মলয় রায়চৌধুরীর মুখোমুখি গোবিন্দ ধর

মলয় রায়চৌধুরীর মুখোমুখি গোবিন্দ ধর

ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৮, দুই মাস প্রশ্নোত্তরে মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোবিন্দ ধর

গোবিন্দ : আপনি প্রচুর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন । দুটি সংকলন আছে আপনার সাক্ষাৎকারের। কিন্তু বেশিরভাগ প্রশ্নকর্তা হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন । আপনার জীবন, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গ্রন্হাবলী নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন কেউ করেননি । আমি সেই ধরনের প্রশ্ন করতে চাই, যা অন্যেরা করেননি । আপনার শৈশব কেটেছে পাটনার ইমলিতলা নামে এক অন্ত্যজ বস্তিতে, সেখানে কৈশোরে কুলসুম আপা নামের এক কিশোরীর সঙ্গে আপনার জীবনে যৌনতার প্রথম পরিচয় । তা কি প্রেম ছিল ? আপনার ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ হিসাবে কি কাজ করেছিল ঘটনাটা ?

মলয় : না, তা প্রেম ছিল না । উনি আমাকে গালিব আর ফয়েজের কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর নিজেই এগিয়ে এসে সংসর্গ পাতিয়েছিলেন । ইমলিতলা পাড়া ছিল চোর,ডাকাত, পকেটমার অধ্যুষিত গরিব দলিতদের পাড়া, তাদের বাড়িতে অবাধে ঢুকে পড়া যেতো । কুলসুম আপাদের বাড়িতেও, এমনকী ওদের শিয়া মসজিদের ভেতরেও খেলা করার সময়ে ঢুকে লুকিয়েছি, নামাজ পড়ার মাদুরের পেছনে লুকিয়েছি । এখন ভারতীয় সমাজ এমন স্তরে পৌঁছেচে যে অমন বাল্যকাল অভাবনীয় মনে হবে । আমার ধর্মনিরপেক্ষতা বা ব্যাপারটাকে যা-ই বলো, ওই পাড়াতেই সূচিত হয়েছিল । দাদা সমীর রায়চৌধুরী এই অভিজ্ঞতাকে বলেছেন একলেকটিক ।  রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়ার সময়ে আমার ক্রাশ ছিলেন গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, যাঁর প্রভাবে আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে এনার নাম সুমিতা চক্রবর্তী । উনি আমাকে ব্রাহ্ম কবি-লেখকদের রচনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ।

গোবিন্দ : সেই পাড়ায় আপনারা নাকি পোড়া ইঁদুর, শুয়োরের মাংস, ছাগলের নাড়িভূঁড়ির কাবাব, তাড়ি, দিশি মদ, গাঁজা ইত্যাদি খেতেন । বাড়িতে তার জন্য পিটুনি খেতেন না ?

মলয় : দাদা বলতো বাড়িতে বলবি না, মৌরি খেয়ে নে । কিন্তু মুখে গন্ধ শুঁকে মা টের পেয়ে যেতেন আর বকুনি দিতেন । কিন্তু পাড়ার লোকেদের টানে আবার অমন কাণ্ড করতুম । এই সমস্ত কারণে দাদা ম্যাট্রিক পাশ করার পর বাবা  ওনাকে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন, আর নিজে একটা ঝোপড়ি কিনে দরিয়াপুর নামে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় বাড়ি করেন। আমি সেই বাড়িতে একা থাকতুম । আমার বাল্যস্মৃতি ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ আর ‘ছোটোলোকের যুববেলা’ পড়লে জানতে পারবে নানা ঘটনা । সিটি কলেজে দাদার সহপাঠী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । চাইবাসা আর ডালটনগঞ্জে দাদা মৎস্য বিভাগে পোস্টেড থাকার সময়ে প্রচুর মহুয়ার মদ খেয়েছি। দাদা হরিণের মাংস খাবারও ব্যবস্হা করে দিতেন । কতো রকমের মাছ যে খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই ; গেঁড়ি-গুগলির বিরিয়ানিও খেয়েছি । তবে সবচেয়ে কড়া মদ হলো সালফি, অবুঝমাঢ় জঙ্গলের উপজাতিরা খায় । সালফি গাছ অনেকটা খেজুরগাছের মতন, খেজুরের মতনই রস বের করে, অবশ্য বেশ গাঢ়, ওদের দুবেলার নেশা আর ভোজনপর্ব তাতেই হয়ে যায় । ওখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ঔরস’ নামে আমার একটা উপন্যাস আছে ।

গোবিন্দ : ওই পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন ? গরিব নিম্নবর্ণের বিহারি ছেলে-মেয়ের সঙ্গে ?

মলয় : হ্যাঁ, তাছাড়া আর কাদের সঙ্গে খেলবো ? স্কুলে ভর্তি হবার পরও ওদের সঙ্গে খেলাধুলা করতুম । স্কুলের বন্ধুরা কেউ ইমলিতলায় আসতো না । এমনকি তথাকথিত সংস্কৃতিবান বাঙালিরাও ইমলিতলা পাড়া এড়িয়ে চলতেন । ছোটোবেলায় নর্দমা থেকে লাট্টু, ড্যাঙ্গুলি, মার্বেল, রবারের বল কাঠি দিয়ে তুলে রাস্তার কলের জলে ধুয়ে নিয়ে খেলতুম । নর্দমাগুলো ছিল অত্যন্ত নোংরা, তাতে পাড়ার বাচ্চারা হাগতো । বাড়িতে জানতে পারলে বড়োজেঠিমা গায়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে দিতেন । বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই যে হাংরি আন্দোলনে এই পাড়ার অবদান কতোটা ।

গোবিন্দ : আপনার নাকি এক জাঠতুতো ভাই ছিল যাকে বড়োজেঠামশায় এক বেশ্যার থেকে কিনেছিলেন ?

মলয় : হ্যাঁ, ছিল । মেজদা । অনেককাল পর্যন্ত জানতুম না যে মেজদাকে কেনা হয়েছিল । মেজদা যখন জানতে পারল তখন বাংলায় কথা বলা বন্ধ করে কেবল হিন্দিতে কথা বলতো। পাড়ার প্রভাবে গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিল । কম বয়সে মারা যায় । তবে মেজদার দাপটের দরুণ কেউ আমাদের ঘাঁটাতো না । 

গোবিন্দ : আপনি নিজেই নিজের ইনটারভিউ নিয়েছিলেন শুনেছি । কাদের ছিল অমন প্রস্তাব ?

মলয় : চন্দননগরের ‘দাহপত্র’ পত্রিকার সম্পাদক কমলকুমার দত্ত’র আইডিয়া ছিল । দাহপত্রতে প্রকাশিত হবার পর পুস্তিকার আকারে ২০০৪ সালে বইমেলায় বেরিয়েছিল। পুস্তিকাটার নাম দেয়া হয়েছিল ‘প্রতিস্ব পরিসরের অবিনির্মাণ’ । প্রচ্ছদে পোরট্রেট এঁকে দিয়েছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী । এবার চান্স পেলে অন্যরকম আত্ম-প্রশ্ন তুলবো ।

গোবিন্দ : হাংরিদের বোহেমিয়ান বলা হয় কেন ?

মলয় : বাঙালির সনাতন সমাজের অনুশাসনে খাপ না খেলে ব্যক্তির আউল, বাউল, ফকির, সাধু, সন্ন্যাসী, বহুরুপী, বৈরাগী ইত্যাদি হবার সুযোগ ছিল, এখনও আছে । ঘটনাটাকে প্রাকৃতিক বলে মেনে নিতো সমাজ । এই কারণেই বোহেমিয়ান নামে কোনো ভাবকল্প বঙ্গসমাজে ছিল না । অথচ আধুনিকতাবাদী ও নবজাগৃতিবাদী ইউরোপে, সংস্কৃতি ব্যাপারটার উদ্ভবের দরুণ, যারা সমরূপতায় খাপ খায় না, তাদের বেয়াদপি সামলাতে ঘোর ঝামেলায় পড়েছে সমাজ । তাদের লাইনে এনে সংস্কৃতিবান করার জন্য  অনুভব করেছে একটি আধিপত্যবাদী নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা । সনাতন সমাজে যা ছিল স্বাভাবিক তা হয়ে গেল অস্বাভাবিক । যে খাপ খায় না সে ‘অপর’ । ইউরোপের নতুন ব্যবস্হা অনুযায়ী তাদের সংশোধন, দোষত্রুটিমুক্ত করে নেবার ফন্দিফিকির তৈরি করা হলো । ফলে সামাজিক স্হিতি আনতে রাষ্ট্র হয়ে উঠলো জরুরি । রাষ্ট্র তার সংস্হাগুলোর মাধ্যমে লাটের পর লাট একই রকম মানব উৎপাদনের কারখানা হয়ে গেল । যারা সেই ফ্রেমওয়র্কের বাইরে, তাদের ‘বোহেমিয়ান’ তকমা দেবার চল শুরু হলো । এদেশে তাদের নকল করা আরম্ভ করলো সমাজের কর্তারা ।

গোবিন্দ : নবারুণ ভট্টাচার্যের গল্প-উপন্যাস আলোচনার সময়ে প্রবুদ্ধ ঘোষ বলেছেন নবারুণ সমাজ নিয়ে ভাবতেন । হাংরিরা আত্মচিন্তার লেখা লিখতেন । আপনি কী বলবেন ?

মলয় : প্রবুদ্ধ ঘোষ একটা হাংরি বুলেটিন পড়ে নিজস্ব ধারণা গড়ে নিয়েছেন । উনি হাংরিদের রাজনীতি বিষয়ক, ধর্ম বিষয়ক, অশ্লীলতা বিষয়ক ইশতাহারগুলো পড়েননি । তাছাড়া আমি ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালি সমাজের, বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার প্রবন্ধগুলোতে,  ‘পোস্টমডার্ন কালখণ্ড ও বাঙালির পতন’ পুস্তিকায় যেটা প্রকাশ করেছিলেন সুকুমার রায়, ‘খনন প্রকাশনী, থেকে এবং আমার প্রবন্ধ ‘উত্তরদার্শনিকতা’তে যা প্রমা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । দুটো প্রবন্ধই আমার প্রবন্ধসংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ডে আছে । বইটা মুর্শিদ প্রকাশ করেছে আবিষ্কার প্রকাশনী থেকে । আসলে, কৌম-নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে পারে না । সে নানারকম কৌমের অন্তর্গত । যেমন একজন বাংলাদেশি মানুষ একই সঙ্গে বাংলাভাষী কৌম, ইসলামি কৌম, সুন্নি কৌম ইত্যাদির অন্তর্গত– সে ইংল্যাণ্ডে গিয়েও বাঙালি হোটেল খোঁজে, বাঙালিদের আড্ডা খোঁজে । প্রবুদ্ধ ঘোষ, মনে হয়, আমার কোনও প্রবন্ধের বই আর উপন্যাস পড়েননি , যতোটা উনি নবারুণ ভট্টাচার্য পড়েছেন।

 গোবিন্দ:  :  আপনারা, হাংরিরা, শুনেছি যৌনকর্মীদের পাড়ায় যেতেন । ‘কৃত্তিবাসের’ কবি-লেখকরাও যেতেন অথচ তা স্বীকার করেননি নিজেদের জীবনীতে ; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ওনার ‘অর্ধেক জীবন বইতে চেপে গেছেন । ওনারা বুদ্ধদেব বসুর বোদলেয়ার পড়ে আর আপনাদের সংবাদ পড়ে হাংরিদের নকল করা আরম্ভ করেন বলে মনে হয় । সুনীলের এই ‘হিমযুগ’ কবিতা পড়লে আপনাদের আর সোনাগাছির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। উনি লিখেছিলেন,“শরীরের যুদ্ধ থেকে বহুদূর চলে গিয়ে ফিরে আসি শরীরের কাছে/কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে-/শিশিরে ধুয়েছো বুক, কোমল জ্যোঃস্নার মতো যোনি/মধুকূপী ঘাসের মতন রোম, কিছুটা খয়েরি/কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে-/আমার নিশ্বাস পড়ে দ্রুত, বড়ো ঘাম হয়, মুখে আসে স’তি/কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে।/নয় ক্রুদ্ধ যুদ্ধ, ঠোঁটে রক্ত, জঙ্ঘার উত্থান, নয় ভালোবাসা/ভালোবাসা চলে যায় একমাস সতোরো দিন পরে/অথবা বৎসর কাটে, যুগ, তবু সভ্যতা রয়েছে আজও তেমনি বর্বর/তুমি হও নদীর গর্ভের মতো, গভীরতা, ঠান্ডা, দেবদূতী/কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে।/মৃত শহরের পাশে জেগে উঠে দেখি আমার প্লেগ, পরমাণু কিছু নয়,/স্বপ্ন অপছন্দ হলে পুনরায় দেখাবার নিয়ম হয়েছে/মানুষ গিয়েছে মরে, মানুষ রয়েছে আজও বেঁচে/ভুল স্বপ্নে, শিশিরে ধুয়েছো বুক, কোমল জ্যোৎস্নার মতো যোনী/তুমি কথা দিয়েছিলে…../এবার তোমার কাছে হয়েছি নিঃশেষে নতজানু/কথা রাখো! নয় রক্তে অশ্বখুর, স্তনে দাঁত, বাঘের আঁচড় কিংবা/ঊরুর শীৎকার/মোহমুগ্ধরের মতো পাছা আর দুলিও না, তুমি হৃদয় ও শরীরে ভাষ্য/নও, বেশ্যা নও, তুমি শেষবার/পৃথিবীর মুক্তি চেয়েছিলে, মুক্তি, হিমযুগ, কথা দিয়েছিলে তুমি/উদাসীন সঙ্গম শেখাবে।”

মলয় : কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবিদের কবিতায় বাঁকবদল ঘটেছিল হাংরি আন্দোলনের প্রভাবে। শরৎ মুখোপাধ্যায়ও হাংরি আন্দোলনের প্রভাবে অমন অভিজ্ঞতার কবিতা লিখেছিলেন, এই যেমন, কৃত্তিবাসের ষোল নম্বর সংকলন সম্বন্ধে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ষোল নম্বর সংকলনে কৃত্তিবাস ফেটে বেরুল। তারিখ ১৩৬৯ চৈত্র। কবিত্বের খোলস ছেড়ে একদল অতৃপ্ত যুবকের অকস্মাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্যে  প্রচন্ড অস্বস্তি ও বেগের প্রয়োজন ছিল। অ্যালেনদের সাহচর্য তা জুগিয়েছিল আমাদের । ঘামে নুন, যোনিদেশে চুল( পৃঃ ৫), দেখেছি সঙ্গম ঢের সোজা, এমনকি বেশ্যারও হৃদয়ে পথ আছে ( পৃঃ ২২)  , যোনির ঝিনুকে রাখা পোকাগুলি মুক্তা হয়ে গিয়েছে বিস্ময়ে ( পৃঃ ৪৫),আসলে যে কান্ড ঘটেছিল সব কবিদের  বুকের মধ্যে তা হল প্রচন্ড বিরক্তি থেকে উদ্ভুত ধ্বংস করার ইচ্ছে – সৃষ্টির নামান্তর – যা কিছু পুরনো পচা, ভালমন্দ সোনারুপোর খনি, এমনকি নিজেদের শরীর ও অস্তিত্ব – সর্বস্বের সর্বনাশ। “ ( শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় , কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কৃত্তিবাস পঞ্চবিংশ সংকলন, ১৯৬৮)। তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যায় যে ওনারা হাংরিদের টেক্কা দেবার চেষ্টা করছেন ।

গোবিন্দ : ওনাদের গোষ্ঠীতে শরৎকুমার কিন্তু স্পষ্টবক্তা ছিলেন, যা ভাবতেন তাই লিখতেন। বীজেশ সাহার ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় উনি লিখেছিলেন, ( কৃত্তিবাস, এপ্রিল-জুন, ২০১৭ ) : “শঙ্খ ঘোষ মহাশয় কিছুদিন আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার গ্রহণ করলেন । কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর হাত থেকে তিনি অন্য একটি পুরস্কার নিতে অসন্মত হন, কারণ তিনি ছিলেন হিন্দুবাদী, বিজেপি পার্টির নেতা । শঙ্খ ঘোষ যে সিপিএম-সিপিআই দলের সমর্থক এ কথা আমরা আগেই জানতাম, কিন্তু একথা জানতাম না প্রধানমন্ত্রী পদ পেলেও পার্টির নামের দুর্গন্ধ মোছে না। কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষকে আমি পঞ্চাশ দশকের প্রধানতম কবি বলতে চাই না । আমার মতে, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রধানতম কবি । তারপর প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত এবং আলোক সরকার ।”

মলয় : শঙ্খ ঘোষ লোকটি সত্যিই অদ্ভুত ছিলেন । ‘শব্দ ও সত্য’ নামে একটা প্রবন্ধ ১৯৭১ সালে লিখেছিলেন, অথচ জানতেন না যে মামলাটা আমার বিরুদ্ধে হয়েছিল, পঁয়ত্রিশ মাস ধরে, আর আমার সাজা হয়েছিল । আমি অনুবাদের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলুম, তা উনি বিশ্বাস করেননি, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে বলে আমার চিঠির কপি আনিয়েছিলেন । আসলে শৈলেশ্বর ঘোষ ওনাকে যা বোঝাতো উনি তা-ই বুঝতেন । সমরজিৎ সিংহ তো লিখেছেন যে যখন শ্যামবাজারে থাকতেন তখন দেখতেন শৈলেশ্বর প্রতিদিনই শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে গিয়ে বসে আছেন। শৈলেশ্বর যে শেষ জীবনে তৃণমূলের পার্থ চ্যাটার্জির সঙ্গে পুরস্কারের আশায় মেলামেশা আরম্ভ করেছিলেন, তাও শঙ্খ ঘোষের ওসকানিতে । শম্ভু রক্ষিত একবার চটে গিয়ে শঙ্খবাবুকে জিগ্যেস করেছিল, আপনি গয়লাঘোষ না কায়েত ঘোষ, তার কারণ শৈলেশ্বর আর সুভাষ ছিল গয়লাঘোষ।

গোবিন্দ : শুনেছি, হাংরি আন্দোলনের প্রচার-প্রসার চেপে দেবার জন্য সেই সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবিতা-ঘন্টিকী’, প্রতি ঘণ্টার কবিতা-পত্রিকা৷৷ 

মলয় : হ্যাঁ । ২৩ বৈশাখ ১৩৭৩, ৭ মে ১৯৬৬ সকাল দশটায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবিতা-ঘন্টিকী’, প্রতি ঘণ্টার কাব্যপত্র৷ তারিখ দেখেই তো বোঝা যায় যে হাংরি আন্দোলনের বুলেটিনগুলোর আর সংবাদপত্রের খবরের দামামাকে চেপে দেবার চেষ্টা ।

গোবিন্দ : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আপনাদের হাংরি আন্দোলনে । উনি প্রতিষ্ঠানবিরিধী হিসাবে নিজেকে প্রচার করতেন, অথচ আপনার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে আন্দোলন ত্যাগ করেন।

মলয় : হ্যাঁ ।  ১৯৮৭ সালে সুমিতাভ ঘোষালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি হারি আন্দোলনের সঙ্গে ভীষণভাবেই জড়িত ছিলাম । হাংরি আন্দোলনের আদর্শ — আমার ভালো লেগেছিল, এবং আমি তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম । এ ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নেই । কিন্তু পরের দিকে ওরা আমাকে না জানিয়ে আমার নামে পত্রিকা টত্রিকা বার করে । যা আমাকে ক্ষুব্ধ করেছিল । তখন আমি কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম । কিন্তু এই হাংরি আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন সুনীল আমেরিকায় । এই আন্দোলনকে সুনীলের অসাক্ষাতে একটা ক্যু বলতে পারা যায় ।প্রতিষ্ঠানের লোভ আমার কোনোদিনই ছিল না । বাংলাদেশে যদি কেউ আগাগোড়া প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ভূমিকা পালন করে থাকে তবে তা আমি । আমার ‘বিজনের রক্তমাংস’ গল্পটি বেরোনোর পর থেকে আমার সে ভূমিকা অব্যাহত ।আমি মনে করি ওরকমভাবে দল পাকিয়ে সাহিত্য হয় না । একজন লেখক নিজেই অতীত, নিজেই ভবিষ্যত, নিজেই সমাজ, নিজেই সভ্যতা, এবং নিজেই সবকিছু । সাহিত্য সৃষ্টিতে দলের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না ।আমি মুচলেকা দিয়েছিলাম তার দুটো কারণ । এক, আমি পুলিশকে ভীষণ ভয় পাই, আর দুই, আমার বউ আমাকে জেলে যেতে বারণ করেছিল । বউ বলল, যে একেই তো তোমার মতো মদ্যপকে বিয়ে করার জন্য আমার আত্মীয় পরিজনরা সব আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়েছে । তার ওপর তুমি যদি জেলে যাও তাহলে সোনায় সোহাগা হবে । সেই জন্যে আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করি ।” সন্দীপনের নামে কোনও বুলেটিন প্রকাশিত হয়নি । উনি বরং দেবী রায়কে চিঠি লিখে নির্দেশ দিতেন কী-কী করা উচিত ।               

গোবিন্দ : আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন । বিদেশে গিয়ে যৌনকর্মীদের পাড়ায় গেছেন ?

মলয় : না, সোনাগাছির কথা কেবল সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, হাংরি বুলেটিনে । আমার মামলার সময়ে সিনিয়র উকিল চণ্ডীচরণ মৈত্র’র চেম্বার ছিল সোনাগাছিতে ঢোকার অবিনাশ কবিরাজ লেনের ঠিক উল্টো দিকে । উকিলের জানলা দিয়ে দেখতে পেতুম শনিবার সন্ধ্যায় পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পুরো কৃত্তিবাস বাহিনী ঢুকছে সোনাগাছিতে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়া । মোড়ের পানের দোকান থেকে গোড়ের মালা আর বাংলা মদের কয়েকটা বোতল নিয়ে ঢুকতো। ওদের যৌনকবিতাগুলো সোনাগাছির মেয়েদের সঙ্গে মাঝরাত কাটানোর অভিজ্ঞতায় ভরপুর। বাঙালি বাড়ির বউরা তখন ওসব যৌন-আঙ্গিক অ্যালাউ করতো না  বলে মনে হয়  ।

গোবিন্দ : আপনি ? আপনারা ?

মলয়: আমার পিসেমশায় যাওয়া আরম্ভ করেন । ওনার দেখাদেখি ওনার বড়ো ছেলে অজয় বা সেন্টুদা ঢুঁ মারা আরম্ভ করেন । সেন্টুদা আমাকে ওই পাড়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । দুপুর বেলায় রেট কম থাকে বলে সেন্টুদা দুপুরে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন । হাংরিদের মধ্যে শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, অবনী ধর রেগুলার যেতো, প্রৌঢ় বয়সেও, ওদের পরস্পরের চিঠিতে পাবে ওদের প্রিয় যৌনকর্মী বেবি, মীরা, দীপ্তির নাম । সবচেয়ে ভীতিকর হল কোনও যৌনকর্মীর প্রেমে পড়া। এখন তো আলো ঝলমলে অন্য চেহারা নিয়ে ফেলেছে এলাকাটা । আধুনিকা যৌনকর্মীরা জিনস-স্কার্ট পরে রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন, স্টাইলে সিগারেট ফোঁকেন । বিদেশে  যৌনকর্মীদের পাড়ায় গিয়ে দেখে বেড়িয়েছি কিন্তু কারোর সঙ্গে শুইনি, কেননা যৌনরোগকে আমার ভীষণ ভয় । বোদলেয়ারের জীবনী পড়ে আরও আতঙ্কিত হই । বিদেশিনীদের কাছে সারা পৃথিবী থেকে খদ্দেররা যায় । ভিয়েৎনামের যুদ্ধের কারণে থাইল্যাণ্ড হয়ে গিয়েছিল যৌনকর্মীদের বিরাট বাজার ; কাঁচের দেয়ালের ওইদিকে মেয়েরা বুক খুলে আর জাঙিয়া পরে খদ্দের ডাকতো । আমস্টারডামে একটা পাড়া ছিল যার গলিগুলোতে বিশাল কাচের জানলার সামনে প্রায় উলঙ্গ মেয়েরা ফিকে লাল আলোয় বসে থাকতো আর নীল আলো জ্বললে বুঝতে হতো সমকামীদের ডাকছে। পাড়ার বাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল নেপোলিয়ানের হুকুমে । গলিগুলো এতো সরু যে দোতলায় আসবাব তুলতে হলে দড়ি বেঁধে তুলতে হয় । চারিদিকে খাল । সৈন্যরা নৌকো করে এসে রাত কাটাতো । গাঁজার দোকানকে ওরা বলে কাফে । যৌনতার নানারকমের খেলনা আছে নারী আর পুরুষের জন্য । নাটক অভিনীত হয়, সঙ্গম করার ।

গোবিন্দ : আপনার আত্মজীবনীতে এসব এসেছে ?

মলয় : হ্যাঁ, ‘ছোটোলোকের শেষবেলা’তে এসেছে । তাছাড়া ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আমি ওই সময়ের সবাইকে আর ঘটনাগুলোকে তুলে এনেছি । উপন্যাসটা প্রতিভাস প্রকাশিত ‘তিনটি নষ্ট উপন্যাস-এর অন্তর্ভুক্ত । মামলার সময়ে আমার শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে যেতে পাটনায় ফিরে গিয়েছিলুম আর আমাদের পারিবারিক ডাক্তার অক্ষয় গুপ্ত সংবাদপত্র পড়ে ধরে নিয়েছিলেন যে আমার যৌনরোগ হয়েছে আর বরাদ্দ করেছিলেন পেনিসিলিন অয়েল ইনজেকশান । জানতে পেরে পরের দিনই কমপাউণ্ডারকে বলেছিলুম, আর দিতে হবে না, ও-রোগ আমার হয়নি, হবে না ।

গোবিন্দ : আপনার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আপনার আর আপনার দাদার বন্ধুরা চরিত্র । সমালোচিত হয়েছেন সেকারণে ?

মলয় : হ্যাঁ । অমিতাভ প্র্রাজ লিখেছিল, পড়ে দেখতে পারো, অমিতাভ প্রহরাজ সমালোলোচনা করেছেন এইভাবে, “মলয়দা মানে মলয় রায়চৌধুরীর রাহুকেতু উপন্যাসের জন্য গান্ধী বার্থডের আগের রাতের রামের মতো বিক্রী হচ্ছে। সামান্য উল্টেপাল্টে পড়া হলো আর স্বাভাবিকভাবেই বেশ ঝাঁঝালো কথা-প্রতিকথা জমে উঠলো। একভাবে বলতে গেলে মলয় রায়চৌধুরীর “রাহুকেতু” দিয়ে লেখামোর প্রথম সেশানের বৌনি হলো। মলয়দা বিজ্ঞাপনে যা বলেছিলেন তা অতি সত্য। এতে রক্তমাংসের সুনীল শক্তি সন্দীপন দীপক খুব প্রবলভাবে আছেন। সুনীল হয়েছেন অসীম গাঙ্গুলী, শক্তি হরিপদ রায়, সন্দীপন প্রদীপন চ্যাটার্জী যার অফিসের নাম নৃপতি চাটুজ্জে। কৃত্তিবাস হয়েছে রামায়ণ নট্ট কোম্পানি, আনন্দবাজার মহাভারত নট্ট কোম্পানি। সুনীল কখনো কখনো রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী। মলয়দা নিজে রাহুল, সমীরদা অনিকেত। উপন্যাসের শুরুই রাহুলকে পুলিশের গ্রেফতার ও তার পেছনে নেপথ্য কাহিনী নিয়ে। সুনীলের মার্গারিটারও উল্লেখ রয়েছে। সুনীল বা অসীম আইওয়া থেকে ফিরে এলে রাহুলের কাছে একটা টেলিগ্রাম আসে “অধিকারী হ্যাজ কাম ব্যাক। এ বিগ কনস্পিরেসি ইজ গোইং অন। – সিংহবাহিনী “। রাহুল প্রথমে বুঝতে পারেনি কে টেলিগ্রামটি পাঠিয়েছে। কিন্তু যারা সময়ের ওই চত্বরটি নিয়ে কিঞ্চিত নাড়াঘাঁটা করেছেন তাঁদের “সিংহবাহিনী” বললেই সেই চরম রঙীন চরিত্রটির কথা মনে পড়বেই। ওয়ান এ্যান্ড অনলি কে জি বা কৃষ্ণগোপাল মল্লিক, যিনি নিজেও এসেছেন পরে কাহিনীতে। এইরকম ছোটখাটো এ্যানেকডোটসে ভর্ত্তি রাহুকেতু। আর বিতর্কিত ঘটনার তো আস্ত শপিং মল রয়েছে ওতে। সে রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী রাহুলকে ডেকে থ্রেট দেওয়া বা রাহুলের পালটা বলা “আপনার প্রথম বই এর সমস্ত খরচ তো আমার দাদা অনিকেত দিয়েছিলেন”। বা দেবী রায়কে তার প্রকৃত নাম হারাধন ধাড়া বলে ডেকে মস্করা করা, ইত্যাদি অগুন্তি রেফারেন্সের ছড়াছড়ি। ফলে হয়তো মলয়দার কাম্য ছিল না, কিন্তু একটা রগরগে স্ক্যান্ডাল কোশেন্ট উপন্যাসটির সঙ্গে জুড়ে গেছে। আমি বইটি নিয়ে কিছুটা বক্তিমে করলাম এই কারনেই যে এটি লেখামোর প্রথম সেশানের সূচনাবিন্দু। আমার মলয়দার কাছে দুটি অতি বিনীত প্রশ্ন আছে, ধৃষ্টতা মাফ করবেন, এক) এই লেখাটা ওনাদের জীবদ্দশায় কি বের করা যেত না? কারন মৃতদেহ প্রতিবাদ করতে পারে না, দুই) নামগুলো যখন কাল্পনিক নামই দিলেন, তখন ও দিকে অসীম, হরিপদ রায়, নৃপতি চাটুজ্জে ইত্যাদি ধরনের নাম আর আপনার বা আপনার দাদার নাম রাহুল বা অনিকেতের মতো স্মার্ট ফিল্মি হীরো টাইপের কেন? এটা কি নামকরন থেকেই দুটো পৃথক ক্লাস বা শ্রেণী বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা? যদি তাইই হয় তাহলে ‘দেবী রায়কে ওরা ইচ্ছে করে হারাধন ধাড়া বলে ডেকে মর্ষকামী আনন্দ পেত’ বলে ওদের খিস্তি দিলেন কেন? সেই একই মর্ষকামীতার দোষে তো তাহলে আপনিও দুষ্ট লেখাটির প্রথম পাতা থেকে, যেখানে নামকরণ করেছেন, এমন কি অসীম ওরফে সুনীলের ঠিকানা বলতে গিয়ে বলেছেন ওঝাপুর। মলয়দা, আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ পণ্ডিত মানুষ, লেখক হিসেবেও অত্যুচ্চ মানের, আপনাকে সরাসরি মুখের ওপর হয়তো কেউ কিছু বলবেনা। আপনার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলি, একটা অতি অপ্রিয় সত্যি যে লুকিয়ে নয় ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। রাহুকেতুর এই গরম কেকতুল্য বিক্রীর পেছনে কিন্তু সেই সুনীল, শক্তি, সন্দীপন, কৃত্তিবাস প্রমূখেরাই রয়েছে। লেখাটা কাঁচু, মাচু আর পাঁচুকে নিয়ে হলে এই চাহিদা হতোনা। তবে এটা অনস্বীকার্য যে ফিকশান ন্যারেটিভে আপনার নিজস্ব তকনিক ও প্রকরণ অসামান্য, যার ফলে এক সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও রিডেবিলিটি খুবই হাই, এক বিরল কম্বো। যদিও সেটা বিচার করার যোগ্যতা হয়তো আমার নেই, ঔদ্ধত্য ক্ষমা করবেন।”

গোবিন্দ : কুলসুম আপা, তারপর এই ধরণের জীবনযাত্রা, আপনার নিজেকে কলুষিত মনে হয়নি? ইমলিতলা পাড়ায় থাকলেও, আপনার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্য হিসাবে, ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসাবে, আপনার মূল্যবোধ তো মধ্যবিত্ত বাঙালির ? সেই প্রেক্ষিতে নিজের মূল্যায়ন করে মনে হয়নি যে অধঃপতনের পথে যাত্রা করছেন ?

মলয় : না হয়নি । বলতে গেলে ইমলিতলা পাড়াই ছিল আমার মূল্যবোধ গড়ে ওঠার বনেদ। ওই পাড়ায় দোল খেলার দিন অন্ত্যজ বউরা কেউ নিষেধ মানতো না, আমার বয়ঃসন্ধিতেও তারা জড়িয়ে চুমু খেয়ে উত্তেজিত করে দিতো । রঙের বদলে নর্দমার জল, গোবর-গোলা জল ঢেলে দিত গায়ে । মুখে গোবর মাখিয়ে দিতো । এমন পাড়া ছিল যে গয়লাটাও দুধ দিতে এসে আমার মা, জেঠিমার নাম ধরে ডাকতো । বাড়ির মধ্যে একটা কুয়ো ছিল, তার চারিধারে বিহারি বউরা ওদের পরিবারের কারোর বিয়ের সময়ে এসে এমন গান গাইতো যাকে লোকে বলবে অশ্লীল ।

গোবিন্দ : যেমন ?

মলয় : যেমন, বাঙলায় বলছি, পাটনাইয়া মগহি গানের বাঙলা । এবার নে মশারি টাঙা, শশা, বেগুন, তেল মাখিয়ে নে, নইলে চিৎকার করে পাড়া মাথায় করবি । এরকম নানা গান । বড়ো জেঠা তাই কুয়োটা বন্ধ করিয়ে দিয়েছিলেন ।

গোবিন্দ : অর্থাৎ আপনি গ্রামের মানুষ নন, শহরের মানুষ । তবু আপনার বইতে, যেমন ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘নামগন্ধ’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘ঔরস’ ইত্যাদি উপন্যাসে গ্রাম এসেছে বিপুলভাবে । কেমন করে আপনি বর্ণনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন ? ‘ঔরস’ উপন্যাসে আপনি অবুঝমাঢ়ের মাওবাদী এলাকা ডিটেলে বর্ণনা করেছেন ।

মলয় : চাকুরিসূত্রে সারা ভারতের গ্রামগঞ্জ ঘুরেছি,  চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, খেতমজুর, নৌকোর ছুতোর আর নিম্নবর্ণের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি ক্ষেত্রসমীক্ষায় । অধিকাংশ চরিত্র পেয়েছি সমীক্ষার সময়ে । তার আগে যখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে চাকুরি করতুম তখন সহকর্মীদের গ্রামে গেছি । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছেড়ে এআরডিসিতে গেলুম, সেখান থেকে নাবার্ড। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকুরিটা ছেড়েছিলুম গ্রামের জীবন আর মানুষ দেখার লোভে । এখন তো আমার যা পেনশন তার চেয়ে বেশি পেনশন পায় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পিওন । তবে প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছিলুম তখন। পশ্চিমবাংলায় সিপিএমের ভয়ে অনেকে কথা বলতে চাইতো না বলে দাড়ি বাড়িয়ে অবাঙালি এম আর চৌধারী হয়ে গিয়েছিলুম, হিন্দিতে কথা বলতুম । ট্যুরের সময়ে বহু গ্রামে আমার স্ত্রীকেও নিয়ে গেছি যাতে গ্রামের গরিব পরিবারের অন্দরমহলের খবর পাই। 

গোবিন্দ : আপনার স্ত্রী রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় ছিলেন ?

মলয় : হ্যাঁ । অনেক কাপ আর শিল্ড ছিল ওদের বাড়িতে । শীতের সময়ে ওরা ওল্ড মঙ্ক রাম খেয়ে খেলতো ।

গোবিন্দ : কোনও বিশেষ  স্মৃতি? 

মলয় : প্রচুর স্মৃতি জমে আছে, লিখেছিও কিছু-কিছু । সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো হিমালয়ের তরাইতে খাঁটি ভারতীয় গরু আছে কিনা তার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর স্মৃতি, যার রক্তাক্ত যোনিও আকর্ষণ করেছিল । স্হানীয় লোকেরা, সকলেই হিন্দু, বাঘিনীর মাংস-হাড় ইত্যাদি সংগ্রহের জন্যে কাড়াকাড়ি করেছিল। একজন আমাকে আর আমার সহকর্মীকে রেঁধে খাইয়েছিল । ইঁদুর খেয়েছি শৈশবে, বাঘ খেলুম যৌবনে । ঘোরাঘুরির চাকরির আগে জানতুম না কতোরকমের গরু, ছাগল, শুয়োর, মুর্গি, হাঁস, চাল, আলু, সবজি ইত্যাদি হয়। জলসেচের কতোরকমের ব্যবস্হা আছে আর কোন ফসলে কখন কীরকম জলসেচের দরকার হয় কিছুই জানতুম না। যেখানে-সেখানে ঘুমোবার আর বনবাদাড়ে হাগার স্মৃতি আছে । অজ পাড়াগাঁয়ে গেলে হাগতে যেতে হতো আখখেতে, ধানখেতে, গাছের আড়ালে, নদীর ধারে । দাদার যখন দুমকায় পোস্টিঙ হয়েছিল তখন পায়খানাটায় দরোজা ছিল না, কিন্তু তার সামনে একটা কাঁঠালগাছ আড়ালের কাজ করতো। গাছে ঝুলে থাকা এঁচোড়ে হিপিরা নিজেদের পোশাক ঝুলিয়ে হাগতে যেতো। আমি তো এনসিসির ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডে ছিলুম । দল বেঁধে সাতসকালে সবাই মিলে গোল হয়ে বসে হাগার অভিজ্ঞতা ছিল । বিয়ের পর পাঞ্জাবে এক বন্ধুর গ্রামে গিয়েছিলুম, সেখানে গিয়ে আমার শহুরে হকি-খেলোয়াড় বউকেও খেতে হাগতে যেতে হতো ।

গোবিন্দ : হাংরি আন্দোলনের সময়কার স্মৃতি ?

মলয় : লিখেছি তো ? পড়োনি ? এটা পড়ো । “হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশের দল রাতে নিয়ে চলল বাঁকিপুর বা পিরবহোর থানায়, সোজা লকআপে, অন্ধকার, আলো নেই, পাশের লকআপে বেশ্যার দলের চেঁচামেচি, লকআপে সাত-আটজন কয়েদি, নানা অভিযোগে, ডাকাতি আর খুনও । ফুলপ্যান্টের ভেতরে ইঁদুর ঢুকে এলো, পা ঝেড়ে বের করলুম, বাড়ি থেকে খাবার এসেছিল, কিন্তু একে অন্ধকার, তায়ে লকআপের অভিজ্ঞতা, খাওয়া গেল না । সকালে স্হানীয় খবরের কাগজে গ্রেপ্তারির খবর শুনে নমিতা চক্রবর্তী সাহস যুগিয়ে গেলেন, বহুদিন পর ওনাকে দেখলুম, চোখে চশমা, টিচারি শুরু করেছেন, আমার নকাকিমা যে স্কুলে পড়ান সেখানে। নমিতাদি বেঁচে থাকলে জানতে চাইতুম, ভেঙে পড়া সোভিয়েত রাশিয়ায় কোথা থেকে এতো মহাকোটিপতি আর মহাচোরাকারবারী আচমকা উদয় হল, এতো ভিকিরি, এতো ছিঁচকে চুনোপুঁটি! হাগবার জন্য কোমরে দড়ি পরিয়ে হাগতে পাঠানো হলো, ঘুড়ি ওড়ানোর মতন করে ঢিল দিয়ে লাটাই ধরে থাকলো একজন কন্সটেবল আর আমি হাগতে গেলুম, চারিদিকে কয়েদিদের গু, জল পড়ে চলেছে কল থেকে, পোঁদ এগিয়ে ছুঁচিয়ে নিলুম । আবার হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে কয়েদিদের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে ফৌজদারি আদালত। বাবা বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে এনেছিলেন, যিনি হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতেন । কলকাতার পুলিস রিমান্ড চাইছিল । বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জামিন দিয়ে বললেন কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আত্মসমর্পণ করতে । বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন লেখিকা এনাক্ষী ব্যানার্জি আর মীনাক্ষী মুখার্জির বাবা । বাড়ি এসে নিজেকে নবীকরণ করে পৌঁছোলুম উত্তরপাড়ায়, পেছন-পেছন বড়োজ্যাঠা আর বাবা । দাদাও চাইবাসায় গ্রেপ্তার হয়ে চাইবাসা থেকে এসে পৌঁছোলো । জমায়েত দেখে, দাদা গ্রেপ্তার হয়েছে শুনে ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল । অন্যান্য জেঠা-কাকারা আর পিসেমশায় এসে পৌঁছোলেন। ব্যাংকশাল কোর্টে সারেন্ডার করে জানতে পারলুম দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষও গ্রেপ্তার হয়েছে । জামিনের পর আদালত বলল লালবাজারে গিয়ে প্রেস সেকশানে হাজিরা দিতে । লালবাজারে হাজিরা দিতে গিয়ে কফিহাউসে পুলিশ ইনফরমারদের কথা জানতে পারলুম, যারা হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন বই পত্রিকা এনে-এনে জড়ো করেছে প্রেস সেকশানে । আশ্চর্য যে মুখের দিকে তাকিয়েও কেন বুঝতে পারিনি যে অমুক লোকটা, যে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে সে ইনফরমার, তমুক যুবক যে আমার কাছ থেকে বুলেটিন চেয়ে নিয়ে গেল, সে পুলিশের খোচর । মামলার সময় যখন এরা কাঠগড়ায় আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো তখন টের পেলুম — তাদের নাম পবিত্র বল্লভ আর সমীর বসু । সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষের মুখের দিকে তাকিয়েও কি কখনও জানতে পেরেছিলুম যে ওরা পিঠে ছুরি মারবে । অবশ্য আঁচ করা উচিত ছিল, কেননা ওরা দুজনেই লালবাজারে ইন্সপেক্টরের হম্বিতম্বিতে কেঁদে একশা , সেই ইন্সপেক্টর অনিল ব্যানার্জি, পরে নকশাল বিনাশে নাম করেছিল। আঘাত তো লোকে করবেই, কিন্তু সব আঘাতে আদর করে হাত বোলানো যায় না । বেশির ভাগ আঘাতের দাগ দেহের চামড়ায় পুষে রাখতে হয় । মামলার সময়টা বেশ খারাপ গেছে, কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, সাসপেন্ড হবার দরুণ মামলার খরচ, যাতায়াতের খরচ আর খাবার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল । একই শার্ট-প্যাণ্ট প্রায় পনেরো দিন অনেক সময়ে এক মাস, পরে চালিয়েছি । সবসুদ্ধ পঁয়ত্রিশ মাস মামলা চলেছিল । উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে থাকা যেতো কেসের ডেটের মাঝে হাতে সময় থাকলে, কেননা তখন সেরকমভাবে ইলেকট্রিক ট্রেন শুরু হয়নি আর প্যাসেঞ্জার ট্রেনের কোনো নির্ধারিত সময় ছিল না । সুবিমল বসাকের জেঠার স্যাকরার দোকানে বৈঠকখানা পাড়ায় থাকতুম মাঝেমধ্যে আর হাগতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে, রাস্তার কলগুলো এতো নিচু ছিল যে তার তলায় প্রায় শুয়ে স্নান করতে হতো । ফলে প্রতিদিন স্নানের অভ্যাস ছাড়তে হয়েছিল । শহরে যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাদের কাছে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল হাগা, কোথায় গিয়ে হাগা যায় । তখন তো সুলভ শৌচালয় আরম্ভ হয়নি । আহিরিটোলায় রাতে থাকতে পেলে অন্ধকার থাকতে গঙ্গার পাড় ছিল সবচেয়ে সহজ । এটা সেন্টুদার শেখানো ; পিসেমশায়ের আটজন বাচ্চা আর একটা পায়খানা, গঙ্গার পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে হাগা পেলে পায়জামা বা প্যান্ট নামিয়ে হেগে নাও আর গঙ্গায় পোঁদ ঠেকিয়ে ছুঁচিয়ে নাও । হাগা পেলে হেগে নেওয়ার মতন আর কোনও আনন্দ নেই । সেন্টুদা পরামর্শ দিয়েছিল যে রাতে হোটেলে থাকার চেয়ে ভালো জায়গা হলো অবিনাশ কবিরাজ লেনের কোনো ঘরে কাউকে সারা রাতের জন্যে প্রেমিকার দাম দেয়া । কিন্তু সেখানেও তো ভোরবেলা উঠে হাগার সমস্যা । সেখানে রাত কাটালেও হাগতে ছুটতে হতো বড়োবাজারে হিন্দি পত্রিকা “জ্ঞানোদয়” এর সম্পাদক শরদ দেওড়ার মারোয়াড়ি গদিতে । এই গদিতে শুয়েও রাত কাটিয়েছি, যতো রাত বেড়েছে ততো শোবার লোকের ভিড় বেড়েছে, কেননা বাইরে থেকে যে ব্যাবসাদাররা কলকাতায় আসতো তারা মারোয়াড়িদের গদিতে শোয়া পছন্দ করতো । বাদবাকি সকলের বিরুদ্ধে আরোপ তুলে নিয়ে, ৩রা মে ১৯৬৫ আমার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করল পুলিশ । তার সঙ্গের নথিগুলো থেকে জানতে পারলুম হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্রব অস্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছে সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ, মামলা থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য । এও জানলুম যে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উৎপলকুমার বসু, এঁরাও নিজেদের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্রব অস্বীকার করেছেন । উৎপল চাকরি খুইয়ে গিন্সবার্গের সুপারিশে ইংল্যাণ্ডে চাকরি পেয়ে চলে গেলেন । সুভাষ আর শৈলেশ্বর আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে ক্ষান্ত দেয়নি, একের পর এক লেখায় হাংরি আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করে গেছে, সময়ের সঙ্গে তাল দিয়ে আমার প্রতি ঘৃণার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, এমনকি নিজের বউ-বাচ্চাদেরও এ-ব্যাপারে ট্রেনিং দিয়ে গেছে ; ফলে ওদের নিজেদের মরচে-পড়া ছোরাগুলোই অকালে রোগ হয়ে ওদের বুকে বিঁধেছে।”

গোবিন্দ : হাংরি মামলা নিয়ে প্রচুর পরস্পরবিরোধী কথা শোনা যায় ।

মলয় : তুমি অলোক গোস্বামীর সম্প্রতি প্রকাশিত বই মেমারি লোকাল পড়ে দেখো, ব্যাপারটা অন্তত কিছুটা  স্পষ্ট হবে । অলোক লিখেছেন, “অরুণেশের ( ঘোষ ) ব্যাগে আচমকা পেয়ে গিয়েছিলাম ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকার সেই সংখ্যাটি। কিন্তু অরুণেশদা কিছুতেই দেবেন না পত্রিকাটা, ভালো কইরে বোঝার চেষ্টা করো হাংরি ফিলজফিটারে। আগেই এই সব ল্যাখা পড়লে সব গুলায় যাবে।কিন্তু আমাকে রুখিবে কে! প্রায় জবরদস্তি ম্যাগাজিনটা কেড়ে নিয়ে কোচবিহার থেকে মাথাভাঙ্গা যাত্রাপথে ভিড় বাসের মেঝেতে বসে পত্রিকাটা শেষ করেছিলাম। এবং স্বীকার করতে বাধা নেই, সত্যিই মাথার ভেতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। সেদিন জেনেছিলাম শৈলেশ্বর ঘোষ রচিত ‘তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি শূণ্য বিছানায়’ কবিতাটা নয় বরং মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটাকেই অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। জেনেছিলাম, হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট মলয়ের নেতৃত্বেই ঘটেছিল এবং কেসটাও সাজানো হয়েছিল মলয়েরই বিরুদ্ধে।”

গোবিন্দ : হাংরিদের মধ্যে আর কারা বিদেশে গিয়েছিলেন ?

মলয় : প্রদীপ চৌধুরী বেশ কয়েকবার প্যারিসে গিয়েছিল । ভালো ফরাসি ভাষা জানতো । কবিতা লিখতো ফরাসি ভাষায়, ফরাসি কবিদের বাংলায় অনুবাদ করতো, জ্যাক কেরুয়াক সম্পর্কে ফরাসি ভাষায় বই আছে ওর । কিন্তু হাংরিদের কবিতা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেনি । প্যারিসে গিয়ে বক্তৃতাও দিয়েছে । বোদলেয়ার ভেরলেনের জীবনী পড়ে গিয়েছিল যৌনকর্মীদের পাড়া লাতিন কোয়ার্টারে, সেখানে দুজন দীর্ঘাঙ্গিনী যৌনকর্মী ওর টাকাকড়ি কেড়ে নিয়েছিল ; তারপর থেকে ফরাসি বন্ধুদের সঙ্গে যেতো । ও থাকতো সেই হোটেলটায় যেখানে গিন্সবার্গ, বারোজ, কেরুয়াক আর অন্য কবিরা থাকতো । প্রদীপের একটা কবিতা নিয়ে একজন ব্যালেরিনা প্যারিসের মঞ্চে ব্যালে অভিনয় করেছিলেন ।

গোবিন্দ : আপনাদের ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে একটা হাংরি ফিল্ম হওয়া উচিত ছিল ।

মলয় : ভবিষ্যতে কেউ করতে পারে হয়তো । ইউরোপ-আমেরিকার কবি-লেখকদের নিয়ে তো হয়েছে । সুপ্রীতি বর্মণকে বলেছিলুম । উনি বললেন, প্রথমে আলোচনা করে স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে হবে, তারপর বাজেটের ব্যাপার আছে । সুপ্রীতি বর্মণ লিখেছেন, “ এটাই ওনার স্বকীয়তা । আর আমার যৌনতার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ওনার কবিতাসমগ্রের আলোচনা । তাই অশ্লীলতা নয় এটা একটা সাধনার মোক্ষপ্রাপ্তি আমার কাছে।” ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার কাঠামো নিয়ে মৃগাঙ্কশেখর একটা ফিল্ম করেছে পাঁচ হাজার টাকায়, দেশ-বিদেশে পুরস্কারও পেয়েছে । জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির একক পারফরমেন্স করেছিলেন স্নাতকোত্তর ছাত্র সৌরদীপ রায় । ঢাকা নিবাসী তারেক হায়দার চৌধুরী লিখেছিলেন, “হাংরি মুভমেন্টের কথা উঠে এসেছে চলচ্চিত্রেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রের নিবারণ চক্রবর্তীর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? নিবারণরূপী গৌতম ঘোষকে সৃজিত হাজির করেছিলেন একজন হাংরিয়ালিস্ট কবির চরিত্রে। উদ্ধত, অহংকারী আর খ্যাপাটে নিবারণ সিস্টেম নিয়ে বললেন- একটা পচে যাওয়া সিস্টেম, প্রত্যেকটা মানুষ পঁচে যাওয়া। কয়েকটা লাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।” এই সিস্টেমের সাথে হাংরি প্রজন্মের দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য।” তবে আমার মনে হয়, সৃজিতের ফিল্মটা হাংরি আন্দোলনকে বদনাম করেছে বেশি । হাংরিরা কেউই ওই নিবারণ চক্রবর্তী টাইপ ছিল না ।

গোবিন্দ : সবাই প্রায় সেকথা বলেন । মৃগাঙ্কর ফিল্মটা আমি দেখিনি ।

মলয় : ফিল্মটা সম্পর্কে অনুপম মুখোপাধ্যায় এই চিঠিটা মৃগাঙ্ককে লিখেছিলেন, আর তাতে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল । অনুপম লিখেছিলেন, “মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে যেটা করেছে, তোমাদের ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রেও সেটাই করেছে, আমার মনে হয়, তবে সেটা বুঝতে বঙ্গবাসীর সময় লাগবে। অবিশ্যি উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল। কবিতার তুলনায় সিনেমা অনেক তাৎক্ষণিক ফলাফল দর্শায়। কিন্তু এই সিনেমা, বাস্তবিকই, আপামরের অগোচরে রয়ে গেছে। সেটাই প্রত্যাশিত। এবং এই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক। বঙ্গীয়, কিন্তু বাঙালি একে আমি বলব না। তোমাদের এই সিনেমাটি আদতে সিনে-কবিতা। একটি শিল্প মাধ্যম তখনই নিজেকে অতিক্রম করে, যখন তার মধ্যে আরো এক বা একাধিক শিল্পমাধ্যমের যোগসাজশ দেখা যায়, এবং সেটা সার্থক হয়। এই সিনেমায় সার্থক কবিতা হয়েছে।একটি কবিতায় আজকাল আমরা দৃশ্য ও শ্রাব্যের একটা দুর্দান্ত নাগরদোলা আশা করি, আমাদের জীবনের সঙ্গে তবেই সেটা যায়, যেখান থেকে সহসা ছিটকে পড়তে হয় না। মলয়দার কবিতাটা আমাদের ঠিক সেটাই দিয়েছিল। একের পর এক দৃশ্য, যেটাকে আমরা চিন্তার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছি। তোমরাও সেটাই দিয়েছ। কাহিনির ধার ধারোনি। আমার দেখা সবচেয়ে গল্পহীন বাংলা সিনেমা এটা। টেকনিকালি কব্জির জোর প্রতিটি শটেই দেখতে পেয়েছি। কোনোরকম স্পেশাল এফেক্ট ছাড়াই ম্যাজিক করেছে ক্যামেরা। রঙের ব্যবহার অসামান্য। ভায়োলেন্স আর সেক্স যে এই ছবিতে একবারও ভালগারিটির ধারেকাছে যায়নি, সেটাই সবচেয়ে বড় কারিগরি সাফল্য। সেক্সের ব্যবহার তো কসমিক হয়েছে। তোমার লিঙ্গ যে এমন ঈর্ষনীয়রকমের বড়, জেনে চমকে গেছি। নিজেকে এমন সাহসে সঙ্গে ব্যবহার করলে, নারী চরিত্রের বেলায় সেটা হল না কেন? একটা পেনিট্রেশন থাকলে কোনোরকম প্রেজুডিসের ধারেকাছেই থাকতে না তো! অবিশ্যি অমন অভিনেত্রী পাওয়াটাও একটা চাপ, সেটা বুঝি। আন্ডারগ্রাউন্ড সিনেমায় কেউ ওই রিস্ক কেন নেবে! তুমি নিজে যেটা করেছ ।স্যালুট রইল।এই ভায়োলেন্স কি বাঙালি নিতে পারবে? আমার অনেক সময় বার্গম্যানের ‘পার্সোনা’-র সেই ওপেনিং শটগুলো মনে পড়ে গেছে। আমি চমকাইনি, তবে চুপিচুপি বলে রাখি, ব্যোমকে গেছি। এই তো চাই নন্দীগ্রামের দেশে! এই তো চাই, যেখানে পারিবারিক বা জননৈতিক দ্বন্দ্বের ফয়সালা করে দেয় অস্ত্র। যেখানে ব্লগারের রক্তে মাটি ততটা ভেজে না, যতটা আমাদের বিবেক। স্রেফ বলি, একটা অভিজ্ঞতা পেলাম। সারাজীবন যে ভুলব না, কথা দিতেই পারি। জন্মান্তরের কথাটা দিতে পারছি না। পরের জন্মে যেন এমন আত্মাকাঁপানো ছবির দরকার না হয়। যেন নতুন সত্যযুগে কম্পিত আত্মাকে সঙ্গে রেখেই জন্মাই।

গোবিন্দ : আসামের যুগশঙ্খ পত্রিকার সাংবাদিক বাসব রায় ২০১৮ সালে পুজোর সময়ে একটা ইনটারেসটিঙ পোস্ট দিয়েছিলেন । এই যে, এটা, “বাসব রায়-এর টাইমলাইন থেকে, পোস্টের নাম “মলয়ের জায়গা”। পড়ে দেখুন । “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আত্মীয়-পরিজনের বাইরে আমি যাঁর নাম প্রথম শুনেছি, তিনি, মলয় রায়চৌধুরী। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ নন, মলয় রায়চৌধুরী। আমি যখন বড় হচ্ছি, ওই ১৯৬৬ থেকে, চারপাশে শুধু একজনের কথাই চর্চিত, তিনি, মলয় রায়চৌধুরী। ১৯৬৪ সালে মলয় নেমে আসছেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সিঁড়ি দিয়ে, একা। আর ধীরে ধীরে তিনি চর্চায় চলে আসছেন কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলের। তখন বেহালা, যেখানে আমার ছোটবেলা কেটেছে, কলকাতার মধ্যে ছিল না। বেহালার সাবর্ণপাড়ার দ্বাদশ মন্দিরের চাতালে কিংবা শখেরবাজার মোড়ের আড্ডায় শুধুই মলয়। তো আমি মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে বড় হয়েছি বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হয় না। ইস্কুলে যাই, সেখানে শিক্ষকরা আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; ঘরে ফিরি, দাদা-কাকারা আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; একটু সন্ধ্যায় পাড়ার কালভার্টেও আলোচনার একটাই বিষয় – মলয়। মলয়-বাসুদেব-ফাল্গুনী-শৈলেশ্বর-সুবো-সুবিমল-দেবী-অবনী-প্রদীপ প্রমুখ তখন আমাদের ঘরের ছেলে। তাঁদের লেখা যেখান থেকে হোক সংগ্রহ করে পড়ছেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। এই আবহে আমি বড় হয়েছি। আর তাই মূলধারার সাহিত্যের প্রতি কখনো আগ্রহ বোধ করিনি। ১৪-১৫ বছরের মধ্যেই আমি পড়ে নিয়েছি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ বা ‘চর্মরোগ’। এবং সেখান থেকেই এই প্রতীতী সম্ভবত জন্মে যায় যে সাহিত্য বলতে এসবই, বাস্তবতা-জীবন-অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর ছাড়া সাহিত্য হয় না। এর বেশ কিছু পড়ে যখন আনন্দবাজারীয় লেখালিখি পড়তে গেছি, হাসি পেয়েছে। বাজারি আনন্দের প্রকাশিত সাহিত্য ওই সুখী মধ্যবিত্তের জন্য। সেখানে একটা কৃত্রিম ভাষা, নাটকীয় কিছু শব্দের সমাহার। সেখানে জীবন, অন্তত আমি, কখনো খুঁজে পাইনি। অথচ শিক্ষিত বাঙালি ওইসব পড়েই নিজেকে এলেমদার, পণ্ডিত মনে করেছে, করে।আর ঠিক এখানেই মলয় ধাক্কা মারেন। বাংলা গদ্যের রীতি ঠিক কী হবে তা সম্ভবত ঠিক হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, যে লিখলে ওই জোব্বা পরা বুড়োর মতোই লিখতে হবে। এবং এরপর যাঁরা লিখতে এসেছেন, যেমন শরৎ-তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-শরদিন্দু থেকে হালের সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশরা, কেউ ওই গদ্যের বাইরে যেতে পারেননি। বিষয় যাঁর যেমনই হোক, গদ্যের রীতি বা ভাষার আঙ্গিক ও প্রকরণ সেই রাবিন্দ্রিক। এবং বাজার বা বাংলা সাহিত্যের কলকাত্তাইয়া প্রতিষ্ঠান এই গদ্যকেই প্রমোট করেছে। পাঠকও খুশি থেকেছেন এই গদ্য পড়ে। এর বাইরে না লেখক না পাঠক কেউই ভাবতে পারেননি। মলয় রায়চৌধুরী ঠিক এই জায়গাটাকেই ধাক্কা দিয়েছিলেন। তাঁর বহুচর্চিত কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ থেকে হালের ‘ছোটলোকের ছেলেবেলা’ লেখাতেও ওই ধাক্কা স্পষ্ট। লেখালিখিতে বাস্তবতা-জীবন যেমন মলয় রায়চৌধুরী প্রথম বাংলা সাহিত্যে এনেছেন, ঠিক তেমনই গদ্যের ভাঙচুর তাঁর লেখাতেই আমরা প্রথম দেখতে পেয়েছি। আর এজন্যই প্রতিষ্ঠান তাঁকে ব্রাত্য করে রেখেছিল, হয়তো-বা এখনও করেই রেখেছে। মলয়ের প্রথম প্রকাশিত বই সম্ভবত ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’। সেখানে মলয় কী লিখেছেন তা এখানে আলোচ্য নয়। বলার কথা হল, মলয় হাফ লিটারেট সাহিত্যিক নন, পড়াশোনা করেই লিখতে এসেছিলেন। আর সেজন্য মলয়ের লেখালিখি যতটা না আবেগের তার চেয়ে অনেক বেশি মেধাজারিত। কোনো এক সাক্ষাৎকারে মলয় জানিয়েছেন যে বৈদ্যুতিক ছুতার লিখতে লেগেছিল তিন মাস। কেন? না, প্রতিটি শব্দ অনেক চিন্তা করে বসাতে হয়েছে।‘তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম’—এই লাইন মলয়কে লিখতে হয়েছে, বাংলাভাষাকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। আর কে না জানে ‘ভাষাকে যে আক্রমণ করে সে-ই ভাষাকে বাঁচায়।’ মিথ্যে না বলতে কী, রক্তরস কমে যাওয়া বাংলাভাষাকে ওই মলয় রায়চৌধুরীই প্রথম আক্রমণ করেন। তাঁর সেই শক্তি ছিল বলেই প্রতিষ্ঠান তাঁকে উঠোনে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বরং মলয়দের শক্তি পাঠক-সহ-প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে নিতে পারে ভেবেই তাঁরা সম্মিলিত আক্রমণের সামনে পড়েন। যার ফলশ্রুতি কিছু বই নিষিদ্ধ, মামলা, মলয় দোষী সাব্যস্ত এবং তারপর ১৯৬৭ সালে মামলায় জয়।এর ফলে মলয়ের কী হয়েছে সে বিচার অন্যরা করবেন, বাংলাভাষার যে বিপুল ক্ষতি হয়ে গেল তা অনস্বীকার্য। কেননা মলয় তো বটেই, ইদানীং অজিত রায়-রবীন্দ্র গুহ-রণবীর পুরকায়স্থরা তুলে আনছেন যে নিচুতলার সংস্কৃতি, জীবনযাপনের শৈলী, আচার-আচরণ, ক্রোধ-আনন্দ, প্রেম-ভালোবাসা… অসম্ভব দরকারি ছিল বাংলা সাহিত্যে। এগুলো বাদ দিয়ে সাহিত্য যেন একেবারে ম্যাড়ম্যাড়ে। মলয় রায়চৌধুরী প্রথম এই ভাবনা এনেছিলেন বাংলা সাহিত্যে। কী? না, নিজেকে সাংস্কৃতিক জারজ ঘোষণা করে সরাসরি বলেছিলেন, অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর উঠে আসা উচিত সাহিত্যে। এবং তা হবে সরাসরি। সেখানে কোনো ফাঁকি থাকবে না। আর তাই, মলয় রায়চৌধুরীর, ঠিক এই জায়গায় কাল্ট ফিগারের সম্মান প্রাপ্য।মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, ভবিষ্যতেও লিখবেন, মলয় হলেন বাংলা সাহিত্যের জায়মান কিংবদন্তি, যাঁকে আনগ্ন শুষে নিলেও শেষ হয় না। কবি-প্রাবন্ধিক-উপন্যাসকার যেভাবেই তাঁকে অভিহিত করা হোক না কেন, কোনোটাই মলয় সম্পর্কে শেষ কথা নয়।আর তাই একটা লেখায় সমগ্র মলয় রায়চৌধুরীকে ধরা আমি তো আমি, শিবের বাপেরও অসাধ্য কাজ! আর তাই আমি অন্য দু-একটি কথা বলি। মলয়ের উদ্যোগে হাংরি আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলে একে অচ্ছু্ৎ ঘোষণা করেছিলেন। আজ হাংরি আন্দোলনকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী আন্দোলনের মর্যাদা পাচ্ছে। আর তাই বিখ্যাতরা যেভাবেই হোক হাংরির ঝোল নিজের কোলে টানতে ব্যস্ত। শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি-মামলার পর মুচলেকা দিয়েছিলেন, সবাই জানেন। পরে তিনিই হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে কলার তুলে হাঁটতে শুরু করেন, আমি দেখেছি। আপাত-ঋষি শঙ্খ ঘোষ এমনভাবে এতদিন লেখালিখি করেছেন যে হাংরি শব্দটাই শোনেননি বা শুনলে তাঁর হার্টফেল হবে। তো তিনি সম্প্রতি একটি হাংরি সংকলনে নিজের কবিতা রেখে যার-পর-নেই আহ্লাদিত। সৌজন্য শৈলেশ্বর ঘোষ। সাহিত্যিক-সততায় মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে আদালতে কথা বলে অনেকটা আলো পেয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তো তিনিই আমাকে রেকর্ডেড ইন্টারভিউতে বললেন ২০০৬ সালে যে ‘হাংরি আন্দোলনের জন্য মলয় ঠিক আমার আমেরিকা-বাসের সময়টাই বেছে নিয়েছিল।’ তো তাতে কী হল? সুনীল, ‘আমি থাকলে ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই আমার হাতে থাকত।’ এখান থেকে বোঝা যায়, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যেভাবেই হোক নাম জড়ানোর কী আকুল প্রচেষ্টা সুনীলের! ছো…আর এই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই কৃত্তিবাস-এ মলয়ের কবিতা ছাপাননি। সাহিত্যিক সততা আর কাকে বলে! যে কোনো আন্দোলনের একটা প্রকরণ আছে। আছে একটা স্ফুলিঙ্গ। আন্দোলনকে যত দমিয়ে রাখা হয় ততই আন্দোলনের অন্তঃশক্তি বাড়ে। আর সেটা হাংরি মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। আজও যখন কেউ ‘ছোটলোক’-এর সংস্কৃতি তুলে আনেন কবিতায়-গদ্যে, আমরা বলি বাঃ তুই তো হাংরিদের মতো লিখছিস। এবং সত্তরের অরুণেশ, আটের অজিত রায়, নয়ের রাজা সরকার, শূন্য দশকের বিকাশ সরকার, প্রথম দশকের তিস্তা, কিংবা বেশ আগের রবীন্দ্র গুহ, নবারুণ ভট্টাচার্য (যদিও কৃত্রিম ভাষা), দেবীপ্রসাদ সিংহ, সমরজিৎ সিংহ (গদ্য), আফসার আহমেদ, দুলাল ঘোষ, অলোক গোস্বামী, এমনকি স্বপ্নময় চক্রবর্তীও ; হালের কান্তারভূষণ নন্দী, মৃণালকান্তি দেবনাথ, ধীরাজ চক্রবর্তীরাও জেনে বা না-জেনে সেই হাংরিদের লিগ্যাসি হয়ে উঠেছেন। এঁরা ভেঙে ফেলেছেন মূলধারার বাংলা সাহিত্যের যাবতীয় ফর্ম, তাঁদের লেখায় উঠে আসছে অন্ত্যজ জীবনযাপন, প্রেম, ক্রোধ, দুঃখ, আনন্দের কথা। এখানেই মলয় রায়চৌধুরী অমর হয়ে যান। শেষ কথাটা হল, আমার প্রথম সন্তান জন্মানোর পর, এক মধ্যরাতে, বউ, একটু হেসে, বলে, ‘শুধু এই ল্যাওড়াটা দিয়া তুমি বাবা হইয়া গেলা।’ ‘এসব তুমি কী বলছ!’‘কেন করতে পারলে কইতে পারুম না?’তখন আমার মলয় রায়চৌধুরীর কথা মনে পড়ল।

মলয় : বাসব বলেছেন আমরা বাংলা ভাষায় “অপর” সাহিত্যের পথনির্দেশক ।

গোবিন্দ : দারুণ ।

মলয় : অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে । গবেষকরা একত্র করছেন । ‘বর্তমান’ পত্রিকার সহসম্পাদক পার্থ মুখোপাধ্যায় যেটা লিখেছিলেন সেটা পড়ে দ্যাখো : “কোনো কোনো লেখক থাকেন সব দেশে সব কালেই, সময়ের চাপ যাঁকে/যাঁদের সইতে হয় সবথেকে বেশি — হয়তো বা সময়ের থেকে তাঁরা বেশ খানিকটা এগিয়ে থাকেন, এগিয়ে ভাবেন বলেই। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, কালে তো অবস্থাটা আরো একটু বেশিই ঘোরালো, কারণ এখানে তাঁদের সামাল দিতে হয় সময়ের চাপকে এটা যেমন ঘটনা, তেমনি, সেইসঙ্গে নিজস্ব নির্মাণের প্রক্রিয়ার চাপটাও এক্ষেত্রে, বলা বাহুল্য , সমান কার্যকরী রয়ে যায়। এ দুইয়ের সমান চাপ ব্যক্তি মানুষটিকে, অর্থাৎ যিনি নিজের মতো করে ভাবতে চেষ্টা করবেন, স্রোতের সামান্য বিপরীতে হলেও দাঁড়িয়ে , তাঁকে /তাঁদের সর্বদা যে সিধে থাকতে দেয় না, অনবরত চেষ্টা করে নুইয়ে দিতে, এ আমরা প্রায়শ দেখেছি তো বটেই, দেখি ও দেখবও। দেখব কারণ, এই দেখাটাকেই বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে ঔপনিবেশিক ও তথাকথিত উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনার ইতিহাস তার নিজস্ব নির্বিকার নিয়মে নির্মাণ করে থাকে । এই ভয়াবহ বিভিন্নমুখী চাপ স্ব-অভিমুখী একজন ব্যক্তি মানুষকে তুবড়ে দুমড়ে কীভাবে মাপমতন করে নিতে চায় তার নিদর্শন আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিনিয়ত যেমন দেখি , তেমনি কাউকে কাউকে এমনো আবার দেখা যায় যিনি বা যাঁরা এই চাপকে হয়তো সর্বতোভাবে ঠেকাতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু সেই না পারাটাকেও যে কীভাবে নিজের হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়ার অন্তর্গত করে নেওয়া যায় তার জন্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা , হ্যাঁ, প্রচেষ্টাই বলা যাক, চালান। তবে কিনা আমাদের এই কর্তাভজা কালে, যখন শাসকের সংস্কৃতিহীনতার সাংস্কৃতিক বারফট্টাইকেও আমাদের মানতে বাধ্য করা হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতির মূলধারা বলে, তখন, এঁদের দেখা মেলে বটে তবে কিনা হরদম মোটেই নয়। গত শতকের শেষ-সত্তর থেকে আশির দশকের গোড়ায় আমরা যখন সদ্য হাংরি প্রজন্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছি তখন একটি নাম আমাদের চারপাশে সসম্ভ্রম কিছু বা ভীতির সঙ্গে উচ্চারিত হত, সে নাম মলয় রায়চৌধুরীর। তাঁর মাত্রই দু-একটি লেখার সঙ্গে (বই নয়) পরিচয় তার আগে আমাদের একেবারে যে হয়নি তা নিশ্চয় নয়, কিন্তু মূলত যেটা হয়েছিল তা হল উক্ত আন্দোলন-জনিত হইচই সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল হওয়া। এবং যা হবার হয়, আমাদের চোখ এবং মন দুই-ই ধাঁধিয়ে যায়।তখনো ক্ষুধার্ত প্রজন্মের নামবাহী কিছু পুরনো পত্র-পত্রিকা মিলত এখানে-ওখানে। চোখ ও মন দুইয়েরই সচকিত হবার যথেষ্ট কারণ , বলা বাহুল্য, নিহিত ছিল তাইতেই। তবে যেটা ভেবে তখন সত্যিই অবাক লাগত সেটা হল, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বলে খ্যাত অন্যান্যদের লেখা ও বইপত্র যদি বা মেলে, এমনকী কিছু পুরনো পত্র-পত্রিকাও, তাহলে এই একজনের কিছু লেখা বা বইপত্র একেবারেই মেলে না কেন !যাই হোক, মোদ্দা বিষয়টা যেটা তা হল, মলয় রায়চৌধুরী নামে ব্যক্তি-সাহিত্যিক তথা চিন্তককে তখনো আমরা চিনি না বলাই ভালো ; চিনব আরো পরে, আটের একদম শেষ , না, নয়ের গোড়াতেই সম্ভবত, যখন শিবনারায়ণ রায় কলকাতায় ফিরে এসেছেন, শুরু হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামে একটি যথেষ্টই গম্ভীর দর্শন কিন্তু আকর্ষণীয় পত্রিকা ; কেবল তা-ই নয়, তাঁর সঙ্গে আমাদের মতন নেহাৎই এলেবেলে আর অপাংক্তেয়দেরও আড্ডা জমছে, মাঝেমধ্যে হলেও। এবং তখনো, আগেই বলেছি যে , আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি ‘মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর’ ; সে বই ১৯৮৫ সালে বেরোলেও আমরা অন্তত পড়িনি তখনো। জানতামও না ইকনমিকসে স্নাতকোত্তর মলয় ব্যাঙ্ক নোট পুড়িয়ে নষ্ট করার জীবিকা দিয়ে আরম্ভ করে ঢের দিন হল গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের চাকরিতে কেবল যোগই দেননি, সেইসূত্রে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে গাঁয়ে–গঞ্জে চাষি-জেলে-তাঁতি-হস্তশিল্পীদের সঙ্গ করেছেন শুধু নয়, সবথেকে বড় কথা, ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ নামে ভূখণ্ডটিকে হাতের তালুর মতো চেনবার সুযোগ পেয়েছেন — যা যতদিন যাবে ছায়া তো ফেলবেই , সেই সঙ্গে তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেবে (ও নিয়েছে) ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘রাহুকেতু’-র মতো উপন্যাসের পাশাপাশি এমনকী ‘নখদন্ত’ বা ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’-র মতো স্তরে স্তরে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে-চিনিয়ে দেওয়া যায় এমনভাবে বিন্যস্ত অথচ আপাত-এলোমেলো গ্রন্থরাজিও — যা আমাদের সযত্ন-লালিত সাহিত্য-সংস্কৃতি তো বটেই, এমনকী আমাদের রক্তের অভ্যন্তরে প্রোথিত থাকা গোটা হয়ে-ওঠার ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক জীবনধারণারও শিকড় অবধি আমূল নড়বড়ে করে ফেলার স্পর্ধা দেখাবে।এবং কথা হচ্ছে, এইটা করতে গিয়ে তিনি, মলয়, আদ্যন্ত যেটা করেন/করেছেন তা হল, নিজের সময় ও সমকালকে তো বটেই, এমনকী নিজের সামাজিক অবস্থানকেও সেই সঙ্গে, কতকগুলো মূল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যা একই সঙ্গে আমাদের, পাঠকদের মনোসামাজিক ভিতকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। যেমন ধরা যাক , মলয় কেবল নিজেকে কালচারাল বাস্টার্ডই বলেননি, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেও আত্মজীবনীর পাতায় নিজের পরিবারের এমন কিছু বাঁক তুলে দিয়েছেন যা অবশ্যম্ভাবীভাবে সঙ্গেসঙ্গেই ঔপনিবেশিক মনোসামাজিক ভূমিতে আজন্ম লালিত পারিবারিক ধারণার কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করে (যেমন , ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’-য় সটান বলে দেওয়া, যে, তাঁর জ্যাঠতুতো ভাই তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের নিজের ছেলে নয়, তাকে এক বেশ্যার কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। কুলসম আপার ঘটনাটাও অবশ্যই এই পর্যায়েই পড়বে।) ; এবং করে যেহেতু, ফলে সব মিলিয়ে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের মূল ধারায় আজও ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। কেবল তা-ই নয়, এর অভিঘাতেই ২০১৫-তে এসেও মলয়কে জানাতে হয়, ‘এতকাল পাঠকরা আমার বইপত্র খুঁজেও পেতেন না। তাঁদের দৃষ্টিতে আমার মামলাটাই জীবন্ত ছিল।’ বা আশির দশকের শেষের পর্বেও তাঁর অভিজ্ঞতা বলে , ‘কলকাতার সম্পাদকরা ভয়ে সিটিয়ে থাকত, ওই অশ্লীল কবিতার ভয়ে…’ একদিকে অবস্থা ছিল এই, আবার অন্য দিকে ক্ষুধার্ত প্রজন্মের এমন একটা বাজার তৈরি করে তোলে যেখানে মলয় কী বলেন বা ভাবেন নয়, বরং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের একদা কর্মকাণ্ড বা ওইসব তথাকথিত-যৌন অনুষঙ্গগুলি, যেগুলি মলয়রা সেদিন তাঁদের কবিতায়/লেখায় ব্যবহার করছিলেন। এই দিকটিকেই ফণিশ্বরনাথ রেণু হাংরি মামলা চলার সময় মলয়ের কাছে চিহ্নিত করেছিলেন এইভাবে যে, ‘এই যে তোমার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নিয়ে অবসিনিটি আর সাবভারশানের মামলা আরম্ভ হল তো , তুমি দেখবে তুমি ক্রমশ ওই অশ্লীলতার জন্যই পাঠকদের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড হয়ে যাচ্ছো ; শুঁটকি মাছের গন্ধ আমাদের ভালো লাগে, টাটকার থেকেও বেশি টানে।’ বা গিন্সবার্গ বলেছিলেন, ‘এত কবিতা লিখছি, তবু সবাই কবিতার চেয়ে আমি কী করে বেড়িয়েছি তাতে ইন্টারেস্টেড।’ স্বাভাবিক। স্বাভাবিক যে-মানসিকতা উপরিউক্ত এই বাজারটা নির্মাণ করে তিলে তিলে, করে এবং শৈশব থেকেই আমাকে-আপনাকে ঝুঁটি ধরে তার অধীনে নিয়ে গিয়ে ফেলে প্রশ্নাতীত ক্ষমতার আঙুলে, তার দৃষ্টিকোণ থেকে।কেউ কেউ বলবেন হয়ত এখন অবস্থা বদলেছে , অন্তত উপরের দিক থেকে হলেও খানিকটা, কিন্তু বাংলা কবিতা বলুন বা গদ্যের মূল যে ভাবনাধারা, তার ক্ষেত্রে সে বদল, পাঠক জানেন, তা-ও ওই ওপর ওপর, এবং ওই খানিকটাই। হ্যাঁ, আর তাই এখন আর মলয়ের লেখাকে সেই অর্থে অশ্লীল হয়ত বলা হয় না ঠিক কথা, কিন্তু মলয় কি সেই অর্থে আবার যাকে বলে বহুলপঠিতও বটে ? এখনও ? না হলে, কেন নন ?নন কারণ, মলয় কিন্তু সেই অর্থে যাকে বলে সাহিত্য/লেখালেখিকে দেখার যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ করে দেওয়া অ্যাটিট্যুড, যাকে আমাদের দেশে আমাদের তদবধি প্রচলিত দেখার চোখকে ধ্বংস করে সেই উপনিবেশ পর্বের গোড়াতেই তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, এবং যত দিন গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছু সামান্য বিবর্তিত হয়েছে মাত্র, এবং একই সঙ্গে বিশেষ করে দাঁতে-নখে আরো আক্রমণাত্মক ও সার্বিক হয়ে উঠেছে, তাকে মান্য করে নিজের রচনার ভাবনা কাঠামোকে নির্মাণ করেননি/ করেন না। বরং আমরা যে প্রশ্নের কথা বলছিলাম, তাকে সেই প্রশ্নেরই সম্মুখীন করে দেন। যে ভূমি থেকে ২০১৭-তে এসেও তিনি এরকম বলেন যে, ‘আমি মূলত সমাজের পর্যবেক্ষক এবং নিজের মতামত উপস্থাপন করি।’ কেবল তা-ই নয়, এই জায়গা থেকেই আরো বলার যে, মলয়ের উপন্যাস, গল্প , প্রবন্ধ , কবিতা সমূহ বিপজ্জনক ; কারণ, মলয় যা লেখেন তার অনেকটাই বিস্ফোরক রকম ইন্সটিঙ্কটিভ। তাঁর লেখা, তা সে যে গোত্রেরই হোক, স্পষ্ট একটা রক্তান্তর্গত রাজনৈতিক মতামত বহন করে। এবং এই বহন করাটাকে মলয়, আরো অনেকের মতো , ভাষার আচ্ছাদনে আড়াল তো করেনই না, বরং, সেই ভাষার অস্ত্রেই, তাকে হা-হা রকম হাটখোলা করে মেলে ধরেন। আর এটা তিনি করেন যেহেতু নিজের ইন্সটিঙ্কটে নিহিত রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই, নিজস্ব নির্মাণের পাথেয়, কিম্বা বলা যাক উপাদান তিনি যেহেতু সংগ্রহ করে নেন এর অভ্যন্তর থেকেই, ফলে, ১৯৯৫-এ কলকাতায় এই নিবন্ধকারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর সটান ছোবল তুলতে বাধে না, যে, ‘কে প্রলেতারিয়েত ? তুমি, না যারা এটা পড়বে— কারা ? যাদের বাড়ির ভেতরেই পায়খানা থাকে, তাদের প্রলেতারিয়েত বলা যায় না।’ কেবল তা-ই নয়, নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁকে ভুরু কুঁচকে বলতে হয়, ‘বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো , যিনি বা যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তা একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন যোগাবার জন্যে নেওয়া… প্রায় সবই মোটিভেটেড। সকলেই মোটামুটি একটা হাংরি ইমেজ নির্মাণ বা অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছেন। …অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা, নিজেদের ডিসকোর্সকে জায়গা করে দিতে চেয়েছেন।’অর্থাৎ মলয় চিহ্নিত করেছেন কীভাবে তাঁর পরের প্রজন্ম , তৎকালীন সময় থেকে দূরে/পরিবর্তিত কালে বসেও, অন্তর্গত সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণের চাপের সৃষ্টি হিসাবে সেই সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের স্বার্থকেই বজায় রাখবার দায় থেকে গৃহীত হাংরি ইমেজকে খাড়া রাখবার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন করছে যেমন একদিকে, তেমনি অন্যদিকে হাংরি আন্দোলন নামে এক বিস্ফোরণের চরিত্রকেও এই ক্ষমতার চোখ এবং মন দিয়েই দেখতে ও পড়তে মগ্ন থাকছে। এই অবস্থা ও অবস্থানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারাকে মলয় বলছেন পীড়া, যে পীড়াকে, মলয়ের স্পষ্ট বক্তব্য , ‘শেয়ার করা যায় না।’ এবং শুধু তা-ই নয় , এই পীড়াই তাঁকে যে এম আর চোওধারি নামে আরেক অস্তিত্বকেও খাড়া করতে বাধ্য করেছে তা-ও মলয়ের বয়ানেই আমরা জানতে পারছি। এটা একটা দিক, আর অন্য দিকে এই এখান থেকেই জাত হয় সেই পরিস্থিতি যেখানে মলয় বলেছেন, ‘গ্রহণ-বর্জনের বৈভিন্ন্যের নিরন্তর টানাপোড়েনে পাঠকৃতি-বিশেষ তার নিজের পরিসর অহরহ গড়ে নিতে থাকে। তার কিনারায় গালে হাত রেখে বসে থাকা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।’ এবং এইখানেই মলয় নিজের জন্যে ‘ফালচার’-শীর্ষক এক বর্গ নির্মাণ করে নেন — যার গভীরে নিহিত থাকে একটা ‘ইরর‍্যাশন্যালিটি’, যাকে আবার নির্মাণ করছে , মলয় বলছেন, ‘পাশাপাশি মিশনারি স্কুল আর ব্রাহ্ম স্কুল’-এর যাদু-বাস্তবতা — যে বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে মলয় লিখছেন, ‘আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন, ব্রাহ্ম বলে। পিরিলি বাউনদের বজরা উত্তরপাড়ার গঙ্গায় ভাসলে স্নান অর্ধসমাপ্ত রেখে ঠাকুমার পালকি ফিরে আসত। সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ ছিল কেননা তা লোচ্চাদের তামাসবিনি।’ এবং এইখানেই ‘প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা’ আর মিশনারি স্কুলের মূল্যবোধের মধ্যে সংঘাতটা বাধে, এবং মলয়ের রক্তান্তর্গত রাজনীতির ভাবনা-বিশ্ব তথা দেখার-চোখ গড়ে ওঠে। এই দেখার চোখটাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর মতো লেখা, ‘শয়তানের মুখ’ বা ‘জখম’-এর মতো হাড় অব্দি চমকে দেওয়া কাব্যগ্রন্থ, ‘নপুংপুং’,’ইল্লত’,’হিবাকুষা’-র মতো নাটক বা রাজনীতি ও ধর্ম নিয়ে ম্যানিফেস্টোগুলি, যা মলয় রায়চৌধুরী নামক ব্যক্তিটিকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্ণধারদের বিপরীতে গলিয়াথের বিরুদ্ধে ডেভিডের মতো বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে অশ্লীলতার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার পর প্রথম একজন কবির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলা/তকমা ঝুলিয়ে দেয় (সে অভিযোগ অবিশ্যি পরে তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবু)। এবং সম্ভবত এইখান থেকেই অদ্যাবধি মলয়ের বই যত না, বেশি আলোচিত হয়েছেন মলয় নিজে—হয়েছেন কারণ, মলয় যে নিজেকেই লেখার বিষয় করেছেন। করেছেন নিজের সামান্য-টিল্টেড দেখার চোখকেই, যে চোখ দ্যাখে ‘কোরা মার্কিন কাপড়ের পুঁটুলিতে রাজপথ থেকে ছেঁকে তোলা মানবলাবণ্য’ (মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর ) বা যে চোখের দৃষ্টিশক্তির অভ্যন্তরে নিহিত থাকে ‘গহ্বরতীর্থের কুশীলব’ কিম্বা ‘ঘোগ’-এর ভাষা-বাস্তবতার শিকড়। বিষয়কেন্দ্রহীন মুক্ত সূচনা ও মুক্ত সমাপ্তির মধ্যবর্তী পর্বে লজিক্যাল সিকোয়েন্স-বর্জিত ছেঁড়া ছেঁড়া চিত্রকল্পে গেঁথে তোলা এই যে সব পাঠবস্তু , যাদের হাঁ-মুখে নির্বিচারে ঢুকে যায় দলা পাকিয়ে ওঠা রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি মথিত আমাদের গোটা সমসময় , যার সম্মুখবর্তী না হলে বোঝাই যায় না কেন, কোন জায়গা থেকে বাজার নামক প্রধান ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মলয় বলেন তিনি কবিতাকে, লেখালেখিকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চান ( অনেকটা ক্ষেত্রে দিয়েওছেন। অন্তত ‘যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের’, ‘ভালোবাসার উৎসব’-এর মতো লেখা বা ধরা যাক ‘রাহুকেতু’-র মতো উপন্যাসটি পড়ে উঠলে বেশ টের পাওয়া যায়), এবং কেন আজও মলয়ের লেখালেখি নিয়ে যে কোনো আলোচনার কেন্দ্রে ঘুরেফিরে এসে যায়ই হাংরি প্রসঙ্গ এবং তৎসংক্রান্ত ডিবেটগুলি, যা , নিহিত উত্তেজনার কারণেই অনেকটা , মুহূর্তে পাঠকের নজরের লক্ষ্যবিন্দুকে গ্রাস করে এমনকী যখন স্বয়ং মলয় বলেই দিচ্ছেন যে তিনি মলয় রায়চৌধুরী হিসেবেই পরিচিত হতে চান, হাংরি বা অ-হাংরি হিসেবে নয় , তখনো গোটা আলোচনাটিরই ভরকেন্দ্রকে, ক্ষমতার ইচ্ছে/স্ট্রাটেজি-মতো , বাধ্যতামূলক ভিন্নমুখী করে দিয়ে। মলয় রায়চৌধুরীর লেখালেখি সম্পর্কে তা-ই আপাতত কথা রয়ে যায় একটাই , যে, তিনি আমাদের মানসিকতার গভীরে বাজারি আঙুলে আমূল প্রোথিত করে দিতে চাওয়া মানসিকতাটাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তার প্রেক্ষিতেই নিজেকে যাচিয়ে দেখতে চান। এই চাওয়াটাই মলয়কে প্রতি মুহূর্তে যেমন সমকালীন রাখে, বিপজ্জনক হিসাবে প্রতিভাত করে, তেমনি আদ্যন্ত সচেতন নিজস্বতায় জারিতও করে নিঃসন্দেহে। তাঁর গল্প-উপন্যাস বলুন বা কবিতা, নাটক কিম্বা কাব্যনাট্যগুলি, সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধ অথবা আত্মজীবনী — সবের মধ্যেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে থাকেন সেই মানুষটি, উত্তর-ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিষ-আঙুল যাঁর ভাবনা-কেন্দ্রে কোনো রদ-বদলই ঘটাতে পারেনি, বরং নিজেই সামান্য হলেও বদলে গেছে — এই যা !

গোবিন্দ : চমৎকার মূল্যায়ন ।

মলয় : ২০১৮ সালে জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায় আমার জাদুবাস্তব গল্প ‘জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা’ আলোচনার সময়ে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ মারফত আমার ক্ষতিকর ব্র্যাণ্ডিং নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন । সয়ে যাবার পর ভাবলাম, জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা নামের কাহিনির বুনন ও বাঙালি ‘পলিটি’ সম্পর্কে মলয় রায়চৌধুরীর ভাবনাচিন্তা নিয়েই লিখি । মুসলমান শাসকরা বঙ্গদেশকে বলতেন জিন্নত-উল-বিলাদ। অর্থাৎ মর্ত্যের স্বর্গ। কিন্তু গল্পের প্রেক্ষাপট অখণ্ড বাংলা নয়, মূলত পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে। উত্তরঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থনৈতিক, প্রসাশনিক, শিক্ষাব‍্যবস্থা ইত‍্যাদির কঙ্কালটা চোখের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়াই মলয়ের ঝুলির এই আড়ালে অরূপকথনের লক্ষ্য।‘যাতুধান তরফদার…. এই দেশের এক অতি বৃদ্ধ শকুন, এককালের বিশাল পরিবারের অভিজ্ঞ কুলপতি, যার পরিবারে যুবক নাতি শিলাদ ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই।’…….উত্তর-ঔপনিবেশিক পশ্চিমবাংলায় ক্রমশ ভেঙে পড়ছে একান্নবর্তী পরিবারগুলো । টুকরো টুকরো হয়ে পড়ছে পরিবারগুলোর গঠন ও সামাজিক দায়দায়িত্ব এবং মূল‍্যবোধ। যৌথ-পরিবারের শেষ উত্তরাধিকারী মলয় রায়চৌধুরীর কি দীর্ঘশ্বাস পড়েছে যাতুধান তরফদারের বুকের বিদার থেকে ? তাঁর ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ কি প্রতিফলিত এই অরূপকথনে ? জানি না। কিন্তু প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা যে আর সম্ভব নয় সেটা মলয় রায়চৌধুরীর’ বিভিন্ন প্রবন্ধে আমরা পড়েছি । খোপ-বাড়ির খোপে খোপে বাস করা বাঙালির চিন্তা জগতেও যে দৈন্যতা প্রকট হয়ে উঠেছে এই ব‍্যাপারেও মলয় রায়চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধগুলোতে বিশ্লেষণ করেছেন, বিশেষ করে তাঁর ‘উত্তরদার্শনিকতা’ প্রবন্ধে। মলয় রায়চৌধুরী, স্বীকার করেন যে, লেখালেখি ঘরের দরজা জানলা এঁটে সাধনা নয়। মানুষ ও সমাজবর্জিত হয়ে চিন্তাজগতে ঢেউ তোলা নয়। তাতে সাহিত্য খন্ডিত বা একপেশে হয়ে পড়ে, তাতে আর যা হোক সমাজের আসল চিত্রটি প্রতিফলিত হয় না। লেখক-শিল্পী যত মানুষের সাথে মিশবেন, যত সমাজের আনাচে কানাচে পৌঁছাবেন তত পুষ্ট হবে তার অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার ইরিটেশনেই নির্মিত হবে সাহিত্য, শিল্প। মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে উৎপলকুমার বসু লিখেছেন যে, ‘বাংলা সাহিত্যের প্রধান ধারাটি একপ্রকার স্হিতাবস্হায় পৌঁছে গিয়েছিল । তার বাঁধ ভেঙে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না । তিনটি উপন্যাস ও স্মৃতিচারণেও মলয় রায়চৌধুরীর ওই আক্রমণকারী প্রবণতা লক্ষ করি । কথা প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন — “লেখা রাজনীতি ছাড়া আর কী হতে পারে ।” বলা বাহুল্য, তিনি দলীয় বা সংসদীয় রাজনীতির কথা বলেননি । তিনি বলেছেন, “পলিটি”-র কথা । আমরা সবাই মিলে কীভাবে থাকব — মলয় রায়চৌধুরী তারই একটা বোঝাপড়ার দলিল তৈরি করেছেন ।’‘জিন্নতুলবিলাদ’ সম্পর্কিত কাহিনি জুড়েই লেখকের এই অভিজ্ঞতা বা শিলাদের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক মননের জার্নিটা স্পষ্ট। জল-স্থল-অন্তরীক্ষ, দিন-রাত, জঙ্গল-নদী, আন্ডার গ্রাউন্ড-মাল্টিপ্লেক্স, বেশ‍্যাপল্লী-ক্লাসরুম ইত্যাদি সময় পরিবেশ ও অবস্থানের যে বর্ণনা আমরা পাই এবং তার সাথে সাথে যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের প্রকৃতি তা যে মোটেই ভাববিলাসে লিখিত নয়, এইটুকু স্পষ্ট বুঝে নেওয়া যায়। ঘটনা, পরিবেশ ও চরিত্রের এই নিঁখুত নির্মাণ বা শার্পনেস্ স্পষ্ট করে দেয় যে এ সবই লেখকের অভিজ্ঞতালব্ধ। আমরা জানি যে গ্রামোন্নয়ন অফিসারের চাকুরিতে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার, গ্রামে-গঞ্জে চাষি, তাঁতি, জেলে, ছুতোর, খেতমজুর ইত্যাদি মানুষের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখেছেন । গল্পকার উত্তরঔপনিবেশিক বাঙালির বাস্তবজীবনকে অনবরত স্ক‍্যানিং করে গেছেন। পাঠবস্তু নির্মাণে তাই কোনো বাছবিচার নেই। নেই নেকুপুসু মার্কা শ্লীল-অশ্লীলের দ্বন্দ্ব। গল্পের সাবজেক্ট পজিশনেও তাই বহুত্বের যথেচ্ছাচার স্পষ্ট। গল্পের হাঁ-মুখে সেঁধিয়ে গেছে বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সন্ত্রাসবাদ, যৌনতা ইত্যাদি । অনায়াসে সবকিছুকে আত্মসাৎ করে নিয়েছে পাঠবস্তুটি। কখনো পাশাপাশি আবার কখনও বা একটার সাথে আর একটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অবস্থান করছে। পাঠককে যে সবসময় পাকগুলো খুলে খুলে পড়তে হবে এমনও নয়। পাঠবস্তুটি সবকিছু গলাধঃকরণ করে নিজেই একটা আলাদা সাবজেক্ট-বহুত্ব গড়ে তুলেছে। সবজিগুলো তাই তাদের একই খেতে উৎপাদিত হয়েই খুশি। অথচ কনট্রাস্টটি হলো পাঠবস্তুটি যখন বহুধায় বিভক্ত তখন শিলাদকে সামনে রেখে গল্পকার মলয় রায়চৌধুরী নির্মাণ করে গেছেন ব‍্যক্তির নিজস্বতা বা ইউনিকনেস। একদিকে গল্পের কৌম-পরিসর বাড়িয়েছেন, খুলে দিয়েছেন পাঠবস্তুকে। অপরদিকে ব‍্যক্তিকে একক হিসাবে ধরে ব‍্যক্তির ভালোলাগা, মন্দলাগা, সাদা কালো ধলো দিয়ে নির্মাণ করেছেন ব‍্যক্তির নিজস্বতা। সামাজিক জীব হয়েও ব‍্যক্তি এককের নিজস্বতা বা ইউনিকনেস নির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন পুরো অরূপকথন জুড়ে। .যৌনতা এবং জাতিপ্রথার দ্বন্দ্ব এসেছে এভাবেই, স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। জীবনের অংশ হিসেবে নয়, সমাজের সদস্যদের জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য ক্রিয়া হিসাবে। ইয়েস্ দ‍্যাট্ .স্বমেহনকে মলয় রায়চৌধুরী একবারো যৌনক্রিয়ার মধ্যে ফেলেননি। এটা আমার বেশ আবাকই লেগেছে, বরঞ্চ মাছ-শিলাদ খোঁজ করছে সমকামী সঙ্গীর। ‘মাছসমাজে সমকামের গোপন গোষ্ঠীটার সাকিন-ঠিকুজি জানলে কিছুটা অন্তত দুঃখামৃত বেরিয়ে যেত।’ যৌনতা নিয়ে মলয় রায়চৌধুরীর এই দ্বিধাহীন স্পষ্ট ও বহুরৈখিক ভাবনার পরিচয় পাই হাংরি আন্দোলনের সময় থেকেই। তার বিখ্যাত কবিতা ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যৌনচেতনা। এই কবিতাটির উপর অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও আমার মনে হয় প্রশাসনের কাছে এই অশ্লীলতার অভিযোগটি করার উদ্দেশ্য ছিল যেনতেন প্রকারেণ একটা অভিযোগ খাড়া করা। কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর মানসে করা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ধোপে টিকবে না দেখে, এবং সেই অভিযোগটা আদালতে এনে ফেললে নিজেদেরই নিম্নদেশ বস্ত্রহীন হবে দেখে, অশ্লীলতার অভিযোগটিকেই ভেসে যাওয়া খড়খুটো হিসাবে ধরা। যদিও এই অভিযোগটিতে মলয় রায়চৌধুরীর লাভ হয়েছিল প্রচুর, ও ক্ষতিও। মামলা চলাকালীন সময়ে মলয় রায়চৌধুরীর নিঃসঙ্গে, কপর্দকহীন, অসহায় ও অসহ্য জীবনের কথা মাথায় রেখেও বলব এই অভিযোগ রাতারাতি মলয় রায়চৌধুরীকে হেডলাইন বানিয়ে ফেলেছিল। দেশে ও বিদেশেও। এই একটি কবিতা মলয় রায়চৌধুরীকে খ‍্যাতির চূড়ায় টেনে তুলেছে, তাঁকে মিথ বানিয়ে তুলেছে। এই ব‍্যপারটা আমরা সবাই জানি, নতুন করে আর কিছু বলার নেই। হাংরি আন্দোলন ও ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নিয়েও কোনো একদিন আমার মতামত লিখব কোথাও। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও চিন্তা ভাবনা সত্ত্বেও কীভাবে একটা ছোট্ট ভুল এক আলোকবর্ষ দূরত্বের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছিল বলব সেটাও কোনো একদিন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে গ্রেপ্তারি ও কবিতাকেন্দ্রিক মামলা, এই ঘটনাটি মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষতিও করেছে প্রচুর এবং করে চলেছে আজও । ব‍্যক্তি মলয় রায়চৌধুরীর কথা অনুমান করতে পারি, কিন্তু সৃষ্টিশীল মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষতিটা অপরিসীম। মলয় রায়চৌধুরীকে মিথ বানিয়ে আর ওই একটি কবিতাতে মগজ নয় শুধু হাত সেঁকেই মলয় রায়চৌধুরীকে পাঠক-পাঠিকারা স‍্যালুট ঠোকে বারংবার। এই প্রসঙ্গে জিন্নতুলবিলাদে একটি চরিত্রের উক্তি প্রসঙ্গিক: ‘আমাকে কেউ শ্রদ্ধাভক্তি করে না, ওরা জাস্ট আমার কংকালটাকে ভয় পায়। কেননা কংকালটা হল আমার রাজনৈতিক জীবনের কিংবদন্তি।’ মলয় রায়চৌধুরীর রচনাগুলোর আগে-আগে ছোটে ওনার কিংবদন্তি । অথচ ওনার লেখা পড়ে যেটুকু বুঝেছি, প্রায় শতাধিক বই আছে ওনার, উনি বারবার চেয়েছেন বা মনে করেন, লেখক নয়, রচনা-বিশেষের গুরুত্ব থাকা উচিত পাঠকের কাছে। অথচ ওনার ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টোটাই। সাধারণ পাঠক-পাঠিকা ওনার অন্য লেখা পড়েন না বা পড়তে চান না, ওই একটা কবিতা দিয়েই দূর থেকে মেপে নিতে চান মলয় রায়চৌধুরীকে। অথচ যখন তিনি বারবার বদলে ফেলছেন তাঁর গদ্যের ডিকশন, কবিতার ফর্ম, সিরিয়াস পাঠক ছাড়া খেয়াল করেন না সেটা।একইসাথে ধর্মের নামে নষ্টামিকে তুলে ধরতেও তিনি পিছহাত নন। ধর্মকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপও করেছেন অনায়াসে। অবলীলায় আঘাত করেছেন ধর্মের অচলায়তনে। ‘ওকে পোড়ালে ও হিঁদু হয়ে যেত আর পুঁতে দিলে মোচোরমান, তাই ওকে ওভাবে ফেলে দিয়েছে। ওর মড়া বদ-ভাবনার বাতাসে ভরা, খেলেই তোর বায়ু রোগ হতো। আর উড়তে পারতিস না।’ অবশ্য ধর্মের নামে বিভিন্ন অমানবিক অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি চিরদিনই সোচ্চার। হাংরি আন্দোলনের সময়েও তাই দেখি আলাদা ভাবে ধর্ম নিয়ে ইশতাহার । শিলাদকে তার দাদু বলছে, ‘এই যে শঙ্কর, রামানুজ, বল্লভাচার্য, শ্রীধরস্বামী, নিম্বকাচার্য, মাধবাচার্য, কেবলভক্তি, বলদেব বিদ্যাভূষণ, মধুসূদন সরস্বতী, ওনারা তো তোর-আমার জন্যে ভগবানের কথা ব্যাখ্যা করেননি; করেছেন নিজেদের আর চেলাদের জন্যে।’ এইভাবেই ধর্মের মুলো ঝুলিয়ে চলছে অবিরত ধর্মের গুরুঠাকুরদের ব‍্যবসা। বংশপরম্পরায় বসে খাওয়ার সুবন্দো‍বস্ত। রাজতন্ত্র আর ধর্ম চিরদিনই হাতে হাত মিলিয়ে হেঁটেছে। একজন আর একজনকে পুষ্ট করে ক্ষমতা বাড়িয়েছে দুজনরেই, যাতে নিশ্চিন্তে ভোগবিলাসে দিন কেটে যায় এবং রাত। ‘লর্ড মাত্রেই তাদের পি.এ., পি.এস., স্ত্রী ছেলে মেয়ের জন্যে অনেক কিছু করে, যাতে তারা কয়েক পুরুষ বিলাস বৈভব ক্ষমতায় থাকে।’ এই কথাটি এখনকার রাজনৈতিক নেতাদের জীবনের সত্য । টকে যাওয়া রাজনীতি আর সমাজের পচনশীল শবগুলোর ভিতরেও গলা পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিতে তাঁর আপত্তি নেই। ছিঁড়ে ছিঁড়ে টেনে আনেন বঙ্গসমাজের পচা-মাংসের টুকরো, পচে-যাওয়া নাড়িভুঁড়ি। এখানে ‘অপার্টি’ শব্দটির প্রয়োগ বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। তুমি আমার দলের নও, মানে তুমি ‘অপর’, দি আদার । বিরোধী পার্টি আবার কী বস্তু? খায় না মাথায় দেয়? সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের গুরুত্ব অপরিসীম, কে বলল? ওসব বইয়েতে লেখা থাকে, বাস্তবে নয়। ‘সেই থেকে ফিবছর মেমননের স্মৃতিতে একদল পাখি জেতে আর আরেকদল হারে।’ সুবিধাবাদী রাজনীতির মুখোশ খুলেছেন তিনি অনায়াসেই। ‘এই যেমন কাশ্মীরে বোমাবাজদের সম্পর্কে যে ধরনের ভাষ্য দেয়া হয়, ত্রিপুরার বোমাবাজদের সম্পর্কে তার চেয়ে গরম ভাষ্য দেয়া হয়। কেননা ত্রিপুরায় ভাষ্যকারের মেসো-জ্যাঠা-কাকা-মামা থাকে। কাশ্মীরে ভাষ্যকারের কেউ থাকে না।’

সংবাদমাধ‍্যমের দ্বিচারিতা, নিজেদের লাভের কথা মাথায় রেখে মিথ্যা খবর তৈরি করাকেও তিনি মোটেই ভালোভাবে নেননি। ‘আপনার অবৈধ প্রেম যাতে ব্রেকিং নিউজ হয় তার জন্যে নিউজ চ্যানেলদের বলে দেব, সে বাবদ এক্সট্রা দিতে হবে না, বিজ্ঞাপন থেকে কভার করে নেব।’হাংরি আন্দোলনের সময় দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগটা চেপে গিয়ে অশ্লীলতার অভিযোগটা সামনে আনা। হাংরি মানে যে কবি ও কবিতার (সৃষ্টিশীলতা) সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, সর্বগ্রাস, অনেক দিন খেতে না পাওয়া মানুষের মতো গোগ্রাসে খেয়ে ফেলা সবকিছুই, খাওয়ার নিয়ম নীতি শিষ্টাচার কিছুই না মেনে। কবিতার পাঠবস্তুটি কখনো কোনকিছুতে বাছবিচার করবে না, তার প্রকান্ড হাঁ-মুখে তলিয়ে যাবে সবকিছুই। থাকবে না কোনো বাইনারি বৈপরীত্য, হ‍্যাঁ-না, ঠিক-ভুল, ন‍্যায়-অন‍্যায়, শ্লীল-অশ্লীলের দ্বন্দ্ব, এটাকে সম্পূর্ণ না জেনে, না বুঝে প্রচার করা হল হাংরি আন্দোলন মানে না খেয়ে, খালি পেটে কবিতা লেখা । তারসাথে নেশা করা, যৌনক্ষুধা ইত্যাদির মশালাদার খবর তো আছেই। সেই সময়ের সংবাদপত্রের পাতা ওলটালেই চোখে পড়বে নানা রকমের রসালো গালগল্প তৈরি করেছে লেখক-সাংবাদিকরা । জ্যোতির্ময় দত্ত লিখেছিলেন, ‘বাংরিজি সাহিত্যে ক্ষুধিত বংশ’ । প্রশাসনের মিথ্যা আশ্বাস আর মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ভুলিয়ে রাখার এক ওয়েস্টবেঙ্গলসম দক্ষতা এড়িয়ে যায়নি গল্পকারের চোখ থেকে। হাংরি আন্দোলনের সময় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার এটাও ছিল একটা মস্ত কারণ। হাংরি আন্দোলনের পরপরই পশ্চিমবঙ্গে ঘটে গেছিল নকশাল আন্দোলন। দেবেশ রায় এই দুটি আন্দোলনে একই বিশ্ববীক্ষার কথা বলেছিলেন । অথচ দুটোর উদ্দেশ্য, প্রস্তুতি ও গভীরতা সম্পূর্ণ আলাদা । হাংরি আন্দোলন যেখানে দেশভাগোত্তর বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি, ধর্ম, শিল্প ও সাহিত্যে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে আঘাত হানার চেষ্টা করেছিল , সেখানে নকশাল আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মার্কসীয় পন্হায় রাজনৈতিক ক্ষমতাদখল । হাংরি আন্দোলনে ক্ষমতার বিরুদ্ধে যে জেহাদ তার কারণ মূলত প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং শিল্প ও সাহিত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বাণিজ্যিক প্রয়াস। শিল্প ও সাহিত্যের পায়ে ভিক্টোরিয়ান মূল‍্যবোধের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া। তাছাড়া শিল্প ও সাহিত্যজগতের মানুষের মধ্যে এসেছিল জাড্যের উদাসীন স্থিতাবস্থা। সমাজবিমুখ হয়ে সাহিত্য ও শিল্পের বাজার আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । ভাবনাতেও এসে গেছিল দৈন্য। কোনো নতুন আইডিয়া নেই। শুধু কালিতে কালি বুলিয়ে সুখী সুখী নির্মাণই ছিল শিল্প ও সাহিত্য সাধনা। এরসাথে যুক্ত হয়েছিল ক্ষমতার পদলেহন করে স্বীকৃতি যোগাড়। ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত হেনেছিল হাংরি আন্দোলন। যদিও অ্যাবস্ট্রাক্ট সিস্টেমের নি-জার্ক প্রতিক্রিয়ায় আজও কোনো হেলদোল নেই। হাংরি একটা কামড় দিতে পেড়েছিল সেই পচাগলা মাংসে। হাংরি আন্দোলনে আন্ডারগ্রাউন্ড বা চোরাগোপ্তা পথের কোনো স্থান ছিল না। যুদ্ধটা সামনাসামনি। আর ক্ষমতার উৎস বন্দুকের নল নয়, কলম-তুলি। যা মুখোশ খোলে, রক্ত খায় না। ‘ভেতর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে দেখল জঙ্গিলা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের গুপ্ত গুলছররা চলছে।’….নকশাল আন্দোলন ছিল অপরদিকে চোরাপথে গেরিলা কায়দায় আঘাত হানা, এখন মাওবাদীরা জঙ্গলে লুকিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রয়াস করছেন, ভারতের জাতিপ্রথার কোনো বিশ্লেষণ তাঁরা করেন না । গল্পকার যে এই চোরাগোপ্তা পথে মানুষখুনের আন্দোলনগুলিকে ভালো ভাবে নেননি তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই গল্প থেকে। ‘সবাই ইংরেজিতে কথা বলছিল, তর্কাতর্কি করছিল, চাপানউতর করছিল; মনে হল ওটাই জঙ্গিলাদের পিতৃভাষা।’ মার্কসবাদকে সামনে রেখে দেশে দেশে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে সবচেয়ে ভুল ছিল, আঞ্চলিক বা নিজস্ব সমস্যাকে বিচার বা বিশ্লেষণ না করে সবকিছুকেই মার্কসবাদের আলোকে ফেলা। অর্থাৎ এখানেও যেন সেই ধর্মের মতো গোঁড়ামি। নিজস্ব চিন্তাভাবনা নয়, নিজের সমাজকে চিনে বিচার বিশ্লেষণ নয়, ধর্মগ্রন্থের মতো একটি বইয়ের কথাগুলিকে চিরসত‍্য ধরে তা প্রশ্নহীন আনুগত্যে পালন করে যাওয়া। ‘মনে হল ওটাই জঙ্গিলাদের পিতৃভাষা’-র মধ্য দিয়ে গল্পকার যেন এটাই বোঝাতে চাইলেন যে, কীভাবে আন্দোলনকারীরা নিজেদের ভারতীয় আইডেন্টিটি ভুলে গিয়ে, নিজেদের চিন্তাভাবনার পরিসরটাকে শূন্য করে ক্রমাগত কপচে যায় মুখস্থ করা বুলি। আর অ্যাকশন্ ঠিক সেই আদি অকৃত্রিম পথেই। নিজস্ব পথ আবিস্কারের কোনো চেষ্টা নেই। শুধু সমাজ-বদলকারীদের নয়, সুখী সামাজিক মানুষদের শ্রেণিবিভাজন’টাও তিনি ধরেছেন নিপুণভাবে। ‘রয়েছে যবাক্ষারজান জলের নিচড়া বর্গ, রোদবৃষ্টিমাখা জলের উচড়া বর্গের সঙ্গে মাঝামাঝি জলের নিচড়া বর্গ। অতি নিচড়া বর্গের গায়ে আঁশ নেই চোয়াল নেই ডানা নেই, তলানি খায়। নিচড়া বর্গের গায়ে হাড় নেই, সবই কার্টিলেজ, কানকোর জায়গায় খড়খড়ি; জলের বেসমেন্টে নামলে চোখের তলায় গর্ত দিয়ে শ্বাস নেয়। আর উচড়া বর্গ তো রোদের পাউডার চাঁদের ক্রিম আর শিশিরের পারফিউম মেখে চোপরদিন গোমরে ঝিকিমিকি।’ এই বিভাজনকে বৈচিত্র্য মেনে মানুষ’ও বেশ খুশি। তাই সুখী খুশি কানে যদি কেউ নতুন কিছু শোনাতে যায় শোনে না, ভাবতেও চায় না, শুনতেও। ‘রঙিন কাউকে দেখলেই ওদের পোঁদে হিং জমে’। চিরদিনই নতুন কিছু যাঁরা জানাতে চেয়েছেন মানুষকে, তাঁদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ‘রঙিন বলে ওই সব বর্গের মাছেরা কেউই শিলাদকে নিজেদের লোক বলে মনে করে না, অথচ খুব হিংসে করে।’এই অরূপকথনে সাম্রাজ্যবাদীশক্তির দাদাগিরিকেও তিনি শিলাদের মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ‘এই বোটকা মালটা কোত্থেকে এল রে সুনন্দা, আমেরিকা না ইজরায়েল? সেই বুড়ো বাঘটার এলাকা গায়ের জোরে জবরদখল করে বসে আছে।’ হয়তো উপনিবেশের রঙ পাল্টে গেছে, ‘নিজেকে আলেকজান্ডার কিংবা দারিয়ুস ভাবছে, মুতে-মুতে জবরদখল আর পাকাপাকি রাজ্যপাট, হাঃ হাঃ হাঃ…’ এখন লক্ষ্য অর্থনৈতিক উপনিবেশ স্থাপন। কিন্তু তার এফেক্ট একই। অসংখ্য হাড়জিরজিরে মানুষের লাশের উপর গুটিকয় নাদুসনুদুস মানুষের ভুড়ি ভুড়ি ভুরিভোজ। ‘দ্যাখে কি, গির্গিটবোমা অ্যানোলের পচাগলা লাশের মোরব্বা চেখে-চেখে খাচ্ছে মার্কিন কানিমাগুর আর ব্রিটিশ পাঁকাল।’

পশ্চিমবঙ্গের পুঁথিনির্ভর শিক্ষকমুখী শিক্ষাব‍্যবস্থার হাল যে কতখানি করুণ তা আর নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। এটা যেন ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে, সবাই মানে তবু হরিদাসের গোয়াল খালি থাকে না। উপায়ও নেই। যেন তেন প্রকারেণ চাই ডিগ্রি, পরীক্ষায় পাশ করাটাই সাফল্যের খতিয়ান। শিক্ষা? সেটা আবার কী স‍্যার? ‘শিমুল-পলাশের ডালে-ডালে ঠাকুরাল-বাঁদর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ছাত্র পড়ানো দেখছিল শিলাদ। প্রগতিশীল বাঁদর স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বেশ হোঁতকা-হোঁতকি রাঙা পোঁদা রাঙামুখো। কারোর চতুর্থ হাতে বিপত্তারিণির হর্তুকি, কারোর তৃতীয় হাতে জয় বজরংবলির মাদুলি, কারোর দ্বিতীয় হাতে রুপোর চেনে মাকলা-বাঁশের শেকড় বাঁধা। ছাত্র-ছাত্রীরা রোগা টিংটিঙে।’….শিক্ষকরা নিজেরাই কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আর তারাই দেয় বিজ্ঞানের শিক্ষা। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে-পড়া ছেলেমেয়েরা আসে ফ্রি স্কুলে শিক্ষা নিতে। বাড়িতে ঠিকঠাক খেতেও পায় না। অপুষ্টি শরীরে ও মনে, আর তারাই মুখস্থ করে বাড়ি ফেরে ভিটামিন কাহারে কয়। এই দূরাবস্থা থেকে আজ আশার আলো স্কুলে-স্কুলে মিড-ডে মিল প্রকল্প। এই গল্পটি যখন লেখা হচ্ছে তখন মিড-ডে মিল চালু হয়নি। তাই গল্পকারের তর্জনী নিক্ষেপ সফল। অবশ্য শুধু সরকারি ফ্রি স্কুল নয়, ঝাঁ চকচকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষাব‍্যবস্থাও যে খুব ভালো এমনও নয়। সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব‍্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো নাম্বার, আরো নাম্বার, আরো আরো নাম্বার। নো ইনোভেশন ওনলি মুখস্থং নোটং। উদাসীন পৃথিবীটা আমাকে লাথিয়ে-লাথিয়ে আমারই স্বাধীনতায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে, আর আমি, পাখনা চাপড়ে বিলাপ করতে বাধ্য হচ্ছি। সম্ভাবনার সুযোগ সুবিধের মধ্যেই আমাকে কাৎ মেরে-মেরে খতিয়ে বেরোতে হবে। না কি?’ প্রশ্ন করতে বাধ‍্য হই নিজেকে, আর উত্তর? ‘নিজেকে নিজের কাছে, নিজের বাছবিচারের সম্ভবানার কাছে, বেঁচে থাকার খামখেয়ালি অথচ নির্বিকার স্রোতের কাছে, নিজেকে পরাজিত লাগে, হেরো, পরাভূত।’”

গোবিন্দ : কবিতাটা একইসঙ্গে আপনার পক্ষে ও বিপক্ষে গেছে, এই তর্ক কিন্তু সত্যি ।

মলয় : ইউটিউবে অনেকে আমার এই কবিতাটা আবৃত্তি করেছেন । মহিলা কবি ও ঔপন্যাসিক মোহনা সেতু আবৃত্তি করার পর লিখেছেন, “যদি আমায় জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি সবথেকে বেশি কোন কবিতা পড়েছি তবে আমি দুইটা কবিতার নাম বলব। এক. বিদ্রোহী ; দুই. প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার। ৯০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা মুখস্ত হয়ে গিয়েছে পড়তে পড়তে। অবশ্য এই কবিতা কোনো পুরুষেরই। আমি যেহেতু সমপ্রেমী না সেহেতু একজন নারীকে যোনী মেলে ধরার কথা বলতে পারি না। কিন্তু কবিতাটি আমার এত পছন্দ যে এসমস্ত কিছুকে পাত্তা দিলাম না। “কেউ কথা রাখেনি ” কবিতা যখন আমিসহ অনেক নারী পাঠ করতে বলি, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ, এখনো সে যেকোনো নারী— তখন এই কবিতায় বাধ্যবাধকতা থাকার কথা না।” 

গোবিন্দ : আপনার বহু কবিতা ইউটিউবে পাঠ করেছেন অনেকে । আপনিও অনেক কবির কবিতা পাঠ করেছেন । তাঁদের মধ্যে অনেকে সম্ভবত বর্তমান প্রজন্মে সদ্য লিখতে এসেছেন । আপনি যে নতুন কবিদের উৎসাহ দেন তা সকলেই স্বীকার করেন ।

মলয় : এই কবিতাটা এ-পর্যন্ত ইউটিউবে আবৃত্তি করেছেন, মোহনা সেতু ছাড়া, শিবাশীস দাশগুপ্ত, তনুময় গোস্বামী, অ্যালেন সাইফুল, রাজা মুখার্জি, সন্ধি মুহিদ, রাজীব চৌধুরী, নুর হোসাইন, দেবাশীস ভট্টাচার্য, আদিত্য শুভ, শশীপ্রসাদ শীল, কৌস্তুভ গাঙ্গুলি, আদিত্য অনাম আর দীপ সেন । আরেকটা কবিতা, ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো’, সেটাও ইউটিউবে এ-পর্যন্ত আবৃত্তি করেছেন সুস্মিতা বোস, শারমিন সুবহা, মিতালী সেন, মোহনা সেতু, সাদিয়া সোবহান সারা, সিলভিয়া নাজনীন এবং মৌ মধুবন্তী ।

গোবিন্দ : আপনার প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতা বিদেশে যতো বিখ্যাত, এখানকার অধ্যাপকরা ততোই এড়িয়ে চলেন, দেখেছি । বরং বাংলাদেশের তরুণ কবিরা এই কবিতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন ।

মলয় : তা সত্যি। ইউরোপের ভাষাগুলোতে অনুবাদ হয়েছে, তুর্কি আর আরবিতেও হয়েছে । তুর্কিতে দুবার অনুবাদ হয়েছে, প্রথমবার করেছিলেন পেলিন আবায় নামে একজন যুবতী। ভাবতে পারো ? মুসলমান-প্রধান দেশে একজন তরুণী এই কবিতাটা অনুবাদ করেছিলেন ? পশ্চিম বাংলার কবি-ঔপন্যাসিক অনুপম মুখোপাথ্যায়ের এই কথাগুলো থেকে কারণ কিছুটা খোলোশা হয়, উনি বলেছেন, “ মলয় রায়চৌধুরী। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে তিনি বাংলা সাহিত্যের একমাত্র জীবিত আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক। প্রায় একাই জ্বলে থাকা আগুন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় দু-দশক হয়ে গেল। আমার এই সম্পর্ক থেকে পাওয়ার ভাগটা এতই বেশি, এত কিছুই শিখেছি তাঁর কাছে, এটাকে প্রায় একতরফা সম্পর্কই বলা যায়। এখনও তিনি লেখায় সমান সক্রিয়। এমনকি, হয়ত আগের চেয়েও সক্রিয় ও সজীব মনে হচ্ছে তাঁকে আমার আজকাল। আসন্ন শারদীয়ায় আপনারা একাধিক পত্রিকায় তাঁর করা অনুবাদ পাবেন, পত্রিকাগুলোর ঠিকানা নিজেই বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। হয়ত এই মুহূর্তেই একটা উপন্যাস লিখছেন, যেটা পড়ার পরে আমাদের অনেক কিছু নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আত্মপ্রচারে তিনি একটা নতুন দিকই খুলে দিয়েছেন, যেদিকটাতে পা রাখার ফলে আমাকেও অনেকে আজ চেনেন। প্রতিষ্ঠান নয়, নিজেই নিজেকে বহন করেন এই লেখক। বন্ধুর বদলে শত্রু কুড়িয়ে চলা এই লেখক। এই কবি। 

গোবিন্দ : যথার্থ বলেছেন অনুপম । মেইনস্ট্রিম সাহিত্যে আপনার শত্রুসংখ্যা বেড়ে চলেছে পশ্চিমবাংলায় । শক্তি চট্টোপাধ্যায় পুলিশের কাছে দেয়া স্টেটমেন্টে লিখেছিলেন, “আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাগুলো মানসিক বিকৃতিতে পরিপূর্ণ এবং তার ভাষা নোংরা । মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ শিরোনামের কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি ।” অথচ সেই সময়ে ঔপন্যাসিক রবীন্দ্র গুহ লিখেছিলেন, “আমি, সমীর রায়চৌধুরী ও সুবিমল বসাক তিনজনে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে হাংরির সেই সংখ্যাটি থেকে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ পড়েছি । পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে দারুন আলোড়ন । পুলিশ অনেক দিন থেকেই ফাঁদ পেতে ছিল । কয়েক কপি সংগ্রহ করে দৌড়োল লালবাজার থানায় জমা দিতে । শুরু হল ধরপাকড় । লাথানি । হেনস্হা । অনেকেই কলকাতা থেকে পালাল । কেউ কেউ মুচলেকা দিয়ে ‘আজকাল’ এবং ‘আনন্দবাজারের’ তু-তু চাকর হয়ে গেল । যুদ্ধের ময়দানে দ্রোহপুরুষ মাত্র তুমি । অত হুজ্জোতের মধ্যেও আমি শুধিয়েছিলাম — ‘কেমন লাগছে ?’ তুমি উল্লাস করে হেসেছিলে । বলেছিলে — “এভারেস্টের চুড়োয় একটি মাত্র সিংহাসন, আমি মলয় রায়চৌধুরী, সেখানে বসে আছি ।” অমিয় দেবনাথ লিখেছিলেন, “কবিতাটা পোষ্ট করার পর আমার মিনিমাম ৫০ জন বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটেছিলো। সেদিন পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিলাম।”

মলয় : কী আর বলবো, বলো ! এটা পড়েছো, অনিন্দ বড়ুয়ার অনুবাদ করা, “চট্টগ্রামের ভাষায় “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার?—–অ-খোদা মরি যাইয়ুম যাইযুম/আঁর চঁ’ড়া জ্বলি যারগই আঠাইট্যা ঠাডারে/আঁই কী গউজ্জুম কডে যাইয়ুম/অ’মারে কিচ্ছু গম ন লাগের/লেয়-পড়া বেগ্গুন লাথি মারি/ যাইয়ুমগই শুভা/শুভা আঁরে তোঁয়ার তরমুজ-কঅরর/ ভিতরে ঘইলতা দ’/ঘুটঘুইট্টা আঁধারত খইর খইর/ মশারির লুডি পইজ্জা ছামাত/বেক নাকল তুলি নিবার পর শেষ/ নাকলঅ আঁরে ফেলাই যারগই/আঁইত আর ন পারির,/মেলা কাঁচ ভাঙি যারগই আঁই জানি/ শুভা, হেডা মেলি ধর,/শান্তি দ শিরা বেগ্গুনে চৌগরপানি/ আনি লই যারগই কইলজার ভিতরে/আদিকাইল্যা ব্যারামে পুঁচি যারগই/ মগজর হাঁছোড়াইন্যা অউনর ফুঁয়া /অ’মা, তুঁই আঁরে কঙ্কাল সিবে কিল্লাই জনম ন’দ?/তইলে ত আঁই দুইকুটি অলোকবর্ষ/ ভগবাইন্যার পোঁদত চুম খাইতাম/এয়াত কিচ্ছু ভালা ন লাগের আঁত্তে/ কিচ্ছুই ভালা ন লাগের/উগ্যাত্তুন দু’য়া চুম দিলে উর্বিষ লা’য়/জোরগড়ি চুইদত্তাম যাই কতবার / ইয়াপোয়ার নাম প’ড়ি/গম কামন ফিরি গেইগই….” আর কায়েস মাহমুদ স্নিগ্ধ করেছেন নোয়াখালির ভাষায়, “ওরে মারে মরি যাইয়ুম মরি যাইয়ুম মরি যাইয়ুম।/আঁর সামবা জ্বলি যারগই দারুয়ার আগুনে।
আঁই কিত্তাম, কোনায় যাইতাম কইতাম হারি না,/ দিলের ভিত্রে শান্তি আইয়ে না এক্কানাও।/ এগিন হুঁথি মুঁতিত লাইত্থাই চলি যাইয়ুম রে শুভা।/শুভা আঁরে এক্কানা তোঁর ভিত্রে চলি যাইতে দে, গেঁডিত গেঁডিত আঁডি যাইতে দে।/ আন্দারের ভিত্রে রাইত নামাইন্না আন্দারের ভিত্রে মশাইর টানাইন্না ছামার মইদ্যে,/বেজ্ঞিন নাও চলি গেসে, অন এই নাওগাও চলি যারগই গাঁডের কিনারের তুন।/উফঃ আর হারি না রে, লাগে য্যান খালি গেলাস বাংগের।/ শুভা ভোদা খুলি আঁর দুয়ারে খাড়া, সুখ দে শুভা, তোরে সুদি।/গিরার গিরার কান্দন খালি চলি আইয়ের আঁর দিলের গোড়াত।/বিমারে বিমারে হঁসি গেসে আঁর গিলু বরা গরম ঠাডা।/এরে মা, তুঁই আঁরে খালি আড্ডিত কেন হ্যাডে লইলি না?/
গোসত দিসত গাত, নইলে তো দুই কুটি সন ঠাউরের হোন্দে চুম্মাচুম্মি কইত্তাম, ওরে মা।/
আঁর বালা লাগে না, আঁর আর কিছুই বালা লাগে না।/ গন গন চুম্মাইলে আঁর গা গিনগিনায়,/সুদতে সুদতে বেডিরে থুই রঙ তামশাত চলি আইসি ম্যালা দিন/ আঁর কইবতার ঠকঠকাইন্না খাড়াইন্না হ্যাডায়।/এগিন কিয়া অইতে আছে, কিয়া অইতে আসে আঁর সিনার বিত্রে ওরে ঠাউর/বেজ্ঞিন বাংগি গুড়াগুড়া করি হালামু, বাংগি হালামু এরে মাদারচোতের হুত/বাংগি হালামু তোগো ডঙের নাচন কোন্দন/আঁই কইদিলাম উডাই আনমু শুভারে, আঁর শুভা, আঁর শান্তির শুভা।/ হেতিরে গুঞ্জাই থোনের তুই কোনাইগার মাংতার হুত হালা?


গোবিন্দ: অভাবনীয় ! বাংলাদেশে  আপনি জনপ্রিয় কবি, আলোচক, ঔপন্যাসিক । ২০০৮ সালে নির্ঝর নৈঃশব্দ আপনার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা সামহোয়ার ব্লগে পোস্ট করার পর যে বিতর্ক আরম্ভ হয়েছিল, তা আজও চলছে । এ পর্যন্ত পছন্দ করেছেন ৩৪৭ জন, মন্তব্য করেছেন ১০৪ জন।বাংলাদেশের মহিলা গল্পকার ২০০৮ সালেই লিখেছিলেন, “ আমি একজন কবিতার পাঠক হিসেবে বলতে চাই কবিতাটি আমার কাছে অসাধরণ মনে হয়েছে। শ্লীলতা কিংবা অশ্লীলতা বিচার করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যার বদহজম হবে সে পড়বে না। যার সহ্য করার ক্ষমতা আছে সে পড়বে।” ২০১০ সালে বাংলাদেশের কবি অমিত চক্রবর্তী লিখেছিলেন, “সময়কে অতিক্রম করা কবিতা এটি।যারা নিন্দা করেছেন তাদের বলছি কবিতা শব্দ শালীনতা বা ভাবসৌন্দর্য্য নয়।কবিতা কবির একান্ত অনুভুতি।ফিল করতে না পারলে পড়বেন না কিন্তু মলয় রায় চৌধুরীর কবিতা নিয়ে মন্তব্য করার স্পর্ধা বর্জন করবেন।” ওই বছরই হাসান মাহবুব লিখেছিলেন, “প্রথমত, শারিরীক যন্ত্রণা নিয়া এই কবিতাটা লেখা হয় নাই। এটা তার চেয়েও বেশি কিছু। তবে প্রকাশভঙ্গি দেখে মানুষ ভুল বুঝতে পারে। আর যেসব শব্দের উদাহরণ তুমি দিছো অরণ্যরে কবি কিন্তু সেই টাইপ শব্দ ইউজ করেনাই। যোনী না লিখে তো অন্য কিছুও লিখতে পারতো, তাইনা? অথবা স্তনের পরিবর্তে অন্যকিছু? অমিত ঠিকই বলসে, ফিল ইট। এটা শারিরীক কামনা বাসনার কবিতা না। এটা এক অসহনীয় যন্ত্রনার বহিঃপ্রকাশ।” 

মলয় : ফেসবুকে দেখি আজকাল আমার কবিতা অনেকে পোস্ট করেন । আমার উপন্যাসও আলোচনা করেছেন অনেকে, সম্ভবত ইনটারনেট আসার সুবিধার কারণে ।  আমার উপন্যাস “অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ অবলম্বনে বাংলাদেশের কবি আসমা অধরা একটা কবিতা লিখেছিলেন। ওই উপন্যাসে নায়ক নিজেকে নানা রকমের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছে। কবিতাটা এরকম, “বুকের মধ্যিখানে নিঁখুত জীপার/খুলে দেখিয়ে দেয়া যেত লাঙ্গলের ফলা/করেছে এফোঁড়ওফোঁড় হৃদবিন্যাস/অযথা জমে থাকা টক্সিন ক্রমেই লাম্প/অথচ স্ফটিক স্বেদবিন্ধুতেও তেমনি পয়জনাস!/মেঘের জলদ কি জানে অক্সিটোসিন,/ব্যাপক জাগরণ কালীন ঘুম?/ক্ষরণ ও মন্থনে কার্ডিওভাস্কুলেশন;/যে কুকুর আঁচড়ে দেয় ত্বক ও শিরাবিন্যাস/তাকে বলি কানে কানে, শেফার্ড নয়, পুডল ভালোবাসি!”

গোবিন্দ :ফেরলিংঘেট্টি, যিনি অ্যালেন গিন্সবার্গের হাউল আর ক্যাডিশ প্রকাশ করেছিলেন, আপনাদের কবিতা ওনার পত্রিকায় ছেপেছিলেন, তিনি নাকি আদালতের রায় পড়ে লিখেছিলেন, ভুল ইংরেজিতে হাস্যকর আদেশ ।

মলয় : লোয়ার কোর্টে আমাকে সাজা দেবার কারণ হিসাবে জজসাহেব লিখেছিলেন,”Applying the test to the offending poem and realising it as a whole, it appears to be per se obscene. In bizarre style it starts with restless impatience of a sensuous man for a woman obsessed with uncontrollable urge for sexual intercourse followed by a description of vagina, uterus, clitoris, seminal fluid, and other parts of the female body and organ, beasting of the man’s innate impulse and conscious skill as to how to enjoy a woman, blaspheming God and prefaing parents accusing them of homosexuality and masterbation, debasing all that is noble and beautiful in human love and relationship. In a piece of self-analysis and eroticism in autobiographical or confessional vein when the poet engages himself in a mercilessly obnoxious and revolting self-denigration and resortage of sexual vulgarity to a degree of perversion and morbidity far exceeding the customary and permissible limits of candour in description or representation. It is patently offensive to what is called contemporary community standards. It’s predominant appeal to an average man considered as a whole is to prurient interest, in a shameful or morbid interest in nudity, sex and excretion. Considering it’s dominant theme it is dirt for dirt’s sake, or, what is commonly called hardcore pornography, suggesting to the mind of those in whose hands it may fall stinking wearysome and suffocating thoughts of a most impure and libidinous character and thus tending to deprave and corrupt them without any rendering social or artistic value and importance. By no stretch of imagination can it be called, what has been argued, an artistic piece of erotic realism opening up new dimension to contemporary Bengali literature or of a kind of experimental piece of writing, but appears to be a report of a repressed or a more pervert mind who is obsessed with sex in all it’s nakedness and thrives on, or revel, in utter vulgarity and profanity preoccupied with morbid eroticism and promiscuit in all it’s naked ugliness and uncontrolled passion for opposite sex. It transgresses public decency and morality substantially, rather at public decency and morality by it’s highly morbid erotic effect unredeemed by anything literary or artistic. It is an affront to current community standards of decency or morality. The writing viewed separately and as a whole treats with sex, that great motivating force in human life, in a manner that surpasses the permissible limits judged from our community standards and as there is no redeeming or social value or gain to society which canbe said to preponderate, I must hold that the writing has failed to satisfy time-honoured test. Therefore, it has got to be stamped out since it comes within the purview of Section 292 of Indian Penal Code. Accused is accordingly found guilty of the offence Under Section 292 Indian Penal Code and is convicted thereunder and sentenced to pay a fine of Rs. 200/- in default simple imprisonment for one month. Copies of the impugned publication seized be destroyed.”

গোবিন্দ : অ্যালেন গিন্সবার্গ আপনাদের পাটনার বাড়িতে কতো সালে এসেছিলেন ? আপনি ওনার হাউল আর ক্যাডিশ অনুবাদ করেছিলেন । শিলচরের কবি বিকাশ সরকারের কাছে শুনেছি ওনার ‘লেখাকর্মী’ পত্রিকায় ক্যাডিশ প্রকাশিত হয়েছিল । বিকাশ সরকারের সঙ্গে কেমন করে যোগাযোগ হলো ?

মলয় : হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে আর গিন্সবার্গ পাটনায় এসেছিলেন ১৯৬৩ সালে । উত্তরবঙ্গে যখন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হলো তখন থেকেই বিকাশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। বিকাশ বেশ কয়েকটা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা প্রকাশ করেছিলেন । ‘থাবা’, ‘বিচিত্রবিশ্ব’, ‘জনপদ সমাচার’, ‘সময়প্রবাহ’, তারপর যুগশঙ্খতে যোগ দিতে ২০০৪ সালে চলে গেলেন গুয়াহাটি । ২০১৫ সাল থেকে কলকাতায় আছেন । ‘বিচিত্রবিশ্ব’ পত্রিকায় আমার বহু কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ; যুগশঙ্খতেও প্রকাশিত হয়েছে । প্রকাশ কর্মকার যখন এলাহাবাদে ছিলেন আর আমি ছিলুম লখনউতে তখন আমরা দুজনে মিলে একটা বুলেটিন বের করতুম । তাতে থাকতো প্রকাশ কর্মকারের ড্রইঙ আর আমার কবিতা । এগুলো বিকাশ রিপ্রিন্ট করেছিল ‘বিচিত্রবিশ্ব’ পত্রিকায়, সব হারিয়ে ফেলেছি । লেখাকর্মী পত্রিকার ওই কপিটা গিন্সবার্গের সংগ্রহশালার কিউরেটার বিল মর্গান এসে নিয়ে গিয়েছিলেন ।

গোবিন্দ : উত্তরবঙ্গের হাংরি আন্দোলনে বিকাশ সরকার ছিলেন ?

মলয় : হ্যাঁ, ছিল বলেই তো যোগাযোগ হয়েছিল । তখন উত্তরবঙ্গ থেকে বেশ কয়েকটা হাংরি পত্রিকা প্রকাশিত হতো । অনুভব সরকারের ‘টার্মিনাস’, জীবতোষ দাশের ‘রোবোট’, সুব্রত রায়ের ‘হাংরি ২১০০’, মনোজ রাউতের ‘ধৃতরাষ্ট্র’, রাজা সরকারের ‘কুরুক্ষেত্র’, অলোক গোস্বামীর ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’, অরুণেশ ঘোষের ‘জিরাফ’ ইত্যাদি । ওরা বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল । শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ মিলে ওদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল। উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আলোচনার সময়ে বিকাশকে কেন বাদ দেয়া হয়, জানি না। অলোক গোস্বামীর ‘মেমারি লোকাল’ স্মৃতিকথাতেও বিকাশ সরকারের কোনও উল্লেখ নেই । অবশ্য সাধারণ পাঠকরা তো আমার নাম শোনেনি, বই পড়েনি । কীই বা বলি । সম্প্রতি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর দুটো কবিতা পোস্ট করেছিলুম ; দেখলুম ওনার মতো প্রতিভাবান কবির নাম শোনেনি অনেকে । 

গোবিন্দ : ফেসবুকে সুতীর্থ দাশ-এর মতন পাঠকও আছেন, জানি না এপারের না ওপারের । উনি লিখেছেন, “স্বীকার করছি পড়ি নি, কারণ মলয় রায়চৌধুরী সুনীল-সমরেশ – শীর্ষেন্দু” দের মতো জনপ্রিয় নন, বা পুজোসংখ্যা, আলোচনাসভা, পত্রিকার সাহিত্যপাতার প্রথমে নাম থাকে না। আমার কথাই বলছি – আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হয়েও অনার্স পাশ করার পরেও জানতাম না মলয় রায় চৌধুরী কে, বা হাংরি আন্দোলন কী ? সত্যি বলতে আপনার নাম প্রথম শুনেছি ” বাইশে শ্রাবণ” চলচ্চিত্রে। তারপর ” আধুনিক কবিতার ইতিহাস ” বইয়ের শেষে বর্ণানুক্রমিক সূচী খুঁজে আধ পৃষ্টা লেখা পেয়েছি মলয় রায় চৌধুরী সম্বন্ধে। এই দশার কারণ- আমাদের চিনিয়ে দেয়া হয় না, আমরা কাগজ পড়ে যাদের বড় বড় ছাপানো ছবি দেখি তাদেরই চিনি। আমরা পাঠ্যসূচির তালিকাভুক্ত লেখকদের গল্প কবিতা উপন্যাস অপন্যাসই গিলি। আমাদের শিক্ষকগণ সিলেবাসের লক্ষণরেখা অতিক্রম করে বাইরে যান না, কোনো প্রশ্ন করলে রেগে ওঠেন। রাত পোহালে এম এ পরীক্ষা দিচ্ছি । আমাদের অনেকের বাড়িতে বাংলা অভিধান পর্যন্ত নেই, মলয় রায় চৌধুরী নামটা আমাদের কানে পৌঁছানোর আগেই আমরা হয়তো বিদ্যালয়মহাবিদ্যালয়ে হাজিরা খাতা বগলদাবা করে সাহিত্য পড়াতে যাবো। এটা শপিংমলের যুগ, যেটা সাজানো থাকে সেটাই আমাদের চোখে পড়ে…ক্ষমা করবেন…আমরা আপনাকে চিনতে পারি নি, আরো এক শতাব্দী পেরোলে চিনতে পারবো কিনা সন্দেহ আছে….

মলয় : এটা পড়েছিলুম । আমারই একটা পোস্টে ইনি এই মন্তব্য করেছিলেন । আমি লিখেছিলুম, “৫০০০ ফেসবুক বন্ধু । ১০০ জনের মতন কেবল আমার একটা-দুটো বই পড়েছেন । ৪৯০০ জনকে “আমার কোন বই পড়েছেন” জানতে চাইলে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না ।”

গোবিন্দ:  শান্তনু বেজ নামে একজন লিখেছেন, “মলয়দা, জানেন আজ অধিকাংশ মিথোস্ক্রিয়া অভ্যাস করে। কেউ আর স্বভোজী নয়। অনেকেই আপনার হাতটা চাইছে তাদের চুলকানি পিঠে আসুক। অনেকেই আপনার উপস্থিতি চাইছে তাদের ইনবক্সে। কি দারুন ভাবে চাওয়া হচ্ছে, একজন অসুস্থ আশির মানুষের কাছ থেকে উৎসাহের “ৎ” টুকু। আমরা যারা, লিখি সবাই আর নির্মোহ নেই। আমরা আজ সবাই সঙ্ঘদোষ চাইছি। সঙ্গদোষ নয়। তাই, তুমি আমার না পড়লে, আমি পগাড় পার। জানি তুমি আমারও কিছু লেখা পড়োনি। আর লিখেছি যা তাতে একটা বাজারের চালান কোনমতে ভরপুর হতে পারে। আর আমিও তোমার গল্প সংগ্রহ, নেক্রপুরুষ এবং মধ্যবর্তীর ধারাবাহিক লেখা ছাড়া বিশেষ কিছুই পড়িনি। কিন্তু, একটা রাস্তা রাস্তা মনে হয়েছে। …. আমি বিশ্বাস করি যে কবি উৎসাহ শব্দে অনুঘটক খুঁজে কবিতা বা তার কাজকর্ম করে, তার বাঁদরের মই সংক্রান্ত অঙ্কটি খুব প্রিয় …একটা কবির শুধু মাত্র একলা হয়ে যাওয়া দরকার, এটাই আমি শিখেছি একজন অগ্রজ কবির কাছ থেকে। আর এটাই আমার শ্রেষ্ঠ ঐ “ৎ ” বলে মনে করি।আমি আপনাকে বিশেষ পড়িনি। কিন্তু, পড়বো। আর, আমি মাচা এবং খাঁচা এই দুটি শব্দকে ঘেন্না করি …ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন মলয়দা।”

মলয় : হোসেন মোতাহার নামে একজন বেশ ইনটারেস্টিং কথা লিখেছেন, “মীজানুর রহমান চৌধুরীর ত্রৈমাসিক পত্রিকা দিয়া আপনার লেখার লগে পরিচয় আমার। হাংরির কিংবদন্তী পুরুষ আপনে। প্রচণ্ড আলোড়িত হৈসিলাম।প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠানের পোঁদে লাত্থি দেওনের সাহস আপনের থিক্যা পাইসিলাম। তথাকথিত বামেরে চিনসি আপনেরে দিয়া। উৎপলদত্ত আপনেগরে হাংড়ি বইল্যা টিটকারি মার্সিল। সুনীল্যা আপনেরে পদ্মাপাড়ের রক্তের গরম দেখাইসিল। দমেন নাই।এখুনে এই ফিড়িং ফিড়িং ফকিন্নি ফেসবন্দুর কাছ থিকা কী ঘোড়ারডিম আশা করেন ! যন্ত্র চালাইবো না বই পড়বো?” গোবিন্দ, তুমি জানো কি না জানি না, মীজানুর রহমান আমার “নামগন্ধ” উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন । কলকাতায় আমার বাসায় এসে বলেছিলেন যে কোনো পত্রিকাই বইটা আলোচনা করতে চায় না । “হাংরি কিংবদন্তি” বই করে বের করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সুনীলরা শামসুর রাহমানের মাধ্যমে চাপ দিয়ে প্রকাশ করতে দেননি ।

গোবিন্দ : আপনার বিরোধিতার জন্যই  পঞ্চাশের কবিরা বিরোধ করেছিলেন, নাকি ?

মলয় : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উৎপলকুমার বসু যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তা ঠিক আমার বিরুদ্ধে নয় । পড়ে দেখতে পারো।

গোবিন্দ : বাই দ্য ওয়ে, সন্দীপন তাঁর সাক্ষ্যে কবিতাটি সম্পর্কে বলেছিলেন – “পড়ে মনে হয়, একজন যুবকের স্বীকৃতি। তার আইডেনটিটি আবিষ্কারের চেষ্টা। সে জানতে চাইছে সে কে। এটা একটা নতুন ধরণের সাহিত্য প্রচেষ্টা, একটা এক্সপিরিমেন্ট। এরকম সাহিত্য-প্রচেষ্টা বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষের জন্য দরকার। এরকম ৯৯৯টা লেখা হওয়ার পর হয়তো একজন জিনিয়াস জন্মাতে পারে। সাহিত্যের জন্য এক্সপিরিমেন্ট খুবই দরকার।

প্রসিকিউটর :আপনি কি লেখাটাকে ইম্‌মরাল বলেন?

সন্দীপন : আমি মনে করি সাহিত্যে সে সব প্রযোজ্য নয়।

প্রসিকিউটর  : এটা পড়ে আপনার মনে কোনো ডিপ্রেভিং এফেক্ট হয়েছিল কি?

সন্দীপন : না, সেসব হয়নি।

বিচারক অমল মিত্র – ডু ইউ কনসিডার দি অ্যাকিউসড পোয়েট এ পায়োনিয়ার ইন দিস ফিল্ড?

সন্দীপন : আমি যেটা বলতে চেয়েছি তা হল এই কবিতাটি নতুন। এটা সার্থক বা ভালো কবিতা কিনা জানি না। সাহিত্যে নতুন-নতুন এক্সপিরিমেন্ট দরকার। সেই হিসেবে কবিতাটি ঠিক দরকার ছিল।

উৎপলকুমার বসুর প্রসঙ্গে আসি। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, ‘এটা পড়ে আপনার কী ইমপ্রেশান হয়েছিল’, 

উৎপল বলেন – এটা আমার সম্পূর্ণ নতুন ধরণের কবিতা মনে হয়েছিল। এক্সপিরিমেন্টাল। তাছাড়া এটা অ্যাংগুইশড ও অ্যাংরি লেখা। হাংরি লেখা।

প্রসিকিউটর : অ্যাংরি? অ্যাংগুইশড?

উৎপল : উত্তেজনা ধরে রাখার কবিতা। যেন একটা নাগরিক টেনশন। টেনশনের মাঝে লেখা। … কবির এক বিশেষ মানসিক অবস্থা চিত্রিত করার জন্য সেই অ্যাংগুইশড অবস্থার কবিতা। কবিতাটা একটা সেন্স ওব এগজিসটেনশিয়াল ডিসগাস্ট ক্যারি করে।

প্রসিকিউটর : এটা কি আপনার ডিবচিং মনে নয়?

উৎপল : না। সেরকম কিছু নয়। ডিসগাস্ট ক্যারিইং।

ম্যাজিস্ট্রেট :’ডিসগাস্টটা আসছে কোত্থেকে? তা কি সামাজিক। না কবির নিজের’ ? 

উৎপল : তা জানিনা। কবি তো সমাজেরই মানুষ। তবে যেমন-যেমন কবিতাটা এগিয়েছে, কবির ব্যক্তিগত ডিসগাস্ট এসে পড়েছে। কবিতাটা সফল।

মলয় : এখান তরুণতম প্রজন্ম আমার বইপত্র পড়ছে । কলকাতার কবি সুনন্দা চক্রবর্তী অবশ্য বলেছেন, “এ কবিতাটা আমি আজ ইস্তক যতবার পড়েছি, ততবার ভিন্ন উপলব্ধি হয়েছে।” ইনটারনেটে তরুণ সান্যালের একটা চিঠি আছে, আমাকে লেখা, তাতে উনি এই কবিতার একটা আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেটা এরকম, “আপনার ডিফেন্সে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত : ১ ) আধুনিক জীবনে ব্যক্তিত্বের খণ্ডীকরণ মাতৃগর্ভে প্রত্যাবর্তনের তৃষ্ণা জাগরুক করতে পারে, সাক্ষ্য হিসেবে ভুরি-ভুরি সমাজতাত্বিকের রচনা কোট করা যায় । যেমন সাহিত্য ও সময়ের দ্বন্দ্বে ব্যক্তিমানুষের মনঃরূপায়ণ ফ্র্যাগমেন্টেশন অফ পার্সোনালিটি ইত্যাদি, এবং সামাজিক এলিয়েনেশন। ক) অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিপুল বিস্তার ; খ ) সামাজিক পরিবর্তনের অতি দ্রুতগতি এবং ; গ ) ক্ষমতার মুখোমুখি অসহায়তা — ব্যক্তিকে সত্যই চূর্ন করছে । এসট্রেঞ্জ করছে, স্ট্রেনজার করছে । আপনার রচনাকে আমি সবরকম ওই এসট্রেনজমেন্টের রূপায়ণ বলে দেখতে ভালোবাসি । শুভা হল যেন পিতামহকথনের সত্যযুগ, গোলডেন এজ — আধুনিক সাইকোঅ্যানালিস্টের কাছে নিশ্চিন্তিবোধের সিমবায়োটিক রমণী । এদিকে অ্যাপ্রোচ করা ভালো — এতে আমাদের দেশে আইন-আদালতে একটা উদাহরণও স্হাপন করা যায় । ২ ) অশ্লীলতার সংজ্ঞা এবং অশ্লীলতা সম্পর্কিত বাংলা রচনায় কীভাবে এবং কোথায় দেখা যাচ্ছে তার উদাহরণসহ ডিফেন্সে এসট্যাবলিশমেন্টের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানানো যায় । ৩ ) আপনাদের রচনা সাহিত্যকর্মীদের মধ্যেই একমাত্র বিতরণ হয় বলে স্বীকৃত ।”

গোবিন্দ : শুনেছি অধ্যাপকরা এই কবিতা নিয়ে এমফিল ও পিএইচডি প্রস্তাব সহজে অনুমোদন করেন না । তার কারণ আপনাদের বইপত্র সহজে পাওয়া যায় না এবং আলোচনাও বিরল । গবেষণা করতে হলে গাইড চাই তো ?

মলয় : তরুণরাই এখন গাইড । যেমন সুকান্ত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুভশ্রী দাস, আমার লেখায় জাদুবাস্তবতা নিয়ে গবেষণা করছেন । শিউলি বসাক করছেন । রূপসা দাশ করেছেন । বিষ্ণুচন্দ্র দে আর উমাশঙ্কর বর্মা অলরেডি পিএইচডি করেছেন ।

গোবিন্দ  : পশ্চিমবাংলার কবি তৈমুর খান বলেছেন, “ বাংলা কবিতার হাতেখড়ি থেকেই বাংলা সাহিত্যে একটা গর্জন শুনেছিলাম, সেই গর্জনের নাম মলয় রায়চৌধুরী (জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৯৩৯)। ১৯৯১ সালে একবার বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় এসে বাঁশদ্রোণীতে কলিম খানসহ এই চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয়ের (সমীর ও মলয় রায়চৌধুরীর) সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেদিন অনেকগুলো বইপত্রও আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ভারী ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে সেই গর্জনগুচ্ছের কাছে নিজেকে বসিয়েছিলামও। অনেকদিন কেটে গেল। অনেক জলও গড়াল। অনেক নির্ঘুম রাতে অনুভব করি —“চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেআমি আর পার্ছি না, অজস্র কাচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে”(প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার)কবিতার “আমি” আমার আমিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। যে পর্যাপ্ত আদিমতা নিয়ে, অস্থিরতা নিয়ে, শূন্যতা ও যৌনতা নিয়ে আমি জেগে উঠতে চেয়েছি, এই কবিতা যেন তারই মূলে তরঙ্গাঘাত করে ঠেলে দিয়েছে আমাকে। পোস্ট মডার্ন কখনোই বুঝতে চাইনি। তার ব্যাকরণও আমার দরকার হয়নি। শুধু এক মুক্তির পক্ষতাড়না শিল্প ও জীবনাচারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কী উল্লাস, কী আত্মক্ষরণ, কী অভিব্যক্তির মোক্ষম বিস্ময় যা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। এক আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আমার ঘুম ও জাগরণ, আমার প্রেম ও যৌনাকাঙ্ক্ষা, আমার পূর্ব ও উত্তরজন্মের মহানির্বাণ ব্যাপ্ত হয়ে ওঠে।“শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও”না, শুভার কাছে শুধু শান্তি চেয়েই জীবনের সমূহ প্রয়াসকে পরিচালনা করা যায় না। তরুণ গড়ুরের ক্ষুধাকে নিবৃত্তি দেওয়া যায় না। দেহবাদের চরম সীমানা পেরিয়ে গেলেও শব্দহীন কিছু কঁকানি আর মৃত্যুর সদর্থক চৈতন্যও খেলা করে। অসাম্ভাব্যতার ভেতর নিরর্থক জৈবক্রিয়ার সঞ্চারী বিন্যাস আত্মনিবিষ্ট সান্নিধ্যকেই ইংগিত করে। তাই শেষ পর্যন্ত “ন্যাংটো মলয়কে” দেখতে পাই। “মলয়” আমাদেরই অভিন্ন সত্তার ব্যাপ্তি।ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি, অনুবাদক, সাংবাদিক এবং হাংরিয়ালিজম্ ও পোস্ট মডার্নিজম্ এর রূপকার মলয় রায়চৌধুরীকে এক বহুমুখী উত্থান ও জীবনপর্যটক বলেই মনে হয়েছে আমার। পরিবর্তনশীল জগতের প্রবহমান অস্তিত্ব নিয়ে তিনি ঝংকৃত ও পরিব্যাপ্ত। শুধু কুশলী শিল্পী হিসেবে নয়, শিল্প ভাঙার শিল্পী হিসেবেও। তিনি কখনোই নিয়ন্ত্রিত ও সীমায়িত হতে চাননি। সামাজিক হয়েও সমাজমননের অভ্যন্তরে বিরাজ করেন। শরীরবৃত্তীয় পর্যায়গুলি সক্ষমতার সঙ্গে লালন করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর লেখায় ফিরে আসে মগ্নচৈতন্যের অবধারিত ক্রিয়াকলাপ। প্রজ্ঞানাচারী বৈভাষিক মিথলজি । প্রথম কাব্যগ্রন্থ “শয়তানের মুখ” জলবিভাজিকার ক্রমিক বিন্যস্ত থেকে উঠে আসে সত্তার বহুমুখীন পর্যায়। ঐতিহ্যকে ভেঙে ঐতিহ্য গড়া, আবার তাকে অস্বীকার, ক্রমবর্ধমান এই প্রবাহ থেকেই তাঁর লক্ষ্যহীন লক্ষ্য। অনুবাদের ক্ষেত্রে বেশ উল্লেখযোগ্য কবিরা হলেন — উইলিয়াম ব্লেক, জাঁ ককতো, সালভাদোর দালি, পল গঁগা, ব্লাইজি সঁদরা, ত্রিস্তান জারা, অ্যালেন গিন্সবার্গ, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, পাবলো নেরুদা এবং ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা। প্রতিটিতেই স্বকীয়তার ছাপ স্পষ্ট ।তবু নিজের কাজের জন্য তিনি প্রশংসা, পুরস্কার কিছুই গ্রহণ করেননি। সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারও সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানেন সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা। এই মাহাত্ম্য তাঁকে আরও সুউচ্চতা দান করেছে।মলয় রায়চৌধুরী আমাদের যে আবহাওয়ায়, যে মৃত্যুতে, যে বেঁচে ওঠার মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে আছেন, তার প্রতিটি বোধেই আমরা আজ তাঁকে উপলব্ধি করতে পারি।”নন্দিতা দেবসিংহ নামে এক তরুণী জানিয়েছেন যে এই কবিতা পড়ে ওনার বাবা ওনার নাম রেখেচিলেন নন্দিতা, বক্তব্যের সত্যিমিথ্যা জানি না, তবে এরকম প্রতিক্রিয়াও বর্তমান সময়ের তরুণীদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ।

মলয় : সত্তর দশকের কবি দেবযানী বসু এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “’প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কাব্যের জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে পোরা হয়েছিল। তিনি অশ্লীলতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।যুগের সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাব্যের অশ্লীলতা এখন আর অশ্লীল নেই। প্রকট যৌনতায় কবিতার রহস্যময়তা মার খায়। রহস্যময়তা বজায় রাখার দাবি মিটিয়ে অশ্লীলতা আনা খুব সহজ কাজ নয়।”

গোবিন্দ : সত্তরের পর থেকে আপনি একটা উচ্চতা পেয়েছেন । কেন জানেন ? বাংলাদেশ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠা । বাংলাদেশে টাইপরাইটার বর্জন করে কমপিউটার চালু করেছিল, বাংলা ফন্টও বাংলাদেশের আবিষ্কার । এখন তো অভ্র না হলে লেখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় । পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট কমপিউটার ঢুকতে দেয়নি । এই ব্যাপারে ভারতে বাঙালিরা পিছিয়ে পড়েছে।

মলয় : হ্যাঁ । মোইন রিয়াদ নামে উইকিপেডিয়ার জনৈক বাংলাদেশি সম্পাদক উইকিতে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নামে একটা আলাদা পেজ খুলে দিয়েছেন ।

গোবিন্দ : আপনারা বেনারস আর কাঠমাণ্ডুতে হিপি-হিপিনীসঙ্গ করেছিলেন শুনেছি । গাঁজা, চরস, হ্যাশিশ, আফিম, মেসকালিন, এলএসডি ইত্যাদি টেনে নেশা করার সুযোগ হয়েছিল ।

মলয় : আমার ইরটিক উপন্যাস ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ পড়লে তোমার আইডিয়া হবে। হিপি-হিপিনীরা আসতো হিচহাইক করে যাকে ওরা বলতো হিপি ট্রেইল । আমেরিকা থেকে অ্যামস্টারডমে গিয়ে, ইউরোপের দেশগুলো হয়ে তুর্কি, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারতের বেনারস । তারপর বেনারস থেকে কাঠমাণ্ডু । আফগানিস্তান থেকে আনতো আফিম- চরস আর পাকিস্তান থেকে গাঁজাফুলের গুঁড়ো যাকে ওখানে বলতো গর্দা । এলএসডি আনতো ক্যাপসুলে আর ব্লটিঙপেপারে ভিজিয়ে । আশির দশকে আমেরিকার চাপে সব দেশে মাদক নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যদিও এখন খোদ আমেরিকাতেই নানা রকমের গাঁজার দোকান হয়েছে। সেদিন প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় ফোন করে বলছিল যে যৌবনে এলোমেলো জীবন কাটিয়েছিলুম বলে এখন আমায় নানা রোগে ভুগতে হচ্ছে ।

গোবিন্দ : কলকাতায় কবিদের কাছে খালাসিটোলার এতো নামডাক । আপনি যেতেন ? 

মলয় : ওখানেও প্রথমবার গেছি সেন্টুদার সঙ্গে । পরে লেখক বন্ধুদের সঙ্গে । অবনী ধর একটা টেবিলে উঠে জীবনানন্দের জন্মদিনে নেচেছিল, সেটা ‘অমৃত’ পত্রিকায় আর ‘দি স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল । ক্লিন্টন বি সিলি ওনার জীবনানন্দ বিষয়ক ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইতে ঘটনাটার উল্লেখ করেছেন । তখনকার দিনে খালাসিটোলার বাইরে গাঁজা-চরস-আফিমের একটা সরকারি দোকান ছিল ; সেখান থেকে একটা পুরিয়া কিনে এগোতেই কমলকুমার মজুমদারের সামনাসামনি হই ; টাকার টানাটানি আর মামলার খরচ জানতে পেরে উনি আমাকে একটা একশো টাকার নোট দিয়েছিলেন। সুভাষ ঘোষ অবশ্য খালাসিটোলার বদলে পছন্দ করতো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে ‘অম্বর’ বার । 

গোবিন্দ : আপনি জীবনী লিখেছেন বা জীবন ও শিল্প বিশ্লেষণ করেছেন এবং অনুবাদ করেছেন  বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, পল ভেরলেন, সালভাদোর দালি, পল গঁগা, জাঁ জেনে, মায়াকভস্কি, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, দস্তয়েভস্কি, জাঁ-লুক গোদার প্রমুখের । মনে হয় আপনি যেন এঁদের প্রতি আকৃষ্ট,  আপনার জীবন ও চরিত্র ও লেখালিখির সঙ্গে এনাদের মিল আছে বলে ? তা কি স্বীকার করেন ?

মলয় : এটা ঠিক যে এনারা আমাকে আকর্ষণ করেছেন । বোদলেয়ারের আর জীবনানন্দের মতন আমিও একজন পথচর, যদিও করোনা ভাইরাসের কারণে আর বয়সের দরুণ আজকাল আর বেরোই না, কিন্তু আমি জেমস জয়েস, মার্সেল প্রুস্ত, হেনরি মিলার, হুলিও কোর্তাজার, ফুয়েন্তেস, শিবনারায়ণ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আনা আখমাতোভা, ওসিপ ম্যানডেলস্টাম, পিকাসো, মার্কেজ, সিলভিয়া প্লাথ,মালার্মে, পাবলো নেরুদা, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখকে নিয়েও লিখেছি ; এমনকী আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান গল্পকার  হায়মেওস্ট স্টর্মকে নিয়েও লিখেছি। শৈলেশ্বর ঘোষ সম্পর্কে আমার প্রবন্ধে কিন্তু গালমন্দ করিনি, যেমনটা উনি আমাকে প্রাণ ভরে দিয়ে গেছেন । 

গোবিন্দ : শৈলেশ্বর ঘোষ যে হাংরি রচনা সংকলিত করেছেন তা থেকে আপনি, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, আলো মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই পমুখদের বাদ দিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের হাংরি আন্দোলনকারীরাও বাদ গেছেন। আপনিও নাকি ওনাদের বাদ দিয়েছেন ?

মলয় : না, আমি কাউকে আমার সম্পাদিত সংকলন থেকে বাদ দিইনি । বস্তুত হাংরি বুলেটিন আর জেব্রা পত্রিকা ছাড়া আমি কোনও হাংরি সংকলন সম্পাদনা করিনি । আসলে শৈলেশ্বর-সুভাষ আমার মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুন অপরাধবোধে ভুগতেন, এটা কমন ক্রিমিনাল সাইকোলজি।

গোবিন্দ : বাঙালি মহিলা কবিদের প্রতি আপনার পক্ষপাত দেখা যায় । আপনি যশোধরা রায়চৌধুরী, সোনালী চক্রবর্তী, বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়, সোনালী মিত্র, জয়িতা ভট্টাচার্য, মিতুল দত্ত, শ্রীদর্শিনী মুখোপাধ্যায়, আসমা অধরা, মুনীরা চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখ করেন, কয়েকজনের বইয়ের ভূমিকাও লিখেছেন । তরুণ পুরুষ কবিদের নিয়ে আপনি আশাবাদী নিশ্চয়ই। কিন্তু পিঠ চাপড়ানোর একটা রেওয়াজ চলছে। এতে সাহিত্যের লাভক্ষতি কি তেমন হচ্ছে? 

মলয় : পিঠ চাপড়ানি তো ভালোই । আমার মামলার সময়ে পিঠচাপড়ানি পেলে কাজে দিতো । তার বদলে আমি পেয়েছিলুম কেবল টিটকিরি, আক্রমণ, বিদ্বেষ । সংবাদপত্রগুলো যা ইচ্ছে তা-ই লিখতো। বুদ্ধদেব বসু আমার নাম শুনেই আমাকে ওনার দরোজা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । আবু সয়ীদ আইয়ুব আমার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা চিঠি লিখেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গকে । এমনকী বন্ধুরাও আমাকে অপছন্দ করতো । শৈলেশ্বর ঘোষ মারা যাবার পর ওর শিষ্যরা আমার বিরুদ্ধে লিখে চলেছে । ঢাকায় একটা বই বেরিয়েছে কবি প্রকাশনী থেকে, তাতে মোস্তাফিজ কারিগর আর  সৌম্য সরকার নামে দুজন আমাকে আক্রমণ করেছেন, আমার বইপত্র না পড়েই । তরুণরা তো নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, নতুন ভাবনা নতুন আঙ্গিক আনার প্রয়াস করছে,  যদিও বয়সের কারণে আমি এখন আর অতো পড়ার অবসর পাই না । আমার পছন্দ হলে আমি প্রশংসা করি ; তা অন্যের পছন্দ নাও হতে পারে। মুনীরা চৌধুরীর কবিতা পড়েছ ? অসাধারণ প্রতিমাভাঙনের কাজ আছে ওনার কবিতায় — সুইসাইড করেছিলেন জলে ডুবে ।

গোবিন্দ :প্রায় সকল প্রকাশক, লেখক যখন পাঠক-শূন্যতা টের পান তখন কেউ কেউ একেকটি মেলায় কোনও কোনও বইয়ের দ্বিতীয় তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার বিজ্ঞাপন দেন। এটা তাহলে পাঠকশূন্যতা নয় ? নাকি অন্য কোন যাদুবলে একজন লেখক পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন? কিংবা একজন প্রকাশক পাঠকের চাহিদা সত্যি সত্যি অগ্রীম ধরে নিতে পারেন? 

মলয় : অনেকের বই বিজ্ঞাপনের জোরে বিক্রি হয়, অনেকের বই পাঠকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে । অনেকের বই আবার সাংস্কৃতিক রাজনীতির কারণে বিক্রি হয় না । প্রকাশককে হুমকি দেয়ায় অনেকের বই আটকে যায়।  পাঠকের অভাব আছে বলে আমার মনে হয় না । যাঁরা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশ করেন তাঁদের অসুবিধা হলো কলেজ স্ট্রিটে বিক্রির ব্যবস্হা না থাকা । যাঁরা কলকাতার বাইরে থাকেন তাঁদের তো একেবারে সুযোগ-সুবিধা নেই । তবু তাঁদের প্রকাশ করা বইয়েরও পাঠক আছে । দাদা ‘হাওয়া৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করার সময়ে যে বইগুলো বের করেছিল সেগুলোর ভালোই চাহিদা ছিল । এখন ‘হাওয়া৪৯’ সম্পাদনা করে মুর্শিদ । ও আবিষ্কার প্রকাশনী খুলেছে, ওর বের করা বইগুলো ভালোই বিক্রি হয়, ও বিভিন্ন মেলাতেও অংশ নেয় । 

গোবিন্দ :  পারিবারিক কোনও স্মৃতি?

মলয় : আমাদের বসতবাড়ি ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় । আমরা সাবর্ণ রায়চৌধুরী বলে বাড়ির নাম ছিল সাবর্ণ ভিলা, তিনশো বছরের পুরোনো বাড়ি । অবশ্য আদি নিবাস বলতে হলে লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা বলতে হয়, যিনি যশোরে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য ছিলেন, মোগলদের কাছ থেকে রায়চৌধুরী উপাধি আর কলকাতার জায়গিরদারি পেয়ে চলে আসেন । সাবর্ণ ভিলা হয়ে গিয়েছিল খণ্ডহর । আমার খুড়তুতো বোন পুটিকে ওর বাবা প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে অনুমোদন না করার দরুন পুটি সবচেয়ে বড়ো ঘরের কড়িকাঠ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করে নিয়েছিল । আর তার পরদিনই ঘরটা  ওপরের স্ট্রাকচারসহ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। বস্তুত ব্যাপারটা ছিল যেন সাবর্ণ ভিলার আত্মহত্যা । পুটির আত্মহত্যা আমি ভুলতে পারিনি । এক্ষুনি তোমাকে পিসেমশায়ের কথা বলছিলুম, উনিও মাঝরাতে আহিরিটোলার বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন ; ওনার পকেটের চিরকুটে লেখা ছিল ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভূবনে’ । বিশাল বাড়িটা ভাঙাচোরা অবস্হায় থাকার দরুণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে  দাদার বন্ধুদের পরামর্শে কয়েকজন শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধাকে ঠাঁই দিতে সুবিধা হয়েছিল । 

গোবিন্দ : আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন? তখনকার বিশেষ স্মৃতি? 

মলয় : আমি পড়তুম পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে । আইএ পড়ার সময়ে যোগ দিয়েছিলুম ন্যাশানাল ক্যাডেট কোর-এ, বন্দুক-পিস্তল চালানো আর নানা জায়গা দেখার লোভে । থ্রিনটথ্রি আর বাইশ বোরের রাইফেল চালিয়েছি । তখনকার পিস্তলগুলো বেশ ভারি হতো । থ্রিনটথ্রিতে প্রতিবার বুলেট ভরতে হতো, এখন কালাশনিকভ থেকে বুলেট বেরোয় চেপে রাখা পেচ্ছাপের মতন । ওই সময়েই আমার বন্ধু তরুণ শুরের মামার ট্রাকে করে নানা জায়গায় গেছি, যেখানে ট্রাকগুলো মাল নিয়ে যেতো । আমরা বসতুম ড্রাইভারের পাশে আর শুতুম ড্রাইভারের পেছনের বেঞ্চে । ওরা চালাতো রাতের বেলায় আর ঘুমোতো দিনের বেলায় । রুটে কোথায় কোথায় গ্রামের বউরা টাকা কামাবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে তা ওরা জানতো, আর নেমে, তেরপল বিছিয়ে শট মেরে আসতো । বউগুলো বেশ্যা নয়, বাড়ির বউ ; কম বয়সী মেয়েরাও থাকতো । দেদার কান্ট্রি লিকার আর তন্দুরি মুর্গি খেতো, আমরাও খেতুম ওদের সঙ্গে । পুলিশ আর অকট্রয় কর্মীদের ঘুষ নেয়া দেখতুম । তরুণের মামা আলাদা করে ঘুষের টাকা দিয়ে দিতেন ড্রাইভারদের । 

গোবিন্দ :পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন? 

মলয় : পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কবি-লেখকদের আশ্রয় দেয়া আর লুকিয়ে রাখাকে যদি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যোগাযোগ মনে করো, তাহলে ছিল ।

গোবিন্দ : আপনার গল্প উপন্যাসে দেশভাগ,মুক্তিযুদ্ধ কিরকম এসেছে? 

মলয় : দেশভাগ এসেছে আমার কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে । ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে পাবে দেশভাগে চলে আসার পর একজন বামপন্হীর দ্রোহ আর শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তন । ‘ঔরস’ উপন্যাসে পাবে ১৯৭১-এর বীরাঙ্গনা আর সন্তানকে কেমনভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বিয়ে করেছিলেন এক স্কুল শিক্ষক । ‘নখদন্ত’ কাহিনির পোস্টমডার্ন স্ট্রাকচারে পাবে । বহু কবিতায় পাবে।

গোবিন্দ :আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু? কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে? 

মলয় : নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া আমি লিখতে পারি না, যদিও চেষ্টা করি । সেজন্য দেশভাগ যেটুকু এসেছে তা দেখে। আমি তো পূর্ববঙ্গের মানুষ নই । পঞ্চাশের দশকে শেয়ালদায় উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্কর অবস্হা নিজের চোখে দেখার দরুনই আমি আর দাদা আন্দোলনের কথা ভেবেছিলুম । দেশভাগে যে নিম্নবর্ণের উদ্বাস্তুরা এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে মিশেছি হিমালয়ের তরাইতে, মানা ক্যাম্পে, ছত্তিসগঢ় আর মধ্যপ্রদেশে, মোতিহারিতে, মহারাষ্ট্রে । এনারা এসেছেন আমার লেখায় । এখন মরিচঝাঁপি নিয়ে একটা ডিটেকটিভ উপন্যাস লেখার তোড়জোড় করছি ।

গোবিন্দ :পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন? 

মলয় : পরিবার বলতে তো বাবা-মা-দাদা আর আমি । কেউই সরাসরি যুক্ত ছিলুম না।

গোবিন্দ :বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা এত আন্তরিক কেন ছিলো? 

উত্তর : সিমপল । বাঙালি বলে । 

গোবিন্দ :দেশভাগের ফলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপর কিরকম প্রভাব পড়ে? 

মলয় : আমার মনে হয় সেইভাবে পড়েনি যেমনটা বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েত শাসন ফেলেছে ইউরোপের লেখায় বা লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ফেলেছে স্প্যানিশ সাহিত্যে ।

গোবিন্দ  :বাঙালি জাতির জীবনে কাঁটাতার নিশ্চয়ই খণ্ডিত জাতিসত্তার জন্ম দিয়েছে? নাকি এর প্রভাব শুধু শিল্পসাহিত্যেই বাস্তবে কিছুই নয়?

মলয় : বলা কঠিন । বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্রমশ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, মূলত সউদি আরব, পাকিস্তান, তুর্কি ইত্যাদি দেশের প্রভাবে । এখন আফগানিস্তান একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে । এপার বাংলায় আর ত্রিপুরায় বিজেপি জিতলেও বাঙালিরা সেইভাবে হিন্দুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি । লেখকরা অবশ্য একটা পৃথক সেকুলার মিলনক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছেন ।

গোবিন্দ :হাংরি উত্থানের দিনগুলোর অর্জন বলুন? 

মলয় : আমি আর কী বলব । লেখক-পাঠক হিসাবে এই বিশ্লেষণ তো তোমাদের করা দরকার।

গোবিন্দ : তবু প্রথমটা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই ।

মলয় : এই বিষয়ে আমার লেখা থেকে কিছুটা পড়ো । ১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম । একটা হল ইতিহাসের দর্শন  যা পরে বিংশ শতাব্দী  পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।অন্যটি মার্কসবাদের উত্তরাধিকার  যা পরে গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং যার প্রকাশক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে। হাংরি আন্দোলনের হাংরি শব্দটা আমি পেয়েছিলুম ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার-এর ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম  বাক্যটি থেকে। ওই সময়ে, ১৯৬১ সালে, আমার মনে হয়েছিল যে স্বদেশী আন্দোলোনের সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ।উপরোক্ত রচনা দুটির খসড়া লেখার সময়ে আমার নজরে পড়েছিল অসওয়াল্ড স্পেংলার-এর লেখা দি ডিক্লাইন অব দিওয়েস্ট  বইটি, যার মূল বক্তব্য থেকে আমি গড়ে তুলেছিলুম আন্দোলনের দার্শনিক প্রেক্ষিত। ১৯৬০ সালে আমি একুশ বছরের ছিলুম। স্পেংলার বলেছিলেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈব প্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় থেকে আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন । আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে ও প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । এখানে বলা ভালো যে আমি কলকাতার আদিনিবাসী পরিবার সাবর্ণ চৌধুরীদের  বংশজ, এবং সেজন্যে বহু ব্যাপার আমার নজরে সেভাবে খোলসা হয় যা অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয় ।ওই চিন্তা-ভাবনার দরুণ আমার মনে হয়েছিল যে কিঞ্চিদধিক হলেও, এমনকি যদি ডিরোজিওর পর্যায়েরও না হয়, তবু হস্তক্ষেপ দরকার, আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন । আমি আমার বন্ধু দেবী রায়কে, দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে, দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে, আমার আইডিয়া ব্যাখ্যা করি, এবং প্রস্তাব দিই যে আমরা হাংরি নামের একটা আন্দোলন আরম্ভ করব । ১৯৫৯ থেকে টানা দুবছরের বেশি সে-সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার চাইবাসার বাড়িতে থাকতেন । দাদার শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমিক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্হ হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য-এর প্রেমের কবিতাগুলো শীলার প্রেমে লিখিত । দাদার চাইবাসার বাড়ি , যা বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্যতম শহর তখন ছিল বনাঞ্চল। দাদার চালাঘরটি ছিল নিমডি নামে সাঁওতাল-হো অধ্যুষিত গ্রামের পাহাড় টিলার ওপর, যা সে-সময়ে ছিল তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাসটির পটভূমি ও চরিত্র সবই চাইবাসা-কেন্দ্রিক; তাঁর সন্তু হল দাদার শ্যালক সন্তু এবং কাকাবাবু হল সন্তুর কাকাবাবু। সে যাই হোক, ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয় , এবং ১৯৬২ সালে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত, আমারা ওই চার জনই ছিলুম আন্দোলনের নিউক্লিয়াস।ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের বনেদেরব ওপর, অর্থাৎ আন্দোলনগুলো ছিল টাইম স্পেসিফিক বা সময়-কেন্দ্রিক । কল্লোল গোষ্ঠি এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাঁদের ডিসকোর্সে যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলোও ছিল কলোনোয়াল ইসথেটিক রিয়ালিটি বা ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেননা সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্থনা নির্ভর এবং তাদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত । সময়ানুক্রমী ভাবকল্পের গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে , এবং স্হানিকতা ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে। ১৯৬১ সালের প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করল সময়তাড়িত চিন্তাতন্ত্র  থেকে পৃথক পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্র  গড়ে তুলতে । সময়ানুক্রমী ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে মননসন্ত্রাস তৈরি করে, তার দরুণ প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে নিরুপণ করা হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণবের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই জন্যই, ইউরোপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যাবে যে, ব্যক্তি-প্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো।কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখব যে পুঁজি-বলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে দুতিনজন মেধাসত্বাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, আমরা যদি ঔপনিবেশিক নন্দনতত্বের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবি, তাহলে দেখব যে পদাবলী সাহিত্য নামক স্পেস বা পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব বা শাক্ত কাজ; মঙ্গলকাব্য নামক ম্যাক্রো-পরিসরে  পাবো মনসা বা চণ্ডী বা শিব বা কালিকা বা শিতলা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষণীয় যে প্রাকঔপনিবেশিক কালখণ্ডে এই সমস্ত মাইক্রো-পরিসরগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ , তার রচয়িতারা নন । তার কারণ সৃজনশিলতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি উপনিবেশে গিয়ে এই ফসলটির চাষ করেছে। ইতিহাসের দর্শন নিয়ে কাজ করার সময়ে আমার মনে হয়েছিল যে স্পেস বা স্হানিকতার অবদান হল পৃথিবী জুড়ে হাজার রকমের ভাষার মানুষ, হাজার রকমের উচ্চারণ ও বাকশৈলী, যখন কিনা ভাষা তৈরির ব্যাপারে মানুষ জৈবিকভাবে প্রোগ্রামড । একদিকে এই বিস্ময়কর বহুত্ব; অন্যদিকে সময়কে একটিমাত্র রেখা-বরাবর এগিয়ে যাবার ভাবকল্পনাটি, যিনি ভাবছেন সেই ব্যক্তির নির্বাচিত ইচ্ছানুযায়ী , বহু ঘটনাকে, যা অন্যত্র ঘটে গেছে বা ঘটছে, তাকে বেমালুম বাদ দেবার অনুমিত নকশা গড়ে ফ্যা।এ । বাদ দেবার এই ব্যাপারটা, আমি সে-সময়ে যতটুকু বুঝেছিলুম, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্হায়ি বন্দোবস্তের ফলে বাঙালির ডিসকোর্সটি উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় , যার ফলে নিম্নবর্গের যে প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্স বাঙালির সংস্কৃতিতে ছেয়ে ছিল, তা ঔপনিবেশিক আমলে লোপাট হয়ে যাওয়ায় । আমার মনে হয়েছিল যে ম্যাকলে সাহেবের চাপানো শিক্ষাপদ্ধতির কারণে বাঙালির নিজস্ব স্পেস বা পরিসরকে অবজ্ঞা করে ওই সময়ের অধিকাংশ কবিলেখক মানসিকভাবে নিজেদের শামিল করে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় সময়-রেখাটিতে । একারণেই, তখনকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রতিসন্দর্ভের সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বুলেটিন থেকেই, এবং তার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রতিটি বুলেটিন প্রকাশিত হবার সাথে-সাথে, যা আমি বহু পরে জানতে পারি , কাউনসিল ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সচিব এ বি শাহ , পি ই এন ইনডিয়া-র অধ্যক্ষ নিসিম এজেকিয়েল, এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুপুল জয়াকার-এর কাছ থেকে। অমনধারা সংঘাত বঙ্গজীবনে ইতোপূর্বে ঘটেছিল । ইংরেজরা সময়কেন্দ্রিক মননবৃত্তি  আনার পর প্রাগাধুনিক পরিসরমূলক বা স্হানিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি ভাবুকের জীবনে ও তার পাঠবস্তুতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর ছটফটানি , রচনার আদল-আদরায় পরিবর্তনসহ, দেখা দিয়েছিল, যেমন ইয়ং বেঙ্গল  সদস্যদের ক্ষেত্রে ( হেনরি লুইভিভিয়ান ডিরোজিও, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ) এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আরও অনেকের ক্ষেত্রে । একইভাবে, হাংরি আন্দোলন যখন সময়কেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে ছিঁড়ে আলাদা হয়, উত্তরঔপনিবেশিক আমলে আবার স্হানিকতার চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিল, তখন আন্দোলনকারীদের জীবনে, কার্যকলাপে ও পাঠবস্তুর আদল-আদরায় অনুরূপ ঝাঁকুনি, ছটফটানি ও সমসাময়িক নন্দনকাঠামো থেকে ষ্কৃতির প্রয়াস দেখা গিয়েছিল । তা না হলে আর হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবিআঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করবেন কেন ?

গোবিন্দ : আপনি পড়েছেন কী না জানি না । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আত্মজীবনী ( ২০০২ ) “অর্ধেক জীবন” গ্রন্হে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে বলেছেন, “দেশে ফেরার পর বেশ কিছু বন্ধুর উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেও বন্ধুত্বের ব্যাপারেই জীবনের প্রথম চরম আঘাতটাও পাই এই সময় । এর দু-এক দিনের মধ্যেই হাংরি জেনারেশনের সমীর রায়চৌধুরী ও মলয় রায়চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ।  সমীর কলেজ জীবন থেকেই আমার বন্ধু, চাইবাসা-ডালটনগঞ্জে তার বাড়িতে কত দিন ও রাত কাটিয়েছি, বন্ধুকৃত্যে সে অতি উদার, আমার প্রথম কাব্যগ্রন্হের প্রকাশকও সমীর । মলয়কেও চিনি তার ছোটবয়স থেকে । হাংরি জেনারেশন আন্দোলন শুরু হয় আমার অনুপস্হিতিতে ও অজ্ঞাতসারে । সেই সময়কার ইংল্যাণ্ডের অ্যাংরি ইয়াং মেন আর আমেরিকার বিট জেনারেশন, এই দুই আন্দোলনের ধারা মিলিয়ে সম্ভবত হাংরি আন্দোলনের চিন্তা দানা বেঁধেছিল, হয়তো অ্যালেন গিন্সবার্গের প্রেরণাও ছিল কিছুটা এবং মুখ্য ভূমিকা ছিল মলয়ের । যেসব বন্ধুদের সঙ্গে আমার প্রতিদিন ওঠাবসা, তারা একটা নতুন কিছু করতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ আমাকে বাদ দিয়ে ? এর কী কারণ থাকতে পারে, তা আমি কিছুই বুঝতে পারিনি । বন্ধুদের কাছে আমি অসহ্য হয়ে উঠেছি, কিংবা আমার হাতে নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কা ? একটা গভীর বেদনাবোধ আমি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম । আমার ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই কাকতালীয়ের মতন পুলিশ গ্রেপ্তার করে সমীর ও মলয়কে । তাতে কয়েকজন মনে করল আমিই ওদের ধরিয়ে দিয়েছি । যেন দমদমে পদার্পণ করেই আমি পুলিশ কমিশনারকে টেলিফোনে আদেশ করেছি, ওই কটাকে ধরে গারদে পুরুন তো ! পুলিশি তৎপরতার সূত্রপাতেই হাংরি জেনারেশনের প্রথম সারির নেতারা সবাই পুলিশের কাছে মুচলেকা দিয়ে জানিয়ে আসে, ভবিষ্যতে ওরা ওই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না । সমীরও ছাড়া পেয়ে যায়, মামলা হয় শুধু মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে, অশ্লীলতার অভিযোগে । সেই সময় মলয় খানিকটা একা হয়ে পড়ে । মামলা ওঠার আগে মলয় আমার বাড়িতে এসে অনুরোধ জানায় আমাকে তার পক্ষ নিয়ে সাক্ষ্য দিতে হবে । আমি তৎক্ষণাত রাজি হয়ে জানিয়েছিলাম পৃথিবীর যে কোনো দেশেই সাহিত্যের ব্যাপারে পুলিশের হস্তক্ষেপের আমি বিরোধিতা করব ।”

মলয় : না, ওনার বইটা পড়িনি । তবে ওনার বক্তব্যটা জানি । সুনীল কেমন করে ভেবেছিলেন যে আমার মতন একজন অখ্যাত পাটনাইয়া যুবক, যে আবার ওনার বন্ধুর ছোটো ভাই, তাঁকে বাদ দেবার কথা ভাববে ? আমি তো ছিলুম ফেকলু পাটনাইয়া । ওনার “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইটা পড়ে দেখতে পারো । আমি ওনাকে নেতৃত্ব নিতে বলেছিলুম, কিন্তু উনি সাড়া দেননি । উনি এতোটাই চটে ছিলেন আমার ওপর যে দাদাকে লিখেছিলেন, “সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয় । পড়ে আমার গা রি-রি করে। এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পযতে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি — আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না — এমন কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না । মলয়ের তিন পাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই ।” এই চিঠিটা ইনটারনেটে বহু সাইটে আছে। সুনীল আমার ওপরে চিৎকার করে বলেছিলেন, “আমি কি শক্তির থুতু চাটবো ?”

গোবিন্দ : ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা সম্পর্কে ?

মলয় : হ্যাঁ । উনি বেঁচে থাকতেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে তরুণতম প্রজন্মের কাছে কবিতাটা আইকনিক হয়ে গেছে, পৃথিবীর নানা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, ফিল্ম হয়েছে । হাংরি আন্দোলনের খ্যাত বা কুখ্যাতি উনি আমারিকায় থাকতে শুনেছিলেন, তাই ভাবছিলেন কলকাতায় সবই বুঝি দখল হয়ে গেল । যুগশঙ্খ পত্রিকায় বাসব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে উনি বলেছিলেন, “মলয় আমার অনুপস্হিতির সুযোগ নিয়েছিল” । আরে, আমি তো তখন অখ্যাত । ওনার উপস্হিতিতেও যা করতুম ওনার অনুপস্হিতিতেও তাই করেছি । 

গোবিন্দ : উনি আমেরিকা থেকে আপনাকে আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে হুমকি দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন শুনেছি ।

মলয় : হ্যাঁ । দুটো চিঠিই নেটে নানা সাইটে পাবে । ১০ই জুন ১৯৬৪ সালের চিঠিতে আয়ওয়া থেকে আমাকে যে চিঠিটা লিখেছিলেন, তার একটা প্যারা এরকম, “চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশনের ভণ্ডামি । আমার ওসব পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে । দূর থেকে। সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি । তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো । আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ । আমি তাই-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে । সুতরাং তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা । নইলে হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না ।”

গোবিন্দ: উনিই তো আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্হ “শয়তানের মুখ”-এর প্রকাশক । আপনার তো কবিতা লিখে সাহিত্যে হাতেখড়ি। আড্ডার দিনগুলোর কথা শুনবো? 

মলয়  : না, আমি প্রথমে প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেছিলুম । আমার ধারাবাহিক গদ্য ‘ইতিহাসের দর্শন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল । তারপর লিখি ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ । এই বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হতো না । দাদার বন্ধুদের সঙ্গে হতো, দীপক মজুমদার আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে । সিপিএম সরকারে আসার পর সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত রাজনীতিতে আগ্রহী হয় । সুনীল আমার প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশক হলেও হাংরি আন্দোলনের পর কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য আমার কাছে কখনও লেখা চাননি । এমনকি দাদা সমীর রায়চৌধুরীর কাছেও কবিতা চাননি অথচ দাদা ওনার প্রথম কবিতার বই “একা এবং কয়েকজন” বইটা নিজের প্রথম মাইনের টাকায় ছেপেছিল । কৃত্তিবাস ছাপাবার খরচও দাদা দিতো, “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইটা পড়লে জানতে পারবে । দাদা অবসর নিয়ে কলকাতায় এসে “হাওয়া৪৯” নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ আর সম্পাদনা আরম্ভ করেন ; তাতে সুনীল কোনও লেখা কখনও দেননি । সম্ভবত প্রতিটি লেখার জন্য উনি টাকা নিতেন বলে ।

গোবিন্দ  :কি করে মনে হলো কবিতার পাশাপাশি গল্প উপন্যাসও আপনার বিষয়?

মলয়  : না, না । উপন্যাস আর গল্প লেখা আরম্ভ করেছি বেশ দেরিতে । গল্প আশির দশকে আর উপন্যাস নব্বুই দশকে । আমার প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ । তবে আমি সব জনারের উপন্যাস লিখেছি, এমনকী ডিটেকটিভ আর ইরটিক উপন্যাসও । অভিজ্ঞতা প্রচুর জমেছিল সারা ভারত ঘোরাঘুরি করে, বন্ধুবান্ধব-বান্ধবীও ছিল, তাদের নিয়ে প্রথমে লেখার ইচ্ছে হয়েছিল। ঔপন্যাসিক বা গল্পকার হবো ভেবে সেসব লিখিনি । প্রতিভাস থেকে আমার উপন্যাস সংকলন বেরিয়েছে “তিনটি নষ্ট উপন্যাস” নামে, তাতে যে প্রথম উপন্যাস আছে “ঔরস” নামে, সেটা সম্পর্কে গুরুচণ্ডালী সাইটে রঞ্জন রায় লিখেছিলেন,”দু’দিন ধরে কোনরকমে নাওয়া-খাওয়া সেরে একটানা পড়ে শেষ করলাম –“ঔরস” উপন্যাস। অসাধারণ লেগেছে। হয়ত মলয়বাউকে নিয়ে কিছু পূর্ব ধারণার কারণে এমন গদ্যরচনা আসা করিনি। এটি উপন্যাসের ভঙ্গিমায় একটি সোশিও অ্যান্থ্রপলজিক্যাল বয়ানকথা।আমি বীজাপুর, নারায়নপুর, কোন্ডাগাঁও, বস্তার, দন্তেওয়াড়া সুকমা গেছি। অবুঝমাড়ে ঢুকি নি । বেশ কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর রিপোর্ট পড়েছি যাতে শহুরে মানুষের রোম্যান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল।এই প্রথম ‘অবুঝমাড়’ নিয়ে একটি অথেন্টিক লেখা পড়লাম, তার প্রকৃতি, বনসম্পদ ও মানুষ নিয়ে । আশি পেরোনো মলয়বাবু কবে এসব এমন নিবিড় করে দেখলেন? আমি মাথা নোয়ালাম। যারা পড়েন নি পড়ে ফেলুন; ঠকবেন না — গ্যারান্টি!”

গোবিন্দ : আরেকটু বিশদ করুন । 

মলয় : আমি একটা প্রবন্ধে আমার লেখালিখি নিয়ে লিখেছিলুম । তোমাদের কাছে সহজে পৌঁছোয়না বলে কথাগুলো আবার বলি, প্রবন্ধটা থেকেই বলি,”দেখি খুল্লামখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি তুলে আনতে পারি! উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না। জীবনকেচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ খেয়ে যেতে পারে, তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই। জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত…..বাঙালি সাহিত্যিকদের চাঁদমারি ভাগ্য যে তাঁদের ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না। বাংলা পাল্প ফিকশন হলো ঘোলা জলের আয়নায় মুখদর্শন । সাহিত্যজগত থেকে ছিঁড়ে নিজেকে আলাদা না করলে লেখালিখি করা যায় না । আমি সাহিত্যিক লাউডগাগিরিতে ভুগি না, বুঝলেন তো! আমার লেখালিখি নিছক সাহিত্য নয়। গণপাঠককে আনন্দ দেবার জন্য নয় তা। পাঠককে চৌচির করে তার ভেতরে সমাজরাষ্ট্রের গুগোবর ভরে দেবার জন্য। আর আমি শিল্প ব্যাপারটার বিরুদ্ধে , কেননা আমাকে সারিয়ে প্রাচীন গ্রিক হেলেনিক সমাজের যোগ্য করে তোলা যাবে না। আমি চাই না যে আমার শবযাত্রায় কবি লেখকরা ভিড় করুক। একজনকেও চাই না…আমি লেখালিখি বেছে নিইনি, লেখালিখি আমাকে বেছে নিয়েছে । প্রথম আদিম মানুষ যেমন পাথরের ছোরা আবিষ্কার করেছিল তেমনই আমি নিজের লেখালিখির অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছি।”

গোবিন্দ :এ যাবৎ পেয়েছেন অনেক সম্মান।লিখেছেন অনেক গল্প।প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোন জায়গায়? 

মলয় : সম্মান আবার কোথায় পেলুম ? কেবল তো জুতো-লাথি খেয়েছি । বাংলা সাহিত্যের অবস্হান খুবই উঁচু জায়গায় । দুর্ভাগ্যবশত অনুবাদকের অভাব । রবীন্দ্রনাথকেও নিজে অনুবাদ করে ইউরোপীয়দের পড়াতে হয়েছিল । এই বইটা পড়েছো ? ”সাতটা ক্ষুধার্ত পত্রিকার সংকলন” ( সম্পাদনা: শৈলেশ্বর ঘোষ , প্রকাশক: দে’জ পাবলিশিং। এতে আমার চোদ্দপুরুষকে গালমন্দ করা হয়েছে । বইটা প্রকাশের ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ । ‘শব্দ ও সত্য” নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, একটু আগে বলেছিলুম, পড়ে মনে হবে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, জেল-জরিমানা হয়নি ।

গোবিন্দ  :প্রেম নিয়ে আপনার ভাবনা? 

মলয় : যা জয়দেব, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্রের, রবীন্দ্রনাথের, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, বোদলেয়ারের ।

গোবিন্দ :আপনার প্রেমিকাদেরকে অনেক কবিতা আছে।বলুন।

মলয় : হ্যাঁ । কীই বা বলব । সবই তো রোমিও বলে দিয়েছিল জুলিয়েটকে আর বোদলেয়ার বলেছিলেন জাঁ দুভাল, মাদাম সাবাতিয়ে, মাদাম দোব্রুঁকে ।

গোবিন্দ :কী লিখি কেন লিখি?

মলয় : যা ইচ্ছা হয় লিখি । কী, কেন ইত্যাদি ভাবি না । তবে কী পড়ি আর কেন পড়ি তা বলা যায়।

গোবিন্দ : হাংরি আন্দোলন কি সে অর্থে সফল বলে সমীর রায়চৌধুরী কিংবা আপনিও মনে করেন? 

মলয় : এসব তোমরা ভাববে ।

গোবিন্দ ::এই সময় দাঁড়িয়ে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজন ছিলো?

মলয়  : ছিল নিশ্চয়ই, তা নয়তো হলো কেন ?

গোবিন্দ :কবিতায় শ্লীল অশ্লীল শব্দোচ্চারণের সুস্পষ্ট কোন নিধি নিষেধ হয়? 

মলয় : ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে শ্লীল-অশ্লীলের উল্লেখ বা বর্গীকরণ নেই । ওটা ইসলাম আর প্রোটেস্ট্যান্ট ভিকটোরিয় খ্রিস্টধর্মীদের আমদানি । মনে হয় তা থেকে আমরা শামুকের গতিতে মুক্ত করতে পারছি আমাদের কাজগুলোকে । আমাদের অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী কাব্যরস নয় প্রকার। যথা: (১) আদি, (২) বীর, (৩) করুণ, (৪) অদ্ভুত, (৫) হাস্য, (৬) ভয়ানক, (৭) বীভৎস, (৮) রৌদ্র এবং (৯) শান্ত। আদিরসই তো ইরটিসিটি নিয়ে । আদিরস (the erotic) হলো নায়ক-নায়িকার অনুরাগবিষয়ক ভাব । ম্যাকলের সিলেবাস আমাদের ওপরে চেপে গেল আর আমাদের আদিরস লোপাট হয়ে গেল । এমনকি, কবিয়ালদেরও আমরা ছোটোলোক দেগে সাহিত্য থেকে ছাঁটাই করে দিলুম । একবার আলোচনায় তথাগত চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, আমি তথাগতর বক্তব্য পুরোটা কোট করছি, “আদিরস মানে শৃঙ্গাররস। আদিরস মানে অশ্লীলের সমার্থক, এই ব্যপারটা খুব সম্ভব উনিশশতকেই হয়েছে ।কাব্যশাস্ত্রের ১০টি রস
১. শৃঙ্গার: শৃঙ্গ শব্দের অর্থ হলো কামেদেব। শৃঙ্গের আর (আগমন) হয় যাতে, তাই শৃঙ্গার। এর অপর নাম আদিরস। নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের ইচ্ছায় যে অনুরাগের সৃষ্টি হয়, তাকেই শৃঙ্গার একেই বলা হয়। প্রেমপ্রকাশ কাব্যে এই রসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।


২. বীর: দয়া, ধর্ম, দান এবং যুদ্ধের নিমিত্তে এই রসের উদ্ভব হয়। এর প্রত্যেকটির ভিতরে জয় লাভের ভাব থাকে। যার দ্বারা প্রতিকুল পরিবেশকে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার উদ্দীপনা প্রকাশ করা হয়। একই সাথে এতে থাকে বীরোচিত প্রতীজ্ঞা। ভয়ানক, শান্ত রস বিরোধী। যেমন−
বারিদপ্রতিম স্বনে স্বনি উত্তরিলা
সুগ্রীব; “মরিব, নহে মারিব রাবণে,
এ প্রতিজ্ঞা শূরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে!
-মেঘনাদ বধ, সপ্তম সর্গ। মধুসূদন


৩. করুণ: আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হলে, অকল্যাণ হলে, প্রিয়জন বিয়োগ ইত্যাদিতে এই রসের সৃষ্টি হয়। মূলত শোকের ভাব এতে প্রকাশ পায়। শৃঙ্গার এবং হাস্যরস এর বিরোধী। যেমন−
কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রুনীরে
শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া
সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,
কহিলা− সজল আঁখি সখীরে;−
“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!
-মেঘনাদ বধ, নবম সর্গ। মধুসূদন


৪. রৌদ্র: ক্রোধ রস থেকে এই রস উৎপন্ন হয়। ক্রোধের উগ্রতা এবং ভয়ঙ্কর রূপ হলো এই রস। এই কারণে ক্রোধকে এর স্থায়ীভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অলঙ্কার শাস্ত্রে একে রক্তবর্ণ ও রুদ্রদৈবত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন−
“কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি,
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
-মেঘনাদ বধ, তৃতীয় সর্গ। মধুসূদন


৫. অদ্ভুত: আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় থেকে উদ্ভুত বিস্ময়কর ভাবই হলো অদ্ভুত রস। সাধারণ অলৌকিক কোনো বিষয়কে এই রসকে উজ্জীবিত করা হয়। [বিস্তারিত: অদ্ভুতরস]

৬. ভয়ানক: ভয় থেকে এই রসের উদ্ভব। বিপদজনক বা ভীতিপ্রত কোনো বিষয় থেকে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, প্রকাশই ভয়ানক।

৭. বীভৎস: কোনো কুৎসিৎ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা থেকে বিভৎস রসের সৃষ্টি হয়।

৮. হাস্য: কৌতুকজনক বাক্য বা আচরণ থেকে এই রসের উদ্ভব হয়।

৯. শান্ত: চিত্তকে প্রশান্ত দেয় এমন ভাব থেকে শান্ত রসের উদ্ভব হয়।

১০.বাৎসল্য: সন্তানের প্রতি স্নেহের যে ভাবের উদ্ভব ঘটে, তাই বাৎসল্য রস।

গোবিন্দ : আপনার কি এখন মনে হয় যে হাংরি বুলেটিনগুলোতে আমাদের আদিরস বা শৃঙ্গাররস আলোচনা করলে আপনাদের আক্রমণ করার আগে সমালোচকরা দুবার ভাবতেন ।

মলয় : সমালোচকরা হয়তো পিছু হটতেন কিন্তু আক্রমণ করা ছাড়তেন না । আমার উকিল ব্যাঙ্কশাল কোর্টে আদিরসের প্রয়োগ নিয়ে তর্ক দিয়েছিলেন কিন্তু জজসাহেব তাকে স্বীকৃতি দেননি । প্রধান আক্রমণ ছিল যে আমরা ছোটোলোক বর্গ থেকে এসে সাহিত্যের আঙিনায় ঢুকে পড়ে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ পর্যন্ত সাহিত্যের মানদণ্ডকে ভেঙে ফেলছি, সাহিত্যিক মূল্যবোধ দখল করে নিতে চাইছি । তুমি জানো না বোধহয়, দেবী রায় ছিলেন কৈবর্ত্য পরিবারের, উনিই বুলেটিনগুলো ওনার হাওড়ার বস্তিবাড়ি থেকে প্রকাশ করতেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকতেন উল্টোডাঙার বস্তিতে । সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অবনী ধর ছিলেন উদ্বাস্তু পরিবারের । আর আমার কথা তো বলেইছি, পাটনার অন্ত্যজপাড়া ইমলিতলা থেকে ।

গোবিন্দ :  ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২১এর আনন্দবাজার পত্রিকায় অভীক সরকার লিখেছেন, ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’। কৃশকায় একটি কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৭২ সনে (১৯৬৬) মধ্যচৈত্রে। কবিতার সংখ্যা ৭১। কবির নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বইটি দৈবাৎ আমার হাতে আসে, বাবার বইপত্রের মধ্য থেকে। তখন আমার মেরেকেটে ১৫ বছর। সত্যি বলতে কি, আমার পুরো জীবনটাই লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল ওই কবিতাগুলো। সেই থেকে আজীবন ওই কাব্যগ্রন্থটি আমার কাছে অভিজ্ঞতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজ মাঝে মাঝে ভাবি, কেন ঘটেছিল এরকম? ওই কবিতাগুলির ছত্রে-ছত্রে প্রকৃতপক্ষে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ ডিসগাস্ট, ব্যবস্থার প্রতি রাগী এক যুবকের প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ মুষ্ট্যাঘাত, প্রচলিত সমাজ-সংসার-সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ আর ভণ্ডামিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করার গনগনে গর্জন। এক ছন্নছাড়া, প্রতিষ্ঠানবিরোধী, উদ্ধত তরুণের সঙ্গে কাব্যসংলাপে সেই যে জড়িয়ে পড়লাম, ওই কবিতা থেকে আর মন সরাতে পারলাম কই? পরবর্তী কালে, পরবর্তী জীবনে, দেশবিদেশের বহু মহৎ কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্তু এই বইয়ের স্বরদ্যুতি আমার কাছে অমলিন। কেননা তীব্র ক্রোধ, তীক্ষ্ণ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, অগ্নিভ অভিমান বহুক্ষেত্রেই কাব্যসংরূপে ততটা সার্থক হতে পারে না। প্রতিবাদী কবিতায় সারা বিশ্বজুড়েই প্রায়শই প্রতিবাদের অনুপাত এত বেশি হয়ে ওঠে যে, কবিতা বিষয়টাই বনবাসে চলে যায়। এ ক্ষেত্রে জাদুবলে সুনীল অকল্পনীয় এক আধুনিক কাব্যভাষাকে রপ্ত করেছেন। যেখানে নির্ধারিত ছন্দে অথবা গদ্যস্পন্দে ব্যক্তিজীবনের রাগ, দুঃখ, হতাশা, কল্পনা, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, বাস্তব-পরাবাস্তব, প্রেম, যৌনতা, রিরংসা, একাকিত্ব আর অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার স্নায়ুকম্পনগুলিকে অত্যাশ্চর্য রুক্ষনৈপুণ্যে প্রকাশ করা যায়। একটু ভেবে দেখলে মনে হয়, পরবর্তী কালপর্বের অতি তরুণ কবিদের কাব্য উচ্চারণে এই কেতাবের স্বরক্ষেপ প্রভাব ফেলেছে। ভাস্কর চক্রবর্তী, শামসের আনোয়ার কিংবা সুব্রত চক্রবর্তীর গোড়ার যুগের কবিতার দিকে তাকিয়ে দেখুন।” আপনার কি মনে হয় যে অভীক মজুমদার ইচ্ছাকৃতভাবে শৈলেশ্বর ঘোষ, ফালগুনী রায়, সুবো আচার্য, ত্রিদিব মিত্র, প্রদীপ চৌধুরী এবং আপনার নাম আলোচনা থেকে বাদ দিয়েছেন?

মলয় : উনি লিখে থাকলেও বিভাগীয় সম্পাদক নামগুলো ছাঁটাই করে দিয়ে থাকবেন । কিংবা অভীক মজুমদারমশায়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল অমন করে লিখতে । একে আনন্দবাজার, তায় সুনীলকে বলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী । কবিতাগুলো সুনীল লিখেছিলেন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হবার পর । বস্তুত হাংরি আন্দোলন ওনার কবিতার ধারাই পালটে দিয়েছিল ।

গোবিন্দ : আপনাদের আন্দোলনের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মগুলোর মহিলা কবিদের লেখায় দেখা গেছে। আলোচকরা তাও স্বীকার করতে চান না । তাকে পঞ্চাশের কবিদের প্রভাব বলে চালান । যেমন কবি যশোধরা রায়চৌধুরী তাঁর ব্লগে লিখেছেন, “বাঙালির রচিসংস্কৃতির অবদমিত যৌনবোধের প্রকাশ যখন কবিতার মানক, জীবনানন্দীয় কুয়াশায় যখন তরুণ কবিরা আচ্ছন্ন, তখনি কৃত্তিবাস আন্দোলন আনল ভাংচুরের পালা। মেধার সরণি ছেড়ে আত্মজৈবনিকের , স্বীকারোক্তির নতুন দিগন্ত খুললেন এই আন্দোলনের পুরোধা প্রধান পুরুষ কবিরা ।  সুনীল-শরৎ-শক্তি-তারাপদ… পাশাপাশি তুষার রায়, বেলাল চৌধুরী তন্ময় দত্তরা। সেই মুহূর্তের অ-প্রাতিষ্ঠানিকতার শেষ কথা এই কবিদের হাত থেকে বেরিয়ে আসা তাজা স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাগুলি। বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক প্রভাব। কবিতায় মেয়েদের পদচারণা তখন যথেষ্ট সীমিত।” অথচ পঞ্চাশের কবিদের প্রভাবিত করেছিল হাংরি আন্দোলন, তা উনি উল্লেখ করেননি । আপনাদের পরের কয়েকজন মহিলা কবিকেও হাংরি আন্দোলন বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। মিতুল দত্ত’র ‘দুর্বার জন্য কবিতা’ পযে দেখুন, “…….যেভাবে বুক দুটোকে বেঁধে রাখিস/মনে হয় ওরা তোর মেয়ে/একটুখানি ঢিলে দিলে বেয়াড়া অসভ্য হয়ে/ডেকে আনবে পাড়ার ছেলেদের/স্নানের সময় যেই খুলে দিস/হুটোপাটি করে ওরা স্নান করে/কেউ কাউকে একটু কষ্ট না দিয়ে/যে যার মতো একা ।”

মলয় : জানি । দেবারতি মিত্র লিখেছিলেন, ““অসম্ভব অনুরক্তা শিশুসুলভতা নিয়ে/ অচেনা আশ্চর্‌য এক লালচে কিসমিসরঙা/ ফুলের কোরক মুখে টপ করে পোরে, / মাতৃদুধের মত স্বাদু রস টানে/ ক্রমে তার মুখে আসে/ ঈষদচ্ছ অনতিশীতোষ্ণ গলা মোম/ টুপটাপ  মুখের গহবরে ঝরে পড়ে/ পেলিকান পাখিদের সদ্যোজাত ডিম ভেঙে জমাট কুসুম নয়/ একটু আঁষটে নোনতা স্বচ্ছ সাদা জেলি “ ( পৃথিবীর সৌন্দর্য একাকী তারা দুজন)। মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ““নারীর জরায়ুজমি লাঙল চাইছে/যদি অসমর্থ হই, ভাড়া করে, নিয়োজিত করে/অথবা যে কোনভাবে বীজ এনে দেব “। কিংবা ““মশারি গুঁজে দিয়ে যেই সে শোয় তার/স্বামীর কালো হাত হাতড়ে খুঁজে নিল/দেহের সাপব্যাং, লাগছে ছাড় দেখি/ক্রোধে সে কালো হাত মুচড়ে দিল বুক/বলল, শোন শ্বেতা, ঢলানি করবে না…”(স্বামীর কালো হাত)। রমা ঘোষ লিখেছেন, ““কুড়িয়ে পেলাম ঘুর্নিবীজ বলা যায় না/আমার কত সুখ হয়েছে বলা যায় না/ঘুমের মধ্যে তোমার বাকল জড়িয়ে ছিলাম/ঘুম ভাঙতে তোমার শিকড় নিচ্ছি টেনে/তলিয়ে যাচ্ছি তোমার মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি, নীতা!…/রাত্রি দুটোয় আমায় তুমি পড়বে ঝুঁকে/বটের নিবিড় গাঢ় আঠায় কপাল ওষ্ঠ/ক্ষুধাই শুধু বুঝতে পারে স্তনবৃন্তের সুধা!”( ঘুর্নিবীজ)। সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “কাটাকুটি খেলতে গিয়ে বরাবর ভুল ঘরে ভুল গোল্লাগুলি/বসিয়েছ । দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছ নিজের দুই ঠোঁট।/জ্যান্ত শুক্রবীজগুলি মুখে শুষে নাও আজ আর থুৎকারে/থুৎকারে ছুঁড়ে ফেলে দাও প্রাণহীন মরা –কুকুরের মতো।” (শুক্রস্হান )। চৈতালী চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “যার কোন উত্থানপতন নেই, আমি সেই/ছাতাপড়া অঙ্গটিকে গড় না করতেই পারি/যদ্যপি সে আমার স্বামীর।/শেষ জলবিন্দুটিকে, নিঃশেষ, না পাই, তো/যাঞচা করতে পারি অন্য মেঘ/যদি অহল্যাও হই, ইন্দ্রের কাছে যাব, বার বার/পাষাণ হব না ।”( একটি শারীরিক কবিতা)।

গোবিন্দ :হাংরি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবিতার বাঁক বিশ্লেষণ করেন প্লীজ? 

মলয় : আমার যে সাক্ষাৎকারের বই বেরিয়েছে প্রতিভাস থেকে, তাতে পাবে । তালিকাটা দীর্ঘ।

গোবিন্দ :হাংরি আন্দোলনে কারা যুক্ত হয়েছিলেন?এখনো কি তাদের উচ্চারণে হাংরি আন্দোলনের ছাপ আছে? 

মলয় : অনেকে । অনেকে । তিরিশ-চল্লিশজন । ১৯৬২-৬৩ সালে হাংরি আন্দোলনে যোগদান করেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন দত্ত, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণনিধান মুখোপাধ্যায় ছিলেন চিত্রকর । সত্তর দশকের শেষে যাঁরা পুনরায় আন্দোলনটিকে জিইয়ে তোলার চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অরুণেশ ঘোষ, অরণি বসু, অরুণ বণিক, অলোক গোস্বামী, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিত্য মালাকার, কিশোর সাহা, জামালউদ্দিন, জীবতোষ দাশ, দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মল হালদার, দেবজ্যোতি রায়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, প্রিতম মুখোপাধ্যায়, বিজন রায়, রবিউল, সমীরণ ঘোষ, রতন নন্দী, রাজা সরকার, সত্যেন চক্রবর্তী, সৈকত রক্ষিত, সুব্রত রায়, সুব্রত চক্রবর্তী, রসরাজ নাথ, সেলিম মোস্তফা, শঙ্খপল্লব আদিত্য, সুভাষ কুন্ডু , স্বপন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । এখনও লেখায় টিকে আছি আমি আর পরের প্রজন্মের  কয়েকজন । আর যে দুয়েকজন বেঁচে আছেন, তাঁরা লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছেন বা স্বাস্হের কারণে লিখতে পারেন না ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জয়িতা ভট্টাচার্য

মলয় : তুই তো এর আগে একটা ইনটারভিউ নিয়েছিলিস ?

জয়িতা : তাতে বেশ কিছু প্রশ্ন করা হয়নি ।

মলয় : আচ্ছা । কী প্রশ্ন ?

জয়িতা : মামলা জেতার পর তুমি নাকি লিখেছিলে হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । তারপর বেশ কয়েক বছর সাহিত্যের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ ছিল না । সত্য ঘটনা জানতে চাই ।

মলয়: না আমি অমন কিছুই লিখিনি । কোথায়ই বা লিখবো ? মামলার সময়ে কলকাতায় দুবেলা খাওয়া জুটতো না, মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না । কেস জেতার পর চাকরিটা ফিরে পাই । কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নোট নষ্ট করা আর পোড়ানোর চাকরি আর করতে চাইছিলুম না । একে তো পচা নোটের ঢিবির মাঝে বসে-বসে  শরীর খারাপ হবার যোগাড়, তার ওপর ভীষণ রিস্কি। বিপদের ব্যাপারটা লিখেছি আমার ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে । অন্য চাকরি খুঁজছিলুম আর অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে গ্রামীণ উন্নয়ন আধিকারিকের ট্যুর করার চাকরি পেলুম লখনউতে। পরে ওটা নাবার্ডে মিশে যায় । প্রচুর পড়াশুনা আরম্ভ করতে হলো গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে— চাষি, জেলে, কুমোর, কামার, হস্তশিল্পী, তাঁতি, হর্টিকালচার, পশুপালন, জলসেচ ইত্যাদি— আমি তার আগে কিছুই জানতুম না । লেখার জগত থেকে বেরিয়ে একেবারে আলাদা জগতে পৌঁছে গেলুম । আক্রান্ত হলুম যাকে বলে রাইটার্স ব্লকে । আর এতো ট্যুর করতে হতো যে ঘোরাঘুরির একটা আলাদা আনন্দে মজে থাকতুম । আবার লেখা আরম্ভ করি পূর্ব পাকিস্তানের মাহমুদ কামাল আর মীজানুর রহমানের অবিরাম অনুরোধে। কৌরবের কমল চক্রবর্তীও চাপ দিতে থাকে । 

জয়িতা : তাহলে, তুমি যখন কলকাতায় ছিলে না তখন তোমার বিরুদ্ধে কেন প্রচার চালাতো তোমার এক সময়ের হাংরি সহযাত্রীরা ?

মলয় : অলোক গোস্বামীর ‘মেমারি লোকাল’ বইটা পড়লে জানতে পারবি । শৈলেশ্বর ঘোষ আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে ওর চেলাদের বোঝাচ্ছিল যে হাংরি মামলাটা ওর ‘তিন বিধবা’ কবিতার জন্য হয়েছিল । অথচ মামলাটা হয়েছিল আমার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার কারণে ; জেল-জরিমানা আমারই হয়েছিল । শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষরা আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হবার দরুন অপরাধবোধে ভুগতো । উত্তম দাশ আমার লখনউয়ের বাসায় এসে মামলার কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকায় লেখার ফলে সব ফাঁস হয়ে যায় । ওরাও আমাকে গালমন্দ করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ওরা মারা গেছে কিন্তু ওদের কুচুটে চেলারা আমাকে গালমন্দ করে চলেছে । শৈলেশ্বরের চেলারা সুভাষকেও মারধর করেছিল । সৌভাগ্যবশত আমি চেলার দল গড়তে পারিনি। মরব আর হাপিশ হয়ে যাবো । ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ নামে একটি কবিতা সঙ্কলন বার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৮ সালে। কিন্তু চার দিক থেকে এত নিন্দে হল এই সঙ্কলনের যে, রবীন্দ্রনাথ বইটি বাজার থেকে তুলে নিতে বাধ্য হলেন। দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরি করলেন অনেক আশা করে, কিন্তু ছাপা গেল না তাও। খোদ রবীন্দ্রনাথকেই এরকম প্রচুর নিন্দে আর আক্রমণ সহ্য করতে হয়েছে ।

জয়িতা :নব্বই ও শূন্য দশকে লিখতে আসা  লিখিয়েরা অনেকেই বাস্তবিক তোমার বিশাল লেখার ব্যাপ্তি সম্পর্কে অজ্ঞ । যদিও বা নামটা শুনেছে, “হাংরি” কবি হিসেবে জানে, কিন্তু সেই হাংরি আন্দোলন বঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিলেও সেটা মাথায় দেয় না গায়ে মাখে কিছু জানে না।

মলয় : আমি একাকীত্ব ভালোবাসি । প্রথমত, কলকাতায় ফেরার পর, আমি কলকাতার আর মফসসলের সাহিত্যসভা, কবিতাপাঠ, কবিদের বাড়িতে আড্ডা, কফিহাউসে যাতায়াত ইত্যাদি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলুম বলে ওনারা আমার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত নন । দ্বিতীয়ত, আমার বইপত্র বইবাজারে পাওয়া যায় না। আসলে প্রকাশক পাই না । গাঙচিলের অধীর বিশ্বাস একটা প্রবন্ধ সংকলন বের করার পর বললেন, “আপনার বই তো বুদ্ধদেব গুহ’র মতন বিক্রি হবে না। কেন ছাপবো আপনার বই  ?” দে’জ আমার বই বের করতে চায়নি কেননা ওনাদের কমিটিতে যাঁরা ছিলেন বা আছেন, তাঁরা আমার নাম অ্যাপ্রুভ করেন না । আমার বই যাঁরা প্রকাশ করেছেন তাঁরা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক ; তাঁদের নেটওয়র্ক তেমন ভালো নয় । ইনটারনেটে আমার প্রচুর লেখা রয়েছে ; সেগুলো নিয়ে বই করলে গোটা পঞ্চাশেক বই হয়ে যাবে । প্রতিভাস বলেছে আমার বই একে একে প্রকাশ করবে কিন্তু কবে করবে জানি না । হাংরি আন্দোলন নিয়ে এখন বেশ কয়েকটা বই আছে– যারা আগ্রহী তারা ঠিকই যোগাড় করে পড়ে । হাংরি নিয়ে গবেষণাও তো হচ্ছে বিদেশের আর পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে । 

জয়িতা :  “ক্ষুধার্ত আন্দোলনের” একেবারে গোড়ার কথা যদি একটু বলো এবং কোন ঘটনা ও পরিস্থিতিতে এই ভাবনার জন্ম সেটাও একটু বলো। :প্রসঙ্গত এটা মনে হলো “ক্ষুধার্ত ” শব্দটির পরিবর্তে “হাংরি” ,যা কিনা সংকরায়িত একটি শব্দ এটি কেন ব্যবহার করতে হলো। সেটা কী আন্তর্জাতিকতা আনার জন্য?

মলয় : গোড়ার কথা তো বহুবার লিখেছি নেটে আর প্রিন্ট ম্যাগাজিনে । উইকিপেডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো  সম্পাদক যা লিখেছেন সেটা পড়াচ্ছি, তাহলে আর নিজের ঢোল পেটাবার প্রসঙ্গ উঠবে না । “বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন, যাকে অনেকে বলেন হাংরিয়ালিস্ট, ক্ষুধিত, ক্ষুৎকাতর, ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদর্শটিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষাবধি হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । হাংরি আন্দোলন, এই শব্দবন্ধটি বাংলাভাষায় ঠিক সেভাবে প্রবেশ করেছে যে ভাবে মুসলিম লিগ, কম্ম্যুনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল ইত্যাদি সংকরায়িত শব্দবন্ধগুলো । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ডিসকোর্সের সংকরায়ণকে স্বীকৃতি দেয়া তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল । ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায় ।কবিতা সম্পর্কিত ইশতাহারটি ছিল ইংরেজিতে, কেন না পাটনায় মলয় রায়চৌধুরী বাংলা প্রেস পাননি । আন্দোলনের প্রভাবটি ব্যাপক ও গভীর হলেও, ১৯৬৫ সালে প্রকৃত অর্থে হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যায় । নকশাল আন্দোলনের পর উত্তরবঙ্গ এবং ত্রিপুরার তরুণ কবিরা আন্দোলনটিকে আবার জীবনদান করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাত্ত্বিক ভিত্তিটি জানা না থাকায় তারা আন্দোলনটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি ।”

জয়িতা : আরেকটু বিশদ করো।

মলয় : আবার উইকির হাংরি প্রজন্মের পাতাটাই পড়াই, এটা সেকেণ্ড প্যারা, “মলয় রায়চৌধুরী হাংরি শব্দটি আহরণ করেছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম বাক্যটি থেকে , অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে তিনি হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চাইলেন । তাত্ত্বিক ভিত্তি সংগ্রহ করা হয়েছিল সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট গ্রন্হটির দর্শন থেকে । স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না; তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় । তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না । যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয় । তার সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে, তা বাইরে থেকে যা পায় ত-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন । সেকারণে মলয় রায়চৌধুরীকে হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে মনে করা হয় । হাংরি আন্দোলনকারীদের মনে হয়েছিল দেশভাগের ফলে ও পরে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মণীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । সেকারণে হাংরি আন্দোলনকে তঁরা বললেন কাউন্টার কালচারাল আন্দোলন, এবং নিজেদের সাহিত্যকৃতিকে কাউন্টার ডিসকোর্স।তারা বললেন, “ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল বা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলো ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাঁদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত ।” তারা বললেন, “এই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্থানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে । ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননর্স্তাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায় । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো । কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্বাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক ননগদনতন্ত্রের আগেকার প্রাক-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষ্যণীয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয় ।”

জয়িতা :ভাবগত কল্পনার জগত ও আত্মোপলব্ধি নয় সরাসরি জৈবিক তাড়না, জীবন যন্ত্রণার প্রতি স্তরের অভিব্যক্তি কে হুবুহু তোমরা তুলে ধরতে চেয়েছ, ধ্বনি ও শব্দ পরিশিলীত ও আরোপিত না করে, একেবারে নগ্ন এই উপস্থাপনার পেছনে হাংরি ফিলোসফির কথা শুনতে চাই । 

মলয় :  আমার ছোটোবেলা কেটেছে ইমলিতলা নামে পাটনা শহরের এক বস্তিতে, যে-পাড়ায় থাকতো বিহারি অন্ত্যজ আর অত্যন্ত গরিব মুসলমানরা, যারা একটা উৎসবে পরা পোশাক পরের উৎসবে পালটাতো । তাদের কাজ ছিল চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পকেটমারি, পিম্পগিরি, মেয়েদের বেশ্যাগিরি ইত্যাদি । পাড়াটায় নিষিদ্ধ বলে কিছু ছিল না যার দরুন আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি মূল্যবোধের বাইরে গড়ে উঠেছি আর তাই ওই জীবন আর বাকজগত আপনা থেকে এসেছে আমার লেখালিখিতে । ইমলিতলার বাড়িতে একটা কুয়ো ছিল আর পাড়ার বউরা তাকে ঘিরে যে গানগুলো গাইতো তাকে বাঙালিরা বলতো অশ্লীল আর নোংরা, ওই যাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন গা রি রি করে, সেরকম । পাড়ার প্রভাবে দাদা খারাপ হয়ে যেতে পারে আঁচ করে বাবা ওনাকে কলকাতায় সিটি কলেজে পড়তে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীরা যে যার জীবন থেকে লেখার মাল-মশলা এনেছে ; তুই শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, অবনী ধর, দেবী রায়, সুবিমল বসাক প্রমুখকে পড়লেই টের পাবি যে দর্শনটা প্রত্যেকের জীবন থেকে পাওয়া ।

জয়িতা : যে কোনো আন্দোলন তার রেশ রেখে যায় ভবিষ্যতের কাছে তাই কোনো আন্দোলনকে ব্যর্থ বলা যায় না বিশেষত হাংরি আন্দোলনকে । কিন্তু দুঃখের বিষয়ে প্রথম পর্বের হাংরি পত্রিকাগুলি কেন সঠিকভাবে সংরক্ষণের কথা কেউ ভাবলেন না। উল্লেখযোগ্য পত্রিকা যেমন তোমার “জেব্রা “, সুবিমল বসাকের “প্রতিদ্বন্দ্বী ” ,ত্রিদিব মিত্র র”উন্মার্গ”, কেন হারিয়ে গেল দেবী রায়ের “চিহ্ন”অথবা প্রদীপ চৌধুরী র “ফুঃ”, আলো মিত্রর ‘দি ওয়েস্ট পেপার’। কেন এই বিস্মরণ ?

মলয় : “জেব্রা” কেবল দুটো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ; সম্প্রতি মুর্শিদ ‘অখণ্ড জেব্রা’ প্রকাশ করেছে। প্রদীপ চৌধুরী মৃত্যুর আগে পর্যন্ত “ফুঃ” প্রকাশ করেছে, তবে মামলার পরে প্রদীপ ওটাকে ফরাসী আর ইংরেজিভাষী পত্রিকায় পালটে ফ্যালে—ফ্রান্সে ও বেশি পরিচিত ছিল । অন্য পত্রিকাগুলো সমীরণ মোদক সংগ্রহ করেছে কিন্তু প্রকাশক পাচ্ছে না । সম্পাদকরা কেউই ভাবেনি যে এককালে হাংরি আন্দোলন খ্যাতি পাবে আর তাদের পত্রিকার চাহিদা হবে । বুলেটিনগুলোও পাওয়া যায় না — মামলার সময়ে ভয়ে অনেকে ফেলে দিয়েছে সেগুলো । মুর্শিদাবাদের এবাদুল হক বেশ কয়েকটা বুলেটিন সংগ্রহ করে বই বের করেছিলেন ।

জয়িতা :কলকাতার প্রতি তোমার তীব্র অভিমান যথাযথ। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আক্রমণ ছাড়াও হাংরিয়ানদের মধ্যে অনৈক্য দেখা দেয়। এই বিষয়ে নানা গসিপ,নানা মত। এই মতবিরোধের ফলশ্রুতি আন্দোলনে ভাঙন সম্পর্কে একেবারে স্পষ্ট কথা শুনতে আগ্রহী।

মলয় : এই প্রশ্নের উত্তর অজিত রায়ের প্রবন্ধ থেকে দিই, “মলয়ের কেসটা এঁদের চেয়ে আলাদা। এবং আপাত জটিল। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিশেবে বিজ্ঞাপিত কলকাতার ধুলো মলয়ের পায়ের চেটোয় সেভাবে লাগেনি। কলকাতার একটা পুশিদা ক্লোমযন্ত্র আছে যা বামুন আর চাঁড়ালকে শুঁকে চিনতে পারে। কলকাতা মলয়কে নিজের দাঁত দেখিয়ে দিয়েছিল। কলকাতা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তুমি আমাদের কেউ নও। তুমি একটা কৃষ্টিদোগলা। তোমার কলমে নিম্নবিত্ত রক্ত। তোমার টেক্সট আলাদা। আলাদা থিসরাস। তফাৎ হটো তুমি। এবং, কলকাতা মলয়ের সঙ্গে সমস্ত শরোকার ছিন্ন করে। কোনও সম্পাদক তাঁর কাছে আর লেখা চান না, বন্ধুবান্ধবদের চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্রমশ সবাই স্লিক করে যায়। লেখা ছাপানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বীভৎস যন্ত্রণা, অপমান আর তিরস্কার একমাত্র কলকাতাই দিতে পারে। এই যন্ত্রণা, এই অপমানই লেখালেখি থেকে নির্বাসন ভোগের আরেক অব্যক্ত যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়েছিল মলয়কে। ২৭ জুলাই ১৯৬৭, মানে, হাইকোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস পাওয়ার পরদিন থেকে মলয় কবিতা লেখা ছেড়ে দেন। সবায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়, আর ক্রমশ নিজেকে অসীম একাকীত্বে ঘিরে ফেলেন। প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের দুর্গদ্বার থেকে অপরিগৃহীত হয়ে লেখার জগৎ থেকে একান্তে অপসৃত হয়ে স্বরচিত নির্জনতার এক সুচারু এরিনায় নিজেকে বন্দী রেখে, রাইটার্স ব্লকের অখল জ্বালা ভোগ করা —- হাংরিদের মধ্যে এটা একমাত্র মলয়ের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।” কলকাতার প্রতি অভিমান বলতে তুই যা বোঝাতে চাইছিস তা রয়েছে প্রতিটি সাবর্ণ চৌধুরীর রক্তে, কেননা পরিবারটা বাধ্য হয়েছিল কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ইজারা কোম্পানিকে লিখে দিতে।

জয়িতা : হাংরিদের পরস্পরের মতবিরোধ তাদের রচনার চেয়ে বেশি চর্চিত । এই বিষয়ে কী বলবে? ১৯৬৫ র পর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলেও পরিবর্তিত রূপে হাংরিয়ালিস্ট কিছু পত্রিকা বেরোতে শুরু করে যেমন,অরুনেশ ঘোষের ‘জিরাফ’, আলোক গোস্বামী র “কনসেনট্রেশন ক্যাম্প”, উত্তরবঙ্গের পত্রিকা ধৃতরাষ্ট্র,  রোবট। এই পত্রিকাগুলি র সঙ্গে তোমার যোগাযোগ কতটা এবং তোমার মতামত কি। পত্রিকাগুলি কতটা হাংরি ভাবাদর্শ অনুকরণে নির্মিত।

মলয় : মতবিরোধ ডাডাবাদী, সুররিয়ালিস্ট, বিটনিক এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতেও ছিল। কৃত্তিবাস থেকে আনন্দ বাগচী আর দীপক মজুমদারকে ক্লিক করে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল । এতোগুলো মানুষ জড়ো হলে মতবিরোধ হবেই । হাংরি আন্দোলনে যারা সরকারি সাক্ষী হয়েছিল তারা আমার বিরুদ্ধে লিখতো । সুভাষ ঘোষকে মারধর করা হলো । উত্তরবঙ্গে অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার, মনোজ রাউত, সমীরণ ঘোষ, জীবতোষ দাশ, দেবজ্যোতি রায় প্রমুখ আবার জাগিয়ে তুলছিলেন আন্দোলনটা কিন্তু শৈলেশ্বর লোক পাঠিয়ে তাকে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল । অরুণেশ ঘোষ যখন উত্তম দাশের মহাদিগন্ত পড়ে সবকিছু জানতে পারলো তখন নিজেকে আলাদা করে নিয়েছিল । আমি উত্তরবঙ্গে সেই সময় যাইনি, তাই ওনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি । ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ পত্রিকায় সম্ভবত লিখেছিলুম । অলোক গোস্বামীকে বাড়ির গেট থেকে শৈলেশ্বর ঘোষ তাড়িয়ে দেবার পর ও বন্ধ করে দিয়েছিল পত্রিকাটা। ওদের লেখাপত্র ভালোই এগোচ্ছিল । শৈলেশ্বর ঘোষ কেন যে অমন কুচুটে ছিল কে জানে, কেননা কবিতা যা লিখতো তা এক কথায় আউটস্ট্যাণ্ডিং । 

জয়িতা :জানতে চাই আলো মিত্র র হাংরি  ইংলিশ জার্নাল  ” দি ওয়েস্ট পেপার “সম্পর্কে।

মলয় : আলো ছিল ত্রিদিব মিত্রের প্রেমিকা । সময়ের প্রেক্ষিতে অনেক বোল্ড । আলো চাকরি করতো বলে ইংরেজি পত্রিকাটা বের করার সুবিধা হয়ে গিয়েছিল ।  ওদের দুজনকে বাদ দিয়ে সুভাষ-শৈলেশ্বর-বাসুদেব ‘ক্ষুধার্ত’ আরম্ভ করার পর ওরা বিরক্ত হয়ে লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিল । ‘দি ওয়েস্ট পেপার’ পত্রিকার কারণে আমরা বিদেশের কবি-লেখকদের সঙ্গে ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পেরেছিলুম । আলো আর ত্রিদিব এখন হাওড়ায় নিজেদের বাড়ি তৈরি করে সেখানেই থাকে । আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই । সুবিমল বসাক বলছিল ফোন করলেও যৎসামান্য কথা বলে রেখে দ্যায় । নন্দিনী ধর নামে একজন লিখেছেন যে হাংরি আন্দোলনে শুধু একজন মহিলা ছিলেন কেন ! উনি ওনার ঠাকুমা-দিদিমার বয়সী কবিদের জিগ্যেস করলেই পারতেন যে তাঁরা কেউ কেন হাংরি আন্দোলনে যোগ দেননি ।

জয়িতা :হাংরি আন্দোলন বিদেশি প্রভাবিত এমন শোনো যায়। বুদ্ধদেব বসুর বোদলেয়ার তখনই প্রকাশিত হয়েছিল । র‌্যাঁবো, ভেরলেন, বোদলেয়ারের জীবনযাপন কি আকৃষ্ট করেছিল তোমাদের ? প্রসঙ্গত অ্যালেন গিনসবার্গ এর সঙ্গে প্রথম পরিচয় কীভাবে এবং তাঁর কতটা অবদান এই আন্দোলনে।

মলয় : উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য বিদেশি প্রভাব ছাড়া আরম্ভ হতো না । গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক সবই তো বিদেশ থেকে এসেছে । বঙ্কিম আর মধুসূদন ইংরেজিতেই লেখা আরম্ভ করেছিলেন । বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, ভেরলেন প্রমুখকে আমি পড়েছি ইংরেজিতে । আগেই তো বললুম, আমার জীবন ইমলিতলা পাড়ার দ্বারা প্রভাবিত । হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে আর গিন্সবার্গ আমাদের পাটনার বাড়িতে এসেছিল ১৯৬৩ সালে । লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির পত্রিকায় আমাদের কবিতা আর মামলার প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার পর ফেরলিংঘেট্টি আমাকে ‘হাউল’ আর ‘ক্যাডিশ’ পাঠিয়েছিল । যে লেখকরা প্রভাবের কথা বলেন তাঁরা নিজেদের লেখার কাঠামো কোথা থেকে এলো তা ভাবেন না । এমনকী সনেট, ভিলানেল, লিমেরিক লেখকরাও অমন আরোপ করেন ।

জয়িতা :ব্যক্তিগতভাবে তোমার উপন্যাস আমার অনেক বেশি প্রিয়। ” Ahead of time”. প্রথম উপন্যাস কবে এবং কোন ভাবনা থেকে লেখা ?

মলয় : আমার প্রথম দিকের সব উপন্যাসই জীবনের ঘটনা থেকে নেয়া । পরে নানা জেনারের উপন্যাস, যেমন ইরটিক, ডিটেকটিভ ইত্যাদি লেখার সময়ে ঘটনা তৈরি করেছি । অবশ্য তাতেও নিজের জীবনের ঘটনা মিশিয়েছি। প্রথম উপন্যাস লিখেছিলুম নব্বুই দশকের প্রথম দিকে, ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’, নোট নষ্ট করা আর পোড়ানোর পৃষ্ঠপটে, কর্মী বন্ধু-বন্ধুনীদের নিয়ে । দাদা “হাওয়া৪৯” পত্রিকা আরম্ভ করে একটা উপন্যাস লিখতে বলেন, তখন লিখি ; ওটা অনেকবার রিপ্রিন্ট হয়েছে  ।

জয়িতা : প্রবন্ধকার হিসেবে তোমার কথা পাঠক কম জানে। প্রবন্ধকার মলয় রায়চৌধুরী ও ঔপন্যাসিক মলয় রায়চৌধুরীর জনপ্রিয়তা তেমন নেই কেন ?

মলয় : প্রকাশক পাই না তো লোকে জানবে কেমন করে ? নামকরা প্রকাশক না পেলে পাঠকদের কাছে পৌঁছোনো যায় না । প্রতিভাস যে তিনটে বই বের করেছে, সেগুলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গেছে বলে শুনেছি । প্রতিভাসও তো কলেজ স্ট্রিট থেকে বহু দূরে । কবিতা জায়গা পায় লিটল ম্যাগাজিনে । উপন্যাস পায় না । আর জনপ্রিয় হতে গেলে পাল্প ফিকশান লিখতে হবে, যা আমি পারি না ।

জয়িতা :তুমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী নও ;  প্রতিষ্ঠান তোমার বিরোধী কেন ? তোমার লেখক-সত্ত্বা কলকাতার সাহিত্য-সমাজ দীর্ঘদিন অবদমিত রাখার প্রচেষ্টা করেছে । কেন ? কিসের ভয়?

মলয় : নিছক সাহিত্যিক রাজনীতি, সাংস্কৃতিক রাজনীতি ; যেমন গানের রাজনীতি দেবব্রত বিশ্বাসকে চেপে দেবার চেষ্টা করেছিল, বড়ো মাপের কাপ্তান আর মাস্তানরা তা করেছিলেন । আনন্দবাজার পত্রিকা তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে বলেছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী । অধ্যাপক অভীক মজুমদার লিখেছেন, “‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৭২ সনে (১৯৬৬) মধ্যচৈত্রে। কবিতার সংখ্যা ৭১।  ওই কবিতাগুলির ছত্রে-ছত্রে প্রকৃতপক্ষে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ ডিসগাস্ট, ব্যবস্থার প্রতি রাগী এক যুবকের প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ মুষ্ট্যাঘাত, প্রচলিত সমাজ-সংসার-সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ আর ভণ্ডামিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করার গনগনে গর্জন। এক ছন্নছাড়া, প্রতিষ্ঠানবিরোধী, উদ্ধত তরুণের সঙ্গে কাব্যসংলাপে সেই যে জড়িয়ে পড়লাম, ওই কবিতা থেকে আর মন সরাতে পারলাম কই?” আনন্দবাজার যদি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে চালাতে চায়, তাহলে আমাকে ওরা ওদের বিরোধী বলেই মনে করবে । সুনীলের এই বইটার কবিতাগুলো হাংরি আন্দোলনের প্রভাবে লেখা — হাংরিদের টক্কর দেবার চেষ্টায় ।

জয়িতা : হাংরিদের প্রভাব সম্পর্কে বলো ।

মলয় : সুনীল নিজেই হাংরিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যৌনতার কবিতা লেখা আরম্ভ করেন । উনি লিখলেন, “শিশিরে ধুয়েছো বুক, কোমল জ্যোঃস্নার মতো যোনি/মধুকূপী ঘাসের মতন রোম, কিছুটা খয়েরি।” হাংরি আন্দোলনে পুলিশের মামলা দায়েরের পরেই কৃত্তিবাস একটা যৌন কবিতা সংখ্যা বের করেছিল ; সেটা যে হাংরিদের প্রভাবে, সেকথা প্রতিষ্ঠানের আলোচকরা চেপে যায়। পরবর্তীকালে মহিলা কবিরাও প্রভাবিত হয়েছেন । যেমন চৈতালী চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “যার কোন উত্থানপতন নেই, আমি সেই /ছাতাপড়া অঙ্গটিকে গড় না করতেই পারি/যদ্যপি সে আমার স্বামীর।” সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “কাটাকুটি খেলতে গিয়ে বরাবর ভুল ঘরে ভুল গোল্লাগুলি বসিয়েছ । দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছ নিজের দুই ঠোঁট।জ্যান্ত শুক্রবীজগুলি মুখে শুষে নাও আজ আর থুৎকারে থুৎকারে ছুঁড়ে ফেলে দাও।” সুতপা সেনগুপ্ত লিখেছেন “তোমার নরম ভারি শরীরের নীচে শুয়ে/ফিরে আসছে আমারও পুরনো/খেলা ও  খেলুড়িপনা, পুরুষ ছোঁয়ার মজা/শঙখ লাগা অমৃত ছোবল/তুমিও কী অপরূপ শিখে নিচ্ছ ভাঙাগড়া/ঠোঁটে কামড়ে বুকে পিষে ফেলে/বলেছ রোয়াব নিয়ে, আমিই শাসন করব/কিছুই বোঝ না, বাচ্চা ছেলে।” রাজশ্রী চক্রবর্তী লিখেছেন, “

ডিম পাঁউরুটির মত জীবনে, তুমি এলে / একটি হলুদ রঙের কলা / নিটোল আকার দেখে, বিশ্বাস করো, / ভারি খিদে পায়।” অনুরাধা মহাপাত্র লিখেছেন, “  সঙ্গমে ভিন্ন কোন আলো নেই- প্রকৃতি অথবা ঈশ্বরের/উপবাস ও পূজার কোন চিদাকাশ নেই/ আত্মত্যাগ, আত্মহত্যা উভয়ই সমান/

প্রেমিকের মাথা আকাশে তুললেও তবু মুখ,/  নেমে আসে অন্ধ পুকুরে।” শবরী ঘোষ লিখেছেন, “এক্ষুণি একজন পুরুষ চাই আমার/  রাত্রি যেভাবে সূর্যের সঙ্গে মেলে/ সেরকম সম্পূর্ণ মিলনের জন্য চাই/ তবু প্রতিদিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত/ ঠিক নিরানব্বই জন হিজড়ের সঙ্গেই শুধু/ ঘুরে ফিরে দেখা হয়ে যায় আমার !/ হায় হিজড়েরা সঙ্গম জানে না।/ এখনই একজন যথার্থ পুরুষ চাই আমার/

 আমি তো প্রস্তুত হয়েই রয়েছি !”

জয়িতা : আর গদ্যে ?

মলয় : আমি প্রবুদ্ধ ঘোষের লেখা থেকে তোকে শোনাচ্ছি, তাহলে টের পাবি : “আজ স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; প্রকাশ্যে চুম্বন করে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাধানিষেধ ও সমাজের প্রচলিত ‘ট্যাবু’গুলিকে। এই বিদ্রোহ কিন্তু ’৬০ এর দশক থেকেই শুরু করে দিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকেরা। সমস্তরকম গোঁড়ামি এবং ‘ঢাকঢাকগুড়গুড়’ বিষয়ের ভিতে টান মেরেছেন। সাহিত্য বহু আগেই ভবিষ্যতের কোনো এক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে যাচ্ছে– তার নিজের মত করে, নিজের প্রকাশে। না, নিশ্চিতভাবেই সাহিত্যের কাজ ভবিষ্যৎদর্শন নয়; কিন্তু হ্যাঁ, সাহিত্যের অন্যতম কাজ ভবিষ্যতের সামাজিক আন্দোলনের, সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রগুলোর হদিশ দিয়ে যাওয়া। ফাল্গুনী রায় যখন কবিতায় বলেন ‘শুধুই রাধিকা নয়, গণিকাও ঋতুমতী হয়’, তখন কি আজকের এই আন্দোলনের কথাই মনে হয় না? যেখানে, ঋতুমতী হওয়া কোনো ‘লজ্জা’র বিষয় নয়, ‘অশুদ্ধি’র বিষয় নয়, বরং তা স্বাভাবিক জৈবনিক প্রক্রিয়া। আর, প্রতিমুহূর্তের এই আত্মজৈবনিক বিষয়গুলিই উঠে আসে হাংরি জেনারেশনের লেখায়। বা, সগর্ব্ব মানুষ-প্রমাণ ‘আমি মানুষ একজন প্রেম-পেচ্ছাপ দুটোই করতে পারি’’। এগুলো তো দৈনন্দিন। এগুলো তো স্বাভাবিক। তা’লে? আসলে, ‘শুদ্ধতা’-র একটা অর্থহীন ধোঁয়াশাবোধ তো তৈরি করেই দেয় সমাজ, একটা বর্ডারলাইন। সাহিত্যের নায়ক রক্তমাংসের মতো হবে কিন্তু তার ক্ষুধা-রেচন ইত্যাদি থাকবেনা বা পুরাণচরিত্রদের শারীরবৃত্তীয় কার্য নেই! এই ‘মেকি’ ধারণাসমূহ লালন করে আসা আতুপুতু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন হাড়-মজ্জা-বোধ জীবন্ত হতে দেখে তখন ‘অশ্লীল সংস্কৃতি’ ছাপ্পা মারে। সমাজের জড়তা, মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির মুখোশগুলো খুলে দেয় টান মেরে। আর, তাই ‘নিষিদ্ধ’, অশ্লীল মনে হয় এদের লেখাগুলি। হাংরি-দের যেখানে মূল বক্তব্যই ছিল প্রতিটি লেখায় ও সাহিত্যযাপনে আত্মউন্মোচন, সেখানে এই বিষয়গুলি স্বাভাবিক বীক্ষাতেই উঠে এসেছে। এবং, ‘সাহিত্য বিক্রির জন্যে আরোপিত যৌনতা’ বনাম ‘শিল্প ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ত যৌনতা’ এই বিতর্কের ডিস্‌কোর্স তৈরি করেছে। অরুণেশ ঘোষ তাঁর ‘কিচ্ছু নেই’ সময়কে লিখছেন- ‘১ পাগল এই শহরের চূড়ায় উড়িয়ে দিয়েছে তার লেঙ্গট/ ১ সিফিলিস রুগী পতাকা হাতে মিছিলের আগে/ ১ রোবট নিজেকে মনে করে আগামীকালের শাসক/ ১ মূর্খ ঘুমিয়ে থাকে শহর-শুদ্ধ জেগে ওঠার সময়… শীতের ভোর রাত্রে- মধ্যবিত্তের স্বপ্নহীনতার ভেতর/ আমাকে দেখে হো হো করে হেসে ওঠে বেশ্যাপাড়ার মেয়েরা’। বুঝে নেওয়া দরকার হাংরি-প্রজন্মের সাহিত্য আন্দোলনের নিভন্ত আগুন এবং সেই আগুনে শাসক-রাষ্ট্রের ক্রমাগত শান্তির জল ঢেলে যাওয়া; অথচ সেই নিভু আগুনের থেকে ফিনিক্সের জেগে ওঠা। নিওফ্যাসিজম্‌ বিশ্বব্যাপী ঠাণ্ডাযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক ভাবে দখল চালানো তো বটেই, তার সাথেই থাকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আগ্রাসন। আর, পুঁজিবাদ নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার উৎপাদন-পদ্ধতিকে খাপ খাইয়ে নিতে চায়, তেমনি সাহিত্যকেও যেহেতু পুঁজিবাদ পণ্য হিসেবেই দেখে, তাই তার উৎপাদন-কৌশলেও নতুন ফর্মুলা নিয়ে আসতে চায়। আর, সেই ফর্ম্যুলার অন্যতম হল, একদা যা ছিল প্রান্তিক, যা ছিল শাসকের ‘ডিস্‌কোর্সের’ বাইরে, তাকেই কেন্দ্রের দিকে ঢুকিয়ে দেওয়া, শাসকের ‘ডিস্‌কোর্সে’ তাকেও ঢুকিয়ে নেওয়া। হাংরি প্রজন্মের আন্দোলনের সময় যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তাদের ‘প্রান্তিক’ করে রেখেছিল, পরে সময়-সুযোগ বুঝে তাকেই প্রতিষ্ঠানের কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকিয়ে নেয়। অ্যাণ্টি-কাল্‌চার ও কি বাজার-কাল্‌চার এ ঢুকে পড়ে? যখন তার প্রভাব এড়ানো যায়না আর, যখন ছাই হয়েও ফিনিক্স পাখির মতো জ্বলে ওঠে ফের তার ভাষা-সংস্কৃতি তখন বাজার নতুন ভাবে নামে? প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয় বিগত সব প্রত্যাঘাতগুলো? একদা ‘ওরা অশ্লীল’ বলে চেঁচানো সাহিত্যিকেরাও লিখে ফেলেন হাংরি-দের কথা। বাণিজ্যিক ছবি হয়, সেখানে হাংরি-লেখক রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রুফ-চেক্‌ করাতে মুখিয়ে থাকে। এ-ও তো এক সংস্কৃতি। প্রতিস্পর্ধাকে নমনীয় করে, দোষারোপ গুলোকে বড়ো করে প্রতিস্পর্ধী-সংস্কৃতর ‘সংস্কৃতি’-কে ভুলিয়ে দেওয়া। কারণগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়া, প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিতকে গুলিয়ে দেওয়া। ক্ষুধার্ত কবিরা দেখেছে প্রতিশ্রুতির গলিত শব, দেখেছে একের পর এক মিছিল ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার হয়ে যায়।  বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘বমন রহস্য’ গল্পে আশাহীন এবং আলোহীন ভোগবাদী সমাজের প্রতি ঘৃণা ঠিকরে বেরোয়। গল্পের শেষ লাইন- “বমি করে যাই রক্তাক্ত পথের উপরে। সমস্ত চর্বিত মাংসের টুকরো, সমস্ত জীবন ভোর খেয়ে যাওয়া মাংসের টুকরো আমি বমি উগরে বার করতে থাকি। বমির তোড়ে আমার নিঃশ্বাস যেন আটকে আসে।”। পাঠকের যথেচ্ছ স্বাধীনতা থাকে, জীবনের সাথে মিলিয়ে পরিণতি ভাবার; সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার দায় লেখকের নয়। হাংরি লেখকেরা তাঁদের লেখালেখিতে জোর দিচ্ছেন পাঠের ওপর। অর্থাৎ, লেখকের ভাষাগত চাতুর্য, শব্দলালিত্য আর বিচার্য নয় বরং বিচার্য পাঠবস্তুটি। ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে হাংরি-দের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রানিং কমেণ্টারির মতোন অর্থাৎ, চলন্ত ধারাভাষ্যের মতো সাহিত্য। যা ঘটছে, যা অভিজ্ঞতা সেটাকেই গল্প বা কবিতায় তুলে আনা। কবিতা সম্পর্কে প্লেটোসহ বহু প্রাচীনপন্থীর মতামত এই ছিল যে, কবিতা বাস্তব থেকে দূরে নিয়ে যায় চেতনাকে। অথচ, হাংরি-দের কবিতা পড়লে কিন্তু তার উল্টোটাই মনে হয়। বড়ো বেশিই যেন বাস্তবের গহ্বরে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে পাঠককে, সঙ্গে নিজেরাও। নৈর্ব্যক্তিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে হইহই করে লেখক নিজেকেও এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে লেখার মধ্যেই। এর ফলে কবিতার চিরাচরিত সম্বোধক-সম্বোধিত বা অ্যাড্রেসার-অ্যাড্রেসি নিয়ম ধাক্কা খাচ্ছে। সাহিত্য আর ততটা দূর থেকে বসে, নিরাপদে লেখার বিষয় থাকছে না; যখন পৃথিবী পুড়ছে ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে তখন লেখাও পুড়তে বাধ্য। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন বেরোয় ইংরাজিতে। ‘Weekly manifesto of hungry generation’, যার সম্পাদক দেবী রায়, মুখ্যনেতা শক্তি চ্যাটার্জ্জী এবং ক্রিয়েটর মলয় রায়চৌধুরি। তার প্রথম অনুচ্ছেদ- “Poetry is no more a civilizing maneuver, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual Hunger.” কবিতা কোনো নিরপেক্ষতার মাপকাঠি নয়, কবিতা শুধুমাত্র ছন্দ-শব্দ দিয়ে বেঁধে রাখার নান্দনিকতা নয়। বরং, অসহ্য জীবনকে তার মধ্যে প্রতিটি ছত্রে রেখে দেওয়া, অনন্ত বিস্ফারের সম্ভাবনায়।  হাংরি-দের লেখায় আত্ম-কে আবিষ্কার, জীবনের কেন্দ্রের মূল উৎস গুলোয় ফেরা, সন্ধান করা অসুখের উৎসের। কবিতা থেকে কবিতাযাপন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। ক্রাইসিস-গুলোকে চিনে নিতে নিতে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠা। কবিতা মানে বাস্তব থেকে দূরে সরার, অথবা কিছু মিথ্যে স্তোকবাক্য দিয়ে বাস্তবকে আড়াল করার চেষ্টা আর নেই; চাঁদ ফুল তারা নদী আর অতটাও সুন্দর নেই যে তারাই হয়ে উঠতে পারে ‘Aesthetics’-র মাপকাঠি। এস্থেটিক্‌স-ও নিয়ন্ত্রিত হয় পুঁজির দ্বারা, পুঁজির স্বার্থেই! সেই এস্থেটিক্‌স কে প্রবল বিক্ষোভে উপহাস করেন ফাল্গুনী রায়ও- “রাজহাঁস ও ফুলবিষয়ক কবিতাগুলি আমি মাংস রাঁধার জন্যেই দিয়েছিলাম উনোনে…”। রাষ্ট্রের ভণ্ডামিগুলো, ‘আদার্‌’ ছাপ্পা মেরে দেওয়াগুলো, ‘নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়া’র গড্ডালিকা স্রোতগুলোর পালটা স্রোত সাহিত্যে-জীবনযাপনে আসে। আর, ‘সংস্কৃতি’ ঠিক করে দেওয়া কর্তারা থাকবে, ততটাই থাকবে সেই ‘সংস্কৃতিকে’ প্রত্যাখ্যান। হয়তো সমান্তরাল, তবু থাকবে। প্রবলভাবেই। সমাজশাসকেরা বরাবরই নিজেদের মত করে হেজিমনি চাপিয়ে দেয়, শাসনের ডিস্‌কোর্সের অভিমুখে দাঁড় করাতে চায় সব্বাইকে। আর, যখনই তার বিরুদ্ধে স্বর ওঠে, তা সে সাহিত্যেই হোক বা অন্য কোথাও, তাকে দমিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাত্য করে রাখা হয় ‘সংস্কৃতি’-র শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে। জাতীয় সাহিত্যের মাপকাঠিতে ‘অশ্লীল’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় এই সাহিত্যগুলো। ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখাকে বিশ্লেষণ না করেই তাকে দাগিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে তাকেই আত্তীকরণ করে বাজারজাত পণ্য করার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা।”   

জয়িতা : তোমার নতুন পর্যায়ের কবিতার মানুষী ‘অবন্তিকা’ একেবারে জৈবিক ও মাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। নেই পূর্বতন কবিদের মত নেবুলাস কল্পনা ও সৌন্দর্য পূজা। এই ব্যাপারে একটু জানতে চাইব।

মলয় : না, অবন্তিকা বনলতা সেন, নীরা, সুপর্ণা নয় । অবন্তিকা ভারতীয় পুঁজিবাদের সৃষ্টি, যাকে তুই সর্বত্র দেখতে পাবি । টিভির পর্দায়, গ্লসি পত্রিকায়, পেজ থ্রি সমাগমে, করণ জোহর-ফারহা খান টাইপের সিনেমায়, মল-মালটিপ্লেক্সে, ট্রেন দুর্ঘটনার মাংসপিণ্ডে, রুজি বাঁচাবার ধান্দায় জরায়ু কাটিয়ে ফেলা মেয়ে শ্রমিকে, সন্ধ্যার যৌনকর্মী পাড়ায়, রেভ পার্টিতে, প্লাস্টিক সার্জারির ডাক্তারের চেম্বারে, জামাই ষষ্ঠীর বাজারে, সংবাদপত্র দপতরে, কফিহাউসে, অ্যাকেডেমি-নন্দন চত্তরে । 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোবিন্দ ধর

মলয় রায়চৌধুরীর মুখোমুখি গোবিন্দ ধর

গোবিন্দ : আপনি প্রচুর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন । দুটি সংকলন আছে আপনার সাক্ষাৎকারের। কিন্তু বেশিরভাগ প্রশ্নকর্তা হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন । আপনার জীবন ও গ্রন্হাবলী নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন কেউ করেননি । আমি সেই ধরনের প্রশ্ন করতে চাই, যা অন্যেরা করেনি । আপনার শৈশব কেটেছে পাটনার ইমলিতলা নামে এক অন্ত্যজ বস্তিতে, সেখানে কৈশোরে কুলসুম আপা নামের এক কিশোরীর সঙ্গে আপনার জীবনে যৌনতার প্রথম পরিচয় । তা কি প্রেম ছিল ? আপনার ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ হিসাবে কি কাজ করেছিল ঘটনাটা ?

মলয় : না, তা প্রেম ছিল না । উনি আমাকে গালিব আর ফয়েজের কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর নিজেই এগিয়ে এসে সংসর্গ পাতিয়েছিলেন । ইমলিতলা পাড়া ছিল চোর,ডাকাত, পকেটমার অধ্যুষিত গরিবদের পাড়া, তাদের বাড়িতে অবাধে ঢুকে পড়া যেতো । কুলসুম আপাদের বাড়িতেও, এমনকী ওদের মসজিদের ভেতরেও খেলা করার সময়ে ঢুকে লুকিয়েছি । এখন ভারতীয় সমাজ এমন স্তরে পৌঁছেচে যে অমন বাল্যকাল অভাবনীয় মনে হবে । আমার ধর্মনিরপেক্ষতা বা ব্যাপারটাকে যা-ই বলো, ওই পাড়াতেই সূচিত হয়েছিল । দাদা সমীর রায়চৌধুরী এই অভিজ্ঞতাকে বলেছেন একলেকটিক ।  রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়ার সময়ে আমার ক্রাশ ছিলেন গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, যাঁর প্রভাবে আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে এনার নাম সুমিতা চক্রবর্তী । 

গোবিন্দ : সেই পাড়ায় আপনারা নাকি পোড়া ইঁদুর, শুয়োরের মাংস, ছাগলের নাড়িভূঁড়ির কাবাব, তাড়ি, দিশি মদ, গাঁজা ইত্যাদি খেতেন । বাড়িতে তার জন্য পিটুনি খেতেন না ?

মলয় : দাদা বলতো বাড়িতে বলবি না, মৌরি খেয়ে নে । কিন্তু মুখে গন্ধ শুঁকে মা টের পেয়ে যেতেন আর বকুনি দিতেন । কিন্তু পাড়ার লোকেদের টানে আবার অমন কাণ্ড করতুম । এই সমস্ত কারণে দাদা ম্যাট্রিক পাশ করার পর বাবা  ওনাকে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন আর নিজে একটা ঝোপড়ি কিনে দরিয়াপুর নামে পাড়ায় বাড়ি করেন। আমি সেই বাড়িতে একা থাকতুম । আমার বাল্যস্মৃতি ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ আর ‘ছোটোলোকের যুববেলা’ পড়লে জানতে পারবে নানা ঘটনা । সিটি কলেজে দাদার সহপাঠী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । চাইবাসা আর ডালটনগঞ্জে দাদা মৎস্য বিভাগে পোস্টেড থাকার সময়ে প্রচুর মহুয়ার মদ খেয়েছি। দাদা হরিণের মাংস খাবারও ব্যবস্হা করে দিতেন । কতো রকমের মাছ যে খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই ; গেঁড়ি-গুগলির বিরিয়ানিও খেয়েছি ।

 গোবিন্দ:  :  আপনারা হাংরিরা শুনেছি যৌনকর্মীদের পাড়ায় যেতেন । কৃত্তিবাসের কবি-লেখকরাও যেতেন অথচ তা স্বীকার করেননি নিজেদের জীবনীতে । আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন । বিদেশে গিয়ে যৌনকর্মীদের পাড়ায় গেছেন ?

মলয় : না, কেবল সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, হাংরি বুলেটিনে । আমার পিসেমশায় যাওয়া আরম্ভ করেন । ওনার দেখাদেখি ওনার বড়ো ছেলে অজয় বা সেন্টুদা ঢুঁ মারা আরম্ভ করেন । সেন্টুদা আমাকে ওই পাড়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । দুপুর বেলায় রেট কম থাকে বলে সেন্টুদা দুপুরে আমাকে নিয়ে যেতেন । হাংরিদের মধ্যে শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, অবনী ধর রেগুলার যেতো, প্রৌঢ় বয়সেও, ওদের পরস্পরের চিঠিতে পাবে ওদের প্রিয় যৌনকর্মী বেবি, মীরা, দীপ্তির নাম । সবচেয়ে ভীতিকর হল কোনও যৌনকর্মীর প্রেমে পড়া। এখন তো আলো ঝলমলে অন্য চেহারা নিয়ে ফেলেছে এলাকাটা । আধুনিকা যৌনকর্মীরা জিনস-স্কার্ট পরে রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন, স্টাইলে সিগারেট ফোঁকেন । বিদেশে গিয়ে যৌনকর্মীদের পাড়ায় গিয়ে দেখে বেড়িয়েছি কিন্তু কারোর সঙ্গে শুইনি কেননা যৌনরোগকে আমার ভীষণ ভয় । বোদলেয়ারের জীবনী পড়ে আরও আতঙ্কিত হই । বিদেশিনীদের কাছে সারা পৃথিবী থেকে খদ্দেররা যায় । ভিয়েৎনামের যুদ্ধের কারণে থাইল্যাণ্ড হয়ে গিয়েছিল যৌনকর্মীদের বিরাট বাজার ; কাঁচের দেয়ালের ওইদিকে মেয়েরা বুক খুলে আর জাঙিয়া পরে খদ্দের ডাকতো । আমস্টারডামে একটা পাড়া ছিল যার গলিগুলোতে বিশাল কাচের জানলার সামনে প্রায় উলঙ্গ মেয়েরা ফিকে লাল আলোয় বসে থাকতো আর নীল আলো জ্বললে বুঝতে হতো সমকামীদের ডাকছে ।

গোবিন্দ : আপনার আত্মজীবনীতে এসব এসেছে ?

মলয় : হ্যাঁ, ‘ছোটোলোকের শেষবেলা’তে এসেছে । তাছাড়া ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আমি ওই সময়ের সবাইকে আর ঘটনাগুলোকে তুলে এনেছি । উপন্যাসটা প্রতিভাস প্রকাশিত ‘তিনটি নষ্ট উপন্যাস-এর অন্তর্ভুক্ত । মামলার সময়ে আমার শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে যেতে পাটনায় ফিরে গিয়েছিলুম আর আমাদের পারিবারিক ডাক্তার অক্ষয় গুপ্ত সংবাদপত্র পড়ে ধরে নিয়েছিলেন যে আমার যৌনরোগ হয়েছে আর বরাদ্দ করেছিলেন পেনিসিলিন ইনজেকশান । জানতে পেরে পরের দিনই কমপাউণ্ডারকে বলেছিলুম, আর দিতে হবে না, ও-রোগ আমার হয়নি ।

গোবিন্দ : অর্থাৎ আপনি গ্রামের মানুষ নন, শহরের মানুষ । তবু আপনার উপন্যাসে, যেমন ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, নামগন্ধ, জলাঞ্জলি, ঔরস ইত্যাদি উপন্যাসে গ্রাম এসেছে বিপুলভাবে । কেমন করে আপনি বর্ণনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন ? ঔরস উপন্যাসে আপনি অবুঝমাঢ়ের মাওবাদী এলাকা ডিটেলে বর্ণনা করেছেন ।

মলয় : চাকুরিসূত্রে সারা ভারতের গ্রামগঞ্জ ঘুরেছি,  চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, খেতমজুর, নৌকোর ছুতোর আর নিম্নবর্ণের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি ক্ষেত্রসমীক্ষায় । অধিকাংশ চরিত্র পেয়েছি সমীক্ষার সময়ে । যখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে চাকুরি করতুম তখন সহকর্মীদের গ্রামে গেছি । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছেড়ে এআরডিসিতে গেলুম, সেখান থেকে নাবার্ড। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকুরিটা ছেড়েছিলুম গ্রামের জীবন আর মানুষ দেখার লোভে । এখন তো আমার যা পেনশন তার চেয়ে বেশি পেনশন পায় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পিওন । তবে প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছিলুম তখন। পশ্চিমবাংলায় সিপিএমের ভয়ে অনেকে কথা বলতে চাইতো না বলে দাড়ি বাড়িয়ে অবাঙালি এম আর চৌধারী হয়ে গিয়েছিলুম, হিন্দিতে কথা বলতুম ।

গোবিন্দ : কোনও বিশেষ কোন স্মৃতি? 

মলয় : প্রচুর স্মৃতি জমে আছে, লিখেছিও কিছু-কিছু । সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো হিমালয়ের তরাইতে খাঁটি ভারতীয় গরু আছে কিনা তার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর স্মৃতি, যার রক্তাক্ত যোনিও আকর্ষণ করেছিল । স্হানীয় লোকেরা, সকলেই হিন্দু, বাঘিনীর মাংস-হাড় ইত্যাদি সংগ্রহের জন্যে কাড়াকাড়ি করেছিল। একজন আমাকে আর আমার সহকর্মীকে রেঁধে খাইয়েছিল । ইঁদুর খেয়েছি শৈশবে, বাঘ খেলুম যৌবনে । ঘোরাঘুরির চাকরির আগে জানতুম না কতোরকমের গরু, ছাগল, শুয়োর, মুর্গি, হাঁস, চাল, আলু ইত্যাদি হয়। জলসেচের কতোরকমের ব্যবস্হা আছে আর কোন ফসলে কখন কীরকম জলসেচের দরকার হয় কিছুই জানতুম না। 

গোবিন্দ : কলকাতায় কবিদের কাছে খালাসিটোলার এতো নামডাক । আপনি যেতেন ? 

মলয় : ওখানেও প্রথমবার গেছি সেন্টুদার সঙ্গে । পরে লেখক বন্ধুদের সঙ্গে । অবনী ধর একটা টেবিলে উঠে জীবনানন্দের জন্মদিনে নেচেছিল, সেটা ‘অমৃত’ পত্রিকায় আর ‘দি স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল । ক্লিন্টন বি সিলি ওনার জীবনানন্দ বিষয়ক ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইতে ঘটনাটার উল্লেখ করেছেন । তখনকার দিনে খালাসিটোলার বাইরে গাঁজা-চরস-আফিমের একটা সরকারি দোকান ছিল ; সেখান থেকে একটা পুরিয়া কিনে এগোতেই কমলকুমার মজুমদারের সামনাসামনি হই ; টাকার টানাটানি আর মামলার খরচ জানতে পেরে উনি আমাকে একটা একশো টাকার নোট দিয়েছিলেন। সুভাষ ঘোষ অবশ্য খালাসিটোলার বদলে পছন্দ করতো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে ‘অম্বর’ বার । 

গোবিন্দ : আপনি জীবনী লিখেছেন বা জীবন ও শিল্প বিশ্লেষণ করেছেন এবং অনুবাদ করেছেন  বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, পল ভেরলেন, সালভাদোর দালি, পল গঁগা, জাঁ জেনে, মায়াকভস্কি, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, দস্তয়েভস্কি, জাঁ-লুক গোদার প্রমুখের । মনে হয় আপনি যেন এঁদের প্রতি আকৃষ্ট,  আপনার জীবন ও চরিত্র ও লেখালিখির সঙ্গে এনাদের মিল আছে বলে ? তা কি স্বীকার করেন ?

মলয় : এটা ঠিক যে এনারা আমাকে আকর্ষণ করেছেন । বোদলেয়ারের আর জীবনানন্দের মতন আমিও একজন পথচর, যদিও করোনা ভাইরাসের কারণে আজকাল আর বেরোই না, কিন্তু আমি জেমস জয়েস, মার্সেল প্রুস্ত, হেনরি মিলার, হুলিও কোর্তাজার, ফুয়েন্তেস, শিবনারায়ণ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আনা আখমাতোভা, ওসিপ ম্যানডেলস্টাম, পিকাসো, মার্কেজ, সিলভিয়া প্লাথ,মালার্মে, পাবলো নেরুদা, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখকে নিয়েও লিখেছি ; এমনকী আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান গল্পকার  হায়মেওস্ট স্টর্মকে নিয়েও লিখেছি। শৈলেশ্বর ঘোষ সম্পর্কে আমার প্রবন্ধে কিন্তু গালমন্দ করিনি, যেমনটা উনি আমাকে প্রাণ ভরে দিয়ে গেছেন । 

গোবিন্দ : শৈলেশ্বর ঘোষ যে হাংরি রচনা সংকলিত করেছেন তা থেকে আপনি, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, আলো মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই পমুখদের বাদ দিয়েছেন। আপনিও নাকি ওনাদের বাদ দিয়েছেন ?

মলয় : না, আমি কাউকে আমার সম্পাদিত সংকলন থেকে বাদ দিইনি । বস্তুত হাংরি বুলেটিন আর জেব্রা পত্রিকা ছাড়া আমি কোনও হাংরি সংকলন সম্পাদনা করিনি । আসলে শৈলেশ্বর-সুভাষ আমার মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুন অপরাধবোধে ভুগতেন, এটা কমন ক্রিমিনাল সাইকোলজি।

গোবিন্দ : বাঙালি মহিলা কবিদের প্রতি আপনার পক্ষপাত দেখা যায় । আপনি যশোধরা রায়চৌধুরী, সোনালী চক্রবর্তী, বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়, সোনালী মিত্র, জয়িতা ভট্টাচার্য, মিতুল দত্ত, শ্রীদর্শিনী মুখোপাধ্যায়, আসমা অধরা, মুনীরা চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখ করেন, কয়েকজনের বইয়ের ভূমিকাও লিখেছেন । তরুণ পুরুষ কবিদের নিয়ে আপনি আশাবাদী নিশ্চয়ই। কিন্তু পিঠ চাপড়ানোর একটা রেওয়াজ চলছে। এতে সাহিত্যের লাভক্ষতি কি তেমন হচ্ছে? 

মলয় : পিঠ চাপড়ানি তো ভালোই । আমার মামলার সময়ে পিঠচাপড়ানি পেলে কাজে দিতো । তার বদলে আমি পেয়েছিলুম কেবল টিটকিরি, আক্রমণ, বিদ্বেষ । সংবাদপত্রগুলো যা ইচ্ছে তা-ই লিখতো। বুদ্ধদেব বসু আমার নাম শুনেই আমাকে ওনার দরোজা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । আবু সয়ীদ আইয়ুব আমার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা চিঠি লিখেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গকে । এমনকী বন্ধুরাও আমাকে অপছন্দ করতো । শৈলেশ্বর ঘোষ মারা যাবার পর ওর শিষ্যরা আমার বিরুদ্ধে লিখে চলেছে । ঢাকায় একটা বই বেরিয়েছে কবি প্রকাশনী থেকে, তাতে মোস্তাফিজ কারিগর আর  সৌম্য সরকার নামে দুজন আমাকে আক্রমণ করেছেন, আমার বইপত্র না পড়েই । তরুণরা তো নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, নতুন ভাবনা নতুন আঙ্গিক আনার প্রয়াস করছে,  যদিও বয়সের কারণে আমি এখন আর পড়ার অবসর পাই না । আমার পছন্দ হলে আমি প্রশংসা করি ; তা অন্যের পছন্দ নাও হতে পারে। মুনীরা চৌধুরীর কবিতা পড়েছ ? অসাধারণ প্রতিমাভাঙনের কাজ আছে ওনার কবিতায়

গোবিন্দ :প্রায় সকল প্রকাশক, লেখক যখন পাঠক-শূন্যতা টের পান তখন কেউ কেউ একেকটি মেলায় কোনও কোনও বইয়ের দ্বিতীয় তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার বিজ্ঞাপন দেন। এটা তাহলে পাঠকশূন্যতা নয় ? নাকি অন্য কোন যাদুবলে একজন লেখক পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন? কিংবা একজন প্রকাশক পাঠকের চাহিদা সত্যি সত্যি অগ্রীম ধরে নিতে পারেন? 

মলয় : অনেকের বই বিজ্ঞাপনের জোরে বিক্রি হয়, অনেকের বই পাঠকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে । অনেকের বই আবার সাংস্কৃতিক রাজনীতির কারণে বিক্রি হয় না । প্রকাশককে হুমকি দেয়ায় অনেকের বই আটকে যায়।  পাঠকের অভাব আছে বলে আমার মনে হয় না । যাঁরা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশ করেন তাঁদের অসুবিধা হলো কলেজ স্ট্রিটে বিক্রির ব্যবস্হা না থাকা । যাঁরা কলকাতার বাইরে থাকেন তাঁদের তো একেবারে সুযোগ-সুবিধা নেই । তবু তাঁদের প্রকাশ করা বইয়েরও পাঠক আছে । দাদা ‘হাওয়া৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করার সময়ে যে বইগুলো বের করেছিল সেগুলোর ভালোই চাহিদা ছিল । এখন ‘হাওয়া৪৯’ সম্পাদনা করে মুর্শিদ । ও আবিষ্কার প্রকাশনী খুলেছে, ওর বের করা বইগুলো ভালোই বিক্রি হয়, ও বিভিন্ন মেলাতেও অংশ নেয় । 

গোবিন্দ :  পারিবারিক কোনও স্মৃতি?

মলয় : আমাদের বসতবাড়ি ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় । আমরা সাবর্ণ রায়চৌধুরী বলে বাড়ির নাম ছিল সাবর্ণ ভিলা, তিনশো বছরের পুরোনো বাড়ি । অবশ্য আদি নিবাস বলতে হলে লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা বলতে হয়, যিনি যশোরে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য ছিলেন, মোগলদের কাছ থেকে রায়চৌধুরী উপাধি আর কলকাতার জায়গিরদারি পেয়ে চলে আসেন । সাবর্ণ ভিলা হয়ে গিয়েছিল খণ্ডহর । আমার খুড়তুতো বোন পুটিকে ওর বাবা প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে অনুমোদন না করার দরুন পুটি সবচেয়ে বড়ো ঘরের কড়িকাঠ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করে নিয়েছিল । আর তার পরদিনই ঘরটা তার ওপরের স্ট্রাকচারসহ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। বস্তুত ব্যাপারটা ছিল যেন সাবর্ণ ভিলার আত্মহত্যা । পুটির আত্মহত্যা আমি ভুলতে পারিনি । এক্ষুনি তোমাকে পিসেমশায়ের কথা বলছিলুম, উনিও মাঝরাতে আহিরিটোলার বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন ; ওনার পকেটের চিরকুটে লেখা ছিল ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভূবনে’ । বিশাল বাড়িটা ভাঙাচোরা অবস্হায় থাকার দরুণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে  দাদার বন্ধুদের পরামর্শে কয়েকজন শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধাকে ঠাঁই দিতে সুবিধা হয়েছিল । 

গোবিন্দ : আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন? তখনকার বিশেষ স্মৃতি? 

মলয় : আমি পড়তুম পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে । আইএ পড়ার সময়ে যোগ দিয়েছিলুম ন্যাশানাল ক্যাডেট কোর-এ, বন্দুক-পিস্তল চালানো আর নানা জায়গা দেখার লোভে । থ্রিনটথ্রি আর বাইশ বোরের রাইফেল চালিয়েছি । তখনকার পিস্তলগুলো বেশ ভারি হতো । থ্রিনটথ্রিতে প্রতিবার বুলেট ভরতে হতো, এখন কালাশনিকভ থেকে বুলেট বেরোয় চেপে রাখা পেচ্ছাপের মতন ।

গোবিন্দ :পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন? 

মলয় : পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কবি-লেখকদের আশ্রয় দেয়া আর লুকিয়ে রাখাকে যদি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যোগাযোগ মনে করো, তাহলে ছিল ।

গোবিন্দ : আপনার গল্প উপন্যাসে দেশভাগ,মুক্তিযুদ্ধ কিরকম এসেছে? 

মলয় : দেশভাগ এসেছে আমার কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে । ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে পাবে দেশভাগে চলে আসার পর একজন বামপন্হীর দ্রোহ আর শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তন । ‘ঔরস’ উপন্যাসে পাবে ১৯৭১-এর বীরাঙ্গনা আর সন্তানকে কেমনভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বিয়ে করেছিলেন এক স্কুল শিক্ষক । ‘নখদন্ত’ কাহিনির পোস্টমডার্ন স্ট্রাকচারে পাবে । বহু কবিতায় পাবে।

গোবিন্দ :আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু?কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে? 

মলয় : নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া আমি লিখতে পারি না, যদিও চেষ্টা করি । সেজন্য দেশভাগ যেটুকু এসেছে তা দেখে। আমি তো পূর্ববঙ্গের মানুষ নই । পঞ্চাশের দশকে শেয়ালদায় উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্কর অবস্হা নিজের চোখে দেখার দরুনই আমি আর দাদা আন্দোলনের কথা ভেবে ছিলুম । দেশভাগে যে নিম্নবর্ণের উদ্বাস্তুরা এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে মিশেছি হিমালয়ের তরাইতে, মানা ক্যাম্পে, ছত্তিসগঢ় আর মধ্যপ্রদেশে, মোতিহারিতে, মহারাষ্ট্রে । এনারা এসেছেন আমার লেখায় ।

গোবিন্দ :পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন? 

মলয় : পরিবার বলতে তো বাবা-মা-দাদা আর আমি । কেউই সরাসরি যুক্ত ছিলুম না।

গোবিন্দ :বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা এত আন্তরিক কেন ছিলো? 

উত্তর : সিমপল । বাঙালি বলে । 

গোবিন্দ :দেশভাগের ফলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপর কিরকম প্রভাব পড়ে? 

মলয় : আমার মনে হয় সেইভাবে পড়েনি যেমনটা বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েত শাসন ফেলেছে ইউরোপের লেখায় বা লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ফেলেছে স্প্যানিশ সাহিত্যে ।

গোবিন্দ  :বাঙালি জাতির জীবনে কাঁটাতার নিশ্চয়ই খণ্ডিত জাতিসত্তার জন্ম দিয়েছে? নাকি এর প্রভাব শুধু শিল্পসাহিত্যেই বাস্তবে কিছুই নয়?

মলয় : বলা কঠিন । বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্রমশ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, মূলত সউদি আরব, পাকিস্তান, তুর্কি ইত্যাদি দেশের প্রভাবে । এপার বাংলায় আর ত্রিপুরায় বিজেপি জিতলেও বাঙালিরা সেইভাবে হিন্দুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি । লেখকরা অবশ্য একটা পৃথক মিলক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছেন ।

গোবিন্দ :হাংরি উত্থানের দিনগুলোর অর্জন বলুন? 

মলয় : আমি আর কী বলব । লেখক-পাঠক হিসাবে এই বিশ্লেষণ তো তোমাদের করা দরকার।

গোবিন্দ: আপনার তো কবিতা লেখে সাহিত্যে হাতেখড়ি। আড্ডার দিনগুলোর কথা শুনবো? 

মলয়  : না, আমি প্রথমে প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেছিলুম । আমার ধারাবাহিক গদ্য ‘ইতিহাসের দর্শন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল । তারপর লিখি ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ । এই বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হতো না । দাদার বন্ধুদের সঙ্গে হতো, দীপক মজুমদার আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে । সিপিএম সরকারে আসার পর সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত রাজনীতিতে আগ্রহী হয় ।

গোবিন্দ  :কি করে মনে হলো কবিতার পাশাপাশি গল্প উপন্যাসও আপনার বিষয়?

উত্তর : না, না । উপন্যাস আর গল্প লেখা আরম্ভ করেছি বেশ দেরিতে । গল্প আশির দশকে আর উপন্যাস নব্বুই দশকে । আমার প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ । তবে আমি সব জনারের উপন্যাস লিখেছি, এমনকী ডিটেকটিভ আর ইরটিক উপন্যাসও ।

গোবিন্দ :এ যাবৎ পেয়েছেন অনেক সম্মান।লিখেছেন অনেক গল্প।প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোন জায়গায়? 

মলয় : সম্মান আবার কোথায় পেলুম ? কেবল তো জুতো-লাথি খেয়েছি । বাংলা সাহিত্যের অবস্হান খুবই উঁচু জায়গায় । দুর্ভাগ্যবশত অনুবাদকের অভাব । রবীন্দ্রনাথকেও নিজে অনুবাদ করে ইউরোপীয়দের পড়াতে হয়েছিল ।

গোবিন্দ  :প্রেম নিয়ে আপনার ভাবনা? 

মলয় : যা জয়দেব, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্রের, বোদলেয়ারের ।

গোবিন্দ :আপনার প্রেমিকাদেরকে অনেক কবিতা আছে।বলুন।

মলয় : হ্যাঁ । কীই বা বলব । সবই তো রোমিও বলে দিয়েছিল জুলিয়েটকে আর বোদলেয়ার বলেছিলেন জাঁ দুভাল, মাদাম সাবাতিয়ে, মাদাম দোব্রুঁকে ।

গোবিন্দ :কী লিখি কেন লিখি?

মলয় : যা ইচ্ছা হয় লিখি । কী, কেন ইত্যাদি ভাবি না । তবে কী পড়ি আর কেন পড়ি তা বলা যায়।

গোবিন্দ : হাংরি আন্দোলন কি সে অর্থে সফল বলে সমীর রায়চৌধুরী কিংবা আপনিও মনে করেন? 

মলয় : এসব তোমরা ভাববে ।

গোবিন্দ ::এই সময় দাঁড়িয়ে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজন ছিলো?

মলয়  : ছিল নিশ্চয়ই, তা নয়তো হলো কেন ?

গোবিন্দ :কবিতায় শ্লীল অশ্লীল শব্দোচ্চারণের সুস্পষ্ট কোন নিধি নিষেধ হয়? 

মলয় : ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে শ্লীল-অশ্লীলের উল্লেখ বা বর্গীকরণ নেই । ওটা ইসলাম আর প্রোটেস্ট্যান্ট ভিকটোরিয় খ্রিস্টধর্মীদের আমদানি । মনে হয় তা থেকে আমরা শামুকের গতিতে মুক্ত করতে পারছি আমাদের কাজগুলোকে । 

গোবিন্দ :হাংরি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবিতার বাঁক বিশ্লেষণ করেন প্লীজ? 

মলয় : আমার যে সাক্ষাৎকারের বই বেরিয়েছে প্রতিভাস থেকে, তাতে পাবে । তালিকাটা দীর্ঘ।

গোবিন্দ :হাংরি আন্দোলনে কারা যুক্ত হয়েছিলেন?এখনো কি তাদের উচ্চারণে হাংরি আন্দোলনের ছাপ আছে? 

মলয় : অনেকে । অনেকে । তিরিশ-চল্লিশজন । এখনও লেখায় টিকে আছি আমি । আর যে দুয়েকজন বেঁচে আছেন, তাঁরা লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছেন বা স্বাস্হের কারণে লিখতে পারেন না ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মারুফুল আলম নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

মারুফ :যদিও এখন আমরা এসব আর কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করি না–তবুও বলি,এখন এই তীব্র সময় বা অসময়ে সবমিলিয়ে কেমন আছেন?

মলয় : বেশ কোনঠাশা হয়ে আছি ।

মারুফ :পাটনাতেই তো লেখালেখি শুরু হয়েছিল?প্রথমে কি লিখেছিলেন– গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ নাকি অন্যকিছু?

মলয় : ইতিহাসের দর্শন নামে একটা ধারাবাহিক লেখা : বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ।

মারুফ :লেখালেখি শুরুর আগেও তো নানা রকম পড়ালেখা করেছেন–সেই ‘পাঠ পর্যায়’ সম্পর্কে কিছু জানাবেন কি?

মলয় : প্রথমে ক্যাথলিক স্কুলে পড়তুম । সেখানে ফাদার হিলম্যানের কাছে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের ঘটনা জানলুম । তারপর, রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়তে গিয়ে গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর ওসকানিতে ব্রাহ্ম লেখক আর কবিদের পড়া আরম্ভ করলুম। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়তেন আর আসার সময়ে তিরিশের দশকের কবিদের বই আনতেন । পাটনায় বাবা বই কিনে দিতেন । যাকে বলে বুকওয়র্ম, তাই ছিলুম।

মারুফ :আপনার প্রথম বই ‘শয়তানের মুখ’ না ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ – কোনটি? ‘শয়তানের মুখ’ তো ‘কৃত্তিবাস’ই করেছিল–সেই সময়ে বইটি সাড়াও ফেলেছিল বেশ।তারও পরে ‘হাংরি আন্দোলন’–তাই তো?তো,ব্যাপারটি এমন নয় যে,চসার,স্পেংলার বা অন্য কেউ তা ঘটিয়ে দিল,নিশ্চয়ই প্রস্তুতিটা ছিল—তা এই যে ‘হাংরি আন্দোলন’ তার প্রস্তুতি এসবের অনুপ্রেরণার উৎস কি?

মলয় : প্রথম বই ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ । ছোটোলোক অন্ত্যজদের ইমলিতলা পাড়ায় শৈশব-কৈশোর কেটেছিল আর ওই পাড়াটাই ছিল প্রস্তুতির বনেদ । আমার ছোটোলোকের ছোটোবেলা, ছোটোলোকের যুববেলা, ছোটোলোকের শেষবেলা বইগুলো পড়লে ব্যাপারটা বুঝতে পারবে । সুনীল গাঙ্গুলি শয়তানের মুখ বইটার প্রকাশক ছিলেন, কিন্তু সাড়া ফেলতেই অস্বীকার করতে থাকেন । তারপর আমারিকায় কবিতা লেখা শিখতে গিয়ে সেখান থেকে আমাকে হুমকি দিয়ে চিঠি লিখতেন । ইমলিতলার অন্ত্যজদের জীবন আর পঞ্চাশ দশকে কলকাতায় উদ্বাস্তুদের দুর্দশা কাজ করেছিল সুতলিতে আগুন ধরাবার । 

মারুফ :সাহিত্যের বহুল আলোচিত ‘হাংরি  মুভমেন্ট’ সম্পর্কে আজ এই এতোকাল পরে যদি অতি সংক্ষেপে আপনার মতামত জানতে চাই–তো কি বলবেন?   

মলয় : কিংবদন্তির ব্যাখ্যা হয় না, আন্দোলনটা ছিল গ্রিসের ইউলিসিসের মতন সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াইও করে লক্ষে পৌঁছোনোর ব্যাপার ।  

মারুফ :আপনার এক বাক্যে লিখিত দু’টি নভেলার একটি ‘ভিড়পুরুষ ও নরমাংসখোরদের হালনাগাদ’ এর শেষটা একটা অভিনব সমাপ্তি। ফিল্মিক  যবনিকাপাত। বেশ্যাপাড়ার একটি ঘরে গিটার বাজিয়ে পতিতারা সমবেত কণ্ঠে একটি ইংরেজি গান গাইছে। এ নভেলায় ১৯৭১-এ পাকবাহিনীর নির্যাতন,স্বাধীন দেশে মৌলবাদের উত্থান এবং অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের নিহতের  ঘটনার উল্লেখ আছে।বিরামচিহ্নহীন এ  লেখার প্রেরণা এবং আইডিয়া আপনি কিভাবে পেলেন?   

মলয় : লিখতে-লিখতে আপনা থেকেই ঘটে গিয়েছিল ।

মারুফ :‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস লেখার ভাবনার কথা জানতে চাচ্ছি। এরকম দুঃসাহসিক আখ্যান তীর্থস্থানে নেশা ও যৌনতাময় ক্যাওস নিয়ে টেক্সট আমাদের পাঠ অভিজ্ঞতায় একটা অনন্য পাঠকৃতি।বাংলা উপন্যাসের টেক্সটে আপনার বাক্য নির্মাণ,ভাষাগত দিক ও উপন্যাসটি রচনার পুর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কিছু বলুন।

মলয় : বেনারস আর কাঠমাণ্ডুতে হিপি কলোনিতে কয়েকমাস সময় কাটিয়েছিলুম । সঙ্গে ছিল আমার পেইনটার বন্ধুরা । সেই অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি । আমার বেশিরভাগ উপন্যাস নিজের জীবনের ঘটনা থেকে সংগ্রহ করা । পেইটারদের মতন এই উপন্যাসে আমি ফ্রেম থেকে বেরিয়ে জীবনকে আঁকতে চেয়েছি, সব রকমের রঙসুদ্দু ।

মারুফ :‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ থেকে ‘জলাঞ্জলি’ ‘নখদন্ত’ হয়ে ‘একটি নিরুপন্যাস’–এগুলো শুধু বিচিত্র আখ্যান নয়।ভিন্ন ভিন্ন নির্মাণ পদ্ধতিও বটে।আখ্যানের সাথে সাথে পৃথক টেকনিকের এপ্লিকেশন বা আইডিয়াও কি মাথায় রেখে লিখতে থাকেন?আপনার নিজের প্রস্তুতিটা একটু বলুন।

মলয় : হ্যাঁ । একটা উপন্যাস লেখার মশলা যোগাড় হয়ে গেলে তার আঙ্গিক নিয়ে ভাবি। চেষ্টা করি যাতে কমার্শিয়াল লেকখদের মতন একই ভাষা আর আঙ্গিক না হয়ে যায় ।

মারুফ ।আপনি খুব সচেতন লেখক,সবার সাথে পংক্তিভোজে আপনাকে দেখা যায় না।সেজন্য লেখকদের প্রতি একটা সমীহবোধ পাঠকদেরও থাকে।কিন্তু একটা কমন টেন্ডেন্সি হলো ওই লেখকগণই যখন বাংলাদেশে কোথাও লেখেন তখন তাঁর এই রুচি,বাছ-বিচারটা অটুট থাকে না।লিটলম্যাগাজিন বা উৎকৃষ্ট সাহিত্য পত্রিকা নয়,একেবারে ঈদ সংখ্যায় বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণির ট্রাশ লেখকদের পাশেই লেখেন।এটা কেন হয় বলে আপনি মনে করেন? 

মলয় : ভারতে বসে টের পাওয়া যায় না কোনটা ঈদের আর কোনটা মৌলবাদী নয় । যারা মৌলবাদী নয় তারাও দাড়ি রাখে । এই যেমন তুমি ; আমি কেমন করে জানবো তুমি মৌলবাদী কি না । হুমায়ুন আহমেদকে বাংলাদেশে গুরুত্ব দেয়া হয়, আমি দিই না । তবু ওনার লেখা যে পত্রিকায় বেরোয় তাতে লিখেছি । বাংলাদেশের তরুণীরা আমাকে তাঁদের কবিতা পড়তে বলেন ; তাঁরা গোঁড়া মতবাদের বা কাব্য-প্রতিভার চিন্তা করি না ; সুন্দরী হলেই হলো ।

মারুফ :বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য চর্চা সম্বন্ধে আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন।এ বিষয়ে আপনার পাঠ অভিজ্ঞতা জানতে চাইছি।

মলয় : এখন আর তেমন পড়ি না ; বইপত্র পাই না । তবে ইনটারনেট থেকে টের পাই যে নানারকমের বাঁকবদল ঘটে চলেছে, ভাষায়, আঙ্গিকে, বিষয়বস্তুতে, ভাবনায় । আমি তো মুনিরা চৌধুরীর কবিতা প্রথমবার পড়ে স্টানড হয়ে গিয়েছিলুম ।

মারুফ :আপনার ‘নামগন্ধ’ শুরুই হচ্ছে পাঠক চেতনায় একটা ভায়োলেন্স তৈরি করে।উপন্যাসের আখ্যানের প্রথাগত টেকনিক আপনি ভেঙে দিয়েছেন। এটা তো শুধু  টেকনিক না,এর পেছনে কোন সাংস্কৃতিক চেতনা  ক্রিয়াশীল,যা থেকে আপনি এটা করেন?

মলয় : ওটা সত্যিকার ঘটনা, দেখেছি, তাই মানসিক আক্রমণটা কাজে লাগিয়েছি। চাকুরিসূত্রে আলুচাষিদের দুর্দশা দেখেছি, সেগুলো কাজে লাগিয়েছি । বলা যায় যে আমি যাদের দুর্দশা নিয়ে লিখি তাদের দুর্দশা হয়ে ওঠে টেকনিক । বইয়ের শেষটা আপনা থেকে মাথায় এসে গিয়েছিল। শেষটা মাথায় আসার পর রিভাইজ করার সময়ে অনেক ঘটনা আর নামধাম পালটে দিয়েছিলুম। 

মারুফ :সুবিমল  মিশ্রের সাহিত্য কীর্তি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি? দেবেশ রায়?  

মলয় : সুবিমল মিশ্র অসাধারণ লেখক ; দেবেশ রায়কে কম পড়েছি । তিস্তাপারের বৃত্তান্ত পড়িনি।

মারুফ :সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপনি নিজেও তৎপর।বর্তমান চলমান ধারায় শিল্পসাহিত্যের কিছুটা প্রতিফলনও সেখানে ঘটেছে।ওয়েবজিন,ইবুকও ইতোমধ্যে চলে এসেছে।অনেকেই শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারী সাহিত্যিক।আবার অতিসামান্য দু’একজন যেমন ‘প্রতিশিল্প’ সম্পাদক অভাজন এই আমার ধারণা,ফেসবুক নানান চর্চা সহ সাহিত্য চর্চায়ও দ্রুত ‘মেইনস্ট্রিম’ই হতে যাচ্ছে।তাছাড়া ফেসবুকও তো পুঁজি এবং অন্যান্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানই,নয়? সার্বিকভাবে এইসব বিষয়-আশয় আপনি কীভাবে দেখেন?  

মলয় : আমরা পাঠকের কাছে কেমন করে পৌছোবো ? আমার বই তো বাংলাদেশে এখন কয়েকটা গেছে ; প্রকাশক পাচ্ছি । ইনটারনেটের সাহায্যে পাঠক জানতে পারছেন আমাকে। তার আগে সবাই জানতো প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর কবি হিসেবে ।

মারুফ :উপন্যাসের তুলনায় ছোটগল্প এতো কম লিখলেন?

মলয় : সত্যি কথা । লিখলে কোথায় দেবো সেটা একটা বড়ো ব্যাপার । অনেকে আমার লেখা ছাপতে চাইতো না । ফলে আগ্রহ হতো না । যে ছোটোগল্পগুলো লিখেছি তা সবই পরিচিত সম্পাদকদের পত্রিকায়।

মারুফ :সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার অভিমত কি?

মলয় : ওনার সম্পর্কে বলতে হলে যে উচ্চতার দরকার, আমি সেই তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র ।

মারুফ :ছোটলোকের ছোটবেলা, ছোটলোকের যুববেলা,এই অধম ওই অধম– এসবই আত্মজীবনীমূলক।তারপরও কি আপনি আত্মজীবনী লিখবেন? 

মলয় : লিখেছি তো ! ছোটোলোকের শেষবেলা । ইনটারনেটে পাবে । 

মারুফ :‘কবিতীর্থ’ আপনার ৩টা নাটক দিয়ে নাটকসমগ্র বের করেছিল।নাটক আর লিখবেন না? ১৯৬৩-তেই প্রথম নাটক – ‘ইল্লত’ লিখেছেন। বাংলাসাহিত্যে আপনার পছন্দের নাট্যকার কারা?

মলয় : না, নাটক আর লিখিনি । তবে চারটে কাব্যনাট্য লিখেছি ।

মারুফ :বাইরের দেশের কার কার লেখা আপনার কথাসাহিত্য চর্চায় প্রণোদনা দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন।প্রভাবিত হওয়ার কথা বলছি। এমন মনে হয় আপনার?

মলয় : আমি বুকওয়র্ম হবার দরুন শেকসপিয়ার থেকে মুরাকামি সবই পড়েছি । তাই বলা কঠিন ।

মারুফ :আপনার একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে আপনি নিজেই নিজের ইন্টারভিউ নিয়েছেন।এটা একটা বিরল ঘটনা। আপনি কোন মন্তব্য করতে চান? এটা কি নিজের সাহিত্যের সারবস্তু,নিজের শিল্পদর্শন,নিহিত ভাবনাসকল অন্য কেউ ঠিকমতো অবতারণা করতে পারবে না বুঝে নিজেই প্রশ্ন এবং নিজেই উত্তর করলেন?

মলয় : সম্পাদকের অনুরোধে ঘটেছিল । আমিও সুযোগটা নিলুম, নতুন ধরণের ব্যাপার বলে ।

মারুফ :একটু জানতে চাইছি,আপনার সবচে’ উল্লেখযোগ্য ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ আপনি কতোদিনে শেষ করেছিলেন?      

মলয় : ওটাই আমার প্রথম উপন্যাস । বেশ সময় লেগেছিল । বছর খানেক তো হবেই ।



Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

সোনালী মিত্র নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

সোনালী মিত্র :  ” প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ” এর পরে মলয় রায়চৌধুরীর সেই কবিতা আর এলো কই যে আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে ? নাকি বিতর্ক হয়েছিল বলে কবিতাটা বিখ্যাত হয়েছিল ? নাকি মলয় রায়চৌধুরীর সব প্রতিভা ঢাকা পরে গেলো ”প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ” এর সৌজন্যে ?

.

মলয় রায়চৌধুরী :  ওটা ছিল মূলত দ্রুতির কবিতা ; আক্ষেপানুরাগের কবিতা । ওই কবিতার দরুন পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালত-উকিল-চাকুরি থেকে সাসপেনশানের কারণে অর্থাভাব ইত্যাদির ফলে দ্রুতির রেশ আক্রান্ত হয়েছিল । কলকাতায় তো আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না, কেননা আমরা তখন পাটনায় থাকতুম । সুবিমল বসাক ছাড়া অন্যান্য বন্ধুরাও কলকাতায় তাদের আস্তানায় রাতে থাকতে দিত না । উত্তরপাড়ার আদিবাড়ির খণ্ডহরে রাতে থাকলে সকালে কলকাতা আদালতে যাবার জন্যে প্যাসেঞ্জার ট্রেন, যার সময়ের ঠিক ছিল না । ইলেকট্রিক ট্রেন তখন সেরকমভাবে আরম্ভ হয়নি । সে কি দুরবস্হা । টয়লেট করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার ট্রেনে ; রাত কাটাতুম সুবিমলের জ্যাঠার স্যাকরার এক-ঘরের দোকানে, বৈঠকখানা পাড়ায় । একই শার্ট-প্যাণ্ট পরে দিনের পর দিন কাটাতে হতো ; স্নান রাস্তার কলে, সেগুলোও আবার এতো নিচু যে হামাগুড়ি দিয়ে বসতে হতো । কবিতা লেখার মতো মানসিক একাকীত্বের সময় পেতুম না মাসের পর মাস । 

.

‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা তখন বিখ্যাত হয়নি ; হয়েছে এই বছর পনেরো-কুড়ি হল । তখন তো ভয়ে লোকে হাংরি শব্দটাই ব্যবহার করত না, কবিতাটা নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা । আমার মনে হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ওদেশে কবিতাটা প্রকাশের ব্যাপারে বা হাংরি আন্দোলন নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে ভীতি ছিল না । ঢাকায় মীজানুর রহমান ওনার পত্রিকায় ধারাবাহিক আমার ‘হাংরি কিংবদন্তি’ প্রকাশ করেছিলেন । আশির দশকে আমার বেশির ভাগ লেখা প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার পত্র-পত্রিকায় । বাংলাদেশের কবিদের দেখাদেখি পশ্চিমবঙ্গে বছর দশেক পরে কবিতাটা প্রকাশের সাহস যোগাতে সক্ষম হন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা । এখন তো কলকাতার সংবাদপত্রের পুস্তিকাতাও প্রকাশিত হতে দেখি । ‘ক্ষুধার্ত’, ‘ক্ষুধার্ত খবর’ ইত্যাদি যে পত্রিকাগুলো সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রকাশ করত, তাতেও ওরা আমার কবিতা প্রকাশ করতে বা আমার নামোল্লেখ করতে ভয় পেতো ; এমনকি হাংরি শব্দটা এড়াবার জন্য ক্ষুধার্ত শব্দটা প্রয়োগ করা আরম্ভ করেছিল । আসলে শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ আদালতে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গিয়ে আত্মঅবমাননার গাড্ডায় পড়েছিল ।

.

আমার মনে হয় তোদের নাগালে আমার বইপত্র পৌঁছোয় না বলে কেবল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ দ্বারা প্রভাবিত রয়েছিস । আমার উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ আর ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ তো বেশ বৌদ্ধিক রেসপন্স পেয়েছে, বিশেষ করে কম বয়সী অ্যাকাডেমিশিয়ানদের থেকে । নয়তো কেনই বা বিষ্ণুচন্দ্র দে আমার কবিতা নিয়ে পিএচডি করবেন, উনি ওনার গবেষণাপত্র গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেছেন । স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায় এম ফিল করবেন ? মারিনা রেজা ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য আসবেন ? আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী গবেষণা করছেন । অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা বিনির্মাণ করে অ্যাকাডেমিশিয়ানদের সাইটে আপলোড করেছেন । পড়ে দেখতে পারিস । তুই দিল্লিতে থাকিস বলে আমার বইপত্র পাস না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইটালি থেকে গবেষণার জন্য আসছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা ।

..

সোনালী মিত্র :  হাংরি আন্দোলন নতুনধারার কবিতার জগতে বিপ্লব এনেছিল । কিছুদিন ফুল ফুটবার পরেই রোদের তাপে মিইয়ে গেলো ! মতপার্থক্য জনিত কারণেই কি আন্দোলন শেষ হয়ে গেলো ? পৃথিবীতে সমস্ত আন্দোলনই প্রথমে আগুন লাগিয়ে দেয় মানুষের বুকে , আবার আগুন নিভিয়েও দেয় আন্দোলনের হোতারা , হাংরি ও এর ব্যতিক্রম হোল না কেন?

.

মলয় রায়চৌধুরী: হ্যাঁ, পৃথিবীর সব আন্দোলনই একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে ; তার কাজ হয়ে গেলে মিলিয়ে যায় ; আন্দোলন মাত্রেই সমুদ্রের আপওয়েইলিং । হাংরি আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় একের পর এক কতোগুলো আন্দোলন হয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যে । তারা মিডিয়া প্রচার পায়নি বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি । আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলুম, যে কারণে এই মাস তিনেক আগেও বিবিসির প্রতিনিধি এসে একটা প্রোগ্রাম তৈরি করে নিয়ে গেলেন আর প্রসারণ করলেন । গত বছর আমেরিকা থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে একটা ফিল্ম তৈরি করে নিয়ে গেলেন ; হাংরি আন্দোলন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা দেবার সময়ে ওনার কাজে লাগে ফিল্মটা। হাংরির পর তো কবিতার আর গদ্যের ক্রিয়েটিভ ধারাই পালটে গেছে ।

.

সোনালী মিত্র :  আপনারা কবিতা আন্দোলন করে কি করতে চেয়েছিলেন ? এতদিন পরে পেছনের দিকে তাকালে কি মনে হয় অল্পবয়সে হুজুকে চেপেছিল আপনাদের সাহিত্য সাধনা ? আপনারা যা চেয়েছিলেন তার কতখানি সফলতা অর্জন করেছিলেন ? যদি সফলতা অর্জন করে থাকেন তাহলে ধরে রাখতেই বা পারলেন না কেন ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : না, আমাদের আন্দোলন কেবল কবিতার আন্দোলন ছিল না । গদ্য-নির্মাণ আর ছবি-আঁকারও আন্দোলন ছিল । ছবি আঁকায় ১৯৭২ সালে অনিল করঞ্জাই ললিত কলা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন । বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ গল্পের বইটা সেই ষাটের দশকেই প্রশংসিত হয়েছিল ; এখন তো ওর রচনাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে, আর পাঠকদের দ্বারা সমাদৃত হচ্ছে । হাংরি আন্দোলনের কারণে পাঠবস্তু মুক্ত হয়ে গেছে যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে; কবিতা আর গল্প লেখা হচ্ছে মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-সমাপ্তি এবং মুক্ত আঙ্গিক নিয়ে ; মানের নিশ্চয়তা এড়াতে পারছে ; অফুরন্ত মানে গড়তে পারছে; সংকরায়ণ ঘটাতে পারছে; ‘আমি’কে বহুমাত্রিক আর বহুস্বরিক করে তুলতে পারছে ; শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ করতে পারছে ; ভঙ্গুরতা আনতে পারছে ; মাইক্রোন্যারেটিভকে গুরুত্ব দিতে পারছে; ফ্লাক্স তৈরি করতে পারছে । এ থেকেই তো বোঝা যায় যে পরের পর প্রজন্মে সফলতা ক্রমশ চারিয়ে যেতে পেরেছে ।

.

সোনালী মিত্র : হাংরি ভূত কি গায়ে চেপে বসে আছে এখনও আপনার পরিচয়ের সঙ্গে ? এখন ও যা লেখেন মানুষ তুলনা টানে হাংরি কবিতার সঙ্গে , এটাকে উপভোগ করেন না খারাপ লাগে ? জীবনের এইপ্রান্তে এসে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলন অন্যকোন ভাবে পরিচালনা করা যেত যাতে এই সময়েও সমান প্রাসঙ্গিকতা থাকত ?

.

মলয় রায়চৌধুরী: হাংরি আন্দোলনের তো কেউ পরিচালক ছিলেন না । আমাদের আন্দোলনের কোনো সম্পাদকীয় দপতর, হেড কোয়ার্টার, হাই কমাণ্ড, পলিট ব্যুরো জাতীয় ব্যাপার ছিল না । যাঁর যেখান থেকে ইচ্ছে বুলেটিন বা পুস্তিকা প্রকাশ করার স্বাধীনতা ছিল । বাঙালির সাহিত্য চেতনায় এই ব্যাপারটা ছিল অভাবনীয় । প্রথম দিকে হ্যাণ্ডবিলের আকারে বেরোতো আর ফ্রি বিলি করা হতো ; যিনি বের করতেন তিনিই বিলি করতেন । কবিতার পোস্টারের প্রচলনও আমরাই সর্বপ্রথম করি, তখনকার দিনে উর্দু লিথোপ্রেসে অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার ছাপিয়ে । দেয়ালে সাঁটার কাজটা করতেন ত্রিদিব মিত্র আর ওনার প্রেমিকা আলো মিত্র । এখন যেটা হয়েছে তা হাংরি নাম ঘাড়ে চেপে যাওয়ার নয় । যা মাঝে-মাঝে নজরে পড়ে তা হল, মলয় রায়চৌধুরী নামটা আমার লেখার আগেই পাঠকের কাছে পৌঁছে একটা ইমেজ গড়ে ফেলার । এর জন্য আমার কিছু করার নেই । জনৈকা পাঠিকা লিখে জানিয়েছিলেন যে আমার কবিতাগুলোকে তিনি প্রিডেটর মনে করেন, এবং আমাকে নয়, আমার কবিতার সঙ্গে তাঁর সুপ্ত যৌনসম্পর্ক গড়ে ওঠে তা তিনি টের পান । অর্থাৎ এ-ক্ষেত্রে আমার নামকে অতিক্রম করে তিনি আমার কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে নিয়েছেন । এই তরুণীর চরিত্রটিকে আমি ‘ভালোবাসার উৎসব’ কাব্যনাট্যে ব্যবহার করেছি । হাংরির ভুতপ্রেত আমার চেয়ে পাঠক-পাঠিকার ওপর চেপে বসেছে বেশি করে । আর হাংরি আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে তুই পাঁচ দশক পর বিষয়টা নিয়ে উৎসাহী কেন ?

.

সোনালী মিত্র : স্পষ্টত তখন হাংরি আন্দোলন নিয়ে বাংলার কবিদল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল , যারা সঙ্গে থাকব বলেও পরে সরে গিয়েছিলেন , যারা কিছুদিন থাকবার পরে সরে গিয়েছিলেন , যারা প্রথম থেকেই বিরুদ্ধে ছিলেন , তাদের প্রতি আপনার কখনও কি মনে হয়েছে যে শিল্প-সাধনার স্বাধীনতার পরিপন্থী ছিলেন তারা ? কিংবা তাদের সেই সাহস ছিল না ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : দু’ভাগ নয়, অনেক ভাগ । লেখালেখির জগতে এই ধরণের ঘটনা আকছার ঘটে । এটা ব্যক্তিচরিত্রের ব্যাপার, শিল্প-সাধনার নয় । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে ওসকাচ্ছিলেন হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়া যাবার জন্য । তাঁরা বেরিয়ে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হয়ে যেতেই উনি ফিরে এসে আমার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলেন আর নিজের বন্ধুদের ছবিটা বাঙালির ইতিহাসে নোংরা করে দিলেন । মীজানুর রহমান ‘হাংরি কিংবদন্তি’ ধারাবাহিক প্রকাশ করার পর গ্রন্হাকারে বের করতে চাইছিলেন, কিন্তু সেখানেও শামসুর রাহমানের মাধ্যমে তাঁকে বিরত করা হয় ; করেছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর কবিরা । স্ট্যালিন যখন পরাবাস্তববাদীদের জেলে পুরছিলেন তখন কয়েকজন কমিউনিস্ট হয়ে-যাওয়া পরাবাস্তববাদী স্ট্যালিনকে সমর্থন করেন । হুমায়ুন আজাদ আর অভিজিৎ রায় হত্যা নিয়ে আল মাহমুদ আর নির্মলেন্দু গুণ মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে বসে রইলেন । আল মাহমুদ একজন মৌলবাদী, তাঁর আচরণ বোঝা যায় । নির্মলেন্দু গুণ মুখ খুললেন না ভয়ে, এসট্যাবলিশমেন্ট তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাস থেকেই লোপাট করে দিতে পারে এই আশঙ্কায় । পশ্চিমবঙ্গেও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে, কিন্তু ‘পরিবর্তনওয়ালা’ কবি-সাহিত্যিকরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট চিপকে লুকিয়ে পড়েন । শিল্প-সাধনার স্বাধীনতা তখন কোথায় যায় ?

.

সোনালী মিত্র :  মলয় রায়চৌধুরী একটা ব্র্যান্ড । মলয় রায়চৌধুরী তকমা ছেপে গেলে অনেক কিছু করে ফেলা যায় যা একটা সাধারণ শিল্পীর দ্বারা সম্ভব নয় ! আপনার কি মনে হয়নি এতদিন যা লিখেছেন , যা লিখছেন এসব যেন কিছুই নয় , চরম কিছু বাকি রয়ে গেলো যা এখনও লেখা হোল না ! শেষ সময়ে এসে কি পেছনে তাকিয়ে হাঁটেন না সামনের পথ তৈরি করার খেলাতে মেতে আছেন ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, আসল লেখা এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি ; মগজের মধ্যে ঘটে চলে অনেকরকমের ভাবনাচিন্তা। ব্র্যাণ্ড কিনা তা জানি না । আমার কতো প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য গ্রন্হাকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে । ব্র্যাণ্ড হলে তো কোনো না কোনো প্রকাশক রাজি হতেন প্রকাশ করতে । কেউই রাজি হন না । অনেকে ছাপার জন্য টাকা চেয়ে বসেন । টাকাই যদি দিতে হয় তো নিজেই ছাপিয়ে ফ্রি বিলি করা ভালো, যেমন রবীন্দ্রনাথ করতেন । কেননা প্রকাশকরা টাকা নিয়ে নাকি যথেষ্ট কপি ছাপেন না, শুনেছি কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিকের কাছে । পেছনে ফিরে তাকাই না । আমি বইপত্র সংগ্রহ করি না, নিজের বইও আমার কাছে নেই, তাই আগের লেখাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কটা অবিরাম ছিন্ন হয়ে চলেছে । আমার বইয়ের কোনো লাইব্রেরি নেই । বই-পত্রিকা পড়ি, আগ্রহী পাঠকদের বিলিয়ে দিই ।

.

সোনালী মিত্র : যৌবনে শুভা শেষ জীবনে অবন্তিকা’র মধ্যে দিয়ে প্রেমের ভিন্নতা খুঁজতে চাওয়া কি কোন ভুল সংশোধন ? নারীকে যখন ভোগ্য , পুরুষকে ও যখন ভোগ্য ভেবে সমস্ত নৈরাশ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় , তখন কি মনে হয়নি শ্মশানের পাশেই হাসনুহানা গাছে কত ফুল ফুটে আছে , সেই ফুলের শোভা ও নৈরাশ্যর মতই ভীষণ সত্য , ফুলকে উপেক্ষিত করা যায় ?

,

মলয় রায়চৌধুরী : শুভা যৌবনের নয় ; বয়ঃসন্ধিকালের । আমার “রাহুকেতু” উপন্যাস পড়লে তুই আমার জীবনের কয়েকজন নারীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারবি । “ভালোবাসার উৎসব” কাব্যনাট্যেও আছেন তাঁরা । আমার ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ বইতে একটি নারী চরিত্র আছে যে একজন আধচেনা পুরুষের হাত ধরে বলে ওঠে, ‘চলুন পালাই’ । এটা আমার জীবনে একজন নারীর প্রবেশের প্রয়াস ছিল । অবন্তিকা একটি নির্মিত প্রতিস্ব । এর আগে রামী, বনলতা সেন, নীরা, নয়ন, সুপর্ণা ইত্যাদি ছিল কবিদের নিজস্ব নারী । অবন্তিকা সেরকম নারী নয়, সে স্বাধীন, পাঠকের কাছে, আলোচকের কাছে, নির্দ্বিধায় যায় । অবন্তিকা আমার স্লেভগার্ল নয় ।

.

সোনালী মিত্র : এই সময়ের কবিতার ভবিষ্যৎ কি ? এই সময়ের কবিতা কোনপথে এগিয়ে গেলে হাংরি যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকে শুরু করা যাবে ? নাকি এখনকার কবিরা গোলকধাঁধায় পড়েছে , কি করবে না করবে কিছুই যেন লক্ষ্য নেই তাদের সামনে ? নাকি এখনকার কবিতা সমাজ রাষ্ট্র সময় থেকে সরে যাওয়া কোন জাফর শা ? কোন উত্তাপ লেগে নেই তাদের হৃদয়ে ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : এখন তো অনেকের কবিতা পড়ে আমার হিংসে হয়; অসাধারণ কবিতা লিখছেন এখনকার কবিরা । মনে হয় শব্দ বাক্য ছন্দ সবই তো রয়েছে, আমি কেন এদের মতন লিখতে পারছি না । যেমন রাকা দাশগুপ্ত, সাঁঝবাতি, মুজিবর আনসারী, বিভাস রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, বিদিশা সরকার, বহতা অংশুমালী, মিচি উল্কা প্রমুখ । সব নাম এক্ষুনি মনে আসছে না ।

.

সোনালী মিত্র : কবির চেতনায় কোন না কোন পূর্বজ কবির একটি আদর্শগত ধারাপাত থেকে যায়, এটা প্রাচীন কাল থেকেই লক্ষণীয় ,কবি অগ্রজ কোন কবির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ? আসলেই কে কাউকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যায় সাধনায় ? যদি যায় কতদূর গিয়েই বা ফিরে আসা উচিত নিজের চেতনায় ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : শৈশবে আমাদের পরিবারে শিউনন্দন কাহার আর বাবার ফোটোগ্রাফি দোকানে রামখেলাওয়ন সিং ডাবর, দুজন কাজের লোক ছিল । শিউনন্দন নিরক্ষর হলেও পুরো রামচরিতমানস মুখস্হ ছিল । রামখেলাওয়ন রহিম, দাদু আর কবির থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারত । তারা কাজের লোক ছিল বলে সরাসরি বকুনি দিতে পারত না, কিন্তু রামচরিতমানস বা রহিম-কবির-দাদু থেকে কোট করে জানিয়ে দিত আমরা কী ভুল করছি । আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা”র ‘এই অধম ওই অধম’ অংশে আমি তাঁদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিষেধ করার কিছু উদাহরণ দিয়েছি । অগ্রজ কবিদের বদলে এই দুই জনের প্রভাব আমার ওপর গভীরভাবে পড়েছিল । তাছাড়া, আমাদের বাড়িতে প্রথম স্কুলে পড়তে ঢুকেছিলেন আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী । আমাদের পরিবার সেই অর্থে শিক্ষিত-সংস্কৃতিমান পরিবার ছিল না । বাবা-মা আর জেঠা-কাকারা কেউই স্কুলে পড়েননি । বাবা-জেঠারা সুযোগ পাননি কেননা ঠাকুর্দা ছিলেন ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার-আর্টিস্ট, বেশির ভাগ সময় কাটাতেন প্রিন্সলি স্টেটের সদস্যদের পেইনটিং আঁকায় ; উনি সপরিবারে মুভ করতেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় । আমার বাবা তো জন্মেছিলেন লাহোরে । গোঁড়া বামুন পরিবার ছিল বলে ঠাকুমা আর বড়োজেঠা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মনে করতেন বেমমো ; বহুকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ছিল আমাদের বাড়িতে ।

.

সোনালী মিত্র : প্রতিটি সফল পুরুষের পিছনে নাকি একজন নারী শক্তি বিরাজ করেন ।আপনার কলমের প্রাণোচ্ছল পরিনতির জন্য কোন নারীশক্তিকে কি আধার মানতে চান ?কবি কলম দূর্ধষ রোম্যান্টিক, এই রোম্যান্টিসিজম এখনো কি প্রেমে পড়তে বাধ্য করে ?আপনার কলমে যে নারীদের পাই তারা কি শুধুই কল্পনারী নাকি বাস্তবেও তাদের ছোঁয়া আছে ?

.

মলয় রায়চৌধুরী : না, আমার পেছনে কোনো নারী নেই, মানে প্রেমিকা-নারী নেই । তবে সাপোর্ট সিস্টেম হিসাবে মা ছিলেন । যে নারীদের আমার লেখায় পাস, তারা কল্পনারী নয়, বাস্তবের নারী, একমাত্র অবন্তিকা হল বিভিন্ন নারীর উপাদান নিয়ে নির্মিত একটি প্রতিস্ব । ‘চলুন পালাই’ পর্ব থেকে আমি আর প্রেমে পড়তে চাই না । রোম্যান্টিক হওয়াটাই আমাকে বিপদে ফেলেছে বারবার । বড্ড ডিসট্র্যাকশান হয় প্রেমে । বুড়ো হয়ে গেছি বলে বলছি না, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ।

.

সোনালী মিত্র : একদম সর্বশেষ প্রশ্নটা করেই ফেলি , আগামীদিনে আপনার পরিকল্পনা কি ? নতুন কি কোন পরিকল্পনা আছে লেখালেখি নিয়ে ? পাঠকরা কি নতুন স্বাদের কিছু পেতে চলেছে আপনার কলম থেকে ? 

.

মলয় রায়চৌধুরী : তোরা তো আমার লেখাপত্র যোগাড় করে পড়িস না । কমার্শিয়াল পত্রিকায় আমার লেখা বেরোয় না যে হাতে পাবি। ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লেভেল-জামপিং আর ফ্রো-টু আঙ্গিক দেবার কাজ করেছি । ‘ঔরস’ উপন্যাসে ফর্ম ভেঙে মানুষের পাশাপাশি মাছিদেরও টিভি সাংবাদিকের চরিত্র দিয়েছি । ‘গল্পসংগ্রহ’তে বিভিন্ন জীবজন্তু পাখিপাখালিকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মানুষের ভূমিকা দিয়েছি । চটকল আর পাটচাষের দুর্দশা নিয়ে ‘নখদন্ত’ উপন্যাসটায় ডায়েরি, নোটস, সত্য ঘটনা আর কাহিনির মিশেল দিয়েছি । ‘জঙ্গলরোমিও’ নামে একটা উপন্যাস পুজোর সময় প্রকাশিত হবার কথা, যার গল্প একদল ক্রিমিনালদের নিয়ে, সেখানে কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাদের সংলাপের ঢঙই তাদের পরিচয়। এলেকট্রা কমপ্লেক্স নিয়ে একটা নভেলাও প্রকাশিত হবে পুজোর সময় বা পরে, তাতেও ফর্মের নিরীক্ষা করেছি ।

( মায়াজম ব্লগজিনে প্রকাশিত )

Posted in Uncategorized | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উৎপল ত্রিবেদী

উৎপল : খুব সংক্ষেপে হাংরি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন ।

মলয় : ১৯৬০ সালে সাধারণভাবে ভারতের এবং বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার উত্তর-ঔপনিবেশিক সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনেটিক অবস্হা যা হয়েছিল, দেশভাগের অজস্র ঘরভাঙা মানুষদের দেখতে-দেখতে এবং সেই সময়ের বাংলা কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয়েছিল একটা সম্পূর্ণ ওলোট-পালোট দরককার । ১৯৬১ সালে অক্টোবরে আমি, দাদা সমীর রায়চৌধুরী, দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং আমার বন্ধু হারাধন ধাড়া ( দেবী রায় ) সবাই মিলে হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনা করি । ১৯৬১ সালের পয়লা নভেম্বর পাটনা থেকে আমি ইংরেজিতে একটা বুলেটিন ছাপিয়ে দেবী রায়কে পাঠাই ; উনি কলকাতায় বিলি করার পরই তুমুল চর্চা আরম্ভ হয় এবং ক্রমে প্রায় তিরিশ জন আন্দোলনে যোগ দেন । প্রথম বুলেটিন ইংরেজিতে ছাপাতে হয়েছিল, তার কারণ পাটনায় বাংলা প্রেসগুলো কেবল উপনয়ন, বিয়ে আর শ্রাদ্ধর কার্ড ছাপতো । হাংরি শব্দটা আমি পেয়েছিলুম জিওফ্রে চসারের ‘ইন দ্য সাওয়ার হাংরি টাইম’ থেকে আর দার্শনিক বনেদটা পেয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের সংস্কৃতি বিষবক বিশ্লেষণ থেকে ।

উৎপল : কোন তাড়না থেকে আপনার কবিতার জগত এবং হাংরি আন্দোলন নিয়ে জড়িয়ে পড়া ?

মলয় : কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলুম ১৯৫৯-৬০ নাগাস । দাদা সিটি কলেজে পড়তেন এবং তিরিশের দশকের কবিদের আর কল্লোলের লেখকদের বই এনে দিতেন । উনি মামার বাড়ি পাণিহাটিতে থাকতেন এবং ছোটোমামার মার্কসবাদী ভাবনা-চিন্তায় প্রভাবিত হয়েছিলেন । পরে বিহারের জাতপাতের প্রেক্ষিতে ওনার মনে হয়রছি যে বাস্তব সমাজের সঙ্গে তা খাপ খাচ্ছে না । ১৯৬০ সালে আমি এই মর্মে “মার্কসবাদের উত্তরাধিকার” নামে একটা বই লিখেছিলুম, যার প্রকাশক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় । ১৯৬৩ সালে আমার কাব্যগ্রন্হ “শয়তানের মুখ” কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । তোমার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর আগেই দিয়েছি ।

উৎপল : ১৯৬৪ সাল । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ লেখার পর আপনার নামে আদালতে মামলা হলো । বাংলা সাহিত্যে বোধহয় এই প্রথম কোনও কবিকে অশ্লীলতার দায়ে প্রকাশ্যে হাতে হাতকড়া ও কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এই যে শুধু কবিতার জন্য জেল খাটা, একের পর এক মামলায় রাষ্ট্র আপনাকে নাজেহাল করে দেয়া — এই মুহূর্তে সেই বিষয়গুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন ?

মলয় : একটা ব্যাপার বেঝতে পেরেছিলুম যে যাবতীয় লড়াই একজনকে একাই লড়তে হয় । সুবিমল বসাক ছাড়া আর কারোর সঙযোগীতা তখন পাইনি । এখন এটা নিয়ে বিশেষ ভাবি না ; তবে শৈলেশ্বর ঘোষ আর ওনার শিষ্য সব্যসাচী সেন যেভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে চলেছেন, তাতে বিরক্ত বোধ করি । আর এনাদের দুজনকে উৎসাহ জুগিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ, দে’জ থেকে বিকৃত ইতিহাস প্রকাশ করিয়ে, তাতে তাঁরও লেখা আছে, আরও অনেকের লেখা আছে যারা হাংরি আন্দোলনে ছিল না । অথচ ওই বই থেকে যারা আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল তাদের সবাইকে বাদ দেয়া হয়েছে ।

উৎপল : সমীর রায়চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে আরও কুড়িটা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে” — পরবর্তীতে কোন আন্দোলনে হাংরির প্রভাব আছে বলে আপনার মনে হয় ?

মলয় : নিম সাহিত্য, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, অপরসাহিত্য, নতুন-কবিতা, কংক্রিট কবিতা, ভাষাবদলের সাহিত্য, অধুনান্তিক সাহিত্য, উত্তরআধুনিক সাহিত্য — এরকম বেশ কয়েকটা, সবগুলো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না ।

উৎপল : বর্তমান সমাজ ব্যবস্হায় হাংরি আন্দোলনের প্রভাব কি ফুরিয়েছে ?

মলয় : হাংরি আন্দোলন ছিল একটা ক্রোনোট্রপিকাল ( সময়/পরিসর ) ঘটনা । আন্দোলন তার কাজ করে গেছে । ত্রিপুরা, উত্তরবঙ্গতেও কবিরা সেসময়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন । যেমন সুররিয়ালিজম, ডাডাবাদ, ইমেজিজম, ফিউচারিজম, কিউবিজম ইত্যাদি আন্দোলন কবেই শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তারা এখনও ভেতরে-ভেতরে কাজ করে চলেছে । তারা যখন আবির্ভূত হয়েছিল, তখন তাদের বিশেষ প্রয়োজন ছিল । তেমনিই হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ওই সময়ে ।

উৎপল : আন্দোলনের একপর্যায়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় রাজসাক্ষী হন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবী রায় প্রমুখ পিছুটান দেন এবং আপনাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপপ্রচার চালান । আপনি এ বিষয়গুলো কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন ?

মলয় : শক্তি রাজসাক্ষী ছিলেন না, আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন, যেমন ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিলেন শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ, যা ওরা চেপে গিয়ে বহুকাল আমার বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে । আমেরিকা থেকে সন্দীপনকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি থেকে জানা গেছে যে সুনীল ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করা হয়েছে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীকে ভেঙে ফেলার জন্য । এটা বোকার মতন কথাবার্তা । উনি বিদেশে বসে বোধহয় ভাবছিলেন কলকাতায় সবাই লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে, ওনার জন্যে খুদকুঁড়োও থাকবে না । আমার কেস যখন আদালতে চলছে, উনি কেসের সাবজুডিস অবস্হায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন । আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা অ্যালেন গিন্সবার্গের চিঠি থেকে এখন জানা গেছে যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন পুলিশের নির্দেশে । দেবী রায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ছাড়া পান, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে ওনার ক্রোধের কারণ মামলার কারণে চাকরি চলে যাবার ভয় । উনি সেসময়ে বস্তিতে থাকতেন, গরিব পরিবারের লোক, বলেছিলেন যে চাকরি চলে গেলে আত্মহত্যা করতে হবে । অপপ্রচার তো এখনও বজায় আছে । কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না । আমি তো নিজের যেমন ইচ্ছে দিব্বি লেখালিখি করে যাচ্ছি । এই ধরণের নোংরা ব্যাপার পৃথিবীর সব সাহিত্যসমাজে হয়ে এসেছে আর চলছে । আমাদের এখানে পণ্যসাহিত্যের আনন্দবাজারি কারবারের কারণে তা পচে পোকাধরা লাশ হয়ে গেছে ।

উৎপল : বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সেসময়ের কার্যকলাপে ডাডাবাদের প্রভাব লক্ষ করেছেন বলে সমালোচনা করেন । এই কারণে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,  সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন । এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী ?

মলয় : না, না, সন্দীপন আন্দোল ছাড়েন পুলিশের হুমকির কারণে । ওনাকে, শক্তিকে, উৎপলকে গ্রেপ্তার করার হুমকি দিয়েচিল পুলিশ । আনন্দবাজারের মাধ্যমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও চাপ দিচ্ছিলেন ওনাদের । উৎপলের তো যোগমায়া দেবী কলেজে লেকচারারের চাকরিও চলে গিয়েছিল ; তারপর অ্যালেন গিন্সবার্গের সুপারিশে লণ্ডনের একটা স্কুলে চাকরি পান । সতীন্দ্র ভৌমিক হাংরি আন্দোলনে ছিলেন না । উনি ‘এষণা’ নামে একটা পত্রিকা বের করতেন । ১৯৬৩ সালে সেই পত্রিকায় শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা পড়ে আমি দেবী রায়ের মাধ্যমে শৈলেশ্বরকে হাংরি আন্দোলনে এনেছিলুম । শৈলেশ্বরের সঙ্গে একই ঘরে থাকতো । আর ডাডাবাদের প্রভাব সম্পর্কে বলি, আগে যে সমস্ত আন্দোলন বা লেখালিখি হয়ে গেছে তাদের প্রভাব পরের লেখালিখিতে থাকবেই ।

উৎপল : অচলায়তন ভাঙার যে শ্লোগান দিয়ে হাংরি আন্দোলন শুরু করেছিলেন, আপনার কি মনে হয় তা স্তিমিত হয়ে গেছে অথবা আজও চলছে ?

মলয় : সিপিএম সরকার আসার পর প্রমোদ দাশগুপ্ত সারা পশ্চিমবাংলায় যে স্ট্যালিনিস্ট নেটওয়র্ক গড়ে তুলেছিলেন, যেটা পরিশ্রম না করেই পরের সরকার পেয়ে গেছে, তারা তো অচলায়তনের পাইক-বরকন্দাজের রক্তচোষার দিগ্বিজয় আরম্ভ করে দিয়েছিল । বিধবা মায়ের মুখে ছেলের রক্তমাখাভাত গুঁজে দিয়েছে, পেট্রল ঢেলে সাধু-সন্ন্যাসীদের পুড়িয়েছে, জিপগাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে মহিলা অফিসারদের গণধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে, গ্রামবাসীদের খুন করে বা জ্যান্ত মাটির তলায় পুঁতে দিয়েছে । ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে ফেলেছিল সাহিত্যিকরা ; সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত সুযোগ বুঝে সিপিএমে ঢুকে পড়েছিল । আমি এই ভয়াবহ অবস্হা সম্পর্কে আমার “পোস্টমডার্ন কালখণ্ড ও বাঙালির পতন” পুস্তিকায় বিশ্লেষণ করেছি । এখন বহু সাহসী যুবক-যুবতীদের দেখা পাই, যারা আমাদের পতাকা এগিয়ে নিয়ে চলেছে ।

উৎপল : আপনি একজন অবস্হাপন্ন পরিবারের সন্তান । বাবা কাকা সরকারি চাকরি করতেন । তাঁদের দৃষ্টিতে ‘অশ্লীল’ কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন । সে সময়ে আপনার পপতি বাড়ির প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল ?

মলয় : আমি অবস্হাপন্ন বাড়ির ছেলে কে বলল তোমায় ? বংশটা সাবর্ণ চৌধুরী বলে অনেকে মনে করেন অবস্হাপন্ন । সাবর্ণ চৌধুরীরা উত্তরপাড়ায় রিকশ চালাচ্ছে দেখতে পাবে তুমি । আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা পো” পোড়ো । ছোটোবেলায় আমরা থাকতুম পাটনা শহরের অন্ত্যজ বিহারি আর অত্যন্ত গরিব মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা পাড়ায় । পাড়ার নিবাসীরা ছিল চোর, ডাকাত, পকেটমার ইত্যাদি। দাদা যাতে না কুসঙ্গে পযে খারাপ হয়ে যায় তাই কলেজে পড়ার জন্য দাদাকে মামার বাড়ি পাণিহাটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল । কুড়িজনের পরিবারে বাবা ছিলেন একমাত্র রোজগেরে । ওনার ফোটো তোলার আর ফোটো থেকে ছবি আঁকার দোকান ছিল পাটনা শহরে । পরে বড়ো জেঠা পাটনা মিউজিয়ামে পেইনটিঙ আর মূর্তি ঝাড়পোঁছের চাকরি পেয়েছিলেন, ক্লাস ফোর স্টাফ । ছয় ভাই একবোনের পরিবারে জেঠা-কাকারা কোনও কাজ করতেন না । উত্তরপাড়ার বসতবাড়ির ট্যাক্স আর ঠাকুমার খাইখরচও বাবাকে পাঠাতে হতো প্রতি মাসে ।আমাদের পোশাক আর জুতো কেবল পুজোর সময়ে কেনা হতো ।  দাদা খেলতে গিয়ে জুতো হারিয়ে আসতো আর সারা বছর খালি পায়ে স্কুলে যেতো । আমাদের বাড়ি চিল ফোটোগ্রফার-আর্টিস্টের । জেঠা কাজ করতেন মিউজিয়ামে । তাই শ্লীলতা সম্পর্কে মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতায় বাড়ির লোক ভুগতেন না । মামলার সময়ে কলকাতার আদালতে বাবা-জেঠা-পিসেমশায় আসতেন সাহস যোগাবার জন্যে ।

উৎপল : সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল কীভাবে নির্ধারিত হয় ? অশ্লীলতার মাপকাঠি আদৌ কি আছে ?

মলয় : ইংরেজরা আসার আগে আমাদের সাইত্যবোধে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদ ছিল না । ধাকলে বাৎসায়ন, জয়দেব, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্র  আমাদেরভাষায় হতে পারতেন না, কবিয়ালদের আবির্ভাব হতো না । খাজুরাহো, কোণারক, পুরীর মন্দিরের স্হাপত্য হতো না । অলঙ্কারশাস্ত্রে প্রথম রসই তো আদিরস । সাম্রাজ্যবাদীরা এসে তাদের ভিকটোরীয় মূল্যবোধ চাপিয়ে দিয়ে গেছে ; তা থেকে বেরোবার আর উপায় নেই । এখন তো বিজেপির লোকেরা শ্লীল-অশ্লীলের বিচারক হয়ে দাঁড়িয়েছে । কোনো লেখায় ভাষার কাজ থাকলে, তা যদি পাঠককে উত্তেজিত করেও, তাকে অশ্লীল বলা চলে না ।

উৎপল : এ পর্যন্ত আপনার কাব্যগ্রন্হ, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা কতগুলো ?

মলয় : সত্তরটার মতো হবে । আমি বইপত্র সংগ্রহে রাখি না, তাই সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না । আমার সম্পর্কে পিএইচডি করেছেন বিষ্ণুচন্দ্র দে, উনি এই সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে রেখেছেন ।

উৎপল : আপনি প্রথম প্রেমে পড়েছিলেন যা নারীর, তাঁর সম্পর্কে কিছু বলুন । সেটা কোন সময়ে ?

মলয় : সময়টা ১৯৫৪-৫৬ । নারী বলা ভুল হবে । তিনি ছিলেন স্কুলছাত্রী । তাঁর সমর্থনে মারপিট করতে গিয়ে আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে । কিন্তু ওনার পরিবার কোনোকিছু না জানিয়েই হঠাৎ পাটনা থেকে উধাও হয়ে যান। আমার উপন্যাস ‘রাহুকেতু’তে আমি লিখেছি এই বিষয়ে । গাঙচিল থেকে প্রকাশিতব্য আমার রচনাসংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ডে আছে । ( গাঙচিল মলয়বাবুর রচনাবলী কোনও রহস্যজনক কারণে প্রকাশ করতে অস্বীকার করে )।

উৎপল : নতুন যারা লেখালিখির জগতে আসছে, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী ?

মলয় : যেমন ইচ্ছের তেমন লেখো, প্রচুর পড়াশুনো করো, একা থাকার চেষ্টা করো, ডায়েরি রাখো, আর অবশ্যই মনে কিছু এলেই তক্ষুনি লিখে রাখো, পরে প্রয়োগ করার জন্য ।

উৎপল : এই সময়ে বিশ্বকাব্যে বাংলা কবিতার স্হান কোথায় বলে মনে করেন ?

মলয় : পোয়েট্রি, প্যারিস রিভিউ, লণ্ডন ম্যাগাজিনের কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে পারি, বাংলায় যা লেখা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক কবিতার স্তরে । দুর্ভাগ্য যে অনুবাদ হয় না, যোগ্য অনুবাদক নেই । বিদেশে কবিতা একটা অ্যাবসট্র্যাক্ট আঙ্গিক নিয়েছে, বাংলা কবিতায় অ্যাবসট্র্যাক্ট কবিতা লেখার ধারা তো চলছে নানা কবিতার পাশাপাশি ।

উৎপল : হাংরি ইশতাহারের একটা পয়েন্ট ছিল, “আত্মআবিষ্কারের পর লেখা আর আঁকা ছেড়ে দেওয়া হবে”—এই নীতি আপনারা কতোটুকু মেনে চলেছেন ?

মলয় : সেসময়ে মনে হয়েছিল জীবনের কোনো একটা সময়ে আত্মআবিষ্কার সম্ভব । এখন বুঝতে পারি যে বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে জীবনে এতোপ্রশ্ন জমতে থাকে যে তার উত্তর দেয়া অসম্ভব । ফলে, আত্মআবিষ্কার শেষ হয় না, আরও কঠিন হয়ে উঠতে থাকে ।

উৎপল : গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে উগ্রপন্হীদের হাতে খুন হয়েছেন অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, নিলয় নীল, ওয়াশিকুর রহমান বাবু প্রমুখ মুক্তমনা ব্লগারদের । ভারতেও গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবার্গিকে হত্যা করেছে কট্টর হিন্দুবাদীরা । সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিপন্ন । আপনার কি মনে হয় না যে শেষ অবধি উগ্রপন্হা এই শতাব্দীর চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়াবে ?

মলয় : হ্যাঁ, তাই মনে হয়, এবং তার ফলে একসময়ে কোনো দেশ আণবিক বোমা ব্যবহার করে ফেলবে, যার দরুন হয়তো বিশ্বযুদ্ধও বেধে যেতে পারে ।

উৎপল : কাশ্মীরের মানুষ ভারত রাষ্ট্রের শোষণ, অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে, লড়াই করছে রাষ্ট্রের সেনার সাথে । কাশ্মীরিরা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে চায় । আপনি কাশ্মীরের এই আজাদির লড়াইকে কীভাবে দেখছেন ?

মলয় : আমি চাকুরিসূত্রে জম্মুকাশ্মীরে গেছি । হোটেলে পৌঁছোতেই দুজন কাশ্মীরি যুবক ভুল করে আমাকে সাংবাদিক ভেবে গাড়ি নিয়ে এসেছিল বারামুলা নিয়ে যাবার জন্য । পরে, জম্মু ফেরার যে বাসে বসেছিলুম, তার পেছন দিকে বোমা ফেটে আমার অধস্তন অফিসাররা আহত হয়েছিল । আর পি এফের লোকেরা আমাকে আপেল আর আখরোট নিয়ে মুম্বাই ফিরতে দেয়নি । বলেছিল, নিয়ে গেলে এদের সাহায্য করা হবে । তখনই অবস্হাটা ব্যক্তিগতভাবে আঁচ করতে পেরেছিলুম । কাশ্মীর একটা ছোট্ট জায়গা, জম্মু আর লাদাখ থেকে আলাদা, সুতরাং সেখানের লোকেদের স্বাধীনতা দেয়ার অসুবিধা হবার কথা নয় । কিন্তু ভারতে হিন্দুত্ব একটা কায়েমি স্বার্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে ; ভারতীয় পুঁজিবাদের দোসর হয়ে গেছে । কাশ্মীর পাকিস্তানে ঢুকলেই সারা দেশে দেশভাগের সময়ের চেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা আরম্ভ হবে । পাকিস্তান আর ভারত একসঙ্গে বসে ওদের স্বাধীনতার আর ওদের ব্যাপারে নাক না গলাবার গ্যারেন্টি দিলে সুরাহা সম্ভব । জেনারাল মুশররফ নাকি এরকমই একটা পরিকল্পনা ফাইনাল করে ফেলেছিলেন বাজপেয়ির সঙ্গে আলোচনায় । সমস্যা হলো ভারতীয় এসট্যাবলিশমেন্ট পাকিস্তানের সরকারকে বিশ্বাস করে না ।

( ‘কবিতার দেশে’ পত্রিকার বৈশাখ ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত )

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তপন মণ্ডল অলফণি

তপন: কেমন আছেন ? এই ৭৮টি ক্যালেণ্ডারের পাতা ওল্টানোর পর ? 

মলয় : ভালো নেই হে । নানা ব্যারাম ধরেছে বুড়ো বয়সে । তার ওপর স্ত্রীও অসুস্হ থাকে বেশির ভাগ সময়। সাহায্য করার কেউ নেই । ছেলে আর মেয়ে বিদেশে, নমাসে-ছমাসে অবশ্য আসে কিন্তু ওদের খাবার-দাবারের সঙ্গে আমাদের পরিপাক শক্তি খাপ খায় না । কাজের বউরা মারাঠি এখানে, ওদের হাতের রান্নার গন্ধ আর স্বাদ একেবারে আলাদা, মিষ্টি জলের মাছ রাঁধতে পারে না, চার্জও অনেক, তাই নিজেরাই যাহোক করে চালাই বুড়ো-বুড়ি মিলে । যেদিন ক্লান্ত বোধ করি সেদিন চিনা, পাঞ্জাবি বা মোগলাই হোটেলে অর্ডার দিয়ে খাবার আনাই। ডেইলি হোম ডেলিভারির খাবারে এতো তেল-মশলা থাকে যে অম্বল হয়  । নাকতলার তিনতলার ফ্ল্যাটটা বেচার সময়ে দাদাকে বলেছিলুম, তোমার ওপরতলাটা ভাড়া দাও । তা বউদি বললেন, কোথাও একতলা ভাড়া করে থাকগে যাও। ছেলের এই ফ্ল্যাটটা ফাঁকা পড়েছিল মুম্বাইতে, চলে এলুম । বউদি পরে নিজের জামাইকে বলেছিলেন, “মলয়দের ভাড়া দিলে পরে প্রবলেম হতো” । কী প্রবলেম হতো কে জানে ! আমি তো পাটনার বাড়ির ভাগ চাইনি, সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলুম ।

তপন : ১৯৩৯ সালে বিহারে পাটনায় জন্ম, তারপর কোলকাতা, এখন মুম্বাই । এই চরাচর কি কবিতার টানে না কর্মসূত্রে ?

মলয় : পাটনায় জন্মালেও, শৈশবে থেকেছি আদিবাড়ি উত্তরপাড়ায়, মামার বাড়ি পাণিহাটি, মাসিমার বাড়ি নিমতা, পিসিমার বাড়ি আহিরিটোলা আর বড়োজেঠিমার বাড়ি কোন্নগরে, কেননা পাটনায় ইমলিতলার বাড়িতে আমার বড্ডো শরীর খারাপ হতো, ডিগডিগে ছিলুম, পাড়ার গরিব  ছন্নছাড়া শিয়া মুসলমান আর বিহারি অন্ত্যজদের সঙ্গে খেলতুম, তাড়ি খেতুম,  তাদের দেখাদেখি নর্দমা থেকে বল, লাট্টু, ড্যাংগুলি, বেলুন কুড়োতুম, আর শরীর খারাপ হতো । আমার শৈশবস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে জানতে পারবে । হাংরি আন্দোলন মামলার পর পাটনায় রিজার্ভ ব্যাংকের চাকরি  থেকে  লখনউ চলে  গিয়েছিলুম এআরডিসিতে সিনিয়ার অ্যানালিস্ট হিসাবে, লখনউ থেকে মুম্বাই নাবার্ডে গ্রামীণ উন্নয়ন অফিসার হয়ে, তখন বোম্বে ছিল, তারপর কলকাতা অফিসে ডেপুটি জেনেরাল ম্যানেজার, আর অবসর নিয়ে মুম্বাই, মূলত চিকিৎসার সুবিধার জন্য আর সাহিত্যিক দলাদলি এড়াবার জন্য,  হাঁপানি সারাবার জন্য, চিকিৎসার খরচ মুম্বাইতে কাৎ করে দেয়। কবিতা লেখার টানে কখনও আস্তানা পালটাইনি, যদিও একবার যে বাড়ি ছেড়েছি সেখানে আর দ্বিতীয়বার ফিরে যাইনি। সারা দেশ ঘুরেছি অফিসের কাজে, প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে, লেখার কাজে লাগিয়েছি সেসব ।

তপন : কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, অনুবাদক, সাংবাদিকতা — এর থেকে যদি বলি সবচেয়ে প্রিয় গোলাপটা তুলতে, কোনটা তুলবেন এবং কেন ? অর্থাৎ ভালোলাগার কারণ কী ?

মলয় : কবিতা ভালো লাগে, কবিতা দিয়েই তো লেখালিখি শুরু করেছিলুম । কবিতা ভাল্লাগে কেননা লিখে কাউকে পড়াবার তাগিদ থাকে না, নিজেই পড়ে মশগুল থাকা যায়, যা লিখি তা না ছাপতে দিলেও চলে । অন্যান্য জনারগুলোর জন্য পাঠক দরকার। প্রবন্ধ তো চিরকাল সম্পাদকদের অনুরোধে লিখেছি । প্রথম উপন্যাসও লিখেছিলুম দাদা সমীর রায়চৌধুরীর অনুরোধে । উনি বলেছিলেন নিজের জীবনের যে নৈরাজ্যমূলক সময় কাটিয়েছিলিস, সেই সময়কার বিহারের বন্ধুদের আর ঘটনাগুলো নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে । “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” লিখেছিলুম, সেই কাহিনিই  পরপর এগিয়ে নিয়ে গেলুম ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘ঔরস’ আর ‘প্রাকার পরিখা’ উপন্যাসে । তবে গোলাপ আমার তেমন পছন্দ নয় ; আমার ভালো লাগে কাঁঠালিচাঁপা ।

তপন : সাহিত্যচর্চায় কেন এলেন যেখানে আপনার বাবা শ্রদ্ধেয় রঞ্জিত রায়চৌধুরী একজন গুণী চিত্রশিল্পী এবং আপনার ঠাকুরদা ভারতবর্ষের প্রথম ভ্রাম্যমান আলোকচিত্রশিল্পী ছিলেন ?

মলয় : বাবা চাইলে আমাকে ছবি আঁকা শিখতে পাঠাতে পারতেন, ম্যাট্রিক পাশ করার পর । পাটনায় ছবি আঁকা শেখার তেমন সুবিধা ছিল না । সেই জন্য হয়তো । উনি ছিলেন স্বশিক্ষিত ; ফোটো তুলে বিহারের জমিদারবাড়ির লোকজনদের পেইনটিঙ আঁকতেন । বড়োজ্যাঠাও প্রচুর পেইনটিঙ এঁকেছিলেন, দাদার ছেলেরা সেসব ফেলে দিয়েছে । আমার মনে হয় বাবা নিজের হাড়ভাঙা খাটুনির অভিজ্ঞতার দরুন আমাকে বা দাদাকে ছবি আঁকার লাইনে পাঠাননি । অত্যধিক খাটুনির জন্য ওনার প্লুরিসি হয়ে গিয়েছিল, কুড়িজনের সংসার একা সামলাতে হতো । সাহিত্য চর্চায় কেন এলুম তার কারণ সম্ভবত ব্রাহ্ম স্কুলের পার্টটাইম গ্রন্হাগারিক উঁচু ক্লাসের ছাত্রী নমিতা চক্রবর্তীর টানে, ওনার গালে টোল পড়ত, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, ক্রাশ ডেভেলাপ করে ফেলেছিলুম, উনি কবি-লেখকদের বই নিজে বাছাই করে পড়তে দিতেন, বেশির ভাগই ব্রা্হ্ম লেখক-কবিদের, ব্যাস, আপনা থেকেই কবিতা লিখতে আরম্ভ করলুম, তারপর অন্য জনারগুলোয় আকৃষ্ট হলুম । কলেজে থাকতে ইংরেজি বই বেশি পড়তুম, কেননা প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পড়েছিলুম। আর ষাটের দশকে জগতজুড়ে তরুণ-যুবক ছাত্ররা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, সেসব খবর পাচ্ছিলুম। ঠাকুরদাকেও প্রচুর খাটতে হতো, কম বয়সে মারা যান, আট ছেলে-মেয়েকে পথে বসিয়ে । টাকার অভাবে ঠিক সময়ে সারানো হয়নি বলে উত্তরপাড়ার বারো-ঘর চার-সিঁড়ির আদিবাড়ি রূপান্তরিত হয়েছিল খণ্ডহরে ; এখন সেটা আবাসন হয়ে গেছে, আমি আমার অংশ বেচে দিয়েছি ।

তপন : আপনি তো ষাটের দশক থেকে সাহিত্যজগতে এসেছেন ; সেই সময়ের কবিতাভাবনা কেমন ছিল আর এখন কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেন ?

মলয় : ষাটের দশকে কোনো একটিমাত্র কবিতার ধারা ছিল না, কেননা আমাদের হাংরি আন্দোলনের কনফেশানাল ও প্রোটেস্ট এবং ডিসেন্টিং পোয়েট্রির পাশাপাশি শ্রুতি আর নিমসাহিত্য আন্দোলনের কবিরা নিরীক্ষামূলক কবিতে লিখতেন, বিশেষ করে শ্রুতির মৃণাল বসুচৌধুরী, পুষ্কর দাশগুপ্ত, পরেশ মণ্ডল, সজল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ । নিমসাহিত্যের রবীন্দ্র গুহ, মৃণাল বণিক, বিমান, ওনারাও নিজেদের একটা ভাবনার এলাকা চিহ্ণিত করে ফেলেছিলেন । ক্রমশ সাত, আট, নয়, শুন্য দশকের কবিরা নানা রকম আঙ্গিক আর ভাঙন নিয়ে এলেন, কবিতাকে রাইজোম্যাটিক করে তুললেন ।  শম্ভু রক্ষিত আর বারীন ঘোষাল তো  বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন । পরে অলোক বিশ্বাস, ধীমান চক্রবর্তী কবিতাকে যে আদল দিলেন তা এক বাক্যে বোঝানো কঠিন । অনুপম মুখোপাধ্যায় নতুন ধরণের কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন, যাকে উনি বলছেন ‘পুনরাধুনিক’, নিজের একটা আলাদা এলাকা গড়ার জন্য ; জয়িতা ভট্টাচার্যও ‘পুনরাধুনিক’ আদল-আদরায় লিখছেন । সোনালী মিত্র নারীবাদের এলাকা ডিঙিয়ে চলে গেছেন যোনিজ কবিতার দিকে, বলা যায় তা একটা চ্যালেঞ্জ । এখনকার কবিতায় লেভেল জাম্পং, লজিকাল ক্র্যাক, কাইনেটিক ইমেজারিজ বেশি, লাইনের ফ্লাক্সও বেশি । 

তপন : ষাটের দশকের কোন কোন কবির কবিতা আজও আপনাকে টানে ?

উত্তর : আর তো পড়িই না বলা চলে । স্মৃতিতে রয়ে গেছে কিছু ছাপ, তা থেকে মনে আসে ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, শামসের আনোয়ার, কেদার ভাদুড়ি, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের  নাম ।

তপন : ষাটের দশকের থেকে এসময় দীর্ঘদিন কবিতাযাপন কবিতার মধ্যে কী পরিবর্তন ঘটেছে ?

মলয়:: আমার কবিতার কথা বলছ ? আমি তো কোনো নিয়মনীতি মেনে লিখি না । লিখতে বসে যথেচ্ছাচার করি, ভাঙচুর করে এগোই । সমাজ এখন এমন অবস্হায় পৌঁছেচে যে যারা দায়ি তাদের আক্রমণ না করে থাকতে পারি না । ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ আর ‘ফিল-গুড’ হাট্টিমাটিম টিম কবিতা আমি লিখতে পারি না । তাছাড়া আর্থাইটিসের আক্রমণে আঙুল অকেজো হয়ে যাবার ফলে ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কিছু লিখতেই পারিনি, তখন পড়েছি প্রচুর কবিতা । কমপিউটারে টাইপ করা শেখার পরে যখন আবার কবিতা লেখা আরম্ভ করলুম, ইমেলের বডিতে কিংবা গুগল ড্রাইভে লিখে রেখে দিই । কবিতা কেউ চাইলেই পাঠিয়ে দিই, কোনো দলাদলি করি না । উপন্যাস আর প্রবন্ধও গুগল ড্রাইভে লিখে রাখি । একটা ব্যাপার তোমায় বলি, বয়স হবার দরুণ আজকাল স্মৃতি গোলমাল হতে থাকে ।

তপন : আজ কি সাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরীর খবর কেউ নেয় ?

মলয় : আমার ব্লগের পাঠক-সংখ্যা থেকে তো মনে হয়  অনেকেই নেয়, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকায় বেশি । বিদেশে যে এতো বাঙালি সাহিত্যানুরাগি আছেন তা আগে জানতুম না । তাছাড়া ২০০৭ সাল থেকে বেশ কয়েকজন পিএইচডি আর এমফিল গবেষণা করেছেন-করছেন এদেশে-বিদেশে ; হিদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা, বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন । অনেকে দেখা করতে আসেন; বিবিসিতে দুটো অনুষ্ঠান হয়েছে । একটা ইংরেজি উপন্যাসে সংলাপে দেখলুম আমার নাম উল্লেখ করে আলোচনা করছে চরিত্ররা । জিৎ থাইল ওনার ‘চকোলেট সেইন্টস’ আধা-ফিকশানে আমাকেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন । পুজোর সময়ে বিদেশের নামকরা প্রকাশনী থেকে ইংরেজিতে ‘ দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটা বইও বেরোবে এক ফিকশান রাইটারের লেখা, যাতে আমি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । কলকাতার এক দম্পতি একটি বই লিখছেন আমাদের আন্দোলন নিয়ে, ইংরেজিতে, পরের বছর বেরোবে, তাতে আমাদের সবায়ের লেখার অনুবাদও থাকবে, সবায়ের মানে সব্বায়ের । তাছাড়া ফেসবুকে আমার দুটো প্রোফাইলে দশ হাজার বন্ধু আর পনেরো হাজার ফলোয়ার হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে অন্তত কিছু “বন্ধু” আমার সাহিত্যিক পরিচয় জানে বলেই মনে হয়, তবে বন্ধুদের চেয়ে আমার বান্ধবীর সংখ্যা এই বুড়ো বয়সেও বেশি । আমার তো মনে হয় একশো পাঠক পেলেই যথেষ্ট, যখন কিনা আমি কমার্শিয়াল পত্রিকায় লিখি না । সাধারণ পাবলিক হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে জেনেছে সৃজিৎ -এর ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্ম থেকে, যাতে গৌতম ঘোষ একজন হাংরি আন্দোলনকারীর অভিনয় করেছিলেন,  যে কিনা কবিতা ছাপাবার জন্য হন্যে হয়ে পাগলামি করে,  আর বইমেলায় আগুন ধরিয়েছিল । গৌতম এরকম ইডিয়টিক ভূমিকায় অভিনয় করতে রাজি হলেন কেন জানি না, ওনার সঙ্গে তো সুবিমল বসাকের আলাপ ছিল, আমাদের বইটইও পড়েছিলেন । তবে ফিল্মটায় লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক এক টেকো খোচর দেখানো হয়েছে, সেটা কারেক্ট, কেননা পবিত্র বল্লভ নামে অমন এক টেকো খোচর কফিহাউস থেকে আমাদের বুলেটিন আর পত্রিকা নিয়ে গিয়ে লালবাজারে প্রেস সেকশানে জমা দিত, আমার বিরুদ্ধে ভুয়ো সাক্ষীও হয়েছিল, শুনেছি ওর সঙ্গে বাসুদেব দাশগুপ্তর দহরম-মহরম ছিল, অথচ বাসুদেব কখনও আমাকে সতর্ক করেনি।

তপন : আপনি দীর্ঘ কর্মজীবনে ভারতবর্ষের বিভিন্ন গ্রামীণ চাষি, তাঁতি, জেলে, হস্তশিল্পীদের মধ্যে কাটিয়েছেন । কখনও কি মনে হয়েছে এই মানুষগুলোর মধ্যে কবিতা লুকিয়ে আছে ?

মলয় : আরে,  বেশির ভাগ পরিবারের এমন দুরাবস্হা যে একবেলা খেয়ে থাকতে হয় । বহু গ্রামে গিয়ে আখের খেতে, নদীর ধারে, ঢিবির আড়ালে বসে হাগতে হয়েছে । অবুঝমাঢ়ে তো গাছের ফল, জংলি জানোয়ার, পোকা আর মাদক খেয়ে জীবন কাটাতে দেখেছি । বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন দেয়া হয়েছিল হিমালয়ের তরাইতে আর দণ্ডকারন্যে, তাদের মাতৃভাষা বলে কিছু বাকি নেই, খিচুড়ি । আমি তো ধনীদের বা মধ্যবিত্তদের জন্য গ্রামেগঞ্জে যেতুম না। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জে গেলে স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যেতুম যাতে ও রান্নাঘরে ঢুকে সঠিক পরিস্হিতির খবর দিতে পারে । অনেক বাড়িতে রাতে রান্নাই হয় না । একটা আদিবাসী গ্রামে আমাদের আতিথেয়তা করা হয়েছিল বেগুনপোড়া খাইয়ে । তাদের নিয়ে কবিতা আমিই লিখেছি । তবে কেরালায় মাছ-ধরিয়ে পরিবারের এক মালায়ালি যুবক কেমন করে জানতে পেরেছিল আমি লেখালিখি করি, সে আমায় তার মালায়ালাম কবিতা শুনিয়েছিল, নিজেই তার ইংরেজি অনুবাদ করে শুনিয়েছিল । কেরালা রাজ্যের প্রকৃতি দেখে মনে হয় সত্যিই “গডস ওন কান্ট্রি” । ইউরোপে চাষিদের দেখে মনে হয়েছিল ওদের খেতখামারে গরিব আর নেই, কতো আধুনিক ওদের চাষবাস ।

তপন : আপনার সাহিত্যভাবনার মধ্যে ধরা পড়ে চিরাচরিত ধারণার অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ । এই যে আগল ভাঙার লড়াই — এই ধারণা আপনার মনে ঠিক কোন কারণে এলো ?

মলয় : তাই বলছিলুম যে “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” ব্‌ইটা পড়তে । অত্যন্ত গরিবদের যে ইমলিতলা পাড়ায় থাকতুম, তারা চুরি ডাকাতি পকেটমারি করলেও, ছিল বেপরোয়া । আমার মেজদা, যাকে বড়োজেঠা দেড়শো টাকা দিয়ে এক বেশ্যার কাছ থেকে কিনেছিলেন, সেও ছিল বেপরোয়া । একটু আগে নমিতাদির কথা বলেছি, উনি ছিলেন মার্কসবাদী, তাঁর প্রভাব অস্বীকার করব না, কেননা আমি কখনও প্রত্যক্ষ রাজনীতি করিনি । বস্তুত কবি-লেখকদের তা করা উচিত নয়, বেলাইনে চলে যাবার সম্ভাবনা, এখন যেমন কবিদের দেখা যাচ্ছে সরকারে ঢুকে চাষিদের টাকা-মেরে দেয়া পনজি স্কিম নিয়ে মুখ খুলতে পারছে না, তেমন ছিল সিপিএমের সময়ে, হাংরি আন্দোলনের সুভাষ ঘোষ সিপিএমে যোগ দিয়ে মুখ খুলতো না, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ঘুরতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পেছন-পেছন, কখনও মুখ খোলেননি । আমি “নখদন্ত” আর “নামগন্ধ” উপন্যাসে সরকারকে তুলোধনা করেছি, পড়লে টের পাবে । উৎপলকুমার বসু লিখেছিলেন যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার বৈশিষ্ট্য আমি পেয়েছি কলকাতার বাইরে বেশির ভাগ সময় কাটাবার দরুন । আমার বাবা-মা কখনও স্কুলে পড়াশুনা করেননি । দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বিজন ভট্টাচার্যের মতন শিক্ষিত বাবা আর মহাশ্বেতা দেবী কিংবা কুসুমকুমারী দাশের মতন মা তো আমি পাইনি । জীবনের পথনির্দেশ আমাকে লেখালিখিরও পথনির্দেশ দিয়েছে । শৈলেশ্বর ঘোষের মতন আমি শঙ্খ ঘোষের চাকরের চাকরি করতে চাইনি, শৈলেশ্বর কবিতা লিখেছে অসাধারণ কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি, অথচ অরুণেশ ঘোষ বামপন্হী প্রতিষ্ঠানকে ফর্দাফাঁই করে গালাগাল দিয়ে দারুণ সব কবিতা লিখেছে । আমি, আমিই, ভেবেচিন্তে অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ করতে হয়নি, ওটা আমার ডিএনএতে রয়েছে।

তপন : আপনার দাদা বাংলা সাহিত্যের একজন বিতর্কিত কবি । আর আপনার মধ্যেও সেই বিতর্কিত তকমা । বাংলা সাহিত্যের কোন দিক আপনাকে এতো বিতর্কিত হতে বাধ্য করল ?

মলয়: হ্যাঁ, দাদা চিরকাল নতুন-নতুন ভাবনা ভেবেছেন, প্রচুর পড়াশুনা করতেন । মামার বাড়িতে থেকে সিটি কলেজে পড়ার সময়ে ছোটোমামার প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো লিখেছেন যে দাদা চিরকাল নতুন ভাবনা ভাবতেন ; প্রথম দিকে দাদা দুই বছর কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রকাশের টাকা যুগিয়েছিলেন, সুনীলের ‘একা এবং কয়েকজন’ বইটা নিজের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাসে ওনার লেখা ছাপা যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন কোনো প্রতিবাদ করেননি বন্ধুত্বের খাতিরে । দাদা বা আমি কেউই বিতর্কিত হবার জন্য লেখালিখি করিনি । যা ভেবেছি, যা মনে হয়েছে বাস্তব অবস্হা, তাকেই বিশ্লেষণ করার প্রয়াস করেছি । এর জন্য কেবল সাহিত্যিক জ্ঞান এবং গভীর পড়াশুনা যথেষ্ট নয় । সমাজ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ্য অভিজ্ঞতা দরকার । দাদা তো মিশতেন জেলেদের সঙ্গে, বেশ কিছুকাল কাটিয়েছিলেন সমুদ্রে জাহাজে-জাহাজে । আমি ছিলুম অর্থনীতির ছাত্র, তাই দেশের অবস্হা বুঝতে অসুবিধা হয়নি । দাদার কলেজের বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অর্থনীতির ছাত্র, কিন্তু তিনি দেশের অবস্হা বিশ্লেষণের বদলে মধ্যবিত্ত আর পরে উচ্চবিত্তদের নিয়ে পড়ে রইলেন । 

তপন: যে প্রশ্নটা না করলেই নয়, ১৯৬১ সালে আপনার জীবন তথা বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে আমার মনে হয় । বর্তমান প্রজন্মে অনেকেই বোধহয় জানে না হাংরি আন্দোলন কী । তাই বর্তমান প্রজন্মকে যদি বলেন হাংরি আন্দোলন কী এবং কেন তাহলে অনেকের সুবিধা হবে ।

মলয় : না জানলে আর কীই বা করা যায় ! যারা আগ্রহী তারা জানে । যারা জানে না তাদের বলব প্রতিভাস প্রকাশনী প্রকাশিত প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “হাংরি আন্দোলন : তথ্য, তত্ব ও ইতিহাস” বইটা পড়ে দেখতে । ইনটারনেটেও প্রচুর তথ্য পাওয়া যায় । একটু নড়েচড়ে বসলেই জানতে পারবে ।

তপন : কখন ভাবলেন এই আন্দোলনের কথা ?

মলয় : ১৯৫৯-৬০ নাগাদ ‘বিংশ শতাব্দী’ পত্রিকায় ‘ইতিহাসের দর্শন’ নামে একটা ধারাবাহিক লিখেছিলুম, সেসময়ে অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট’-এর সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক দর্শনের বনেদটা দেখি যে আমাদের দেশভাগোত্তর অবস্হার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সেসময়ে তুমি যদি শেয়ালদায় উদ্বাস্তুদের জমায়েত দেখতে তো তোমারও মনে যে দায়ি লোকগুলোর কাঁধে চেপে বসি । স্পেংলার সংস্কৃতির আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার কথা লিখেছিলেন, আমি এই প্রক্রিয়াকে জিওফ্রে চসারের কবিতার ‘সাওয়ার হাংরি টাইম’-এর সঙ্গে মেলাতে পারলুম । হাংরি শব্দটা পেয়ে যাবার পর আন্দোলনের কথা ভাবলুম । দাদা, আমি শক্তি আর হারাধন ধাড়া মিলে প্রথম আওয়াজটা তুললুম, পাটনায় বুলেটিন ছাপিয়ে, তারপর অনেকে দলে যোগ দিয়েছিল, মামলা দায়ের হতেই বেশির ভাগ সদস্য  দে পিট্টান ।

তপন : সেই সময়ে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যজগত দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল । এটা নিছক আত্মকেন্দ্রিকতার জন্য না অন্য কোনো কারণে ?

মলয় : না না । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভেবেছিলেন ওনার কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ভেঙে ফেলার জন্য এই আন্দোলন শুরু করা হয়েছে । এই বিষয়ে উনি সন্দীপন, উৎপল, শক্তিকে চিঠিও লিখেছিলেন, প্রায় হুমকি দিয়ে । ওনারা আনন্দবাজারে যোগ দিলেন । কলকাতার এলিট লেখকরা আমাদের বিরুদ্ধে অবিরাম পুলিশের কাছে নালিশ করতে লাগলো । শক্তি তো দলবল নিয়ে কফিহাউসের কাছে সুবিমল বসাককে ঘিরে ধরে মারধর করতে নেমে পড়েছিলেন । সুবিমলের তখন মারকুটে মাস্তানের চেহারা ছিল, ওর হিন্দি আর বাঙালভাষার গালমন্দতে সবাই পালিয়ে যায় । কিন্তু শক্তির দলটা প্রেসগুলোতে গিয়ে আর পাতিরামকে হুমকি দিয়ে আমাদের টাইট দিতে চেয়াছিল । সফল হলো না বলে শেষে পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে হেনস্হা আরম্ভ করলে । ব্যাপারটা আত্মকেন্দ্রিকতার নয় । সেটা ছিল শ্রেণিযুদ্ধ, ছোটোলোক আর ভদ্রলোকের যুদ্ধ । 

তপন : সালটি ১৯৬৪-৬৭ ; একটি কবিতা “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” । একটা কবিতা নিয়ে আদালত, সাজা ও মুক্তি । সেদিন কি কখনও মনে হয়েছিল মানুষের বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে ?

মলয় : না না । তা মনে হয়নি । ওই সময়েই তো সাপ্তাহিক, মাসিক, দৈনিক এমনকি কবিতা ঘণ্টিকি নামে ঘণ্টায় ঘণ্টায় কবিতার পত্রিকা বেরোনো আরম্ভ হয়েছিল, আমাদের বুলেটিনের দেখাদেখি । বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেবার প্যাঁচপয়জার বরং আমাদের আন্দোলনের পর থেকে শুরু হয়েছে ।  এখন লেখকরা মনের মতন লিখতে পারে না, কার্টুন আঁকতে পারে না, রাজনৈতিক দলগুলোর মাস্তানদের ভয় পায়, তার ওপর আরম্ভ হয়েছে রাম-হনুমানের কুটকচালি । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা নিয়ে মামলা চলার সময়েও কবিতাটা খালাসিটোলায়, হাওড়া স্টেশানে, মধুসূদনের সমাধিতে পড়েছি । হিন্দি, গুজরাতি, জার্মান, স্প্যানিশ আর ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে সেই সময়েই। কবিতা নিয়ে লড়াইটা ছিল আমার একার, হাংরি আন্দোলনের বন্ধুরা তো আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিল । একা লড়েছিলুম,  আর তা আমি শেষ পর্যন্ত জিতেছিলুম ।

তপন : কিন্তু যখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত Modern and Postmodern Poetry of the Millenium সংকলনে জেরোম রোদেনবার্গ বলেন যে দক্ষিণ এশিয়ার একটিমাত্র কবিতা স্হান দিলেন, তখন কি মনে হয়নি বাংলা সাহিত্যের সেদিনের সেই অবিচারের যোগ্য জবাব দিল বিদেশি সাহিত্য ?

মলয় : কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছে জেনে ভালো লেগেছিল বটে, কিন্তু অবিচারের যোগ্য জবাব ধরণের ব্যাপার মনে হয়নি । মামলার সময়েই তো কবিতাটা লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘সিটি লাইটস জার্নাল’, জর্জ বাওয়ারিঙের ‘ইমেজো’, অ্যালান ডি লোচের ‘ইনট্রেপিড’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । ডিক বাকেন একটা বিশেষ সংখ্যাই প্রকাশ করেছিলেন ওনার ‘সলটেড ফেদার্স’ পত্রিকার । হিন্দিতে আর গুজরাতিতেও অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল । কলকাতাতেও আনন্দ বাগচি ওনার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘প্রথম সাড়া-জাগানো কবিতা’ সংকলনে কবিতাটা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন । কলকাতা আর ঢাকা থেকে কবিতার কতো সংকলন প্রকাশিত হয়, তার জন্য আমার কাছ থেকে কবিতা চাওয়া হয় না ; আমি তাকে মোটেই অবিচার মনে করি না ।

তপন : আজ হাংরি আন্দোলন সংক্রান্ত তথ্য লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত, ঢাকা অ্যাকাডেমিতে সংরক্ষিত, আমেরিকার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সংরক্ষিত । এই আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি জায়গায় অনেকে এনিয়ে পিএইচডি করেছেন । এই সাফল্য আজ কি আপনাকে আত্মতুষ্টি দিচ্ছে ? নাকি এসবের মাঝে মলয় রায়চৌধুরী অন্ধকারের আবর্তে চলে যাচ্ছেন ?

মলয় : পঁচিশ-তিরিশ বছর বয়সে হয়তো আত্মতুষ্টি হতো । এখন আর হয় না । তবে মনে হয় হাংরি আন্দোলনকারীদের নিয়ে একটা ফিল্ম হলে ভালো হতো, যেমন বিট কবিদের নিয়ে ‘হাউল’ আর ‘কিল ইওর ডারলিংস’, , র‌্যাঁবো-ভেরলেনদের নিয়ে, ডাডাবাদী-পরাবাস্তববাদীদের নিয়ে হয়েছে, সিলভিয়া প্লাথকে নিয়ে, কিটসকে নিয়ে ‘ব্রাইট স্টার’, এলিয়টকে নিয়ে ‘টম অ্যাণ্ড ভিভ’, সেজার ভালেহোকে নিয়ে ‘সংস ফ্রম দি সেকেণ্ড ফ্লোর’ইত্যাদি । সম্ভবত আমাদের আন্দোলন নিয়ে ইংরেজিতে বই বেরোবার পর হতে পারে । অন্ধকারের আবর্তে সব কবি-লেখকদেরই এক সময়ে হারিয়ে যেতে হয়, যেমন এখন হয়েছেন ‘ইউসুফ-জোলেখা’র কবি,  মঙ্গলকাব্যের আর পদাবলীর কবিরা । তাই সেসব আমার চিন্তার আওতায় পড়ে না ।

তপন : কলকাতার এতোদিনের সাহিত্যচর্চা ছেড়ে মুম্বাইয়ে এই নির্বাসন কেন ?

মলয় : এর উত্তর তো দিলুম একটু আগে । তার সঙ্গে যোগ করি যে এখন এই বয়সে আমার একাকীত্ব ভালো লাগে, লোকজন হই-হট্টোগোল ভালো লাগে না ।

তপন : বাংলা ভাষায় বিদেশি সাহিত্যের যেভাবে অনুবাদ হয়েছে, বাংলা সাহিত্যের সেভাবে অনুবাদ হয়নি । তবে কি বাংলা সাহিত্যের মান বিদেশি সাহিত্যের তুলনায় কম ? আপনার কী মনে হয় ?

মলয় : কে অনুবাদ করবে ? বামফ্রণ্টের সময়ে প্রাইমারি স্তরে ইংরেজি তুলে দেবার ফলে আমরা কেবল ইংরেজি-ইল্লিটারেট প্রজন্ম পেয়েছি । যারা ভালো ইংরেজি জানে তারা ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র, ফলে ভালো বাংলা জানে না । অনুবাদক নেই, তাই অনুবাদ হয়না । যাদের অনুবাদ হয়েছে, যেমন শংকর, সুনীল প্রমুখ, তাঁদের লেখা নিয়ে ফিল্ম হতে পারে, কিন্তু তাকে মার্কেজ বা রুশডির মতন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গদ্যের কাজ বলা যায় না । সন্দীপনের উপন্যাস হতে পারতো, কিন্তু সেই একই সমস্যা, অনুবাদক নেই । আর কবিতার অনুবাদের কথা তো ছেড়েই দাও । যে কয়জন অনুবাদ করেন তাঁরা কেউই কলকাতায় থাকেন না । রুদ্র কিংশুকের কবিতা বিদেশে বিখ্যাত পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়, ওর নিজের করা অনুবাদ, কিন্তু কলকাতার সাহিত্য এসট্যাবলিশমেন্ট ওকে গুরুত্ব দেয় না ।

তপন : ২০০৩ সালে দেওয়া সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারসহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন কেন ?

মলয় : যে বা যারা পুরস্কার দেয় তাদের নিজস্ব নোংরা মূল্যবোধ ওই পুরস্কারের সঙ্গে চাপিয়ে দেয় । বামফ্রণ্টের সময়ে বাংলা অ্যাকাডেমির একটা কমিটি ছিল । নতুন সরকার এসে তাদের বিদায় করে দিলে । কেন ? নিজেদের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য । লক্ষ্য করলে দেখবে যে নানা সাংস্কৃতিক ঘাঁটিতে বিজেপি নিজের ঘুঁটিদের বসিয়ে দিচ্ছে, ফলে তাদের দেয়া পুরস্কারে তাদের মূল্যবোধ থাকবে । আমি এই নোংরামির ভেতরে গিয়ে নিজের গায়ে গু মাখতে চাইনি । যাদের মাখতে ভালো লাগে তারা মাখুক ।

তপন : আপনার শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম কী ? সে সম্বন্ধে কিছু বলুন ।

মলয় : শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম “মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো” । না পড়লে বুঝতে পারবে না কেন মাথা কেটে পাঠাচ্ছি আর কাকে বা কাদের পাঠাচ্ছি ।

তপন : কবিতায় যৌনতা নিয়ে আপত্তি করেন অনেকে, কিন্তু চিত্রশিল্পে যৌনতা গ্রহনীয় । এ সম্পর্কে আপনার কী মত ?

মলয় : কবিতায় যৌন শব্দ নিয়ে আপত্তি করেন সাধারণত গ্রাম্য সম্পাদক আর আলোচকরা । মেট্রোপলিটান সম্পাদক আর আলোচকরা করেন না । এখনকার ছবি আঁকা যেমন মেট্রোপলিটান, গ্রামে বসে সাধারণত কেউ আর পেইনটিঙ করে না । তাই পেইনটিঙে যৌনতা বহুকাল যাবৎ স্বীকৃত । পিকাসো তো কতো রকমের যোনি আর স্তন এঁকেছেন তার ইয়ত্তা নেই, সেসব পেইনটিঙ এখন মিলিয়ান ডলারে বিকোয় । কলকাতায় প্রকাশ কর্মকার আর যোগেন চৌধুরীর পেইনটিঙেও পাবে, সেগুলোও লক্ষ-কোটি টাকায় বিক্রি হয়, বৈভবশালীরা কেনে, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক-আলোচকরা নয় ।

তপন : শরীর, যৌনতা, এসব তো সমাজের একটা অঙ্গ হয়ে গেছে, ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাহলে কবিতায় যৌনতার শব্দ এলে এতো তারস্বর কেন ?

মলয় : তুমি যখন নিজেই ‘ভাইরাস’ শব্দটা প্রয়োগ করছ তখন বুঝতে হবে তোমার অবচেতনে এই প্রয়োগগুলো নিয়ে দ্বিধা আছে । এখন প্রযুক্তি এতো দ্রুত পালটে যাচ্ছে আর সকলের আয়ত্তে এসে যাচ্ছে যে কবিতায় যারা আপত্তি করছে বুঝতে হবে তারা এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না । হিন্দি ফিল্মে দ্যাখো, তেলুগু-তামিল ফিল্মে দ্যাখো, তার দেখাদেখি বাংলা ফিল্মেও দ্যাখো, বিজেপির পহলাজ নিহলানি আপত্তি করতো, এখন রাজনৈতিক দলের পাণ্ডা নেই বলে করে না । প্রযুক্তি সবাইকেই সাধের লাউ খাইয়ে বৈরাগি বানিয়ে দিয়েছে। স্কুলের ছেলেদের হাতেও স্মার্টফোন, টিপলেই গুগল এনে দেবে বিবসনা সুন্দরীদের, তাদের যৌনকর্মের। এক্ষুনি যা বললুম, গ্রাম্য সম্পাদক আর আলোচকরাই তারস্বর হন, পহলাজ নিহলানির মতন ।

তপন : আপনার কি কখনও মনে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কবিরা ভিনদেশি কবি আর কবিতা নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে আদপে বাংলা সাহিত্যজগতের ক্ষতি করেছে ?

মলয় : না, তা মনে হয় না । সাহিত্যজগতের ক্ষতি বলে কিছু নেই । আর বিদেশি বলতে তো হাতে গোনা কয়েকজন ইউরোপের লেখক আর কবি । তাদের নিয়ে কখনও-সখনও পত্রিকারা সংখ্যা বের করে বা ইনটারভিউ-সংকলন বের করে, তাকে মাতামাতি বলা যায় না । এখন কবিতা অ্যাকাডেমি হবার পর আশা করা যায় ইউরোপের বাইরে যেসব দেশ রয়েছে সেখানকার কবিদের পরিচয় আমরা পাবো । কোথায় কেমন কবিতা লেখা হচ্ছে তার খোঁজখবর রাখা দরকার ।

তপন : বাংলা সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা । এর ফলে অনেক ভালো লেখার মূল্য হারিয়ে যাচ্ছে । রাজনৈতিক দল আর সাহিত্যজগত এক হয়ে যাচ্ছে । এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন ?

মলয় : আমি আর কী বলব ! সমস্যাটা আরম্ভ করেছিল ‘দেশ’ পত্রিকা, যখন থেকে কবিতার জন্য আলাদা সম্পাদক রাখতে আরম্ভ করল,  আর সেই সম্পাদকরা নিজেদের চারপাশে স্তাবক গোষ্ঠী পুষতে লাগলো । ফলে কবিতার লিটল ম্যাগাজিনরা নিজেরা গোষ্ঠী গড়ে আলাদা প্ল্যাটফর্ম বানাতে চাইলো । এখন একদল তরুণ সুশিক্ষিত আলোচক-অধ্যাপক এসেছেন যাঁরা গোষ্ঠীকে গুরুত্ব না দিয়ে কবিতার অনন্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন । জহর সেনমজুমদার অনন্যধারার কবিতা লিখছেন ; তাঁকে কেউ গুরুত্ব দিক বা না দিক কিছু যায়-আসে না । আমার মনে হয় ‘দেশ’ পত্রিকার মৌরসী পাট্টা ভাঙার জন্য সুবোধ সরকার বাংলা অ্যাকাডেমি পত্তন করেছেন, কিছুকাল গেলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে । এবার যে কবিরা পুরস্কৃত হয়েছে তারা দেশ-গোষ্ঠীর বাইরের বলেই মনে হয় । ‘দেশ’ পত্রিকাকে টেক্কা দিয়ে ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ এসেছে, ওরা পত্রিকা-গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে ফেলতে চাইছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয় ।

তপন : তরুণ কবিদের কবিতা পড়তে কেমন লাগে ? তরুণদের কী বার্তা দেবেন ?

মলয় : আমি নিয়মিত পড়ি না । বলা চলে অ্যাট র‌্যাণ্ডাম পড়ি । অনেকে কবিতা ইনবক্স করেন, বই পাঠান, সেগুলো পড়ি, সময় পেলে । পড়তে কেমন লাগবে ভেবে পড়ি না । আজকাল কেমন লেখা হচ্ছে জানার জন্য পড়ি। তরুণদের বলব, নিজের ইচ্ছেমতন লেখো, কোনো গুরুঠাকুর ধরার প্রয়োজন নেই । লিখে নিজের আনন্দ হওয়াটাই আসল ।

তপন : কবিতার ভাষা কেমন হওয়া উচিত ? দুর্বোধ্য না সরল ?

মলয় : কবিতা-বিশেষ দুর্বোধ্য না সরল তা পাঠকের গ্রহণ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে । পাঠক কবিতা বুঝতে পারছে না বলে তাকে দুর্বোধ্য তকমা দেয়া যায় না । আমি তো “ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড’ দ্বিতীয়বার পড়েছি, প্রথমবার বুঝতে পারিনি বলে । এখনও ‘হ্যামলেট’ পড়ে বোঝার চেষ্টা করি । সরল না দুর্বোধ্য তা পাঠকের নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে ।

তপন : আপনি আজ কতোটা নিঃসঙ্গ ?

মলয় :  একটু আগেই বলেছি যে একাকীত্ব আমার ভালো লাগে । বর্তমান স্হিতিকে নিঃসঙ্গতা বলব না, কেননা বাজারে যখন বেরোই এর তার সঙ্গে দুচারটে কথা বলে নিই । সামনের রাস্তায় একটু দাঁড়ালে এখনকার তরুণ-তরুণীদের আচরণ, কথাবার্তা, পারস্পারিকতা, সাজসজ্জা, পারফিউম, যৌন আবেদনের প্রয়াস, নিজেকে ভালোবাসবার দর্শন,  টের পাই । দাঁড়িয়ে গ্যাঁজাতে আমার ভালো লাগে না । সাহিত্যসভা বা কবিতার আড্ডাও ভালো লাগে না । সন্ধ্যায় সিঙ্গল মল্ট খাই আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি । সিঙ্গল মল্ট ছাড়া আমি অন্য কোনো মদ আর খাই না । মদও চিরকাল একা খেতে পছন্দ করি ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

শিউলি বসাক নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

শিউলি বসাক নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

শিউলি : সাহিত্য রচনায় এলেন কীভাবে ? 

মলয় : বইপোকা ছিলুম শৈশব থেকে । মার্কসবাদ নিয়ে পড়াশুনায় উৎসাহ দিয়েছিলেন নমিতা চক্রবর্তী, আমার স্কুলের গ্রন্হাগারিক । ওনার গালে টোল পড়ত । যাদের গালে টোল পড়ে তারা চিরকাল আমায় আকর্ষণ করেছেন । যেমন ইমলিতলা পাড়ার কুলসুম আপা, যিনি আমার সঙ্গে গালিব, ফয়েজ ও যৌনতার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । দাদা কলকাতা থেকে প্রচুর কবিতার বই আনতেন আর বাবা কিনে দিতেন ইংরেজি বই । বাড়ির কাজের লোক শিউনন্দন কাহার ‘রামচরিত মানস’ মুখস্হ বলতে পারতো ; বাবার দোকানের কর্মী রামখেলাওন সিং ডাবর বলতে পারতো রহিম, দাদু, কবির । বড়োজ্যাঠা ছিলেন পাটনা মিউজিয়ামের কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার্স । জাঠতুতো দিদিরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতেন ও গাইতেন । আমি বেহালা বাজানো শেখা আরম্ভ করি । এইরকম আবহে লেখালিখির প্রতি আগ্রহ গড়ে ওঠে ।

শিউলি : দেশি-বিদেশি কার কার লেখা পড়তেন আন্দোলন শুরুর আগে?                                                    

মলয়: আমি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়তুম । নমিতাদি আমাকে ব্রাহ্মদের বই পড়তে দিতেন, যদিও উনি বলতেন না যে লেখক ও কবিরা ব্রাহ্ম, কেননা তখনকার দিনে সাধারণ বাঙালি পরিবার ব্রাহ্মদের এড়িয়ে চলতেন । ব্রাহ্ম স্কুলের আগে ক্যাথলিক স্কুলে পড়ার ফলে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ফাদার হিলম্যান ; প্রতি বৃহস্পতিবার বাইবেল ক্লাস হতো, সংলগ্ন চার্চে । যখন দীপক মজুমদারের পরামর্শে ইতিহাসের দর্শন পড়া আরম্ভ করি তখন বিষয়টা সম্পর্কে নানা বই পড়া আরম্ভ করেছিলুম । ইতিহাসের দর্শন নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । মার্কসবাদের উত্তরাধিকার নামে একটা বই লিখেছিলুম, দাদা পাণ্ডুলিপি দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আর আমি দিয়েছিলুম ১৯০০০ টাকা । কিন্তু শক্তি তা মদ খেয়ে উড়িয়ে দেন আর বইটা ভুলভাল নোংরাভাবে প্রকাশ করেন । আমার এতো রাগ হয়েছিল যে ওনার উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে সব কপি জড়ো করে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলুম।

শিউলি : সাহিত্য আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাই বা কেন মনে করলেন সেই সময়ে?    

মলয় : হাংরি আন্দোলন নিছক সাহিত্য আন্দোল ছিল না । আমরা নানা বিষয়ে ইশতাহার প্রকাশ করেছিলুম আর সেই কারণেই আমাদের হেনস্হা করা হয়েছিল । নিছক সাহিত্য আন্দোলন করলে আমাদের ওইভাবে আক্রমণ করা হতো না । আন্দোলন আরম্ভ করেছিলুম শেয়ালদা স্টেশানে উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্কর দুর্দশা প্রতিদিন দেখার পর । দাদা পানিহাটি থেকে সিটি কলেজে যেতো । আমিও পানিহাটি গেলে শেয়ালদা দিয়েই যেতুম । এখনকার শেয়ালদা দেখে অনুমান করা যাবে না তখনকার ভয়াবহ অবস্হা । প্রতিবাদ আর সমাজকে ঢুঁ মারা জরুরি ছিল ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনকে কি দুই পর্বের ধরব ? না কি ’৬৫ তেই শেষ? ‘ক্ষুধার্ত’কে কীভাবে দেখা যেতে পারে? 

মলয় : একটাই পর্ব ধরা উচিত । দুর্ভাগ্যবশত আমি লেখা কিছুকাল বন্ধ রাখার পর শৈলেশ্বর ঘোষ ক্ষুধার্ত আরম্ভ করেছিল, কিন্তু নেতৃত্বের যোগ্যতার অভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পারেনি । এমনকি অলোক গোস্বামীরা উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করলে লোক পাঠিয়ে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল ; সুভাষ ঘোষকে লোক লাগিয়ে মারধর করেছিল যার দরুন সুভাষ ঘোষ ক্ষুধার্ত খবর নামে আলাদা পত্রিকা আরম্ভ করে । যতো পত্রিকা আছে সবই হাংরি আন্দোলনের বলে ধরা উচিত । পরাবাস্তববাদীদের ঝগড়াঝাঁটি হাংরিদের তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়েছিল, অনেকবার দল ভাগাভাগি হয়েছিল । কিন্তু পরাবাস্তব বলতে একটাই আন্দোলন বোঝায় । 

শিউলি : বাজারে যে কয়েকটি ‘ক্ষুধার্ত’ সংকলন পাওয়া যায়, সাধারণ পাঠক সেগুলিকেই হাংরি-সংকলন হিসেবে গ্রহণ করে আসছে, এই ব্যাপারে আপনার অনুভূতি ও মতামত কী ? 

মলয় : জানি । তার কারণ সামগ্রিকভাবে কেউই চেষ্টা করেননি সবাইকে একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করতে । উইকিপেডিয়ায় দেখলুম প্রচুর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে হাংরি আন্দোলনে । আমি অনেককে চিনি না । না চিনলেও আমি তাদের অন্তর্ভু্ক্ত করতে চাইবো । কেউ নিজেকে হাংরি ঘোষণা করলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এটাই ছিল আমাদের পন্হা ।

শিউলি : সাহিত্যক্ষেত্রে ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’ ব্যাপারটিকে  আপনি কীভাবে দেখেন ? 

মলয় : এসট্যাবলিশমেন্ট একটা বিমূর্ত ক্ষমতা । সেই ক্ষমতা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা নির্দিষ্ট ক্যানন চাপিয়ে দিতে চায় । আমি মনে করি সাগরময় ঘোষের কারণে বাংলা সাহিত্যে পাল্প ফিকশানের প্রবেশ । গদ্য নিয়ে যারা কাজ করতে চেয়েছে তাদের সাগরময় ঘোষ পাত্তা দেননি, যেমন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উদয়ন ঘোষকে ।

শিউলি : কবিতায় শব্দচয়ন কীভাবে করেন? ভেবেচিন্তে,  না কি স্বতস্ফূর্ত ? 

মলয় : কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নেই । মনে এলে লিখি, ফেলে রাখি, ঘষামাজা করি, তাই ভাবনা আর স্বতঃপ্রক্রিয়া দুটোই কাজ করে ।

শিউলি : শ্লীলতা ও অশ্লীলতাকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ? 

মলয় : ওই বাইনারি বিভাজন এনেছিল প্রটেস্ট্যান্ট পাদরিরা । তার আগে আমাদের অমন বিভাজন ছিল না । ওদের কারণেই আমাদের রসশাস্ত্র লোপাট হয়ে গেছে । তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে বহুকাল নিম্নবর্গ আর নিম্নবর্ণের মানুষদের দিনানুদৈনিক বুলিকে ঢুকতে দেয়া হয়নি ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনের সময় লেখালেখির পাশাপাশি আরও যে ঘটনাগুলি ঘটেছে, জুতোর বাক্স রিভিউ করতে পাঠানো ইত্যাদি ইত্যাদি; সেগুলি তখন কী মনে করে করা হয়েছিল, এখনই বা আপনি কী মনে করেন?

মলয় : ওগুলো দিয়েই তো সমাজকে ভিত থেকে নাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, বিশেষ করে মুখোশ পাঠানোর ব্যাপারটা । অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিঠি পড়লেই টের পাবে যে এলিট সম্প্রদায় কতোটা আঘাত পেয়েছিল ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনের সময় আপনাদের লেখালেখিকে যেভাবে দেখেছেন, এখনও সেভাবেই দেখেন কি?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময়ে সারা ভারতবর্ষকে দেখিনি যা গ্রামীণ উন্নয়ন আধিকারিকের চাকরির অভিজ্ঞতায় জেনেছি । ১৯৭০ থেকে আমার প্যানারমা বিশাল হয়ে গেছে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে ছিলুম পাটনা শহরের দলিত পাড়া ইমলিতলার ছোটোলোক বর্গের তরুণ ।

শিউলি : নতুন করে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না কখনও ? 

মলয় : আমার মনে হয় আর কোনো সাহিত্য আন্দোলন সম্ভব নয় । বহু তরুণ আমাকে অনুরোধ করেছেন নতুনভাবে আন্দোলন আরম্ভ করার । আমি সবাইকে এই একই কথা বলেছি ।

শিউলি : সমকালীন শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনকে সেই সময়ে কীভাবে দেখেছেন, এখনই বা কীভাবে দেখেন? 

মলয় : ওনারা পুরোপুরি সাহিত্যে কেন্দ্রিত ছিলেন । সমাজকে নাড়া দেবার অন্য উপায়ের কথা ভাবেননি । ওনাদের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না । প্রতিষ্ঠানের চাপানো ক্যানন ভেঙে ফেলার পথ ওনারাও পরের প্রজন্মকে দেখিয়েছেন ।

শিউলি : বাংলা সাহিত্যের ধারায় হাংরি জেনারেশনের গুরুত্ব আপনার চোখে কতখানি ? সমকালীন শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনের গুরুত্ব আপনার চোখে কতটা? 

মলয় : এখন তো হাংরি আন্দোলন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে । পেঙ্গুইন র‌্যানডাম হাউস থেকে বই বেরিয়েছে । ইনটারনেটে প্রচুর রচনা দেখতে পাই, হাংরিদের ইনটারভিউ দেখতে পাই । শ্রুতি আর শাস্ত্রবিরিধিদের তেমন উপস্হিতি নেই । আমার মনে হয় সব কয়টা আন্দোলন নিয়ে ইংরেজিতে একটা বই বের করে যদি কেউ বিশ্বের পাঠকদের সামনে নিয়ে আসেন তাহলে ভালো হয় ।

শিউলি : আপনি সাহিত্য আকাদেমি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কী মনে করে? 

মলয় : আমি কোনো পুরস্কার নিই না । যেকোনো পুরস্কার যিনি বা যাঁরা দেন তাঁর বা তাঁদের মূল্যবোধ বহন করে । তৃণমূল এসেই বাংলা অ্যাকাডেমির সদস্যদের ভাগিয়ে দিল অথচ তাঁরা সবাই জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন । কেন ? কেননা আগের সদস্যরা একটি ভিন্ন মূল্যবোধের বাহক ছিলেন ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi in conversation with Malay Roychoudhury

The Hungryalist Movement in Bengal : A Conversation with Malay Roychoudhury—-

 Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi 

Abstract

হল্যান্ডে মলয় রায়চৌধুরী

 

Malay Roychoudhury (1939) is an Indian Bengali poet, playwright, short story writer, essayist and novelist who founded the Hungryalist movement in the 1960s which changed the course of avant-garde Bengali literature and painting. 

His best-known poetry collections are Medhar Batanukul Ghungur, Jakham and Matha Ketey Pathachhi Jatno korey Rekho; and his novels Dubjaley Jetuku Proshwas and Naamgandho. He has written more than hundred books. He was given the Sahitya Academy award, the Indian government’s highest honour in the field, in 2003 for translating Dharamvir Bharati’s Hindi fiction Suraj Ka Satwan Ghora. However, he declined to accept this award and others. 

This interview has been executed by the exchange of e mails with the activist-author.

 

 

  1.   Allen Ginsberg in a BBC interview spells out his religious and sexual preferences while introducing himself. He says he is certainly a beat poet, certainly Jewish, certainly gay, certainly American practicing meditation. How would Malay Roychoudhury, who spearheaded one of the most important movements in Bengali poetry, introduce himself?

 

Malay : Ginsberg belonged to a very rich country, his father was a poet himself and quite well to do ; Ginsberg thus knew what he should leave for posterity to remember. In whichever country he went he used to send all paper cuttings, magazines etc related to him to his step-mother who used to arrange them country-wise in their basement. He made millions from the sale of these items including his books, poetry readings, photographs and records. Right from the beginning he had friends in the writing world. His friend Burroughs was very rich, Ferlinghetti was a publisher.  As far as I know after returning from India he converted to Tibetan Buddhism and after death was cremated according to Buddhist rites ; his ashes have been placed between the tombs of his parents, given to some Red Indian tribes and sprinkled on Amazon river. 

 

I come from a very poor family of twenty members living in a slum at Patna’s Imlitala locality in which the residents were all poor Mahadalits ( who were called untouchables in my childhood )and remnants from descendants of Harems of Lucknow Nawabs. My father was the only earning member and we did not have any restrictions to enter any house during playing hide and seek. My elder uncle was a menial staff at Patna Museum and I had the opportunity to visit all the rooms of the Museum for free during my holidays. None of the elders in my family had gone to school and my elder brother Samir was the first member to attend school and college. Because of Samir’s interest in literature we started getting poetry books, novels, drama, criticism books from Calcutta ( now Kolkata ) and I was introduced to literature. Not being from a literary family I have not preserved the letters written to me, the Hungryalist bulletins & magazines as well as my books. I never knew that when you meet famous writers you have to get photographed with them. In school ( Ram Mohan Roy Seminary- a non-Hindu school ) I was guided by  lady librarian Namita Chakraborty to read Brahmo Samaj writers. At Imlitala I was introduced to Faiz and Ghalib by a Shia Muslim girl ( I used to visit their house to purchase duck eggs ) who used to recite their poems which I did not understand at that time though I liked her sonorous rendition. This girl was the first who fell in love with me and I was initiated into the secrets of female body. This was the beginning of my heterosexual journey and I still remain a heterosexual. I am a Hindu in the sense that I was born in a Hindu Brahmin family — I call myself an Instinctive Hindu, I used to enjoy Holi and fireworks during Diwali. However, having been educated in a Brahmo school all these things withered away ; my parents also did not have sparable time to devote to religious activities.I am certainly Bengali and certainly Indian. In fact after visiting some foreign countries I have realized that I feel at-home only in India.

 

  1.   How did you conceive the idea of Hungryalist poetry?  How did it become so significant a poetry movement?

 

Malay : I would like to correct you that Hungryalist movement was not limited to poetry. We had novelists, dramatists and painters. Anil Karanjai was awarded Lalit Kala Academy prize for his paintings. Karuna Nidhan Mukhopadhyay drew posters and Subimal Basak sketched some drawings for Hungryalist bulletins which created uproar during Sixties. 

 

It became significant primarily because we started writing against the modern poetry and narrative style of thirties. They had discarded Nazrul Islam and Jasimuddin ; Madhusudan Dutta was also being side-lined. We said that the thirties critics thought in terms of Abrahamic single line progression whereas Brahmo Tagore, Christian Madhusudan and Muslim Jasimuddin had branched out in three different paths ; it was wrong to imagine poetry in terms of Western concepts of literature and history. The English manifestos also reached various literary centres of the World and young writers printed them in their magazines. Lawrence Ferlighetti published our poems in three issues of City Lights Journal. Dick Bakkaen published a special Hungryalist issue of his magazine Salted Feathers. Margaret Randall spread the world in Latin America, Karl Weissner in Germany, George Dowden in England, Gordon Lasslet in Australia. 

 

  1. We would like to know how the movement was conceived.  Did you prepare any manifesto? Was it Calcutta centric only?

 

Malay : Hungryalist movement was conceived at my Patna residence when Samir and Shakti came in 1961 and Debi Roy had also come to visit me. I explained to them the philosophy of Spengler and Chaucer’s line in the background of post-partition nightmare that Bengali society was facing at that time. Refugees protested almost everyday at the then Dalhousie Square, Railway stations were swarming with destitutes and we remembered Henry Louis Vivian Derozio’s radicalism. The first manifesto was published on Samir’s birthday, i.e. 1st November 1961.

 

  Most of the English manifestos were written by me. I was staying at Patna at that time and Bengali press was not available. Obviously the initial manifestoes printed at Patna were in English. I guess I wrote about ten to twelve in English. I used to pack them and send to Debi Roy who used to distribute them in Calcutta Coffee House, Universities, Newspaper offices, periodical editors etc. Since the initial manifestos were in English, we could draw attention of writers of other languages, such as Phanishwar Nath ‘Renu’, Ramdhari Singh ‘Dinkar’, S. H. Vatsayana ‘Ajneya’, Dharmavir Bharati ( whose Suraj Ka Satwan Ghora I translated in Bengali ),Nagarjuna, Kamleswar, Srikant Verma, Khushwant Singh, Umashankar Joshi, Arun Kolatkar, Mudrarakshasa, Dhumil, Sarveshwar Dayal Saxena and others. Hindi, Malayalam, Gujarati, Assamese magazines wrote about our movement and published our photos at that time. Even Nepali newspapers and magazines wrote about us ; we became friends with Nepali poets Parijat, Basu Sashi, Ramesh Sreshtha and others and had visited  Nepal in 1965 for three months on their invitation. We used to stay in a Hippie Colony in Kathmandu.

 

No, it was not Calcutta-centric. Myself and Subimal Basak came from Patna. Anil Karanjai and Karunanidhan Mukhopadhyay from Benaras, Saileswar Ghosh and Subhas Ghose from Balurghat, Pradip Chowdhuri and Arun Banik from Tripura, Aloke Goswami from Siliguri, Abani Dhar and Basudeb Dasgupta from Ashoknagar, Subo Acharya and Ramananda Chattopadhyay from Bankura, Sambhu Rakshit from Midnapur, Samiran Ghosh from Jalpaiguri.

 

  1.     Could you reach out to other cities and villages in Bengal? Any incident you would like to share with us…..

 

Malay : Yes. I have told you just now that the participants came from various places and we could reach out to the districts. Since at Calcutta most of the writers were against us, they would visit the printing presses and tell them not to print our bulletins, books and periodicals. We had to arrange with a Press at Berhampur, Murshidabad for getting them printed and we arranged to bring them to Calcutta. Manish Ghatak, whose nom-de-plume was Jubanashwa resided there and gave a helping hand to identify the press. Manish Ghatak, you might be knowing is Ritwik Ghatak’s elder brother and father of Mahasweta Devi. The press was run by Adrish Bardhan’s elder brother ; Adrish Bardhan is a known writer of detective and children’s books.

 

  1.     ‘Hungry Generation’ was not at all like Richard Huelsenbeck’s random paper knife word. You took the word from Geoffry Chaucer’s “In sowre Hungry times.” Does ‘Hunger’ in the Hungryalist movement have other connotations?

 

Malay : Yes, in later years, during and after the Court case, some of the Hungryalists tried to explain their own viewpoint. Those who became a part of the Left Front explained that Hungryalists talked of hungry people of West Bengal, hunger the refugees were suffering from. Subhas Ghose became a CPM card-holder and brought out Khudharo and Basudeb Dasgupta edited Khudharto Khabor to emphasize hunger or khudha. When I borrowed from Chaucer I was thinking of Hungry Time. TIME was more important.

 

  1.     What was Oswald Arnold Gottfried Spengler’s historiographical theory that Hungryalist movement drew upon? Were there other theorists as well who influenced your movement?

 

Malay : Every culture in the world, according to Spengler, develops like an organism. This idea was completely different from the Abrahamic linier time or progression on which Marxism is based. Spengler  conceived culture as something small, it grows, blooms and strengthens itself, produces geniuses and finally enters a stage of decline and irrevocably withers away. Spengler recognized this organic process in several cultures around the world and throughout history. We developed Hungryalism on the premise that Bengalies  will no longer produce geniuses similar to 19th Century greats of Bengal, say, like Tagore family, Bankimchandra, Vidyasagar, Ram Mohan Roy, Satyendra Nath Bose, Anil Kumar Gain, Prasanta Chandra Mahalanobis, Prafulla Chandra Ray, Debendra Mohan Bose, Jagadish Chandra Bose, Jnan Chandra Ghosh, Gopal Chandra Bhattacharya, Kishori Mohan Bandyopadhyay, Jnanendra Nath Mukherjee and Meghnad Saha and others. and will gradually face a withering socio-cultural economy swarmed by puny politicians. I don’t recollect any other theorists. However, during Left Front rule the stranglehold of CPM became so strong in the suburbs that Basudeb Dasgupta, Subhas Ghose, Saileswar Ghose, Aloke Goswami joined the Left Front. Arun Banik, who joined the CPM in Agartala was murdered by political goons.

 

  1. “I am thinking of my debauched  Sabarna Choudhury ancestors” Tell us something about your ancestors.

 

Malay : My ancestors were Gangopadhyay. Mughal Emperor Jehangir gave the title of Roy and later Akbar gave Choudhury. Lakshmikanto was the first to use the title Roychoudhury in his name instead of Gangopadhyay. Since Gangopadhyays are “savarna gotra”, the family is called Sabarna Choudhury. Like all zamindars the Sabarna Choudhurys also led a life of pleasure with several wives, mistresses  and children and squandered their wealth. They were the original zamindars of the villages which later became Calcutta.The three villages of Sutanuti, Govindapur and Kalikata were part of a khas mahal or imperial jagir or an estate belonging to the Mughal emperor himself, whose jagirdari rights were held by the Sabarna Roychoudhury family. The British settlement was surrounded by thirty-eight villages held by others. Although in 1717, the British East India Company was permitted by the Mughal emperor Farrukhsiyar to rent or acquire zamindari rights in them, it was unable to procure the land from the zamindars or local landlords. Even the Sabarna Roychoudhury family was not keen to allow the British to settle or do trading in these villages, but the British had paid a bribe at the Mughal Durbar to ensure that the deal did not fail. Just prior to their move from Hali Shahar to Barisha, the Roychoudhury family had to transfer their rights over Kalikata in 1698, to the East India Company much against their wishes and protests. The British ultimately got the ‘Right to Rent’ or lease of three villages for an annual rent of Rs. 1,300. The deed was in Persian. A copy of the deed can be seen at the Sabarna Sangrahashala at Barisha.

 After the villages were transferred to the British Sabarna Choudhurys became quite poor. They also sided with Siraj Ud Daulah instead of the British and failed to get gold crumbs from East India Company. Now there are about 30,000 Sabarna Choudhurys all over the world. A large number now belong to lower middle class ; my family was one of them. My grandfather left the clan to try in photography business in Lahore, where my Dad was born.

 

  1. Tell us about the poets you loved reading and the poets who influenced you. Were you influenced by Nicanor Parra’s Anti-poetry?

 

Malay : No, I had not heard or read Nicanor Parra in Sixties when the movement was started. Another Bengali poetry group called ‘Shruti’ drew on Anti-Poetry and Concrete Poetry. Their main poets were Paresh Mandal, Sajal Bandopadhyay, Pushkar Dasgupta etc. I read Parra in Eighties. I gave more importance to saying something and the voice saying it  rather than the look of the printed poem on a page. At Imlitala we had two workers who worked at our home and Dad’s photography shop, Sivnandan Kahar and Ramkhelawan Singh Dabur. They used to admonish us by quoting from Tulasidasa, Kabir, Rahim and Dadu– these two were important influences in my literary life.

 

I loved reading  Jibanananda Das, Shakti Chattopadhyay, Al Mahmud’s Sonali Kabin, Rimbaud’s A Season in Hell ( which I have translated in Bengali ) , Baudelaire’s The Flowers of Evil and Paris Spleen ( which I have translated in Bengali ), Sarveswar Dayal Saxena’s Khution Par Tange Log, Pablo Neruda’s Love Poems. But because of time constraint due various ailments I do not find time to read anymore. My own writing takes up a lot of time. 

 

  1. Did you suffer from any anxiety of influence?

Malay : No, I don’t. However, I get irritated because of the label Hungryalist applied to all my works. I have published more than 100 poetry collections, novels, short story collections, essay collections, drama and have translated several western poets. Unfortunately these are not discussed much by critics.

  1. While your friendship with Allen Ginsberg is widely covered we do not hear much about your meetings with Octavio Paz and Ernesto Cardenal. Can you please tell us more about your interactions with them?

Malay : Friendship with Ginsberg had been discussed because he took up my trial with several influential people in India and abroad which no other writer did in Bengal. Rather Bengali magazines wrote against our movement, which included Sunil Gangopadhyay’s Krittibas and Sagarmoy Ghosh’s Desh. Ginsberg wrote angry letters Abu Sayeed Ayyub, as he was incharge on Indian Congress for Cultural Freedom and refused to help me. 

Octavio Paz was Ambassador at that time and had come to Patna. He was staying in Governor’s house and probably knew that I would not like to visit him there. He came to my residence with a posse of policemen alongwith the District Magistrate of Patna. People in my locality thought I was again being arrested for anti-state activity. Our discussion was limited to Bengali literature and what we were trying to do. I did not correspond with him, neither did he. I was in the midst of my court ordeal at that time and could not devote much time to correspondences. 

I met Ernesto Cardenal in 1987 when he was Culture Minister of Nicaragua. He had come to Mumbai and I met him in his hotel room. He wanted to know about our movement as the news had reached Latin America because of the Spanish and Portugese little magazines there. The Spanish language version of TIME magazine had also printed the same news that appeared in the English version of TIME with our photographs. I wanted to talk about Sandinista but found him reluctant on the subject. I had two long letters from him which I have not preserved. 

 

  1. What are your views on obscenity in art?  Allen Ginsberg has been accused of it. Saadat Hasan Manto has been accused of it. James Joyce, D.H.Lawrence, Gustave Flaubert, Charles Baudelaire, Henry Miller, Arundhati Roy, and many others have faced the annoyance of the authorities. Do you think that society still digs a straw at the ancient perception that art ought to be didactic?

You have openly expressed your dissatisfaction with Ginsberg’s clicking of pictures of  Indian beggars and lepers for the western audience. Do you think that is in a way obscene?

Malay : The problem is that we started thinking about Art in terms of the Western world view, specially Christian after the Britishers introduced their own brand of curriculum in India. We forgot our Alamkarshastra, Rasashastra and the Rasas. The Adi Rasa was condemned by James Long as obscene and because of him what now is known as Battala Sahitya, has vanished. James Long castigated Rasamanjari of Bharatchandra. When Obscenity is discussed, no one talks of Kalidasa, Jayadeva, Vidyapati, Chandidasa and other ancestors. It is no longer possible to go back as we are trapped in symbols, images, sonnets etc. Charges of Obscenity are labelled by powers in the Establishment, not by common readers. All the names you have mentioned were attacked by the Establishment. Buddhadeva Basu’s Raat Bhorey Brishti and Samaresh Basu’s Bibar and Prajapati were hauled to Court on charges of obscenity. Achintya Sengupta had stated that Jibanananda Das lost his lecturer’s job at City College in 1949 on charges of obscenity in his poem Campey. Art ought to be what our ancient Indian ancestors told us ; look at Khajurao ( destroyed by foreign invaders who had a different world view ) Puri temple and  Konarak or the sculptures at Meenakshi temple. Most of the beautiful sculptures were destroyed by invaders. Now they are talking of destroying Taj Mahal as they did in case of Bamiyan Buddha.

Yes, my Dad was very angry with Ginsberg because of those photographs. Ginsberg included them in his India Journals for the consumption of Western readers. Ginsberg proved to be someone of an Orientalist. I would not call it obscene. He saw India through the eyes of a regular Westerner. 

 

  1. How do you think Hungryalists developed a voice of their own? How was it different from the previous voices in poetry? Do you think that  Bengali poetry has considerably changed due to the movement?

Malay : Definitely Bengali poetry has changed. Look at poems written before and after the Hungryalist movement. We did away with the title defining the centre of a poem. The title was now a rubric and poems did not have a centre ; the poem was spread all over the work. We introduced open-endedness, multi-exit, free forms, heterotopia, absence of only one voice in a poem, liminality, break from cannons, spread of meaning, fragmentation, level jumping, logical cracks,. Rhyzomatizm, avoidance of symbols, flux, centrifugality, complexity, micro-narratives, interlocking, hybridization etc.

  1. Do you think idealism is important in life? In art? Do you feel let down by the artists who tune their voices with the people in power from time to time?

Malay :  I would not call it idealism. I would call it opinion ; a writer should have his own opinion on society, politics, economy, culture, writing  and other walks of life. It is not a question of me being let down. I did felt strange when a few Hungryalist like Subhas Ghose became a CPM card holder, started raising their slogans on the streets of Chandannagar, hoarded CPM flags with thick wooden sticks, took up the distribution of CPM newspaper Ganashakti in his area, became an active member of their moholla committee. Similarly Saileswar Ghosh joined the Trinamul Congress at old age and felt happy to be photographed with Education Minister. A large number of writers and poets joined the ruling Establishment — what were they against when they talked about anti-establishment voice ? I consider them fallen, enticed by the Rakshasas.

  1. We know about Unmarga and Wastepaper. Tell us about other little magazines that publish and promulgate hungryalist poetry.

Malay : I edited Zebra, two issues were published. Now ( 2019 ) Avishkar Prakashani has published a combined issue of Zebra. Subimal Basak published Pratidwandi, several issues were published. A letter written by Sandipan Chattopadhyay to all his friends was published in one of the issues which angered Sunil Gangopadhyay. Debi Roy published Chinho. Pradip Chowdhuri published Phooo ; it is still being published though mostly translated works of Pradip’s French poet friends. Pradip was in France for quite sometime. Pradip was rusticated from Visva Bharati for writing a poem dedicated to one of the descendants of Rabindra Nath Tagore. Sambhu Rakshit published Blues, which he renamed Mahaprithibi which is still being published. Aloke Goswami published Concentration Camp. Raja Sarkar published Dritarashtra. A researcer named Samiran Modak is trying to gather all the Hungryalist magazines and bring out an omnibus. Most of our bulletins were one-page leaflets and we did not think of preserving them.

  1. Tell us something about Shakti Chattopadhay leaving the group.

Malay : Shakti was unemployed and lived with Samir at latter’s Chaibasa hutment for three years. During this period he fell in love with Samir’s sister in law Sheela. In fact all his love poems in Hey Prem Hey Noihshabdo was written during this period. Shakti used to spend most of his time in Samir’s in law’s house. Shakti has written a novel Kinnar Kinnari based on his love life during Chaibasa period. Since he was not employed and drunk most of the time, Sheela’s father sent her to Patna to study Master of Arts in Bengali Literature from Patna University. Shakti thought that Samir and his in laws were trying to get Sheela married to me and became very angry. Actually at that time I was in love with a girl who is the centre of the poem for which I was arrested. 

  1. Do you think poetry has the power to change society?

Malay : No. Poetry per se is not going to change the society. When it becomes a potent force for the revolting public it contributes to change. During Bangladesh’s Liberation war poets such as Jasimuddin, Al Mahmud, Samsur Rahaman, Shahid Kadri, Rafiq Azad, Nirmalendu Goon, Rudra Muhammad Shahidullah, Abul Hasan wrote inspiring poems. 

You might be knowing that in 2011 by Michael Rothenberg and Terri Carrion launched a movement called 100 Thousand Poets for change or 100TPC. But they also knew that poetry per se is not going to change the world. The concept of “Change” in the name 100 Thousand Poets for Change refers to social change, but is otherwise broadly defined and dependent on the definitions of individual organizers or poets. 100TPC events do not necessarily share political or philosophical orientation. The 100TPC  describes the “change” as having only to fall “within the guidelines of peace and sustainability. It is held in India also but I do not know about their affairs.

  1. How relevant is your brand of poetry today?

Malay : My poetry has changed over the years. Each of my collection is a turning point in terms of voice, form and breath-span. I could not develop a brand like, say, Tagore, Jibanananda, Shakti or Joy Goswami.

  1. Do you consider the Hungryalist poets as ‘angry’ and ‘fiery’ ?

Malay : When you talk about the society in your writings ‘anger’ obviously enters into a poem’s psyche. Not all Hungryalist poems are ‘angry’ and ‘firey’. Poems written by Subimal Basak and Tridib Mitra are angry. Those written by Subo Acharya and Pradip Chowdhuri are confessional. Sambhu Rakshit Has been continuously experimenting with words and sentences. Debi Roy used level jumping and logical cracks in his poems most of which are socio-political. Views against the Establishment are more sharp in stories and novels, specially those of Subimal Basak, Basudeb Dasgupta, Abani Dhar, Aloke Goswami and Subhas Ghose. 

  1. Any regrets…..

Malay : Yes, I should have brought my ailing father to Mumbai in 1987 which I did not as I thought he was happy with Samir’s family at Patna. But in his last letter he wrote that he was not at all happy and was not being treated well by Samir’s wife and children. Dad felt alone after my mother’s death. He was quite fond of my son.

  1. Would you please share with us a poem that represent you.

Malay : I would like to share the poem for which I had to face 35 months ordeal at Kolkata, without a place to sleep, have food, most of the friends having disappeared due to police action etc. The poem is ‘Stark Electric Jesus’ ( or Prachanda Boidyutik Chhutar in original Bengali )

Oh I’ll die I’ll die I’ll die

My skin is in blazing furore

I do not know what I’ll do where I’ll go oh I am sick

I’ll kick all Arts in the butt and go away Shubha

Shubha let me go and live in your cloaked melon

In the unfastened shadow of dark destroyed saffron curtain

The last anchor is leaving me after I got the other anchors lifted

I can’t resist anymore, a million glass panes are breaking in my cortex

I know, Shubha, spread out your matrix, give me peace

Each vein is carrying a stream of tears up to the heart

Brain’s contagious flints are decomposing out of eternal sickness

other why didn’t you give me birth in the form of a skeleton

I’d have gone two billion light years and kissed God’s ass

But nothing pleases me nothing sounds well

I feel nauseated with more than a single kiss

I’ve forgotten women during copulation and returned to the Muse

In to the sun-coloured bladder

I do not know what these happenings are but they are occurring within me

I’ll destroy and shatter everything

draw and elevate Shubha in to my hunger

Shubha will have to be given

Oh Malay

Kolkata seems to be a procession of wet and slippery organs today

But i do not know what I’ll do now with my own self

My power of recollection is withering away

Let me ascend alone toward death

I haven’t had to learn copulation and dying

I haven’t had to learn the responsibility of shedding the last drops

after urination

Haven’t had to learn to go and lie beside Shubha in the darkness

Have not had to learn the usage of French leather

while lying on Nandita’s bosom

Though I wanted the healthy spirit of Aleya’s

fresh China-rose matrix

Yet I submitted to the refuge of my brain’s cataclysm

I am failing to understand why I still want to live

I am thinking of my debauched Sabarna-Choudhury ancestors

I’ll have to do something different and new

Let me sleep for the last time on a bed soft as the skin of

Shubha’s bosom

I remember now the sharp-edged radiance of the moment I was born

I want to see my own death before passing away

The world had nothing to do with Malay Roychoudhury

Shubha let me sleep for a few moments in your

violent silvery uterus

Give me peace, Shubha, let me have peace

Let my sin-driven skeleton be washed anew in your seasonal bloodstream

Let me create myself in your womb with my own sperm

Would I have been like this if I had different parents?

Was Malay alias me possible from an absolutely different sperm?

Would I have been Malay in the womb of other women of my father?

Would I have made a professional gentleman of me

like my dead brother without Shubha?

Oh, answer, let somebody answer these

Shubha, ah Shubha

Let me see the earth through your cellophane hymen

Come back on the green mattress again

As cathode rays are sucked up with the warmth of a magnet’s brilliance

I remember the letter of the final decision of 1956

The surroundings of your clitoris were being embellished

with coon at that time

Fine rib-smashing roots were descending in to your bosom

Stupid relationship inflated in the bypass of senseless neglect

Aaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaah

I do not know whether I am going to die

Squandering was roaring within heart’s exhaustive impatience

I’ll disrupt and destroy

I’ll split all in to pieces for the sake of Art

There isn’t any other way out for Poetry except suicide

Shubha

Let me enter in to the immemorial incontinence of your labia majora

In to the absurdity of woeless effort

In the golden chlorophyll of the drunken heart

Why wasn’t I lost in my mother’s urethra?

Why wasn’t I driven away in my father’s urine after his self-coition?

Why wasn’t I mixed in the ovum -flux or in the phlegm?

With her eyes shut supine beneath me

I felt terribly distressed when I saw comfort seize Shubha

Women could be treacherous even after unfolding a helpless appearance

Today it seems there is nothing so treacherous as Woman & Aet

Now my ferocious heart is running towards an impossible death

Vertigoes of water are coming up to my neck from the pierced earth

I will die

Oh what are these happenings within me

I am failing to fetch out my hand and my palm

From the dried sperms on my trousers spreading wings

300000 children gliding toward the district of Shubha’s bosom

Millions of needles are now running from my blood in to Poetry

Now the smuggling of my obstinate legs are trying to plunge

Into the death-killer sex-wig entangled in the hypnotic kingdom of words

Fitting violent mirrors on each wall of the room I am observing

After letting loose a few naked Malay, his unestablished scramblings.

( Copyright : Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi )

 

 

 

 

 

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Sunflower Collective in conversation with Malay Roychoudhury

Interview with Malay Roychoudhury

 

 

নাগপুরে মলয় রায়চৌধুরী

নাগপুরে মলয় রায়চৌধুরী

 

 

 

By The Sunflower Collective 

Malay Roychoudhury is an Indian Bengali poet and novelist who founded the Hungryalist Movement in the 1960s. He was awarded a Sahitya Akademy award for translating Dharamvir Bharati’s Suraj Ka Satvan Ghoda in 2003 but he refused to accept it. He spoke to The Sunflower Collective at length about his work, Hungryalist Movement, Allen Ginsberg, other writers associated with the Movement, politics and rifts with other poets, publishers, and the establishment during the Movement. 

The Sunflower Collective: Young poets are calling themselves Hungryalists in West Bengal again, as you said in a recent interview. Jeet Thayil is making a BBC documentary on Ginsberg’s time in India for which he met you. Deborah Baker wrote a book about the same not so long ago. Internationally, several films about the Beats hit the screens in quick succession in recent years. Do you see it as a revival of the two movements that were linked willy-nilly?

Malay Roychoudhury: I don’t think so. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Basudeb Dasgupta had been editing Hungryalist magazines, Kshudharta and Kshudharta Khabor, before they died a few years back. Pradip Choudhuri is still publishing Phoo and Swakal. Rasaraj Nath and Selim Mustafa are still publishing Anarya Sahitya. Ratnamoy Dey is still publishing Hungryalist Folder. Aloke Goswami had published Concentration Camp before he concentrated on writing novels and short stories. Arunesh Ghose continued publishing Giraffe before he died a couple of years back. Since these magazines are in Bengali and they are not active on social media, you don’t hear about them. Pradip Choudhuri has done a lot of translation of Hungryalist work in French.

Prior to Jo Wheeler and Jeet Thayil, another producer, Dominic Byrne, had come and made a radio programme exclusively on our movement. Marina Reza had come from Weslyan University for research on our movement. Daniella Limonella had come from Italy for the same purpose. University of Exeter has published an interview of mine in their Exeposé online newspaper. Mrigankasekhar Ganguly has made a film based on my poem, ‘Stark Electric Jesus.’ A debate is going on for a decade, for and against this poem on a Bangladeshi news portal.

Deborah Baker neither met any Hungryalist nor consulted any written material available at Kolkata’s Little Magazine Library Research Centre. Most of the information is wrong and concocted, though she claims to read and write Bengali. This Research Centre has an exclusive section on Hungryalist periodicals, bulletins, manifesto, and books.

Students at IIT, Kharagpur, Jadavpur University, Rabindra Bharati University, Visva Bharati University, Calcutta University, and Assam University have been doing PhD and M Phil, etc. on our work for more than a decade as a matter of academic routine.

Academic interest in the Beats, especially Allen Ginsberg, continues. He had himself established a Trust to look after the interest of all the Beats and his own work with the million dollars he got from Stanford University by selling his collections. Bill Morgan, one of the Trustees, had visited me when I used to reside at Kolkata.

We, the Hungryalists, have not even been able to bring out an anthology of our work in English and Hindi, as there is no commercial interest in our work from the publishers. And none of us are well to do. Hindi being the prime Indian language, the Sahitya Academy should have evinced interest in bringing out an anthology.

TSC: Ginsberg was concerned that the Beats did not receive the amount of academic attention in America they deserved. Do you feel the same about the Hungryalists, as far as the Indian academia is concerned? In the case of the painter Karanajai, it appears even the critics abandoned him after a while leading to a very embittered existence. What are your thoughts on this?

MRC: Yes, he was worried during his lifetime that the American Establishment is not ready to award them with governmental and academic recognition. However, presently a lot of academic work is being done on the Beats due to the next generation of poets, who took an interest in them. Even if the Beats were anti-Establishment, they were typical products of the American capitalist world. Ginsberg created his trust with a huge fund to carry on his legacy. Kerouac’s manuscript roll was sold for 2.40 million dollars, enough to carry on his legacy by his Trustees for eternity. Ferlinghetti opened City Lights Bookstore on West Front in order to regularly publish the Beats. In Greenwich Village, they had Barney Rosset’s Grove Press, James Laughlin’s New Directions and the Village Voice newspaper for support. They regularly interacted with the digital companies and brought out their recitations and films, etc. They appointed secretaries to enable them to get paid invitations for poetry readings from various European and American cities.

As I told you just now, there has been continuous academic work on Hungryalist poets and writers. Sahitya Academy has awarded prizes to Utpalkumar Basu, Sandipan Chattopadhyay, Binoy Majumdar, Saileswar Ghosh, and Subimal Basak. Since I do not accept literary and cultural prizes, I had refused their award. The point is we do not get publishers like Ferlinghetti or James Laughlin in Kolkata to bring out our works and arrange for distribution. And we do not get translators who would translate and publish our works in Indian periodicals. There is still a strong lobby against us at Kolkata, though it has weakened after Sunil Gangopadhyay’s demise; nevertheless Sunil’s trained disciples are still active.

After receiving the Lalit Kala Academy prize at a young age in 1972, Anil Karanjai started sympathizing with the Naxalite Movement; his studio at Benaras was ransacked by police. To avoid the repression, he married an American lady and went to Wahington DC to live there. He was soon disillusioned with the Western world and came back a few years later after divorcing the lady. He got involved in social activities and avoided the dirty machinations that painters had started resorting to at that time. Karuna Nidhan also fled from Benaras and went to Patna, where my elder brother Samir opened a coloured fishes shop for him. When Anil returned to Delhi, Karuna joined him. Anil married Juliet Reynolds and settled at Dehradun to avoid the Delhi painters’ circus. Anti-Establishment writers and artists in that circuit are rare these days.

TSC: What are your views on Shakti Chattopadhyay leaving the movement?

MRC: Shakti Chattopadhyay testified against me because Shakti had fallen in love with Samir’s sister-in-law, Sheela, at Chaibasa. He felt that he could not marry Sheela because of Samir, who did not want her to get married to an unemployed drunkard. That Sheela was living at our Patna residence at that time for post graduate study at Patna University added fuel to Shakti’s fire.

This, along with instructions from a newspaper group which was against us, and which offered Shakti a sub-editor’s job, forced him to leave the movement. Now, after Sunil Gangopadhyay’s death, when Sunil’s letters to his friends are being published, it is found that Sunil was goading his friends to leave Hungryalist Movement, as Sunil thought that my sole motive in launching the Hungryalist Movement was to destroy his ‘Krittibas’ group. Almost all of these letters spew venom against me. In these letters, Sunil wrote that to be an anti-establishment writer, you have to join the Establishment and work from within.

TSC: Is there something akin to an anxiety of influence which informs the relationship between the two movements? In his Indian Journals, Ginsberg continues to profess adherence to the Blake vision. He mentions the harmonium but there is no indication he first learnt about it through the Hungryalists. At what point do you think he discarded the Blake vision and allowed the Indian influences to play out? Could you give some specific examples? I understand that his use of breath as a measuring unit for verse might be one?

MRC: I don’t think we were bothered about influencing each others’ movements. In an interview to LIFE magazine, Ginsberg had said that the Blake vision departed from him when he was traveling in a train while returning from India and started weeping.

When he had visited Bodhgaya, he had chanced upon a piece of stone wherein small replicas of Buddha were inscribed. He had told me that seated on two stones he was shitting, as at that time the Japanese had not developed Bodhgaya and it was almost a village. He said it was a divine direction from Buddha; thus he became interested in Buddhism and departed from mysticism. Due to archaeological restrictions, he could not carry the stone to USA. He had cleaned that stone with his tooth brush at our Patna residence.

Bill Morgan, one of Ginsberg’s trustees, who visited me, had said that there were more than fifty copies from which edited pages were included in his Indian Journals. Ginsberg was spied upon by the Indian agents and a few of his copies were picked out of his shoulder sling-bag by some of these agents to find out what he was recording. Ginsberg himself told me about it. The harmonium story might have been in one of the fifty copies.

Sunil Gangopadhyay, who was in the USA at the time of editing Indian Journals, tried his best to shut out the Hungryalist Movement from this book. Bill Morgan had told me that Ginsberg regularly mailed packets to his step-mother in New Jersey so that she could arrange the papers in the almirahs of their basement. Ginsberg had country-wise almirahs. He collected most of our manifestos and they are available in Stanford University.

TSC: In his Indian Journals, Ginsberg does not allude to your movement, although he knew about it and took a deep interest. Do you think it was deliberate? Do you think he appropriated your techniques and attitudes regarding poetry and art in general?

MRC: I think I have answered your question just now.

TSC: Ginsberg met poets in Bombay also, including Kolatkar and others. How can then it be said that he was principally influenced by the Hungryalists?

MRC: He met poets of other Indian languages for a day or two ; but he stayed in Kolkata for about two years, attended Bengali poetry readings, went to country liquor den Khalasitola, visited by Bengali poets, Sonagachhi visited by Bengali poets, and smoking joints, visited by Bengali poets.

TSC: You have criticised Ginsberg for clicking pictures of beggars while he was here. Is that part of a larger disenchantment with your old friend? Do you think at the end of the day, he was as superficial as other white tourists?

MRC: Yes, when Ferlinghetti sent me a copy of Indian Journals I felt quite ashamed. I did not show the book to my dad, who had admonished Ginsberg for taking photographs of beggars, lepers, lame men, naked sadhus, etc. I have visited other countries and never thought of making a mockery of poverty of certain people. In his Indian Journal, there is a photograph of Ginsberg himself in the guise of a beggar seated beside a beggar.

Ginsberg had several photo exhibitions in USA, which highlighted Indian beggars, lepers, destitutes, almost naked sadhus, cows on the streets, stray dogs, goats, etc. Cards to these exhibitions were sold to patrons. When he revisited India during the Bangladesh War (1971), he shot photos of refugees fleeing the war zone.

He did have the typical white tourist in him.

Probably my childhood in Imlitala slum taught me to respect the poorest man.

TSC: Could you tell us about the politics of the Hungryalists? Were there direct links back then between the Naxals and the Hungryalists?

MRC: Hungryalist Movement had started in 1961; the Naxalite Movement started in the Seventies. I have already told you about the plight of Anil Karanjai and Karuna Nidhan. My first book was on Marxism. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Aloke Goswami had joined the CPI (M) for literary gains. I was disillusioned with Marxism after I started reading about the activities of the Soviet establishment as well as the activities of the lumpens of CPI (M). Strangely CPI (M) resorted to the same murderous activities of the earlier Bengal governments. Now the new Bengal government has co-opted the same lumpens and are resorting to same murderous activities.

TSC: The Beats were criticised for their lack of gender awareness. How do the Hungryalists fare in your opinion on that count? Were there female hungry gen writers and artists? Also, did the movement display consciousness of caste issues?

MRC: Young bold women writers were rare at that time. We had one lady member, Alo Mitra, who later married Tridib Mitra. They together used to edit two Hungryalist magazines, one in Bengali, named, UNMARGA, another in English named, WASTE PAPER.

We were the first to bring lower and backward class writers and poets in literature. Prior to us, there was not a single poet to be seen on the pages of poetry magazines. Debi Roy, Subimal Basak, Abani Dhar, Rasaraj Nath belong to lower or backward class.

TSC: Tell us a little about your poetic process? What influences and inspires you? Is the process of writing poems that deal with stark reality harder than facing the wrath of audience and editors?

MRC: I was initiated into poetry in a strange way. Being a Brahmin family, at our Imlitala house we were not allowed to eat chicken eggs. I was sent to fetch duck eggs from our Shia Muslim neighbour quite frequently. I was ten. The elder girl of their house whom I called Kulsum Apa was fifteen-years-old. She used to recite Ghalib and Faiz Ahmed Faiz to me, whom I did not understand; but she explained those poems to me. She indirectly, through those poems, told me that she loves me. One day when I asked for the meat being cooked in their house because of the scent, she induced me into a sexual relation. The meat was wonderful and she licked clean my lips with her tongue. After a few days, due to painful scratches on my penis, I got scared and stopped going to Kulsum Apa’s house. However, the impact of the poems remained. I had told about this sexual relation to my grandmother, who told me to never talk about it to anyone in my life. I still miss Kulsum Apa. When I last visited Imlitala, I enquired of the family and was told that they had sold their house and left Imlitala.

My next influence was again a girl of higher class named Namita Chakroborty at the Ram Mohun Roy Seminary, who doubled up as Librarian for the Bengali section. I had a great crush on her. She initiated me into Marxism and introduced me to works of Brahmo writers and poets, including Rabindranath Tagore and Jibanananda Das. One day I had kept a chit on her table in which I had written ‘I love you’. She had preserved the chit and showed it to one of my aunts after several years, when my name started appearing in magazines and papers. Both Kulsum Apa and Namitadi had dimples.

At Imlitala house, we had two servants, Shivnanni and Ram Khelawan, who were paid in kind, that is food, dresses, and shelter. Since they were servants, they could not reprimand us children directly. Shivnanni knew Ramcharitmanas by heart. Ramkhelawan knew dohas of Kabir, Rahim, and Dadu. Both of them reprimanded through quotations and explained the lines as well. Shivnanni used to play a game called, Ramshalaka, that is a metal stick. You have to close your eyes, open a page and put the Ramshalaka on a line. Shivnanni explained how our day will pass based on the line.

Imlitala was considered a bad influence by Dad as we were exposed to free sex, toddy, cannabis, country liquor, etc. He constructed a house in Dariapur and we shifted there. My elder brother Samir was packed off to Kolkata for post-school studies. It helped me. He joined groups of poets and brought lots of poetry collections and periodicals for me. Ginsberg had come to our Dariapur residence. Prior to that Ginsberg and Orlovsky had visited Samir at Chaibasa, Singhbhum and experienced Mahua drink.

I am not bothered about editors in my life. Only when I am requested, do I send my poems and novels to them. Most of the editors are younger to me and they respect me. Yes, dealing with reality is harder. Earlier I used to maintain a bank of images, words, lines, sentences when I wrote with pen on paper, Now, because of arthritis of fingers, especially the thumb, the process has become difficult with the computer. Since I take a lot of medicines, including sleeping pills, I tend to forget these days.

TSC: What is your opinion of the current writing scene in Bangla and English in India? Are there any writers you like in particular?

MRC: I do not have much idea about what is happening in Indian Writing in English. As far as Bengali writing is concerned, lot of exciting things are happening in the little magazine world. Every year a Little Magazine Fair is held apart from the Kolkata Book Fair. Book Fairs are also held at the district headquarters. This gives us a glimpse into a wide range of creative writing.

The poets whom I have noticed recently writing in a new way are Raka Dasgupta, Sridarshini Chakraborty, Mitul Dutta, Barin Ghoshal, Dhiman Chakraborty, Anupam Mukhopadhyay and Bahata Anshumali, to name a few.

TSC: Are you concerned about the general rise of right-wing and other intolerant forces in India and elsewhere?

MRC: Yes, I am very much disturbed by the latest events taking place all over India. It appears that a worthless government run by cheaters was better than one influenced by fundamentalist criminals baying for blood of the meek and helpless. I wonder how this country had once given us Khajuraho, Puri temple, Meenakshi temple, Konarak, Ajanta, Ellora; how kings enjoyed meat and wine after the Ashwamedh Yajna.

TSC: Is Neera in Sunil’s poems and the one whose name appears in your poem, “Please Don’t tell my grandmother”, the same person? Was she real? Was she a writer/publisher who could be associated with the Generation? Is Mala in Debi Roy’s Malar Jonne real? Was she, too, a poet associated with the Generation?

MRC: Yes, she is the same Neera. Sunil Gangopadhyay never asked for a poem from me for his magazine, Krittibas. After his death, his wife Swati Gangopadhyay became the editor of Krittibas, which Sunil used to edit. Krittibas asked me to contribute a poem. I had sent this poem but they were scared to publish it in Krittibas. They did not publish it and told me to replace it. Obviously I had to decline. But the fact became known to the little magazine circle of poets and writers in Kolkata.

No, Debi Roy’s wife Mala was not a poet; she was a housewife. She died recently.

The interview was first published in The Sunflower Collective on 10/11/15 

Bio:

Malay Roy Choudhury is a Bengali poet and novelist, who founded the Hungryalist Movement that took the poetry scene in Bengal by storm in the 1960s. The Hungry Generation was a literary/art movement that Malay Roy Choudhury, along with Shakti

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান