইটা কি গোপনে কলকাতার দুই আদি পরিবারের মধ্যে আজও চলছে? তুমি কী উদ্দ্যেশ্যে এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে, যার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক নেই?

উত্তর: ইংরেজরা কলকাতার একশ বছর, কলকাতার দুশ বছর চিহ্ণিত করে কোনও উৎসব পালন করেনি । যারা তিনশ বছর পালন করার হুজুগটা করল, তাদের একটা অংশ সেই পরিবারের রেলিকস যারা সিরাজের বিরুদ্ধে ক্লাইভকে সাহায্য করে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় খুঁটি হিসেবে কাজ করেছিল । কিন্তু সবচেয়ে বিরক্তিকর ও অসহ্য লাগল সেইসব লোকগুলোর কাজকারবার, যাঁরা স্বঘোষিত বামপন্হী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী । কলকাতার রাস্তাঘাত, মাঠ-ময়দান সর্বত্র থেকে যখন সাম্রাজ্যবাদীদের মূর্তিগুলো উপড়ে লোপাট করা হয়েছে, তখন আশ্চর্য হয়ে গেলুম দেখে যে স্কুলের পাঠ্যবইতে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট জোব চার্ণকের মূর্তি বসন হয়েছে, এই ফিকশনের মাধ্যমে যে, তিনি কলকাতা শহরের বাবা । আসলে পশ্চিম বাংলায় নিজেদের বৈধ ও ন্যায্য প্রমাণ করার জন্যে পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুরা রাজনৈতিক রিরুটিং হিসেবে এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন । বহিরাগতরা যেখানে গেছে সেখানকার ইতিহাস বিকৃত করেছে । হাওয়া৪৯ এর অপর সংখ্যায় আদি কলকাতার অপর শিরোনামে কৌশিক পরামাণিক ওনার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সরকারি ইতিহাসকাররা কলিকাতার তিনশত বৎসরের জীবনপঞ্জী বইটায় কী কেলো করেছেন । হাওয়া৪৯-এ উত্তরঔপনিবেশিকতা নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার সময়ে তধ্য খুঁজতে বসে রাগ ধরে গেল সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান বইতে জোব চার্ণক আর লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর এন্ট্রি দুটো পড়ে । জোব চার্ণক সম্পর্কে এন্ট্রিটা ভুল তথে্য ঠাসা, এবং গাঁজাখুরি । সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত আর অঞ্জলি বসু কোথা থেকে ওসব জুটিয়েছেন জানি না । তবে ওনাদের সাবজেক্ট পোজিশান যে মোটিভেটেদ তা স্পষ্ট হয়ে গেল আমার পূর্বজের এন্ট্রিটা পড়া । পদবিসহ নাম না দিয়ে লেখা হয়েছে কেবল লক্ষ্মীকান্ত, জন্ম-মৃত্যু সন নেই, তথ্য ভুল এবং ভাসা-ভাসা, যখন কিনা লক্ষ্মীকান্তর উত্তরপুরুষ অতুলকৃষ্ণ রায়ের লেখা এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা বইটা, যার ভূমিকা লিখেছিলেন নিশীথরঞ্জন রায়, তা ওনাদের কাছেই ছিল । এই সময়েই বড়বাড়ি আর সাবর্ণ পাড়ার গোরাচাঁদবাবু, স্মরজিৎবাবু, কানুপ্রিয়বাবু জোব চার্ণককে কলকাতার বাবা বানাবার বিরুদ্ধে মামলা করার তোড়জোড় করছিলেন । সাম্রাজ্যবাদ আসার আগে হিন্দু বাঙালির বাপ-চোদ্দোপুরুষের ইতিহাস খতিয়ান রাখত ঘটক সম্প্রদায় আর পুরীর পাণ্ডারা । ধার্মিক আচার-আচরণের বাইরে তার গুরুত্ব এই ছিল যে, লোকে নিজের ভৌগলিক আর ঐতিহাসিক শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকত, যা তার মধ্যে সক্রিয় রাখত এই বোধ যে, সে পোকা-মাকড় জন্তু-জানোয়ার নয় । কিন্তু ইউরোপীয় মননবিশ্বে নির্মিত নাগরিক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার পারিবারি আর ভৌগলিক স্মৃতি থেকে । আজকের বিশ্বের বহু সমস্যার বীজ ওই উত্তরঔপনিবেশিক স্মৃতিবিপর্যয়, এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদি এনট্রপি । সাহিত্যিক হিসেবে পারিবারিক শেকড়ের স্মৃতিচর্চার মাধ্যমে আমি গভীর বাঙালিত্বে প্রবেশ করি, যা মুর্শিদাবাদ, গৌড়, সরকার সাত গা্ঁ, তাম্রলিপ্তে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আদি বাঙালিত্বের স্পেস তৈরি করে । আমার লেখালিখিতে এই স্পেস হাংরি আন্দোলনের সময় থেকে মোটিভ ফোর্স রূপে আছে । হাংরি বুলেটিন, যেটা আমার জেনারেশনের >কাব্যদর্শন বা মৃত্যুমেধী শাস্ত্র নামে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা মহারাজ প্রতাপাদিত্যকে উৎসর্গ করেছিলুম । পোস্টমডার্ন ভাবনা ও সমাজ বিশ্লেষণে আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর আগ্রহ, এই বিশেষ স্পেসটির সূত্রে । প্রথম যিনি ১৯৩৪ সালে পোস্টমডার্ন শব্দটি প্রয়োগ করেন, নিকারাগুয়ার কবি ফেদেরিকো দ্য ওনিস, তা করেছিলেন প্রক্তন উপনিবেশের মানুষগুলোর স্মৃতি বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে । মুম্বাইতে থাকতে, আর্জেন্টিনার এক তরুণ কবিগোষ্ঠী আমার সম্পর্কে একটি স্প্যানিশ ওয়েবসাইট খুলেছেন খবর পেয়ে, ১৯৮৯ সালে নেট সার্ফিং করতে বসে ফেদেরিকো দ্য ওনিস সম্পর্কে জানতে পারি ।

প্রশ্ন: তোমাকে নিয়ে, তোমার নাম উল্লেখ করে বহু ওয়েবসাইট আছে । বইপত্র তবু কিছুদিন থাকে । কিন্তু ওয়েবসাইট যে থাকবে না, মুছে যাবে, তা কি পীড়িত করে না তোমায়? ইন্টারনেটের কারণে চিঠিপত্র সংগ্রহে রাখাটাও তো সম্ভব নয় । সাহিত্যের যে সাময়িক অবিনশ্বরতা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল । তোমায় হন্ট করে না ?

উত্তর: ওয়েবসাইটগুলোয় যে আমি আছি তা জানতে পারি নেট সার্ফিং শিখতে গিয়ে । আমার সম্পর্কে কে কী লিখেছে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চিঠি বা হাংরি বুলেটিন রেখেছে, কোন গ্রন্হে আমার কবিতা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, সে সব জানার আহ্লাদ আছে । অনেকে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে কবিতা সংকলিত করেন, তাতে আমার কবিতাও থাকে, যদিও তা কয়েকমাসের জন্যে । অনেকে ই-মেল করে গল্প বা কবিতা পড়ার জন্যে পাঠান । আমার তো বাড়িতে ব্যবস্হা নেই, সাইবার কাফেতে ঢুঁ মারতে হয় । আঙুলে ব্যথার জন্যে অসুবিধে হয় । এ ঠায় বসে থাকাও কষ্টকর । অবিরাম পরিবর্তনরত একটা ব্যাপারের মধ্যে আছি, তার মৌজমস্তি উপভোগ করি । কলকাতার সাহিত্যিকি নোংরামির বাইরে বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্হান । সাহিত্যিক অবিনশ্বরতা ব্যাপারটা ফালতু । তরুণ কবি-লেখকরা দেখি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর পড়েন না , অথচ তিনি, ঢাকার আব্দুল হালিম বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলেন । বেঁচে থাকতেই তো দেখছি আমার নামের ইমেজ আমার লেখাপত্রকে ছাপিয়ে যাচ্ছে । মগজের দেয়ালে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো, মিশরের পিরামিড, রোমের কলোসেয়াম, মাম্মালাপুরমের মন্দির, কুমহারারে সম্রাট অশোকের প্রাসাদের পাথরটুকরো ইত্যাদির ছবি টাঙিয়ে রাখলে অযথা দুশ্চিন্তার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কাজ করতেন বলে আমি স্কুলে পড়ার সময় ছুটির দিনগুলো সেখানেই কাটাতুম । তাই সময় ও সময়হীনতার ধারণা তখন থেকে গড়ে ওঠে । মুছে যাওয়াটা সেহেতু হন্ট করে না ।

প্রশ্ন: তুমি কি নিজেকে হিন্দু বলে মনে করো? হিন্দুদের দেবী-দেবতা, ইষ্টদেবতা আর ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? হিন্দুর উৎসবে অংশ নাও? হিন্দুরা যদি অন্য ধর্মের লোকেদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, যেমন কাশ্মিরি পণ্ডিত রা, তাহলে কি ইন্সটিংক্টলি রিঅ্যাক্ট করো? মরে গেলে ডাক্তারি ছাত্রদের জন্যে তোমার দেহ দান করে দেবে? তুমি কি চাইবে গঙ্গার ধারে, তোমার বাপ-ঠাকুর্দার বসতবাটি উত্তরপাড়ায় তোমার শেষকৃত্য হোক? নশ্বর শবের মাধ্যমে কি ইমেজকে পূর্ণতা দিয়ে যেতে চাও, যেমনটা রাজনীতিক-সাহিত্যিক-শীল্পীরা করেন? বয়েস তো হয়ে গেল, এখনও পর্যন্ত নিজের মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করে কবিতা লেখোনি তো?

উত্তর: হ্যাঁ, আমি একজন হিন্দু । এই জন্যে যে আমি চাই মরে গেলে আমার দেহ পোড়ানো হোক । সবাই জন্মসূত্রে হিন্দু হয় । আমি মৃত্যু সূত্রে । পারিবারিক ইষ্ট দেবতা, সাবর্ণচৌধুরী হবার সুবাদে, কালীঘাটের কালী আর শ্যামরায়, যাঁদের থেকে, ঠাকুমার আমল থেকে, ঠাকুমার মানসিকতা ও দাপটের কারণে, আমার আগের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে গিয়েছিল । বাবাকে কখনও কোনো মন্দিরে যেতে দেখিনি, যদিও উনি পৈতে পরা, গায়ত্রীমন্ত্র, খাবার সময়ে গণ্ডুষ ইত্যাদি সম্পর্কে গোঁড়া ছিলেন, পাঁজি-পুঁথি মানতেন না । মা সেসব কিচ্ছু মানতেন না, এমনকি অন্য ধর্মের মেয়ে বিয়ে করার ওপন পারমিশান দিয়ে রেখেছিলেন উনি । আমার সাবজেক্ট পোজিশানের বহুত্বের উৎস আমার শৈশবের পাড়াগুলো তো বটেই, আমার বাবা-মা, জেঠিমা-জ্যাঠা, কাকিমা-কাকার মতাদর্শের বৈভিন্ন্যের অবদানও তাতে আছে । আমার বয়ঃসন্ধির যৌনউন্মেষ হয়েছিল একজন শিয়া মুসলমান তরুণির সংসর্গে, এবং কবিতার জগতে প্রবেশও । এ-ব্যাপারে আমার একটা কবিতা আছে, প্রথম প্রেম: ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ শিরোনামে । প্রাথমিক স্তরে পড়েছি ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে, তখন প্রতিদিন চার্চে যেতে হত । তারপর ব্রাহ্ম স্কুলে । আমার মস্তিষ্কে ঈশ্বর বিশ্বাসের ওই বীজ অংঙ্কুরিত হতে পারেনি । চেষ্টা করেও না । ডুবজলে যেটুকু প্রশাস-এর অতনু, আর নামগন্ধ উপন্যাসে অরিন্দম এবং যিশু বিশ্বাস চরিত্রগুলোয় আমি এই মনস্হিতি আর্টিকুলেত করার চেষ্টা করেছি । দুটি স্কুলেই হিন্দু উৎসব নিষিদ্ধ ছিল । পাড়ার প্রধান উৎসব ছিল দোলখেলা, যাতে অংশ নিতুম, এখন বয়সের কারণে নিই না । গণহত্যা শুনলেই গাগুলোয়, টিভিতে দেখলেই বন্ধ করে দিতে হয় । পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশানের সামনেই দুজনকে থেঁতলে দেয়ালে গেঁথে দিতে, সঙ্গে-সঙ্গে সরবিট্রেট রাখতে হল জিভের তলায় । ইন্সটিংক্ট এখন এই স্তরে । তবে পাকিস্তান রাষট্রটিকে আমি ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করি । তাদের জণভেই হিন্দিত্ব নামক দানবটি পয়দা হবার সুযোগ পেয়েছে । রাষ্ট্রধর্ম কনসেপ্টটাই দুর্বৃত্তসুলভ । রাষ্ট্রের আবার ধর্ম হয় নাকি? তাহলে তো পথঘাট-লাউকুমড়ো কাক-কোকিলেরো ধর্ম থাকবে । দেহ দান করার ব্যাপারটা নিছক নৌটঙ্কি । গুদামের চেলাকাঠের ডাঁইয়ের মতন মর্গগুলোয় বেওয়ারিশ লাশের পাহাড় জমে থাকে । এসকেপিস্টরা আর যে প্রাক্তন উদ্বাস্তুরা পশ্চিম বাংলার মাটিতে নিজেকে মিশিয়ে দিতে অনিচ্ছুক তাঁরা, ওটা করেন । মরার সময়ে মুম্বাইতে থাকলে চোখদুটো কারোর কাজে লাগবে । উত্তরপাড়ার যে-ঘাটে সাবর্ণচৌধুরীদের শেষকৃত্য হত, সেখানে বহুকাল আগে শবদাহ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে । বেস্ট হবে কিউ না দিয়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢুকতে পারা । মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করার সাহিত্যিক ক্যাননটা উপনিবেশগুলোয় এনেছে ইঊরোপ । যার শব পোড়ানো হবে, তার এপিটাফ লেখার মতন ইডিয়টিক ব্যাপার আর দ্বিতীয়টি নেই । মৃতদেহ ঘিরে ফিউনারাল সং গাওয়াটাও বাঙালির সাংস্কৃতিক আচরণ নয় । মৃত্যুর পর স্মরণসভা ব্যাপারটাও আমার অভিপ্রেত নয় । আমি অমন স্মরণসভাগুলো এঢ়িয়ে যাই । লক্ষ-লক্ষ বাঙালির মতন আমিও সাধারণ স্বাভাবিক অবলুপ্তি চাই । আপাতত দুর্গাপুজোর নবমীর দিন বড়বাড়ি আর আটচালায় নানা এলাকা থেকে এসে সাবর্ণচৌধুরীদের যে জমায়েট হয়, ১৬১০ থেকে হয়ে আসছে, তাতে অংশ নেয়া আর খাওয়ায় সীমিত হয়ে গেছে ধর্মকর্ম।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Malay Roychoudhury interviewed by Nishtha Pandey

    Malay Roychoudhury interviewed by Nishtha Pandey

Nishtha : In your own words, can you explain briefly why the movement ended? Were the reasons purely political?

Malay : People thought that the movement ended after I left Kolkata in 1967 consequent upon my exoneration at High Court and my getting a job in Agricultural Refinance & Development Corporation, Lucknow. I was from a Patna slum called Imlitala and did not have any knowledge of agriculture and rural life. I had to gain knowledge by reading about rural life. The movement was continued by other members but they did not give publicity to their magazine “Khudharto ” as I did by distributing leaflets and pamphlets which reached readers quickly ; nobody had to pay. Leaflets/pamphlets  had a greater reach as some of them were in English as well. “Khudarto” was in Bengali and Kolkata Centric. In fact seven issues of “Khudharto’ were published as an anthology by Sahitya Academy. Unfortunately those who published “Khudharto ” took a decision to have only a few writer friends as contributors. I used to increase the number of participants which included writers, poets, dramatists, cartoonists and painters. The movement took roots in North Bengal and Tripura in 1975-1980 but then again they were not publicized. Politics played a role as far as the then West Bengal government wanted to stifle our voice, arrested us and charged me for my poem Stark Electric Jesus. When my elder brother returned to Kolkata and started a literary magazine called HAOWA39, and I got transferred to Kolkata, interest among younger generation writers about our movement received attention. I was requested to write about the movement by a magazine of Bangladesh which was republished in Kolkata by a publisher and published again by another publisher with lots of photographs. After Maitreyee Bhattacharjee Choudhury wrote The Hungryalists published by Penguin Random House, the movement again got an Indian attention.

Nishtha : Performing poetry was a big part of the Hungry Movement, it aimed at raising people from their passive state. Is there a particular performance that is striking to you, or stands out more than the others?

Malay : There were a few of them. One was at the cemetery of Michael Madgusudan Dutt, limited to us only, though Tridib Mitra and his girlfriend Alo Mitra had distributed cards of the event among writers and poets. The one which attracted a crowd was at Howrah station when I stood upon a bench at platform number one and read the Bengali version of Stark Electric Jesus loudly. Tridib Mitra read his poem Hatyakand. Third was at country liquor den Khalasitola on Jibananda Das’s birthday when Abani Dhar got up on a table and sang a song ; he had worked as a ship mate for some time. This became news in the next day’s newspapers and literary magazines. The incident has also been included in the book ‘A Poet Apart’ by Klinton B Seely, on Jibananda Das’s life and poetry.

Nishtha : The Hungry Movement was a combination of the literary and the political when at its peak. How did this come about? Did one aspect stem from the other or were both of them intertwined from the beginning?

Malay : Both of them were intertwined from the very beginning as Hungry Generation manifestos were issued not only on literature but also on politics and religion etc. The then daily ‘Jugantar’ wrote its main editorial on consecutive days about our political manifestos. Our poems, short stories and drama had political overtones. Politics came automatically as the movement itself was a reaction to the plight of refugees at the Sealdah railway station. 

Nishtha : Caste equality was an important fight that was led by the Hungryalists. Can it be the sole reason why the movement always garnered unwanted attention from the literary elite of Bengal, and eventually from the state?

Malay : I do not think so. Elitist literary magazines did not publish under-caste works. We wondered loudly as to why they were excluded from Buddhadeva Basu, Sushil Roy, Sunil Gangopadhyay’s poetry magazines. Haradhan Dhara had to change his name to Debi Roy, since Dhara means cultivator caste, so was Sambhu Rakshit. Sunil Gangopadhyay ridiculed Haradan Dhara in letters to his friends. Actually the then Establishment was dominated by upper castes. It is the elites who requested Kolkata Police to take action against our movement. 

Nishtha : Do you think the movement’s delicate position in a postcolonial country, in post-independent Bengal, affected the fate of the movement, particularly the end, compared to let’s say the Beats in America?

Malay : The Beats came from rich families. Very rich families, when you think of Ginsberg, Kerouac, Burroughs. We were paupers compared to them. Saileswar Ghosh, Subhash Ghosh, Basudev Dasgupta, Pradip Choudhuri came from refugee families. Haradhan Dhara had to work as an errand boy at a tea stall ; his mother collected garbage from vegetable markets. Falguni Ray did nothing.  came from a slum. We did not get publishers for our books for more than two decades.

Nishtha: Do you think the friendship with Allen Ginsberg propelled the Hungry Movement in any way? Did his visit act as a catalyst for the movement?

Malay : Yes it did. Not in India but in America. In India prominent Hindi, Gujarati and Marathi writers wrote about our movement in the papers/magazines of their languages. Allen Ginsberg sent our manifestos and bulletins to Lawrence Ferlinghetti who published them in four issues of his City Lights Journal. This attracted other editors and writers of various little magazines in the USA, Latin America, Europe, Turkey and Arab world.  Research is being done in those activities by academicians now. You may find them in academia.edu. But his visit can not be termed as a catalyst. Our movement started in November 1961 and Ginsberg came in 1962. He met my elder brother Samir in 1962 and came to meet me at Patna in April 1962. My photographer father was annoyed with Ginsberg when he found out that Ginsberg was taking photos of lepers, beggars, destitutes, half-naked sadhus. He eventually made money by printing them in India Journals and Exhibiting them in various studios. He was, like other foreigners, an Orientalist.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজ্বল দত্ত

ব্যারাকপুর স্টেশন পত্রিকার  মুখোমুখি মলয় রায়চৌধুরী 

( ” বারাকপুর স্টেশন ” কবিতা পত্রিকার ৪র্থ সংখ্যায়   মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজ্জ্বল দত্ত। সাক্ষাৎকার সহায়তা গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও রাজদীপ ভট্টাচার্য) 

সজ্জ্বল দত্ত: মলয়দা , বারাকপুর স্টেশন পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রথমেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি এই সাক্ষাৎকারে সম্মত হয়েছেন এজন্য আমরা যারপরনাই উল্লসিত। শুরুতেই আপনার ছোটবেলার কথা, জন্ম, পারিপার্শ্বিক এবং বাল্যশিক্ষার বিষয়ে আমাদের যদি একটু জানান।

মলয় রায়চৌধুরী : প্রশ্ন পাঠাবার জন্য ধন্যবাদ । কিন্তু প্রশ্নগুলো পড়ে বুঝতে পারলুম যে তোমরা আমার বইপত্র পড়োনি, কেননা কোনো প্রশ্নই আমার কোনো বই পড়ে করা হয়নি । আমার বাল্যস্মৃতি ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ বইয়ের চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে । সাম্প্রতিক সংস্করণ প্রতিভাসের, নাম ‘ছোটোলোকের জীবন’ । আমি জন্মেছিলুম পাটনায় সরকারি হাসপাতালে ১৯৩৯ সালে । আমরা থাকতুম ইমলিতলা নামে একটা মহাদলিত আর গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা বস্তিতে । বাবা ছিলেন কুড়িজনের পরিবারের প্রধান রোজগেরে । পরে বড়োজেঠা পাটনা মিউজিয়ামে মূর্তি আর পেইনটিঙ ঝাড়পোঁছের ক্লাস ফোরের চাকরি পান । শিক্ষা পাটনাতেই, রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে। সেখানকার গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম।

সজ্জ্বল :  বাংলা সাহিত্য ও কবিতার প্রতি আপনার ভাব-ভালোবাসার শুরুয়াত হল কীভাবে?

মলয় : আমার পড়াশোনা পাটনায় হলেও, দাদা সমীর রায়চৌধুরীর চরিত্র পাড়ার প্রভাবে খারাপ হয়ে যেতে পারে আঁচ করে ওনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল । দাদা পাটনায় আসার সময়ে প্রচুর বাংলা বই আনতেন । আমি তিরিশের দশকের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হই । পাশাপাশি ইংরেজি কবিদেরও পড়া আরম্ভ করি, যাদের কবিতাপাঠ ম্যাকলে সাহেবের চাপে স্কুল আর কলেজের পাঠ্যে ঢুকেছিল । ১৯৫৯ নাগাদ বাবা একটা সুদৃশ্য ডায়েরি দিয়েছিলেন, তাতেই কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলুম ।

সজ্জ্বল :  আপনার দাদা আপনার সাহিত্যচর্চায় কতটা প্রভাবিত করেছেন আপনাকে?

মলয় : দাদা পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক প্রভাবে ভিন্ন চরিত্রের মানুষ ছিলেন । আমার বিপরীত । উনি ছিলেন সোফিসটিকেটেড । আমি মিশতুম পাটনার লুচ্চা-লাফাঙ্গাদের সঙ্গে। ইমলিতলায় ছোটোবেলাতেই শুয়োরের মাংস, ইঁদুর পোড়া আর তাড়ি খেয়ে ভিন্ন ধরণের জীবনে ইনিশিয়েশন হয়েছিল । ইমলিতলার বন্ধুরা আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল । দোলখেলার সময়ে পাড়ার মহিলারা যৌনতার ইনহিবিশিন বাদ দিয়ে মেতে উঠতেন রঙ খেলায় । আমার প্রথম বন্ধুনি ছিলেন কুলসুম আপা নামের এক কিশোরী, যিনি আমার সঙ্গে গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজের পরিচয় করান । ওনার সম্পর্কে মন খুলে লিখেছি বাল্যস্মৃতিতে । একজন যুবতীর যোনি উনিই প্রথম প্রত্যক্ষ আর অনুভব করতে দিয়েছিলেন।

সজ্জ্বল : হাংরি আন্দোলন বিষয়ে অবহিত নন যে পাঠক তাঁদের কথা ভেবে আপনাদের আন্দোলনের পশ্চাদপট এবং শুরুর দিনগুলির কথা সংক্ষেপে  একবার আমাদের জানান ।  

মলয় : হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে ৯৯% বাঙালি পাঠক অবহিত নন। পাঠক কেন, তরুণ কবি-সাহিত্যিকরাও জানেন না। অনেকে তো আমার নামই শোনেনি । তাই তাঁদের কথা আর ভাবি না । 

সজ্জ্বল : ক্ষুধার্ত মানে প্যাটের না চ্যাটের ক্ষুধা? আপনার সম্পূর্ণ সাহিত্যযাপন অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ করলে এই প্রশ্ন কিন্তু বহুপাঠকের ভেতরে অবধারিতভাবে উঠে আসবেই  মলয় দা, আপনার কবিতা কি আদৌ বুভুক্ষুদের কথা বলে নাকি অহৈতুকী যৌনক্ষুধাকে গুরুত্ব দ্যায়?

মলয় : কী আর বলি ? আমার লেখাপত্র তো পড়ো না । পড়লে জানতে হাংরি শব্দটা কোথা থেকে পেয়েছিলুম । আর আন্দোলনের তাত্ত্বিক বনেদ কী ছিল । আমি ক্ষুধা শব্দটা ব্যবহার করিনি । চিরকাল হাংরি শব্দটাই ব্যবহার করেছি । ‘হাংরি’ শব্দটা প্রথমে পেয়েছিলুম কবি জিওফ্রে চসারের ‘In Swore Hungry Time’ বাক্যটি থেকে। আর আন্দোলনের তত্ত্ব গড়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেঙ্গলারের লেখা ‘The Decline of the West’ বইটি থেকে। স্পেঙ্গলারের এই তত্ত্বটির সারমর্ম হলো: 

“কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন।”

এই হাঙ্গার  শুধু আক্ষরিক অর্থেই হাঙ্গার ছিল না। তা ছিল সাহিত্যে মনের ভাব প্রকাশের হাঙ্গার, যথার্থ শব্দ প্রয়োগের, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষার হাঙ্গার। আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। আমার মনে হয়েছিল যে কিছুটা হলেও এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার, আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন। অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে আমি হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চেয়েছিলুম। এখনকার পশ্চিমবাংলার দিকে তাকালে আমার বক্তব্যকে ভবিষ্যৎবাণী বলে মনে হবে ।

সজ্জ্বল :খুব সত্যি কথা , এ’ বিষয়ে আপনিও নিশ্চয়ই অবগত আছেন , হাংরি আন্দোলনের অনুসারীদের কেউ কেউ মনে করতেন যে আপনিই এই আন্দোলনকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন! আপনার কী বক্তব্য ? 

মলয় : আমি আর ছুরি মারব কেমন করে ? আমার বিরুদ্ধে মামলা চলেছিল ৩৫ মাস। বন্ধুরা বেশির ভাগ রাজসাক্ষী হয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশে বয়ান দিয়েছিল আর কেটে পড়েছিল । সাক্ষী হবার জন্য আদালতের ট্রেজারি থেকে টাকাও পেয়েছিল । এইসমস্ত বন্ধুদের ঘৃণ্য মনে হয়েছিল। হাইকোর্টে মামলা জেতার পর ঘেন্নায় আমি এদের সংস্পর্শ ত্যাগ করে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম । সৌভাগ্যবশত পাটনায়  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ব্যাঙ্কনোট পোড়ানোর চাকরি ছেড়ে এআরডিসিতে গ্রামীণ উন্নয়ন আধিকারিকের চাকরি পেয়ে লখনউ চলে যাই । নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে টের পাই যে চাষবাস, পশুপালন, জলসেচ, গ্রামজীবন সম্পর্কে কিচ্ছু জানি না । এই সমস্ত বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা আরম্ভ করতে হয়েছিল । সাহিত্যের বই পড়া আপনা থেকেই পেছনে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিলুম । তবে সরকারি চাকরি ছাড়ার ফলে এখন আমার পেনশন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পিওনের চেয়েও কম ।

সজ্জ্বল : রমানাথ রায় এবং শম্ভু রক্ষিতের কবিতা বিষয়ে আপনার কি মত?

মলয় : রমানাথ রায় তো কবিতা লিখতেন না ! শম্ভু রক্ষিত সম্পর্কে আমি বিস্তারিত লিখেছি। নেটে পাবে প্রবন্ধটা ।

সজ্জ্বল : কবিতা রচনায় বেশি মনোযোগ না দিলেও আসলে রমানাথ রায়ের কিছু ছোট্ট ছোট্ট চিত্রকল্পনির্ভর কবিতার কথা বলতে চেয়েছিলাম । যেমন – ‘ রাস্তায় রাস্তায় ‘ , ‘ চালের বদলে ‘ , ‘ আমার বুক ‘ ইত্যাদি । যাইহোক আপনার উত্তরে বুঝতে পারছি এগুলো আপনার কাছে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি । থাক সে প্রসঙ্গ । রমানাথ রায়ের কথা যখন উঠলোই , এই অবসরে বরং আপনার কাছ থেকে একটু জেনে নেওয়া যাক হাংরি আন্দোলনেরই প্রায় সমসাময়িক রমানাথ রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, আশিস ঘোষ দের ‘ শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আন্দোলন ‘  সম্পর্কে । হাংরি আন্দোলনের ঠিক পাশাপাশি এই আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মনোভাব কী ? আরো একটু নির্দিষ্ট বিন্দুতেই আসা যাক । ধরুন আপনার সম্পাদিত পত্রিকা ‘জেব্রা ‘র সঙ্গে সেইসময় শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের ‘ এই দশক ‘ এর দৃষ্টিভঙ্গী ও লেখা নির্বাচনে ঠিক কী ধরনের মিল-অমিল আপনি চিহ্নিত করবেন ?

মলয় : শাস্ত্রবিরোধিরা গল্প লেখায় প্রশংসনীয় কাজ করেছেন সেসময়ে । হাংরি আন্দোলনে কেবল সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত গল্প বা ফিকশানাল ন্যারেটিভ লিখতো । সুবিমল লিখেছে বাঙাল বুলিতে আর ডায়াসপোরিক বাংলায় । সুভাষ ঘোষ লিখেছে ক্রিপটিক ডিকশানে । কেবল বাসুদেব দাশগুপ্ত যে ধরণের গল্প লিখেছে তার সঙ্গে শাস্ত্রবিরোধিদের তুলনা করা যায় । আমি, ফালগুনী, অরুণেশ ঘোষ, অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার অনেক পরে ফিকশান লেখা আরম্ভ করি । জেব্রার মোটে দুটো সংখ্যা বেরিয়েছিল, শাস্ত্রবিরোধিদের বহু পত্রিকা আর বই প্রকাশিত হয়েছিল । 

সজ্জ্বল : হাংরি আন্দোলনের সর্বাপেক্ষা গভীরতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী  কবি কে বা কে কে? কার কার নাম করবেন ? 

মলয় : শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, শম্ভু রক্ষিত । আমি এনাদের সবায়ের সম্পর্কে লিখেছি । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার মূল্যায়ন আমিই প্রথম করেছিলুম, কিন্তু উনি যতোদিন বেঁচেছিলেন আমাকে গালমন্দ করে গেছেন, এমনকী নিজের মেয়েকেও বলে গিয়েছিলেন যে উনি মারা যাবার পর ওনার মেয়ে যেন তা বজায় রাখেন । হয়তো ওনার নাতিও বড়ো হয়ে তা বজায় রাখবে ।

সজ্জ্বল : খুব স্পষ্ট এবং খোলাখুলিভাবে জানতে চাইছি মলয়দা , হাংরি আন্দোলনের ভাষাতেই জানতে চাইছি , জীবনের এই প্রান্তবেলায় দাঁড়িয়ে আপনি কী মনে করেন ? তরুণ হাংরি কবি মলয় রায়চৌধুরীর ” প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ” তদানীন্তন থেকে প্রবহমান বাংলা কবিতায় আদৌ কিছু কী ‘ছিঁড়তে’ পেরেছিল , বা পারল ? 

মলয় : এটা বাঁকবদলের কবিতা । অনেকে বুঝতে পারেনি ‘ছুতার’ শব্দটা কিসের দ্যোতক ! এই কবিতার প্রভাবে বাংলা কবিতার শব্দভাঁড়ারে অভূতপূর্ব সব বদল ঘটে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শব্দভাঁড়ারকে বর্জন করার ফতোয়া ছিল কবিতাটা । দানিয়েলা কাপেলো আর শীতল চৌধুরী এই কবিতাটার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বাংলা কবিতায় কেমন প্রভাব ফেলেছে । দানিয়েলার বিশ্লেষণ পাবে অ্যাকাডেমিয়ার সাইটে । শীতল চৌধুরীর প্রবন্ধটা নেট সার্চ করলেই পাবে।

সজ্জ্বল দত্ত : আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ শয়তানের মুখ ‘ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে । কৃত্তিবাসের কর্ণধার যিনি ছিলেন তার সঙ্গে তখন আপনার সম্পর্কের রসায়ন যাইই থাক , পরবর্তীকালে তার গোটা জীবনের সাহিত্য কর্মকাণ্ড এবং কৃত্তিবাস পত্রিকা ও প্রকাশনীর সাহিত্যধারার ওপর বড় করে আলো ফেললে পরে কখনো কি আপনার মনে হয়নি যে আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি আপনার  আদর্শগত জায়গার একেবারে বিপরীতে অবস্থান করা কোনো প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ?

মলয় : কৃত্তিবাস তখনও মাঙ্কি পক্সে আক্রান্ত হয়নি । সুনীল তখনও পত্রিকাটা কৃত্তিবাসের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আনন্দ বাগচীর থেকে ছিনিয়ে নেননি । আনন্দবাজারে সুনীল ঢোকার পর কৃত্তিবাস পালটি খেয়ে যায় । আমার ‘রাহুকেতু’ আর ‘চাইবাসা আবিষ্কার’ উপন্যাস পড়লে ব্যাপারটা তোমার কাছে স্পষ্ট হবে । আমার স্কুলে পড়ার সময় থেকে সুনীল আমাদের পাটনার আর উত্তরপাড়ার বাড়িতে আসতেন । সুনীল যখন বেকার তখন দাদা কৃত্তিবাস চালাবার খরচ দিয়েছেন বেশ কয়েকবার। ‘সুনীলকে লেখা চিঠি’ বইতে পাবে । সুনীলের ‘একা এবং কয়েকজন’ দাদা ছাপিয়েছিলেন ‘সাহিত্য প্রকাশক’ নামে প্রকাশনার নাম দিয়ে। তাই বইটা কৃত্তিবাস থেকে বেরিয়েছিল বলে আমার অবস্হানের কোনো বদল ঘটেনি । সুনীল অবশ্য হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হবার পর আমার আর দাদার কাছে কবিতা চাননি ।

সজ্জ্বল : এটা কিন্তু আজ সর্বস্তরেরই সাহিত্যপাঠক বিদিত একটি সত্য যে হাংরি আন্দোলন তাৎক্ষণিক একটা হৈচৈ পাঠকমহলে তৈরী করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত এই সাহিত্যআন্দোলন কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছিল এবং  সমাজমানসে দীর্ঘ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি । এর কারণ কী বলে মনে করেন ? অন্ত:সারশূন্যতা ?

মলয় : তোমার বোধহয় জানা নেই যে এই আন্দোলন নিয়ে বাংলা ছাড়াও অন্যান্য ভারতীয় আর বিদেশি ভাষায় গবেষণা হয়েছে আর এখনও হচ্ছে । এখনও পিএইচডি আর এমফিল করছেন অনেকে । ইতালি থেকে দানিয়েলা কাপেলো এসে তথ্য সংগ্রহ করে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ডক্টরেট করেছেন জার্মানি থেকে । ওনার গবেষণার বইটা ইংরেজিতে প্রকাশের তোড়জোড় চলছে । উনি ফালগুনী রায় সম্পর্কে বাংলায় যে প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেটা আমি ফেসবুকে শেয়ার করেছি । সম্প্রতি  ইংরেজিতে পেঙ্গুইন র‌্যাণ্ডাম হাউস থেকে মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরীর লেখা বই বেরিয়েছে ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে । রাহুল দাশগুপ্ত আর বৈদ্যনাথ মিশ্র দুজনে একটা ইংরেজি সংকলন প্রকাশ করেছেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের ছবি আঁকা নিয়ে জুলিয়েট রেনল্ডস ‘রোডস অ্যাক্রস দি আর্থ’ নামে একটা বই লিখেছেন ২০১৮ সালে । জনমানস বলতে তুমি বোধহয় কফিহাউসের আড্ডাবাজদের বোঝাতে চেয়েছো ।

সজ্জ্বল : ঠিক তা নয় । একটু আগেই এক প্রশ্নের উত্তরে আপনি বললেন “এখনকার পশ্চিমবাংলার দিকে তাকালে আমার বক্তব্যকে ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে হবে” । আপনার ওই বক্তব্যের পূর্ণ প্রতিফলন যদি আপনার কবিতা তথা সমগ্র হাংরিকবিতা হয়, তবে এখনকার পশ্চিমবাংলার পরিপ্রেক্ষিতে ‘Gungshalik school of poetry’ কে সরিয়ে ‘আমাকে তোমার গর্ভে আমারি শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও’ কিংবা ‘তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়’ –এর মতো লাইনের কবিতাধারা পুরোপুরি বা অংশতঃ কোনোভাবেই কি ধীরে ধীরে মেইনস্ট্রিম কবিতা হয়ে উঠতে পারতো না ? ঠিক যেমন ব্রিটেনে দীর্ঘদিনের রোম্যান্টিক কবিতাধারাকে ঠেলে সরিয়ে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এজরা পাউণ্ড , এলিয়ট , ইয়েটস্ – দের modern movement কবিতাধারার মেইনস্ট্রিম হয়ে উঠতে পেরেছিল , colonial literature ধারাকে পরবর্তীতে ঠেলে সরিয়ে আফ্রিকায় চিনুয়া আচেবে বা যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকায় সলমন রুশদি ও গার্সিয়া মার্কেজরা তাদের post colonial literary movement কে অনেকখানি মেইনস্ট্রিম করে যেতে পেরেছিল ? … জনমানসে প্রভাব বলতে হাংরি সম্পর্কে এটাই জিজ্ঞাস্য ।

মলয় : কবিতার মেইনস্ট্রিম সরকার আর অকাদেমির সমর্থন ছাড়া হয় না । এখন কবিতার মেইনস্ট্রিম মানে চটিচাটার দল । তবে, তার বাইরে আমাদের প্রভাব লক্ষণীয়, অন্তত ফেসবুক আর ব্লগজিনগুলোতে নজরে পড়ে । ইউরোপ আমেরিকার সঙ্গে আমাদের লিফলেট আর লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যের তুলনা করা উচিত নয় । আমার তো প্রকাশকই জোটে না । গাঙচিল নামে এক প্রকাশনার কর্ণধার বললেন, “আপনার বই কেন ছাপবো ? আপনার বই তো বুদ্ধদেব গুহর মতন বিকোবে না” । মেইনস্ট্রিম ফিকশান হতে হলে, যে বিদেশিদের নাম তুমি করলে, বড়ো প্রকাশনা দরকার, অনুবাদক দরকার, রিভিউকার দরকার । হাংরি আন্দোলনের কারোরই সেসব জোটেনি । বাংলা থেকে ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ না হলে ওনাদের মতন নজরে পড়া অসম্ভব । ইংরেজিতে অনুবাদের পরও রিভিউকারদের নজরে পড়া দরকার, নেটওয়র্কিঙ দরকার । শঙ্কর, সুনীল প্রমুখের বই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে, কিন্তু বিদেশে আলোচিত হয়নি । 

সজ্জ্বল : একবিংশ শতকের লেখক-কবিদের উপর হাংরি প্রভাব কতটা পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মলয় : এটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় । এসব গবেষকরা বলবেন ।

সজ্জ্বল : ঠিক দু’বছর আগে হাংরি পরবর্তী বাংলা কবিতার আর এক আন্দোলন ” শতজল ঝর্ণার ধ্বনি “র অন্যতম প্রধান মুখ কবি দেবদাস আচার্য এই বারাকপুর স্টেশন পত্রিকাতেই সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন ” প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা নয় , সঠিক শব্দটা বোধহয় হওয়া উচিত অপ্রাতিষ্ঠানিক ” । আপনি এই দুই শব্দের মধ্যে কোনটা পছন্দ করবেন? 

মলয় : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । উনি বোধহয় প্রতিষ্ঠান বলতে সংবাদপত্রের কথা বলতে চেয়েছেন । প্রতিষ্ঠান বলতে রাজনৈতিক দলগুলোকে, অর্থনৈতিক কঙগ্লোমারেটদেরও বোঝায় । আমি ফেসবুকে এই পোস্টটা দিয়েছিলুম, দেখেছো কিনা জানি না : “গৃহবধূর চটি মারার সাবাশি বিষয়ক: –সবচেয়ে চুতিয়া টাইপের নিরক্ষর হল রাজনৈতিকভাবে  অশিক্ষিতরা । তারা শোনে না, কথা বলে না বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে না। তারা জীবনের দাম জানে না , বাজারে জিনিসপত্রের দাম কেন বাড়ছে জানে না, কারা বাড়াচ্ছে জানে না । আলু-পটলের দাম, মাছের, আটার দাম, ভাড়া, জুতো, ওষুধের দাম, সবই নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। রাজনৈতিক নিরক্ষর  লোকগুলো এতটাই বোকা যে তারা গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলে যে তারা রাজনীতিকে ঘৃণা করে। মূর্খরা জানে না যে, তাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় পতিতা, পরিত্যক্ত সন্তান আর সর্বাপেক্ষা জঘন্য রাজনৈতিক চোর, রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির দুর্নীতিবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের কোটিপতি দোস্ত।” বিরোধিতা না করলে দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র নামের ডিকটেটরশিপে পরিণত হবে ।

সজ্জ্বল : আপনার সাহিত্য জীবনের প্রায় গোটাটাই বাংলার বাইরে কেটেছে। ২০১৩ সাল নাগাদ একবার কোলকাতায় এসে কিছুদিন এখানে থাকার চেষ্টা করেও অবশেষে ফিরে গিয়েছেন। সাহিত্য জগতে আজীবন নিঃসঙ্গতা একাকীত্ব আপনাকে কোথাও হতাশ করে? নাকি তা শাপে বর হয়েছে?

মলয় : না । কলকাতায় যতোদিন পিসেমশায় ছিলেন ততোদিন মাঝে-মাঝে গেছি । পিসেমশায় আত্মহত্যা করার পর পিসিমা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোতরঙ চলে গেলেন । কলকাতায় তো কোনও আত্মীয় স্বজন ছিল না তাই আদিবাড়ি উত্তরপাড়ার জমিদারি খণ্ডহরে গিয়ে থাকতে হতো। উত্তরপাড়ায় ইলেকট্রিসিটি আর জলের কল ছিল না, ঠাকুমার হবিষ্যি খেতে হতো, নয়তো মুড়ি-মুড়কি, সেসময়ে খাবার হোটেল ছিল না উত্তরপাড়ায় । ১৯৮৮ সালে নাকতলায় একটা ফ্ল্যাট কেনার পর নিয়মিত থেকেছি । ১৯৯৫ সালে কলকাতা অফিসে বিভাগীয় আধিকারিক হয়ে গিয়েছিলুম । ওই সময়েই দাদা হাওয়া-৪৯ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করেন । ১৯৮৮ এর আগে বারুইপুরে উত্তম দাশের বাড়িতে গিয়ে থাকতুম । ১৯৮৫ নাগাদ উত্তম আমার বেশ কয়েকটা বই প্রকাশ করেছিলেন । আমি আর উত্তম সন্ধ্যাবেলায় কেদার ভাদুড়ির ঘরে মদ খেয়ে নাচার আড্ডা জমাতুম । ওদের কাজের মাসি খুব ভালো মাছ রাঁধতে পারতেন । আসলে আমি সাহিত্যসভা বা কফিহাউসে যাতায়াত করিনি বলে তোমার মনে হচ্ছে কলকাতায় থাকিনি । কলকাতায় চাকরি করার সময়ে পুরো পশ্চিমবঙ্গে চষে ফেলেছিলুম । নামগন্ধ আর নখদন্ত উপন্যাসে সেসব অভিজ্ঞতা পাবে । নামগন্ধ উপন্যাসে আলুচাষের রাজনীতি আর নখদন্ত উপন্যাসে পাট চাষের রাজনীতি নিয়ে লিখেছি ।

সজ্জ্বল : হাংরি লেখালেখির বাইরে যে বাংলা সাহিত্য সেখানে সাহিত্যিক হিসেবে আপনার পছন্দের মানুষ কারা?

মলয় : অনেক, অনেক, অনেক । বিশেষ করে তরুণদের লেখা আমার ভালো লাগে ।

সজ্জ্বল : একজন বাংলা সাহিত্যপাঠক মলয় রায়চৌধুরীকে কীভাবে মনে রাখবে বলে আপনি মনে করেন ?

মলয় : মনে রাখার দরকার তো নেই ! দুশো-তিনশো বছর আগের কবিদের অনেককেই কেউ মনে রাখেনি, অনুসন্ধানী গবেষকরা ছাড়া ।

সজ্জ্বল : সম্প্রতি জেমস ওয়েবের টেলিস্কোপ আমাদের বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য খানিকটা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এমত পরিস্থিতিতে মলয় রায়চৌধুরীর ঈশ্বরভাবনা জানতে ইচ্ছে করে। 

মলয় : হিন্দুধর্মে ঈশ্বর বলে কিছু নেই । ওটা এসেছে ইসলাম আর খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে আর ব্রাহ্মরা তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। হিন্দুদের কাছে পৃথিবীর সব কিছুই পূজ্য । তাই আমাদের আছেন দেবী-দেবতারা । আমি কোনো কালে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করিনি, গোঁড়া সাবর্ণ রায়চৌধুরী ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্য হয়েও । জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদের বিস্ময় আর জ্ঞানের বিস্তার ঘটাচ্ছে ; ঈশ্বরের অস্তিত্বের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই ।

সজ্জ্বল : মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আপনার চেতনায় মৃত্যু কীভাবে ধরা দেয়?

মলয় : মৃত্যু সম্পর্কে ভাবার দরকার নেই । বরং অসুখে পড়লে হাসপাতালের আর দাহ করার খরচ কেমন করে মেটানো হবে সেটাই চিন্তার। 

সজ্জ্বল : দীর্ঘ বিরাশি / তিরাশি বছরের ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকালে কী মনে হয় আজ? কোনো অপ্রাপ্তির কথা মনে হয়? জীবনকে বদলে নিতে ইচ্ছে করে? 

মলয় : হ্যাঁ। বাবাকে মুম্বাই নিয়ে আসিনি বলে রিগ্রেট হয় । এখানে ওনার ভালো চিকিৎসা করাতে পারতুম । ইন ফ্যাক্ট, আমরা বুড়ো-বুড়ি মুম্বাই চলে এসেছি চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য ।

সজ্জ্বল : এই প্রজন্মের নবীন কবিকে পোড় খাওয়া বরিষ্ট কবি মলয় রায়চৌধুরী কী উপদেশ দিতে চাইবেন?

মলয় : বিন্দাস লিখে যাও । কে কী বলছে ভাবার দরকার নেই ।

সজ্জ্বল : ভালো থাকবেন মলয় দা। পত্রিকার পক্ষ থেকে আরও একবার ধন্যবাদ এবং নমস্কার জানাই।

মলয় : তুমিও ভালো থেকো, সুস্হ থেকো আর আমার অন্তত একটা উপন্যাস পোড়ো, বন্ধুদের পড়িও । তোমরা তো আমার কোনো বই পড়োনি বলে মনে হচ্ছে। তোমাদের পত্রিকাও দীর্ঘ জীবন লাভ করুক।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজল দত্ত

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজল দত্ত

বারাকপুর স্টেশন পত্রিকা থেকে নিতে চাওয়া সাক্ষাৎকারের প্রশ্নাবলী : 

সজল দত্ত: মলয়বাবু বারাকপুর স্টেশন পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রথমেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি এই সাক্ষাৎকারে সম্মত হয়েছেন এজন্য আমরা যারপরনাই উল্লসিত। শুরুতেই আপনার ছোটবেলার কথা, জন্ম, পারিপার্শ্বিক এবং বাল্যশিক্ষার বিষয়ে আমাদের যদি একটু জানান।

মলয় : প্রশ্নগুলো পাঠাবার জন্য ধন্যবাদ । কিন্তু সবকটা প্রশ্ন পড়ে বুঝতে পারলুম যে তোমরা আমার বইপত্র পড়োনি, কেননা কোনো প্রশ্নই আমার কোনো বই পড়ে করা হয়নি । আমার বাল্যস্মৃতি ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ বইয়ের চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে । সাম্প্রতিক সংস্করণ প্রতিভাসের, নাম ‘ছোটোলোকের জীবন’ । আমি জন্মেছিলুম পাটনায় সরকারি হাসপাতালে ১৯৩৯ সালে । আমরা থাকতুম ইমলিতলা নামে একটা মহাদলিত আর গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা বস্তিতে । বাবা ছিলেন কুড়িজনের পরিবারের প্রধান রোজগেরে । পরে বড়োজেঠা পাটনা মিউজিয়ামে মূর্তি আর পেইনটিঙ ঝাড়পোঁছের ক্লাস ফোরের চাকরি পান । শিক্ষা পাটনাতেই, রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে।সেখানকার গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম।

সজল দত্ত:  বাংলা সাহিত্য ও কবিতার প্রতি আপনার ভাব-ভালোবাসার শুরুয়াত হল কীভাবে?

মলয় : আমার পড়াশোনা পাটনায় হলেও, দাদা সমীর রায়চৌধুরীর চরিত্র পাড়ার প্রভাবে খারাপ হয়ে যেতে পারে আঁচ করে ওনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল । দাদা পাটনায় আসার সময়ে প্রচুর বাংলা বই আনতেন । আমি তিরিশের দশকের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হই । পাশাপাশি ইংরেজি কবিদেরও পড়া আরম্ভ করি, যাদের কবিতাপাঠ ম্যাকলে সাহেবের চাপে স্কুল আর কলেজের পাঠ্যে ঢুকেছিল । ১৯৫৯ নাগাদ বাবা একটা সুদৃশ্য ডায়েরি দিয়েছিলেন, তাতেই কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলুম ।

সজল দত্ত: আপনার দাদা আপনার সাহিত্যচর্চায় কতটা প্রভাবিত করেছেন আপনাকে?

মলয় : দাদা পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক প্রভাবে ভিন্ন চরিত্রের মানুষ ছিলেন । আমার বিপরীত । উনি ছিলেন সোফিসটিকেটেড । আমি মিশতুম পাটনার লুচ্চা-লাফাঙ্গাদের সঙ্গে। ইমলিতলায় ছোটোবেলাতেই শুয়োরের মাংস, ইঁদুর পোড়া আর তাড়ি খেয়ে ভিন্ন ধরণের জীবনে ইনিশিয়েশন হয়েছিল । ইমলিতলার বন্ধুরা আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল । দোলখেলার সময়ে পাড়ার মহিলারা যৌনতার ইনহিবিশিন বাদ দিয়ে মেতে উঠতেন রঙ খেলায় । আমার প্রথম বন্ধুনি ছিলেন কুলসুম আপা নামের এক কিশোরী, যিনি আমার সঙ্গে গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজের পরিচয় করান । ওনার সম্পর্কে মন খুলে লিখেছি বাল্যস্মৃতিতে । একজন যুবতীর যোনি উনিই প্রথম প্রত্যক্ষ আর অনুভব করতে দিয়েছিলেন।

সজল দত্ত :হাংরি আন্দোলন বিষয়ে অবহিত নন যে পাঠক তাঁদের কথা ভেবে আপনাদের আন্দোলনের পশ্চাদপট এবং শুরুর দিনগুলির কথা সংক্ষেপে  একবার আমাদের জানান । 
 
মলয় : হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে ৯৯% বাঙালি পাঠক অবহিত নন। পাঠক কেন, তরুণ কবি-সাহিত্যিকরাও জানেন না। অনেকে তো আমার নামই শোনেনি । তাই তাঁদের কথা আর ভাবি না । 

সজল দত্ত :খুব সত্যি কথা , এ’ বিষয়ে আপনিও নিশ্চয়ই অবগত আছেন ,  ক্ষুধার্ত আন্দোলনের অনুসারীদের কেউ কেউ মনে করতেন যে আপনিই এই আন্দোলনকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন! আপনার কী বক্তব্য ? 

মলয়: আমি আর ছুরি মারব কেমন করে ? আমার বিরুদ্ধে মামলা চলেছিল ৩৫ মাস। বন্ধুরা বেশির ভাগ রাজসাক্ষী হয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশে বয়ান দিয়েছিল আর কেটে পড়েছিল । সাক্ষী হবার জন্য আদালতের ট্রেজারি থেকে টাকাও পেয়েছিল । এইসমস্ত বন্ধুদের ঘৃণ্য মনে হয়েছিল। হাইকোর্টে মামলা জেতার পর ঘেন্নায় আমি এদের সংস্পর্শ ত্যাগ করে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম । সৌভাগ্যবশত পাটনায়  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ব্যাঙ্কনোট পোড়ানোর চাকরি ছেড়ে এআরডিসিতে গ্রামীণ উন্নয়ন আধিকারিকের চাকরি পেয়ে লখনউ চলে যাই । নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে টের পাই যে চাষবাস, পশুপালন, জলসেচ, গ্রামজীবন সম্পর্কে কিচ্ছু জানি না । এই সমস্ত বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা আরম্ভ করতে হয়েছিল । সাহিত্যের বই পড়া আপনা থেকেই পেছনে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিলুম । তবে সরকারি চাকরি ছাড়ার ফলে এখন আমার পেনশন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পিওনের চেয়েও কম ।

সজল দত্ত: ক্ষুধার্ত মানে প্যাটের না চ্যাটের ক্ষুধা? আপনার সম্পূর্ণ সাহিত্যযাপন অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ করলে এই প্রশ্ন কিন্তু বহুপাঠকের ভেতরে অবধারিতভাবে উঠে আসবেই  মলয় বাবু, আপনার কবিতা কি আদৌ বুভুক্ষুদের কথা বলে নাকি অহৈতুকী যৌনক্ষুধাকে গুরুত্ব দ্যায়?

মলয় : কী আর বলি ? আমার লেখাপত্র তো পড়ো না । পড়লে জানতে হাংরি শব্দটা কোথা থেকে পেয়েছিলুম । আর আন্দোলনের তাত্বিক বনেদ কী ছিল । আমি ক্ষুধা শব্দটা ব্যবহার করিনি । চিরকাল হাংরি শব্দটাই ব্যবহার করেছি । হাংরি’ শব্দটা প্রথমে পেয়েছিলুম কবি জিওফ্রে চসারের ‘In Swore Hungry Time’ বাক্যটি থেকে। আর আন্দোলনের তত্ত্ব গড়েছিলুন অসওয়াল্ড স্পেঙ্গলারের লেখা ‘The Decline of the West’ বইটি থেকে। স্পেঙ্গলারের এই তত্ত্বটির সারমর্ম হলো: কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না| যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন।”এই হাঙ্গার  শুধু আক্ষরিক অর্থেই হাঙ্গার ছিল না। তা ছিল সাহিত্যে মনের ভাব প্রকাশের হাঙ্গার, যথার্থ শব্দ প্রয়োগের,, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষার হাঙ্গার। আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালীর আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। আমার মনে হয়েছিল যে কিছুটা হলেও এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার,আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন। অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে আমি হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চেয়েছিলুম। এখনকার পশ্চিমবাংলার দিকে তাকালে আমার বক্তব্যকে ভবিষ্যৎবাণী বলে মনে হবে ।

সজল দত্ত :রমানাথ রায় এবং শম্ভু রক্ষিতের কবিতা বিষয়ে আপনার কি মত?

মলয় : রমানাথ রায় তো কবিতা লিখতেন না ! শম্ভু রক্ষিত সম্পর্কে আমি বিস্তারিত লিখেছি। নেটে পাবে প্রবন্ধটা ।

সজল দত্ত: ক্ষুধার্ত আন্দোলনের সর্বাপেক্ষা গভীরতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী  কবি কে বা কে কে? কার কার নাম করবেন ? 

মলয়: শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, শম্ভু রক্ষিত । আমি এনাদের সবায়ের সম্পর্কে লিখেছি । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার মূল্যায়ন আমিই প্রথম করেছিলুম, কিন্তু উনি যতোদিন বেঁচেছিলেন আমাকে গালমন্দ করে গেছেন, এমনকী নিজের মেয়েকেও বলে গিয়েছিলেন যে উনি মারা যাবার পর ওনার মেয়ে যেন তা বজায় রাখেন । হয়তো ওনার নাতিও বড়ো হয়ে তা বজায় রাখবে ।

সজল দত্ত:খুব স্পষ্ট এবং খোলাখুলিভাবে জানতে চাইছি মলয়দা , ক্ষুধার্ত আন্দোলনের ভাষাতেই জানতে চাইছি , জীবনের এই প্রান্তবেলায় দাঁড়িয়ে আপনি কী মনে করেন ? তরুণ হাংরি কবি মলয় রায়চৌধুরীর ” প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ” তদানীন্তন থেকে প্রবহমান বাংলা কবিতায় আদৌ কিছু কী ‘ ছিঁড়তে ‘ পেরেছিল , বা পারল ? 

মলয় : এটা বাঁকবদলের কবিতা । অনেকে বুঝতে পারেনি ‘ছুতার’ শব্দটা কিসের দ্যোতক ! এই কবিতার প্রভাবে বাংলা কবিতার শব্দভাঁড়ারে অভূতপূর্ব সদবদল ঘটে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শব্দভাঁড়ারকে বর্জন করার ফতোয়া ছিল কবিতাটা । দানিয়েলা কাপেলো আর শীতল চৌধুরী এই কবিতাটার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বাংলা কবিতায় কেমন প্রভাব ফেলেছে । দানিয়েলার বিশ্লেষণ পাবে অ্যাকাডেমিয়ার সাইটে । শীতল চৌধুরীর প্রবন্ধটা নেট সার্চ করলেই পাবে ।

সজল দত্ত: এটা কিন্তু আজ সর্বস্তরেরই সাহিত্যপাঠক বিদিত একটি সত্য যে  ক্ষুধার্ত আন্দোলন তাৎক্ষণিক একটা হৈচৈ পাঠকমহলে তৈরী করতে সক্ষম হলেও  শেষ পর্যন্ত এই সাহিত্যআন্দোলন কিন্তু মুখ থুবড়ে পরেছিল এবং  সমাজমানসে দীর্ঘ কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি । এর কারণ কী বলে মনে করেন ? অন্ত:সারশূন্যতা ?

মলয় : তোমার বোধহয় জানা নেই যে এই আন্দোলন নিয়ে বাংলা ছাড়াও অন্যান্য ভারতীয় আর বিদেশি ভাষায় গবেষণা হয়েছে আর এখনও হচ্ছে । এখনও পিএইচডি আর এমফিল করছেন অনেকে । ইতালি থেকে দানিয়েলা কাপেলো এসে তথ্য সংগ্রহ করে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ডক্টরেট করেছেন জার্মানি থেকে । ওনার গবেষণার বইটা ইংরেজিতে প্রকাশের তোড়জোড় চলছে । উনি ফালগুনী রায় সম্পর্কে বাংলায় যে প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেটা আমি ফেসবুকে শেয়ার করেছি ।সম্প্রতি  ইংরেজিতে পেঙ্গুইন র‌্যাণ্ডাম হাউস থেকে মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরীর লেখা বই বেরিয়েছে ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে । রাহুল দাশগুপ্ত আর বৈদ্যনাথ মিশ্র দুজনে একটা ইংরেজি সংকলন প্রকাশ করেছেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের ছবি আঁকা নিয়ে জুলিয়েট রেনল্ডস ‘রোডস অ্যাক্রস দি আর্থ’ নামে একটা বই লিখেছেন ২০১৮ সালে । জনমানস বলতে তুমি বোধহয় কফিহাউসের আড্ডাবাজদের বোঝাতে চেয়েছো ।

সজল দত্ত :একবিংশ শতকের লেখক-কবিদের উপর হাংরি প্রভাব কতটা পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মলয় : এটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় । এসব গবেষকরা বলবেন ।


সজল দত্ত: ঠিক দু’বছর আগে হাংরি পরবর্তী বাংলা কবিতার আর এক আন্দোলন ” শতজল ঝর্ণার ধ্বনি “র অন্যতম প্রধান মুখ কবি দেবদাস আচার্য এই বারাকপুর স্টেশন পত্রিকাতেই সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন ” প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা নয় , সঠিক শব্দটা বোধহয় হওয়া উচিত অপ্রাতিষ্ঠানিক ” । আপনি এই দুই শব্দের মধ্যে কোনটা পছন্দ করবেন?

 মলয় : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । উনি বোধহয় প্রতিষ্ঠান বলতে সংবাদপত্রের কথা বলতে চেয়েছেন । প্রতিষ্ঠান বলতে রাজনৈতিক দলগুলোকে, অর্থনৈতিক কঙগ্লোমারেটদেরও বোঝায় । আমি ফেসবুকে এই পোস্টটা দিয়েছিলুম, দেখেছো কিনা জানি না : “গৃহবধূর চটি মারার সাবাশি বিষয়ক: –সবচেয়ে চুতিয়া টাইপের নিরক্ষর হল রাজনৈতিকভাবে  অশিক্ষিতরা । তারা শোনে না, কথা বলে না বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে না। তারা জীবনের দাম জানে না , বাজারে জিনিসপত্রের দাম কেন বাড়ছে জানে না, কারা বাড়াচ্ছে জানে না । আলু-পটলের দাম, মাছের, আটার দাম, ভাড়া, জুতো, ওষুধের দাম, সবই নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। রাজনৈতিক নিরক্ষর  লোকগুলো এতটাই বোকা যে তারা গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলে যে তারা রাজনীতিকে ঘৃণা করে। মূর্খরা জানে না যে, তাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় পতিতা, পরিত্যক্ত সন্তান আর সর্বাপেক্ষা জঘন্য রাজনৈতিক চোর, রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির দুর্নীতিবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের কোটিপতি দোস্ত।” বিরোধিতা না করলে দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র নামের ডিকটেটরশিপে পরিণত হবে ।

সজল দত্ত :একজন বাংলা সাহিত্যপাঠক মলয় রায়চৌধুরীকে কীভাবে মনে রাখবে বলে আপনি মনে করেন ?

মলয়: মনে রাখার দরকার তো নেই ! দুশো-তিনশো বছর আগের কবিদের অনেককেই কেউ মনে রাখেনি, অনুসন্ধানী গবেষকরা ছাড়া ।

সজল দত্ত: সম্প্রতি জেমস ওয়েবের টেলিস্কোপ আমাদের বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য খানিকটা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এমত পরিস্থিতিতে মলয় রায়চৌধুরীর ঈশ্বরভাবনা জানতে ইচ্ছে করে। 

মলয় : হিন্দুধর্মে ঈশ্বর বলে কিছু নেই । ওটা এসেছে ইসলাম আর খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে আর ব্রাহ্মরা তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। হিন্দুদের কাছে পৃথিবীর সব কিছুই পূজ্য । তাই আমাদের আছেন দেবী-দেবতারা । আমি কোনো কালে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করিনি, গোঁড়া সাবর্ণ রায়চৌধুরী ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্য হয়েও । জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদের বিস্ময় আর জ্ঞানের বিস্তার ঘটাচ্ছে ; ঈশ্বরের অস্তিত্বের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই ।

সজল দত্ত: মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আপনার চেতনায় মৃত্যু কীভাবে ধরা দেয়?

মলয় : মৃত্যু সম্পর্কে ভাবার দরকার নেই । বরং অসুখে পড়লে হাসপাতালের আর দাহ করার খরচ কেমন করে মেটানো হবে সেটাই চিন্তার। 

সজল দত্ত :দীর্ঘ বিরাশি / তিরাশি বছরের ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকালে কী মনে হয় আজ? কোনো অপ্রাপ্তির কথা মনে হয়? জীবনকে বদলে নিতে ইচ্ছে করে? 

মলয় : হ্যাঁ। বাবাকে মুম্বাই নিয়ে আসিনি বলে রিগ্রেট হয় । এখানে ওনার ভালো চিকিৎসা করাতে পারতুম । ইন ফ্যাক্ট, আমরা বুড়ো-বুড়ি মুম্বাই চলে এসেছি চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য ।

সজল দত্ত: এই প্রজন্মের নবীন কবিকে পোড় খাওয়া বরিষ্ট কবি মলয় রায়চৌধুরী কী উপদেশ দিতে চাইবেন?

মলয় : বিন্দাস লিখে যাও । কে কী বলছে ভাবার দরকার নেই ।

সজল দত্ত: ভালো থাকবেন মলয় বাবু। পত্রিকার পক্ষ থেকে আরও একবার ধন্যবাদ এবং নমস্কার জানাই।

মলয় : তুমিও ভালো থেকো, সুস্হ থেকো আর আমার অন্তত একটা উপন্যাস পোড়ো, বন্ধুদের পড়িও । তোমরা তো আমার কোনো বই পড়োনি বলে মনে হচ্ছে। তোমাদের পত্রিকাও দীর্ঘ জীবন লাভ করুক।







Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অভিজিত পাল

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অভিজিত পাল

অভিজিত :—জানলা দিয়ে কি দেখছেন ? বৃষ্টি ? বর্ষা ?

মলয়:—না, না, বর্ষাকাল উপভোগ করতে হয়  বৃষ্টিতে ভিজতে -ভিজতে নদীগুলোয় । দিনের বেশ, মতন বৃষ্ট ভিজ । শহরে বৃষ্টির শব্দ বেশ ভালগার আর, ধানখেতে বা জঙ্গলে বৃষ্টি তার নিজের শব্দকে নষ্ট হতে দেয় না, ভারজিন শব্দ শুনতে পাওয়া যায় ।

অভিজিত:—তাহলে ?

মলয়:—না, দেখছি সামনের ওই গাছটা একবছরেই শুকিয়ে মরে গেল ।

অভিজিত :—তার জন্য কষ্ট ?

মলয় :—কষ্ট ? নাহ । বৃষ্টিও তো দিনকতক হল পড়ছে না । বর্ষাকাল বলে গাছটার শব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । ছাল-চামড়া উঠে গেছে । গাছটা আমার জন্যেই মরে গেল ।

অভিজিত:—আপনার জন্যে ? বিষ দিয়েছিলেন নাকি ? গাছ মারার তো মাফিয়া আছে । কর্পোরেশানের আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেদের টাকা খাওয়ায়, তা সে তো কোনো হোর্ডিঙের বা ব্যানারের বিজ্ঞাপনকে যদি আড়াল করে, তাহলে ; কিংবা কোনো বড়ো দোকানের শোরুমের সামনে থাকলে। এই গাছ তো আপনাদের আবাসনের চৌহদ্দিতে রয়েছে, কোনো বিজ্ঞাপনের ফলাও করা নিয়নসাইনও নেই , আপনাদের বিলডিঙের তলায় মোটরগাড়ির বা মহিলাদের পোশাকের শোকেসও নেই । 

মলয়:—এই গাছটা কোনো জংলি গাছ, নাম জানি না ; গোলাপি রঙের ফুল হতো বসন্তকালে, থোকা-থোকা, দেখতে সুন্দর, কিন্তু সেই ফুলগুলো থেকে প্রচুর পরাগ উড়তো একটু হাওয়া দিলেই, আর আমার হাঁপানি, সব জানলা-দরোজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, বেড়ে যেতো, দুবেলা ফোরমোস্ট ফোর হানড্রেড ইনহেল করতে হতো । বছর পঞ্চাশ আগে এটা জঙ্গল ছিল, শহর এগিয়ে এসে দখল করে ফেলেছে ।

অভিজিত:—তাই গাছটার মৃত্যু চাইছিলেন ?

মলয়—আমি চাইনি তো । আমার সঙ্গে শত্রুতা করলেই, কেবল মানুষ নয়, গাছপালা আর প্রাণীরাও মারা যায় । অথচ আমি কারোর সঙ্গে কখনও শত্রুতা করিনি । আমি চাইনি গাছটা মরে যাক । শত্রু বলা বোধহয় উচিত হল না, ইনটিমেট এনিমিজ বললে ভালো হয় ।

অভিজিত:—তাহলে ছয় তলায় দাঁড়িয়ে জানলা দিয়ে কি দেখছিলেন, ওই মরা গাছ ? ওটা তো বছরখানেক হল মরে গেছে বলছেন ।

মলয়:—গাছটা মারা যাবার দরুণ পায়রাদের সঙ্গমের সুবিধা হয়ে গেছে ।

অভিজিত:—পায়রাদের সঙ্গম দেখছিলেন ?

মলয়:—ঠিক সঙ্গম নয়, দেখছিলুম যে পুরুষ পায়রা প্রতিবার সঙ্গম করছে আর ডালের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত নেচে আসছে, গর্বের সঙ্গে ঘাড় নাড়াচ্ছে । মাদি পায়রাটাও একটু খেলিয়ে নিচ্ছে । মানুষ অমন করে না, তার কারণ পুরুষ মানুষের অমন পায়রাক্ষমতা নেই, একবারেই কেলিয়ে পড়ে, তারপর আবার দম নিয়ে পায়রাবাজি করতে হয় । মানুষকে কেন এমন দুর্বল করে দেয়া হয়েছে, তা এখনকার গণধর্ষণ, সোলোধর্ষণ, গ্রুপধর্ষণ, মেঠোধর্ষণ, মাচাধর্ষণ  ইত্যাদি দুঃসংবাদ থেকে আঁচ করতে পারি । মানুষকে সিংহের ক্ষমতা দিলে তারা ওই কাজকেই শিল্প বলে চালাতো । শিল্প নামের ভাঁওতাটাকে মানুষ বড়ো ভালোবাসে । 

অভিজিত:—সিংহের কথা বলছিলেন যে ?

মলয়:—হ্যাঁ, সিংহেরা পনেরো মিনিট অন্তর করে । ইম্যাজিন, পনেরো মিনিট অন্তর !

অভিজিত:—আপনার আপশোষ হচ্ছে যে অমন সিংহত্ব আপনি পাননি । আপনি তো সিংহরাশি !

মলয়:—যখন যোয়ান ছিলুম তখন হতো বটে ; এখন তো বুড়িয়ে গেছি । এমনিতেই হাঁপানি হয়, পনেরো মিনিট অন্তরের ব্যাপার হলে ফুসফুস গলার কাছে উঠে আসতো ; অবশ্য ছোটোবেলায় বাবা যদি সুন্নৎ করিয়ে দিতেন, তাহলে মনে হয় এলেমটা সময় বাড়িয়ে দিতে পারতো । যাকগে, পায়রাদের কথায় আসুন । পায়রা হল এই শহরের প্রাণী, যে পাড়াতেই যান, ঝাঁক-ঝাঁক পায়রা দেখতে পাবেন । অন্য ভারতীয়  শহরে এমন গোলা পায়রার পপুলেশান পাবেন না । সব শহরেরই নিজস্ব প্রাণী থাকে, সেখানকার মানুষেরা সেই প্রাণিদের চরিত্র পায়, প্রাণী না বলে রাজ্যেশ্বর-রাজ্যেশ্বরীও বলতে পারেন । এখানকার কবি আর ছবি আঁকিয়েদের দেখুন, পায়রা । ঝাঁকের মধ্যে জোড়ায়-জোড়ায় ; পায়রার তো সিংহদের মতন আলফা মেল নেই । দুটো পুংপায়রা গুঁতোগুঁতি করে ডিসাইড করে মাদি পায়রাটাকে কে পাবে; মাদি পায়রাটা আবার পরের গুঁতোগুঁতিতে জেতা পুংপায়রার সোহাগ খেতে ঢলে পড়ে । কবিতার চরিত্রও পায়রাদের মতন, দেখে বুঝতে পারবেন না কোন পায়রাটাকে সকালে সঙ্গম করতে দেখেছিলেন ।

অভিজিত:—পায়রা ছাড়াও ইঁদুর তো প্রচুর এই শহরে ? বেরালের সঙ্গে তারা যুঝে যায়, এমন তাদের সাইজ ।

মলয়:—হ্যাঁ, এই ইঁদুরগুলো পায়রাদের আক্রমণ করে, খায় । কর্পোরেশানের ইঁদুর মারার কর্মচারী আছে । এই বছর তারা নাকি প্রায় তিন লাখ ইঁদুর মেরেছে ; বর্ষায় ইঁদুরগুলোর জন্যে লেপ্টোস্পিরোসিসে প্রতিবছর শতখানেক লোক মারা যায় । ইঁদুরকেও প্রতিনিধিত্বকারী দেবী-দেবতার সিংহাসন দেয়া যায় পায়রাদের পাশাপাশি । জৈন আর গুজরাতি দোকানদাররা ইঁদুরগুলোকে মারে না ; তার ওপর প্রতিদিন আট হাজার টন জঞ্জাল খেয়ে ইঁদুরগুলোর সাইজ বেড়েই চলেছে, এই শহরের বৈভবশালীদের মতন ।

অভিজিত:—পায়রাগুলো ঘরের ভেতরে যাতে না ঢুকতে পারে, ঘরের ভেতরে পিজনসেক্স করতে না পারে, তাই জানলায় গ্রিলমেশ লাগিয়েছেন ? পায়রাদের কারণে অ্যালার্জি হচ্ছিল বলে ? কিন্তু পায়রা তো শান্তির প্রতীক। 

মলয়:—গ্রিলমেশ বিল্ডারের বসানো । শান্তির প্রতীক ছিল হয়তো এককালে ; এখন স্হানীয় লোকেরা অসৎ কাজকে বলে ‘ফাকতা ওড়ানো’ বা পায়রা ওড়ানো ; সম্ভবত মাগিবাজি করা থেকে এসেছে উক্তিটা । তবে পায়রা ঘরে ঢুকে পড়লে হয়তো নিজেই বসাতুম । তা ওদের সঙ্গমে বাগড়া দিতে নয় । ওরা তো দুই ইঞ্চ জায়গা পেলেও চট করে সেক্স সেরে নিতে পারে । হাঁপানিতে কাহিল হয়ে গেছি ।

অভিজিত:—আপনি কি নিজেকে কখনও প্রশ্ন করে দেখেছেন যে আপনার শরীরের যাবতীয় রোগের, ইনক্লুডিং হাঁপানি, আসলে যৌবনে বেহিসাবি জীবনযাপনের কারণে ঘটেছে । যে সমস্ত মাদক নিতেন তা তো শ্বাসকে প্রভাবিত করে দেহের ভেতরে পৌঁছে প্রতিক্রিয়া ঘটানোর জন্য । নয়কি ? তখনকার বেলেল্লাপনার মাশুল দিচ্ছেন বলে মনে হয় না ?

মলয়:—বলা কঠিন । হাঁপানির ডাক্তারকে বলেছিলুম আমার মাদকপ্রিয় যৌবনের কথা । উনি বললেন,  ধোঁয়ার কারণে আমার ফুসফুস আর হার্ট প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে । আমার হাঁপানির কারণ, ওনার মতে, সুগন্ধ । আমার শরীর সুগন্ধ সহ্য করতে পারে না । উনি ফুল শুঁকতে, যে ফুলেরা পরাগ ছড়ায় তাদের কাছে যেতে, সুগন্ধি সাবান আর পাউডার মাখতে, দেহে আর পোশাকে পারফিউম লাগাতে, রুম ডেওডোরেন্ট ব্যবহার করতে,  বারণ করেছেন । এমনকি রান্নার সময়ে ফোড়নের গন্ধ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন । ফুসফুস ভালোই আছে, অকসিজেন ইনটেক চেক করিয়ে দেখেছি । দ্বিতীয়ত আমার গা থেকে হরমোনের তিতকুটে গন্ধ বেরোয়না বলে আমায় পারফিউম ব্যবহার করতে হয় না । লিফটে অনেকসময়ে যুবতীদের গা থেকে একই সঙ্গে তিতকুটে হরমোনের দুর্গন্ধ, আর তার ওপর চাপানো বডি ডিওডেরেন্টের সুগন্ধ আমায় হাঁচিয়ে-হাঁচিয়ে কাহিল করে দেয় বেশ ; তরুণী দেখলে এড়িয়ে গিয়ে বলি, আপনি যান, আমি পরে যাবো । এই জন্যে কাঠমাণ্ডুতে হিপিনীদের আমার ভালো লাগতো ; ওরা দিনের পর দিন স্নান করতো না, গা থেকে স্বাভাবিক নারীগন্ধ পেতুম ।

অভিজিত:—একটু আগে বলছিলেন, আপনার সঙ্গে যারা ইনটিমেট শত্রুতা করে তারা মরে যায় ? আপনি কি তার জন্য অনুতপ্ত বোধ করেন ?

মলয়:—নাহ, করি না । কারণ যারা মারা যায় তারা নিজের দোষেই মরে, আমার উপস্হিতি তাদের জীবনে আপনি  পাবেন না । যেমন এই গাছটা । আমি কিছুই করিনি, অথচ মরে গেল । গাছটাকে সারা বছর পছন্দ করতুম ওর সবুজের কারণে, কতোরকম সবুজ ছিল গাছটার স্টকে, প্রচণ্ড বৃষ্টি হলে বাফারের কাজ করতো, সামুদ্রিক ঝড়গুলোকে সামলাতো । কিন্তু বাধ সাধল ওর অত্যাকর্ষক ফুল আর তার সুগন্ধজনিত পরাগ ।

অভিজিত:—আরও উদাহরণ আছে ?

মলয়:—হ্যাঁ, ইনটিমেট বন্ধুবান্ধব যারা শত্রুতা করেছিল, এমনকি অগ্রজ সাহিত্যিকরা, তারাও একে-একে মারা গেল । অনেক সময়ে পরিচিত  ইনটিমেট কেউ মারা গেলে, অমি দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই, ভাবি যে, ইনি কি আমার সঙ্গে শত্রুতা করেছিলেন, যে মারা গেলেন ? ব্যাপারটা অদ্ভুত, কেননা আমি তো শত্রুতা করিনি, করছি না, কারোর সঙ্গে, কেনই বা করব । তারা করছে, তারা মারা পড়ছে । আমি প্রথম যে চাকরিটার ইনটারভিউ দিতে যাচ্ছিলুম, তা ছিল লেকচারারের । যাবার সময় একটা কাক গাছ থেকে হেগে দিয়েছিল আমার শার্টে ; উড়ে যেতে গিয়ে কাকটা ইলেকট্রিকের তারে ঠেকে গিয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তার ওপর , অথচ কাকেরা সাধারণত ইলেকট্রিকের তার এড়িয়ে ওড়ে। তারপর থেকে আমি লেকচারারের আর স্কুল শিক্ষকের জন্য আর দরখাস্ত দিইনি ।

অভিজিত:—আপনার মস্তিষ্কে এই দুর্ভাবনা এলো কোথ্থেকে ?

মলয়:—আমি একবার গোরখপুরে ট্যুরে গিয়েছিলুম । সহযোগী আর স্হানীয় হোস্ট নিয়ে গেলেন গোরখনাথ মন্দিরে, ওই যেখানে পূণ্যার্থীরা ত্রিশূল দেয় পুজোয় । সেখানের চত্তরে একজন নোংরা জটাধারী সাধু হঠাৎ আমায় জড়িয়ে ধরে, মুখে দাড়ি ঘষে বলেছিল, “তোর সঙ্গে যে শত্রুতা করবে সে তোর আগে মরে যাবে।”

অভিজিত:—আপনি এই সব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন ?

মলয়:—করি না, তবে মৃত্যুর ব্যাপারে দেখছি, এই ব্যাপারটা হ্যারি পটারীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

অভিজিত:—মৃত্যু নিয়ে কবিতা লেখেননি কেন এখনও ?

মলয়:—যাঁরা জানেন যে তাঁরা কালক্রমে অমর হবেন, তাঁরা সাধারণত লেখেন । খ্রিস্টধর্মীদের মধ্যে এপিটাফ লেখার চল আছে । সেই দেখাদেখি হয়তো আমাদের কবিরা মৃত্যুবোধ এনেছেন । আমি তো জানি আমি নশ্বর, তাই লিখিনি । তবে শবযাত্রা নিয়ে লিখেছি । একটা কবিতা লেখার ইচ্ছে আছে, সেটাও আমার শব নিয়ে । আমার অনুমান যে আমি এই ফ্ল্যাটটায় মরে পড়ে থাকবো, লোকে পচা গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেবে, পুলিশ এসে দরোজা ভেঙে দেখতে পাবে যে শবেতে ম্যাগটস ধরে গেছে আর তারা আমার পচা মাংস খেয়ে কিলবিল করছে । মানে, আমার মৃতদেহ থেকেও প্রাণের উদ্ভব সম্ভব । 

অভিজিত:—তা লিখে ফেললেন না কেন ?

মলয়:—ম্যাগটের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাইনি এখনও ।

অভিজিত:—সব শহরের নিজস্ব প্রাণী থাকে বলছিলেন, আর সেই প্রাণীরা সেই শহরের চরিত্র নির্ণয় করে, সাহিত্যের গতিপ্রকৃতির ঝোঁক গড়ে তোলে, কবি-শিল্পীরা তাদের চরিত্র পায়, মুম্বাইয়ের অভিনেতা-শিল্পী-কবিরা যেমন ইঁদুর আর পায়রার চরিত্র পেয়েছে, বলছিলেন । আপনার শৈশবের ইমলিতলায় কোন প্রাণী ছিল ?

মলয়:—বিহারের পাটনা শহরের কথা বলছেন ? ইমলিতলার বাড়িতে বাঁদর আসতো, লালমুখো-লালপোঁদ বাঁদর, যাদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানুষ, ওষুধ আর রোগের কারণ-নিদান আবিষ্কার করে । বাঁদরদের ব্যবহার করা হয়, মেরে ফেলা হয়, রোগে ভোগানো হয়, যাতে মানুষেরা ভালোভাবে বাঁচতে পারে । তারা অনেকটা কবিতার মতন রক্ত ঝরায়, কান্নাকাটি করে, ব্যথার সময়ে নিরাময়ের অভয় দেয়, দাঙ্গা আর যুদ্ধের সময়ে কাজে লাগে, তাদের পেট চিরে স্লোগান বের করা যায় ; তারা নিজেদের সমাজে সামাজিক প্রাণী, একে আরেকজনকে চুমু খায়, উকুন বেছে দেয় ; তারা একে আরেকজনকে বড়ো একটা খুন করে না যদি না তা দুজন আলফা মেলের জিজান লড়াই হয়, একপাল মাদি বাঁদর দখলের জন্যে । ওখানকার রাজনীতিকদের দেখুন, মেলাতে পারবেন । এক জাতের বাঁদরের সঙ্গে আরেক জাতের বাঁদরের তফাত বজায় রাখার চেষ্টা করে যায় তার আলফা গোষ্ঠীপতি ।

অভিজিত:—কিন্তু আপনি যা বলছেন তা তো অন্য রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোয্য ।

মলয়:—ওই যে বললুম, বাঁদর নানা জাতের হয় । ভারতে নাকি সাত রকমের বাঁদর আর ছয় রকমের হনুমান হয় । বাঁদরগুলো আপনি জানেন নিশ্চয়ই : রেসাস ম্যাকাক, বনেট ম্যাকাক, আসাম ম্যাকাক, অরুণাচল ম্যাকাক, বেঁটেলেজ ম্যাকাক, সিংহলেজ ম্যাকাক আর শুয়োরলেজ ম্যাকাক । আপনি খুঁজলেই এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভারতীয় রাজ্যগুলোর মানুষে পাবেন । এদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা আছে । আপনি একে ঠাট্টা-ইয়ার্কি বলে মনে করবেন না ।

অভিজিত:—যারা আলফা হতে পারে না সেই সব বাঁদরেরা কি স্বমেহন করে ?

মলয়:—হ্যাঁ, এছাড়া আর উপায় কি বলুন ? স্বমেহন ছাড়া পুংবাঁদেরেরা পরস্পরকে ধর্ষণ করে, যাতে পরবর্তীকালে আলফা হয়ে উঠলে যন্তরটা অকেজো না হয়ে পড়ে ।

অভিজিত:—বাঁদরদের কি নাইটফল হয় ?

মলয়:—হয় না বলেই তো জানি । কিন্তু হওয়া তো উচিত । পুরুষমানুষের নাইটফল হয় শুক্রকীটগুলো মরে গেলে তাদের জেটআউট করার জন্য, স্টকে নতুন শুক্রকীট আনার জন্য । মানুষের যখন হয় তখন প্রাইমেটদেরও হওয়া উচিত ।

অভিজিত:—নাইটফল নিয়ে কবিতা লেখেননি ?

মলয়:—না, লেখা হয়নি । প্রেমিকার জন্য প্রেমের কবিতা লেখার দিকে খেয়াল যেতো । তবে আমার এক পাঠিকা, যিনি ‘মায়াজম’ নামে একটি ওয়েব পত্রিকা চালান, তিনি নাইটফল নিয়ে একটা অসাধারণ কবিতা লিখেছেন । তাঁর নাম সোনালী মিত্র । কবিতাটার নাম ‘নাইটফল অথবা সমুদ্রযাত্রা’ । পড়ে দেখুন :

তখন রাতগুলো পরী-ভালোবাসায় ভরপুর

হরিদার চায়ের দোকানে সন্ধ্যায় ফেলে আসা

মিঠু বউদি আর ঝিলিক সেনের দুই চাঁদ

রাতে নাড়িয়ে দিলে গো । ঘুম, ঘুম  আসে না

অস্হির, বুকের ভিতরের হ্যাংলা কুকুরটা বনেদি নয়

ঠিক, ঠিক যেন ভাদ্রের মতো অবস্হান

আর কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল মিঠু না ঝিলিক সেনের বুকে

বুঝলাম না……

আর নাভি খাচ্ছে, আর কোমর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে দাঁতে

দরদর ঘাম ভিজে উঠছে গা

থামবে না, এ-খাওয়া থামবে না

সমস্ত বেডকভার ড্রেনড্রাইট চটচটে, আহা মায়াবী আঠা

ক্রমশ কুকুরের গা-মোচড়ানো শিথিল হয়ে ওঠে

ঘুম, ঘুম, ঘুম

সকালে ভুলে যায় আস্ত একটা কুকুর নিয়ে আমার রাতের সংসার

কেননা তখন আমাদের রাত্রির বুকে অবিবাহিতকলা

কেননা তখন পায়জামার অন্ধকারে হাজার ওয়াট

তখন আমার নিজস্ব রাতের নাম ছিল

নাইটফল মেমারি

অভিজিত:—তরুণীরা এই ধরণের কবিতা লিখতে পারছেন । আপনার কি মনে হয় যে আপনারা, মানে হাংরি আন্দোলনকারীরা,  ততোটা বোল্ড হতে পারেননি, যতোটা এখনকার যুবক-যুবতীরা পারছেন ।

মলয়: —প্রতিদিনের জীবনযাপন আমার ভিন্ন ছিল । আমি তো আদপে একজন কালচারাল বাস্টার্ড । এখনকার তরুণ-তরুণীরা কবিতা লেখার সঙ্গে আমার মতন খোট্টাই জীবনযাপনকে মেলাতে চান না কিংবা হয়তো পারেন না । ইমলিতলায় বসবাসের ফলে আমার চরিত্রে বহু অবাঙালি বৈশিষ্ট্য বাসা বেঁধে ছিল, যাকে কেউ বলত বোহেমিয়ান, কেউ বলত ভ্যাগর‌্যান্ট ইত্যাদি । আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে বুঝতে পারবেন । আমি বাড়ি থেকে কয়েকবার পালিয়ে গিয়েছিলুম স্কুলে পড়ার সময় ।

অভিজিত:—আপনার বইগুলোয় এই “ছোটোলোক” শব্দটা জুড়ে দেন কেন ?

মলয়:—ইমলিতলা পাড়াটাকে স্হানীয় বাঙালিরা বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া ; তাঁরা সাধারণত আমাদের বাড়িতে আসতেন না, এমনকি আমার স্কুলের বন্ধুরাও আসতো না, বলতো, শালা, তুই ওই ছোটোলোকদের পাড়ায় ক্রিমিনালদের সঙ্গে থাকিস ? পরে বাবা দরিয়াপুরে বাড়ি করলে আমাদের গা থেকে ছোটোলোক খেতাবটা খসে । কিন্তু মগজের ভেতরের ছোটোলোকটা তার ছোটোলোকমি নিয়ে রয়ে গেছে ।

অভিজিত:—আমার ধারণা ছিল নিজের যৌবলাম্পট্যকে তুলে ধরার জন্য ছোটোলোক শব্দটার প্রয়োগ ।

মলয়:—যৌবলাম্পট্য বলতে যা বোঝাতে চাইছেন, তেমনভাবে যৌবন কাটাইনি আমি । আমি লম্পট ছিলুম না কখনও, যদিও আমার এক প্রেমিকা আমাকে লেচার বলে ঘোষণা করেছিলেন । অথচ সে নিজেই আমাকে লাথি মেরে চলে গিয়েছিল ।

অভিজিত:—তারপর ?

মলয়:—তারপরও আমি কখনও ফার্স্ট মুভ করিনি । প্রেমিকারা করেছিল ।

অভিজিত:—প্রেমে টেকেননি তার মানে ?

মলয়:—অনেক কারণে ছাড়াছাড়ি হয়েছে । আমিও ছেড়েছি, ঠিকই, একজনকে তার সুগন্ধ বিলাসীতার জন্য, আমার হাঁপানি রোগের দিকে তার খেয়াল ছিল না, সে নিজেকে এতো ভালোবাসতো যে নিজেতেই আটক থেকে গেল । বিদেশিনীও ডাক দিয়েছিলেন, আমি নিজে থেকে যাইনি । একজন অবাঙালি তরুণী হাত আঁকড়ে বলেছিল, “চলুন পালাই” । আমি পালাইনি বলে তিনি আত্মহত্যা করেন । যৌবলাম্পট্য থাকলে তাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে, ব্যবহার করে, ফেলে চলে আসা যেতো । আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে পেরেছি, যখন ইচ্ছা হয়েছে, তখন । এমনকি, কবিতা লেখাও দেড় দশক ছেড়ে দিয়েছিলুম ।

অভিজিত:—সোনাগাছি ?

মলয়:—বন্ধুদের সঙ্গে গেছি, কিন্তু তা মূলত এলাকাটা সম্পর্কে অভিজ্ঞতার জন্যে । আমি কখনও কোনো যৌনকর্মীর সঙ্গে শুইনি । যৌনরোগ সম্পর্কে আমার প্রচণ্ড ভীতি আছে । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আমি লিখেছি ব্যাপারটা । বাসুদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখতে বলেছিল ‘বাঘের বাচ্চা’ পত্রিকা, তাতেও একটা ঘটনা লিখেছি । ডেভিড নামে একজন বিদেশী এসেছিল ষাটের দশকে ; সে বললে বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায় ; কয়েক দিনের মধ্যে তো প্রেমিকা পাওয়া সম্ভব নয়, তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । 

অভিজিত:—এই আলোচনাকে বিরতি দেয়া যাক । এবার বলুন, পশ্চিমবঙ্গের প্রাণীদেবতা আইডেনটিফাই করতে পেরেছেন ।

মলয়:—ওটা তো সেল্ফডিক্লেয়ার্ড প্রাণীদেবতা ।

অভিজিত:—কোন প্রাণী ?

মলয়: —কেন ? বিড়াল, ষষ্ঠীর বাহন ।

অভিজিত: —একটু বুঝিয়ে বলুন প্লিজ ।

মলয়:—টি এস এলিয়ট বলেছেন বিড়ালেরা স্বভাবে খুঁতখুঁতে, ব্যস্ততার ভানকারী, আর দলবদলু । রয়াল ভেটেরিনারি কলেজের অধ্যাপক ডক্টর অ্যালান উইলসন পঞ্চাশটা বিড়ালকে জিপিএস আর কলার ক্যাম বেঁধে যে তথ্য যোগাড় করেছেন তা থেকে জানা যায় যে বিড়ালেরা অত্যন্ত চতুর আর বিশ্বাসঘাতক । যে পুষেছে তার কোলে বসে যেমন আদর খেতে-খেতে এপিগ্লোটিস-ল্যারিংস ব্যবহার করে আরামের গরগরানি ওগারায়, তেমনই ওগরাবে অন্য কেউ কোলে তুলে নিলে ; অন্যের আদর আর খাবার পেয়ে ততোটাই খুশি হয়, যতোটা মালিকের । মালিক যদি টেবিলের ওপরে মাছ আর দুধ রেখে নিজের পোষা বিড়ালকে খেতে বারণ করে বাইরে বেরোয়, তবুও খেয়ে নেবে । আজ্ঞাবাহক পোষা কুকুরের বিপরীত চরিত্র ।

অভিজিত:—এগুলো বাঙালির চরিত্রে পাওয়া যায় বলছেন ?

মলয়:—দেখুন না, শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেল কেন ? ডিসলয়ালটির কারণে । চটকলগুলো লাটে তুলে দিলে বিড়াল-শ্রমিকনেতারা । নতুন দল সিংহাসনে বসতেই লুমপেনরা লাল থেকে সবুজে চলে গেল কেন ? শুধু লুমপেনরা নয়, কবি-লেখক-নাট্যকার-অভিনেতারাও । স্লোগানের গরগরানিতে কোনো পরিবর্তন নেই । গরিবের রাখা মাছ-দুধ খেতে কোনো আপত্তি নেই বিড়ালদের, পনজি স্কিমগুলোর কর্তাদের কাজকারবারের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন । পশ্চিমবঙ্গের সমাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুমপেনদের পিরামিড ।

অভিজিত:—কিন্তু কুকুরেরা কি অন্যের দেয়ালে গিয়ে মোতে না ? মুতে-মুতে এলাকা চিহ্ণিত করে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতন । দেয়ালে স্লোগান লেখার জন্য আগাম হুঁশিয়ারি বলতে পারেন একে ।

মলয়:—করে কিন্তু তারা নিজের মালিকের প্রতি লয়াল থাকে । বিড়ালের মতন দলবদলু নয় ।

অভিজিত:—আপনি তো পশ্চিমবঙ্গের, আপনার মধ্যেও তাহলে বিড়ালের বৈশিষ্ট্য আছে ?

মলয়:—একটু আগেই বলেছি যে আমি হাইব্রিড, বর্ণসংকর, কালচারাল বাস্টার্ড । আমার মধ্যে সবরকম প্রাণীর বৈশিষ্ট্য পাবেন । বাঘ সিংহ হাতি গণ্ডার জিরাফ জেব্রা জাগুয়ার চিতা হায়েনা অক্টোপাস অ্যানাকোণ্ডা প্যাঁচা উটপাখি চিল শকুন, সমস্ত প্রাণীর ।

অভিজিত:—হাতি ? হাতির মতন লিঙ্গ পেয়েছেন তাহলে । মাটিতে ঠেকেছে কি কখনও ?

মলয়:—তাহলে একটা ঘটনা বলি আপনাকে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে একজন বিদেশি এসেছিলেন, আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন । আমি তা সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে জানিয়ে ওদের বললুম যে চলে এসো হোটেলটায় । টাইম ম্যাগাজিনে আমাদের সংবাদ প্রকাশিত হবার পর বিদেশি কবিলেখকরা প্রায়ই আসতেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে । সেসময়ে তো স্নানের অসুবিধা ছিল আমার, কেননা কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না । কখনও সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের স্যাকরার দোকানে থাকতুম, কখনও হারাধন ধাড়ার হাওড়ার বস্তিবাড়িতে, আবার কখনও আমাদের উত্তরপাড়ার আদিবাড়ির খণ্ডহরে । হোটেলটায় বাথরুমটা বেশ বড়ো ছিল । আমি পোশাক ছেড়ে উলঙ্গ ঢুকে পড়লুম ; আমার পেছন-পেছন, সেই বিদেশি ছাড়া, সবাই পোশাক ফেলে উলঙ্গ ঢুকে এলো । ভালো সাবান শ্যাম্পু ছিল, একে আরেকজনকে মাখিয়ে হুল্লোড় করে স্নান করা হলো । সবাই স্বীকার করল যে আমার লিঙ্গই মাপে সবার চেয়ে বড়ো । সুভাষ ঘোষের লিঙ্গের দিকে তাকিয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত বলেছিল, “যাক সুভাষের লিঙ্গ আমার চেয়ে ছোটো”, তার জবাবে সুভাষ বলেছিল, “আমি এখনও ভার্জিন, বুঝলে, এখনও ফুল খোলেনি, একবার খুলে যাক, তারপর সবাইকে দেখিয়ে দেবো”।

অভিজিত:—তাহলে তো স্বীকার করতে হয় যে কবিতা, কল্লোল, কৃত্তিবাস, ধ্রুপদি, শতভিষার কবিদের থেকে আপনারা একেবারেই আলাদা । ওই দশকগুলোর কবিরা অমন চিন্তা করলেও আঁৎকে অজ্ঞান হয়ে যেতেন । সরকার যে আপনাদের আলাদা করে চিহ্ণিত করেছিল, তা অন্তত চিহ্ণিত করার ব্যাপারে ভুল করেনি ।

মলয়:—আরেকবার, সুবো আচার্যের বাড়ি গিয়েছিলুম, বিষ্ণুপুরে, আমি, ত্রিদিব মিত্র আর সুবিমল বসাক । আমরা হাঁটতে-হাঁটতে বেরিয়ে পড়লুম, ধানখেতের মধ্যে দিয়ে, একটা নদী এলো, নাম ভুলে গেছি, কোমর পর্যন্ত জল, প্যাণ্ট-শার্ট-গেঞ্জি খুলে উলঙ্গ পার হলুম নদী, পেরিয়ে একটা গাছতলায় বসে পাতা ফোঁকা হলো । তখনও ওরা স্বীকার করেছিল যে আমার সাইজ বড়ো ।

অভিজিত :—ভাগ্যিস নিজেদের নিয়ে ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’ টাইপের উপন্যাস লেখেননি । অভিনেতাদের উলঙ্গ হয়ে অভিনয় করতে হতো । 

মলয়:—আমার মনে হয়, আপনি পরের প্রজন্মগুলোতেও আমাদের মতন চরিত্র পাবেন না । স্বমেহন-মুখমেহন প্রসঙ্গ তাঁদের লেখায় আসে বটে, কিন্তু নিজেরা করেছেন কিনা জানতে দেন না । জোট বেঁধে উলঙ্গ হুটোপাটিও করেননি বা করেন না বলেই মনে হয় ।

অভিজিত:—আপনি ম্যাস্টারবেট করেছেন ?

মলয়:—অবশ্যই করেছি । নিজেকে ভালোবাসবার কায়দাটা বাৎসায়ন শিখিয়ে দিয়ে গেছেন । খ্রিস্টধর্মাবলম্বী আর ইসলামধর্মাবলম্বীরা আসার পর স্বমেহন “খারাপ কাজ”-এর তকমা পেয়ে গেল । আমরা বলতুম “হাত-মারা” । এখন তো হাত-মারার সুবিধের জন্য বাজারে গোপনে সিনথেটিক নারী-অঙ্গ বিক্রি হয় ; পকেটে নিয়ে ঘোরা যায় । মেয়েদের জন্য ডিলডো আর ভাইব্রেটর বিক্রি হয় । যদিও আইনি পথে ওগুলোর আমদানি নিষিদ্ধ । জেমস জয়েসের সময়ে বাজারে এলে ‘ইউলিসিস’-এ উনি হাত-মারার দৃশ্যটায় প্রয়োগ করতেন হয়তো ।

অভিজিত:—শুরুর দিকের কথায় আসি । সেসময়ে আপনার যেমন বিরোধীতা হয়েছিল তেমন কি এখনও হয় ?

মলয়:—হয় বৈকি । তবে সারেপটিশাসলি । যাঁরা বিরোধীতা করেন তাঁরা দেখছেন যে বিবিসি থেকে, ইতালি থেকে, জার্মানি থেকে, আমেরিকা থেকে সাংবাদিক আর গবেষকরা আমাদের খোঁজে আমার কাছে আসছেন, অন্য গোষ্ঠীদের কাছে যাচ্ছেন না, তাই বিরোধীতাটা সাবডিউড ? অনেকে আবার তাঁদের মনগড়া ইমেজের সঙ্গে আমাকে মেলাতে না পেরে বিরোধীতা করেন ; তাঁরা ফেসবুকে নিজেদের মগজ থেকে গোবর বের করে আমার দেয়ালে সুযোগ পেলেই ঘুঁটে দিয়ে যান ।

অভিজিত:—যেমন ?

মলয়:—কয়েক মাস আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় শৈলেন সরকার নামে এক ছোকরালোচক প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত আর প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “হাংরি সাহিত্য আন্দোলন, তত্ব, তথ্য, ইতিহাস” বইটা রিভিউ করার সময়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে শিরোনাম দিলেন, “তিনিও কি সুবিধাবাদের প্রশ্রয় নেননি” । শৈলেন সরকারের বক্তব্য ছিল যে, “তিনি জানতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর রচিত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার’ কবিতাটিকে পছন্দ করেননি এবং সব জেনেও কেন মলয়বাবু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মিথ্যে করে তাঁর খারাপ লাগা কবিতাটিকে বিচারকের সামনে ভালো বলে শংসাদানে অনুরোধ করেছিলেন ? নিজে বাঁচার জন্য বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে অন্যকে মিথ্যে সাক্ষী দিতে বলাটা কি কম সুবিধাবাদ ?” ছোকরালোচক শৈলেন সরকার ওই বইতেই আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠিটা ( পৃষ্ঠা ১৪৭ ) পড়ে দ্যাখেনি যেখানে সুনীল বলছেন যে কবিতাটি উনি প্রথম পড়লেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে । তার আগে তিনি কবিতাটি পড়েননি ।

অভিজিত:—প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার ? কুঠার নাকি ! কবিতার শিরোনাম তো প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ।

মলয়:—শৈলেন সরকার বারবার কবিতাটাকে প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার বলে উল্লেখ করেছেন । কিছুদিন পরে নদীয়া থেকে একজন পাঠক প্রতিবাদ করে সম্পাদকের চিঠিতে লেখেন যে কবিতাটার শিরোনাম প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার । প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার নয় । ছোকরালোচক শৈলেন সরকার যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই । এই কবিতাটির নাম জানেন না এমন  কবিতা পাঠক নেই বলেই মনে হয় ।

অভিজিত:—এমনও তো হতে পারে যে পাঁচশো পৃষ্ঠার বই পড়ার মতন সময় ছিল না ওনার হাতে । 

মলয়:—তা ঠিক । উনি বইটা পড়েনইনি । কেননা বইতে স্পষ্ট লেখা আছে যে ‘হাংরি’ শব্দটা আমি পেয়েছিলুম জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে । ছোকরালোচক শৈলেন সরকার লিখে দিলেন যে, “ইতিহাসের দার্শনিক স্পেংলারের এই বইয়ের একটি লাইন ‘ইন দ্য সাওয়ার হাংরি টাইম’ থেকেই পাটনার মলয় রায়চৌধুরী তাঁদের আন্দোলনের নাম ঠিক করেন ‘হাংরি জেনারেশন’ ।” আমরা ১৯৬১ সালে ঘোষণা করেছিলুম “শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা রচনার প্রথম শর্ত” ; ছোকরালোচক শৈলেন সরকার তার দু দশক পরে প্রকাশিত ল্যারি সিনারের ‘দ্য মডার্ন সিস্টেম অব আর্ট’ বইতে আমাদের ঘোষণার সমর্থন যোগাড় করেছেন, কেন জানি না ।

অভিজিত:—আরও উদাহরণ ?

মলয়:—এই কয়েকদিন আগে আবীর মুখোপাধ্যায় নামে জনৈক ছোকরালোচক শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে, ওই সংবাদপত্রেই, লিখে ফেলল যে হাংরি ম্যানিফেস্টোগুলো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ! ছোকরালোচক অ্যালেন গিন্সবার্গকেও হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে দিলেন ।

অভিজিত:—রিয়ালি ? কেউ কেউ আপনার সম্পর্কে ইমেজ গড়ে ফেলে আপনার আচরণের সঙ্গে তাকে মেলাতে পারছেন না বলছিলেন যে ? মগজের গোবর দিয়ে ঘুঁটে মারার কথা ?

মলয়:—আমার বই তো এতোকাল পাঠকের হাতে পৌঁছোতোই না । বাংলাদেশে এই সবে পৌঁছোতে আরম্ভ করেছে, তাও কেবল ঢাকায়, আমি ফেসবুকে আমার বইয়ের প্রচার চালাবার পর । কলকাতায় ধ্যানবিন্দুর দরুণ পাঠকদের হাতে পৌঁছোচ্ছে, মফসসলে এখনও পৌঁছোয়নি । যেহেতু আমি আমার বইগুলোর প্রচার করি তাই তাঁরা চটা । তাঁরা বুঝতে পারেন না যে আমার সঙ্গে কলকেতিয়া মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের  তুলনা হতে পারে না । আমার বাবা-মা কখনও স্কুলে পড়েননি, কার্ল মার্কসের একটা ছবি প্রথমবার দেখে বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, “এই বুড়োটা আবার কে রে ?” কুড়ি জনের সংসারে বাবা ছিলেন প্রধান রোজগেরে ; বড়োজ্যাঠা জীবন আরম্ভ করেছিলেন ক্লাস ফোর স্টাফ হিসাবে । ইমলিতলা থেকে আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে বেরোইনি । বেশ হাতপা ছুঁড়ে ফুঁড়ে বেরোতে হয়েছে সেখান থেকে ।

অভিজিত:—উনি সোভিয়েত দেশের সংবাদ রাখতেন না ?

মলয়:—উনি রাশিয়ার কথা জানতেন, সোভিয়েত দেশ বলে যে কিছু আছে তা-ই জানতেন না । বাবার দৌলতে বা দলের দৌলতে আমি রাশিয়া-চিন-কিউবা যাইনি, বিদেশীদের টাকায় কোথাও যাইনি ।    

অভিজিত:–এখন তো আর আপনার বিরোধীতা হয় না । আপনার লেখার একটা পাঠকসমাজ গড়ে উঠেছে ।

মলয়:–কে বললে হয় না ! ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা কবিতা চেয়েছিল ; আমি এই কবিতাটা পাঠিয়েছিলুম, ওনারা রিজেক্ট করে দিলেন । শুনুন, কবিতাটার শিরোনাম ‘আমার ঠাকুমাকে যেন বলবেন না’ ।

উনি আমাকে পছন্দ করতে বারণ করেছিলেন

আপনি কেন করছেন, নীরা ?

আমি আজো শুঁয়োপোকা-ঠাশা ঈশান মেঘে চিৎসাঁতার দিই

উনি পঞ্চাশ বছর আমার কাছে কবিতা চাননি

আপনি কেন চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো জলের দশপা গভীরে দাঁড়িয়ে বরফের লাঠি চালাই

উনি আমার সাবজুডিস মামলায় সম্পাদকীয় লিখেছিলেন

আপনি সম্পাদক হয়ে কেন লেখা চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো স্মোকড পেংগুইনের চর্বির পরোটা খেতে ভালোবাসি

উনি আমার কবিতার বইয়ের প্রকাশক হয়েও স্বীকার করেননি

আপনি কেন স্বীকৃতি দিচ্ছেন, নীরা ?

আমি আজো দুপুর গেরস্হের হাঁমুখে সেঁদিয়ে ফ্যামিলিপ্যাক হাই তুলি

উনি আমার নাম উচ্চারণ করতে চাইতেন না

আপনি কেন তরুণদের কাছে করছেন, নীরা ?

আমি আজো রক্তঘোলা জলে টাইগার শার্কদের সঙ্গে বলিউডি নাচে গান গাই

উনি বলেছিলেন ওর মধ্যে সত্যিকারের লেখকের কোনো ব্যাপার নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি ইমলিতলায় জানতুম কাঠকয়লা ছাড়া ইঁদুরপোড়ায় স্বাদ হয় না

উনি বলেছিলেন ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কনোট পুড়িয়ে মড়ার গন্ধ পেয়েছি

উনি বলেছিলেন ওর দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না

আপনি কেন মনে করছেন হয়েছে, নীরা ?

আমি আমস্টারডমের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁকরা বুড়োদের লিরিক শুনেছি

উনি সেসময়ে দুঃখ থেকে রাগ আর রাগ থেকে বিতৃষ্ণায় উঠছেন

আপনি এত উদার কেন, নীরা ?

আমার ঠাকুমাকে যেন প্লিজ বলবেন না ।

অভিজিত:—এটা তো রিজেকশান নয় ; এটা চ্যালেঞ্জ ছিল, ওনারা অ্যাকসেপ্ট করতে ভয় পেয়েছিলেন । আদারওয়াইজ, সুরজিত সেন যেমন আপনাকে বলেছিলেন, ‘এই সময়’ সংবাদপত্রের জন্য আপনার একটা হিরোমার্কা ফোটো দিতে, এই কারণে যে পাঠকদের চেয়ে আপনার নাকি পাঠিকার সংখ্যা বেশি, দুই বাংলাতেই । ‘কবিতীর্থ’ সম্পাদক উৎপল ভট্টাচার্যও বলছিলেন যে বই মেলায় আপনার বই কিনতে ওনার স্টলে পাঠিকা-ক্রেতাই বেশি আসেন । 

মলয়:—শুনেছি ।

অভিজিত:—আপনি এই বয়সেও ফ্লার্ট করেন ?

মলয়: —তা করি, ভালো লাগে, রিডিমিং মনে হয় ।

অভিজিত:—ওপার বাঙালির তরুণীদের সঙ্গেও ?

মলয়:—হ্যাঁ, ওপার বাংলায় সুন্দরী পাঠিকাদের সংখ্যা বেশি । যৌবনে যদি ওপার বাংলায় যেতুম তাহলে আমিও বোধহয় কবীর মলয় হয়ে ন্যাড়া মাথায় ফিরতুম । প্রথমত সুন্দরী আর দ্বিতীয়ত ওনারা রাঁধেন ভালো ।

অভিজিত:—আপনি কি পেটুক ?

মলয় :—এককালে ছিলুম, এখন দেখে লোভ হয় কিন্তু শরীরের দরুণ ডাক্তারের নানা বিধিনিষেধের কারণে কুরে-কুরে খেয়ে সন্তুষ্ট হতে হয় । ভূমেন্দ্র গুহ অবশ্য বলেছেন যে এক-আধ বার খাওয়া চলে ; তাই খেয়ে নিই । ইউরোপে গিয়ে সব রকমের মদ আর বিয়ার খেয়ে এসেছি । 

অভিজিত:—আপনারা দল বেঁধে খালাসিটোলায় যেতেন, মাতাল হতেন কি ?

মলয়:—আমি কখনও মদ খেয়ে মাতাল হইনি । একবার শুধু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম বেনারসে, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় গাঁজা-চরস-আফিমের কনককশান তৈরি করে ফুঁকিয়েছিল, তখন । তাছাড়া আমি কখনও নেশা করে পোঁদ উল্টে পড়িনি, সুভাষ ঘোষ যেমন পড়ত । আটের দশক পর্যন্ত গাঁজা-চরস-আফিম সরকারি দোকানে পাওয়া যেতো, সত্যমেব জয়তে ছাপ মারা । আমেরিকার চাপে বেআইনি হয়ে গেল । কুম্ভ মেলায় কিন্তু যতো ইচ্ছে কিনতে পাওয়া যায় ।

অভিজিত:—আপনার কোন নেশা ভালো লাগে ? মদ না গাঁজা-চরস-আফিম ইত্যাদি ?

মলয়:—এগুলোকে নেশা বলা ভুল । এই জিনিসগুলো মগজে ঢুকে মধ্যবিত্ত রাবীন্দ্রিক ভাষার একচেটেপনাকে ভেঙে দিতে পারে , এমনিতেই কালচারাল বাস্টার্ড হবার দরুণ ভাষার মনোপলি আমার ওপরে তেমন কাজ করে না । এখন শুধু সিংগল মল্ট খাই, কিন্তু মাদকের ব্যাপারে এককালে আমার প্রিয় ছিল গাঁজা আর চরসের মিক্সচারের ধোঁয়া । যাবতীয় সামাজিক মনোপলিকে মগজের মধ্যে ভেঙে ফেলতে পারে ওটা । ধোঁয়া ফুঁকে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ান, মিছিল দেখলে মনে হবে ভেড়াদের চরাতে নিয়ে যাচ্ছে তাদের মালিক, এটাই মাদকের ক্রিয়েটিভ দিক ; বহু মানুষের মুখকে মনে হবে কুমিরের হাঁ-করা মুখ, ভাষণকে মনে হবে হায়েনার ডাক ।

অভিজিত:—মাদকের অভ্যাস কেমন করে হয়েছিল ?

মলয়:—কেন ? ইমলিতলা পাড়ায় । কেউই ব্যাপারটাকে খারাপ মনে করত না । পাড়ার অগ্রজরা তাড়ি সোমরস গাঁজা ভাঙ সবই শেয়ার করতে চাইতেন । এমনকি বিয়ের বরযাত্রিদেরও তাড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো । দোলের দিন তো সমস্ত সীমা ভেঙে পড়ত । সেই দিনগুলো দারুন ছিল ।

অভিজিত:—ছাড়লেন কেন ?

মলয়:—মাদক নিয়ে সিরিয়াসলি লেখালিখি করা যায় না । এমনকি সিংগল মল্ট খেয়েও লিখতে ব্যাঘাত হয় ।

অভিজিত:—ভাষার মনোপলির কথা বলছেন । সংবাদপত্রগুলো আর কমার্শিয়াল পত্রপত্রিকারা ভাষাকে মনোপলাইজ করে ফেলেছে, সাধারণ মানুষের ভাবনাচিন্তাকেও ওই ভাষা দিয়ে দখল করে নিচ্ছে । তাই না ? 

মলয়:—আমি তাই সংবাদপত্র আর কমার্শিয়াল পত্রিকা পড়ি না । তিরিশ বছরের বেশি হয়ে গেল । কোনো কিছু জানাবার থাকলে কলকাতা থেকে কোনো পাঠক বা সম্পাদক কাটিং পাঠিয়ে দেন । 

অভিজিত:—টিভি দেখেন না ?

মলয়:—অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট, ডিসকভারি, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক ইত্যাদি দেখি ।

অভিজিত:—ফিল্ম দেখেন না ? এক্সপেরিমেন্টাল কবি-লেখকরা তো ফিল্ম টেকনিকের সাহায্য নেন ।

মলয়:—না, আমি ফিল্ম বড়ো একটা দেখি না । বই পড়ার সময় যেমন কোনো চিন্তাভাবনা এলে মুড়ে রেখে চিন্তাটার প্রসার ঘটাতে থাকা যায় মগজে, ফিল্মে তেমন হয় না । ফিল্ম আমি দেখেছি যৌবনে, মূলত নায়িকাদের যৌন আকর্ষণের কারণে । সুতরাং ফিল্মের কোনো টেকনিক আমার লেখায় প্রয়োগ করার প্রশ্নই নেই । 

অভিজিত—আপনার লেখার আঙ্গিকে যথেচ্ছাচার তাহলে আনেন কী করে ?

মলয়:—যা মনে আসে তাই করি, আর তার জন্য কোনো যুক্তি খাড়া করার দরকার আছে বলে মনে করি না । অনেকসময় ওটা আপনা থেকে মাথায় চলে আসে, যেমন “নখদন্ত” বা “ঔরস” ফিকশানে, কিংবা “টাপোরি”, “ইচ্ছাপত্র”, “গুমরাহীবাঈ-এর সন্ধ্যা” আর “ব্লাড লিরিক” কবিতায়।

অভিজিত:—কোন অভিজ্ঞতায় আপনি সবচেয়ে বেশি থ্রিলড ?

মলয়:—গুলি চালানোয় । আমি এনসিসিতে থ্রিনটথ্রি, বারো বোর আর স্টেনগান চালিয়েছি । তখন এখনকার মতন রেসট্রিকশান ছিল না । প্রতিদিন চালানো যেতো । বিন্দেশ্বরী প্রসাদ নামে এক বিহারি বন্ধুর গ্রামে গিয়ে ডাবল ব্যারেল গান আর পিস্তল চালিয়েছি । 

অভিজিত:—আপনি নাকি বেহালা বাজাতেও শিখেছিলেন ?

মলয়:—হ্যাঁ, বেহালা শিখছিলুম, প্রেমে পড়ে সব গোলমাল হয়ে গেল । তার চেয়ে গিটার বাজাতে শিখলে ততো দিনে শিখে ফেলতুম । 

অভিজিত:—কিন্তু আপনার বাবা ওনার বন্ধুদের নাকি বলতেন যে কুসঙ্গে পড়ে আপনি বেহালা বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন ।

মলয়:—বাবা কুসঙ্গ বলতে নমিতাদির কথা বলেছেন, নমিতা চক্রবর্তী, যিনি আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সুমিতাদি । মা মনে করতেন যে আমার কুসঙ্গ হল বিহারি বন্ধুরা, যাদের ফোটো আপনি দেখতে পাবেন বিবিসি রেডিও প্রোগ্রামের ফোটোটায় ; তাদের প্রায় সকলের গ্রামে গাঁজা আর পোস্তর গাছ ছিল, সহজেই পাওয়া যেতো ভালো কোয়ালিটির গাঁজা আর আফিম । এরা সকলেই হাইকোর্টের জজ, অধ্যাপক, আই এ এস, আই পি এস, ডাক্তার, ইনজিনিয়ার, গবেষক ইত্যাদি হয়ে অবসর নিয়েছে ; আমার স্নাতকোত্তর রেজাল্ট কিন্তু ওদের সবায়ের চেয়ে ভালো ছিল । আসলে আমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না । আমি কবিতার কুসঙ্গে পড়ে গিয়েছিলুম, ওরা পড়েনি । উল্টোটাও হয়েছে, ফালগুনী রায়ের দিদি এসে আমার মাকে বলে গিয়েছিলেন যে আমার কুসঙ্গে পড়ে ফালগুনী রায় খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।

অভিজিত:—আচ্ছা, কবিতা বললে আপনার মনে কোন ছবি ভেসে ওঠে ?

মলয়:—এটা ভালো প্রশ্ন । কবিতা বললেই একটা ঘটনা মনে পড়ে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কবিতা ভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরোজায় রিং দিয়েছি । বুদ্ধদেব বসু দরোজা খুলতেই আমি বললুম, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী, উনি সঙ্গে-সঙ্গে দড়াম করে দরোজা বন্ধ করে দিলেন । আমি ভাবলুম হয়তো খুলবেন, প্রায় মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে রইলুম, খুললেন না । ওনার সঙ্গে ওটাই আমার প্রথম আর শেষ দেখা । অথচ তার আগে উনি বদল্যার সম্পর্কে বই লিখে ফেলেছেন, বিট আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন বাঙালি পাঠকদের জন্য ।

অভিজিত:—বদল্যার, ভেরলেন, র‌্যাঁবোও যদি ওনার কবিতাভবনের দরোজায় অমন আনইনভাইটেড টোকা দিতো, তাহলেও হয়তো ওই ভাবেই তাদের বিদায় করতেন ।

মলয়:—হয়তো । নিজেকে প্রস্তুত করে উনি বোধহয় ওনাদের মুখোমুখি হতেন । চরিত্রের দিক থেকে বিদেশি ছিলেন ভদ্রলোক, আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে তারপর দেখা করতেন । তাছাড়া, তখন তো প্রতিদিন স্নান করতুম না, জামাও পালটাতুম না ।

অভিজিত:—এরকম অভিজ্ঞতা আরও হয়েছে ?

মলয়:—মিছিলে উৎপল দত্তের হাতে একটা হাংরি বুলেটিন দিয়ে নিজের নাম বলতেই উনি আঁৎকে উঠে বুলেটনটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে বলে উঠলেন, “হাংড়ি জিন্নাড়েশন !” তারপর হনহনিয়ে মিছিলে এগিয়ে গেলেন ।

অভিজিত:—আর ?

মলয়:—আবু সয়ীদ আইয়ুবের বাড়ি গিয়েছিলুম । তখন জানতুম না যে পুলিশে যারা কমপ্লেন করেছেন উনি তাঁদের অন্যতম । উনি আমাদের আন্দোলন নিয়ে বিশেষ আলোচনা করতে চাইলেন না ; ভারতের মুসলমানদের প্রসঙ্গে আমাদের মতামত জানতে চাইলেন । আমি কুলসুম আপার সঙ্গে আমার শৈসবে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটা বলতে গম্ভীর হয়ে গেলেন । 

অভিজিত:—এগুলো আপনাকে প্রভাবিত করেনি ?

মলয়:—এর চেয়ে বরং এক ন্যুড মডেল অ্যাপ্রুভ করার জন্য সমীর রায়ের সঙ্গে গিয়ে প্রভাবিত বোধ করেছিলুম। বয়স পঁছিশ-ছাব্বিশ হবে । একজন আর্টিস্ট তার স্তনে সবুজ রঙ করে দিয়েছিল । মনে হচ্ছিল খাবার মতন হিমসাগর । 

অভিজিত:—আপনি তো সেক্সিস্ট বুল, দেখেই আপনার দাঁড়িয়ে গিয়ে থাকবে ?

মলয়:—হ্যাঁ, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দাড়িয়ে গেল, বুঝতে পারলুম যে আমার দ্বারা পেইনটিঙ সম্ভব হতো না । একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল অনিল করঞ্জাইয়ের বেনারসের স্টুডিওয় এক নিউড বিদেশিনীকে দেখে । এই বিদেশিনীকে আপনি পাবেন আমার “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে । 

অভিজিত:—ওটা তো অলমোস্ট পরনোগ্রাফি ।

মলয়:—অনেকে তাই বলেন বটে । ওতে একটা প্যারা ছিল লাবিয়া ম্যাজোরায় হিরের মাকড়ি পরানো সম্পর্কে ; তা বাদ দিয়ে দিই কেননা ওটা তাহলে খোলার ঘটনা বর্ণনা করতে হতো । উপন্যাসটা লিখতে বসে, তখন হাতে লিখতুম, কমপিউটারে নয়, আমি দৈহিক আনন্দ উপভো্গ করছিলুম । ঠিকই বলেছেন, সেস্কিস্ট বুল হয়ে গিয়েছিলুম লিখতে বসে । হিমসাগর স্তনের যুবতীকে নিয়ে একটা লেখা ঘুরছে মাথায় ।

অভিজিত:—আপনার রেপ করতে ইচ্ছে হয় না ?

মলয়:—না, না । আমি অত্যন্ত ডেলিকেট আর সেনসিটিভ; যার তার সঙ্গে শুতে পারি না । ফার্স্ট মুভ আমি কখনই করিনি । রেপ ব্যাপারটা শরীরের দিক থেকে নোংরা । আজকাল দিকে-দিকে এতো রেপিস্ট গজাচ্ছে শরীর নোংরা হবার দরুণ । নোংরা শরীরে ভরে গেছে সমাজ । পুরুষ মানুষ ভুলেই গেছে যে শরীর একটা ইন্দ্রজালের ওয়র্কশপ । বেশিরভাগ দম্পতি মিশনারি পোজের বাইরে কিছুই জানে না । 

অভিজিত:—আপনি হাংরি আন্দোলনের আগে ফাক, শিট, আসহোল, সান অফ এ বিচ, মাদারফাকার, কান্ট, ডিকসাকার ইত্যাদি গালাগাল দিতেন বন্ধুদের ?

মলয়:—হ্যাঁ দিতুম । তবে ইমলিতলায় গ্রুমিঙের কারণে হিন্দি গালাগালই বেশি প্রয়োগ করতুম । সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করতুম “চুতিয়া” আর “ভোঁসড়িকে জনা” । আমি কখনও রাগিনি, তাই রেগে গিয়ে গালপাড়ার স্তরে উঠিনি কখনও । বন্ধুরা রাজসাক্ষী হয়ে গেলেও ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চেয়েছিলুম, ওরাই পালিয়ে গিয়ে দল বেঁধে ওদের পত্রিকা থেকে আমাকে বাদ দিয়ে দিলে । আমার পাশাপাশি সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র আর দেবী রায়কেও বাদ দিয়ে দিলে । অথচ সম্পাদক বাসুদেব দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিল “আমার ক্ষুধা ছিল মানুষের সার্বিক মুক্তির ক্ষুধা”। সার্বিক মুক্তি কেমন করে সম্ভব কে জানে যখন আপনি নিজের বন্ধুদেরই আপনার পত্রিকায় ল্যাঙ মেরে বের করে দিচ্ছেন । হাংরি আন্দোলন তো কাউকে বাদ দেবার আন্দোলন ছিল না ।

অভিজিত:—আপনার কি মনে হয় ওনাদের এই বিভাজন প্রচেষ্টা হাংরি আন্দোলনের ক্ষতি করেছে ?

মলয়:—নিশ্চয়ই, অনেকে এটাকেই আলোচনার বিষয়বস্তু বানিয়ে ফ্যালে । যাকগে, বিষয়ান্তরে যাওয়া যাক ।

অভিজিত:—আপনি হোমোসেক্সুয়ালিটিতে আকর্ষিত হয়েছেন ? বিহারে তো লৌণ্ডাবাজির জন্য বিখ্যাত ।

মলয়:—না, হইনি । কম বয়সেই নারীসঙ্গের কারণে ওই দিকটা অবহেলিত থেকে গেছে । লৌণ্ডাগুলোও তো বিটকেল দেখতে লাগতো । স্কুলে আর কলেজে লৌণ্ডাটাইপ ছিল না কোনো সহপাঠী ; থাকলে হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে পারতুম । তবে শুনতুম বটে যে অমুক হোস্টেলে দুজন ছাত্র মশারির ভেতরে ওয়ার্ডেনের হাতে  ধরা পড়েছে । প্রাইমারি স্তর থেকেই কোএজুকেশান ছিল, খুকি থেকে তরুণীরা স্কুল-কলেজে আশেপাশে ছিলই, ছাত্রও খারাপ ছিলুম না, কুসঙ্গ সত্ত্বেও । দেখতেও মন্দ ছিলুম না । গরিব বলে পোশাক একটু বেখাপ্পা থাকতো, এই যা । 

অভিজিত:—অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমির পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন কেন ?

মলয়:—আমি কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় ; কোনো সম্বর্ধনা নিই না, কোনো সাহিত্য সভায় গিয়ে বক্তিমে ঝাড়ি না । আমার মনে হয় অন্যের নোংরামি আমার ওপরও চেপে বসবে, তাদের মূল্যবোধে আটকে পড়ব । দেখুন না, কতো সাহিত্যিক, নাট্যকার, আঁকিয়ে কেমন নোংরামিতে আটকে পড়েছেন । পনজি স্কিমে গরিবের টাকা মেরে দেবার খেলা চলছে তা তাঁরা টের পেলেন না কেমন করে ? 

অভিজিত:—উপায় ?

মলয়:—উপড়ে ফেলতে হবে ; পুরো এসট্যাবলিশমেন্টকে উপড়ে ফেলতে হবে, আর তা করার জন্যে বাইরে থেকেই চাড় দিতে হবে, থুতু ছেটাতে হবে, মুতে দিতে হবে, হেগে দিতে হবে মাথায়, যারা তেল দিতে একত্র হয়েছে, পুরস্কারের জন্য লালা ঝরাচ্ছে তাদের ছিঁড়ে বাঘের খাঁচায় ফেলে দিতে হবে, বামপন্হা-দক্ষিণপন্হা সবই তো দেখা হল, এগুলো চলবে না, নতুন কোনো ব্যবস্হার কথা ভাবতে হবে, অসৎদের ঝোলাতে হবে, অনেক-অনেক কাজ করতে হবে, তবে যদি মানুষের কিছু হয় । আবার ট্রাইবাল হয়ে যেতে হবে, যেমন আদিবাসীরা থাকেন ।

মলয় রায়চৌধুরী
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেবরাজ চক্রবর্তী

 দেবরাজ: মলয়দা, আপনার লেখার জন্য রাষ্ট্র যখন আপনাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখন আপনার কী মনে হয়েছিল ?

মলয়: অবাক লেগেছিল । কেননা বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার জন্য তার আগে তো রাষ্ট্র এই ধরণের পদক্ষেপ কখনও নেয়নি বলে জানতুম । তাছাড়া আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল হাতে হাতকড়া পরিয়ে আর কোমরে দড়ি বেঁধে ; কলকাতার তৎকালীন কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশ ছিল যে আমাকে যেন ওভাবেই হিউমিলিয়েট করা হয় ।

দেবরাজ: যে-সময়ে রাষ্ট্র আপনার কন্ঠরোধ করেছিল, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আমাদের কিছু বলুন ।

মলয়: সে-অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে তোমাদের পত্রিকায় স্হান সংকুলান হবে না । অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকু হল যে, সাহিত্যিক লড়াইটা একাই লড়া যায় আর লড়তে হয় ।

দেবরাজ: আপনার লেখায় বাংলা সাহিত্য এক নতুন ধরণের ভাষা পেল । আপনি কেন এই ভাষাকেই বেছে নিলেন ?

মলয়: আমি তো ফিকশান লেখায়, কবিতায় আর প্রবন্ধ লেখায়, ভিন্ন ভিন্ন ভাষাকাঠামো ব্যবহার করি । হ্যাঁ, আমি শব্দ আর বাক্যের ব্যাংক তৈরি করেছিলুম আর তা থেকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতুম । ‘সমার্থশব্দকোষ’ও ব্যবহার করেছি বিকল্প শব্দের খোঁজে । ফিকশানের ক্ষেত্রে ‘নখদন্ত’ লেখাটায় খাপছাড়াভাব আনার প্রয়াস করেছিলুম । কবিতায়, ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমপ্লেক্স কাঠামোর পর, এখন অবন্তিকাকে নিয়ে যেগুলো লিখেছি, সেগুলো থেকে কমপ্লেকসিটি বাদ দেবার চেষ্টা করেছি । এক্সটেমপোর লেখা লিখে দেখতে চেয়েছি । এক্সটেমপোর গদ্য লিখছি জুবিন ঘোষদের ক্ষেপচুরিয়ান ই-জাইনে । আসলে আরথ্রাইটিসের কারণে কলম ধরতে পারি না বলে কমপিউটারে লিখি ; ফলে এক্সটেমপোর লেখার তাগিদ গড়ে উঠেছে । ‘ডিটেকটিভ নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক’ নামের রহস্যোপন্যাসও লিখেছি একই প্রক্রিয়ায় ।

দেবরাজ: আপনি কি সচেতন ভাবেই এই ভাষাশৈলীকে বেছে নিলেন ?

মলয়: সব লেখার ভাষাবিন্যাস সচেতন ভাবেই তো করেছি ।

দেবরাজ: রাষ্ট্র আপনাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল কেন ? ‘অশালীন’ ভাষা ব্যবহারের জন্য , না রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য ? আপনার কি মনে হয় ?

মলয়: সে-সময়ে যারা পশ্চিমবঙ্গের এসট্যাবলিশমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করতো তারা, যে কারণেই হোক, ভয় পেয়ে গিয়েছিল । এসট্যাবলিশমেন্ট বলতে আমি সংবাদপত্রগোষ্ঠীর কথা বলছি না । আমি বলছি ক্ষমতাধিকারীদের কথা । বলছি রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মসনদে আসীন লোকেদের কথা । ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সর্বভারতীয় কর্তা এ.বি.শাহকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার তেমনটাই জানিয়েছিলেন ।

দেবরাজ: রাষ্ট্রের এই ফ্যাসিবাদী মনোভাবের জন্যই কি আপনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ?

মলয়: যে-কোনো পুরস্কারই পুরস্কারদাতার মূল্যবোধটি প্রাপকের ঘাড়ে চাপিয়ে দ্যায়, ওই পুরস্কারের মাধ্যমে । বাংলা অ্যাকাডেমির দিকে তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে ; আগের লট চলে গিয়ে নতুন লট এসেছে, তাদের পুরস্কার-প্রাপকদের তালিকা একেবারে আলাদা । আমি কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় । আমার নাকতলার বাড়িতে অনুষ্ঠান করে পুরস্কার দিতে চেয়েছিলেন এক সম্পাদক ; তিনি বোঝার চেষ্টাই করেননি আমার অবস্হান । আমি কোনো সম্বর্ধনাও নিই না । এই সব ব্যাপারগুলো আমাকে প্রচণ্ড ডিসটার্ব করে ।




দেবরাজ: সেই সময়ে আপনার কাছের মানুষ ও সমকালীন লেখকদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল ?

মলয়: কাছের মানুষ বলতে যদি আত্মীয়দের কথা বলছ, তাঁরা ডেট পড়লে  ব্যাংকশাল কোর্টে আমাকে সমর্থন জানিয়ে যেতেন । হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সুবিমল বসাক নিয়মিত, আর দেবী রায়, ত্রিদিব মিত্র-আলো মিত্র মাঝেমধ্যে কোর্টে আসতেন । কিন্তু সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উৎপলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে পুলিশের তরফের সাক্ষী হয়েছিলেন ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য ।  দীপক মজুমদার একটা চিঠি তৈরি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে লেখা, আমাকে গ্রেপ্তার আর আমার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ করে । সেই চিঠিতে আনন্দ বাগচী ছাড়া আর কোনো সাহিত্যিক সই করতে রাজি হননি ; অনেকে এমনকী দীপককে ভর্ৎসনা করেছিলেন ।

দেবরাজ: হাংরি আন্দোলনের প্রথমদিকে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পরে এই আন্দোলন থেকে সরে যান । এর কী কারণ ছিল বলে আপনি মনে করেন ?

মলয়: যাঁরা মুচলেকা দিয়েছিলেন তাঁরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ; শৈলেশ্বর ঘোষ তো কাঁদছিলেন লালবাজারে যখন জেরা করা হচ্ছিল । বোধ হয় চাকরি খোয়াবার ভয় ছিল । কৃত্তিবাস গোষ্ঠী থেকে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা ছেড়ে চলে যান প্রধানত আয়ওয়া থেকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির আঘাতে-আঘাতে । প্রতিদানে পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষমতাসীন হবার পর ওনাদের গ্রন্হ-প্রকাশ, পুরস্কার ইত্যাদির ব্যবস্হা করেছিলেন । সুনীল আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকেও বলেছিলেন, “তোর ওই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ছাড় ; আমার কাছে আয়, আমি প্রকাশকদের বলে তোর বইগুলো বের করে দেবো আর পুরস্কারও পাইয়ে দেবো, দেখতেই তো পাচ্ছিস  কারা-কারা পুরস্কার পাচ্ছে ।

দেবরাজ: তৎকালীন কোনো সংবাদপত্র কি আপনাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন ? তৎকালীন লিটল ম্যাগাজিনগুলির এই আন্দোলনের প্রতি কী ভূমিকা ছিল ?

মলয়: না, কোনো সংবাদপত্রের মালিক সমর্থন করেননি বলেই জানি । তবে সে-সময়ে ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রে দুটি সম্পাদকীয় আমাদের সমর্থনে লিখেছিলেন কবি কৃষ্ণ ধর । ‘আনন্দবাজার’, ‘স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে কয়েকবার টিটকিরি মেরে কার্টুন বেরিয়েছিল আমার আর দেবী রায়ের । ‘দর্পণ’, ‘জনতা’ ইত্যাদি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতি সংখ্যায় লেখা হতো বা কার্টুন বেরোতো ; আমি গৌরকিশোর ঘোষের সঙ্গে দেখা করার পর ‘দর্পণ’-এ তা বন্ধ হয় । হাংরি আন্দোলনের কারণেই লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটে ; তার আগে হাতে গোণা গুটিকয় লিটল ম্যাগাজিন ছিল যাকে এলিটিস্ট বলাই ভালো । তার সম্পাদকেরা আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলার আগে আমাকে পেডেস্ট্রিয়ান ভাবতেন ।

দেবরাজ: মলয়দা, এবার একটু অন্য প্রশ্ন করি । এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের পরিস্হতি ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আপনার কী মত ?

মলয়: যাঁরা পটবয়লার সাহিত্য করেন তাঁরাই চতুর্দিক ছেয়ে ফেলেছেন । লিটল ম্যাগাজিন স্তরে অনেক কাজ হচ্ছে । আমাদের অ্যাকাডেমিয়া ওই পটবয়লার-জগতের বাইরে বেরোতে চান না । বিদেশি সাহিত্যিকদের নিয়ে আমাদের অ্যাকাডেমিয়া যতটা আগ্রহী ততটা তাঁরা লিটল ম্যাগাজিনের নন-কনফরমিস্ট বাংলা লেখালিখির সঙ্গে নন । তবে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা যাঁরা অ্যাকাডেমিক জগতে প্রবেশ করছেন তাঁরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলা ক্রিয়াটিভ লেখালিখির দিকে নজর দেবেন বলে মনে হয় । এটা যে হবে তা এইজন্য বলছি যে তা না হলে আমার সম্পর্কে একজন তরুণ লেকচারার পিএচ ডি করবেন কেন ! আমাকে বেশ কয়েকজন লেকচারার বলেছেন যা তাঁরা বাংলা অ্যাকাডেমিয়ায় পরিবর্তন ঘটাবেন ।

দেবরাজ: বর্তমান বাংলা সাহিত্য জগৎ কি ক্রমশ রাজনীতি-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে ?


মলয়: সমগ্র সাহিত্য জগৎ নয়, তবে সাহিত্যিকদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হয়ে গেছেন দলাদলিতে । দলাদলি না করলে স্বীকৃতি মেলা, বই প্রকাশ ও বিক্রি, পুরস্কারপ্রাপ্তি ইত্যাদি আজ অসম্ভব । বঙ্গসমাজ সহজে এই ফাঁদ থেকে বেরোতে পারবে বলে মনে হয় না । বহু লেখকই মনের কথা আর লিখতে চান না ।

দেবরাজ:  আপনার অনেক লেখা আমরা ই-ম্যাগাজিন বা ইনটারনেটে দেখতে পাই । লেখার জন্য এই মাধ্যমটিকে আপনার কতটা গুরূত্বপূর্ণ বলে মনে হয় ? এর কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে ?

মলয়: ইনটারনেটের মাধ্যমে আমি সারা পৃথিবীর পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আমার লেখা পৌঁছে দিতে পারছি । তার আগে আমার এত পাঠক-পাঠিকা ছিল না । উন্নত দেশগুলোয় ইনটারনেট বেশ গুরূত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । কিন্ডল-এ অনেক বই আপলোড করে যখন ইচ্ছা পড়তে পারছেন পাঠক । ওপার বাংলায় ইনটারনেটে বাংলা ভাষায় যা ঘটছে তা থাকে অনুমান করা যায় যে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও এর গুরুত্ব বাড়বে । নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্হা আর শিক্ষা কোন দিকে যায় তার ওপর ।

দেবরাজ : এই সময়ের কার-কার লেখা আপনার ভালো লাগে ?

মলয়: একটা লেখা ভালো-খারাপ বাইনারি দিয়ে যাচাই করার ব্যাপারটা এনেছিল  প্রাগাধুনিক ইউরোপীয়রা । একটা লেখায় কী করার প্রয়াস করা হয়েছে সেইটেই দেখার । জেমস জয়েস বা মার্সেল প্রুস্ত পড়ে অনেক কম পাঠকের ভালো লাগবে । কিন্তু তাঁদের জন্যই তাঁদের মাতৃভাষা আজ এত উন্নত ।

( পারেজিয়া পত্রিকার সম্পাদক দেবরাজ চক্রবর্তীর নেওয়া সাক্ষাৎকার।২০১৩ সালে পারেজিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত। )


 দেবরাজ: মলয়দা, আপনার লেখার জন্য রাষ্ট্র যখন আপনাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখন আপনার কী মনে হয়েছিল ?মলয়: অবাক লেগেছিল । কেননা বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার জন্য তার আগে তো রাষ্ট্র এই ধরণের পদক্ষেপ কখনও নেয়নি বলে জানতুম । তাছাড়া আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল হাতে হাতকড়া পরিয়ে আর কোমরে দড়ি বেঁধে ; কলকাতার তৎকালীন কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশ ছিল যে আমাকে যেন ওভাবেই হিউমিলিয়েট করা হয় ।দেবরাজ: যে-সময়ে রাষ্ট্র আপনার কন্ঠরোধ করেছিল, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আমাদের কিছু বলুন ।মলয়: সে-অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে তোমাদের পত্রিকায় স্হান সংকুলান হবে না । অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকু হল যে, সাহিত্যিক লড়াইটা একাই লড়া যায় আর লড়তে হয় ।দেবরাজ: আপনার লেখায় বাংলা সাহিত্য এক নতুন ধরণের ভাষা পেল । আপনি কেন এই ভাষাকেই বেছে নিলেন ?মলয়: আমি তো ফিকশান লেখায়, কবিতায় আর প্রবন্ধ লেখায়, ভিন্ন ভিন্ন ভাষাকাঠামো ব্যবহার করি । হ্যাঁ, আমি শব্দ আর বাক্যের ব্যাংক তৈরি করেছিলুম আর তা থেকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতুম । ‘সমার্থশব্দকোষ’ও ব্যবহার করেছি বিকল্প শব্দের খোঁজে । ফিকশানের ক্ষেত্রে ‘নখদন্ত’ লেখাটায় খাপছাড়াভাব আনার প্রয়াস করেছিলুম । কবিতায়, ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমপ্লেক্স কাঠামোর পর, এখন অবন্তিকাকে নিয়ে যেগুলো লিখেছি, সেগুলো থেকে কমপ্লেকসিটি বাদ দেবার চেষ্টা করেছি । এক্সটেমপোর লেখা লিখে দেখতে চেয়েছি । এক্সটেমপোর গদ্য লিখছি জুবিন ঘোষদের ক্ষেপচুরিয়ান ই-জাইনে । আসলে আরথ্রাইটিসের কারণে কলম ধরতে পারি না বলে কমপিউটারে লিখি ; ফলে এক্সটেমপোর লেখার তাগিদ গড়ে উঠেছে । ‘ডিটেকটিভ নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক’ নামের রহস্যোপন্যাসও লিখেছি একই প্রক্রিয়ায় ।দেবরাজ: আপনি কি সচেতন ভাবেই এই ভাষাশৈলীকে বেছে নিলেন ?মলয়: সব লেখার ভাষাবিন্যাস সচেতন ভাবেই তো করেছি ।দেবরাজ: রাষ্ট্র আপনাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল কেন ? ‘অশালীন’ ভাষা ব্যবহারের জন্য , না রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য ? আপনার কি মনে হয় ?মলয়: সে-সময়ে যারা পশ্চিমবঙ্গের এসট্যাবলিশমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করতো তারা, যে কারণেই হোক, ভয় পেয়ে গিয়েছিল । এসট্যাবলিশমেন্ট বলতে আমি সংবাদপত্রগোষ্ঠীর কথা বলছি না । আমি বলছি ক্ষমতাধিকারীদের কথা । বলছি রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মসনদে আসীন লোকেদের কথা । ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সর্বভারতীয় কর্তা এ.বি.শাহকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার তেমনটাই জানিয়েছিলেন ।দেবরাজ: রাষ্ট্রের এই ফ্যাসিবাদী মনোভাবের জন্যই কি আপনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ?মলয়: যে-কোনো পুরস্কারই পুরস্কারদাতার মূল্যবোধটি প্রাপকের ঘাড়ে চাপিয়ে দ্যায়, ওই পুরস্কারের মাধ্যমে । বাংলা অ্যাকাডেমির দিকে তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে ; আগের লট চলে গিয়ে নতুন লট এসেছে, তাদের পুরস্কার-প্রাপকদের তালিকা একেবারে আলাদা । আমি কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় । আমার নাকতলার বাড়িতে অনুষ্ঠান করে পুরস্কার দিতে চেয়েছিলেন এক সম্পাদক ; তিনি বোঝার চেষ্টাই করেননি আমার অবস্হান । আমি কোনো সম্বর্ধনাও নিই না । এই সব ব্যাপারগুলো আমাকে প্রচণ্ড ডিসটার্ব করে ।




দেবরাজ: সেই সময়ে আপনার কাছের মানুষ ও সমকালীন লেখকদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল ?মলয়: কাছের মানুষ বলতে যদি আত্মীয়দের কথা বলছ, তাঁরা ডেট পড়লে  ব্যাংকশাল কোর্টে আমাকে সমর্থন জানিয়ে যেতেন । হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সুবিমল বসাক নিয়মিত, আর দেবী রায়, ত্রিদিব মিত্র-আলো মিত্র মাঝেমধ্যে কোর্টে আসতেন । কিন্তু সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উৎপলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে পুলিশের তরফের সাক্ষী হয়েছিলেন ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য ।  দীপক মজুমদার একটা চিঠি তৈরি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে লেখা, আমাকে গ্রেপ্তার আর আমার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ করে । সেই চিঠিতে আনন্দ বাগচী ছাড়া আর কোনো সাহিত্যিক সই করতে রাজি হননি ; অনেকে এমনকী দীপককে ভর্ৎসনা করেছিলেন ।দেবরাজ: হাংরি আন্দোলনের প্রথমদিকে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পরে এই আন্দোলন থেকে সরে যান । এর কী কারণ ছিল বলে আপনি মনে করেন ?মলয়: যাঁরা মুচলেকা দিয়েছিলেন তাঁরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ; শৈলেশ্বর ঘোষ তো কাঁদছিলেন লালবাজারে যখন জেরা করা হচ্ছিল । বোধ হয় চাকরি খোয়াবার ভয় ছিল । কৃত্তিবাস গোষ্ঠী থেকে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা ছেড়ে চলে যান প্রধানত আয়ওয়া থেকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির আঘাতে-আঘাতে । প্রতিদানে পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষমতাসীন হবার পর ওনাদের গ্রন্হ-প্রকাশ, পুরস্কার ইত্যাদির ব্যবস্হা করেছিলেন । সুনীল আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকেও বলেছিলেন, “তোর ওই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ছাড় ; আমার কাছে আয়, আমি প্রকাশকদের বলে তোর বইগুলো বের করে দেবো আর পুরস্কারও পাইয়ে দেবো, দেখতেই তো পাচ্ছিস  কারা-কারা পুরস্কার পাচ্ছে ।”দেবরাজ: তৎকালীন কোনো সংবাদপত্র কি আপনাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন ? তৎকালীন লিটল ম্যাগাজিনগুলির এই আন্দোলনের প্রতি কী ভূমিকা ছিল ?মলয়: না, কোনো সংবাদপত্রের মালিক সমর্থন করেননি বলেই জানি । তবে সে-সময়ে ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রে দুটি সম্পাদকীয় আমাদের সমর্থনে লিখেছিলেন কবি কৃষ্ণ ধর । ‘আনন্দবাজার’, ‘স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে কয়েকবার টিটকিরি মেরে কার্টুন বেরিয়েছিল আমার আর দেবী রায়ের । ‘দর্পণ’, ‘জনতা’ ইত্যাদি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতি সংখ্যায় লেখা হতো বা কার্টুন বেরোতো ; আমি গৌরকিশোর ঘোষের সঙ্গে দেখা করার পর ‘দর্পণ’-এ তা বন্ধ হয় । হাংরি আন্দোলনের কারণেই লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটে ; তার আগে হাতে গোণা গুটিকয় লিটল ম্যাগাজিন ছিল যাকে এলিটিস্ট বলাই ভালো । তার সম্পাদকেরা আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলার আগে আমাকে পেডেস্ট্রিয়ান ভাবতেন ।দেবরাজ: মলয়দা, এবার একটু অন্য প্রশ্ন করি । এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের পরিস্হতি ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আপনার কী মত ?মলয়: যাঁরা পটবয়লার সাহিত্য করেন তাঁরাই চতুর্দিক ছেয়ে ফেলেছেন । লিটল ম্যাগাজিন স্তরে অনেক কাজ হচ্ছে । আমাদের অ্যাকাডেমিয়া ওই পটবয়লার-জগতের বাইরে বেরোতে চান না । বিদেশি সাহিত্যিকদের নিয়ে আমাদের অ্যাকাডেমিয়া যতটা আগ্রহী ততটা তাঁরা লিটল ম্যাগাজিনের নন-কনফরমিস্ট বাংলা লেখালিখির সঙ্গে নন । তবে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা যাঁরা অ্যাকাডেমিক জগতে প্রবেশ করছেন তাঁরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলা ক্রিয়াটিভ লেখালিখির দিকে নজর দেবেন বলে মনে হয় । এটা যে হবে তা এইজন্য বলছি যে তা না হলে আমার সম্পর্কে একজন তরুণ লেকচারার পিএচ ডি করবেন কেন ! আমাকে বেশ কয়েকজন লেকচারার বলেছেন যা তাঁরা বাংলা অ্যাকাডেমিয়ায় পরিবর্তন ঘটাবেন ।দেবরাজ: বর্তমান বাংলা সাহিত্য জগৎ কি ক্রমশ রাজনীতি-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে ?মলয়: সমগ্র সাহিত্য জগৎ নয়, তবে সাহিত্যিকদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হয়ে গেছেন দলাদলিতে । দলাদলি না করলে স্বীকৃতি মেলা, বই প্রকাশ ও বিক্রি, পুরস্কারপ্রাপ্তি ইত্যাদি আজ অসম্ভব । বঙ্গসমাজ সহজে এই ফাঁদ থেকে বেরোতে পারবে বলে মনে হয় না । বহু লেখকই মনের কথা আর লিখতে চান না ।দেবরাজ:  আপনার অনেক লেখা আমরা ই-ম্যাগাজিন বা ইনটারনেটে দেখতে পাই । লেখার জন্য এই মাধ্যমটিকে আপনার কতটা গুরূত্বপূর্ণ বলে মনে হয় ? এর কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে ?মলয়: ইনটারনেটের মাধ্যমে আমি সারা পৃথিবীর পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আমার লেখা পৌঁছে দিতে পারছি । তার আগে আমার এত পাঠক-পাঠিকা ছিল না । উন্নত দেশগুলোয় ইনটারনেট বেশ গুরূত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । কিন্ডল-এ অনেক বই আপলোড করে যখন ইচ্ছা পড়তে পারছেন পাঠক । ওপার বাংলায় ইনটারনেটে বাংলা ভাষায় যা ঘটছে তা থাকে অনুমান করা যায় যে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও এর গুরুত্ব বাড়বে । নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্হা আর শিক্ষা কোন দিকে যায় তার ওপর ।দেবরাজ : এই সময়ের কার-কার লেখা আপনার ভালো লাগে ?মলয়: একটা লেখা ভালো-খারাপ বাইনারি দিয়ে যাচাই করার ব্যাপারটা এনেছিল  প্রাগাধুনিক ইউরোপীয়রা । একটা লেখায় কী করার প্রয়াস করা হয়েছে সেইটেই দেখার । জেমস জয়েস বা মার্সেল প্রুস্ত পড়ে অনেক কম পাঠকের ভালো লাগবে । কিন্তু তাঁদের জন্যই তাঁদের মাতৃভাষা আজ এত উন্নত ।( পারেজিয়া পত্রিকার সম্পাদক দেবরাজ চক্রবর্তীর নেওয়া সাক্ষাৎকার।২০১৩ সালে পারেজিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত। )
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান স্বাধীন

মেহেদী হাসান স্বাধীন : হাংরি কি দাদাইজমের একটা নতুনরূপ?

মলয় রায়চৌধুরী : সমস্যা হলো যে বাংলাদেশে হাংরি আন্দোলনকারীদের বই বহুকাল যায়নি । এখন যাচ্ছে । তাও সবায়ের বই পৌঁছোয়নি । অনেকে ইনটারনেট থেকে মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি করে নিয়েছেন । হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে । অর্থাৎ ষাট বছর আগে । অথচ বইপত্র পৌঁছোয়নি । তার মানে যিনি খবর পাচ্ছেন তিনি নিজের মনে ভাসাভাসা ধারণা গড়ে নিয়েছেন । ডাডা আন্দোলনের পর ইউরোপ-আমেরিকায় আরও বহু আন্দোলন হয়েছে, পশ্চিমবাংলাতেই হয়েছে নিম-সাহিত্য, শাস্ত্রবিরোধী, শ্রুতি ইত্যাদি আন্দোলন । এমনকি পরাবাস্তববাদ আন্দোলনকেও ডাডা আন্দোলনের নতুন রূপ বলা হয় না । ত্রিস্তান জারার রচনার সঙ্গে যেমন আঁদ্রে ব্রেতঁর রচনার ভাবনাধারার মিল নেই, তেমনই ওনাদের ভাবনাধারার সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকারীদের মিল নেই । তুমি ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, শম্ভু রক্ষিত, সুভাষ ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখের রচনা ডাডাবাদীদের পাশাপাশি রেখে পড়ে দেখতে পারো, তাহলেই টের পাবে । আমার প্রায় দুশোটা বই আছে, কবিতা, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ ইত্যাদি নিয়ে । এর মধ্যে কয়টা যে বাংলাদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছেচে তা জানি না । তার ফলে অমন ধারণা তৈরি হয়েছে । এখন অবশ্য ঢাকার কয়েকজন প্রকাশক আমাদের বই প্রকাশ করায় আগ্রহ দেখিয়েছেন । সংগ্রহ করে পড়লে স্পষ্ট হবে ধারণা ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : হাংরি আন্দোলনকে কেন ইন জেনারেল ভিত্তি দেয়া যায়নি?

মলয় রায়চৌধুরী : ঠিক কী বলতে চাইছ বুঝতে পারলুম না । হাংরি আন্দোলন নিয়ে তো প্রচুর পিএইচডি আর এম ফিল হয়েছে, হয়ে চলেছে । ভারতের অন্যান্য ভাষায় এই আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে । কেবল আমার কবিতা নিয়েও একজন ডক্টরেট করেছেন। জার্মানিতে ড্যানিয়েলা ক্যাপেলো সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএই্চডি করেছেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে । হ্যাঁ, বলা যায় যে বাণিজ্যিক প্রচার হয় না কেন ! তার কারণ পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক রাজনীতি । তাছাড়া হাংরি আন্দোলনকারীরা কোনও সংবাদপত্রে আর রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নিতে চায়নি । যারা নিয়েছে তাঁরা নিজেরাই আন্দোলন ত্যাগ করেছিলেন ; যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ । বিনয় মজুমদার কিন্তু আন্দোলন ত্যাগ করেননি ; একটা সাক্ষাৎকারে উনি আপশোষ করেছেন যে আন্দোলনের নেতা হবার কথা ছিল ওনার কিন্তু ওনাকে নেতা করা হয়নি । ওনার ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো তো হাংরি আন্দোলনের কবিতা । বিনয় তাই উপেক্ষিত ; ওনাকে অকাদেমি পুরস্কার দেয়া হয় জীবনের শেষ পর্বে। আরেকটা কারণ হল কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ । আমার বিরুদ্ধে পঁয়ত্রিশ মাস ধরে মামলা হয়েছিল ; প্রদীপ চৌধুরীকে বিশ্বভারতী থেকে রাস্টিকেট করা হয়েছিল, উৎপলকুমার বসুকে যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপকের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল ; সুবিমল বসাক আর দেবী রায়কে সরকারি চাকরিতে কলকাতার বাইরে ট্রান্সফার করে দেয়া হয়েছিল । ক্লিন্টন বি সিলির জীবনানন্দ বিষয়ক গ্রন্হ ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট, বইটা পড়লে জানতে পারবে,  হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জীবনানন্দের যে জন্মদিন পালন করেছিল, তার বর্ণনা  । উনি ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে প্রকাশিত সংবাদ তুলে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে জীবনানন্দের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন । একই খবর প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ পত্রিকায় । সেদিন সন্ধ্যায় জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য  টেবিলে উঠে পড়েছিলেন হাংরি আন্দোলনের গল্পকার অবনী ধর  নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন একটা গান, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে । উপস্হিত সাংবাদিকরা,  ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না ।  তাঁরা গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা ।  ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে ।  ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য । অবনী ধর-এর নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন । যাঁরা তাঁর নাম শোনেননি এবং ওনার একমাত্র বই ‘ওয়ান শট’ পড়েননি, তাঁদের জানাই যে ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে মান্যতা দিলে বলতে হয় যে অবনী ধর ছিলেন হাংরি আন্দোলনের অন্যতম ছোটো গল্পকার । 

গানটা এরকম, মোৎসার্টের একটা বিশেষ সুরে গাওয়া হয়:

জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা উউউউউহ,

হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা, উহ

শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি ।

উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ । 

১৯২০ সালে,, প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বোরির জন্য, রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েল, প্রথম বারন ব্যাডেন-পাওয়েল (স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা) সিদ্ধান্ত নেন যে একটা মজার গান পেলে ভালো হয়, যা সব দেশের স্কাউটরা গাইতে পারবে ; কারোরই কঠিন মনে হবে না । উনি মোৎসার্টের  এক নম্বর সিম্ফনির ইবি মেজরে বাঁধা সুরটি ধার করেছিলেন । গানটা স্কাউটদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়েছিল । এই রকমই ছিল তখনকার প্রতিক্রিয়া ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : আন্দোলনটা ধপ করে জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল ?

মলয় রায়চৌধুরী : বাংলাদেশে বসে সম্ভবত এরকম একটা ধারণা হয়ে থাকবে । মামলা হবার দরুন আমি বন্ধু-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলুম । কিন্তু হাংরি আন্দোলনের পত্রিকা তো নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে । আমার মতন অরগ্যানাইজিং কেপেবিলিটি ছিল না বলে সেই সব পত্রিকা তেমন প্রচারিত হয়নি । প্রদীপ চৌধুরীর ‘ফুঃ’ পত্রিকা গত বছর ওনার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে । সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত নিয়মিত ‘ক্ষুধার্ত’, ‘ক্ষুধার্ত খবর’ প্রকাশ করেছেন । ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার সব কয়টা সংখ্যা নিয়ে ভারতের সাহিত্য অকাদেমী থেকে সংকলন প্রকাশিত হয়েছে । আমি ‘জেব্রা’ পত্রিকা প্রকাশ করতুম । সেগুলো নিয়ে গত বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘অখণ্ড জেব্রা’, সমীরণ মোদকের সম্পাদনায়, ঢাকায় তক্ষশীলাতে পাওয়া যায় । সুবিমল বসাক সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, দেবী রায় সম্পাদিত ‘চিহ্ণ’, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত ‘উন্মার্গ’, অরুণেশ ঘোষ সম্পাদিত ‘জিরাফ’ পত্রিকার সংখ্যাগুলো সংগ্রহ করেছেন সমীরণ মোদক, একত্রে সংকলিত করার জন্য, কিন্তু প্রকাশক পাচ্ছেন না । শিলিগুড়ি, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি থেকে আশির দশক জুড়ে অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার, মনোজ রাউত, মলয় মজুমদার, সমীরণ ঘোষ, জীবতোষ দাশ প্রমুখ প্রকাশ করতেন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’, ‘রোবোট’, আর ‘ধৃতরাষ্ট্র’ — কলকাতা থেকে দূরে বলে তেমন আলোচিত হয়নি । এই যে আমি এতোগুলো পত্রিকার নাম বললুম, আমি নিশ্চিত যে তোমার চোখে পড়েনি ; সম্ভবত এনাদের রচনাও পড়োনি । তাই মনে হতে পারে যে জ্বলেই নিভে গেল । তিন বছর আগে পেঙ্গুইন র‌্যানডাম হাউস থেকে হাংরি আন্দোলনকারীদের নিয়ে ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটা বই বেরিয়েছে, মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরীর লেখা ; ইংরেজিতে আরেকটা বই বেরিয়েছে বৈদ্যনাথ মিশ্র এবং রাহুল দাশগুপ্তর সম্পাদনায়, ‘লিটারেচার অফ হাংরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট – আইকনস অ্যাণ্ড ইমপ্যাক্ট’ নামে । গতবছর অলোক গোস্বামীর স্মৃতিচারণ প্রকাশিত হয়েছে, ‘মেমারি লোকাল’ নামে । বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুভাষ ঘোষকে নিয়ে প্রায় পাঁচশো পাতার দুটো বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে ‘মানুষের বাচ্চা’ পত্রিকা । ওদের দুজনের রচনাসমগ্র প্রকাশ করেছে গাঙচিল প্রকাশনী । সুবিমল বসাকের রচনাসমগ্র দুই খণ্ডে প্রকাশ করেছে সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী । অরুণেশ ঘোষকে নিয়ে ছয়শো পৃষ্ঠার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে কবিতীর্থ পত্রিকা । শৈলেশ্বর ঘোষকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে ‘কারুবাসনা’ পত্রিকা । এবাদুল হক আমাকে নিয়ে ‘আবার এসেছি ফিরে’ পত্রিকার দুটো বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছেন । জানি না এই বই আর পত্রিকাগুলো বাংলাদেশে যায় না বলে তোমার মনে হয়ে থাকবে ধপ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল । তুমি যদি ইউটিউব দ্যাখো তাহলে সবচেয়ে পঠিত যে কবিতাটা পাবে তা হল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ আর আমার সাম্প্রতিক কবিতা ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো’ । আলোচনা অবিরাম হয়ে চলেছে । 

মেহেদী হাসান স্বাধীন : মলয় রায়চৌধুরীর চোখে হাংরি আন্দোলনের সময়কার সামাজিক বাস্তবতা এবং ইজম কনফ্লিক্টটা কেমন ছিল? 

মলয় রায়চৌধুরী :এটা দুচার লাইনে ব্যাখ্যা করা যায় না । তুমি আমার সাক্ষাৎকারসমগ্র ‘কথাবার্তা সংগ্রহ’ আর ‘হাংরি কিংবদন্তি’ বইদুটো পড়ে দেখতে পারো । প্রকাশক কলকাতার প্রতিভাস । ঢাকায় পাওয়া যায়। অবশ্য সাত-আটশো টাকা দাম বলে পাঠকের নাগালের বাইরে থেকে গেছে ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন :আমরা শুনেছি একটা ইশতেহারের মাধ্যমেই সূচনা হয়েছিল হাংরি আন্দোলন। আসলে ইশতেহারে কী লেখা হয়েছিল যা সে সময়কার তারুণ্যকে নাড়া দিয়েছিল?

মলয় রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, প্রথম দিকে হ্যাণ্ডবিলের মতন এক পাতার বুলেটিন বা ইশতেহার প্রকাশ করা হতো আর তা বিলিয়ে দেয়া হতো কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ম্যানিফেস্টো আর ১৯৬২ সালের শুরুতে বাংলা ম্যানিফেস্টো । পত্রিকা বের করলে পাঠকের কেনবার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হতো। এক পাতার বুলেটিন পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে যেতো, প্রায় প্রতি সপ্তাহে । এইভাবে পৌঁছে যাওয়াটাই সাড়া ফেলার প্রধান কারণ । সংবাদপত্রে খবর, কার্টুন, ছবি ইত্যাদি বেরোবার ফলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল । যুগান্তর সংবাদপত্রে পরপর দু’দিন প্রধান সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল । আন্দোলন যেভাবে দ্রুত সাড়া ফেলেছিল, তরুণরা আপনা থেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন । পঁয়ত্রিশ-চল্লিশজন ছিলেন প্রথম কয়েক বছর । তারপর পুলিশের হস্তক্ষেপের কারণে অনেকে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এবং আন্দোলন থেকে দূরত্ব গড়ে নিয়েছিলেন । আমার ‘হাংরি কিংবদন্তি’ বইটায় তুমি প্রায় সব কয়টা ইশতেহারের কপি পাবে । তক্ষশীলা, বিদিত, পাঠক সমাবেশ, বাতিঘরকে বললে আনিয়ে দেবে ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের হাংরিয়ালিস্ট প্রভাব পরবর্তিতে বাংলা সাহিত্যের লেখনীতে কী ধরনের বিশেষত্ব দিয়েছে?

মলয় রায়চৌধুরী : এই প্রশ্নের উত্তর অভিজিত পালের একটা প্রবন্ধে দেয়া আছে, ‘ভূবনডাঙা’ সাইটে, । তোমার প্রশ্নের উত্তরের জন্য সেটা থেকে খানিকটা তুলে দিচ্ছি। অভিজিত লিখেছেন, বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই । হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে । তাঁদের অবদান, ১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন । পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক  । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । ২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই । শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই । তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ । সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট । ৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস । মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন । বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো ।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি । তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’ । বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য । পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট । ৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে । পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে । ৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল । ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন । এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক,  জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি । পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল। ৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি । তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা । ৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে । ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন । বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন । হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্হীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। হাংরি জেনরেশনের পরের দশকের কবি ও লেখকগণের নিকট বামপন্হীদের দুইমুখো কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে মরিচঝাঁপি কাণ্ডের পর । ৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না । হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন । ১০ ) হাংরি  জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয় । তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার। ১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি । এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে । আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের । সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল । বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’ । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন । যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ‘যুদ্ধে আমার তৃতীয় ফ্রন্ট’  ইত্যাদি । তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন । ১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য । পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষজ্ঞ কবিদের সময় সমাপ্ত করে দিয়েছেন নতুন কবির দল এবং নবনব লিটল ম্যাগাজিন । ১৩ ) ঔপনিবেশিক প্রভাবে বহু কবি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন । ইউরোপীয় লেখকরা যেমন নিজেদের ‘নেটিভদের’ তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতেন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠত্ব, বিশেষ একজনকে তুলে ধরা, নায়ক-কবি, সরকারি কবির শ্রেষ্ঠত্ব, হিরো-কবি, এক সময়ে একজন বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ড বিশিষ্ট কবি  আইকন কবি ইত্যাদির প্রচলন ছিল । হাংরি জেনারেশন সেই ধারণাকে ভেঙে ফেলতে পেরেছে তাদের উত্তরঔপনিবেশিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে । তারা বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দিতে পেরেছে, কবির পরিবর্তে একাধিক লেখককের সংকলনকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে, ব্যক্তি কবির পরিবর্তে পাঠকৃতিকে বিচার্য করে তুলতে পেরেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেছে । সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কৌমের কথা বলেছে । তাঁদের পরবর্তী কবি-লেখকরা হাংরি জেনারেশনের এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন । ১৪ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল । রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই । নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি । রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে । হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা । এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ১৫ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ‘বাদ’ দেবার প্রবণতা ; সম্পাদক বা বিশেষ গোষ্ঠী নির্ণয় নিতেন ‘কাকে কাকে বাদ দেয়া হবে’ । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল “এলিমিনেশন”। বাদ দেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তাঁরা নিজেদের আয়ত্বে রাখতেন । হাংরি জেনারেশনের সম্পাদকরা ও সংকলকরা জোট বাঁধার কথা বললেন । যোগসূত্র খোঁজাল কথা বললেন । শব্দজোট, বাক্যজোট, অর্থজোটের কথা বললেন । এমনকি উগ্র মতামতকেও পরিসর দিলেন । তাঁদের এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সম্পাদক ও সংকলকদের অবদানে স্পষ্ট । যেমন অলোক বিশ্বাস আটের দশকের সংকলনে ও আলোচনায় সবাইকে একত্রিত করেছেন । বাণিজ্যিক পত্রিকা ছাড়া সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে এই গুণ উজ্বল । ১৬ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত একটিমাত্র মতাদর্শকে, ইজমকে, তন্ত্রকে, গুরুত্ব দেয়া হতো । কবি-লেখক গোষ্ঠীর ছিল ‘হাইকমাণ্ড’, ‘হেডকোয়ার্টার’, ‘পলিটব্যুরো’ ধরণের মৌরসি পাট্টা । হাংরি জেনারেশন একটি আন্দোলন হওয়া সত্বেও খুলে দিল বহু মতাদর্শের পরিসর, টুকরো করে ফেলতে পারলো যাবতীয় ‘ইজম’, বলল প্রতিনিয়ত রদবদলের কথা, ক্রমাগত পরিবর্তনের কথা । ভঙ্গুরতার কথা । তলা থেকে ওপরে উঠে আসার কথা । হাংরি জেনারেশনের পরে সম্পূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন জগতে দেখা গেছে এই বৈশিষ্ট্য এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব । ১৭ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত দেখা গেছে ‘নিটোল কবিতা’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ এলিটিস্ট কবিতা রচনার ধারা । তাঁরা বলতেন রচনাকারের শক্তিমত্তার পরিচয়ের কথা । গুরুগম্ভীর কবিতার কথা । নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক মডেলের কথা । যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ নিয়ে এলেন এলো-মেলো কবিতা, বহুরঙা, বহুস্বর, অপরিমেয় নাগালের বাইরের কবিতা । তাঁদের পরের প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মাঝে এর প্রভাব দেখা গেল । এখন কেউই আর ঔপনিবেশিক বাঁধনকে মান্যতা দেন না । উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় অলোক বিশ্বাস, দেবযানী বসু, ধীমান চক্রবর্তী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, প্রণব পাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের রচনা । ১৮ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল স্হিতাবস্হার কদর এবং পরিবর্তন ছিল শ্লথ । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ পরিবর্তনের তল্লাশি আরম্ভ করলেন, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দিলেন । পরবর্তী দশকগুলিতে এই ভাঙচুরের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন কমল চক্রবর্তী, সুবিমল মিশ্র, শাশ্বত সিকদার, সুব্রত সেন, দেবজ্যোতি রায় ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে ; তাঁরা ভাষা, চরিত্র, ডিকশন, সমাজকাঠামোকে হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে গুরুত্ব দিতে পারলেন । ১৯ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো, শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন । বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের । অভেদের সন্ধান করলেন । একলেকটিকতার গুরুত্বের কথা বললেন । বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের বিলোপ ঘটালেন । উল্লেখ্য যে বুদ্ধদেব বসু মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর দ্বারে দেখামাত্র দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । পরবর্তীকালের লিটল ম্যাগাজিনে আমরা তাঁদের এই অবদানের প্রগাঢ় প্রভাব লক্ষ্য করি । ২০ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল ইউরোপ থেকে আনা বাইনারি বৈপরীত্য যা ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা হা্রণ করেছিল তাদের ধর্মের ঈশ্বর-শয়তান বাইনারি বৈপরীত্য থেকে । ফলত, দেখা গেছে ‘বড় সমালোচক’ ফরমান জারি করছেন কাকে কবিতা বলা হবে এবং কাকে কবিতা বলা হবে না ; কাকে ‘ভালো’ রচনা বলে হবে এবং কাকে ভালো রচনা বলা হবে না ; কোন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস  উতরে গেছে এবং কোনগুলো যায়নি ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা এই বাইনারি বৈপরীত্য ভেঙে ফেললেন । তাঁরা যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা রচনার কথা বললেন ও লিখলেন, যেমন সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হগুলি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন বহুপ্রকার প্রবণতার ওপর, রচনাকারের বেপরোয়া হবার কথা বললেন, যেমন মলয় রায়চৌধুরী, পদীপ চৌধুরী ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা । যেমন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ও ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস । যেমন সুবিমল বসাকের বাঙাল ভাষার কবিতা যা এখন বাংলাদেশের ব্রাত্য রাইসুও অনুকরণ করছেন । হাংরি জেনারেশনের পরের দশকগুলিতে  তাঁদের এই অবদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে ।২১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল আধিপত্যের প্রতিষ্ঠার সাহিত্যকর্ম । উপন্যাসগুলিতে একটিমাত্র নায়ক থাকত । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ আধিপত্যের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন তাঁদের রচনাগুলিতে । বামপন্হী সরকার থাকলেও তাঁরা ভীত হলেন না । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সেকারণে ছিল খণ্ডবাদ বা রিডাকশানিজমের গুরুত্ব । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন কমপ্লেকসিটিকে, জটিলতাকে, অনবচ্ছিন্নতার দিকে যাওয়াকে । যা আমরা পাই বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ প্রমুখের গল্প-উপন্যাসে । পরবর্তী দশকগুলিতে দুই বাংলাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । ২২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভকে । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন মাইক্রো ন্যারেটিভকে, যেমন সুবিমল বসাকের ‘দুরুক্ষী গলি’ নামক উপন্যাসের স্বর্ণকার পরিবার, অথবা অবনী ধরের খালাসি জীবন অথবা তৎপরবতী কঠিন জীবনযাপনের ঘটনানির্ভর কাহিনি । পরবর্তী দশকগুলিতে দেখা যায় মাইক্রোন্যারেটিভের গুরুত্ব, যেমন গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাটকগুলিতে । ২৩ ) হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ নিয়ে এলেন যুক্তির ভাঙন বা লজিকাল ক্র্যাক, বিশেষত দেবী রায়ের প্রতিটি কবিতায় তার উপস্হিতি পরিলক্ষিত হয় । পরের দশকের লেখক ও কবিদের রচনায় লজিকাল ক্র্যাক অর্থাৎ যুক্তির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে । যেমন সাম্প্রতিক কালে অগ্নি রায়,  রত্নদীপা দে ঘোষ, বিদিশা সরকার, অপূর্ব সাহা, সীমা ঘোষ দে, সোনালী চক্রবর্তী, আসমা অধরা, সেলিম মণ্ডল, জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া জেরিন,  প্রমুখ । ২৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে রচনায়, বিশেষত কবিতায়, শিরোনামের গুরুত্ব ছিল ; শিরোনামের দ্বারা কবিতার বিষয়কেন্দ্রকে চিহ্ণিত করার প্রথা ছিল । সাধারণত বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং সেই বিষয়ানুযায়ী কবি কবিতা লিখতেন । শিরোনামের সঙ্গে রচনাটির ভাবগত বা দার্শনিক সম্পর্ক থাকতো । ফলত তাঁরা মৌলিকতার হামবড়াই করতেন, প্রতিভার কথা বলতেন, মাস্টারপিসের কথা বলতেন ।হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ শিরোনামকে সেই গুরুত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন । শিরোনাম আর টাইটেল হোলডার রইলো না । শিরোনাম হয়ে গেল ‘রুবরিক’ । তাঁরা বহু কবিতা শিরোনাম র্বজন করে সিরিজ লিখেছেন । পরবর্তী দশকের কবিরা হাংরি জেনারেশনের এই কাব্যদৃষ্টির সঙ্গে একমত হয়ে কবিতার শিরোনামকে গুরুত্বহীন করে দিলেন ; সম্পূর্ণ কাব্যগণ্হ প্রকাশ করলেন যার একটিতেও শিরোনাম নেই ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : ফ্রয়েডীয় মনোবীক্ষণ কি কোনো ভাবেই হাংরি মুভমেন্টের গভীরতাকে সরলীকরল করতে পারে?

মলয় রায়চৌধুরী : ফ্রয়েড সম্পর্কে জীবনানন্দের বক্তব্য পড়েছ ? মাল্যবান উপন্যাসে মাল্যবান বলছে, “স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড? ভিয়েনা শহরে বসে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্নায়ুরোগীদের স্বপ্ন নিয়ে কোনো স্বপ্নতত্ত্ব বানানো যায় না। চড়কের মাঠে কোনোদিন তো আর যাবেন না ফ্রয়েড সাহেব,স্বপ্নের আর কী বুঝবেন।” এই প্রসঙ্গে গৌতম মিত্র বলেছেন, “কী ভয়ঙ্কর রকমের আধুনিক একজন চিন্তক জীবনানন্দ দাশ ভেবে অবাক হই। ঠিক এখানেই ফ্রয়েডেরই শিষ্য কার্ল গুস্তাভ ইয়ুংও ফ্রয়েডের থেকে আলাদা হয়ে যান। ইয়ুংও মনে করেন, শুধু ব্যক্তি নির্জ্ঞান নয়, স্বপ্নের ক্ষেত্রে যৌথ নির্জ্ঞানেরও একটি ইতিবাচক ভূমিকা আছে।আর সেজন্যই কি জীবনানন্দ চড়কের ইঙ্গিত করেন? ফলিত বিজ্ঞানের ফ্রয়েড থেকে তত্ত্ব বিজ্ঞানের ইয়ুং বেশি কাছের।” হাংরি আন্দোলন একটা যৌথ মুভমেন্ট, তাকে ফ্রয়েডের তত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা ভুল হবে; তাছাড়া ফ্রয়েড বিশ্লেষণ করেছেন পাশ্চাত্য দৃষ্টিতে যার সঙ্গে প্রাচ্যের কৌম-মননের বিস্তর ফারাক।

মেহেদী হাসান স্বাধীন :আমরা দেখেছি সে সময় বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি পরাবাস্তব চিত্রকাণ্ড নিয়ে মেতে আছেন। অথচ তার চিত্রগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দাদাইজমের শিকড় পাওয়া যায়। ইজম কেন্দ্রিক সুন্দর নির্মাণ কিংবা আঁকবার চেষ্টাটা কি হাংরি আন্দোলন ভেঙে দিয়েছিলো? হতে পারে সেটি কবিতায়, গদ্যে কিংবা আঁকা ছবিতে। বাস্তবতা তো কবিতার মতো সুন্দর না, আঁকা ছবির মতো কালার কনট্রাস্টে ভরা না! আপনার অভিমত কী?

মলয় রায়চৌধুরী : পরাবাস্তববাদের নেতা আঁদ্রে ব্রেতঁ দালির পেইনটিঙগুলো পরাবাস্তব প্রদর্শনী থেকে বের করে ফেলে দিয়েছিলেন । তা জানো ? অথচ দালি নিজেকে বলেছেন পরাবাস্তববাদী, ডাডাবাদী নয় । দালির পেইনটিঙ সুন্দর নয় বলতে চাইছ ? ভাউল ধারণা । তাহলে পিকাসোকে কী বলবে । আমি ইউরোপে গিয়ে ওনাদের পেইনটিঙ দেখেছি আর হর্ষ অনুভব করেছি । হাংরি আন্দোলনে কয়েকজন পেইনটার ছিলেন, যাদের মধ্যে অনিল করঞ্জাই অগ্রগণ্য । ওনাকে নিয়ে ইংরেজিতে একটা বই বেরিয়েছে ২০১৮ সালে, জুলিয়েট রেনল্ডস-এর লেখা, ‘রোডস অ্যাক্রস দ্য আর্থ’ নামে । আমি নিশ্চিত যে এই বইটাও বাংলাদেশে যায়নি । বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি যদি হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত বইগুলো ওনাদের লাইব্রেরিতে রাখেন তাহলে ওখানকার পাঠকদের সুবিধা হবে। তোমরা অনুরোধ করে দেখতে পারো ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : হাংরি মুভমেন্ট নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার যখন সরব তখন আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয় রায়চৌধুরীকে লিখে পাঠালেন, কলকাতা শহরটা আমার, ফির গিয়ে আমি ওখানে রাজত্ব করব। দুএকজন বন্ধুবান্ধব ওই দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা রাখি। লেখার বদলে হাঙ্গামা আন্দোলন করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। যতো খুশি আন্দোলন করো, বাংলা কবিতার এতে কিছু এসে যায় না।”  সুনীলের এই বক্তব্য জানবার পর আপনার প্রতিক্রিয়া কী ছিল? কিংবা আপনার সহযোদ্ধা কবি-বন্ধুদের কী বলেছিলেন?

মলয় রায়চৌধুরী : আমার চিঠির জবাবেই সুনীল ওই চিঠিটা আমাকে লিখেছিলেন। উনি ভেবেছিলেন ওনার অবর্তমানে আমরা বাংলা সংস্কৃতির দখল নিয়ে নিচ্ছি । ওই সময়েই উনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুকে লিখেছিলেন হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যেতে । ওনার মনে হয়েছিল ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার বিরুদ্ধে খাড়া করা হয়েছে হাংরি আন্দোলনকে । কিন্তু কৃত্তিবাস তো ছিল একটা পত্রিকা, ফিরে এসে আবার শুরু করে চালিয়েছেন মৃত্যু পর্যন্ত । আমরা খুব হাসাহাসি করেছিলুম ওনার চিঠি পড়ে । শক্তিকে নেতা করা হয়েছিল বলে সুনীল চটে গিয়েছিলেন । আমেরিকা যাবার আগে আমি ওনার সঙ্গে দেখা করতে উনি রেগে গিয়ে বলেছিলেন. “আমি কী শক্তির থুতু চাটবো?”  ফিরে এসে ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকায় বাসব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মলয় আমার আমেরিকাবাসের সুযোগটা নিয়েছিল’ ।যে-কোনো আন্দোলনের জন্ম হয় কোনো না কোনো আধিপত্যপ্রণালীর বিরুদ্ধে । তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন। আন্দোলন-বিশেষের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্খা, গন্তব্য হল সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা । হাংরি আন্দোলন কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প ছিল না, যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁকে না জানিয়ে তাঁকে বাদ দেবার জন্যেই এই আন্দোলন। তাঁর ধারণা ভুল ছিল। যে-কোনো কবি বা লেখক, ওই আন্দোলনের সময়ে যিনি নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করেছেন, তাঁর খুল্লমখুল্লা স্বাধীনতা ছিল হাংরি বুলেটিন বের করার । বুলেটিনগুলোর প্রকাশকদের নাম-ঠিকানা দেখলেই স্পষ্ট হবে ( অন্তত যে কয়টির খোঁজ মিলেছে তাদের ক্ষেত্রেও ) যে, তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্নজন কতৃক ১৯৬৩-র শেষ দিক থেকে ১৯৬৪ এর প্রথম দিকে প্রকাশিত । ছাপার খরচ অবশ্য আমি বা দাদা যোগাতাম , কেননা, অধিকাংশ আন্দোলনকারীদের আর্থিক অবস্হা ভালো ছিল না । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসুও নিজের খরচে বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ হাংরি বুলেটিন কারোর প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না । এই বোধের মধ্যে ছিল পূর্বতন সন্দর্ভগুলোর মনোবীজে লুকিয়ে-থাকা সত্বাধিকার-বোধকে ভেঙে ফেলার প্রতর্ক । সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়রা আসার আগে বঙ্গদেশে  পারসোনাল পজেশান  ছিল, কিন্তু প্রায়ভেট প্রপার্টি  ছিল না । ইউরোপীয়রা বাঙালিকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পেরেছিল, এবং তা করার পরই ব্যক্তিমানুষ প্রকৃতির মালিকানা দাবি করার যোগ্য মনে করা আরম্ভ করেন নিজেকেহাংরি আন্দোলনের সময়ে সুবিমল বসাক, হিন্দি কবি রাজকমল চৌধুরীর সঙ্গে, একটি সাইক্লোস্টাইল-করা ত্রিভাষিক  (বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি )  বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন, তদানীন্তন সাহিত্যিক সন্দ্যফের প্রেক্ষিতে হাংরি প্রতিসন্দর্ভ যে কাজ উপস্হাপন করতে চাই্ছে তা স্পষ্ট করার জন্যে । তাতে দেয়া তালিকাটি থেকে আন্দোলনের অভিমুখের কিছুটা হদিশ মিলবে :

প্রথাগত সাহিত্য সন্দর্ভ

প্রাতিষ্ঠানিক

শাসক সম্প্রদায় (টিরানি)

ভেতরের লোক ( অন্দরুনি)

এলিটেতর সংস্কৃতি ( ঢাকোসলা )

তৃপ্ত

আসঞ্জনশীল

লোকদেখানো ( দিখাওয়া )

জ্ঞাত যৌনতা (পরিচিত )

সিশিয়ালিস্ট

প্রেমিক (দুলারা )

একসট্যাসি

নিশ্চল ( আনমুভড )

ঘৃণার কামোফ্লাজ

আর্ট ( ফিল্ম )

শিল্প

রবীন্দ্রসঙ্গীত ( সুগমসঙ্গীত )

স্বপ্ন ( ড্রিম )

শিষ্ট ভাষা ( টিউটর্ড )

রিদিমড ( দায়মুক্ত )

ফ্রেমের মধ্যে

কনফরমিস্ট ( অনুগত )

উদাসীন ( ইনডিফারেন্ট )

মেইনস্ট্রিম ( মূলস্রোত )

কৌতুহল

আনন্দ ( এন্ডোক্রিন )

পরিণতি অবশ্যম্ভাবী

সমাপ্তি প্রতিমা ( আনুষ্ঠানিক )

ক্ষমতাকেন্দ্রিক ( সিংহাসন )

মনোহরণকারী ( এনটারটেইনার )

আত্মপক্ষ সমর্থন

আমি কেমন আছি ( একপেশে )

প্রতিসম

ছন্দের একাউন্ট্যান্ট

কবিতা নিখুঁত করতে কবিতা

রিভাইজ

কল্পনার খেলা

হাংরি প্রতিসন্দর্ভ

প্রতিষ্ঠানবিরোধী

শাসকবিরোধী ( প্রটেস্টার )

বহিরাগত ( হামলাবোল )

জনসংস্কৃতি

অতৃপ্ত

খাপছাড়া (ব্রিটল)ছামড়া ছাড়ানো ( র বোন )

অজ্ঞাত যৌনতা ( অপরিচিত )

সোশিয়েবল

শোককারী ( মোর্নার )

অ্যাগনি

তোলপাড় ( টার্বুলেন্ট )

খাঁটি ঘৃণা

জনগণ ( সিনেমা )

জীবনসমগ্র

যে কোনো গান

দুঃস্বপ্ন ( নাইটমেয়ার )

গণভাষা ( গাট ল্যাংগুয়েজ )

আনরিডিমড (দায়বদ্ধ )

ফ্রেমহীন (কনটেসটেটরি )

ডিসিডেন্ট ( ভিন্নমতাবলম্বী )

এথিকস-সংক্রান্ত

ওয়াটারশেড ( জলবিভাজিকা )

উদ্বেগ

উৎকন্ঠা (অ্যাড্রেনালিন )

উন্মেষের শেষ নাই

সতত সৃজ্যমান ( উৎসব )

ক্ষমতাবিরোধী ( সিংহাসনত্যাগী )

চিন্তাপ্রদানকারী ( থটপ্রোভোকার )

আত্মআক্রমণ

সবাই কেমন আছে

অসম্বদ্ধ ( ট্যাটার্ড )

বেহিসাবি ছন্দ খরচ

জীবনকে প্রতিনিয়ত রিভাইজ

কল্পনার কাজ

মেহেদী হাসান স্বাধীন : ’৬৫ সালে নিজের দাদার সাথে আপনিসহ ৬ জন কবি গ্রেপ্তার হন। বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এই বিরল ঘটনার পর হাংরি মুভমেন্ট কোন পথে ধাবিত হয়েছিল?

মলয় রায়চৌধুরী : সবাই ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল । মামলাটা কেবল আমার বিরুদ্ধে হয়েছিল, প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার বিরুদ্ধে, পঁয়ত্রিশ মাস । কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না । চাকরি থেকে সাসপেণ্ড ছিলুম বলে টাকাকড়িরও টানাটানি ছিল, এক বেলা খেয়ে চালিয়ে দিতুম । কিন্তু আন্দোলনের পত্রপত্রিকা নিয়মিত বেরোতো তা তো এক্ষুনি উল্লেখ করেছি । এক পাতার বুলেটিন ছাপানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কেননা প্রেসগুলো হাংরি শুনলেই ভয় পেতো । বই-পত্রিকা ছাপাতুম বহরমপুরের একটা প্রেসে । মামলার পর হাংরি আন্দোলনের প্রভাবে বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে লিটল ম্যাগাজিনের কবিতা ও গদ্যের সৃজনশীলতায় ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : আন্দোলন সংশ্লিষ্ট তরুণ কবিদের হাংরি জেনারশন বলে সম্বোধন করা হলো। তো এই জেনারেশন হাংরি মুভমেন্টের মাধ্যমে আসলে কী অর্জন কিংবা কী তুলে ধরতে চাইছিলো?

মলয় রায়চৌধুরী : ওই তো, অভিজিত পালের লেখাটায় সবই তো বলা হয়ে গেছে।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : কোনো কারণে কি এই আন্দোলন জনবিচ্ছন্ন ছিল? থাকলে সেটি কী? কিংবা এই আন্দোলনকে দালাল শ্রেণির মানুষ সাধারণের বিপরীতে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিল?

মলয় রায়চৌধুরী : জনসাধারণের সঙ্গে সাহিত্য আন্দোলনের যোগাযোগ কোনো দেশেই হয়নি কখনও ।  এক পাতার বুলেটিনে যা করা গিয়েছিল তাই যথেষ্ট । আমাদের বইপত্র কোনোকালেই কমার্শিয়াল ছিল না । বড়ো প্রকাশকরা আগ্রহ দেখায়নি, আজও দেখায় না । আমার বিরোধী লেখক-কবিতে এখনও কফিহাউস ছেয়ে আছে । তাদের যদি দালাল বলো তো আমার আপত্তি নেই ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন :একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। হাংরি আন্দোলন সূত্রপাত হওয়ার আগেকার মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে জানতে চাই। কেমন ছিল ২১ বছরের তরুণ মলয় রায়চৌধুরী?

মলয় রায়চৌধুরী : আবার একই কথা বলতে হচ্ছে । আমার স্মৃতিকথাগুলো পোঁছিচ্ছে না বাংলাদেশে । তুমি যোগাড় করতে পারলে আমার ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা; ছোটোলোকের যুববেলা’ আর ছোটোলোকের শেষবেলা পোড়ো । যদি চাও তো তোমার সাইটে ‘আমার জীবন’ প্রকাশ করতে পারো, তাতে সব পাবে । বলো তো পাঠিয়ে দিই ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : আর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়বার পর একজন মলয় রায়চৌধুরীকে আপনি নিজে কীভাবে খণ্ডন করবেন?

মলয় রায়চৌধুরী : খণ্ডন করতে যাবো কেন ? সব আন্দোলনই তার সময়ের প্রডাক্ট । এখন কেউ কি মহাকাব্য বা মঙ্গলকাব্য লেখে ? লেখে না ,কারণ ওগুলো ছিল তাদের সময়ের প্রডাক্ট । মলয় রায়চৌধুরীর লেখালিখি সম্পর্কে জানতে হলে তুমি গোটাকতক বই অন্তত পড়ো । তাহলে নিজেই টের পাবে ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন :হাংরি মুভমেন্ট পরবর্তি সময়ে হাংরি জেনারেশনের অবস্থানটা সামাজিকভাবে কেমন ছিল? মানুষ কীভাবে গ্রহণ করেছিল তাদের?

মলয় রায়চৌধুরী : বললুম তো, জনসাধারণের স্তরে সৃজনশীল সাহিত্য সেইভাবে পৌঁছোয় না যেমন যায় কমার্শিয়াল লেখা বা পাল্প ফিকশান । এই যে ষাট বছর পর তুমি হাংরি আন্দোলনে আগ্রহী, এটাই তো প্রমাণ যে আন্দোলন একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্হান গড়ে ফেলতে পেরেছে ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন :হাংরি আন্দোলনে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বটা কেমন ছিল? আন্দোলনটা চিমসে যাওয়ার পর শক্তির সমাজ এবং আত্ম পরম্পরাটা কেমন দেখেছেন?

মলয় রায়চৌধুরী : শক্তি ওই এক বছরই ছিলেন । শক্তি ছেড়ে যান কারণ উনি দাদার শ্যালিকা শীলার সঙ্গে প্রেম করতেন । দাদার চাইবাসার বাড়িতে তিন বছর ছিলেন, প্রেম করবার সময়ে । শক্তির কাব্যগ্রন্হ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্যর’ কবিতাগুলো শীলাকে নিয়ে লেখা।  দাদার শশুরবাড়ি চাইবাসায় । দাদার শশুর একজন মাতাল আর বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাননি । শক্তি ভেবেছিল আমি আর দাদা বিরোধিতা করেছি বলে শীলার সঙ্গে ওনার বিয়েটা ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছে । ব্যাস চটে গেলেন আমার আর দাদার ওপর। বদলা নিলেন কাঠগড়ায় সরকারি সাক্ষীর রূপে দাঁড়িয়ে ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : ‘The Decline of the West’ বইটি হাংরি মুভমেন্টের সাথে কীভাবে জড়িয়ে গেল? একইসাথে জানতে চাইছি হাংরির দার্শনিক অবয়বটা আসলে কী?

মলয় রায়চৌধুরী : অসওয়াল্ড স্পেঙলারের দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট বইটা পড়ার পরই আমার ধারণা হয় সমাজ কী ভাবে কাজ করছে ভারতে, বিশেষভাবে পশ্চিমবাংলায় । সেই সময়ে আমি ইতিহাসের দর্শন নামে একটা ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখছিলুম বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় । অসওয়াল্ড স্পেঙলার বলেছেন যে, স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা লিনিয়র নয়, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় । তা হল জৈবিক প্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশ কোন দিকে কার বাঁকবদল ঘটবে, তা আগাম বলা যায় না । যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করতে থাকে ; তার নিত্য নতুন স্ফূরণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় থেকে আরম্ভ হয়, যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তা-ই ‘আত্মসাৎ’ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন। আমার মনে হয়েছিল, দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ঙ্কর অবসাদের মুখে পড়েছে । কলকাতা থেকে পাণিহাটি যাবার সময়ে (  দাদা সমীর পাণিহাটিতে মামার বাড়িতে থেকে কলকাতার সিটি কলেজে যাতায়াত করতেন ) আমি আর দাদা উদ্বাস্তুদের অসহায় জীবন প্রত্যক্ষ করতুম প্রতিদিন, কলকাতার পথে দেখতুম বুভুক্ষুদের প্রতিবাদ মিছিল । ক্ষোভ, ক্রোধ, প্রতিবাদ প্রকাশ করার জন্য আমাদের দুজনের মনে হয়েছিল হাংরি আন্দোলন জরুরি । আমার মনে হয়, তাঁরা না করলেও অন্যেরা এই ধরণের আন্দোলন করত, প্রতিষ্ঠানকে নাস্তানাবুদ করত । আমি ওই সময়টাকে ধরার চেষ্টা করেছি ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে ; বইটা ঢাকায় পাওয়া যায় ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : হাংরির ঢেউ বাংলাদেশেও এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আশির দশকের কবিদের লেখনীতে কদাচিৎ আঁচ পাওয়া যায়। কারণ তখন বাংলাদেশের যুব সমাজ একটা বিশৃঙ্খল আর স্বৈরাচারী শৃঙ্ক্ষলে আটকা পড়েছিল। ফলে সে সময় কবিরা শিল্পীরা একাট্টা হয়ে লড়তে থাকে। আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বাংলাদেশের আশির দশকের সাহিত্য?

মলয় রায়চৌধুরী : বাংলাদেশের সাহিত্যে আঁচের ব্যাপারটা জানি না । তোমার মুখেই প্রথম শুনছি ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : এটা বলার অবশেষ থাকে না যে, হাংরি জেনারেশন দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশে তার ঢেউ খেলিয়ে দিয়েছে। হাংরিয়ালিস্টদের রুখতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার কূটকৌশলের প্রকাশ ঘটিয়েছে। তো, হাংরিকে আপনি কতোটা সমাজবান্ধব আন্দোলন বলে মূল্যায়ন করবেন?

মলয় রায়চৌধুরী : ওসব মূল্যায়ন তোমরা করবে, সমাজ-বিশ্লেষকরা করবেন। ওটা আমার কাজ নয় ।

মেহেদী হাসান স্বাধীন : সবশেষ জানতে চাই, হাংরিয়ালিস্ট যদি একটি মতবাদ হয়ে উঠে তবে বাংলাসাহিত্যে এর প্রভাব এবং বর্তমান সাহিত্যে এর মেলবন্ধনটা কী? 

মলয় রায়চৌধুরী : যে-কোনো আন্দোলনের জন্ম হয় কোনো না কোনো আধিপত্যপ্রণালীর বিরুদ্ধে । তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন। আন্দোলন-বিশেষের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্খা, গন্তব্য হল সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা । হাংরি আন্দোলন কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প ছিল না, যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁকে না জানিয়ে তাঁকে বাদ দেবার জন্যেই এই আন্দোলন। তাঁর ধারণা ভুল ছিল। যে-কোনো কবি বা লেখক, ওই আন্দোলনের সময়ে যিনি নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করেছেন, তাঁর খুল্লমখুল্লা স্বাধীনতা ছিল হাংরি বুলেটিন বের করার । বুলেটিনগুলোর প্রকাশকদের নাম-ঠিকানা দেখলেই স্পষ্ট হবে ( অন্তত যে কয়টির খোঁজ মিলেছে তাদের ক্ষেত্রেও ) যে, তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্নজন কতৃক ১৯৬৩-র শেষ দিক থেকে ১৯৬৪ এর প্রথম দিকে প্রকাশিত । ছাপার খরচ অবশ্য আমি বা দাদা যোগাতাম , কেননা, অধিকাংশ আন্দোলনকারীদের আর্থিক অবস্হা ভালো ছিল না । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসুও নিজের খরচে বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ হাংরি বুলেটিন কারোর প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না । এই বোধের মধ্যে ছিল পূর্বতন সন্দর্ভগুলোর মনোবীজে লুকিয়ে-থাকা সত্বাধিকার-বোধকে ভেঙে ফেলার প্রতর্ক । সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়রা আসার আগে বঙ্গদেশে  পারসোনাল পজেশান  ছিল, কিন্তু প্রায়ভেট প্রপার্টি  ছিল না । ইউরোপীয়রা বাঙালিকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পেরেছিল, এবং তা করার পরই ব্যক্তিমানুষ প্রকৃতির মালিকানা দাবি করার যোগ্য মনে করা আরম্ভ করেন নিজেকে। হাংরি আন্দোলনের কোনো হেডকোয়ার্টার, হাইকমাণ্ড, গভর্নিং কাউন্সিল বা সম্পাদকের দপতর ধরণের ক্ষমতাকেন্দ্র ছিল না, যেমন ছিল কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস ইত্যাদি পত্রিকার ক্ষেত্রে, যার সম্পদক বাড়ি বদল করলে পত্রিকার ক্ষমতাকেন্দ্র সেই বাড়িতে চলে যেত। হাংরি আন্দোলন কুক্ষিগত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণাকে অতিক্রম করে প্রতিসন্দর্ভকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রান্তবর্তী এলাকায় , যে কারণে কেবল বহির্বঙ্গের বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক ছাড়াও তা হিন্দি, উর্দু, নেপালি, অসমীয়া মরাঙী ইত্যাদি ভাষায় ছাপ ফেলতে পেরেছিল ।  হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্যের ভাষা আসলে ভূমিকম্পের মতো। সেই ভূমিকম্প প্রচলিতের ভিতে আঘাত করেছিল, ক্ষত সৃষ্টি করেছিলো। যার আফটার এফেক্টে একপ্রকার উপকার হয়েছে বাংলা সাহিত্যের। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত একটি গ্রন্হ সমালোচনায় শৈলেন সরকার বলেছেন, “হাংরি-র পুরনো বা নতুন সব কবি বা লেখকই কিন্তু অনায়াসে ব্যবহার করেছেন অবদমিতের ভাষা। এঁদের লেখায় অনায়াসেই চলে আসে প্রকৃত শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দাবলি। ভালবাসা-ঘৃণা বা ক্রোধ বা ইতরামি প্রকাশে হাংরিদের কোনও ভণ্ডামি নেই, রূপক বা প্রতীক নয়, এঁদের লেখায় যৌনতা বা ইতরামির প্রকাশে থাকে অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ বিবরণ— একেবারে জনজীবনের তথাকথিত শিল্পহীন কথা।’’ এইধরণের সাহিত্য বোধেরপ্রয়োজন এখনও ফুরায়নি। মুক্তচিন্তা-বাকস্বাধীনতা এসব শুধু টার্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, মতপ্রকাশের অধিকার আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। এখনকার এই প্রচলিত সাহিত্যচর্চা সমাজকে কতোটা পরিবর্তন করতে পারছে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। বস্তুত সেই থ মেরে থাকা অবস্থা সাহিত্যে আজো কাটেনি, সাহিত্য এখনও কর্পোরেট দাসত্বে আটকে আছে। বিভিন্ন বাধ্যবাধকতায় লেখকের স্বাধীনতা এখন খাঁচায় বন্দী।  এখনও মাঝে-মধ্যে কিশোর-তরুণরা এখান-সেখান থেকে নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে গর্বিত হন । ফেসবুকে হাংরি জেনারেশন নামে তরুণদের কয়েকটা গোষ্ঠী নজরে পড়েছে। 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Malay Roychoudhury in conversation with Jayeeta Bhattacharya

Jayeeta Bhattacharya in conversation with Malay Roychoudhury

[ Jayeeta Bhattacharya, post graduate in English, and teacher,  is a poet who writes both in Bengali and English. She is the first female author who has written a bildungsroman novel in Bengali. ]

Jayeeta : Poetry or prose — in case of prose critical essays or stories and novels —  which do you prefer writing ?

Malay : I do not have any preference as such. Depends on what is happening in my brain at a particular time. Critical essays I mostly write on the request of Editors. These days I dislike writing essays ; actually, since essay writers are only a few, Editors request for essays ; in many cases Editors even select a specific subject and request me to write on it. Is it possible, tell me ? Now a days I do not like to read much or think about the society. I write fictions, once something strikes me I start writing, there is no dearth of material in my experience, I may pick up scores of characters from my own life. When an Editor requests, I send him. Poetry is really an addiction ; once the grug grips you, there is no way out other than writing. I write them on the body of emails ; when someone requests for a poem or poems, I mail him. If it is not to what I had intended to achieve I delete it completely. In fact whoever requests, I send him, without any preferences. Some editors identify a subject and request me to write on it. That creates a problem for me, as you know I do not write subject-centric poems ; I write as I please, whether it is liked or not. I do not have anything like a writing diary or pages, after 2005, because of arthritis I suffered induced by wrong medicines after angioplasty. Then I started suffering from asthma, hernia, prostate, varicose veins. Because of arthritis I was going out of writing habit, you would not be able to feel that suffering. Texts kept on crating verigoes of thoughts and I was not able to write anything. Then my daughter encouraged me to learn computer, I learned typing in Bengali, the middle finger of right hand is less affected, I use it for typing. My son has gifted this computer, he cleans it whenever he visits on holidays. For about three-four years I was not able to write because of problems with my fingers.

Jayeeta : While reading your novels one finds that the narrative techniques and forms are different from one another. From Dubjaley Jetuku Proshwas to Jalanjali, Naamgandho, Ouras, Prakar Porikha, have almost the same characters you have proceeded with, it may be called a single novel, but you have kept on changing the form and technique. Why ? Then in Arup Tomar Entokanta novel you have introduced a new technique, you have displayed three types of Bengali diction. In Nakhadanta novel you have put together several short stories along with your daily diary. Tell us something about these. Are they conscious effort ?

Malay : Yes. No editor would have published such a large novel comprising of five, obviously I wrote them at different periods, each separate from the other. Dubjaley is written based on my co-workers, I had learned that some of them are Marxist-Leninist. Writing five different novels was a sort of boon for me, I have tried to bring in novelty in all of them. When an idea comes to me I think about its form for quite some time, about its presentation, then I start writing. Quite often a form develops at the time of writing itself, such as in Nakhadanta or Arup Tomar Entokanta. While writing Nakhadanta I had gathered substantial information during field studies in West Bengal about the jute cultivators and jute mills.  Similarly, for writing Naamgandho I collected field information of potato cultivators and cold storages in West Bengal. A large number of characters in these two novels are from real life events. I have written outside of my experience as well such as Jungleromeo, based on beastiality of a bunch of criminals. I have written the fiction Naromangshokhroder Halnagad  in one single sentence, this is also imaginative, based on political divisions in West Bengal. Hritpinder Samudrajatra is based on the voyage of Rabindranath Tagore’s grandfather’s heart ripped off  from his body in a cemetery in England to Calcutta in a ship of those days ; I have criticised Rabindranath and his father in the fiction. Had Rabindranath’s grandfather lived for another ten years the industrial scene in West Bengal would have been developed. Idiot Bengalis of those days attacked his character of vices which you would find thousand times more in today’s Indian industrialists, among whom there are thieves, black marketeers, smugglers and even those criminals who have fled the country. I wrote the detective novel as a challenge, but I have dragged Indian society there as well. I am not able to write a fiction without involving Indian politics and society. Even  the lengthy story Jinnatulbilader Roopkatha which have animal and bird characters, is based on political events a personalities of West Bengal. Rahuketu is based on court case and activities of members of the Hungryalist movement. Anstakurer Electra is about sexual relations between father and daughter. I have written Nekropurush deriving on necrophilia. Chashomrango is about elasticity of time.

Jayeeta : Do you think Salman Rushdie is the ideal Postmodern novelist in the perspective of Postcolonial or Commonwealth literature ?

Malay : Rushdie is a magic realist novelist, influenced by Marquez. However chaotic it might be, the reader understands the novelist, just like in the case of Satanic Verses. American critics do not give much importance to magic realism because the technique was not invented in their country ; as a result magic realist writers are also labelled as postmodern by them. Though there are certain subtle usage of postmodern features in Rushdie’s fiction it would be incorrect to call it postmodern. If you call fictions of Gabriel Garcia Marquez as postmodern, spanish critics may shoo bulls of bullfight at you.

Jayeeta : In your fictions we do not find conventional trope of love. There are no stereotype protagonists. Have you adopted these in order to individualize your fiction as yours ? In Dubjaley Jetuku Proshwas novel, Manasi Burman, Shefali, Julie-Judy ; in Naamgandho novel Khushirani Mondal ; in Arup Tomar Entokanta Keka sister-in-law, Itu in Ouras, they are different from one another and none of them are stereotype character. You have even created a shock at the end of the fiction by revealing that Khusirani Mondal was kidnapped from East Bengal during partition and she is actually grand daughter of one Minhazuddin Khan. You have played with  self-identity in case of Khushirani Mondal ; without knowing her own origin she recites songs in praise of goddess Lakshmi, follows Hindu fasts, believes in superstitions like Chalpara . I would like to know the intricacies of Malay’s fiction in detail.

Malay :  That is because my love life has not been conventional. Secondly, the concept of central character was brought to the colonies by Europe, as a symbol of metropilitan throne. Women elder to me have first entered my life. That might be the reason for the ladies being elder to young men in relationship in my novels. In female characters obscurely there is presence of Kulsum Apa and Namita Chakroborty. The life I led during the Hungryalist movement has left its impact on female characters. Through Khushirani Mondal I have tried to indicate that how problematic is the idea of identity. Look at today’s Indian society, because of identity politics the society is getting fragmented, skirmishes are taking place daily, Dalits are being beaten up, Muslims are being driven out of their home and hearth. By banning beef livelihood of hundreds of families have been destroyed, Posrk is banned in Islam, but in Dubai malls you’d get shop corners in which pork is sold. From identity politics we have reached jingoism. Let me tell you about my marriage ; I had married Shalila within three days of proposing to her, both of us liked each each other at first sight. I have written these incidents in my memoir. Shalila’s parents died when she was a kid ; I am unfortunate that I did not get the affection of a Bengali mother-in-law.

Jayeeta : In Dubjaley Jetuku Prashwas novel Manasi Burman’s excess breast milk was kept on a table after she pumped it out. Atanu Chakraborty who had come to visit her suddenly picked it up and drank it. Why did he do it ?

Malay : Atanu’s mother had died recently ; he had sexual relation for several months  with two Mizo step sisters Julie and Judy  at the Mizo capital where he had gone  for official work and was quite depressed. When he found a mother’s milk on the table of Manasi Burman he felt the absence of his mother and instinctively gulped the milk. In later novels Ouras and Prakar Parikha I have explored the strange sexual relations between Atanu Chakraborty and Manasi Burman, they had by then joined the Marxist-Leninist bandwagon.

Jayeeta : How far globalization impacted Bengali literature. Do you think that globalization is withering away ?

Malay : I can’t tell you about the current state of affairs. These days I do not get much time to read. We are both quite old and have to share family activities, going to market, cleaning home, peeling and cutting vegetables, helping my wife in cooking etc — I do not get much time. I have not read any novel after introduction of globalization. Because of Brexit and Donald Trump’s withdrawal from international politicking globalization has weakened ; only China is interested in selling their products ; our markets have already been captured by China. However, colonial Bengali literature was possible because of Europe. Bankimchandra started writing novels in European form. Michael Madhusudan Dutt wrote Amitrakshar in European form. Poets of thirties started writing in European form, so much so that academicians have been pointing out Yeats’ influence on Jibanananda Das, Eliot’s presence in Bishnu Dey’s poems. Before the British arrived, our literary style was completely different. Symbol, metaphor, image etc were Europe’s contribution. I do not have much knowledge about modern songs, but critics talk about Tagore having been influenced by Europe, in fact some tunes are said to be same as certain European songs. Singing changed after arrival of Kabir Suman.

Jayeeta : There is opacity in understanding of Remodern, Postmodern or Alt-modern even among the poets of Zero decade. What are the reasons ? How far Bengali literature on the same level as that of international literature ?

Malay : Even if there is opacity in understanding you would find influences. And it would be incorrect to presume that everybody’s mind is full with smoke. Some are well educated. Some do not have any interest, they want to write as they please. Without any understanding of Remoden, Postmodern, Structuralism, Poststructuralism, Feminism one may write as he pleases. Kabita Singha did not know about Feminist theories but she has written Feminist poems. The type of rhymed poems being written in Bengali commercial magazines are no more being written in Europe, their images are fragmentary and have speed. If one reads the poems in Paris Review or Poetry magazine one would find that they are being written in easy dictions, abandoning complexities, whereas many young poets have resorted to complex Bengali poetry writing. The point is that poets do not like to be branded by labels. Everybody wants that his name should be known, not within any arena of a label. I myself feel disgusted because of Hungryalist label. Most of the readers do not know beyond Stark Electric Jesus.

Jayeeta : Now let us discuss some of your personal issues. You have written about your growing up period in Chhotoloker Chhotobela and Chhotoloker Jubobela. You have written about the Hungryalist period in Hungry Kimbadanti and Rahuketu. However, the later Malay Roychoudhury remains unpublished for sometime. Tell me about this period. Did you not write or they are unpublished ? Tell us about this transitional period.

Malay : I have already written, I have covered the entire period. In the latest issue of Akhor little magazine I have written about the entire period titled Chhotoloker Jibon. It is to be published by Prativas with the title Chhotoloker Sarabela. I have sent you a copy of Chhotoloker Jobon, you may like to go through. Amitava Praharaj has written that readers were purchasing this copy of Akhor as people buy bottles of Rum before Gandhi’s birthday, since intoxicants are not sold on Gandhi’s birthday.

Jayeeta : What is the difference between Malay as a person and Malay as a writer ? How do you see yourself ?

Malay : I do not think there is any difference. However, I have tried to destroy the image of my identity as a person ‘Malay’ ; I am not satisfied just by destroying the language as such. Like any other person I go to the market, bargain during purchases, resorted to flirting during my youth with a fisher-girl, drink single malt in the evening. During the Hungryalist movement I used to smoke marihuana, hashish, opium, took LSD capsules and drank country liquor. The attire I am in during the day is the attire I am in when guests visit, even if they are women. I do not change they way I talk if someone visits, though I had seen some poets and authors talk in a peculiar limpid way in Kolkata. Most of them are Buddhadeva Basu’s students. I talk in Hooghly district lingo mixed with Imlitala diction. As a person and as a writer I belong to Imlitala, which makes it easier to break my image.

Jayeeta : Tell me about your contemporary writers who have not been properly evaluated by Kolkata-centric literary groups.

Malay : No evaluation is made at all and you are talking of proper evaluation. So much cultural-political groupism takes place that works of  talented writers and poets are not evaluated, specially fiction writers remain neglected. Tug of war is played with literary prizes. For the same cultural-political reasons CPM people were driven out of Bangla Academy, though they also were well educated and wise men. A new bunch has come who are lavishing their dear writers with awards. The Establishment does not give importance to those who have avoided both sides. For example Kedar Bhaduri, Sajal Bandyopadhyay.

Jayeeta : Has there been any change in your consciousness after reaching life’s twilight ? I am talking about philosophy of life.

Malay : Now I like solitude, I do not want to keep on talking, my wife also does not like too much talking. We do not go to celebrations. Avoid lunch or dinner invitations, for health reasons. Here in Mumbai, if I talk about relatives, my wife’s cousin and her husband lives in Andheri, who is six years older than me. Sometimes I ponder over the problem of gathering people to take me to the crematorium when I die. I wanted to get cremated where my mother was cremated. Or the best thing would be to donate the body. That depends on the condition of the body after my death. My wife is agreeable to this proposition. If she dies first, I also do not have any reservation. Problem is that because of arthritis I am not able to sign, my wife has to do it everytime when I visit a bank.

Jayeeta : Now a days your life and literary works are subject to research and dissertation. Readers in Kolkata want to know more about it.

Malay : It  has started from about ten years back. First Ph D was written by Bishnuchandra De and M Phil was written by Swati Banerjee in 2007. Marina Reza had come from USA for a research project on the Hungryalist movement. Daniela Limonella is working on the subject at Gutenburg University. Rupsa Das, Probodh Chandra Dey have written M Phil papers. Nayanima Basu, Nickie Sobeiry, Jo Wheeler from BBC, Farzana Warsi, Juliet Reynolds, Sreemanti Sengupta have written about our literary movement. Maitreyee B Chowdhury has written a book titled The Hungryalists which have been published by Penguin Random House. I know about them because they had contacted me. Some researchers do not contact me and approach Sandip Dutta’a Little Magazine Library for information, such as Rima Bhattacharya, Utpalkumar Mandal,Madhubanti Chanda, Sanchayita Bhattacharya, Mohammad Imtiaz, Nandini Dhar, Titas De Sarkar, S. Mudgal, Ankan Kazi, Kapil Abraham and others. Udayshankar Verma wrote his Ph D dissertation at North Bengal University, he did not contact me, neither did he cover the entire literary movement. He could have gathered more information and documents had he contacted Dr Uttam Das. Deborah Baker did not meet any of us nor did she visit Sandip Dutta’s Library and wrote abracadabra in The Blue Hand based on what Tarapada Roy told her.  Rahul Dasgupta and Baidyanath Misra have edited a collection of research papers and interviews titled Literature of The Hungryalists : Icons and Impact ; this book have photographs of all the Hungryalists. Samiran Modak has collecte the issues of Zebra edited by me in 1960s and published it recently ; he is trying to anthologize all Hungryalist periodicals. 

Jayeeta : You have worked in various genres of literature. Do you have any other subject in mind to write about ?

Malay : I am thinking of writing a fiction on a Baul couple who in their youth were involved in Naxal movement and the other in anti-Naxal or Kangshal gang. The fall in love after renouncing their earlier role when they become Bauls. But I am unable to construct the characters around them to carry the fiction forward. The idea came after reading Faqirnama by Surojit Sen. Since I do not have personal experience about these mendicants I could not proceed further. Here also the woman is elder and has more experience for having changed partners several times. They call themselves Mom and Dad. Sarosij Basu has requested to write an essay on the present social conditions of the country, nationalism, patriotism, riots, beef eating, suppression of undercastes etc for his periodical Bakalam,. I have started writing under the title of Vasudaiva Jingovadam. Problem is, I am unable to sit at the computer for long.

Jayeeta : You seem to be like Homer’s Spartan heros. You do not care about being attacked, people talking against you, writing against you. Where from do you get the life-force ? Who is your inspiration ?

Malay : Your question seems to be based on your experience of having watched Hollywood-Bollywood films. Is it ? Rambo, Thor, Gladiator etc heros. I was handcuffed and a rope tied around my waist during my arrest for having written Stark Electric Jesus. I was made to walk in that condition with seven criminals. After the Khudharto group testified against me in the Court, nothing bothers me, lot of people of the Establishment write against me, abuses me, specially the disciples of Khudharto group. When I started writing, Kulsum Apa, Namita Chakraborty, our Imlitala helping had Shivnandan Kahar and Dad’s helper at his photo-shop introduced me to poets. The latter two had byhearted Saint poets and would quote from them for scolding us. My wife and son do not have any interest in my writing. My daughter has but she does not have much time, recently she suffered from a cerebral stroke as well. I do not know whether there is really anything called inspiration. I think I am my own inspiration, when I walk the streets inspirations keep on getting accumulated in my brain.

Jayeeta : Tell your devoted readers about your present daily life.

Malay : Do you think I have devoted readers ? I do not think so. I get up first in the morning, wife gets up late, as she does not get good sleep during night, takes homoeopathic medicines during the night. After brushing I do some free hand exercise, taught to me by the physiotherapist. Drink a glass of lukewarm water to keep bowels clean. Prepare breakfast, oats. Then while reclining on the easy chair I go through The Times of India. I do not get Bengali newspaper in our locality. It is an area of Gujarati brokers who purchase one Financial Times which is consulted for the share market news by dozens of persons. I have never invested in shares and do not find any interest in talking to them. If I request the hawker he will deliver four days’ Bengali newspaper in a bunch. Then I go through the little magazines received by post. After physiotherapy I prepare tea, green tea. By that time my wife gets up and serves oats and fruits. I complete my breakfast. Her breakfast is completed around Eleven. Then I go to the market. Fish is delivered by the shop whenever we ring them for a particular type of fish. I do not eat meat anymore though my wife loves it but unless you go to the butcher you will not get good portion ; my daughter in law, whenever she comes from Saudi Arabia on holidays, she brings cooked meat. About eleven I sit at the desktop and start thinking ; browse through Facebook and Emails. Take bath at about one, have lunch with my wife, then have a nap. From six I repeat at the desktop. I write during this time. Now a days I am translating foreign poets. After having dinner, take a sleeping pill and go to bed. This the time to brood and lots of ideas come swarming.

Jayeeta : These days poets are being categorised in to decades ; they are being categorised on the basis of the districts they live in as well as subjects they specialize in. What is your opinion ?

Malay : It is a time induced phenomenon. Time will sieve out those who are not attuned to a particular time. The number of poets have increased in the districts. When such anthologies are published we would be able to have an idea of the effects of local diction and ecology of the space in their poems. I do not know to which district I belong. Ancestors had come from Jessore to Calcutta and settled at Barisha-Behala of Calcutta. One of the descendant settled at Uttarpara in Hooghly district in 1703, I am from his bloodline. Now the Villa he built has been demolished and I have sold off my portion. Then I stayed in a flat at Calcutta’s Naktala. Thereafter came to Mumbai after donating all my books and furnitures etc. The house I once left, I have never gone back to live there again. I have not spent my life in the same room, same house, same locality, same city. 

Jayeeta : Literary periodicals have now discovered micro-poems. What is your idea about it. Should an Editor specify the number of words or lines ? The poet finds himself at sea in such cases.

Malay : This also has happened because of increase in number of poets. To accommodate a large number of poets in a particular issue of the periodical such publications have come into vogue. But Ezra Pound had written imagist poems after being influenced by Chinese and Japanese poems. He had written a poem titled “In a Station of the Metro” which is the best short poem ever written. Here it is:

The apparition of these faces in the crowd ;

Petals on a wet, black bough.

Jayeeta : Tell us about your international connection, your introduction to World literature. Have you been fascinated by any foreign poet or writer? With whom your friendship has been quite close ? Are they present day foreign readers aware about your work ?

Malay : During the Hungryalist movement I had known Howard McCord, Dick Bakken, Allen Ginsberg, Laswrence Ferlinghetti, Margaret Randall, Daisy Aldan, Carol Berge, Daiana Di Prima, Carl Weissner, Allan De Loach and others. During my arrest Police had seized all letters which I did not get back with many books, manuscripts and other things. These days people from print and electronic media visit me for interviews. BBC representatives had come for their Radio Channel 3 and 4 programmes. Daniela Limonella had visited a few times, she is writing a dissertation on our movement ; my wife also loves her. I do not know whether you have read Maitreyee B Chowdhury’s book “The Hungryalists” published by Penguin. Baidyanath Misra and Rahul Dasgupta has edited an anthology of dissertations by academicians along with interviews of some of us. Recently painter Shilpa Gupta visited and presented me with sets of colours, brushes etc to enable me to paint.I have started experimenting with colours. In Mumbai students often visit for collecting information. Recently a Turkish periodical has written about me and translated my poem Stark Electric Jesus. Turkish writer Dolunay Aker has interviewed me which will be published in Turkey shortly.

Jayeeta : When did you start writing poems ? Why ? Because your elder brother Samir used to write ?

Malay : In 1958 my Dad had presented me with a beautiful diary in which I started writing. At that time I wrote both in Bengali and English. Samir started writing after me. When Sunil Gangopadhyay visited our Patna residence he evinced interest and Samir gave him some of my poems which Sunil published in his magazine “Krittibas”. Later Sunil became very angry because of the Hungryalist movement. In an interview to “Jugashankha” Sunil had told Basab Ray that “Malay deliberately took the opportunity as I was in America at that time.” 

Jayeeta : Without going into the details of Hungryalist movement I would like to ask whether the poetic diction of that time had any influence of Nicanor Parra or Beat Generation poets ?

Malay : To be frank, till then I had not read them. In fact I was not aware about their names. Foreign poets meant romantic British poets. In my poems you will find influences of Magahi and Bhojpuri diction because of my childhood spent at Imlitala slum of Patna. I read Beat literature after Lawrence Ferlighetti and Howard McCord sent me some books. Moreover all Beat prose and poems have not been written in same style. We in the Hungryalist movement did not follow the same diction and style. Some of my friends after joining CPI ( M ) party started writing in a different vein.

Jayeeta : The poems you had written during the first phase were different from your present day style and diction. During the first phase there were elements of disruption. Their syntax and diction structures were astounding. In the subsequent phase your family life, experience have weighed upon your work; poetry has become like deep sea and up-wailing.

Though there is no similarity, even then one may find out that you are the author. Tell us something about it.

Malay : During that phase my poems had testosterone, adrenalin. We used to fund our own broadsides and periodical and felt free to write as we pleased. We were in a world of drugs and Hippie Colony. Now after having read so much and experience of touring almost entire India, the changes have come automatically. In between I did not write for fifteen years and concentrated on reading.

Jayeeta : Do you think Postmodern poetry is being written in Bengali ?

Malay : Yes, definitely. What is known as postmodern features are seen in the poems of almost all contemporary poets. Some young writers compose wonderful and stunning  lines and images ; I rather feel jealous. You may read Barin Ghoshal. Alok Biswas, Pronab Pal, Dhiman Bhattacharya. But there are differences between postmodern philosophy and postmodern literature.

Jayeeta : Who are the contemporary poets you love to read, in Bengali as well as in foreign languages ?

Malay : In Bengali, Binoy Majumdar, Manibhushan Bhattacharya,  Falguni Roy, Kedar Bhaduri, Jahar Senmajumdar, Yashodhara Raichaudhury, Mitul Dutta, Anupam Mukhopadhyay Helal Hafiz, Rudra Muhammad Shahidulla, Pradip Chowdhuri’s “Charmarog” — I am not able to remember all the names immediately. In foreign poets I would name Paul Celan, Sylvia Plath, Maya Angelu, John Ashbery, Amiri Baraka, Yeves Bonneyfoy, Jaques Dupan. I am not naming more ; you may start searching for influences. Recently I have started translating most of the European Surrealist poets, Arab, Turkish and Russian poets and I am sure there may be influences creeping in to my own poems. Though I do not write much.

Jayeeta : Lot of research is going on about Hungryalist movement and your work in English. Do you feel proud about it ? Do you think you have achieved what you had started for ?

Malay : Nothing happens to me. Those who used to denigrate and attack me, I suppose they feel distressed. A few days ago Kamal Chakraborty had expressed his anguish. Actually I was offended when Kamal agreed to publish a poetry collection of mine. However the book was a disaster in publishing with newsprint papers and ordinary cover compared to his own book. But I no  longer keep my books and do not bother about them. Publisher Adhir Biswas agreed to publish all my books but backed out because of unknown reasons; he also told other publishers not to publish my books. Calcutta Literature scene has become quite dirty.

Jayeeta : Syllables or rhymes, what should be followed ?

Malay : I do not count syllables. I write based on breath spans.

Jayeeta : You tell us to keep updated with foreign poetry but in poetry is it not necessary to maintain Bengali sentiment and own Bengali diction ? If one follows foreign poetry, can it be called copying or following ? Jibanananda Das and many other poets had to face such complaints?

Malay : If one reads poems in other languages one may have an idea as to in which way world poetry is moving. There is no need to copy.

Jayeeta : In fictions, writers during Hungryalist movement had not used local Bengali diction or dialogoues  of the marginal society. What could be the reason ?

Malay : At that time most of the writers were Calcutta-centred. When muffasil writers started writing marginal people and their voice entered literature. In 1965 Subimal Basak Had written “Chhatamatha” in Dhaka’s kutty peoples language. Rabindra Guha and Arunesh Ghosh had also brought the lingo of the local and marginal. 

Jayeeta : In literature sexuality has entered as Art but entirely in explicit and uncompromising way. Readers are stunned. You people had brought 

Activities of the bed and sex in creativity. I would talk about you. Sexuality has been highlighted in various ways, in poetry, sometimes through characters in fiction or in memoirs, specially in your life-based fiction “Arup Tomar Entokanta”. Please talk about it.

Malay : Sexuality existed in Sanskrit and Bengali literature from antiquity. During British rule, after the Evangelical Christians poked their nose in the syllabus of schools and colleges a new middle class appeared and they started hesitating with sexuality in literature. Thereafter the Brahmo Samaj people arrived, specially Rabindranath Tagore. When literature got out of the clutches of middle class, sexuality in literature got its rightful place.

Jayeeta : You had proposed to your would be wife Shalila the day after you two were introduced and she agreed instantly ; since Shalila’s guardians were hesitating to agree immediately, you had purchased rail tickets to Patna to elope. But when the guardians agreed you got married within a few days and returned to Patna with your wife. Did you think her behaviour to be strange for agreeing immediately. Did your parents react annoyingly to your decision ?

Malay : No. Shalila was a field hockey player, had reacted like a sports-girl. Moreover she did not have her parents. She wanted to get out of the oppressing establishment of maternal uncles. The uncles hesitated as Shalila’s income from her job was useful for them. If we had eloped then there would have been problems with her job which she did not want to quit. For getting a transfer to Patna she required legal documents. You are a teacher, you know how important it is for women to be financially independent. My parents were very happy when I reached Patna with Shalila. They thought I might become a lout if I do not get married. But no rituals were performed at Patna. 

Jayeeta : After marriage you left your Patna job and joined Agricultural Refinance and Development Corporation at Lucknow, from there you went to Mumbai to join NABARD ; thereafter you came back to NABARD, Calcutta. Returning after so many years did you feel that the Hungryalist days are no more there at Calcutta ?

Malay : Only after going to Lucknow I came to know Indian village life. Prior to that I had no idea about cultivation, jute and cotton mills, carpentry, handicraft, tribal life etc. I did not know there were so many types of cattles, pigs, goats, camels and their breeding methods. I toured almost entire country. When I came to Calcutta, I took along Shalila with me so that she enters the houses of villagers to find out their way of life. I have utilised those information in my fictions as well as essays. What you said is correct. When I returned West Bengal the society had changed completely. Some critics have written that I was in a government job. That is not correct. The Finance Commission increases pays and pensions of government workers but my pension remains that same as I am not a government worker.

Jayeeta : Do you watch Bengali serials ? Films ?

Malay : Shalila watches some serials, but she does not stick to any one story. If she feels a girl is not being treated properly she shifts to another serial midway. During dinner time I also watch with her. Here in Mumbai there is no scope to talk and listen to people talking in Bengali. The Bengali serial is helpful in keeping in touch with the way people talk in present day Bengali. I watch short films also on my desktop but the problem is my sound system does not work properly ; the desktop is very old, it belonged to my son when he was in college. Moreover I am not able to sit continuously in front of the computer for a long time. I have not been to any cinema hall for about thirty years.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান