মলয় রায়চৌধুরীর আত্মসাক্ষাৎকার

এই সাক্ষাৎকারের ধারণাটি ‘দাহপত্র’ পত্রিকার সম্পাদক কমলকুমার দত্তর । তিনিই প্রস্তাব দেন যে নিজের সঙ্গে নিজে কারোর সাক্ষাৎকার নেবার নজির সম্ভবত বাংলায় নেই । মলয় রায়চৌধুরীকে তিনি প্রস্তাব দেন যে তিনি নিজের সঙ্গে নিজের একটি সাক্ষাৎকার তৈরি করুন যা তাঁর লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে । তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি সাহিত্যিক মহলে অভাবনীয় সাড়া ফেলেছিল ।কারণ এই ধরণের সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম । সে-কারণে ২০০৪ সালের কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় তিনি এটি গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেন । এখানে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হল।

প্রশ্ন: তুমি তো বহু সাহিত্য পত্রিকায় ইনটারভিউ দিয়েছ । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে দিয়েছ । বহির্বাংলার বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে দিয়েছ। পোস্টমডার্ন সাহিত্যভাবনা সম্পর্কে দিয়েছ । ইংরেজি আর হিন্দি পত্রিকায় দিয়েছ । চাকরি পাবার জন্যে, চাকরিতে পদোন্নতির জন্যে দিয়েছ । তাছাড়া তুমি স্বদেশ সেন, কার্তিক লাহিড়ি, দীপঙ্কর দত্ত আর সুবিমল বসাকের সাক্ষাৎকার নিয়েছ । যখন তুমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর ফয়জাবাদ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ডায়রেক্টর ছিলে, তখন তুমি ক্লার্ক আর অফিসার পদে কর্মী নিয়োগের ইন্টারভিউ নিতে । সাক্ষাৎকার দেবার আর নেবার বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা তোমার হয়েছে । এখন কেউ যদি তোমাকে বলেন যে তুমি নিজের একটা সাক্ষাৎকার নাও, কিংবা তুমি নিজেকে একটা ইন্টারভিউ দাও, তাহলে তোমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? তোমার মনের মধ্যে যা ঘটতে থাকবে, তা তুমি কীভাবে সামাল দেবে ?

উত্তর: বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো, যিনি বা যাঁরা সাক্ষা৭কারগুলো নিয়েছেন, তা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থন যোগাবার জন্যে নেওয়া, বিশেষ করে হাংরি আন্দোলন নিয়ে যে সাক্ষাৎকারগুলো তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা নিয়েছেন, সেগুলো । প্রায় সবই মোটিভেটেদ । সকলেই মোটামুটি একটা হাংরি ইমেজ নির্মাণ বা অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে রচিত আমার লেখাপত্র সম্পর্কে কোনোও বিশ্লেষণভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেননি তাঁরা । অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে আমার বইটই পড়ে নিজেদের প্রস্তুত করেননি । আমার ডিসকোর্সের পরিবর্তে, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা নিজেদের ডিসকোর্সকে জায়গা করে দিতে চেয়েছেন ।ম পোস্টমডার্ন ভাবনা নিয়ে যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি জানার জন্যে, এবং পাঠকদের সঙ্গে বিষয়টির পরিচয় করাবার জন্যে নিয়েছেন । সাকআৎকার কীভাবে নেয়া উচিত, তা স্পষ্ট করে দেবার জন্যেই আমি কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলুম । তবে, বহুল-প্রচারিতদের সাক্ষাৎকার আমি নিইনি, কেননা তাঁরা মিথ্যায় গড়া সাবজেক্ট-পজিশানের কারবার করেন । গ্রামীণ ব্যাঙ্ক দুটোর কর্মী নিয়োগের জন্যে ইন্টারভিউ নেবার জন্যে আমায় নিজেকে পড়াশুনা করে যোগ্য করে তুলতে হয়েছিল । এখন তুমি যেই বললে নিজেই নিজের সাক্ষাৎকার নেবার কথা, আমার মনে হল, ব্যাপারটা অ্যাবসার্ড, কেননা যে নিচ্ছে তার এবং যে দিচ্ছে তার, এই স্হিতিটা তো দুটি সাবজেক্ট পোজিশানের বাইনারি অপোজিট নয় । একাধিক সাবজেক্ট পোজিশান রয়েছে, এবং প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে, যে-অবস্হায় এক্সটেমপোর জিনিস বেরোতে পারে বলে মনে হয় না । ব্যাপারটা আমার কাছে ওই সাবজেক্ট পোজিশানগুলোর ওপনিং আপ প্রক্রয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সমস্যা হল যে, এই ওপনিং আপ তো বিশাল, তাকে তো কিছুক্ষণ বা কয়েকদিনের চিন্তা পরিসরে ছকে ফেলা যাবে না । তার ওপর, যাকে দ্বিপাক্ষিক ডিসকোর্স হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তার মধ্যে দুটি পক্ষই এমনভাবে গড়ে উঠতে পরে যে, সাক্ষাৎকারের বদলে তা হয়ে দাঁড়াবে আত্ম-বিশ্লেষণ । ফলে সাক্ষাৎকারের genreটাকে subvert করে ফেলা হবে । তার মানে, একটা formless সাহিত্য-সংরূপ চাগিয়ে উঠবে, যাকে define করা কঠিন । বিজ্ঞানী মণি ভৌমিক যাকে বলেছেন বুদ্ধিমত্তার manifest শেষাবধি সেরকম একটা আদল-আদরা পাবে ।Syncretism দিয়ে সামাল দিতে হবে, যে প্রক্রিয়ায় জীবনের সবকিছু সামাল দিচ্ছি ।

প্রশ্ন: মাঝে-মাঝে অফিসের কাজে তুমি মুম্বাই থেকে পশ্চিমবাংলায় আসতে । পঁয়ত্রিশ বছর পরে পাকাপাকি কলকাতায় থাকতে এসে তোমার মনখারাপ হয়ে গেল কেন? তোমার আত্মীয় পরিজন, সাবর্ণ চৌধুরী ক্ল্যান, বন্ধুবান্ধব, সবায়ের সঙ্গে আবার দাখাসাক্ষাৎ হল, পাণিহাটি-কোন্নোগর-উত্তরপাড়ার কৈশোরের সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে দেখা হল, তা সত্বেও তোমার মন কেন পীড়িত বোধ করতে লাগল ? মনে হল যে তোমার মস্তিষ্কের মধ্যে আবাল্য লালিত দেশের বাড়িতে তুমি ফেরোনি ?যেখানে ফিরেছ, তা অন্য ভূখণ্ড ? যাদের মাঝে ফিরেছ, তারা সম্পূর্ণ অন্য লোক ? যা লাগবে বলবেন কাব্যগ্রন্হে তুমি এই মননস্হিতি আর্টিকুলেট করলে, কিন্তু বুঝতে পারলে যে, যাদের পক্ষে ওই পাঠকৃতি প্রবেশযোগ্য ছিল, সেই আদি ভূমিজ পশ্চিমবঙ্গবাসী নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে ? এই পীড়া তো নিরাময়ের অতীত ! কী করবে তুমি?

উত্তর: আমার এই দেশাত্মবোধ এতই বিমূর্ত আর জটিল যে, অনেক সময়ে আমার মনে হয়, আমার পীড়া আমারই সৃষ্ট । এ-জিনিসটা দেখনসই বাঙালিয়ানা নয় । কিংবা এমনটাও নয় যা আমার আত্মীয়-জ্ঞাতিরা বলে থাকেন, যে, রিফিউজিরা এসে আমাদের পশ্চিমবাংলাকে ধ্বংস করে দিলে । বস্তুত অন্য শব্দ না পেয়ে আমি দেশাত্মবোধ শব্দটা প্রয়োগ করছি । পাকাপাকি ফিরে আসার পর, মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে মুম্বাইতে বা মেয়ের কাছে আহমেদাবাদে যাই, আমি বুঝতে পারি, আমি এই পীড়া নিজের সঙ্গে নিয়ে বেড়াই । জলাঞ্জলি উপন্যাসের শেষার্ধে এবং নামগন্ধ উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু বোধটা এমনই অ্যাবসট্র্যাক্ট যে অনায়ত্ত রয়ে গেল । ব্যাপারটা পারক্য, এলিয়েনেশন, একাকীত্ব, মন ভালো নেই ধাঁচের নয় । অ্যানুই নয় । একে শেয়ারও করা যায় না । আমার মনে হয় মুম্বাই থেকে মাঝে-মধ্যে পশ্চিমবাংলায় অফিসের কাজে আসার সময়ে আমি এই পীঢ়া-বোধটা পিক আপ করেছি । বাঙালির সঙ্গে বাঙালি মন খুলে কথা বলে না টের পাবার পর আমি এম আর চোওধারি হয়ে হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলতুম । মুর্শিদাবাদ-মালদা জেলায় উর্দুভাষী মুসলমানের মতন কথা বলেছি । দাড়ি রাখার সূত্রপাত এই ক্যামোফ্লেজের প্রয়োজন মেটাতে । সাহিত্যিকদের সঙ্গে পারতপক্ষে মেলামেশা করতুম না । কেউ আমায় চিনত না বলে অসুবিধা হয়নি । এলডিবির ম্যানেজিং ডায়রেক্টর প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ আমার পাশে বসে সরকারি মিটিঙেও জানতে পারেননি । আর কোনও কবি বা লেখক এই পীড়ায় আক্রান্ত কি না জানি না । এ কোনোও অসুখ নয় । একজনকে গভীর ভালোবাসতুম, অথচ এখন দেখে আর তার সঙ্গে বাস করে, বুঝতে পারছি না সে-ই কি না, অথচ তার কাছেই তো এসেছি । বাইরে না গিয়ে টানা এখানে থেকে গেলে এরকমটা হতো না হয়তো । যাঁরা সেই তখন থেকে পশ্চিমবাংলার সাথাসাথা মেটামরফোজড হয়েছেন, বা মেটামরফোসিস প্রক্রিয়াটিতে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের এই পীড়ার বোধটা জন্মায়নি । না লেখকদের, না আলোচকদের । আমার তাই সন্দেহ থেকে যায় যে আমার পাঠকৃতি আর পাঠক-আলোচকদের মাঝে ওই পীড়া একটা অনচ্ছ দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তো ? কেননা, এমনিতেই আমার পাঠকৃতির আগেই আমার ইমেজ—কালীকৃষ্ণ গুহের কাছে একরকম, অনিকেত পাত্রের কাছে একরকম, আবার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে আরেকরকম—পাঠকের কাছে পৌঁছে ভ্যারিয়েবল ইন্টারপ্রিটেশনের সম্ভাবনা গড়ে ফ্যালে, যা আসলে পাঠকের নিজের চাহিদা মেটাবার জন্যে । পাঠকৃতির উদ্দেশে নয় । সম্ভবত গ্রহণ-বর্জনের বৈভিন্ন্যের নিরন্তর টানাপোড়েনে পাঠকৃতি-বিশেষ তার নিজের পরিসর অহরহ গড়ে নিতে থাকে । তার কিনারায় গালে হাত রেখে বসে থাকা ছাড়া আমের কিছু করার নেই ।

প্রশ্ন: তুমি তোমার কবিতা অনুশীলনে ফর্ম, কনটেন্ট, মিঊজিকালিটি এসব নিয়ে প্রথম থেকেই ভেবেছ কী? এগুলো আলাদা-আলাদা ভেবেছ কী ? নাকি একটা কবিতাকে এককসমগ্র উৎসার ভেবে ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠতে দিয়েছ? প্রশ্নটা এই জন্যে করতে হল যে একটা একঘেয়ে আদল না থাকলে সেই কবির কাজগুলোর একঘেয়েমির ছাপ পাঠকের মগজে বসতে পারে না বলে পাঠক তোমার কাব্যজগত সম্পর্কে পাকাপাকি ধারণা তৈরি করার বদলে কনফিউজড হয়ে যান । রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, নজরুল, বিষ্ণু দে, সমর সেন, আলোক সরকার, যাঁর কবিতার দিকে তাকাও, দেখবে যে তাঁরা অনুশীলনের মাধ্যমে নিজস্ব একঘেয়েমি গড়ে তুলেছেন যার ছাঁচে তাঁদের যে কোনোও কাব্যিক ডিসকোর্স ঢালাই করে দিয়েছেন । অথচ তোমার প্রথম কাব্যগ্রন্হ শয়তানের মুখ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্হ জখম একেবারে আলাদা । তারপর প্রকাশিত হল মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর যার সঙ্গে সামান্যতম মিল নেই জখম কাব্যগ্রন্হের । এরপর বেরোল হাততালি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর বইটার কবিতাগুলো থেকে । তোমার সাম্প্রতিক কৌণপের লুচিমাংস পর্যন্ত এই ব্যাপারটা লক্ষ করা গেছে । সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা দখলের জন্যে প্রধান ব্যাপার হল একঘেয়েমি, যাকে ইউরোপে বলা হয়েছে কবির মৌলিক শৈলী । সর্বজনস্বীকৃত সেই পথ অগ্রাহ্য করে তুমি ভুল করে যাচ্ছ না কি ?

উত্তর: ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে আমাদের সংস্কৃত শিক্ষক বলেছিলেন, “আরে ইংরেজদের বুকে অত দম আছে নাকি যে বেদ-উপনিষদের মতন শ্লোক লিখবে বা গীতা মতন কাব্য লিখবে ? শিতের দেশের লোক, চান-টান করে না, একটুতেই দম ফুরিয়ে যায় বলে অমন কবিতা লেখে, যেন ছুটতে ছুটতে দম নিচ্ছে ।” কালিদাসের আড়াল নিয়ে তুমুল আক্রমণ করতেন টেনিসন, কীটস, শেলি প্রমুখকে । তখন অত না বুঝলেও, ব্যাপারটা আমার মাথায় থেকে গিয়েছিল । যখন কবিতা লেখা আরম্ভ করলুম, গোগ্রাস বইপোকা ছিলুম বলে, য়েশ পড়াশোনা করে ফেলতে পেরেছিলুম যাতে পয়ার ফাটিয়ে বেরোতে পারি । আমার মনে হয়, কবিতায় একঘেয়েমি বজায় রাখার জণভে একটা টিপিকাল বাল্যকালীন আত্মপরিচিতির সঙ্গীতজগত দরকার হয়, যা অগ্রজ বাঠালি কবিদের মতন আমার ছিল না । দাদারও ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি, জানোয়ার এবং আমার ভিয়েতনাম কাব্যগ্রন্হ তিনটের মধ্যে একঘেয়েমির মিল নেই, যা দাদার বন্ধু দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপধ্যায় প্রমুখের কবিতায় আছে । বিহারিপাড়ার অন্ত্যজ লোকসঙ্গীত, শিয়া মুসলমানদের গজল, নাথ, কাওয়ালি, মিশনারি স্কুলে চার্চ কয়্যার, রামমোহন রায় সেমিনারিতে ব্রাহ্মসংগীত, বাবার দোকানের কর্মী ডাবরের রহিম-দাদু-কবীর, বাড়ির কাজের লোক শিউনন্নির রামচরিতমানস, বঢ়জ্যাঠার আঙুরবালা-শু্ভলক্ষ্মী, বড়দি-ছোড়দির খেয়াল-ঠুমরি, জ্যাঠাইমার নানারকম পাঁচালিগান, সতীশকাকার চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে মন্ত্রৌচ্চারণ, এই পলিমরফাস মিউজিকালিটিতে আমার বাল্যকাল কেটেছে । এই অধম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় আমি ব্যাপারটাকে চেহারা দেবার চেষ্টা করেছি । একটা পলিসোনিক পরিমণ্ডলে বড় হওয়ায় এক কাব্যগ্রন্হ থেকে পরের গ্রন্হে পরিবর্তনটা মনে হয়েছে অপরিহার্য । তা নইলে একটা নতুন বই বের করার দরকারটাই বা কী? পাঠক নামক একজন অপরকে সামনে দাঁড় করিয়ে, নিজের কাব্য টেক্সটের দশহাজার কিলোর একঘেয়ে হাতুড়ি ঠুকে যাচ্ছি বছরের পর বছর, ওটা আমার ভাষা-প্রযুক্তির অন্তর্গত ছিল না কখনও । কবিতা পড়তে শুরু করে বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখের ভাষা-স্ট্রাকচারকে মনে হয়েছিল আউট অ্যান্ড আউট বুর্জোয়া । ভিরমি খেয়েছিলুম দাদার কাছে শুনে যে ওনারা মার্কসবাদী । তারপর তো নকশাল কবিদের দেখলুম যারা কবিতা লিখেছেন কুলাক-বাড়ির ভাষায় । আসলে সবাই ভেবেছেন কী বলছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । তাই যদি হবে, তো কবিতা লেখা কেন? অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্র্যভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব প্রমুখ বাঙালিরা তো ওসব বলে গেছেন বহুকাল আগে । বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন, “ও ওইসব কালচার-ফালচার নিয়ে থাকে ।” কথাটা আমায় স্ট্রাইক করেছিল । বঙ্গসংস্কৃতির দুটো বর্গ আছে । রবীন্দ্রনাথ থেকে শঙ্খ ঘোষ হয়ে হাল আমলের বহু কবি হলেন কালচারের মানুষ, যাঁদের কবিতায় একঘেয়েমিটা কালচার দ্বারা নির্মিত । আমি আর আমার মতন কেউ-কেউ হলেন ফালচার বর্গের মানুষ, যাঁরা একঘেয়েমি না কাটাতে পারলে পাগল হয়ে যাবেন । ফালচার বলতে আমি ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্পেসটার কথা কেবল বলছি না । আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন ব্রাহ্ম বলে । পিরিলি বাউনদের বজরা উত্তরপাড়ার গঙ্গায় ভাসলে স্নান অর্ধসমাপ্ত রেখে ঠাকুমার পাল্কি ফিরে আসত । সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ ছিল কেননা তা লোচ্চাদের তামাসবিনি । অথচ পাশাপাশি মিশনারি স্কুল আর ব্রাহ্ম স্কুলও ঘটেছে । এই ইরর‌শানালিটি দিয়ে ডিফাইন করতে হবে ফালচার ব্যাপারটাকে । নিজেরা ফালচার বর্গের হয়েও আমি আর দাদা যে লেখালিখি আরম্ভ করলুম, তার কারণ অবশ্য মামার বাড়ির উচ্চমধ্যবিত্ত কালচার । ফালচারজগৎ এবং কালচারজগতের মাঝে যোগসূত্র ছিলেন শৈশবে পিতৃহীন আমার মা । আমি তো আর কোনো কবি-লেখকের কথা জানিনা, যাঁর সাবজেক্ট পোজিশানগুলো এরকম স্পেস আর টাইমে গড়ে উঠেছে । কালচার এমনই এক বাঙালিয়ানা যে-পরিসরে কখনও তুর্কি, কখনও ইরানি, কখনও ব্রিটিশ, কখনও সোভিয়েত, কখনও মারোয়াড়ি তাপের আঁচ কাজ করে গেছে বলে তা বেশ সুশৃঙ্খল । ফালচার জায়গাটার লোকটা বাঙালি বলে তার বিশৃঙ্খলা দিয়ে বাঙালিয়ানা সংজ্ঞায়িত; কোনোও সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় সীমানা নেই । আমার ফিকশানে বহু চরিত্রের নির্গুণ বৈশিষ্ট্য এই সীমাহীনতার বোধ থেকে এসেছে । আমাদের উত্তরপাড়ার বাড়িটা শুনেছিলুম কোনও তুর্কি স্হপতির নকশা অনুযায়ী তৈরি, ইজিয়ান সমুদ্রের পূর্বপাড়ের ভিলাগুলোর আদলে; তিনশ বছর আগে বাড়ির সামনে দিয়ে গঙ্গা বইত । বাড়িটায় পঞ্চমুণ্ডের আসন ছিল; আর সেই জায়গাটায় বসে ছোটোবেলায় বেশ ফালচারি ফিল নেয়া যেত । সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রমুখের সাইকিতে এরকম প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা সম্ভব কি? এই সাবভারসিভ ফালচার? নেই, সম্ভব নয় । তাঁরা সমন্বিত চেতনার ইউনিফায়েড সেল্ফের বাইরে বেরোতে অপারগ । তান্ত্রিক নকশা-আঁকা লাল সিমেন্টের চারকোণা জায়গায় স্রেফ কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থেকে যে নানা সাবজেক্ট পোজিশান স্পষ্ট হয়, ভয়ের, অতীতের, শবের, ধর্মের, নেশার, তন্ত্র নামক অনচ্ছ ধারণার, যৌনতার, এবং এ-ধরণের পাঁচমেশালি ফালচারি পরিচিতি, তা থেকেই তো জেনে গিয়েছিলুম যে শৈলীর একঘেয়েমি চলবে না । একটা বইয়ের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা পুরোনো হয়ে গেলে পরের বইতে যেন বোঝা যায় যে দুটি কাব্যগ্রন্হের মাঝে এক বা একাধিক সাইকো-লিংগুইস্টিক রাপচার্স ঘটে গেছে । আমার সাইকো-লিংগুইস্টিক স্পেসটাও মাইগ্রান্ট, কিন্তু সে মাইগ্রান্সি দেশভাগোত্তর রিফিউজি পরিবারের কবি-লেখকদের থেকে ভিন্ন, কেননা আমার মধ্যে রিরুটিঙের উদ্বেগ ছিল না, নেই । আমার মাইগ্রান্সি বজায় আছে । রিরুটিং পাকা হতেই রিফিউজি পরিবারের কবির মাইগ্রান্সি হাপিস, এবং তাঁরা একঘেয়েমির খপ্পরে । মনে হয় যে একঘেয়েমির ছকে পড়ে গেলে আমার কবিতা লেখা ফুরিয়ে যাবে । কবিতা লেখা বেশ কমে এসেছে । পত্রিকাগুলো চায়, কিন্তু ছকের মধ্যে থেকে যাচ্ছে বলে বাতিল করে দিতে হচ্ছে । একইরকম কবিতা অনেকে হুহু করে দিনের পর দিন কীভাবে লিখে যান, কে জানে! অধিকাংশ বিদ্যায়তনিক আলোচক এখনও ইউরোপে উনিশ শতকে শেখানো লেখককেন্দ্রিক আলোচনাপদ্ধতিতে আটক, আর কেবল সময় সময় সময় সময় বকে যান । আলোচনা যে পাঠবস্তুকেন্দ্রিক হওয়া উচিত, স্পেস স্পেস স্পেসের ভাবনা ভাবা দরকার, তা এখনও খেয়াল করে উঠতে পারেননি আলোচকরা । এখনও তাঁরা ইউরোপীয় অধিবিদ্যার মননবিশ্বের কারাগারে নিজেরা নিজেদের পায়ে বেড়ি হাতে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছেন ।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতা , এই দুটি ধারায় তুমি গ্রেপ্তার হয়েছিলে । তোমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেপ্টেম্বর ১৯৬৪তে । তোমাকে চার্জশিট দেয়া হল আর তোমার বিরুদ্ধে মকদ্দমা আরম্ভ হল মে ১৯৬৫তে । এই নয় মাস কলকাতার মিডিয়া আর কফিহাউস-বুদ্ধিজীবিরা অবিরাম প্রচার চালিয়েছিলেন যে তোমার বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা পোরনোপুস্তক লেখার অভিযোগ উঠেছে । তুমি যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সে খবর মিডিয়া বেমালুম চেপে গিয়েছিল ওই নয় মাস । বিদ্ধদেব বসু এবং সমরেশ বসুর বিরুদ্ধে যে মকদ্দমা হয়েছিল, ওনাদের বিরুদ্ধে কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল না । তোমার বিরুদ্ধে সিরিয়াস অভিযোগ ছিল বলে তোমাকে আর তোমার দাদাকে জেরা করেছিল একটা ইনভেস্টিগেটিং বোর্ড যাতে সদস্য ছিলেন পুলিস, সেনা, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপতরের উচ্চপদস্হ আধিকারিকরা । মামলা রুজু হতে তুমি দেখলে যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নেয়া হয়েছে, এবং চার্জশিট দেওয়া হয়েছে অশ্লীল কবিতা লেখার ধারায় । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নায়া হয়েছে দেখে তোমার মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল কেন? এ-রাষ্ট্র তো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সরকার নয় যে তুমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা করে গর্ববোধ করবে ? তোমার নিজেরই স্বদেশী উত্তরঔপনিবেশিক সরকার ! তোমার তো ভারমুক্ত বোধ করা উচিত ছিল । পরিবর্তে তুমি বিষণ্ণ হলে ?

উত্তর: স্বাধীনতা লাভের পর একজন কবির বিরুদ্ধে প্রথম রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলা হল । সারা ভারতবর্ষে প্রথম । কেবল কবিতা বা গল্প নিয়ে নয়, আমি রাজনীতি আর ধর্ম নিয়েও ম্যানিফেস্টো বের করেছিলুম, যা কোনও বাঙালি কবি তার আগে করেননি । ফলে রাষ্ট্রের টনক নড়ে গেল । রাষ্ট্র তো একটা অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম, যেটা চালায় একদল লোক । সেই লোকগুলো, যারা যখন মসনদে বসে, নিজেদের রাষ্ট্র বলে মনে করে । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলতে প্রখৃত পক্ষে বোঝায় মসনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র । যারা মসনদে বসে, তারা সবসময়ে পায়া টলে যাবার আতঙ্কে ভোগে । মসনদ বিরোধিতাই হল এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতা । আমি তো স্বঘোষিত এসটাবলিশমেন্ট বিরোধী । অভিযোগটা ছিল তার স্বীকৃতি । তাই মন খারাপ লেগেছিল । আসলে আঘাতটা যাঁদের দিয়েছিলুম, সেই সব মন্ত্রী, প্রশাসনিক আমলা আর পুলিসের কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, অভোযোগের প্রমাণ যখন আদালতে পেশ হবে, তখন সাধারণ মানুষ তাঁদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে । মসনদের কেদারায় আসীন লোকগুলোর মগজে আমি অস্হিরতার বোধ চালান করে দিয়েছিলুম, তাঁদের আত্ম্ভরী ক্ষমতায় ঘা মেরে, মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রী, মুখ্য ও অন্যান্য সচিব, জেলাশাসক, পুলিশের কমিশনার ও আই জি, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও বুদ্ধিজীবীদের কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে, রাক্ষস-অসুর-জানোয়ার-জোকার-মিকিমাউসের মুখোশ পাঠিয়ে, যার ওপর ছাপিয়েছিলুম একটি বার্তা: দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন । প্রশাসনের ক্রুদ্ধ নি-জার্ক প্রতিক্রিয়ার কথা পুলিশ কমিশনার নিজে আমাকে আর দাদাকে বলেছিলেন । এখন তো বিরোধীপক্ষের লোকেরা প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে বলছে মুখৌটা বা মুখৌশধারী, বলছে মুখোশ খুলে ফেলুন । অনেকে তখন হ্যা হ্যা হি হি করেছিলেন, কেননা তাঁরা টের পাননি যে এসটাবলিশমেন্টের দাঁতকে শক্ত আর নখকে তারাল করে রেখে গেছে ইংরেজরা । তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন যখন নকশালর আন্দোলনে অংশ নেয়ায় অত্যাচারিত হলেন ও গুমখুন হলেন কবি ও লেখকরা । আরও বেশি করে টের পেলেন এমার্জেন্সির সময়ে যখন পচা আলুর চটের বস্তার মতন জেলের ভেতর নিক্ষিপ্ত হলেন লেখক ও সাংবাদিকরা, আর অশিক্ষিত লোকেদের দ্বারা প্রকাশিতব্য পাঠবস্তু অনুমোদন করাতে হল, কারা গারে দাগি আসামির মতন দাড়ি বাড়াতে হল গৌরকিশোর ঘোষকে, পালাতে গিয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলেন জ্যোতির্ময় দত্ত।মুখোশধারী অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম যে একই আছে, তা অভিজিৎ সিংহের আত্মহত্যায় আবার প্রমাণিত হল চল্লিশ বছর পর । তাত্বিক বিপ্লব আজকের দিনে বুদ্ধিবৃত্তির ভাঁোতামাত্র জেনেও, অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেমের নি-জার্ক প্রতিক্রিয়া যে একই আছে, তা টের পাওয়া যায় মসনদের আতঙ্কবোধ থেকে, যখন তা কচি কচি ছেলেমেয়েদের এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতাকে ভয় পেয়ে মাঝরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে নখদন্ত দেখায় । পচনের এই প্রক্রিয়াকে আমি কিছিটা ধরার চেষ্টা করেছি নখদন্ত সাতকাহনে । বাঙালদের যে নেতারা ১৯৫০ সালে সংবিধান পুড়িয়েছিল, আজ তাদের কুর্সি নড়বড় করছে মনে হলেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ধুয়ো তোলে । নবদ্বীপের গাণ্ডীব পত্রিকায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কনসেপ্টটাকে রিডিকিউল করে টুসকি অবিনির্মাণ শিরোনাঞে একটা পোস্টমডার্ন ছোটগল্প লিখেছি ।

প্রশ্ন: তোমার প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতার বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনের সময়ে অশ্লীলতার আরোপে মামলা হয়েছিল । সাহিত্যে অশ্লীলতা তখন নেতিবাচক ছিল । তোমার লেখালিখিতে অত্যধিক যৌনতা থাকার অভিযোগও উঠেছে । তোমার লেখালিখির জন্যেই তো হাংরি আন্দোলনকে অনেকে বলতেন যৌন ক্ষুধার আন্দোলন । তোমার নান্দনিক অবস্হান আর নৈতিকতা নিয়ে এরকম নেতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও তুমি মনে-মনে আনন্দ পেয়েছ । সমাজকর্তারা, সাহিত্যবেত্তারা, তোমার পাঠকৃতিকে অশ্লীল বললেন, যৌনতার বাড়াবাড়ি বললেন, ইমমরাল বললেন, অথচ গোপনে-গোপনে সে-কারণে তুমি গর্ববোধ করলে ! এটা পারভার্সান ছাড়া কী?

উত্তর: ব্রাহ্ম স্কুলে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল পাঠ্য ছিল । বাংলার শিক্ষক অধিকারীবাবু একদিন সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে জানিয়েছিলেন, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর-এর কোন অংশগুলোকে বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ, জেমস লঙ প্রমুখ অশ্লীল ঘোষণা করেছেন । উনি ভারতচন্দ্রকে ডিফেন্ড করে ব্রাহ্ম এলিটিজমকে আক্রমণ করেন, যা প্রধানশিক্ষকের কানে পৌঁছোলে অধিকারীবাবুকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল । আমি ভারতচন্দ্রের পক্ষে চলে গিয়েছিলুম অন্নদামঙ্গল-এর তৃতীয় অংশ মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান পড়ার সময়ে, কেননা আমার পূর্বজ লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী ছিলেন প্রতাপাদিত্যের প্রধান অমাত্য । আমার লেখায় যৌনতা আরোপিত নয় । কিন্তু অশ্লীলতা-যৌনতার অভিযোগে আমি ভারতচন্দ্রের ডিসকোর্সের পরিসরটা, যা এখন বুঝতে পারি প্রাগাধুনিক-প্রাকঔপনিবেশিক বলে, রিগেইন করে নিতে পেরেছিলুম । ভারতচন্দ্র-এর রচনায় যৌনতাকে আক্রমণের সূচনা করেছিল ব্রিটিশ অধ্যাপকরা । আর সাবর্ণ চৌধুরীরা গরিব হয়ে গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সাম্রাজ্যবাদী ধাক্কায়, যখন ওরা কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর নিয়ে নিল । আমার মধ্যে, অভিযোগগুলো শুনে, বদলা নেবার গোপন গর্ববোধ চাগিয়েছিল । পার্ভারসান যে মনে হয় না, তারও কারণ আছে । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কিপার অব পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার ছিলেন । পরীক্ষা-পরবর্তী স্কুলছুটিতে ওনার সাইকেলের কেরিয়ারে বসে প্রায়ই পাটনা মিউজিয়ামে যেতুম। স্কাল্পচার বিভাগে নানা ঢঙের নগ্ন-ন্গিকা অবাধে দেখে বেড়াতুম । দেখতুম যে পুরুষরা খাঁজকাটা যোনি বা স্তনের বোঁটায় টুক করে হাত দিয়ে নিচ্ছে বা ঠোঁট ঠেকাচ্ছে । মেয়েরা একই ব্যাপার করছে গ্রিক পুরুষের লিঙ্গ নিয়ে । হাত ঠেকিয়ে, চুমু খেয়ে সেসব অংশগুলোকে একেবারে চকচকে করেদিয়েছিল দর্শনার্থীরা । এখন মিউজিয়ামে নানা নিষেরধ হয়েছে যা তখন ছিল না । আমি প্রতাপাদিত্যের চেয়ে প্রাচীন সময়ে চলে যেতুম, যখন মেগাসথিনিস কয়েক হাজার গ্রিক তরুণী এনে পাটনায় তখনকার ক্ষমতাসীনদের বিলিয়েছিলেন, কিংবা যখন গ্রিক সম্রাট মিনান্ডার পাটনা শহরে আগুন ধরিয়ে লন্ডভন্ড করার পর অনুতপ্ত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । অতীতের সঙ্গে আমার যা যোগসূত্র, আমি জানতুম, জানি, অভোযোগকারীদের সেরকম যোগসূত্র নেই । আমার কাছে তারা সদ্যভূমিষ্ঠ । মিউজিয়ামে বড়জ্যাঠার অফিসঘরে একাধিক নিউড পেইনটিং ছিল, যার একটা আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর আঁকা । ঠাকুর্দা ছবি আঁকা আর ফোটো তোলা শিখেছিলেন লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটর জন লকউড কিপলিঙের কাছে । ইনি সম্ভবত রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা, যাঁর সুপারিশে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতা মিউজিয়ামে সহকারী কিউরেটর হয়েছিলেন । ঠাকুর্দার আঙকা নিউডটা সম্পর্কে বড়জ্যাঠার গর্ববোধ ছিল । প্রত্যেক সদ্য-পরিচিতকে বলতেন ছবিটা ওনার বাবার আঙকা । ফলে আমার একটা ঐতিহাসিক সাপোর্ট সিস্টেম রয়েছে । হাংরি মকদ্দমার সময়ে বড়জ্যাঠা-বাবা-কাকারা আমায় টোটাল সাপোর্ট দিয়েছিলেন । বাবা তো পাটনা থেকে আদালতে এসেওছিলেন হিয়ারিঙের সময়ে বারকয়েক । আহিরিটোলা থেকে পিসেমশায়ও আসতেন ।

প্রশ্ন: তুমি তো রান্নাবান্না কর । সাধারণ বাঙালি রান্না রাঁধতে জান । অধিকাংশ কবি-লেখক যখন রান্না করা, বাসন মাজা, ঝুল ঝাড়া ইত্যাদি কাজকে অবমাননাকর মনে করেন, তখন তুমি রান্না-বান্নার কথা খোলাখুলি বলো কোন সাহসে? তাও আবার সংবাদপত্রের শৌখিন রান্না নয়, রোজকার রান্না । বিশুদ্ধ শিল্প, উত্তরণ, নান্দনিক বোধ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে রান্নাবাড়ি ব্যাপারটা কি স্ববিরোধী নয় ? একদিন তুমি যখন ফ্যান গালছিলে, তখন মাঝি পত্রিকার সম্পাদক টেলিফোনে সেকথা শুনে স্তম্ভিত হয়েছিলেন, বিশ্বাস করতে পারেননি । নখদন্ত সাতকাহনের প্রতি পৃষ্ঠায় তোমার রান্নার রেফারেন্স আছে । ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস উপন্যাসে বিসদৃশ মেনু আছে । জলাঞ্জলি উপন্যাসে সেক্সুয়াল অ্যাক্ট বর্ণনা করেছ রান্না প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আর তদ্বারা আক্রমণ করেছ সংবাদপত্রের শ্রখিন রন্ধনকর্মকে । নামগন্ধ উপন্যাসে রান্নাবান্নায় লুকিয়ে থাকা শ্রেণি বিভাজন অন্তত দুবার তুমি স্পষ্ট করেছ । তোমার কবিতাতেও রান্না বা কুইজিনের প্রসঙ্গ থাকে । তোমার আলোচকরা কেউই এই ব্যাপারটা ধরতে পারেননি দেখে তোমার অবাক লাগেনি? রান্না করতে শিখলে কোথায় ?

উত্তর: ইমলিতলায় হিন্দু-মুসলমান সবায়ের হেঁসেলে ঢোকার অবাধ অধিকার ছিল । রান্নাবাড়ির সাংস্কৃতিক পাথফক্যের ব্যাপারটা মগজে স্হান করে নিতে পেরেছিল । কুড়িজনের পরিবারে রান্নাঘরের ইনচার্জ ছিলেন মা। বাবা আর ছোটকাকা বিশুদ্ধ শাকাহারি ছিলেন । ইমলিতলার বাড়িতে কেবল পাঁঠার মাংস, হাঁসের ডিম, আঁশযুক্ত মাছ অনুমোদিত ছিল । প্রতি রবিবার ও ছুটির দিন বড়জ্যাঠা রাঁধতেন ওনার সাবর্ণ চৌধুরী স্পেশাল, যার তিনটে আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে । বাদাম কিসমিস খোয়াসহ যাবতীয় আনাজ দিয়ে সোনামুগ-আতপচালের মিষ্টি ভুনি খিচুড়ি; ঘিয়ে ভাজা তেতো-বর্জিত আনাজ দুধে সেদ্ধ করে ফোড়ন-তেজপাতার ওপর নারকোল কুরো দেয়া মিষ্টি শুক্তো; এবং বাঁধাকপি-ফুলকপি আলুতে ভেটকিটুকরো গরম মশলা দিয়ে মাখোমাখো তরকারি । ইমপ্রেশানিস্টিক মাইন্ড বলতে যা বোঝায়, তাতে এই পুরো সিনারিওটার ছাপ পড়েছে, যেটা ধরার কিছুটা চেষ্টা করেছি এই অথম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকতে গিয়ে যখন নিষেধ ভাঙার, সীমালঙ্ঘনের, যথেচ্ছাচারের পর্ব শুরু হল, তখন সহপাঠী তরুণ-বারীন-সুবর্ণর সঙ্গে যা ইচ্ছে খাওয়া আর রাঁধার স্বাধীনতা পেয়ে গেলুম । প্রতিবেশি এক মুসলমান চুড়িওয়ালা অনেক পদ রাঁধতে শিখিয়েছিল । আমার স্ত্রী বাড়িতে মারাঠি পদগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে । লখনউতে দেড় বছর তেলেগু আবদুল করিম, পাঞ্জাবি মদন মোহন, কর্ণাটকি শেট্টিখেড়ে প্রভাকরা আর কোংকনিয় কুরকুটে একটা ফ্ল্যাটে ফোর্সড ব্যাচেলর হয়ে নিজেরা পালা করে রাঁধতুম । রান্না ব্যাপারটা যে যৌথজীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ, এবং আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জলবিভাজক, তা পিক আপ করেছি অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তরে । বাঙালি লেখক-শিল্পীরা রান্নাকে ডিসকোর্স হিসেবে নেন না সম্ভবত উনিশ শতকের প্রধান পুরুষদের যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার ফলে। তার ওপর শ্বেতাঙ্গ পিতৃতন্ত্রের যে আদল-আদরা ইংরেজরা আমাদের সাহিত্যে চাপিয়ে গেছে, তাকে ডিকলোনাইজ করার জন্যে আমার মনে হয়েছে রান্নাবান্নার ব্যাপারটা একটা প্রধান হাতিয়ার। দাদা অবশ্য আমার চে্যে ভাল আটপৌরে রান্না জানে, আর বাবার কাছে শাকসব্জি আনাজপাতির আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ শেখার ফলে রান্নাবাড়ির বাঙালিয়ানা ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে। ইমলিতলার রান্নাঘরে কোনবারে আর কোন তিথিতে কী-কী খেতে নেই, তার তালিকা থাকত, আগের বছরের পাঁজির ছেঁড়া পাতা । রান্না ব্যাপারটায় জীবনের সবকিছুই তো আছে ইনক্লুডিং সেক্স । আলোচকদের চোখে পড়েনি তার কারণ তাঁরা কেবল খাবার মধ্যে আটক, তার আগের পর্বের কর্মকান্ডেই যে তাঁদের সমাজটির নিবাস, তা অনুভব করেননি । বুদ্ধিজীবী যদি মাল্টিডিসিপ্লিনারি না হয়, তাহলে সাহিত্যের পুরো এলাকাটা খণ্ডিত করে ফ্যালে ।

প্রশ্ন: পোখরানে আনবিক বোমা ফাটাবার পর অনেক প্রতিবাদ হল, কবিতা লেখালিখি হল, গলা-কাঁপানো বক্তৃতা হল । এবারেই বেশি হল । প্রথমবার যখন ফাটানো হয়েছিল, তখন এতটা চেঁচামেচি হবনি । তুমি কেন আর সবায়ের মতন এর বিরুদ্ধে পদ্য বা গদ্য লিখলে না? ক্যাসেট বের করলে না? প্রথমবারও করোনি । এবারও করোনি। তুমি কি প্রসঙ্গটা থেকে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখছ?

উত্তর: তলিয়ে না দেখে কোনও কিছু ঘতলেই যারা গদ্য-পদ্য-গান-আঁকার মাধ্যমে একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাঁরা ইনটেলেকচুয়াল বাফুন । ভারতের আণবিক বোমা তৈরি নিয়ে আমেরিকান, পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ গবেষক এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লেখা বেশ কিছু বই আছে । প্রতিটিতেই বলা হয়েছেযে, ভারতীয় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের অগোচরে, হোমি ভাবার সময় থেকে, বিজ্ঞানীদের একটা ছোট গোষ্ঠী আণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে নিজেদের জাহির করা । বাজেট বরাদ্দের দাবি ফি-বছর বাড়তে থাকায় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের সন্দেহ হতে তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানায় । কেননা বিভাগটা তাঁর অধীনে । প্রতিরক্ষমন্ত্রী ও সেনা জানত না । ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে তরিৎকর্মা বিজ্ঞানীরা তাঁকে নানা তর্কে রাজি করিয়ে ভূগর্ভে বিস্ফোরণ ঘটাল । বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখে বিজ্ঞানীদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা । সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে পড়ায়, চিন নিউট্রন বোমা তৈরি করে ফেলায়, এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে, বিজেপি দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটায় । মানবিকতার দৃষ্টিতে আণবিক বোমার তুলনায় ঘৃণ্য আবিষ্কার দ্বিতীয়টি নেই । কিন্তু রিয়াল পলিটিক ভিন্ন কথা বলে । বাঙালি রাজনীতিকরা ছেঁদো দলাদলির সময়ে রিয়াল পলিটিক করেন, অথচ বিশ্বের ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে বিমূর্ত মানবতাবাদ ফলান । বুশ-ব্লেয়ার মাস্তানি ফলিয়ে যেভাবে ইরাকে যুদ্ধ করতে ঢুকে পড়ল, সাদ্দাম হুসেন চৌসেস্কুর মতন একজন নৃশংস অত্যাচারী তিলে খচ্চর একনায়ক মেনে নিয়েও বলতে হয়, যে, ইরাকের কাছে আত্মরক্ষার অস্ত্র থাকা প্রয়োজন ছিল । ইউ এন ইন্সপেক্টর-ফেক্টর সব ফালতু । বুশ আর তার কুবের বন্ধুরা ইরাক আক্রমণ আর দখলের ছক বহু আগে করে রেখেছিল, এমনকী কে কী পাবে সেটাও । হয়ত কখনও ইরাক দখল করবে ভেবে ওদের আণবিক পরিকাঠামোটাও বোমা ফেলে বহুকাল আগে ওড়ানো হয়েছিল । ভারত আগে থাকতে মিসাইল প্রযুক্তিতে উন্নতি করে তারপর বোমা ফাটিয়ে অন্তত এটুকু হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখতে পেরেছে যে, তার কিছু হলে অন্তত এক হাত দেখে নেবে । চিন যেমন নিউট্রন বোমা বানিয়ে ফেলেছে, ভারতেরও তা তাড়াতাড়ি করে ফেলা দরকার । জেন-এর মিলিটারি ম্যাগাজিন অনুযায়ী, আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিটি দেশের মিসাইল কলকাতার দিকে তাক করা আছে, কেননা একটিমাত্র চোটে সবচেয়ে বেশি নাগরিকে এখানে যেভাবে ছাই করা যাবে, তা অন্য শহরে সম্ভব নয় । ইরাক যুদ্ধের ফলে বহু দেশ এবার গোপনে মারণাস্ত্রের ভাঁড়ার গড়বে, সম্ভবত একজন বয়ে নিয়ে যেতে পারে এমন গণবিদ্ধংসী অস্ত্র । পদ্য-যোগাড়েরা তাদের হেড মিস্ত্রিদের যুগিয়ে যাবে গলা-কাঁপানো পদ্য । আমেরিকার বিশ্ববাজার আছে, তো পদ্য যোগাড়েদের আছে বুকনিবাজার । সম্প্রতি টিভিতে দেখলুম তথাকথিত নকশালপন্হী একদল পাঁচফুটিয়া ছেলেমেয়ে শেক্সপিয়ার সরণিতে একটা দোকানে এই অজুহাতে ভাঙচুর করল যে তারা মার্কিনী জুতো বিক্রি করে । একটি মেয়ে জিন্সের টপ আর টাইটবটম পরে ভাঙচুর করছিল । অর্থাৎ সে নিজেই মার্কিনী পোশাকে ছিল । অর্থনীতি সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই ছেলেমেয়েগুলোর । দোকানটা মারোয়াড়ির, টাকা তার, জুতোগুলো ভারতীয় শ্রমিকরা বানায় । ওসব না করে ওদের উচিত ছিল ফিদাইন হয়ে ইরাকে লড়তে যাওয়া । ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা লড়তে গিয়েছিল । যে নেতার কাজ অপছন্দ হতো, তিনি যে দেশেরই হোন, অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁদের যাচ্ছেতাই চিঠি লিখত ।

প্রশ্ন: তোমার জন্মের এক মাস আগে জার্মানি আর সোভিয়েত রাশিয়া পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল । সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল সেই যুদ্ধে, দু কোটি কেবল সোভিয়েত রাশিয়ার । তুমি যখন ক্যাথলিক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছ, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল যার ফলে তিন লক্ষ মানুষ মারা যান । তোমার যখন এক বছর বয়স, তখন ছাব্বিশ হাজার মানুষকে পোল্যান্ডের কাতি জঙ্গলে স্তালিনের নির্দেশে খুন করা হয়েছিল । ষাট লক্ষ ইহুদিকে বিষাক্ত গ্যাসে আর ইনসিনেটারে পুড়িয়ে মেরেছিলেন হিটলার । কত লক্ষ বিরোধী-নামাঙ্কিত মানুষকে স্তালিন, কাম্পুচিয়ার পল পট, জানারাল পিনোশে, ইদি আমিন, সুহার্তো, ট্রজিলিও, মোল্লা ওমর, দুভালিয়ের, টিক্কা খান, বিদেশের মাটিতে বাবা বুশ ছেলে বুশ মেরে ফেলেছেন । তোমার জীবদ্দশায় লক্ষ-লক্ষ মানুষকে একযোগে মেরে ফেলার জন্যে অ্যানথ্রাক্স, স্মল পক্স, বটুলিনাম, রাইসেন, টুলারেনসিস, নিউমোনিক প্লেগ, মাস্টার্ড গ্যাস, সারিন গ্যাস ইত্যাদি মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও প্রয়োগ হয়েছে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনোও না কোনোও আদশফের নামে গণহত্যাগুলোকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে । সারাটা জীবন অমন দূষণের ভেতরে বাস করে তুমি নিজেও কি দূষিত হয়ে যাওনি? তোমার কি সন্দেহ হয়না যে অমন দূষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাটাই বরং অপরাধ? এরকম আবর্তে বসে কবিতা লিখতে অপরাধ বোধ কর না? কেমন মানুষ তুমি?

উত্তর: হ্যাঁ । নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নৃশংসতার যে সামগ্রিক ডিসকোর্সের সঙ্গে জন্মাবধি পরিচিত হয়ে চলেছি, এবং যেভাবে তা দেশে দেশে রাষ্ট্রীয়, জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, এথনিক, ট্রাইবাল, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, আর্থিক বৈধতা পেয়েছে, তা ব্যক্তির অন্তরাত্মা ধাঁচের ধারণার অ্যাবসার্ডিটিতে আমি আক্রান্ত । হত্যাযজ্ঞ একজনের কর্মকাণ্ড নয় । তা অজস্র মানুষের আনুগত্যের যান্ত্রিক দক্ষতা থেকে উপজাত । জনমুক্তি, মানবতাবাদ, মানুষই পৃথিবীর কেন্দ্র, কমরেড তুমি নবযুগ আনবে, মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ, সততা, উত্তরণ, ধ্রুবসত্য, যুক্তিপ্রাণতা, ইতিহাসের প্রগতি, সার্বভৌম একক মন, ব্যক্তিচেতনা, বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক সুস্হতা ইত্যাদি, গ্রমীণ লিটল ম্যাগাজিনের অজ্ঞান-অবোধ ডিসকার্সিভ স্পেস হিসেবে কেবল টিকে আছে । আমি যে কেবলমাত্র সন্দেহে আক্রান্ত, সেখানেই যে এই প্রবলেম্যাটিকের সমাপ্তি, তা কিন্তু নয় । পশ্চিম বাংলার ম্যাক্রোলেভেল ও মাইখপলেভেল ঘটনাবলীর দ্বারা প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে বাগাড়ম্বরের ইডিয়সি । যারা বলেছিল যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এসট্যাবলিশমেন্টকে ধ্বংস করাটা সাম্যবাদের অভিমুখ, তাদের তো চেয়ারে বসে-বসে ফিসচুলা হয়েগেছে । আমাএ সাবজেক্ট পোজিশান ওই উনিশ শতকীয় এনলাইটেনমেন্টের পৃষ্ঠপটে যদি দূষিত মনে হয় তো তার উৎসসূত্র ওই একই ডিসকোর্স । বদ্ধ উন্মাদ বা খবরের কাগজে ঘটনা-নির্লিপ্ত প্রবন্ধ-লেখকরাই শুধু নিজেদের দূষণমুক্ত মহাপুরুষ বলে মনে করতে পারেন, কেননা তাঁদের যন্ত্রণায় ছটফট করার প্রয়োজন হয় না । আমি তাই আমার এই সাবজেক্ট পোজিশানকে পারক্য আক্রান্ত বা এলিয়েনেটেদ বলব না । কেননা, তুমি যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছ, সে single agent নয়, তার ‘অ্যানোমি’ ঘটা সম্ভব নয় । আমি যে আপোষ করিনা, আর dissenting voice গুলো বজায় রাখতে পেরেছি, তাও কিন্তু আমার সাবজেক্ট পোজিশানকে অবিরাম যাচাই করতে থাকার কারণে । অমন জাগতিক ধ্বংসকাণ্দের মাঝে জন্মাবধি বাস করে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখার নৈতিক প্রয়োজনীয়তার সন্দেহটা থেকেই যায় । সাহিত্য ব্যবসায়ী হলে নিরেট অজ্ঞানতার কোকুনে সন্দেহহীন আরামে থাকতুম । সন্দেহহীন হওয়াটা, আমার মনে হয়, ক্রমিনালের মতন আচরণ হয়ে যাবে । যদিও জানি যে আমার ভাবনাচিন্তার চাপটাই আমার হার্ট অ্যাটাক দুটোর অন্যতম কারণ ।

প্রশ্ন: তুমি যখন থেকে লেখালিখি করছ, তখন থেকেই জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দেবার বিরোধিতা করে আসছ । কলকাতায় ফিরে আসার পর সাবর্ণ চোধুরী পরিবার পরিষদে অংশ নিয়েছ, যাতে জোব চার্ণককে পিতৃত্ব দেয়া নাকচ হয় । প্রথম সাবর্ণ চৌধুরী লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর জীবন নিয়ে লিখেছ কবিতীর্থ পত্রিকায় । নবম শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত নিজের সাবর্ণ চৌধুরী লিনিয়েজ নিয়ে দিশা পত্রিকায় লিখেছ । এটা কি তোমার পোস্টকলোনিয়াল ডিসকোর্স ? নাকি জোব চার্ণককে উৎখাত করার মধ্যমে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলে? কেননা রাধাকান্ত দেবের পরিবার সুতানুটি পরিষদ জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দিতে উঠে-পড়ে লেগেছিল । আর রাধাকান্ত দেবের পূর্বজই ক্লাইভকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে, আর্থিক ও স্ট্র্যাটেজিক সাহায্য করেছিল । ইংরেজ ও নবাবপক্ষের অবর্তমানে, তাদের লড়াইটা কি গোপনে কলকাতার দুই আদি পরিবারের মধ্যে আজও চলছে? তুমি কী উদ্দ্যেশ্যে এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে, যার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক নেই?

উত্তর: ইংরেজরা কলকাতার একশ বছর, কলকাতার দুশ বছর চিহ্ণিত করে কোনও উৎসব পালন করেনি । যারা তিনশ বছর পালন করার হুজুগটা করল, তাদের একটা অংশ সেই পরিবারের রেলিকস যারা সিরাজের বিরুদ্ধে ক্লাইভকে সাহায্য করে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় খুঁটি হিসেবে কাজ করেছিল । কিন্তু সবচেয়ে বিরক্তিকর ও অসহ্য লাগল সেইসব লোকগুলোর কাজকারবার, যাঁরা স্বঘোষিত বামপন্হী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী । কলকাতার রাস্তাঘাত, মাঠ-ময়দান সর্বত্র থেকে যখন সাম্রাজ্যবাদীদের মূর্তিগুলো উপড়ে লোপাট করা হয়েছে, তখন আশ্চর্য হয়ে গেলুম দেখে যে স্কুলের পাঠ্যবইতে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট জোব চার্ণকের মূর্তি বসন হয়েছে, এই ফিকশনের মাধ্যমে যে, তিনি কলকাতা শহরের বাবা । আসলে পশ্চিম বাংলায় নিজেদের বৈধ ও ন্যায্য প্রমাণ করার জন্যে পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুরা রাজনৈতিক রিরুটিং হিসেবে এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন । বহিরাগতরা যেখানে গেছে সেখানকার ইতিহাস বিকৃত করেছে । হাওয়া৪৯ এর অপর সংখ্যায় আদি কলকাতার অপর শিরোনামে কৌশিক পরামাণিক ওনার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সরকারি ইতিহাসকাররা কলিকাতার তিনশত বৎসরের জীবনপঞ্জী বইটায় কী কেলো করেছেন । হাওয়া৪৯-এ উত্তরঔপনিবেশিকতা নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার সময়ে তধ্য খুঁজতে বসে রাগ ধরে গেল সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান বইতে জোব চার্ণক আর লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর এন্ট্রি দুটো পড়ে । জোব চার্ণক সম্পর্কে এন্ট্রিটা ভুল তথে্য ঠাসা, এবং গাঁজাখুরি । সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত আর অঞ্জলি বসু কোথা থেকে ওসব জুটিয়েছেন জানি না । তবে ওনাদের সাবজেক্ট পোজিশান যে মোটিভেটেদ তা স্পষ্ট হয়ে গেল আমার পূর্বজের এন্ট্রিটা পড়া । পদবিসহ নাম না দিয়ে লেখা হয়েছে কেবল লক্ষ্মীকান্ত, জন্ম-মৃত্যু সন নেই, তথ্য ভুল এবং ভাসা-ভাসা, যখন কিনা লক্ষ্মীকান্তর উত্তরপুরুষ অতুলকৃষ্ণ রায়ের লেখা এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা বইটা, যার ভূমিকা লিখেছিলেন নিশীথরঞ্জন রায়, তা ওনাদের কাছেই ছিল । এই সময়েই বড়বাড়ি আর সাবর্ণ পাড়ার গোরাচাঁদবাবু, স্মরজিৎবাবু, কানুপ্রিয়বাবু জোব চার্ণককে কলকাতার বাবা বানাবার বিরুদ্ধে মামলা করার তোড়জোড় করছিলেন । সাম্রাজ্যবাদ আসার আগে হিন্দু বাঙালির বাপ-চোদ্দোপুরুষের ইতিহাস খতিয়ান রাখত ঘটক সম্প্রদায় আর পুরীর পাণ্ডারা । ধার্মিক আচার-আচরণের বাইরে তার গুরুত্ব এই ছিল যে, লোকে নিজের ভৌগলিক আর ঐতিহাসিক শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকত, যা তার মধ্যে সক্রিয় রাখত এই বোধ যে, সে পোকা-মাকড় জন্তু-জানোয়ার নয় । কিন্তু ইউরোপীয় মননবিশ্বে নির্মিত নাগরিক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার পারিবারি আর ভৌগলিক স্মৃতি থেকে । আজকের বিশ্বের বহু সমস্যার বীজ ওই উত্তরঔপনিবেশিক স্মৃতিবিপর্যয়, এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদি এনট্রপি । সাহিত্যিক হিসেবে পারিবারিক শেকড়ের স্মৃতিচর্চার মাধ্যমে আমি গভীর বাঙালিত্বে প্রবেশ করি, যা মুর্শিদাবাদ, গৌড়, সরকার সাত গা্ঁ, তাম্রলিপ্তে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আদি বাঙালিত্বের স্পেস তৈরি করে । আমার লেখালিখিতে এই স্পেস হাংরি আন্দোলনের সময় থেকে মোটিভ ফোর্স রূপে আছে । হাংরি বুলেটিন, যেটা আমার জেনারেশনের >কাব্যদর্শন বা মৃত্যুমেধী শাস্ত্র নামে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা মহারাজ প্রতাপাদিত্যকে উৎসর্গ করেছিলুম । পোস্টমডার্ন ভাবনা ও সমাজ বিশ্লেষণে আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর আগ্রহ, এই বিশেষ স্পেসটির সূত্রে । প্রথম যিনি ১৯৩৪ সালে পোস্টমডার্ন শব্দটি প্রয়োগ করেন, নিকারাগুয়ার কবি ফেদেরিকো দ্য ওনিস, তা করেছিলেন প্রক্তন উপনিবেশের মানুষগুলোর স্মৃতি বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে । মুম্বাইতে থাকতে, আর্জেন্টিনার এক তরুণ কবিগোষ্ঠী আমার সম্পর্কে একটি স্প্যানিশ ওয়েবসাইট খুলেছেন খবর পেয়ে, ১৯৮৯ সালে নেট সার্ফিং করতে বসে ফেদেরিকো দ্য ওনিস সম্পর্কে জানতে পারি ।

প্রশ্ন: তোমাকে নিয়ে, তোমার নাম উল্লেখ করে বহু ওয়েবসাইট আছে । বইপত্র তবু কিছুদিন থাকে । কিন্তু ওয়েবসাইট যে থাকবে না, মুছে যাবে, তা কি পীড়িত করে না তোমায়? ইন্টারনেটের কারণে চিঠিপত্র সংগ্রহে রাখাটাও তো সম্ভব নয় । সাহিত্যের যে সাময়িক অবিনশ্বরতা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল । তোমায় হন্ট করে না ?

উত্তর: ওয়েবসাইটগুলোয় যে আমি আছি তা জানতে পারি নেট সার্ফিং শিখতে গিয়ে । আমার সম্পর্কে কে কী লিখেছে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চিঠি বা হাংরি বুলেটিন রেখেছে, কোন গ্রন্হে আমার কবিতা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, সে সব জানার আহ্লাদ আছে । অনেকে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে কবিতা সংকলিত করেন, তাতে আমার কবিতাও থাকে, যদিও তা কয়েকমাসের জন্যে । অনেকে ই-মেল করে গল্প বা কবিতা পড়ার জন্যে পাঠান । আমার তো বাড়িতে ব্যবস্হা নেই, সাইবার কাফেতে ঢুঁ মারতে হয় । আঙুলে ব্যথার জন্যে অসুবিধে হয় । এ ঠায় বসে থাকাও কষ্টকর । অবিরাম পরিবর্তনরত একটা ব্যাপারের মধ্যে আছি, তার মৌজমস্তি উপভোগ করি । কলকাতার সাহিত্যিকি নোংরামির বাইরে বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্হান । সাহিত্যিক অবিনশ্বরতা ব্যাপারটা ফালতু । তরুণ কবি-লেখকরা দেখি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর পড়েন না , অথচ তিনি, ঢাকার আব্দুল হালিম বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলেন । বেঁচে থাকতেই তো দেখছি আমার নামের ইমেজ আমার লেখাপত্রকে ছাপিয়ে যাচ্ছে । মগজের দেয়ালে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো, মিশরের পিরামিড, রোমের কলোসেয়াম, মাম্মালাপুরমের মন্দির, কুমহারারে সম্রাট অশোকের প্রাসাদের পাথরটুকরো ইত্যাদির ছবি টাঙিয়ে রাখলে অযথা দুশ্চিন্তার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কাজ করতেন বলে আমি স্কুলে পড়ার সময় ছুটির দিনগুলো সেখানেই কাটাতুম । তাই সময় ও সময়হীনতার ধারণা তখন থেকে গড়ে ওঠে । মুছে যাওয়াটা সেহেতু হন্ট করে না ।

প্রশ্ন: তুমি কি নিজেকে হিন্দু বলে মনে করো? হিন্দুদের দেবী-দেবতা, ইষ্টদেবতা আর ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? হিন্দুর উৎসবে অংশ নাও? হিন্দুরা যদি অন্য ধর্মের লোকেদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, যেমন কাশ্মিরি পণ্ডিত রা, তাহলে কি ইন্সটিংক্টলি রিঅ্যাক্ট করো? মরে গেলে ডাক্তারি ছাত্রদের জন্যে তোমার দেহ দান করে দেবে? তুমি কি চাইবে গঙ্গার ধারে, তোমার বাপ-ঠাকুর্দার বসতবাটি উত্তরপাড়ায় তোমার শেষকৃত্য হোক? নশ্বর শবের মাধ্যমে কি ইমেজকে পূর্ণতা দিয়ে যেতে চাও, যেমনটা রাজনীতিক-সাহিত্যিক-শীল্পীরা করেন? বয়েস তো হয়ে গেল, এখনও পর্যন্ত নিজের মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করে কবিতা লেখোনি তো?

উত্তর: হ্যাঁ, আমি একজন হিন্দু । এই জন্যে যে আমি চাই মরে গেলে আমার দেহ পোড়ানো হোক । সবাই জন্মসূত্রে হিন্দু হয় । আমি মৃত্যু সূত্রে । পারিবারিক ইষ্ট দেবতা, সাবর্ণচৌধুরী হবার সুবাদে, কালীঘাটের কালী আর শ্যামরায়, যাঁদের থেকে, ঠাকুমার আমল থেকে, ঠাকুমার মানসিকতা ও দাপটের কারণে, আমার আগের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে গিয়েছিল । বাবাকে কখনও কোনো মন্দিরে যেতে দেখিনি, যদিও উনি পৈতে পরা, গায়ত্রীমন্ত্র, খাবার সময়ে গণ্ডুষ ইত্যাদি সম্পর্কে গোঁড়া ছিলেন, পাঁজি-পুঁথি মানতেন না । মা সেসব কিচ্ছু মানতেন না, এমনকি অন্য ধর্মের মেয়ে বিয়ে করার ওপন পারমিশান দিয়ে রেখেছিলেন উনি । আমার সাবজেক্ট পোজিশানের বহুত্বের উৎস আমার শৈশবের পাড়াগুলো তো বটেই, আমার বাবা-মা, জেঠিমা-জ্যাঠা, কাকিমা-কাকার মতাদর্শের বৈভিন্ন্যের অবদানও তাতে আছে । আমার বয়ঃসন্ধির যৌনউন্মেষ হয়েছিল একজন শিয়া মুসলমান তরুণির সংসর্গে, এবং কবিতার জগতে প্রবেশও । এ-ব্যাপারে আমার একটা কবিতা আছে, প্রথম প্রেম: ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ শিরোনামে । প্রাথমিক স্তরে পড়েছি ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে, তখন প্রতিদিন চার্চে যেতে হত । তারপর ব্রাহ্ম স্কুলে । আমার মস্তিষ্কে ঈশ্বর বিশ্বাসের ওই বীজ অংঙ্কুরিত হতে পারেনি । চেষ্টা করেও না । ডুবজলে যেটুকু প্রশাস-এর অতনু, আর নামগন্ধ উপন্যাসে অরিন্দম এবং যিশু বিশ্বাস চরিত্রগুলোয় আমি এই মনস্হিতি আর্টিকুলেত করার চেষ্টা করেছি । দুটি স্কুলেই হিন্দু উৎসব নিষিদ্ধ ছিল । পাড়ার প্রধান উৎসব ছিল দোলখেলা, যাতে অংশ নিতুম, এখন বয়সের কারণে নিই না । গণহত্যা শুনলেই গাগুলোয়, টিভিতে দেখলেই বন্ধ করে দিতে হয় । পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশানের সামনেই দুজনকে থেঁতলে দেয়ালে গেঁথে দিতে, সঙ্গে-সঙ্গে সরবিট্রেট রাখতে হল জিভের তলায় । ইন্সটিংক্ট এখন এই স্তরে । তবে পাকিস্তান রাষট্রটিকে আমি ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করি । তাদের জণভেই হিন্দিত্ব নামক দানবটি পয়দা হবার সুযোগ পেয়েছে । রাষ্ট্রধর্ম কনসেপ্টটাই দুর্বৃত্তসুলভ । রাষ্ট্রের আবার ধর্ম হয় নাকি? তাহলে তো পথঘাট-লাউকুমড়ো কাক-কোকিলেরো ধর্ম থাকবে । দেহ দান করার ব্যাপারটা নিছক নৌটঙ্কি । গুদামের চেলাকাঠের ডাঁইয়ের মতন মর্গগুলোয় বেওয়ারিশ লাশের পাহাড় জমে থাকে । এসকেপিস্টরা আর যে প্রাক্তন উদ্বাস্তুরা পশ্চিম বাংলার মাটিতে নিজেকে মিশিয়ে দিতে অনিচ্ছুক তাঁরা, ওটা করেন । মরার সময়ে মুম্বাইতে থাকলে চোখদুটো কারোর কাজে লাগবে । উত্তরপাড়ার যে-ঘাটে সাবর্ণচৌধুরীদের শেষকৃত্য হত, সেখানে বহুকাল আগে শবদাহ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে । বেস্ট হবে কিউ না দিয়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢুকতে পারা । মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করার সাহিত্যিক ক্যাননটা উপনিবেশগুলোয় এনেছে ইঊরোপ । যার শব পোড়ানো হবে, তার এপিটাফ লেখার মতন ইডিয়টিক ব্যাপার আর দ্বিতীয়টি নেই । মৃতদেহ ঘিরে ফিউনারাল সং গাওয়াটাও বাঙালির সাংস্কৃতিক আচরণ নয় । মৃত্যুর পর স্মরণসভা ব্যাপারটাও আমার অভিপ্রেত নয় । আমি অমন স্মরণসভাগুলো এঢ়িয়ে যাই । লক্ষ-লক্ষ বাঙালির মতন আমিও সাধারণ স্বাভাবিক অবলুপ্তি চাই । আপাতত দুর্গাপুজোর নবমীর দিন বড়বাড়ি আর আটচালায় নানা এলাকা থেকে এসে সাবর্ণচৌধুরীদের যে জমায়েট হয়, ১৬১০ থেকে হয়ে আসছে, তাতে অংশ নেয়া আর খাওয়ায় সীমিত হয়ে গেছে ধর্মকর্ম।

Advertisements
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ডক্টর বিষ্ণুচন্দ্র দে

ডক্টর দে: একজন লোক কেন লেখে ? কেন ?

মলয়: সবাই একই কারণে লেখেন না । প্রতিটি লেখা একই কারণে রচিত নয় । একই লোক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বয়েসে একই কারণে লেখেন না । আমার মনে হয়, আমি লেখালিখি শুরু করেছিলুম প্রাকযৌবনের উচ্ছৃঙ্খল সাহিত্যপাঠ, বঙ্গসংস্কৃতিতে আউটসাইডার-বোধ, পারিবারিক গোঁড়ামি, সাবর্ণ চৌধুরী ক্ল্যানের সীমালঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে ।
আমি যে কেন লিখি, এই অমূলক প্রশ্নটা আমার কোনো ভারবাহী জিঞ্জাসাবোধের অন্তর্গত ছিল না যদিও, একটি দার্শনিক সমস্যা হিসাবে প্রতিনিয়ত আমাকে এমনভাবে চিন্তিত রেখেছে যে, প্রশ্নহীনতা, চিন্তাহীনতা, এমনকি চেতনাবোধ গুলিয়ে ফেলেও, আমার লেখার সম্ভাবনা থেকে, লিখিত পাঠবস্তু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার, কোনো সদুত্তর পাই না । আমার মধ্যে আমার লেখার প্রক্রিয়াটি নিজে, ওই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর । আমি কেন লিখি, এই সমস্যাটি, সারাজীবন একই দার্শনিকতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত থাকতে পারে না , কেন না, একজন মানুষের মানসিক অবস্হানগুলোর সুস্পষ্ট জলবিভাজন থাকে না ।
যাঁরা মার্কসবাদী, গান্ধিবাদী, রামকৃষ্ণ অথবা শ্রীঅরবিন্দে বিশ্বাসী, কিংবা রাজ্য সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলেছেন, তাঁদের, মনে হয়, এই সমস্যাটির হাঙরের হাঁ-মুখে পড়তে হয় না । লেখালিখিটা যাঁদের ব্যবসা, তাঁরা তো জানেজই কেন লিখছেন; তাই বলে আমি মনে করি না যে তাঁদের নিজস্ব অবস্হানের জন্যে তাঁদের অশপদ্ধা করতে হবে ।

ডক্টর দে: আপনি কি হিন্দু ?

মলয়: হ্যাঁ, আমি হিন্দু । কিন্তু একেশ্বরবাদ ও অরগ্যানাইজড রিলিজিয়নে বিশ্বাসী নই । আমি প্রকৃতিকে ডিভাইন বলে মনে করি । প্যাগান হিন্দুর মতো জল, আলো, বাতাসকে ডিভাইন মনে করি । তাদের নিয়ে কবিতা লিখি না ।

ডক্টর দে: আপনি হাংরি আন্দোলনের ইশতাহারে বলেছেন ‘ঈশ্বরের মৃত্যুসংবাদ অনেক-কাল আগেই পেয়ে গেছি, এখন আমিই আমার নিয়ন্ত্রক ও কর্ণধার । এখানেই কবিতার শুরু ।’ বিষয়বক্তব্যকে একটু সহজ করে বলুন ।

মলয়: ব্যাপারটা বুঝতে হবে দেশভাগোত্তর বাঙালির উত্তর-ঔপনিবেশিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে, যখন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হল । ইউরোপে রেনেসাঁসের হর্ষোল্লাসে ঈশ্বর প্রণীত নিয়ম-শৃঙ্খলার ভাঙনকে মুক্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনে বসানো হয়েছিল ব্যক্তি-মানুষকে । পরিবর্তনটি ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল মানব-সমাজে; প্রথমে ইউরোপে, এরপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ যে ভূখণ্ডে গেছে, সেখানে । প্রতিটি ঊপনিবেশে সেখানকার দেবী-দেবতা ও আরাধ্য ইষ্টকে মেরে ফেলতে ইউরোপ যে সফল হয়েছিল শুধু তাই নয়, সেসমস্ত দেশের ইউরোপীয় মূল্যবোধ প্রভাবিত ভূমিপুত্রদের মধ্যে এই চিন্তাচেতনাকে ইতিবাচক গরিমা দিতে পেরেছিল । তার আগে প্রতিষ্ঠা দেবার জণে ব্যক্তি-মানুষকে বলা হত দেবতুল্য, সাক্ষাৎ ভগবতী ।
ওই নবজাগৃতির ভাবকল্পটি ঈতিহ্যগত প্রভূত্ববাদের জায়গায় ‘জোর যার সত্য তার’ এই আধিপত্যবাদকে যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা, ব্যক্তি-এককের ক্ষমতা প্রয়োগের আহ্লাদ ইত্যাদি তর্ক দ্বারা ন্যাজ্যতা দেবার প্রতিপাদ্য গড়ে তুলেছিল, যা শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে আধুনিকতাবাদকে চাপিয়ে প্রকৃতির সৃষ্টিগত জটিলতা ও সমগ্রতা থেকে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল ।
প্রাক-ঔপনিবেশিক বঙ্গসমাজে তাই প্রকৃতি-সংস্কৃতি বাইনারি অপোজিশান ছিল না । বাংলায় প্রকাশিত প্রথম হাংরি ম্যানিফেস্টো দ্যাখো । এই আরণ্যকতার উল্লেখ আছে । ওই বাইনারি অপোজিশান বা বলা যায় সব রকমের বাইনারি অপোজিশান বর্জন করেই কবিতা লেখার কথা বলেছিলুম ।

ডক্টর দে: আপনি বলেছিলেন আত্মার ইরিটেশা থেকে হাংরি কবিতার জন্ম । ‘আত্মার ইরিটেশান’ ভাবকল্পটা একটু সহজ করে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলে কঠিনতা দূর হয় ।

মলয় : ঝিনুকের মধয়ে বালুকণা ঢুকলে যে ইরিটেশান হয়, তার দরুন মুক্ত তৈরি হয় । কবি যেহেতু সর্বব্যাপী এবং নিজেকে নিজে জানেন, তাই আত্মা শব্দটা প্রয়োগ করেছিলুম । আরো জানার প্রক্রিয়া থেকে ইরিটেশান হয়, যার দরুন বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানে প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটান । হাংরি আন্দোলনকারীরা প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটাবার চেষ্টা করলেন সাহিত্যে ।

ডক্টর দে: আপনার কবিতাকে কেন হাংরি বলা হবে ?

মলয়: কেননা আমি কবিতা থেকে কিচ্ছু বাদ দিইনি । কবিতা হাঁ-মুখে ছিল সবই গ্রাহ্য । অমুক হলে কবিতা হবে না, তমুক হলে কবিতা অসফল, এই ধরনের তর্ক সদ্য উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলায় মনে হত বুদ্ধিহীন ।

ডক্টর দে: ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় কিসের ক্ষুধার কথা বলা হয়েছে ?

মলয়: কবিতাটা নিজেই তার হাঁ-মুখে জীবন, যৌবন, মৃত্যু, যৌনতা, প্রেম, বাবা-মা, সমাজ, সময়, ইতিহাস সবাইকে পুরে নিতে চাইছে । এবং তা দ্রুতি- আক্রান্ত ।

ডক্টর দে: আন্দোলনের জন্য ইংরেজি ‘হাংরি’ শব্দটা ব্যবহার না করে ‘ক্ষুধার্ত’ শব্দটা ব্যবহার করলে কি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সঠিক শক্তি পাওয়া যেত না ?

মলয়: না । ক্ষুধার্ত শব্দটায় ব্যক্তির আর্তির লেজুড় রয়েছে । ব্লান্ডার হয়ে যেত । শক্তি চট্টোপাধ্যায় করেছিলেন ‘ক্ষুৎকাতর’; তাও গ্রাহ্য হয়নি । হাওয়া খাওয়া, পালটি খাওয়া, লাথি খাওয়া, গোঁত্তা খাওয়া, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদির মজা ওই আর্তি বা কাতরতায় নষ্ট হয়ে যায় । খাওয়া তো সর্বগ্রাসী ।
এতদিনে হাংরি শব্দের উৎস-সূত্র আর দার্শনিক প্রেক্ষাপট জেনে গেছ নিশ্চই । না খেতে পেয়ে মরা বা যৌন ক্ষুধার সঙ্গে হাংরিকে সম্পর্কিত করেছিলেন প্রধানত সাংবাদিকরা ।
হাংরি শব্দটা আমি পেয়েছিলুম ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে । উনি কালখণ্ডকে হাংরি রুপে চিহ্ণিত করেছিলেন ।
ওই সময়ে আমি হাতে পাই অসওয়াল্ড স্পেংলারের বই দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট । স্পেংলার বলেছিলেন যে সমাজ-সংস্কৃতি হল জৈব প্রক্রিয়া । তা যখন কেবল নিজের সৃজন-ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করে, তার নিত্য-নতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু তার অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয় জখন তার নিজের স্ফূরণ-ক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে; তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন । অথাৎ তখন সমাজ-সংস্কৃতিটি হাংরি । আমার মনে হয়েছিল, দেশ-ভাগোত্তর বঙ্গসমাজ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মণীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় ।
হাংরি আন্দোলন ছিল এই চিন্তাভাবনার ফসল । ‘সম্প্রতি’ পত্রিকায় ১৯৬২ সালে এই কথাগুলোই নিজের মতন করে শক্তিদা বলেছিলেন । প্রশ্ন হল যে পরে কোনো-কোনো আন্দোলনকারী হাংরি শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন । তা খুবই স্বাভাবিক । বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঁকবদলকারী আন্দোলন, যার খবর পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং সব আলো আমার ওপর এসে পড়ছিল । তাই আন্দোলনের মধ্যেই প্রত্যেকে নিজস্ব পরিসর গড়তে চেয়েছেন । প্রচার চেয়েছেন ।

ডক্টর দে: হাংরি আন্দোলনের কবিরা যে ক্ষুধার কথা বলতে চেয়েছেন সেটা অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না । এতে আপনার অভিমত কি?

মলয়: একটু-আধটু পড়াশোনা না করলে বোধগম্য না হতেই পারে । অনেক পাঠকই লেখকের ক্ষুধা খুঁজে মরেন, যখন কি না ক্ষুধাটা ডিসকোর্সের ।

ডক্টর দে: হাংরিয়ালিজমের সঙ্গে ডাডাইজম এবং সুররিয়ালিজমের পার্থক্য কী ?

মলয়: ডাডাইজম ও সুররিয়ালিজম হল সময়-তাড়িত চিন্তাতন্ত্রের ফসল, জুডিও-ক্রিশ্চিয়ানিটির ফসল । হাংরিয়ালিজম হল পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্রের ফসল, বহুত্ববাদী ভাবনার ফসল । ডাডাইজম ও সুররিয়ালিজম লেখককে তার মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করে ভেবেছে । হাংরিয়ালিজম লেখককে একলেকটিক বলে মেনে নিয়েছে । ডাডাবাদী-পরাবাস্তববাদীরা জন্মেছেন আর্ট ফর আর্ট সেক-এর পৃষ্ঠপটে, তাই ভাঙচুর করছেন । হাংরিয়ালিস্টরা ‘আর্ট’ কনসেপ্টটাকেই আক্রমণ করেছেন ।

ডক্টর দে: কোনো একটি কবিতা যে হাংরি সেটা বোঝার জন্য কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ? সাধারণ পাঠক কী করে বুঝবেন যে কবিতা-বিশেষটি হাংরি ?

মলয়: সাধারণ পাঠক কি আর কবিতা পড়েন ? মনে হয় না । পাঢবস্তুটি যদি সাহিত্যের তদানীন্তন উর্ধ ও নিম্ন সীমাগুলো লঙ্ঘন করে, তাহলে টের পাওয়া যেতে পারে । শৈলেশ্বর, প্রদীপ, ত্রিদিব, সুবিমল, দেবী, সুবো, ফালগুনী, উৎপল, সমীর, আমার ওই সময়ের কবিতা পড়ো । মুক্তসূচনা ও মুক্তসমাপ্তির কবিতা, বিষয়কেনদ্রহীন, শিরোনাম দিয়ে বিষয় চিহ্ণিত হয় না, শব্দের ও ছন্দের যথেচ্ছাচার, লজিকাল সিকোয়েন্স বর্জিত, গুরুচণ্ডালি ভাষা, ইন্দ্রিয় পালটা-পালটি, প্রতীক বর্জিত, ছেঁড়া চিত্রকল্প ইত্যাদি । অথাৎ পাঠবস্তুটি বিবেচ্য, লেখক নন ।

ডক্টর দে: এমন অনেক কবিতা হাংরি-পরবর্তী কালে রচিত হয়েছে যেগুলোর মধ্যে যৌন শব্দ, অশ্লীল শব্দ, নতুন শব্দ, নিম্নশ্রেণির শব্দ, অশ্লীল উপাদান, ঘৃণ্য জীবনবোধ ইত্যাদি পাওয়া যায় । সে-ধরণের কবিতাকে কী হাংরি প্রভাবিত কবিতার পর্যায়ে ফেলা যায় ? অথবা অনেকেই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, হাংরি আন্দোলন সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, কিন্তু দেখা যায় হাংরি কবিতার বৈশিষ্ট্য তাঁদের লেখায় রয়েছে । সেগুলোকে কি হাংরি কবিতা বলব না ?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময় কাল ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ । ফলে স্বাভাবিক যে তার পরের অনেক কবি প্রভাবিত হবেন । আগের প্রশ্নের উত্তরে যে বৈশিঢ়্ট্যের কথা বললুম সেগুলো যদি থাকে তো অস্বিকার করার কারণ দেখি না । উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরার আনেকে নকশাল আন্দোলনের পর নিজেদের হাংরি ঘোষণা করেছেন । আমি তাঁদের চিনি না, দেখিনি । এটাই তো হাংরির সাফল্য ।

ডক্টর দে: আপনি ১৯৬৫ সালে পালামৌতে সম্বর্ধনায় লেখা ইংরেজি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমি কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চাই” । পেরেছেন কি ?

মলয়: না, পারিনি মনে হয় । বঙ্গসমাজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে, কবিতাহীন হয়ে গেছে । বাজার হয়ে উঠেছে প্রধান ডিসকোর্স । ফলে কবিতা প্রক্রিয়াটাই আজ কাউন্টার-ডিসকোর্সের চেহারা নিতে বাধ্য হয়েছে । কবিরা যেন গোপন সমিতির সদস্য । তার বাইরে বেরোলেই ঢুকতে হবে বাজারা । এখন কবিরাই শুধু কবিতা পড়ে । সে-সময়ে রাজনীতিকরাও কবিতা পড়তেন ।

ডক্টর দে: সমস্ত লেখকই লেখার শুরুতে প্রতিষ্ঠান আঁকড়ে ধরতে চান । তার কারণ প্রচারমুখিতা ।ঔ যে যত প্রচারিত সে তত সার্থক বলে মনে করা হয় । তাহ।এ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব না-পাওয়াই বোঝায় । আপনি কি বলেন ?

মলয়: এসটাবলিশমেন্ট ও অ্যান্টিএসটাবলিশমেন্ট শব্দদুটো বঙ্গসমাজে আমিই প্রথম এনেছিলুম । দুর্ভাগ্যবশত ক্ষমতালোভী বামপন্হীরা শব্দ দুটোর সঙ্গে আনন্দবাজারকে গুলিয়ে দিয়েছিল । মনে রাখতে হবে যে আমরা নাড়া দিতে চেয়েছিলুম প্রশাসনকে, যে অক্টোপাসের একটা আঁকশি ছিল আনন্দবাজার । এখন অন্য আঁকশিগুলোকে গণশক্তি, বাংলা আকাদেমি, তথ্যসংস্কৃতি বিভাগ, নন্দন, আলিমুদ্দিন, মহল্লা কমিটি, পঞ্চায়েত ইত্যাদি দিয়ে সহজে চিহ্ণিত করা যায় । এখন এসটাবলিশমেন্ট আরও ভয়ংকর । তার চাই লাশের পর লাশ ।
রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠান শব্দটার বদলে অচলায়তনের কথা বলেছিলেন । আমাকে নিয়ে মুর্শিদ এ. এম. যে-বইটা প্রকাশ করেছেন, তাতে কলিম খান তাঁর রচনায় গৌতম বুদ্জধ, শংকরাচার্য, রবীন্দ্রনাধ প্রমুখকে বলেছেল প্রতিষ্ঠানবিরোধী ।
যাঁরা লেখালিখির ব্যবসায় ঢুকতে চান তাঁদের জন্যে আনন্দবাজার জরুরি । যাঁরা সরকারি পুরস্কারের জন্যে লালায়িত তাঁরা গণশক্তি পত্রিকায় ঢুকতে চান । প্রচারিত হন তাঁরা । কিন্তু বেশিরভাগই হারিয়ে যান । সকলে ওসব জায়গায় ঢুকতে চায় না, কেউ-কেউ চায় । প্রধানত অন্য ভালো চাকরি জোটা না বলে । তাছাড়া প্রচারের আলোয় থাকার জন্যে অবিরাম লেখা-ব্যাপারটার ঘানি ঘোরাতে হয় । প্রতিষ্ঠান য়ভক্তি-এককের মূল্যবোধ নষ্জট করে । অক্টোপাস তাকে যে আঁকশি দিয়েই আঁকড়ে ধরুক না কেন ।

ডক্টর দে: আমরা জানি হাংরি আন্দোলন যাঁরা শুরু করেছিলেন তাঁরা প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী । এমন কি, প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাব যাঁরা লিখতেন তাঁদেরও কয়েকজন হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করে বুলেটিনগুলোয় লিখতেন । তাহলে স্বীকার করতে হয় এই আন্দোলোনটাই একটা প্রতিষ্ঠান । আপনি স্বীকার করেন কী ?

মলয়: অক্টোপাসের কোনো আঁকশির ক্ষমতাই হাংরি আন্দোলনের ছিল না । শক্তিকে আনন্দবাজারের আঁকশি ধরেছিল, উৎপলকুমার বসুকে এখন ধরেছে । সুভাষ আর বাসুদেবকে ধরেছিল সিপিএমের আঁকশি । সুবিমল সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার নিয়েছে । তাতে হাংরি আন্দোলনের স্ট্রাকচার এবং কাউন্টারডিসকোর্সে রদবদল হয় না । সুররিয়ালিজম আন্দোলন থেকেও অনেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন । আর কীর্তি হিসেবে উৎপলের ‘পুরী সিরিজ’ ও শক্তিদার ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’ এবং বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ তাতে ক্ষুন্ন বা বাতিল হয় না । সাহিত্যিক কাজ য়্যাপারটা প্রতিষ্ঠানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে না । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এখন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী বটে — আনন্দবাজার ও সিপিএম দুটিতেই— এবং আমি তাঁর সমালোচনা করি । কিন্তু কৈশোরকালীন সম্পর্কের দরুন তাঙকে শ্রদ্ধা করি । ওই সম্পর্কের কারণে উনি আমার পক্ষের সাক্ষী ছিলেন; যখন কি না শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ দিয়েছিলেন ।

ডক্টর দে: আধুনিকতা ব্যাপারটা আপনার মতে “একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর” । কী ভাবে ?

মলয় : ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর ‘গ্রন্হে ‘ধ্রুপদী জোচ্চোর’ শিরোনামে আমার কবিতাটা পড়েছ কি ? ‘কবিতা পাক্ষিক’ থেকে ‘আধুনিকতার বিরুদ্ধে কথাবাত্রা’ নামে আমার একটা বই বেরিয়েছিল । ওদের ওয়েবসাইটে দেখলুম এখনও পাওয়া যায় । মডার্ন, মডার্নিটি, মডার্নিজম কিন্তু একই ব্যাপার নয় ।
বঙ্গীয় আধুনিকতা প্রসারিত হয়েছিল ঔপনিবেশিকতার স্ফূরণরূপে । স্বাভাবিক যে উত্তর-ঔপনিবেশিকতায় তার আদল-আদরা পালটাবে । ইউরোপে ঠিক যে-ভাবে ও যে-কারনে আধুনিকতার উদ্ধব ও প্রসার ঘটেছিল, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সে-ভাবে ও সে-কারণে তা ঘটেনি । আমাদের অভিধানে তাই আধুনিকতার অর্থ বর্তমানকালীন, সাম্প্রতিক, হালের, অধুনাতন, নব্য । আসলে, আধুনিকতা হল জীবনের একটি ফর্ম, পরিবর্তিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সামাজিক বিন্যাসের কাঠামো । অন্যরকম আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ, আদান-প্রদানের জীবন উদ্ভূত হয়েছিল, এবং হোতারা তাকে ইতিবাচকতা দিয়েছিলেন ।
জ্ঞান ব্যাপারটা অটীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ওই জীবনবোধে, যা থেকে বিশেষজ্ঞদের আবি্র্ভাব । বিজ্ঞানের এক বিশেষ দৃষ্টি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল জ্ঞান সম্পর্কে অমন ধারণা । এখন তাকে বলা হচ্ছে রিডাকশানিজম বা খণ্ডবাদ । অমন জ্ঞান না থাকাকে আধুনিকতা মনে করেছে মূর্খতা, অর্থাৎ তা খারাপ, অনৈতিক, অজ্ঞতা, আনকালচার্ড । আধুনিক বিজ্ঞানকে তুলে ধরা হয়েছিল একটি সর্বজনীন, মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ জ্ঞান-কাঠামো হিসেবে, এবং মেনে নেয়া হয়েছিলযে ব্রহ্মাণ্ড, জীবন ও সমস্ত কিছু সম্পর্কে তা শেঢ় কথা বলে দিতে পারে । এই যান্ত্রিক প্যারাডাইম বা খণ্ডবাদকে ইউরোপ প্রয়োগ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে; নিজেদের আধিপত্যকে বৈধতা দেবার স্বার্থে । সাম্রাজ্যবাদ, খণ্ডবাদ, আধুনিকতাবাদ, বিজ্ঞানবাদ সবই চলেছে হাতে হাত মিলিয়ে ।
ওই ইউরোপীয় প্যারাডাইমটার জ্ঞানতাত্বিক, এমনকি তত্ববাদী অনুমানগুলো, সমরূপতা বা একরূপতার ধারণার ওপর নি্র্যরশীল, যা মনে করে যে, তাবৎ নিয়ম, ব্যবস্হা, প্রণালী, কাঠামো ইত্যাদির বুনিয়াদি উপকরণগুলোর মধ্যে পার্থক্য নেই । আধুনিক কবিতার প্রতিপাদকরা এই খণ্ডবাদী দর্শনের পথটিকে সমস্ত কবিদের ক্ষেত্রে অবশ্যমান্য করতে চেয়েছে, বেঁধে দিতে চেয়েছে সমরূপতার অনুশাসন, ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী শর্ত অনুযায়ী । জোচ্চুরি ছাড়া আধিপত্য হয় না । তুমি ভেবে দেখো, কেন বহুকাল পর্যন্ত নজরুল আর জসীমুদ্দিনকে একঘরে করে রেখেছিলেন ওই হোতারা । ভাগ্যিস নজরুল মারা গেলেন বাংলাদেশে ।
খণ্ডবাদের অধিযান্ত্রিক উপমাগুলো প্রকৃতি ও সমাজকে, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক স্তরে পুনর্গঠন করেছে নিজেদের স্বার্থে । প্রকৃতির ওপর আরোপ করা হয়েছে যান্ত্রিকতার মেটাফর, যেহেতু তা বিভাজন-সহায়ক এবং স্বকার্যে প্রয়োগযোগ্যতার অনুমানে ভর করে দাঁড়ায় । পক্ষান্তরে, জৈব মেটাফরগুলো মনে করেছে যে পরস্পর-নির্ভরশীলতা এবং আদান-প্রদানের দ্বারা ক্ষমতার বিন্যাস হোয়া দরকার । বাস্তবজগত একটি জীবন্ত ব্যাপার । এই জীবন্ত ব্যাপারটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে খণ্ডবাদ থেকে চাগিয়েছে আর প্রশ্রয় পেয়েছে সন্ত্রাস । বহু আদর্শকে আধুনিকতা মানবসমাজে এনেছিল, এবং সেগুলোকে প্রতিষ্ঠা দেবার প্রধান উপায় করা হয়েছে সন্ত্রাসকে ।

ডক্টর দে: দীর্ঘদিন লেখা থেকে বিরতি ঘটিয়ে যখন দ্বিতীয়বার লেখারজগতে ফিরে এলেন, তখন আপনি বলেছিলেন, নিজেকে ক্ষুধার্ত মনে করি না । কেন? ক্ষুধার্ত প্রজন্মের স্রষ্টা আপনি । তার মানে ক্ষুধা শেষ ? যখন আন্দোলন করেছিলেন, তখনও কি ক্ষুধা ছিল না? কিন্তু অনেকেরি যে ক্ষুধা ছিল এবং রয়েছে ?

মলয়: তুমি আবার পেটের খিদের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে গুলিয়ে ফেলছ । আমলাশোল আর ডুয়ার্সে চাষি আর মজুররা না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে বলে সরকারের তুলোধুনা করব । নিজেকে ক্ষুধার্ত বলতে যাব কেন? হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যারা সিপিএমের ছত্রছায়ায় ঢুকেছিল—যেমন সুভাষ, বাসুদেব, শৈলেশ্বর— তারাই এই গোলমালটা বাধিয়েছে । দিব্বি চাকরি-বাকরি করে আরামে থেকেছে আর নিজেদের বলেছে সর্বহারা ।
নিজেকে সেই সময়ে হাংরি আন্দোলনকারী বলতুম, ক্ষুধার্ত বলতুম না । তাছাড়া, নিজেকে ক্ষুধার্ত মনে না করার বহুবিধ কারণ আছে । যেমন, যাঁরা মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হলেন (সুভাষ ও শৈলেশ্বর), তারাই ‘ক্ষুধার্ত’ নামে পত্রিকা বের করতেন । তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, মূল্যবোধের সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই । অনুপম মুখোপাধ্যায়ের রিভিউ পড়ে জানতে পারলুম, আমার নামে তাতে জাল প্রবন্ধও ছাপা হয়েছে ।
যাঁরা নিজেদের ক্ষুধার্ত বললেন তাঁরা শাসকদল ও তার শিক্ষক সংগঠনে ঢুকলেন । হাংরি আন্দোলনকারীর তো অচলায়তন ভাঙার কথা । তারা তাতে ঢুকে আশ্রয় নেবে কেন? এটা তো জোচ্চুরি । আত্মসন্মানবোধহীনতা ।
উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরায় অনেকে ক্ষুধার্ত ঘোষণা করেছিলেন নিজেদের । দেখলুম তাঁদের চেয়ে আমি সব ব্যাপারেই আলাদা । অভিজ্মতা ও ভাবনাচিন্তায় তো বটেই । আবার যখন লিখতে আরম্ভ করলুম তখন চাকুরিসূত্রে সারা ভারতবর্ষ চষে বেড়াচ্ছি, বিশেষ করে গ্রামে-গ্রামে ।

ডক্টর দে: শিল্পকৃতির জন্যে আন্দোলন জরুরি নয়; শিল্পী ও ভাবুকদের মধ্যে অনেকেই নির্জনে সাধনা করার পক্ষপাতি ল কথাটা আপনি কতটুকু সমর্থন করেন ?

মলয়: মন্দিরের আরাধ্যরা শিল্পকৃতি নন । তাঁদের উপড়ে চুরি করে ইউরোপ-আমেরিকায় কোটি-কোটি ডলারে বিক্রির পর তাঁরা হয়ে যান শিল্পবস্তু । অর্থাৎ তা থেকে ডিভিনিটি নিষ্কাশিত । শিল্প শব্দটা হল আর্ট শব্দের বাংলা, যে কনসেপ্ট এসেছে সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে চেপে ।
কবিতা, উপন্যাস লেখার জন্যে আন্দোলন জরুরি নয়, এটা ঠিক । সে-সময়ে কাউন্টার কালচারাল মুক্তধারা বইয়ে দেবার জন্যে প্যারাডাইম শিফ্ট দরকার ছিল ।
আর নির্জনে একা বা অনেকের মাঝে বসে যারা কখনও সাধনা ব্যাপারটা কী, তা জানার চেষ্টা করেননি, তাঁরা অমন মধ্যযুগীয় অভিব্যক্তি প্রয়োগ করতেন । আমি আচার্য রজনীস (তখন তিনি চন্দ্রমোহন জৈন ছিলেন), রামকৃষ্ণ আশ্রম, বালটিবাবা, মোহন্ত গোরখনাথ, গাঁজাপায়ী নিরক্ষর সন্ন্যাসী, সব সঙ্গ করে দেখে নিয়েছি । লেখা।লিখির জন্যে দরকার বিপুল অভিজ্ঞতা । জীবনানন্দ রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরতেন । রবীন্দ্রনাথ হিল্লি-দিলই করতেন । নানা এলাকার নানা রকম মানুষের সঠ্গে যত বেশি মেশা যায়, একজন লেখক ও ভাবুক তত বেশি সমৃদ্ধ হন । নির্জনে নয় ।

ডক্টর দে: হাংরি আন্দোলন শুরু করার আগে বাংলা-সাহিত্যের কোন কবি-লেখকদের রচনা পড়েছিলেন ? মন্বন্তর,দেশভাগ, উদ্বাস্তু, দাঙ্গা, এগুলো হাংরি আনদোলনের ক্ষেত্রে আপনার চিন্তায় কতটুকু প্রভাব ফেলেছিল ?

মলয়: আমি ভালো পড়ুয়া ছাত্র ছিলুম । বাবাকে আর দাদা সমীরকে বললেই বই কেনা যেত । চাকরি করতে ঢুকে বাড়ির জন্যে খরচ করতে হত না । বই কিনতুম আর অভিজ্ঞতা সংগ্রহে খরচ করতুম । তাই রবীন্দ্রনাথ আর শশধর দত্ত আকযোগে পড়েছি । গোগ্রাস পাঠক ছিলুম । বন্ধু-বান্ধব, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, দাদা ও দাদার কবি-বন্ধুদের মুখে নাম শুনলেই বই যোগাড় করতুম ।
বই পড়ে বা লোকমুখে শুনে যে চিন্তা-প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে তার তুলনায় আভিজ্ঞতা-সঞ্জাত চিন্তা-প্রক্রিয়াকে আমি গুরুত্ব দিই । অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে লিখলে তার লিটেরারি প্রেমাইস থাকে না । ছোটোলোকের ছোটবেলা, এই অধম ওই অধম, অভিমুখের উপজীব্য, ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলি, নামগন্ধ, নখদন্ত বইগুলো পড়লে তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে ।

ডক্টর দে: একজন লেখক, কবি বা চিত্রকর যে হাংরি আন্দোলনের সহযোদ্ধা তা কী করে বোঝা যাবে ?

মলয়: সহযোদ্ধা কথাটায় আমার আপত্তি আছে । ওটা যুদ্ধ ছিল না । বলতে হবে অংশগ্রহণকারী ।
ম্যানিফেস্টোগুলোয় যাঁদের নাম আছে, কোনো না কোনো সময়ে, তাঁরা অঙশগ্রহণকারী ।
হাংরি আন্দোলনের কোনো হেডকোয়ার্টার, পলিটব্যুরো বা হাইকমাণ্ড ছিল না । তাই যিনি চেয়েছেন তিনিই নিজেকে অঙশগ্রহণকারী ঘোষণা করেছেন । যেমন অরুণেশ ঘোষ, অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার, সেলিম মুস্তফা, রসরাজ নাথ, বিকাশ সরকার, অরুণ বণিক, জীবতোষ দাস, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ নিজেদের হাংরি ঘোষণা করেছিলেন, আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার দেড়-দুই দশক পর । ফলে ইমপ্যাক্ট প্রমাণিত ।

ডক্টর দে: শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই আন্দোলনকে বলেছিলেন সর্বগ্রাসী ? কেমন করে ?
মলয়: একটু আগেই তো স্পেংলার ব্যাখ্যা করার সময়ে সে-কথা বললুম ।

ডক্টর দে: দেবেশ রায় বলেছিলেন, “তত্ববিশ্বের ক্ষেত্রে হাংরি আন্দোলন ছিল নকশাল আন্দোলনের প্রথম ধাপ”। আপনার মন্তব্য কী?

মলয়: উনি সরকারি মার্কসবাদী বলেই হয়ত নেতিবাচক দৃষ্টিতে কথাটা বলে থাকবেন । কিউবায় কারোর ফুসকুড়ি হলে ওনারা মিছিল-মিটিং করতেন । আমার পুলিশি হেনস্হার সময়ে এগি্যে আসেননি । মার্কসবাদীদের মধ্যে একমাত্র তরুণ সান্যাল এসেছিলেন, পার্টির দাদাদের নিষেধ সত্বেও । আর যুগান্তর সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন কৃষ্ণ ধর ।

ডক্টর দে: “বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার জটিলতা ও আস্পষ্টতার বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনই ছিল প্রথম পরিকল্পিত বিদ্রোহ” । আধুনিকতার জটিলতা ও অস্পষ্টতা প্রাঞ্জল করে দিলে পাঠকের সামনে ধোঁয়াটে ভাব কেটে যাবে ।

মলয়: আধুনিকতা সম্পর্কে ব্যাপারটাতো একটু আগেই ব্যাখ্যা করেছি । আর হাংরি আন্দোলন যে পরিকল্পনা করেই আমি দাদা, শক্তিদা করেছিলুম তা আজ সবাই জানেন ।

ডক্টর দে: ব্যক্তিগতভাবে হাংরি আন্দোলন নিয়ে সে-সময়ে বিদেশি কাদের সঙ্গে আলোচনা হত ? আজকের দিনে হাংরি আন্দোলন বিষয়ে বিদেশিরা এখনও আলোচনা করেন কি।

মলয়:আলোচনা ধরণের তেমন কিছু হত না । তবে, আন্দোলন আরম্ভ হবার পর দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেছে হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড,অ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ ডাউডেন, ওকতাভিও পাজ, ডেইজি অ্যালডান, আরনেস্তো কার্দেনাল প্রমুখের সঙ্গে । বহু লেখক-কবি-সম্পাদকের সঙ্গে যোপগাযোগ ছিল, যাঁরা ম্যানিফেস্টো, কবিতা ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন, যেমন লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, ডিক বাকেন, মার্গারেট র‌্যানডাল, এরিক মটর‌্যাম, জেরোম রোদেনবার্গ, বার্নে রসেট, ক্যারল বার্জ, কার্ল ওয়েসনার, রবার্ট কেলি, গর্ডন ল্যাসলেট, ড্যান জর্জাকাস, আইডা স্পলডিং, লেরয় জোন্স (হামিরি বারাকা), অ্যালান ডি লোচ, অ্যালেন ভ্যান নিউকার্ক, জেমস লাফলিন, ডায়না ডি প্রিমা, জর্জ বাওয়ারিং, পল ব্ল্যাকবার্ন, অ্যালেন হফম্যান, ক্লেটন অ্যাশলেম্যান, ক্যারল রুবেনস্টিন, অ্যার্মন্ড শোয়েনার, টেড বেরিগ্যান, রবের্তো হুয়ারোজ, লিটা হরনিক প্রমুখ । বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনাদের আরকাইভে আমার চিঠি-কবিতা-ম্যানিফেস্টো যে সংরক্ষিত তা ‘গুগল’ সার্চ করলে পাওয়া যায় ।
হাইকোর্টে মকদ্দমার অকল্পনীয় খরচ মেটাতে অনেকে লেখা ছাপিয়ে সাহায্য করতেন । এখানে কমলকুমার মজুমদার এবং অশোক মিত্র আই এ এস ছাড়া কেউ সাহায্য করেননি । কলকাতায় থাকার জায়গাও ছিল না ।
হাংরিয়ালিজম বা আন্দোলনকারীর নামে নেট সার্চ করলে বোঝা যায় যে অবিরাম আলোচনা-মন্তব্য চলছে । বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ভাষায় ।
ওই সময়ে বেনারস-পাটনা-নেপালে বহু হিপি-হিপিনীদের সঙ্গেও সময় কাটিয়েছি, যাঁরা নেশা-যৌনতার যথেচ্ছচারী জীবন কাটাতে ইউরোপ,আমেরিকা, জাপান থেকে আসতেন । ওই সময়ের এক ঝলক আমি ব্যবহার করছি “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে ।

ডক্টর দে: কোন ধরণের কবিতা অমরত্ব পায় ? অর্থাৎ মৃত্যুর পর শত বছর পরও কোনো-কোনো কবিতা আমরা আবার পড়ি । কেন?

মলয়: অমরত্ব ব্যাপারটা বলতে পারব না । বহু কবিতা অ্যাকাডেমিক চত্বরে পঠিত হব, অথচ জনমানস থেকে লোপাট হয়ে যায় । যেমন চর্যাপদ, শূন্যপুরাণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পদাবলী সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, দৌলত কাজী-সৈয়দ আলাওল, মৈমনসিংহগীতিকা, ভারতচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, সবাই অমর । কিন্তু কলেজের বাইরে কেউ পড়ে না।

ডক্টর দে: আমরা কবিতায় ‘আধুনিক’ শব্দটা প্রয়োগ করি । আসলে ‘আধুনিক’ শব্দটা কবিতার বেলায় কতটুকু প্রযোজ্য ? কবিতার আধুনিকতা প্রকৃতপক্ষে কী?

মলয়: একট আগেই এ-বিষয়ে অনেক কথা বলেছিলুম । বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ হলেন সাহিত্যের জলবিভাজক । তাঁর পূর্বের কবিদের পড়লে আমরা বুঝতে পারি লেখাগুলো প্রাগাধুনিক । তাঁর পরের কবিদের লেখা পড়ে বুঝি যে তা আধুনিক । অতএব শব্দটা যে প্রযোজ্য সে-ব্যাপারে সংশয় থাকা নিরর্থক ।
“বদ্ধসূচনা ও বদ্ধসমাপ্তির মাঝে একটি স্বয়ংসম্পূর্ন ভাষা পরিসর যা একরৈখিক অন্তর্বয়নের মাধ্যমে যুক্তিক্রম মেনে নির্মিত, এবং যার বিষয় কেন্দ্রের মালিকানা কবির নিজস্ব, এবং শিরোনামের দ্বারা তিনি তা ঘোষণা করেন, অবশ্যই গৃহপালিত বাকমণ্ডল ব্যবহার করে”। আধুনিক কবিতার এরকম একটা সংজ্ঞা হতে পারে । আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ আধুনিক কবিতা সম্পর্কে বলেছিলেন, “ইট শুড নট মিন, বাট বি” । দীপ্তি ত্রিপাঠী আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য বলার সময়ে যে পয়েন্টগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো উত্তরআধুনিক কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । ওনার সময়ে উত্তরআধুনিক বা পোস্টমডার্ন ব্যাপারটা আসেনি বলে ওনার বক্তব্য থেকে আমরা বঞ্চিত ।

ডক্টর দে: কোন-কোন উপাদানের সাহায্যে বোঝা যাবে যে একটি কবিতা উত্তরআধুনিক?

মলয়: দাদা সমীর রায়চৌধুরী উত্তরঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিতে আধুনিক এবং উত্তরআধুনিক কবিতার তুলনামূলক তালিকা তৈরি করেছিলেন। সেটা দেখেও, তাহলে দুটোই স্পষ্ট হবে । সমীর চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক, যিনি “আংরি জেনারেশান রচনা সংকলন” বের করেছেন, তাঁর সঢ্গে আমার দাদাকে গুলিয়ে ফেলো না যেন।

ডক্টর দে: অভিযোগমত হাংরি কবিতা যদি অশ্লীল হয়, তাহলে রামায়ণ, মহাভারত, গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মনসামঙ্গল অশ্লীল । কোনারক, খাজুরাহো, পুরীর মন্দির অশ্লীল । সাহিত্য-শিল্পে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদ নিয়ে আপনার বক্তব্য চাইব । অশ্লীলতা বিষয়ক হাংরি বুলেটিনে যা বলা হবেছিল, তাছাড়া আর কোনো বক্তব্য আছে কি?

মলয়: সনাতন ভারতবর্ষে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদ যে ছিল না, তা তোমার উল্লেখ করা কাজগুলো থেকেই স্পষ্ট । সনাতন ভারতবর্ষে দেখা হত কাজটা রসশাস্ত্র-অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী হয়েছে কিনা । শৃঙ্গার-রস ব্যাপারটাই তো আদি রস ।
দুর্ভাগ্যবশত আরবি-তুর্কি-আফগানি বিটকেল মূল্যবোধের প্রথম ঝাপটায় সনাতন ভারত ব্যাপারটা লোপাট হয়ে গেল । প্রচুর ভাঙচুর হল । তারপর এল ভিকটোরীয় খ্রিষ্টধর্মীর দল । যেটুকু বেঁচেছিল তা-ও গেল । ওরা অবসিনিটির আইন র্বিটেন থেকে আমদানি করে কী শ্লীল আর কী অশ্লীল তার র্খিষ্টিয় ফতোয়া দিতে লাগল । ওদের আনা মানদণ্ডের চাকর হয়ে গেল ভারতীয়রা । এত পুরু ঔপনিবেশিকতার চাদর জমে গেছে এদেশের চিন্তা-চেতনায় যে তা সহজে যাবার নয় । তার ওপর, সমাজে যারা ছড়ি ঘোরায়, তারা ইংরেজদের আদল-আদরায় নিজেদের সংস্কৃতিমান মনে করে । এঁরাই হাংরি আন্দোলনে অশ্লীলতা খুঁজে বের করেছিলেন ।

ডক্টর দে: যৌনতা ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । মানুষের যৌনক্ষুধা বিলুপ্ত হয়ে গেলে অনেকটা জড়পদার্থে পরিণত হয়ে যায় । যৌনতা মস্তিষ্কগত, যে-কারনে পশুদের মত মানুষের যৌনতার ঋতু হয় না । বিজ্ঞানমতে যার যৌনশক্তি যত প্রখর, তার তত মেধার জোর, এবং সৃষ্টিশক্তি । তাহলে কাব্য-সাহিত্যে এর প্রকাশকে যাঁরা অপরাধ বলেন, তাঁরা কি ঠিক করেন?

মলয়: তারা সব বাঁজা বা হিজড়ে ।

ডক্টর দে: যারা রাজনৈতিক উগ্রপন্হী, তারা বিভিন্নভাবে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে । আমরা শুনেছি, হাংরি আন্দোলনকারীরা ইশতাহার বুলেটিন পোস্টার হ্যান্ডবিল পত্রপত্রিকা বই ইত্যাদি প্রকাশের বাইরে কিছু আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ করেছিলেন । যেমন, সম্পাদককে জুতোর বাক্স দিয়ে বলা হয়েছিল রিভিউ করতে; টপলেস যুবতীর প্রদর্শনী, সাদা কাগজ গল্প-সম্পাদককে দিয়ে বলা হয়েছিল ছাপাতে । বিয়ের কার্ডে কবিতা পাঠের নিমন্ত্রণপত্র তৈরি করা হয়েছিল । “মুখোশ খুলে ফেলুন” লেখা রাক্ষস, ও পশুর মুখোশ মন্ত্রীদের পাঠানো, মাইকেলের সমাধিতে-খালাসিটোলা-কেওড়াতলা শ্ঞশানে কবিতা পাঠের আয়োজন, বাঁকুড়ায় উলঙ্গ অবস্হায় নদী পারাপার, দুমকায় হাড়িয়ার হাঁড়ি বাজিয়ে দোলের সময় উদ্দাম নৃত্য, হিপিনীদের সঙ্গে নেশা ও যৌনতার বেনারসী-নেপালি অনাচার, গ্রন্হের দাম ১৪৪৩৫০০ টাকা রাখা বা ৫০টি টিয়ি সিল রাখা ইত্যাদি । এখন কথা হচ্ছে, হাংরি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যশিল্পে স্হিতাবস্হা ভাঙা । তা করতে গিয়ে এই সমস্ত কার্যকলাপ কেন? হাংরি আন্দোলনকারীদের এই কার্যকলাপের সঙ্গে ডাডা আন্দোলনকারী এবং বিট জেনারেশানের কার্যকলাপের মিল খুঁজে পান আলোচকরা । তা কতটা সত্য? আমার মনে হয়, কেবল সাহিত্যশিল্প চর্চায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে, হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা-মকদ্দমা-হেনস্হা হত না । অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহের অভিযোগে গ্রেপতার হতেন না । তখনকার সাহিত্যিক, রাজনেতা, প্রশাসক, সাংবাদিক, বণিকরা এবং সমাজের গণ্যমান্যরা বাধ্য হয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-মকদ্দমা হয়, এবং কোর্টে ডাকাত ও খুনিদের পাশাপাশি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অপমান ও কারারুদ্ধ করা হয় । অনেক ক্ষেত্রে আপনাদের এই কার্যকলাপকে বয়স্ক শরিকরা, যাঁরা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ছেড়ে হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, অন্তর দিয়ে সমর্থন করেননি, যতটা করেছিলেন সাহিত্যে সহিতাবস্হা ভাঙার আন্দোলনকে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ওগুলো সস্তায় নাম কেনার চেষ্টা । এই সমস্ত অভিযোগ সম্বন্ধে কী বলবেন ?

মলয়: ডাডা আন্দোলনের ত্রস্তান জারা, মিশেল দুশঁ প্রমুখের প্রয়াস ছিল যুদ্ধোত্তর ইউরোপে শিল্পকৃতিকে রিডিফাইন করার প্রয়াস । অ্যালেন গিন্সবার্গ, উইলিয়াম বারোজ, জ্যাক কেরুয়াক প্রমুখ বিট আন্দোলনকারীরা ম্যাককার্থি-পরবর্তী রক্ষণশীল আমেরিকার দমবন্ধকরা আবহাওয়া কাটিয়ে খোলা হাওয়া আনতে চাইছিলেন । আমাদের কার্যকলাপ ছিল দেশভাগোত্তর বিপর্যয়ে আক্রান্ত উত্তরঔপনিবেশিক বঙ্গসমাজের স্হিতাবস্হায় আঘাত দেয়া । অচলায়তনে ফাটল ধরিয়ে মুক্তধারাকে বের করা । কাগজ কলম নিয়ে ঘরে বসে তিনে কত্তে তিন হাতে রইল পেনসিল নয় ।
হামাকে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ডাকাতদের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটানো হল । প্রদীপ চৌধুরী শান্তিনিকেতন থেকে রাস্টিকেট হল । উৎপলকুমার বসু যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপকের চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেন । আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন । সুবিমল বসাক আর দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেয়া হল । কফিহাউসের সামনে লোহার রড, চেন, হকিস্টিক নিয়ে সুবিমলকে ঘিরে ফেলা হল । এগুলো থেকেই তো প্রমাণ হয় যে স্হিতাবস্হায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল ।
ওসব কার্যকলাপে কেউ আতঙ্কিত হয়েছিল বলে তো শুনিনি । ভিরমি খেয়েছিল বা ঘাবড়ে গিয়েছিল বলা যায় । তখন পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্যিকরা ছিল “আর্ট ফর আর্ট সেক”-এর নৌকোয়, যা হাংরি আন্দোলনের ধাক্কায় ডুবে যায় । বঙ্গসমাজের পচনকে যে হাংরি আন্দোলনকারীরাই শনাক্ত করেছিল, বামপন্হীরা নয়, তা এখনকার পশ্চিম বাংলার দিকে তাকালেই টের পাবে ।
আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহু ধান্দবাজি করে নাম কিনেছেন, এ-ব্যাপারে কিছু বললে বড় মুখে ছোট কথা হয়ে যাবে । ওনার গুণগ্রাহী বিশ্বব্যাপী । শক্তি চট্টোপাধ্যাব আনন্দবাজার চাকরি পাবেন বলে উষ্মা প্রকাশ করেন । শৈলেশ্বর আর সুভাষ যে মুচলেকা দিয়েছিল তা বহু লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে ।

ডক্টর দে: আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি হাংরি আন্দোলন শুরুর কথা ভাবা হয়, তাহলে কীভাবে ভাববেন ? দর্শন ধার করার জন্য স্পেঢলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ বইটির প্রয়োজন হবে কি ? নতুন দর্শন যুক্ত করার প্রয়োজন থাকলে কার দর্শন গ্রহনযোগ্য মনে করেন? প্রথম ইশতাহার শুরু করলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী হবে ? ধরা যাক, প্রথম হাংরি ইশতাহার প্রকাশ পাবে তাতে কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, দশফন, সাহিত্য, স্বাধীনতা, মানুষ, বিজ্ঞান, সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি, ক্ষুধা, সংস্কৃতি, ছবি-আঁকা বিষয়ে আপনার অভিমত কি ১৯৬১-৬৫ সময়ের থেকে ভিন্ন হবে ?

মলয়: আমার ‘পোস্টমডার্ন কালখণ্ড ও বাঙালির পতন’ বইটার আর ‘প্রমা’ পত্রিকাব প্রকাশিত ‘উত্তরদার্শনিকতা’ নামের দীর্ঘ প্রবন্ধের জেরক্স তো তুমি নিয়েছ ? গভীরভাবে পড়লেই টের পাবে যে হাংরি বা ওই ধরনের আর কোনো কাউন্টার-কালচারাল আন্দোলন সম্ভব নয় । বিশ্ব এখন দ্রুতি-আক্রান্ত, প্রযুক্তি তাবৎ অনুমানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে প্রতিটি সমাজের ম্যাক্রো ও মাইক্রো স্তর । যাবতীয় অ্যিধার ভাবসীমা হয়ৈ গেছে পরিধিহীন ।

ডক্টর দে: আন্দোলনের শুরুতে সম্পাদনার দায়িত্ব, প্রচার ও প্রসারের জন্য হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়কে আবিষ্কার করেছিলেন । আজকের দিনে আন্দোলন শুরু করতে গেলে এই কাজের জন্য কাকে খুঁজে আনবেন? নেতৃত্বের জন্যই বা কোন অগ্রজকে চিহ্ণিত করবেন?

মলয়: আর কোনো অমন আন্দোলন যে সম্ভব নয় তা তো একটু আগেই বলেছি । সাব-অলটার্ন কবি-লেখকরা আজ নিজের জোরে সাহিত্য-পরিসর গড়ে নিয়েছেন । তারাই বরং সংখ্যায় বেশি । তাঁরা এনেছেন নিজস্ব শব্দভাঁড়ার, অভিয়ভক্তি, ডিকশন, ভাষাবিন্যাস । এই মুহূর্তে কবিতায় অনিকেত পাত্র আর ফিকশানে অনিল ঘড়াইয়ের নাম মনে পড়ছে ।
হাংরি আন্দোলনে আগে পর্যন্ত তুমি ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ ইত্যাদি পত্রিকা দ্যাখো । নিম্নবর্গের একজন কবির কবিতাও পাবে না, কেননা, ওই শ্রেণির ভাষাকাঠামো অভিজাত সম্পাদকের স্বকৃতি পেত না । ইউরোপ তখন ওনাদের মাথায় চেপে বসেছিল । হারাধন ধাড়া বললে ওঁর অবশ্য খারাপ লাগে, কেন জানি না । তাই পালটে করেছেন দেবী রায় । হয়ত ঠিকই করেছেন ।

ডক্টর দে: ‘হাংরি’ এই যে অভিধা, তা একটি কবিতা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিলে পাঠকদের সুবিধা হয় ।

মলয়: তুমি ‘জখম’ কবিতাটাই নাও না । ওই কালখণ্ডের পুরো বঙ্গসমাজকে নিজের হাঁ-মুখে ঢুকিয়ে নিয়েছে পাঠবস্তুটা । তারপর পংক্তির পর পংক্ত উগরে দিয়েছে পাঠকের সামনে । ওই পাঠবস্তুটি তার সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তখনকার তাবৎ সাহিত্যিক অনুশাসনকে অস্বীকার করে কবিতা হয়ে উঠতে চেয়েছে । পাঠবস্তুটি তার হাঁ-মুখে পোরার জন্যে কোনো বাদবিচার করছে না । পাঠবস্তুটা সে-কারণে বিষয়বস্তুহীন, শিরোনাম দিয়ে বিষয় চিহ্ণিত হচ্ছে না । তার কোনো ব্রেকফাস্ট টাইম, লাঞ্চ টাইম, ককটেল টাইম, ডিনার টাইম, পর্ব নেই । পাঠবস্তুর শুরু ও শেষ দু-ই মুক্ত । তা সর্বগ্রাসের আগে গণ্ডুষ ও শেষে আচমন করছে না । বানানের, শব্দের ও ছন্দের যথেচ্ছাচারে লিপ্ত, দু-হাতে খাবার মতন । সর্বোপরি, ওটি ‘সাওয়ার হাংরি টাইমের ‘ কবিতা । প্রতীক বর্জিত, ছেঁড়াখোঁড়া চেবানো চিত্রকল্প, কোনটা আগে আর কোনটা পরে গ্রাস করার বালাই নেই বলে পাঠবস্তুর পংক্তিরা অনুক্রমহীন ।গোগ্রাস খাবার মতন যেখান থেকে ইচ্ছা পড়া যায় । বাইনারি অপোজিশান বা যুগ্মবৈপরীত্যের মূলকাঠামোকে চুরমার করা হয়েছে, যার দরুন হরেকরকম ‘আমি’ ছড়িয়ে আছে পাঠবস্তু জুড়ে, অর্থাৎ পাঠবস্তুর হাঁ-মুখও অতগুলো । ‘জখম’-এর আগে দীর্ঘ কবিতা হত নদী-প্রবাহের মতো । ‘জখম’, পক্ষান্তরে, তৃণভূমির মতন । টৃণের মতন পংক্তিগুলো পরস্পরের সঙ্গে একযোগে যুক্ত ও বিযুক্ত । তৃণভূমির মতই এর ব্যাপ্তি বিশাল, এবং যতবার পড়বে তার বৃদ্ধি ঘটবে । লক্ষ্য করো, পাঠবস্তুটির হাঁ-মুখে ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, সমায়, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছু নির্বিচারে সেঁধিয়ে যাচ্ছে । ফিকশানে তুমি বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ পড়ো ।

ডক্টর দে: আজকের দিনের কবিতায় হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যকৃতি প্রভাব ফেলতে পেরেছে কি ? অথাৎ আজ বহু প্রকার কবিতা লেখা হচ্ছে । সবারই নিজস্ব বোধভূবন রয়েছে । এই ভুবনে হাংরি কবিতার সাহিত্য-দর্শন বা ক্যানন প্রতিফলিত হয় কি ?

মলয়: কেবল কবিতা কেন, সাহিত্যের সব এলাকায় প্রবেশ করেছে হাংরিয়ালিস্ট ক্যানন, এমন কি পত্রিকার নামকরণেও । ১৯৬১-৬৫-র আগের ও পরের সাহিত্য বিশ্লেষণ করে দ্যাখো, তাহলেই চোখে পড়বে । শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিন পরিসরে তা সীমিত নয়; বাণিজ্যিক লেখকরাও হাংরি আন্দোলন থেকে প্রচুর মাল-মশলা খড়কুটো নিয়েছেন । এই তো কয়েকদিন আগে নারায়ণ ঘোষের চিঠি পেলুম, যাতে উনি বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন । তুমি তো পি এইচ ডি করছ, তুমি আরো ভালো বলতে পারবে। এই কিছুক্ষণ আগেই একটা প্রশ্নে তুমি নিজেই বলছিলে যে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমন অনেকের কবিতায় হাংরি বৈশিষ্ট্য দেখা যায় । তবে?

ডক্টর দে: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ২০০০ সালের শেষে বিশ্ব কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছে, মডার্ন অ্যাণ্ড পোস্টমডার্ন পোয়েট্রি অব দি মিলেনিয়াম শিরোনামে । তাতে বাংলা সাহিত্য থেকে কেবল আপনার কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতার অনুবাদ Stark Electric Jesus, তা কি এই জন্য যে আপনার সঙ্গে প্রধান-প্রধান বিট কবিদের যোগাযোগ ছিল ? ইউরোপ-আমেরিকার পত্রপত্রিকায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি সে সময়ে কী ভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল ? বাঙালি সাহিত্য আলোচকরা তো সে-সময়ে কবিতাটিকে প্রাপ্য সন্মান দিতে কুণ্ঠিত ছিলেন ।

মলয়: কেবল বিটরা নন, অন্যান্য গোষ্ঠির কবিদের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু হয়ে উঠেছিল কবিতাটা, কেননা তাঁদের সাহিত্যের প্রেক্ষিতেও একেবারে নতুন ছিল প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার । আমার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যেমন হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, ডেভিড অ্যানটিন, রবার্ট ক্রিলি, জোয়েল ওপেনহাইমার প্রমুখের যোগাযোগ ছিল, যাঁরা ছাত্রদের ওয়র্কশপে কবিতাটা বিশ্লেষণ করেছেন ।
ড্যান ব্রাউনের ‘দা ভিঞ্চি কোড’ প্রকাশিত হবার পর Stark Electric Jesus একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে । সেটা তুমি গুগল সার্চ করলে নেটে দেখতে পাবে । খ্রিষ্টধর্মীদের মাঝে কবিতাটা অন্য ব্যাখ্যা পাচ্ছে । যিশুকে তাঁরা এখন ‘স্টার্ক’ এবং ‘ইলেকট্রিক’ রূপে দেখছেন, এবং তা সেই সময়ে, যখন তিনি ক্রস নিয়ে প্যাশানে আক্রন্ত । একটি ব্যাখ্যায় কবির প্রেমিকা শুভাকে তুলনা করা হয়েছে মেরি ম্যাগডালেনের সঙ্গে ।
‘কৌরব’ পত্রিকার সম্পাদক আর্যনীল মুখোপাধ্যায়, যিনি আমেরিকায় থাকেন, লিখে জানিয়েছেন যে বহু ইংরেজি-ভাষী কবির কাছে তিনি এই কবিতাটার কথা শুনেছেন । আমার মনে হয় কবিতাটা নানা ভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য বলেই হাজার বছর পূর্তি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । তাছাড়া, কনটেমপোরারি অথর্স অটোবায়োগ্রাফি সিরিজ-এ প্রকাশিত আমার আত্মজীবনী স্নাতক ক্লাসে ‘অটো-এসে’ নামের সেশানে অনেক সময়ে পড়ানো হয় ।

ডক্টর দে: ‘জখম’ কবিতা যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন অনেকে বলেছিলেন রচনাটি গিন্সবার্গের ‘হাউল’ এবং ‘ক্যাডিশ’ এর অনুকরণে লেখা । তারপর আপনি, বিকাশ সরকার, আশেক তুহিন, শুভঙ্কর দাশ বই দুটি অনুবাদ করার পর যখন তাঁদের ভুল ভাঙল, তাঁরা বললেন, ‘জখম’ কবিতা ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘লিভস অব গ্রাস দ্বারা প্রভাবিত । ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকায় (জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৯৯) কেদার ভাদুড়ির সাক্ষাৎকার নেবার সময় আপনি বলেছিলেন যে ‘জখম’ কবিতার টোনাল স্ট্রাকচার গঠনের সময় মাথায় ছিল ফেনটন জনসনের ‘টায়ার্ড’, রিচাডফ রাইটের ‘বিটুইন দি ওয়ার্লড অ্যাণ্ড মি’ এবং ক্রস্টোফার স্মার্টের ‘জুবিলেট অ্যাগনো’ কবিতাগুলো । আপনাদের সময়ে কবিতার যে সংজ্ঞা ছিল তার সঙ্গে ‘জখম’ কিন্তু খাপ খায় না । আপনি কি বলবেন?

মলয়: ‘লিভস অব গ্রাস’, ‘টায়ার্ড’ ‘বিটুইন দি ওয়ার্লড অ্যাণ্ড মি’ আর ‘জুলিয়েট অ্যাগনো’-র গতিময়তা ‘জখম’ থেকে বর্জিত । দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের কাউবয়রা গিটার বাজিয়ে ‘লিভস অব গ্রাস’ গায় । ‘জখম’ তো বাংলা ব্যাণ্ডো গাইতে পারবে না, এমনই আপাত-অনুক্রমহীন ও নিঃছন্দ এর গঠন । বাংলা বাক্য, শ্বাসে ধরে রাখার সঙ্গে ইংরেজি বাক্য ধরে রাখার সময়-পার্থক্য আছে । তবে এটা ঠিক যে, কবিতার সংজ্ঞার আমি তোয়াক্কা করিনি ‘জখম’ লেখার সময় । যা ইচ্ছে, যেমন ভাবে ইচ্ছে, লিখে গেছি । কে কী বলবেন, এসব ভেবে হাংরি আন্দোলনের সময়ও লিখিনি, এখনও লিখি না । কবিতাটা নিজেই কবিতাকে সংজ্ঞাহীন করে দিয়েছে, এরকমও ভাবতে পারো ।

ডক্টর দে: তাহলে কি ধীমান চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, রঞ্জন মৈত্র, প্রণব পাল, অলোক বিশ্বাস, আর্যনীল মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ভাষা বদলের কবিতা, অতিচেতনার কবিতা, ভাষা ভাবনার কবিতা ইত্যাদি আপনাদের খুলে দেয়া সিংহদ্বার দ্বারা উপকৃত?

মলয়; দেশ-কাল-পাত্রের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে লেখালিখি । আমি বাণিজ্যিক বা সরকার-পোষ্য লেখালিখির কথা বলছি না । যাঁরা নিজস্ব ঢঙে লেখালিখি করতে চান, কারোর পরোয়া করেন না, তাঁদের জন্যে একটা খোলা হাওয়ার চত্বর গড়ে দিয়েছে হাংরি, শ্রুতি আর নিমসাহিত্য আন্দোলন । তুমি যাঁদের নাম বললে, তাঁরা আউটস্ট্যান্ডিং কাক করছেন । ওনাদের কবিতা পড়ে মনে হয়, পরের প্রজন্মের জন্যে আর কিছু বাকি রইল না ।

ডক্টর দে: হাংরি, অনেকে বলেন, বাংলা সাহিত্যের জলবিভাজক ঘটনা । কিন্তু হলদিয়ায় প্রতিবছর যে বিশ্ব কবিতা উৎসব হয়, তাতে আপনাকে এবং প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবো আচার্য, ত্রিদিব মিত্র, সুবিমল বসাক প্রমুখকে কখনও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি । কেন?

মলয়: আমরা কারোর প্রতি অনুগত নই বলে । আমাদের কখনও যেতে বলা হয়নি । অথচ কেউ প্রশ্ন তুললে কর্তাব্যক্তিরা বলেন যে, তাঁরা নাকি প্রতিবছর আমন্ত্রণ জানান । ওটা নন্দীগ্রাম-খ্যাত রাজনীতিক লক্ষ্মণ শেঠ মশায়ের মহোৎসব ল বহু কবির জামাকাপড়ে সেসব রক্ত আর অশ্রুজল লেগে আছে ।

ডক্টর দে: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্হ ‘শয়তানের মুখ’-ও একটি সময়-চিহ্ণকারী ঘটনা । হাংরি আন্দোলনের সময়ে–১৯৬৩ সালে– কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল । কৃত্তিবাসের ওয়েবসাইটে আপনার এবং এই কাব্যগ্রন্হের কোনো উল্লেখ নেই । আপনার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’ পখাশিত হয়েছিল কৃত্তিবাস থেকে । তাঁরও উল্লেখ নেই । পঞ্চাশবর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকেও আপনারা দুজন বর্জিত । একে কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মলয়: এটা হাংরি আন্দোলের সাফল্যের স্বীকৃতি । নয়তো দাদাকে তো বাদ দেবার কারণ ছিল না । দাদা তো কৃত্তিবাসের ফণীশ্বরনাথ রেণু সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন । পত্রিকার জন্যে দীপক মজুমদারের সঠ্গে দৌড়ঝাঁপ করতেন । চাইবাসা, দুমকা, ধানবাদ, ডালটনগঞ্জ, লাহেরিয়া সরাই, ভাগলপুর, মুজফফরপুর ইত্যাদি যেখানে-যেখানে দাদার পোস্টিং হয়েছে, শক্তি-সুনীল-সন্দীপন প্রমুখ সেখানে দল বেঁধে গিয়ে দিনের পর দিন থেকেছেন । এসটাবলিশমেন্টের হাজার চেষ্টা সত্বেও হাংরি আন্দোলন যদি ছেয়ে ফেলতে থাকে তো তার দায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ।
এসটাবলিশমেন্ট চিরকালই ইতিহাসকে বিকৃত করতে চায় । শক্তি চট্টোপাধ্যাব দাদার কুঁড়ে ঘরে বছর দু-তিন ছিলেন । উনি দাদার এক শ্যালিকার প্রেমে পড়েছিলেন । সম্প্রতি মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় আর সমীর সেনগুপ্ত চাইবাসা গিয়ে শক্তি সম্পর্কে শুটিং করে এসেছেন । আমাদের সম্পর্কে ভীতি কেন এবং কোন স্তরে কাজ করছে ভেবে দ্যাখো ।

ডক্টর দে: সাহিত্যে প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করলে চিরকালই পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করার কথা অনুমান করা হয় । অনেকে মনে করেন যে হাংরি আন্দোলন, যা ষাট দশকের আন্দোলন, তা ্রভাবিত করেছে পঞ্চাসের দশকের বেশ কয়েকজন কবিকে । আপনিও কি তাই মনে করেন?

মলয়: হ্যাঁ । ১৯৬১ সালের আগে লেখা ওনাদের কবিতা পড়ে দ্যাখো আর পরের কবিতা পড়ে দ্যাখো । পুরোপুরি বদলে গেছে । কবিতায় গুরুচণ্ডালী নিয়ে এলুম আমরা, ছন্দপতন নিয়ে এলুম আমরা, অথচ দাবি করছেন ওনারা । কলকাতা-পাটনা=বেনারস-কাঠমাণ্ডু ইত্যাদি শহরে রাত্রীকালীন হ্যাপেনিং শুরু করলুম আমরা, অথচ সেসব ঘটনা ওনারা নিজেদের লেখালিখিতে ঢুকিয়ে নিলেন । তোমার তো বয়স কম; পরে বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে দেখো, বিশ্লেষণ কোরো । হাংরি আন্দোলন গিন্সবার্গকেও প্রভাবিত করেছিল, সে থত্য তুমি নেট সার্ফ করলেই পাবে ।

ডক্টর দে: রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শক্তি প্রমুখের কবিতায় প্রেমাস্পদকে গবেষকরা চিহ্ণিত করে ফেলেছেন । আমরা জেনেছি তাঁরা সব বাস্তব । কবিরা তাঁদের পাননি । আপনার কবিতায় নারীরা কি বাস্তব? না কি কাল্পনিক?

মলয়: বাস্তব । তবে, আমার প্রেমের কবিতা সেই অর্থে প্রেমের কবিতা নয়, যে অর্থে ওই তিন কবির । আমি ্রেমের মধ্যে থাকাকালীন নিজের মনঃস্হিতিতে নেশাগ্রস্ত থেকেছি । সে-কারণে একজন নারী তিন-চার বছরেই আকর্ষণ হারিয়েছেন । বা বলা যায়, প্রেমের মনঃস্হিতি ক্রমশ উবে গেছে । এটা কলেজে ঢোকার পর থেকে ঘটতে থেকেছে । অনেকে একে অনৈতিক বলবেন, স্বার্থপরতা বলবেন । ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর’ পর্যন্ত আমি আবিরাম প্রেমের মনঃস্হিতিতে থাকতে চেয়েছি । উপন্যাসগুলোয় বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে এই মনঃস্হিতিকে ধরবার চেষ্টা করেছি । ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর’ -এর নারী আমার চায়ে কুড়ি বছরের ছোট ছিলেন । প্রায়ই আত্মহত্যার হুমকি দিতেন । শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করেন, অথচ তখন তাঁর বিয়ে বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেছে ।

ডক্টর দে: আপনি কখনও আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন?

মলয়; হ্যাঁ । ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল আশানুরুপ না হওয়ায় । পটাশিয়াম ফেরিসায়েনাইড খেয়ে, যে কেমিকাল তখনকার দিনে বাবার ফোটোগ্রাফি ব্যবসায় প্রয়োজন হত । পিসেমশায় ধরে ফেলেছিলেন । ওরই বড়ছেলে সেন্টুদা, মানে অজয় হালদার, যাঁর কথা তুমি একবার জানতে চেয়েছিলে । শক্তিদাকে উনিই মদ খেয়ে বেহেড হবার পথে নিয়ে যান । ওই বেহেড হবার কারণেই মারা যান শক্তিদা । আমাকে পিসেমশায় আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে আত্মহত্যা করে মারা যান । ‘অপ্রকাশিত ছোটগল্প’ বইতে ‘তিনকড়ি হালদার’ নামে গদ্যটা ওনাকে কিয়ে লেখা ।

ডক্টর দে: আপনার প্রবন্ধগুলো নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশের কথা ভেবে দেখেছেন?

মলয়: কেউ বের করতে চাইলে বেরোবে । আমার তো কোনো রচনার কপিরাইট নেই। কিছু প্রবন্ধ ফাইলবন্দি হয়ে আছে কবিতীর্থ প্রকাশনীর উৎপল ভট্টাচার্যের কাছে আর কিছু প্রবন্ধ আরেকটা ফাইলে আবিষ্কার প্রকাশনীর মুর্শিদ এ এম-এর কাছে, যিনি প্রচুর পরিশ্রম ও বহু টাকা খরচ করে আমার কবিতাসমগ্র ১৯৬১-২০০৪ বের করেছেন ।

(ঋণস্বীকার: সম্পাদক, স্বপ্ন পত্রিকা,নবীনচন্দ্র কলেজ, ডাক: বদরপুর, অসম ৭৮৮৮০৬ । মোবাইল নং ০৯৮৬৪৯০৮৭৯৯)

[মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ২০০৪-১৯৬১ বইটির প্রকাশক: আবিষ্কার প্রকাশনী, ১২এ বাঁশদ্রোণীঘাট রোড
কলকাতা ৭০০০৭০, ফোন: ০৩৩-২৪১০-৫১৩২, মোবাইল: ০৯৮৩০৩৩১০৯২, দাম: ভারতীয় ১৫০টাকা]
[মলয় রায়চৌধুরীর ছোটোলোকের ছোটোবেলা বইটির প্রকাশক: চর্চাপদ পাবলিকেশন, ১৩বি রাধানাথ মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০০১২, ফোন: ০৩৩-২২৫৭-৩১৪৪, মোবাইল: ০৯৮৩০৩৭৯৮৪২. দাম ভারতীয়: ১৫০টাকা]
[মলয় রায়চৌধুরীর তিনটি উপন্যাস বইটির প্রকাশক: তেহাই প্রকাশনী, এবি ২৯ অটল আবাস, দেশবন্ধুনগর, বাগুইআটি, কলকাতা ৭০০০৫৯, মোবাইল: ০৯৮৩১৫৭৯৮৮২ এবং ০৯০৫১৩৬৮৯০৬. দাম ভারতীয় ২৫০ টাকা]

 
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ

শুনেছি তাঁর মেজাজ মর্জি রাজকীয় । শুনেছি তাঁর প্রতিটি বাক্য কোটেবল । শুনেছি তাঁর কথার ধারে কেটে যায় আপাত নিরীহ জিজ্ঞাসা । দেখলাম তিনি স্ট্রেট ব্যাটে খেলেন । দেখলাম তিনি লোপ্পা ক্যাচ দেন না । দেখলাম তিনি আন্তরিক ডাকে সাড়া দেন স্নেহশীল বর্মের আড়াল থেকেই । দেখলাম তিনি ব্রাত্যজনেরও সখা । তিনি জীবন্ত কিংবদন্তী মলয় রায়চৌধুরী । পড়ুন তাঁর আনএডিটেড সাক্ষাৎকার এবারের শব্দের মিছিল এর ‘একমুঠো প্রলাপ’ এ । শব্দের মিছিল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনায় এক গবলেট চিয়ার্স । 

 
রাষ্ট্রের সাথে আপনার সম্পর্ক তো প্লেটোর তত্ত্বকেই প্রামাণ্য দেয় । কিন্তু প্লেটো যেটা জানতেন না তা হল মলয় রায়চৌধুরী রা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন । আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ব্যাপারটা ? 

না, না । ভুল ধারণা । নিৎশে বলেছেন যে প্ল্যাটোর দর্শনের কারণেই খ্রিস্টধর্ম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল । প্ল্যাটোর শিক্ষক ছিলেন সক্রেটিস এবং ছাত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল । সেইন্ট অ্যাকুইনাস খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য প্ল্যাটোর দর্শনের আশ্রয় নিয়ে ছিলেন । প্ল্যাটোই প্রথম প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনা করেছিলেন অ্যাকাডেমি স্হাপনের মাধ্যমে, যা রোমানদের সময় পর্যন্ত বজায় ছিল । আর এসট্যাবলিশমেন্ট বলতে বোঝায় ক্ষমতার কেন্দ্র । প্ল্যাটো তাঁর দর্শনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন ; আমি কোনও ক্ষমতার কেন্দ্র নই । পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতার কেন্দ্রে কারা । রাজনৈতিক দলগুলো, বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, রামকৃষ্ণ মঠ, বাংলা অ্যাকাডেমি ইত্যাদি । আমি এই সমস্ত ব্যাপারে আউটসাইডার।

 
বিতর্ক কখনোই আপনার পিছু ছাড়ে নি । আপনি কেমন এনজয় করেন এটা ? বিতর্ক কি কিছুটা সচেতন ভাবে আপনার নিজেরই তৈরি না কি এটাকে ভবিতব্য হিসেবে দেখেন ?

বিতর্ক এনজয় করি ঠিকই, কিন্তু বিতর্ক আমার তৈরি করা নয় । আমার বিরোধিদের সংখ্যা প্রচুর, তারাই বিতর্ক বজায় রাখে । সম্ভবত আমি যে ধরণের লেখালিখি করি আমার রচনাবলী বিতর্কিত হতে বাধ্য । আমি মূলত সমাজের পর্যবেক্ষক এবং নিজের মতামত উপস্হাপন করি । তাছাড়া হাংরি আন্দোলনের মামলা, তাতে শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষের রাজসাক্ষী হওয়া, এবং সেই সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হওয়াটাও বিতর্কের কারণ ।

 
জাদুবাস্তবতা বাংলা সাহিত্যে নতুন নয় । কিন্তু এটার সার্থক আধুনিকীকরণ করলেন আপনি । এই ঝোঁকটা কিভাবে কেন এল আপনার মধ্যে বলবেন ?
 

আমি লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভ টেকনিক নেবার বদলে ঠাকুমার ঝুলি আর বেতাল পঞ্চবিংশতির ল্যাবিরিন্হকে অনুসরণ করার প্রয়াস করেছি । শৈশবে বড়ো জেঠাইমা আমাদের গল্প বলতেন অভিনয় করে, লন্ঠনের আলোয়, তার প্রভাব রয়ে গেছে স্মৃতিতে । আমি রাক্ষস-খোক্কোস ইত্যাদিদের এখনকার মানুষ হিসাবে উপস্হাপন করতে চেষ্টা করেছি ; জীবজন্তুদেরও মানুষের চরিত্র দিয়েছি । বস্তুত আমি সচেতনভাবে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা এড়িয়ে গেছি ।

 
মলয় রায়চৌধুরী কথা বলছেন , কিন্তু অ্যালেন গিন্সবার্গের সাথে বন্ধুত্বের প্রসঙ্গ উঠবে না তা হয় না । ‘হাউল’ লিখে ওনার যে পরিণতি হয়েছিল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ এর জন্য আপনারও তাই । আপনি সেকুলার আর উনি পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন । উনি রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে গেলেন অনেকটাই । আপনি ? কি চোখে দেখেন রাজনীতিকে ?
 
গিন্সবার্গ বলতো যে ঈশ্বর নামের কোনো সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি হতে পারে না । উনি তাই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন, হিন্দুধর্মের সমস্যা ছিল যে তাতে জাতপাতের সমস্যা, যখন কিনা ভারতে এসে হিন্দু গুরু আর গডম্যানদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করেছিলেন উনি । আমি নিজেকে ইন্সটিংকটিভ হিন্দু বলি, কিন্তু অরগ্যানাইজড হিন্দুধর্মের প্রতি আমি সমর্পিত নই, তার কারণ আমি সারা জীবন ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছি, এক জায়গায় থাকিনি, ফলে ধর্মের শেকড় গজিয়ে ওঠেনি । আমি যে সেকুলার সেটাও ইন্সটিংকটিভ, কোনো বই পড়ে বা চিন্তাভাবনা করে নয় । রাজনীতি, ভারতবর্ষে, আমেরিকার সঙ্গে তুলনীয় নয় । আমি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ইনভলভড নই, কিন্তু আমার প্রবন্ধগুলো, গল্পগুলো, এমনকি কবিতাও, আমার রাজনৈতিক মতামত বহন করে ।
 
আপনার কবিতা বা হাংরি আন্দোলন নিয়ে জানার গবেষণাধর্মী বই যেমন আছে বাজারে তেমনি আছে হাংরি শিবিরের বিভাজনের মুচমুচে পেজ থ্রি টাইপ স্টোরি । এই বিভাজন কি শুধুই মতাদর্শগত নাকি খানিকটা ইগোর লড়াইও ? অ্যাকাডেমিক ভিউ পয়েন্টের বাইরের চোখ দিয়ে দেখে যদি বলেন …
 

একটু আগে যেমন বলেছি, মামলার সময়ে বন্ধুরা রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছিল, এবং সেই গ্লানি থেকে তারা মুক্ত হতে পারেনি । তারাই বিভাজনটা গড়ে তুলেছিল । আমি তো মাঝে লেখালিখি করতে পারিনি নানা কারণে । কলকাতায় এসে শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপ, সন্দীপন, শক্তি, উৎপল সকলের সঙ্গে দেখা করেছিলুম । কিন্তু বুঝতে পারলুম ওনারা আত্মগ্লানির বিষ ঝেড়ে ফেলতে পারেননি, বরং আমার বিরুদ্ধে ফলাও করে কুৎসিত কথাবার্তা অবিরাম লিখে গেছেন । এটা ইগোর লড়াই নয় । এটা আত্মসন্মানবোধের ব্যাপার । মতাদর্শগত বিভাজনের তো প্রশ্ন ওঠে না কেননা সব কয়টা ইশতাহার আমিই লিখেছিলুম । তবে শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব — ওরা সবাই সিপিএম গদিতে বসতেই সিপিএমে যোগ দিয়েছিল, তাদের মিছিলে ইনক্লাব জিন্দবাদ করে বেড়াতো । এই জিনিসটা আমি মেনে নিতে পারিনি । এ কেমন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ? সিপিএম তো ছিল ভয়ংকর এক অত্যাচারী প্রতিষ্ঠান !

 
জন্ম পটনায় । কর্ম মুম্বাইতেই বেশিটা । এদিকে কোলকাতা কানেকশান একদম শহরের ইতিবৃত্তের সাথে জড়িত । আবার এই কোলকাতাই আপনার জীবনের সাময়িক বিড়ম্বনার কারণ । আপনি কি নিজভূমে পরবাসী রয়ে গেলেন তবে ?
 

না, মুম্বাইতে কর্ম বেশি বলা উচিত হবে না । চাকুরিসূত্রে আমি পাটনা, লখনউ আর কলকাতাতেও অনেকটা সময় কাটিয়েছি । বুড়ো বয়সে মুম্বাই চলে এসেছি প্রধানত চিকিৎসার সুবিধার জন্য । আমার ও আমার স্ত্রীর দুজনেরই নানা রকমের রোগ । অফিসের ডিসপেনসারিও আমাদের বিল্ডিঙের পাশে । কলকাতায় নাকতলা থেকে ট্যাক্সি করে প্রতিবার যেতে হতো পার্ক স্ট্রিট আর প্রচুর টাকা খরচ হতো । কেবল পেনশনে চালানো বেশ কঠিন । কলকাতায় যখন বিভাগীয় প্রধান ছিলুম, আমি স্ত্রীকেও সঙ্গে ট্যুরে নিয়ে যেতুম পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের জীবনের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য । সিপিএমের ক্যাডারদের ভয়ে অনেকে প্রকৃত তথ্য দিতে ভয় পেতো তাই হিন্দি-উর্দু প্রয়োগ করে, অবাঙালি সেজে তথ্য আদায় করতুম । স্ত্রীকে বলতুম চাষি-তাঁতি-জেলেদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে তথ্য যোগাড় করতে । আমার “নামগন্ধ” উপন্যাসের ও “নখদন্ত” ফিকশানের তথ্য এই ভাবেই সংগ্রহ করা । আমি সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্য ঠিকই কিন্তু আমার প্রজন্মে পৌঁছে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল, আমার শৈশবস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে টের পাবে ।

 
হাংরি স্টাইল কি আপনার সাথেই শেষ হয়ে যাবে না কি আছেন কেউ সার্থক ধারক বাহক ? আপনার মুখ থেকেই শুনতে চাই ।
 

বহু তরুন নিজেদের হাংরি আর নিও হাংরি ঘোষণা করে লেখালিখি করছেন । ফেসবুকে কয়েকটা কমিউনিটি পেজও আছে তাঁদের । দেখেছি তাঁদের লাইক সংখ্যা তিনহাজার-চারহাজারে পৌঁছে গেছে । আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নেই । তাঁরা নিজেদের মতো করে যা ইচ্ছা লিখে চলেছেন । জানি না তাঁদের ধারক-বাহক বলা যায় কিনা কেননা আমি পড়ার তেমন সময় পাই না । তবে সামগ্রিকভাবে যে হাংরি আন্দোলনের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে ছায়া ফেলেছে তা অস্বীকার করা উচিত হবে না ।

 
আপনার অনুবাদকর্ম তো প্রচুর । আর সেটা অদ্ভুত একটা কম্বিনেশান । কখনো উইলিয়াম ব্লেকের মত রোম্যান্টিক মুভমেন্টের কবিকে বেছেছেন তো কখনো আঁরত্যুর র্যারবো , আঁন্দ্রে ব্রেটন বা ত্রিস্তান জ্যারা । সবাই এক একটা লিটেরারি মুভমেন্টের জনক বলা যেতে পারে । এই বাছাই কি নেহাতই কাকতালীয় নাকি কোন সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনার ফসল ? 
 
যাঁদের মনে হয়েছে আমার চিন্তাজগতের নিকটবর্তী, আমি তাঁদের অনুবাদ করেছি । কাকতালীয় নয় । আমি র্যাঁমবোর “নরকে এক ঋতু”ও অনুবাদ করে একটি পত্রিকা সম্পাদককে পাঠিয়েছিলুম, কিন্তু তিনি তাঁর কলেজ স্ট্রিটের দপতর বিক্রির সময়ে দপতরে একত্রিত যাবতীয় পাণ্ডুলিপিও ক্রেতাকে হস্তান্তর করে দিয়েছিলেন ; আমি কপি রাখিনি । এই দুঃখটা রয়ে গেল ।
 
 ‘সূরজ কা সাতোয়াঁ ঘোড়া’ অনুবাদের জন্য আপনাকে ‘সাহিত্য অ্যাকাদেমী’ দিতে চাওয়া হয়েছিল , আপনি নিলেন না । আপনার মৌলিক কোন লেখার জন্য যদি আজ আবার প্রস্তাব আসে , নেবেন ?

আমি কোনো পুরস্কার নিই না । পুরস্কার মানেই দাতার মূল্যবোধ তার সঙ্গে জড়িয়ে । ঈশ্বর ত্রিপাঠী আমার বাড়িতে এসে অনুষ্ঠান করে পুরস্কৃত করতে চেয়েছিলেন, আমি রাজি হইনি । আরও কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন আমাকে সম্বর্ধিত করতে চেয়েছিলেন আমি রাজি হইনি । সেই দিক থেকে মুম্বাইতে এসে বেঁচে গেছি ।

 

‘ বাইশে শ্রাবণ’ এ গৌতম ঘোষ কতটা পেরেছেন আপনার ম্যনারিজম ফুটিয়ে তুলতে ? রোলটা কি আপনি নিজেই করতে চান কখনো ? কোন পরিবর্তন হবে তাহলে স্ক্রিপ্টে ?

 

ওটা একটা মোস্ট ইডিয়টিক রিপ্রেজেন্টেশান । গৌতম ঘোষের সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল, শান্তিনিকেতন যাবার ট্রেনে । জানি না উনি কোন হাংরি কবির ম্যানারিজম ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন । আমাদের উত্তরপাড়ার আদিবাড়ি ওই রকম খণ্ডহর হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু আমরা কেউই লেখা ছাপাবার জন্য হাপিত্যেশ করতুম না । নিজেরাই ছাপাতুম আর বিলি করতুম, কোনো লিটল ম্যাগাজিনকে অনুরোধ করতে হয়নি কখনও লেখা ছাপাবার জন্য । কেউ যদি ফিল্ম করতে চায় তাহলে একেবারে প্রথম থেকে হাংরি আন্দোলনকে নিয়ে ফিল্ম করতে হবে । কোনো ফিল্মে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাংরি আন্দোলনকে ঢুকিয়ে দেয়াটা ইডিয়টিক । বিট আন্দোলন নিয়ে, অ্যালেন গিন্সবার্গকে নিয়ে, র্যাঁ বোকে নিয়ে ফিল্ম হয়েছে, কিন্তু কোনোটাই বাইশে শ্রাবণের মতন ইডিয়টিক ফিল্ম নয় ।

 
 
 
 
 

 
   
 
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোলাম রাব্বানী

দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস: মলয় রায়চৌধুরী

তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। ‘প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি ।

গোলাম রাব্বানী
ফিচার এডিটর
০৫ অক্টোবর ২০১৫, সময় – ১২:৫৩

ছবি সংগৃহীত

ছবি: সংগ্রহ

(প্রিয়.কম) মলয় রায়চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি.দে মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন বিষয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের জন্য পিএচ.ডি. সন্মান দ্বারা ভূষিত হয়েছেন । ২০১৩ সালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক রিমা ভট্টাচার্য । ১৯৯৭ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক উদয়নারায়ণ বর্মা । আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে মলয় রায়চৌধুরী এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ‘প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। শয়তানের মুখ, জখম, ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস,নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র,কৌণপের লুচিমাংস অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি । কলকাতার এই কবি তার কবিতা, হাংরি আন্দোলন, বর্তমান ব্যস্ততা এবং দুই বাংলার সাহিত্য বিষয়ে কথা বলেছেন প্রিয়.কমের ফিচার সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে…

প্রিয় : কেমন আছেন ?
মলয় : শরীরের দিক থেকে বলতে গেলে বলব, ভালো নেই । দুবার হার্ট অ্যাটাক, তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি, একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি, তা সত্ত্বেও আবার হার্ট অ্যাটাক, হাঁপানি, আঙুলের আরথ্রাইটিস, আচমকা অজ্ঞান হবার রোগ সিনকোপি, প্রস্টেট, হার্নিয়া, ডান হাঁটুতে বাত, দুই পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইনস ইত্যাদি । তবে মনের দিক থেকে খুবই ভালো আছি ; প্রচুর ভাবনা মগজে এসে জড়ো হয়, তরুণরা লেখা চান কিন্তু আঙুলের আথ্রাইটিসের কারণে এক আঙুলে কম্পিউটারে যতোটুকু পারি লিখি । চারটে কাব্যনাট্য আর পাঁচটা উপন্যাস তো এক আঙুলেই কম্পিউটারে লিখেছি । তবে প্রবন্ধ আর বিশেষ লিখতে পারি না , মানে ভালো লাগে না লিখতে, প্রকাশকও পাওয়া যায় না।
প্রিয় : এখন সময় কাটান কি করে ? লেখালিখিই তো করছেন নিয়মিত ?
মলয়: ঘুম থেকে উঠে গ্রিন-টি খেয়ে, সামনের চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে রকিং চেয়ারে বসে চিন্তা করতে ভালো লাগে আমার; পরে সেগুলো কবিতা বা উপন্যাসে চালান করি। ক্রেয়ন আর কালার পেনসিল কিনেছি, মাঝেমধ্যে যা ইচ্ছে হয় ডুডলিং করি, আরথ্রাইটিস সত্ত্বেও । ওটস খাবার পর দুপুর বেলায় দশটা থেকে একটা পর্যন্ত কম্পিউটারে লিখি, রিভাইজ করি । দুপুরে খেয়ে-দেয়ে ঘুমোই । সন্ধ্যায় ফেসবুকের  তরুণী পাঠিকা আর আঁকিয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করি, তাঁরাই, সৌভাগ্যবশত, সংখ্যায় বেশি। কোনো-কোনো দিন বিদেশে বসবাসকারী নাতনিদের সঙ্গে স্কাইপে গল্প করি । সাড়ে-আটটা নাগাদ আবার চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে খাওয়া এবং চিন্তা । মদ আর বিশেষ খাই না, কেননা আমি সিঙ্গল মল্ট ছাড়া খাই না, ছেলে বা মেয়ে বিদেশ থেকে আনলে খাই । দশটা বাজলে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় ; ঘুমের ট্যাবলেটে শৈশবের স্বপ্ন বেশি করে আসে। চাকর-চাকরানি রাখা আমার পছন্দ নয়, তাই আমি আর স্ত্রী ভাগাভাগি করে চালিয়ে দিচ্ছি।
প্রিয় : আপনি তো এখন দিল্লিতে থাকেন ?
মলয় : না, আমি ২০০৯ সাল থেকে মুম্বাইয়ের শহরতলি কানডিভালিতে গুজরাটি পাড়ায় একরুমের ফ্ল্যাটে স্ত্রীর সঙ্গে থাকি, প্রধানত চিকিৎসার সুবিধার জন্য। কোনো বাংলা সংবাদপত্র বা পত্রিকা পাওয়া যায় না এ-পাড়ায়। নাকতলার ফ্ল্যাট বিক্রির পর যতো বইপত্র কলকাতায় ছিল সব বিলি করে দিয়েছিলুম ; এখন আর বইপত্র সংগ্রহ করি না, পড়া হয়ে গেলে বিলিয়ে দিই, মানে আমার কোনো ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার নেই । তাই একরুমের ফ্ল্যাটে অসুবিধা হয় না । বইয়ের ধুলোর কারণে হাঁপানি বেড়ে যায় ।
প্রিয় : আপনাদের হাংরি আন্দোলনের যাঁরা এখনও জীবিত, তাঁদের সঙ্গে কি নিয়মিত যোগাযোগ হয় ?

মলয় : হ্যাঁ, কলকাতা নিবাসী সুবিমল বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, রবীন্দ্র গুহ, সুবো আচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ আছে । ত্রিপুরার রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফা, রত্নময় দে, অরূপ দত্তের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে । সকলেই তো প্রায় মারা গেছেন ; উৎপলকুমার বসুও এই সেদিন মারা গেলেন । হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সকলের গদ্যপদ্য নিয়ে একটা সংকলন বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি, কাউকে বাদ দেয়া হবে না । দেখি প্রকাশক পাওয়া যায় কিনা ; সমস্যা হল হাংরি আন্দোলন শুনলে চুনোপুঁটিরাও সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করে দ্যায়
প্রিয় : ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আপনি, এবং ৩৫ মাস ব্যাপী কোর্ট কেস চলে। কলকাতার নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণা হলেও ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে অভিযোগ মুক্ত হন । এত কিছু হয়ে গেল একটি কবিতার জন্য । আমি এই কবিতার জন্মকথা জানতে চাই । কখন, কীভাবে, মাথায় আসে আইডিয়াটা ?
মলয় : হ্যাঁ, এই কবিতাটির জন্য আমাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে সাতজন ডাকাত আর খুনির সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ কেবল অশ্লীলতার ( ধারা ২৯২ ) ছিল না, সাবভার্সানেরও ( ধারা ১২০বি ) ছিল । প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সেরকমটাই নির্দেশ ছিল আমাকে হিউমিলিয়েট করার । কবিতাটিতে আমার নিরীক্ষার আগ্রহে যে ব্যাপারগুলো এই পাঠকৃতি তৈরি করার সময়ে ছিল, তার মধ্যে প্রধান দুটি হল দীর্ঘ কবিতার কাঠামোয় স্পিড বা দ্রুতি আনা, এবং তাকে চিৎকার-নির্ভর করা । এই দুটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা কবিতায় তার আগে, বোধহয় পরেও, বিশেষ কাজ হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল পাঠবস্তুকে ইলেকট্রিফাইং করে তোলা, এবং পাঠককে দ্রুতির তুমূল বৈদ্যুতিক প্রবাহে আটক রাখা, যা থেকে সে ছাড়াবার চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না । ‘ছুতার’ দ্যোতকটি শিল্পবিরোধিতার জন্য ব্যবহৃত। কবিতাটিতে চিৎকারের খেলা বজায় রাখার জন্য অভিব্যক্তিকে শ্বাসপংক্তিতে সংকুচিত ও প্রসারিত করেছিলুম । শেষ তিনটি পংক্তিতে ধাতস্হ করেছি শ্বাসকে, আর স্তিমিত করেছি চিৎকারকে। অর্থাৎ অভিব্যক্তির বিনির্মাণ, কবিতায় বুর্জোয়া অহংবোধের সমাপ্তি, এবং লিখিত শব্দকে ছাপিয়ে যাবার প্রয়াস, হাংরি আন্দোলনের সময়ে যে নিরীক্ষাগুলো করতুম, তা এই কবিতায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলুম। তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত গড়ে-ওঠা পাতি-বুর্জোয়া চেতনার মডেলটি আমি বদলে ফেলতে চেয়েছিলুম আমূল । বাংলা কবিতাকে যে সেন্টিমেন্টাল নার্সিসিজম পেয়ে বসেছিল তখন, তাকে জলাঞ্জলি দিতে চেয়েছিলুম । কবিতার ঐতিহাসিকতাকে এভাবে বিপর্যস্ত করা মনে হয়েছিল শ্রেয় । প্রেম এই কবিতার স্ট্র্যাটেজি, কেন্দ্র নয়, বস্তুত কবিতাটির কোনো কেন্দ্র নেই । না আছে স্বীকৃত আঙ্গিক বা বিষয় বা থিম বা বক্তব্য বা ছন্দ বা প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক । মেইনস্ট্রিম বাংলা কবিতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর প্রান্তিক অবস্হান নির্ধারিত করতে চেয়েছিলুম আমার শৈশবে পাওয়া ইমলিতলা পাড়ার মাগধি ও ভোজপুরি ইথসের সাহায্যে । তখনকার সাহিত্যিকরা এই অ-বাঙালি ইথসকে বরদাস্ত করতে পারেননি । তাঁরা তখন হয় ইউরোপ বা সোভিয়েত দেশের দাপটে পীড়িত ছিলেন । কবিতাটিতে এভাবে ঔপনিবেশিক ও উত্তরঔপনিবেশিক সংঘাতক্ষেত্রটিকে গড়তে চেয়েছিলুম — মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির সংঘাত । প্রতিষ্ঠিত বাইনারি-বৈপরীত্যগুলোকে, ছয়ের দশকের পূর্বেকার বাংলা কবিতা যা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকত, অর্থাৎ ভালো/খারাপ, প্রেম/ঘৃণা, সু/কু, শ্লীল/অশ্লীল, পুরুষ/প্রকৃতি, মিতকথন/অতিকথন, শরীর/মন, শুরু/শেষ, আমি/তুমি, সুন্দর/কুৎসিত ইত্যাদি, সেই দেয়ালকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলুম । ভণ্ডুল করার জন্য প্রয়োগ করেছিলুম যৌনতা আর অন্তর্ভাবাত্মক স্বরধ্বনি । সেসময়ে কবিতায় এভাবে সঘোষ অব্যয় প্রয়োগ অকল্পনীয় ছিল, অস্বাভাবিক ছিল । কবিতাকে শাসন করার বিদ্যায়তনিক অনুশাসনকে ছত্রভঙ্গ করেছি প্রসৃত অব্যয় প্রয়োগে, এবং বিদ্যায়তনিক মানদণ্ডকে বেদখল করে দেবার চেষ্টা করেছি ঐক্য, রৈখিকতা, আদল, আদরা আর আনুমানিক মর্মার্থের মূল্যবোধসমূহের মসনদ থেকে । আবেগ যেহেতু একটি ট্র্যান্সগ্রেসিভ উপাদান, তাকে বারংবার, হাপরের মতন, ব্যবহার করেছিলুম লেখাটাতে । আমার কাছে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ছিল একটি অফুরন্ত আহ্লাদের বহুমাত্রিক প্রোজেক্ট । আর, আমার কবিতার কোনো কন্সটিটুয়েন্সি তখন আদপেই ছিল না । বাকধারা নিয়ে খেলবার অফুরন্ত এলাকা ছিল । খেলেওছি । তা টের পাওয়া যাবে রচনাটির নিজস্ব স্পিড বা দ্রুতি থেকে । কবির দ্রোহ নয়, কবিতার দ্রোহ ব্যক্ত করতে চেয়েছে পাঠবস্তুটি ।
‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এ “আমি” ব্যাপারটিকে অজস্র জিজ্ঞাসা দ্বারা বিগঠিত করতে চেয়েছিলুম । রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত কবিতায়, “আমি” ছিল স্বয়ংসিদ্ধ, সবজান্তা, প্রমাণিত সত্য । তাই “আমি” প্রতিপাদি জ্ঞানকে মনে করা হতো অকাট্য । অথচ অকাট্য ও বিশুদ্ধ জ্ঞান বলে তো কিছুই নেই । আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার ডিসকোর্সকে একযোগে নান্দনিক সন্ত্রাস ও ভাষার সন্ত্রাস হিসেবে রূপায়িত করতে চেয়েছিলুম । কবিতাটিতে “আমি” প্রান্তিক ও সাবভারসিভ, এবং সেকারণে রাজনৈতিক । ১৯৬৩ সালে কবিতাটা লিখতে আমার তিন মাসের মতন লেগেছিল, প্রচুর রিভাইজ করেছিলুম । পাণ্ডুলিপি আর ফেরত পাওয়া যায়নি লালবাজার থেকে ।
প্রিয়: শিল্পে কোনটা শ্লীল মনে হয় আপনার কাছে আর কোনটাকে অশ্লীল বলবেন ?
মলয় : শ্লীল আর অশ্লীল এই যুগ্মবৈপরীত্য বা বাইনারি অপোজিটের মাপকাঠি এনেছিল ইভানজেলিস্ট খ্রিস্টানরা । তার আগে মাপকাঠি ছিল আমাদের রসশাস্ত্র ; তাতে কোথাও শ্লীল-অশ্লীলের বিভাজনের কথা নেই । বস্তুত আদিরসই তো যৌনতা, অথচ শ্রীরামপুরের পাদরিরা তাকে নাকচ করে দিয়ে জেমস লং আর ম্যাকলের মাধ্যমে ভিকটোরীয় মূল্যবোধ চাপিয়ে দিল । ইসলামি শাসকরাও এই বিভাজন চাপায়নি । যুগ্মবৈপরীত্যের মানদণ্ড থাকলে বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস, খাজুরাহো, কোণারক, পুরীর মন্দিরের কাজ, অজন্তা-ইলোরা, মীনাক্ষী মন্দির হতো না । মনসামঙ্গল, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বাৎসায়নের কামসূত্র লেখা হতো না ; এখানে বলে রাখি, কামসূত্রে বলা আছে স্বমেহন কী ভাবে করা উচিত। বর্তমান ভারতে টিকিয়াল আর দাড়িয়াল প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটিগুলো আবার নতুন করে ভিকটোরীয় মানদণ্ড চাপিয়ে দিচ্ছে ; এ থেকে বেরোনো কঠিন। সংস্কৃত সাহিত্যের বাহাত্তরটা অলঙ্কারগুলো ছিল পুরুষের অলঙ্কার ; কবিতাকে নারী বানিয়ে ফেলার পর সংস্কৃত অলঙ্কার সাহিত্য থেকে লোপাট হয়ে গেছে । মোগল সম্রাটরাও এদেশে এসে অলঙ্কার পরা আরম্ভ করেছিলেন। এখন সবই ইউরোপের দেয়া। শ্লীল/অশ্লীলের নির্ণায়ক এখন প্রতিষ্ঠানের টিকিয়াল আর দাড়িয়াল মৌলবাদীরা ।
প্রিয়: ঐ মামলায় আপনার পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিৎ দত্ত । আর বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । যারা আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁরা কি ঠিক ছিলেন ? তাঁদের মধ্যে আর পুলিশের মধ্যে তাহলে পার্থক্য কোথায় ? তাঁদের কি শিল্পী বলা যায় ?
মলয় : কি বলব বলো ? পবিত্র বল্লভকে আমি চিনতুমই না ; কুঁজো লোকটা ছিল পুলিশের ইনফরমার, কফিহাউস থেকে হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন লিফলেট পত্রপত্রিকা নিয়ে গিয়ে জমা দিত লালবাজারে । শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে বলা যায় পিঠে ছুরি মারা বিশ্বাসঘাতক । ওরা দুজনেও গ্রেপ্তার হয়েছিল ; মামলা থেকে রেহাই পাবার জন্য আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে দিলে, আমাকে যখন চার্জশিট দেয়া হল তখন ওদের ঘৃণ্য রূপ বেরিয়ে এলো । ওরা দুজনে  মিলে সারাজীবন আমার বিরুদ্ধে অবিরাম লিখে-লিখে নিজেদের গিল্টি-ফিলিং থেকে ছাড়া পাবার চেষ্টা করে গেছে । ওদের এই দুষ্কর্মে ইন্ধন যোগাতেন শঙ্খ ঘোষ, আমার বিরুদ্ধে যে বই শৈলেশ্বর-সুভাষরা কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের থেকে বের করেছে তাও শঙ্খ ঘোষের দৌলতে ; তাতে শঙ্খ ঘোষকেও হাংরি বলে চালানো হয়েছে । এই প্রকাশকরা আমার বই বের করতে চায় না, শঙ্খ ঘোষের দাপটের কারণে । শক্তি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন কেননা ওনার ধারণা ছিল আমি আর দাদা ষড়যন্ত্র করে দাদার শালি শীলার সঙ্গে ওনার বিয়েটা হতে দিইনি । সন্দীপন আর উৎপল কেন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়েছিলেন তা আজও জানতে পারিনি । উৎপল তো বাংলাদেশে গিয়ে খাতিরযত্ন পেতেন,  ওনার ডিগবাজি খাবার কারণ জিগ্যেস করতে পারতে ।
প্রিয় : আপনার কি মনে হয়েছে মামলাটি হওয়ার ফলে ভালোই হয়েছে ? কারণ এতে হাংরি আন্দোলন আলোচিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী ?
মলয় : ওই পঁয়ত্রিশ মাস, যখন মামলাটা চলেছিল, তখন কলকাতায় আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না । চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হয়ে  টাকার টানাটানি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, কেসে প্রচুর টাকা দরকার হতো । অনেক সময়ে একবেলা খেয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে । সুবিমল বসাকের এক স্যাকরা জ্যাঠামশায় ছিলেন, তাঁর দোকানে রাতে শুতুম আর গোসল করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূর পাল্লার ট্রেনে । দিনের পর দিন স্নান হতো না, জামাকাপড় পালটানো হতো না । একবার কমলকুমার মজুমদার কিছু টাকা দিয়েছিলেন, সেই টাকায় জামা-প্যান্ট কিনে পুরোনোগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিলুম । সৌভাগ্যবশত হাইকোর্টের জন্য করুণাশঙ্কর রায় নামে একজন সাহিত্যানুরাগী ব্যারিস্টার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখনকার নামজাদা ক্রিমিনাল  অ্যাডভোকেট মৃগেন সেনের সঙ্গে, যাঁর তখনকার ফিসই ছিল দিনে এক লক্ষ টাকা । তিনি বলেছিলেন, যা পারো দিও । কেস জিতে যাবার পরে চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে যে থোক টাকা পেয়েছিলুম তা ওনাকে দিই । এই স্মৃতির পৃষ্ঠপটে কি করেই বা বলি মামলাটা হয়ে ভালো হয়েছে ? তবে হ্যাঁ, রাজসাক্ষীরা আলোকিত হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার আর টাকাকড়ি পেয়েছে, মনের মতন প্রকাশক পেয়েছে হাংরি আন্দোলন সেসময়ে ততো আলোচিত হয়নি ; এখন বিবিসির সাংবাদিক, স্কটল্যাণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র, আমেরিকার গবেষক, ইতালির গবেষক এসে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, হাংরি আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পর । পিএই্চ ডি আর এম ফিল করছেন ছাত্র-ছাত্রীরা, তাও বছর দশেক হল । মামলার আগেই আমাদের লেখাপত্র ইউরোপ-আমেরিকার এবং ভারতের হিন্দি-উর্দু-মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল, তার কারণ হিন্দির ফণিশ্বরনাথ রেণু আর রামধারী সিং দিনকর আমায় আর দাদাকে শৈশব থেকে চিনতেন ।
প্রিয় : আপনি কি মনে করেন আপনাদের হাংরি আন্দোলন সফল হয়েছিল ? সফল না হলে এটাকে কনটিনিউ করেননি কেন আপনারা ?
মলয় : কনটিনিউ তো হয়েছে । পাকিস্তানি আমলে সংবাদ সেরকমভাবে হয়তো ওই পারে পৌঁছোয়নি ; এখন বাংলাদেশ হবার পর হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সংবাদ পৌঁছোচ্ছে । জীবিতকালে সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত ‘ক্ষুধার্ত খবর’ আর ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করেছে । অরুণেশ ঘোষ প্রকাশ করেছে ‘জিরাফ’ পত্রিকা । অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেছে ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ । রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফারা এখনও ‘অনার্য সাহিত্য’ প্রকাশ করে চলেছে । প্রদীপ চৌধুরী প্রকাশ করে চলেছে ‘ফুঃ’ এবং ‘স্বকাল’ পত্রিকা । রত্নময় দে প্রকাশ করে চলেছে  ফোল্ডার পত্রিকা । ওনাদের পারস্পরিক সংযোগের অভাবের জন্য তেমন প্রচার করতে পারছেন না বা পারেননি, যেমনটা আমি, সুবিমল বসাক আর দেবী রায় করেছিলুম। যেমনটা ত্রিদিব মিত্র আর আলো মিত্র বুলেটিন বিলি আর পোস্টার মারার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল নিজেদের কাঁধে । তুমি বোধহয় দ্যাখোনি যে ফেসবুকে একদল তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স বিশের কোঠায়,  নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী নামে একটা কমিউনিটি পেজ চালায় । আমি যে-কজনের নাম জানতে পেরেছি তাঁরা হলেন সায়নী সিংহরায়, রাজদীপ দত্ত, রিফাত খান অনীক, সায়ন ঘোষ, অয়ন ঘোষ, অর্ঘ্য দাশগুপ্ত, সুপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, সান্যাল কবীর সিদ্দিকি প্রমুখ । এঁদের কারোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি এখনও । অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ দশক পরও কনটিনিউ করছে । সফলে যে হয়েছে তার প্রমাণ তো আমাদের পরে পত্রিকাগুলোর নামকরণ ; কেউই আর লিটল ম্যাগাজিনের লালটুশমার্কা নামকরণ করে না । দ্বিতীয়ত আমাদের লেখালিখির বৈশিষ্ট্য পরের প্রজন্মগুলো আত্মসাৎ করে নিতে পেরেছে, যেমন পংক্তির যুক্তিফাটল, যা দেবী রায়ের কবিতার প্রধান গুণ । যেমন রচনার মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-আঙ্গিক, মুক্ত-সমাপ্তি । যেমন অফুরন্ত অর্থময়তা, একক আমির অনুপস্হিতি, সংকরায়ণ, লিমিন্যালিটি, শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ, প্লুরালিজম, রাইজোম প্রয়োগ, বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতাকে সরিয়ে দেয়া, শব্দার্থের ঝুঁকি, ভঙ্গুরতাকে স্বীকৃতি, অনবিচ্ছিন্নতা অভিমুখী, কবিতায় ফ্লাক্স প্রয়োগ, বার্তা বর্জন, পংক্তির ইনটারলিংকিঙের পরিবর্তে ইনটারলকিং ইত্যাদি ।
প্রিয় : আপনারা ছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী । প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে কি ভাবে লেখক-কবি হওয়া সম্ভব ? এখনও অনেক তরুণ কবি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার পক্ষে ?
মলয় : বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বলতে কী বোঝায় জানি না । তবে আঁচ করতে পারি যে ব্লগার খুনের চাপাতিবাজরা প্রতিষ্ঠানের টাকায় চলে । ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায়, প্রতিষ্ঠান মানে নরখাদক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক-ধার্মিক-আর্থিক সিসটেমের নাগপাশ । আনন্দবাজার তো বাংলা সাহিত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভূতকিমাকার করে ফেলেছে । আমাদের পোঁদে তো প্রতিষ্ঠানই লেগেছিল, তারপর ওরা নকশাল খতম শুরু করে দিলে । সিপিএম মসনদে বসে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোপাট আরম্ভ করলে । এখন প্রতিষ্ঠান গেছে তৃণমূলের কব্জায়, তারা মসনদে বসতেই সিপিএমএর চামচাদের অ্যাকাডেমি আর সংস্কৃতির মাথা থেকে লাথিয়ে বের করে নিজেদের মালদের বসিয়ে দিলে । লুমপেনরা চিরকাল শাসকদের সঙ্গে থাকে ; সিপিএমএর লুপমেনরা এখন ভিড়ে গেছে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় । এই ক’দিন আগে বিফ খেয়েছে জিগির তুলে উত্তরপ্রদেশে একজনকে কোতল করা হল । ফিদা হুসেনকে দেশে ফিরতে দেয়া হল না । মহারাষ্ট্রে সনাতন ধর্ম নামে একটা সংস্হা তিনজন বুদ্ধিজীবীকে খুন করিয়ে দিলে । তামিলনাডুতে একজন লেখক বাধ্য হয়ে নিজের বই উইথড্র করে নিলে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরোধিতা লেখকরা না করলে কারা করবে ?
প্রিয় : কেউ-কেউ বলেন, হাংরি আন্দোলনের মূল আদর্শ থেকে আপনি সরে গিয়েছিলেন। একথা কতটা সত্য?
মলয় : কেউ-কেউ নয়, ওসব কথা প্রচার করেছে শৈলেশ্বর ঘোষ-সুভাষ ঘোষ আর তাদের চেলারা । নিজেরা তো মুচলেকা দিয়ে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংস্রব অস্বীকার করেছিল, ভয়ে “হাংরি” শব্দটাই ব্যবহার করতো না, তাই “ক্ষুধার্ত খবর” বা “ক্ষুধার্ত” নামে পত্রিকা বের করত, আর আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করত । আমি ১৯৯৪ সালে কলকাতা ফিরে যখন “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লিখলুম তখন ওদের টনক নড়ল, শঙ্খ ঘোষকে ধরে কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশক দিয়ে “হাংরি” নামে চেলাদের নিয়ে বই বের করল, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নাকচ করা । ওদের বেশির ভাগ চেলা তো ছিলই না হাংরি আন্দোলনে ; আমি তাদের বেশির ভাগকে চিনি না, দেখিনি কখনও । তারা নিজেরাই লিখেছে যে ষাটের দশকের হাংরি ম্যানিফেস্টো তারা পড়েনি। সব ম্যানিফেস্টো তো আমারই লেখা , আমি কেমন করেই বা মূল আদর্শ থেকে সরে যাব । ওরাই গিয়ে সিপিএমে ঢুকলো, মিছিলে ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়ালো, মোড়ের অবরোধে অংশ নিল । সিপিএম তখন ভয়ংকর প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে, যাকে ইচ্ছে কেটে মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, ধর্ষণ করাচ্ছে, খেতের ফসল কাটিয়ে নিচ্ছে, রাস্তায় মানুষের ওপর পেটরল ঢেলে পোড়াচ্ছে । আমি এসবের বিরুদ্ধে প্রচুর লিখেছি, অথচ ওরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে স্পিকটি নট হয়ে বসেছিল । আমি তো অ্যাকাডেমির পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেছি ; সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ আর উৎপলকুমার বসুর মতন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে ল্যাজ নাড়াইনি ।
প্রিয় : আপনাদের আন্দোলনের বিনয় মজুমদার সম্পর্কে মূল্যায়ন শুনতে ইচ্ছে করছে ।
মলয় : আমি মনে করি জীবনানন্দের পর পশ্চিমবাংলায় যে দুজন জলবিভাজক কবি এসেছেন তাঁরা হলেন বিনয় মজুমদার ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় ।
প্রিয় : “আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই”, এটা আপনার কবিতার লাইন । নারী বিশ্বাসঘাতকতা করে, মানলাম । কিন্তু শিল্প কীভাবে বিশ্বাসঘাতক হয়, বিষয়টা যদি পরিষ্কার করেন ।
মলয় : কেন লিখেছিলুম, তা এখন আর মনে নেই । পাণ্ডুলিপি থাকলে আন্দাজ করতে পারতুম । তবে শিল্প ধারণাটায় আমি বিশ্বাস করি না ।
প্রিয় : লেখকের জন্য ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কিন্তু অনেকেরই নিজস্ব ভাষা নেই । নিজস্ব ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে কোন উপাদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন ?
মলয় : বাংলা গদ্য খুব বেশি দিনের নয়, ১৮০০ সনে মথি লিখিত সুসমাচারের আগে বাংলা গদ্য বলতে যা বোঝায় তা ছিল না । তাই ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা উচিত হবে না । ওদের তো ওল্ড টেস্টামেন্টের সময় থেকে, রোম সাম্রাজ্য আর গ্রিসের সময় থেকে গদ্য চলে আসছে । ‘ডন কিওটে’ লেখা হয়েছিল ১৬০৫ সালে, তার কতকাল পরে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড’ লেখা হল ভেবে দ্যাখো । বাংলা ভাষারও তেমন সময় দরকার ; আগামী প্রজন্মে ভাষা নিয়ে কাজ হবে নিশ্চয় । সন্দীপন, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, অজিত রায়, রবীন্দ্র গুহ, সুবিমল বসাক, কমল চক্রবর্তী, আজিজুল হক, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নিজেদের গদ্য তৈরি করেছেন । আমি নিজের গদ্য তৈরি করার দিকে খেয়াল দিইনি, কেননা প্রতিটি উপন্যাসের জন্য কাহিনি অনুযায়ী ভাষা বুনতে চেষ্টা করেছি । দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস, মানে পাল্প ফিকশান।
প্রিয় : যদি দুই বাংলার বাংলা সাহিত্য নিয়ে মূল্যায়ন করতে বলা হয়, তাহলে আপনি কী বলবেন ?
মলয় : আমার পড়াশুনা অমন গভীর আর ব্যাপক নয় যে এই বিষয়ে বলার সাহস দেখাব । তবে কবিতায় যে ধরণের কাজ হচ্ছে তাকে আন্তর্জাতিক স্তরের বলতে আমার দ্বিধা নেই ।
প্রিয় : বাংলাদেশের লেখকদের কাদের লেখা আপনার ভালো লাগে ? তরুণদের লেখা পড়েন কি ?
মলয় : হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ আমার পছন্দ । শহীদ কাদরী আর হেলাল হাফিজের কবিতা আমার পছন্দ । তরুণদের লেখা নেটে যা পাই পড়ি । বই আর পত্রিকা তো বিশেষ পাই না ; দুই সরকার ষড়যন্ত্র করে ডাক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে আদানপ্রদান কঠিন হয় ।
প্রিয় : বাংলা সাহিত্য সত্যিকার অর্থে কোন দিকে যাচ্ছে ? আমরা কি উন্নতি করছি, নাকি অবনতির দিকে যাচ্ছি ?
মলয় : নিশ্চয়ই উন্নতি করছি ; কিন্তু তা কমার্শিয়াল লেখালিখির বাইরে, লিটল ম্যাগাজিনের জগতে ।
প্রিয় : আপনাকে ফেসবুকে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ অ্যাকটিভ দেখা যায় । কিন্তু আমি অনেক কবিকেই চিনি যারা ফেসবুক এবং নেট-সংস্কৃতিকে নাক ছিটকায় ! এ বিষয়ে আপনার মতামত কি ?
মলয় : আমি প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে চাই । অনেক কবি এখনও লম্বা দাড়ি, কাঁধে ঝোলা, খাদির পাঞ্জাবিতে পুকুর পাড়ে আটক । যাঁরা নাক ছিটকান তাঁরা সম্ভবত প্রযুক্তির উন্নতি, প্রভাব আর দ্রুতির সঙ্গে পরিচিত নন ; বিদেশে কবি-লেখকরা কী করছেন তার সঙ্গে পরিচিত নন । ফেসবুকে আছি বলেই আমার বই আর নেট-এর লেখালিখি এখন বাংলাদেশ আর পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পৌঁছোয়, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল । কলকাতার বাইরে এবং ঢাকায় আমার বই এখন বিক্রি হচ্ছে, ইনটারনেটের কারণে । প্রচার করার ধান্দা নিয়ে  আমি কোনো সম্বর্ধনা নিই না, কবিতা পাঠে যাই না, সাহিত্যসভায় সভাপতিত্ব করি না বা বক্তৃতা দিই না । পাঠকের কাজ আমাকে খুঁজে নেয়া । বিখ্যাত বিদেশি বই এখন পিডিএফ আকারে নেটে বিনে পয়সায় পড়তে পাওয়া যায় । বাংলা বই এবার কিণ্ডলেও পড়তে পাওয়া যাবে, ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার আর মেইনটেনেন্সের ঝক্কি-ঝামেলা পোয়াতে হবে না ।
প্রিয় : আপনার প্রেম, বিয়ে, সংসারের গল্প জানতে চাই ।
মলয় : পাটনার ইমলিতলা পাড়ায় থাকতে, প্রথম প্রেমে পড়ার আগেই আমার সঙ্গে পনেরো বছরের এক শিয়া মুসলমান তরুণীর যৌন সংসর্গ হয়েছিল, তখন আমার বয়স দশ বছর ; ওনাদের বাড়িতে হাঁসের ডিম কিনতে যেতুম, তরুণীটিকে কুলসুম আপা বলে ডাকতুম, ওনাদের বাড়ির মাংস রাঁধার  গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে প্রায়ই যেতুম । কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুখস্ত বলতে পারতেন । যৌনাঙ্গ ছড়ে যাবার পর যাওয়া বন্ধ করে দিই, তবে এখনও ওনার জন্য মন কেমন করে । পাটনায় ওনার খোঁজে কিছুকাল আগে গিয়েছিলুম, শুনলুম ওনাদের পরিবার বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন । এই ঘটনা আমি কেবল আমার ঠাকুমাকে বলেছিলুম ; উনি উপদেশ দিয়েছিলেন আমি যেন জীবনে কখনও এই ঘটনা বাড়ির কাউকে না বলি ।
স্কুলে ঢুকে ক্রাশ উঁচু ক্লাসের গালে-টোল ছিলেন নমিতা চক্রবর্তি, যাঁর প্রভাবে মার্কসবাদ ও বাংলা সাহিত্যে আকৃষ্ট হই । তারপর আমি তিনবার প্রেমে পড়েছি : স্কুলের সহপাঠিনী অঞ্জলি দাশ, যে আমার কবিতায় শুভা ; দ্বিতীয়বার স্নাতকস্তরের নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা, আর তৃতীয়বার হিপিনী ম্যাডেলিন করিয়েট, যে আমার ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । চতুর্থবার বিয়ে করেছি । আমার স্ত্রী সলিলা ছিলেন মধ্যপ্রদেশ হকি দলের ক্যাপটেন, যখন ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় । অনেক শিল্ড-মেডেল জিতেছে সেসময়ে । কাপ জিতলে তাতে ভরে ওরা রাম খেয়ে উৎসব করত । আলাপের কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের নাগপুরের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলুম । ১৯৬৮ সালে বিয়ে করি । দুজনেই চাকরি করেছি আর নাগপুর, পাটনা, লখনউ, মুম্বাই, কলকাতা শহরে কাজ করেছি ।
আমি প্রথমে ব্যাঙ্ক নোট পোড়াবার চাকরি করতুম, পচা ছাতাপড়া তেলচিটে নোটের বিশাল-বিশাল পাহাড় পোড়াতে হতো তাতে শরীর খারাপ আরম্ভ হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ণের চাকরিতে যোগ দিয়ে সারা ভারত ঘুরেছি ; চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, শ্রমিকদের জীবন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে । আমার মেয়ে অনুশ্রী বড়ো, তার পাঁচ বছরের ছোটো ওর ভাই জীতেন্দ্র । দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সবই লিখেছি, পড়ে দেখতে পারো, যোগাড় করতে পারলে । আমি রাহু আর দাদা কেতু।
প্রিয় : যুগে-যুগে কবিতার ছন্দ নিয়ে দুই দল কবি আলাদা হয়ে ঝগড়া করতে থাকে । কিন্তু কেউ কি আজকাল নতুন ছন্দরীতি তৈরি করতে পেরেছে ?
মলয় : যুগে যুগে বলা উচিত হবে না । বাংলা কবিতা তো এই সেদিনকার, বিদেশিদের সঙ্গে এসেছে । তার আগে আমরা বাঁধা ছন্দে কাব্য লিখতুম । মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে বাংলা ছন্দ নানা আদল-আদরা পেয়েছে । ইউরোপের তুলনায় আমাদের কবিতা বেশ নবীন । নতুন ছন্দরীতি তৈরী হবে নিশ্চয়ই, তার জন্য ধৈর্য চাই । কলকাতায় ধীমান চক্রবর্তী, রাকা দাশগুপ্ত, শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী, মিতুল দত্ত, বারীন ঘোষাল, যশোধরা রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ছন্দে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন ।
প্রিয় : জীবন এখন দ্রুতি-আক্রান্ত । এই সময় কবিতার পাঠক তৈরি করা কি সম্ভব ?
মলয় : যারা কবিতা লিখছেন তাঁরাই তো পাঠক । কবি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই বাংলায় প্রায় ৫০০০ কবি আছেন, ওই বাংলাতেও হয়তো সেরকম সংখ্যকই হবেন । আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার তো হয়ইনি, তো পাঠক পাবে কোথ্থেকে । ইউরোপ-আমেরিকার মতন শিক্ষার প্রসার ঘটেনি এদেশে, লোকেরাও বেশ গরিব, বই কেনার মতন রেস্ত দূরের কথা, খাবার কেনার মতনই টাকাকড়ি জোটে না বেশির ভাগ পরিবারে । যতো দিন যাচ্ছে ভারতে গরিবের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । মধ্যবিত্তরা কবিতার বই কিনতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবাংলার যা আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ, তারা পশ্চিমবাংলা ছেড়ে প্রথম সুযোগেই পালাচ্ছে, তাদের পরের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি থেকে ।
প্রিয় : প্রকাশকরা প্রায় বলে থাকেন কবিতার পাঠক নেই । কবিতার জনপ্রিয়তা নেই । কবিতাকে জনপ্রিয় করলে কবিতার জাত চলে যাবে বলে আপনি মনে করেন কি ?
মলয় : কমার্শিয়াল উপন্যাস ছাড়া আর কিছুই বিকোয় না, প্রবন্ধের আর ছোটোগল্পের বইও বিকোয় না, তো কবিতার বই কোথ্থেকে বিকোবে ! গানের মাধ্যমে কবিতাকে কিছুটা জনপ্রিয় যে করার চেষ্টা হয়নি তা নয়, যেমন করেছেন কবীর সুমন । কিন্তু তারও তো ক্রেতা দরকার । ঘুরেফিরে সেই একই সমস্যায় এসে ঠেকি, অর্থাৎ সাধারণ বাঙালি পরিবারের হাতে তেমন টাকাকড়ি নেই যে কিনবে । প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়তো মোবাইল ফোনে কখনও কবিদের কন্ঠস্বর শোনার আগ্রহ হবে মধ্যবিত্ত শ্রোতার। কবিতা-পাঠ ও আবৃত্তির গ্রামোফোন রেকর্ডও প্রথম বের করেছিলেন ‘সাপ্তাহিক কবিতা’ লিটল ম্যাগাজিনের কবি শান্তি লাহিড়ি । ফেসবুকে এবার ভিডিও পোস্ট করা শুরু হয়েছে, কেউ-কেউ নিজের কবিতা পাঠ করছেন বা গান গেয়ে পোস্ট করছেন । ধৈর্য ধরতে হবে, তাড়াহুড়া করলে চলবে না ।


Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

নীলিমা দেব নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

নীলিমা : ‘মুদ্রিত পত্রিকা’ ও ‘ওয়েব পত্রিকা’ এ-দুটো বিষয়কে আপনি কিভাবে দেখেন ?

মলয় : বাংলা ভাষাসাহিত্যে আপাতত দুটোরই প্রয়োজন রয়েছে, তার কারণ লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রথমত গোষ্ঠীবদ্ধ, দ্বিতীয়ত একটা লিটল ম্যাগাজিন পাঁচশো কপির বেশি ছাপা হয় না বলে তার পাঠক সংখ্যা সীমিত, তৃতীয়ত পত্রিকাগুলো একটা বিশেষ ভৌ্গলিক এলাকায় আটক থেকে যায় । কিন্তু মুদ্রিত পত্রিকাগুলো গবেষকদের সাহায্য করে, সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরিতে গিয়ে গবেষকরা কোনো বিষয়ে প্রয়োজনীয় লেখাগুলো এক জায়গায় পেয়ে যান, ‘ওয়েব পত্রিকা’র ক্ষেত্রে তাঁদের গুগল খুঁজে-খুঁজে বের করতে হবে, প্রিন্ট আউট নিতে হবে, তাতে অনেক সময় নষ্ট হবে তাঁদের । কিন্তু ওয়েব পত্রিকার সুবিধা হলো যা তা সারা পৃথিবীর পাঠক পড়তে পারেন, লেখালিখির ক্ষেত্রেও তাতে গোষ্ঠীবদ্ধতা কম ।

 

নীলিমা : আজকাল বাংলা কবিতায় অন্য ভাষার শব্দযাপন নিয়ে আপনার কি মত ?

মলয় : ইংরেজি কবিতায় বহুকাল থেকে লাতিন, ফরাসি, গ্রিক শব্দ ব্যবহার করা হয় । সে কবিতাগুলো পড়ার সময়ে আমাদের অভিধানের সাহায্য নিতে হয়েছে, ছাত্রাবস্হায় অধ্যাপকদের কাছ থেকে মানে জেনে নিতে হয়েছে। বাংলা কবিতায় অন্য ভাষার শব্দ এইজন্যে আসছে যে প্রতিদিনের কথাবার্তায় কবিরা তা নিজেদের মধ্যে প্রয়োগ করছেন । প্রচুর বাংলা শব্দ আছে যা ফারসি আর আরবি থেকে এসেছে । আবার অনেক শব্দ এমন যেগুলো ইংরেজি বা ফরাসি শব্দকে অনুবাদ করে তৈরি করা, যেমন সিমবল শব্দের বাংলা প্রতীক, অরিজিনালের বাংলা মৌলিক — এই শব্দগুলো হরিচরণের শব্দকোষে পাওয়া যাবে না । জীবনানন্দ ইংরেজি শব্দের অনুবাদ নিজের মতন করে বাংলা করে নিয়েছেন, যেমন আকাশলীনা । বাংলা অভিধানে দেখবে বহু বাংলা শব্দের মানে বোঝানো হয়েছে ইংরেজি শব্দের মাধ্যমে । একই সঙ্গে কথোপকথনের বহু শব্দ হারিয়ে গেছে, ‘কলিকাতা কমলালয়’ পড়লে টের পাবে সেখানে অজস্র শব্দ রয়েছে যা আর প্রয়োগ হয় না ।

 

নীলিমা : শঙ্খ ঘোষকে জ্ঞানপীঠ দেওয়া হলো । আপনার মতে কি সঠিক কবি ও সঠিক কবিতাকে সমর্থন করা হলো ?

মলয় : পুরস্কারগুলো তো বুড়ো না হলে দেয়া হয় না । বাঙালি কবি-লেখকদের মধ্যে উনিই বয়স্ক, তাই ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন ওঠে না । বিনয় মজুমদার যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তাঁর শিমুলপুরের বাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্র পুরস্কার আর অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ।

 

নীলিমা : দেশে নানা রকমের শিল্পী ইনটলারেন্স নিয়ে চিন্তিত । অ্যাও্য়ার্ডও ফিরিয়ে দিচ্ছেন । ইনটলারেন্স নিয়ে আপনার কি মতামত ? অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দেওয়া নিয়েই বা আপনার মতামত কী ?

মলয় : ইনটলারেন্স সঞ্জয় গান্ধির সময়ে ছিল, লালু যাদবের বিহারে ছিল, সিপিএমের পশ্চিমবাংলায় ছিল, তৃণমূলের কার্টুন-বিরোধীতায় ছিল, পাঞ্জাবে গিলের সময়ে ছিল, আসামে বঙ্গাল খেদাওতে ছিল । সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে এখনকার ইনটলারেন্সের পার্থক্য হলো এখন ব্যাপারটা হিন্দুত্ববাদী বিজেপির চাপিয়ে দেওয়া। এটা নতুন ধরণের রাজনৈতিক চাপ যা আমরা আগে দেখিনি । যাঁরা অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই বামপন্হী মতামতের ।  লালু যাদবের গুণ্ডাদের সময়ে, সিপিএমের বিরোধী-নিধনের সময়ে, বঙ্গাল খেদাওয়ের সময়ে ফিরিয়ে দেননি । অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিয়ে শিল্পীরা নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করার প্রয়াস করেছিলেন । আমাকে অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমি যে পুরস্কার দিয়েছিল তা আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলুম, কারণ আমি নীতিগতভাবে কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় ; প্রতিটি পুরস্কারের সঙ্গে পুরস্কারদাতার মূল্যবোধও চাপিয়ে দেয়া হয়, নয়তো তৃণমূল এসেই বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে সিপিএমের বাছাই করা সদস্যদের ভাগিয়ে দেবে কেন ? তাঁরা তো জ্ঞানীগুণী লেখক-অধ্যাপক ছিলেন ।

 

নীলিমা : আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা কবিতার ভবিষ্যত কতোদূর ? আপনার মতে এখন বাংলা কবিতার ট্রেণ্ড কী? কোথায় যাচ্ছে এই কবিতা । কোনো নতুন হাংরি আন্দোলন কি অদূর ভবিষ্যতে দেখতে পাচ্ছেন ?

মলয় : বাংলা ভাষায় যে ধরণের কবিতা লেখা হচ্ছে তাকে আন্তর্জাতিক স্তরেরই বলা যায় । দুর্ভাগ্যবশত বাংলা থেকে ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করার মতো লোক নেই । প্রাইমারি স্তরে ইংরেজি শেখানো বন্ধ করে পশ্চিমবাংলায় একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যারা ইংরেজি-ইল্লিটারেট । তবে ইউরোপীয় ভাষাগুলোয় আর অন্ত্যমিলের বা ছন্দের কবিতা প্রায় লেখাই হয় না ; তাই বাংলায় যাঁরা মিল দিয়ে কবিতা লেখেন তাঁদের কবিতা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করলে সেকেলে মনে করবে পাঠক-পাঠিকারা । টাইমস লিটেরারি সাপলিমেন্ট, প্যারিস রিভিউ, পোয়েট্রি ম্যাগাজিন, লণ্ডন ম্যাগাজিনে কিন্তু বাঙালি কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয়, তাঁরা সরাসরি ইংরেজিতে লেখেন বলে । হাংরি আন্দোলন ছিল একটা বিশেষ সময়ের প্রডাক্ট । আর অমন আন্দোলন সম্ভব নয় ।

 

নীলিমা : মহিলা কবিদের কবিতাকে আপনি ঠিক কীভাবে মূল্যায়ন করেন ?

মলয় : মহিলা বলে তো আর তাঁদের কবিতার জন্য কোনো আলাদা মানদণ্ড নেই । নারীবাদীদের কবিতা ছাড়া, কবির  নামটা সরিয়ে দিলে টের পাওয়া যায় না তা মহিলার লেখা কিনা । তবে তরুণীরা আজকাল অসাধারণ কবিতা লিখছেন, যেমন যশোধরা, মিতুল, তানিয়া, বিদিশা, জয়িতা, স্বাগতা, জপমালা, দেবযানী প্রমুখের নাম করা যায় ।

 

নীলিমা : গদ্য, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কোনটা আজকের দিনে আপনাকে বেশি স্পর্শ করছে ? কেনই বা ?

মলয় : এখন বয়সের কারণে পড়াশুনায় সময় দিতে পারি না । তার ওপর আঙুলে আরথারাইটিসের কারণে নিজের লেখা লিখতেই প্রচুর সময় যায় । শেষ যে উপন্যাস পড়েছিলুম তা নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট । কবিতার বই অনেকেই পাঠান, কিন্তু সেভাবে একাগ্র হতে পারি না । বেশিক্ষণ বসে থাকতেও আজকাল অসুবিধা হয় । শুয়ে পড়তে-পড়তে ঘুম পেয়ে যায় ।

 

নীলিমা : হাংরি আন্দোলন করলেন, কবিতা লিখলেন, উপন্যাস লিখলেন । কি-কি রয়ে গেলো যা আগামী দশ বছরে আপনি করতে চান ?

মলয় : নাটক, কাব্যনাট্য, ডিটেকতিভ উপন্যাস, ছোটো গল্পও লিখেছি । দশ বছর বাঁচবো না । দু’তিন বছর আর বাঁচবো বলে মনে হয়। স্বাস্হ্যের যা অবস্হা, তাও বাঁচবো কিনা ঠিক নেই । দুটো বই লেখার ইচ্ছে আছে । একটা রান্নার রেসিপির বই, যা থেকে বোঝা যাবে যে মায়ের আর স্ত্রীর কাছ থেকে ভালো রাঁধতে শিখেছি । অন্য বইটা কলকাতা নিয়ে। হাংরি আন্দোলনের ইনভেস্টিগেশনের সময়ে মাঝে-মাঝে লালবাজারে যেতে হতো । ফালতু বসে আছি দেখে দিনের বেলা আর রাতের বেলা পুলিশ অফিসাররা আমাকে ওনাদের ভ্যানে বসিয়ে কলকাতার আনডারবেলি দেখাতে নিয়ে যেতেন । দেখি পারি কিনা লিখতে, কেননা স্মৃতি ধ্যাবড়া হয়ে গেছে, কলকাতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

রূপসা ব্যানার্জির নেয়া সাক্ষাৎকার

 

  • রূপসা: কবিতা রচনার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু না আঙ্গিক কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন ?
  • মলয়: কবিতা লেখার সময়ে ওগুলো আগে থেকেই কবিরা ভেবে নেন বলে মনে হয় না আমার। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত যেমন ভেবেছিলেন যে ‘মেথর’ নিয়ে কবিতা লিখবেন, তেমন আর কেউ ভাবে না। কিছু কবি ছন্দ সম্পর্কে সজাগ, তাঁরা মাত্রার অক্ষর গুনে-গুনে কবিতা লেখেন । জীবনানন্দ, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যয়ের কাছে পয়ার স্বাভাবিকভাবেই আসতো, তাঁদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু স্পেসিফিক বিষয়ে আটক থাকেননি, এমনকি বহু কবিতায় একটি লাইনের সঙ্গে পরের লাইনের সংযোগের যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না । এখন যেমন জহর সেনমজুমদার কবিতা লেখেন যা পাঠ করলে গায়ে কাঁটা দেবে কিন্তু কবিতাটি থেকে কোনো স্পেসিফিক বিষয় বেরিয়ে আসবে না । কবিতার একটি বিষয়কেন্দ্র থাকতে হবে, এটা সাম্রাজ্যবাদী মেট্রোপলিটান আইডিয়া, যেন কবিতা একটি উপনিবেশ আর তার বিষয়কেন্দ্রে একটি সিংহাসন দরকার । ঔপনিবেশিক উপন্যাসও এইভাবে লেখা হতো, উপন্যাসের কেন্দ্রে একজন নায়ককে নির্মাণ করে, তার চারিপাশে চরিত্ররা, এমনকি নায়িকাও কেবল তাকে খাড়া রাখার জন্য সাপোর্ট দিতো । আমি যেহেতু মাত্রা গুনে লিখি না, তাই আগে  থাকতে ভেবে নিই না কোন আঙ্গিকে লিখবো, সেটা আপনা থেকে গড়ে ওঠে । আমি যে উপন্যাস লিখেছি, ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলী, নামগন্ধ, ঔরস, প্রাকার পরিখা, তাদের কেন্দ্রে কোনো নির্দিষ্ট নায়ককে বসাইনি ।
  • রূপসা: ম্যানিফেস্টো রচনার মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূচনা করেন, কিন্তু হাংরি আন্দোলন সাহিত্যের জগতে আদর্শভিত্তিক বৈপ্লবিক চেতনার সত্যিই কি স্ফুরণ ঘটাতে পেরেছিলো?
  • মলয়:  হ্যাঁ, আমরা ম্যানিফেস্টো এবং বুলেটিনের মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছোতে চেয়েছিলুম আর তাতে সফল হয়েছিলুম, কেননা সেগুলো সাধারণত একপাতার হতো আর ফ্রি বিলি করা হতো । কেবল কবিতার ম্যানিফেস্টো নয়, আমরা ছোটোগল্প, নাটক, রাজনীতি, ধর্ম, ছবিআঁকা ইত্যাদি বহু ব্যাপারে ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছিলুম । প্রথম কবিতার পোস্টকার্ড ও পোস্টার আমরাই শুরু করেছিলুম । সাহিত্যের জগতে বিপুল ঝটকা দিয়েছিল হাংরি আন্দোলন । তারপর থেকে কতো যে আন্দোলন হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু বিদ্যায়তনিক জগত কেবল হাংরি আন্দোলনকেই মনে রেখেছে, ওই ঝটকার জন্য, অনেকটা বলিকাঠে পাঁঠার মাথা কাটার মতন। তুমি কাকে আদর্শ বলছ জানি না । আদর্শ শব্দটাই আপেক্ষিক । মানববোমারা বহু মানুষকে হত্যা করার প্রয়াস করে তাদের আদর্শের জন্য । তাই আদর্শ শব্দটা ব্যবহার না করাই উচিত । হাংরি আন্দোলন ওই মানববোমাদের মতন আদর্শের জগতে তোলপাড় ঘটিয়েছিল।
  • রূপসা: হাংরি আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন কোন লেখা আপনাকে বিশেষ প্রভাবিত করেছিল?
  • মলয়: প্রভাবিত শব্দটা ব্যবহার করা উচিত হবে না । তবে ‘হাংরি’ শব্দটা আমি পেয়েছিলুম জিওফ্রে চসারের ক্যানটারবেরি টেলসের ‘In the sowre hungry time’ থেকে । উনি একটি পতনশীল বিপর্যস্ত সময়কে বলেছিলেন হাংরি । অনেকে ভাবে আমরা যৌনক্ষুধার কথা বলেছি হাংরি শব্দের মাধ্যমে । তারা ইডিয়ট, অশিক্ষিত ।  সময়কে হাংরি তকমা দেয়া একটা বৈপ্লবিক বক্তব্য । দ্বিতীয়ত, হাংরি আন্দোলনের তাত্বিক পটভূমি পেয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের বই ‘ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট’ থেকে । স্পেংলার বলেছিলেন যে, একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তাহল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে, তা আগাম বলা যায় না । যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয়, যখন তার সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন । আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ঙ্কর অবসাদের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । দুঃখের বিষয় বহু আলোচক আমার এই বক্তব্যের দিকে নজর না দিয়ে হাংরি আন্দোলনকে যৌনক্ষুধার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন । আমার মনে হয় তাঁদের নিজস্ব গোপন চেতনা প্রতিফলিত হয় তাঁদের চিন্তাধারায় ।
  • রূপসা: ষাটের দশকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই কি আন্দোলন শুরু করার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা নেয়?
  • মলয়: নিঃসন্দেহে । তুমি যদি তখনকার শেয়ালদা স্টেশানে একবার যেতে, তাহলে তোমার মনে হতো যে দেশের নেতাদের, যারা দেশভাগের জন্য দায়ি, তাদের আচ্ছাসে জুতোপেটা করি ।
  • রূপসা : অ্যালেন গিন্সবার্গের সাথে আপনার পরিচয় ১৯৬২ তে।  বহির্বিশ্বের সাস্কৃতির প্রভাব হাংরি আন্দোলের ওপর কতটা পর?
  • মলয়: ভুল তথ্য । অ্যালেন গিন্সবার্গ আমার পাটনার বাসায় এসেছিলেন ১৯৬৩ সালের এ্রপ্রিল মাসে । ১৯৬২ সালে দোলের দিন উনি গিয়েছিলেন আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর চাইবাসার বাসায় মহুয়ার মদ খেতে, পিটার অরলভস্কিকে সঙ্গে নিয়ে ।বস্তুত আমি আর দাদা তার আগে অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার সঙ্গে পরিচিত ছিলুম না । গিন্সবার্গ আমেরিকায় ফিরে যাবার পর প্রকাশক লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি আমাকে গিন্সবার্গের ‘হাউল’ আর ‘ক্যাডিশ’ বইদুটো পাঠান । বহির্বিশ্বের কোনো প্রভাব হাংরি আন্দোলনের ওপর ছিল বলে মনে হয় না আমার । অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীরা গিন্সবার্গের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, বেনারসের হাংরি পেইনটার অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় ছাড়া ।
  • হাংরি কবিতাগুলিকে কি আপনি পোস্ট মডার্নিজম আওতাভুক্ত করবেন ?
  • মলয়: সব কবিতাকে করব না, কিন্তু বহু কবিতাকে করব । তুমি যদি লক্ষ্য করো তাহলে দেখবে জীবনানন্দের ‘প্যারাডিম; কবিতাটা পোস্টমডার্ন ।
  • রূপসা: প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছাড়া হাংরি আন্দোলর সাহিত্য সংস্কৃতির আর কোথায় ধাক্কা দিতে চেয়েছিলো ?
  • মলয়: কলকাতার সাংস্কৃতিক এসট্যাবলিশমেন্টকে শিকড় থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল । নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরোবে কেন ? এটা অনেকে ভুলে যায় । কেবল অশ্লীলতার মামলা ছিল না আমাদের বিরুদ্ধে । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলাও ছিল।
  • রূপসা : মুক্ত যৌনতা না যৌনতায় মুক্তি..হাংরি কবিতা কোন রূপকল্পকে তুলে ধরতে চেয়েছিলো?

 

          মলয় : অমনভেবে আগে থাকতে ভেবেচিন্তে কোনো রূপকল্প হাংরি কবিরা গড়তেন না । যা কিছু                   কবিতায় এসেছে তা স্বতঃস্ফূর্ত ।

          রূপসা : সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে অশ্লীলতা শব্দটিকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন ?

 

 

  • মলয়: অশ্লীল সাহিত্য লিখব ভেবে কেউই কবিতা বা গল্প-উপন্যাস লেখেন না । পাঠক যদি কোনো রচনাকে অশ্লীল বলে মনে করে তাহলে তা তার শ্রেনিচেতনার ফল । নিম্নবর্গের শব্দাবলী ও অভিব্যক্তিকে উচ্চবর্ণের ও উচ্চবর্গের বাঙালিরা অশ্লীল মনে করেন । তাদের জীবন নিয়ে লিখতে গেলে তোমাকে তাদের ভাষাজগতে প্রবেশ করতে হবে ।
  •      রূপসা : আদর্শগত মতানৈক্যই কি হাংরি আন্দোলন শেষ হবার পিছনে প্রধান কারণ ?
  •       মলয় : না, প্রধানত কয়েকজন চলে গেলেন আনন্দবাজারে, লোভে পড়ে । কয়েকজন আমার বিরুদ্ধে মামলায় রাজসাক্ষী আর পুলিশের সাক্ষী হয়ে গেলেন, যে কারণে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা তাঁরা খোয়ালেন । একে আদর্শগত মতানৈক্য বলা যায় না । তারা প্রতিষ্ঠানের থুতুচাটা কুকুর ।
  • রূপসা : যে প্রতিবাদী স্পর্ধা হাঙরি আন্দোলন সাহিত্যের জগতে আমদানি করেছিল তা সমসাময়িক লেখালিখির মধ্যে ভীষণই অনুপস্থিত ৷ বর্তমান সমাজ রাজনীতিকে এর জন্য কতটা দায়ি  বলে মনে করেন ?
  • মলয়: হ্যাঁ, এখনকার লেখকরা বেশ ভিতু। রাষ্ট্র যে কখন কাকে জেলে পুরে দেবে তার ঠিক নেই। আইন আর আইনের পথে চলে না । কার্টুন আঁকলেও জেলে পুরে দেয়া হয় ।
  • রূপসা: সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে কতটা আশাবাদী ?
  • মলয় : সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে প্রচুর লেখা হচ্ছে যাকে আন্তর্জাতিক স্তরের বলা যায় । দুঃখের বিষয়, বাংলা থেকে কেবল কমার্শিয়াল লেখালিখি অনুবাদ হয়, সৃজনশীল লেখার অনুবাদ হয় না, তাই পৃথিবীর বৃহত্তর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না ।
  • রূপসা : হাংরি আন্দোলনের সার্থকতা ঠিক কোন জায়গায় ?
  • মলয়: তুমি নিজেই ওপরে একটা প্রশ্নে বলেছ যে হাংরি আন্দোলন প্রতিবাদী স্পর্ধা এনেছিল । তা ছাড়াও আরও বহু কিছু এনেছে হাংরি আন্দোলন । বস্তুত সাহিত্যের টেকনিকালিটিজ পুরো পাল্টে গেছে হাংরি আন্দোলনের প্রভাবে ।
  • রূপসা: সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এটাও কি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সুযোগ্য জবাব ছিল ?
  • মলয় : আমি কোনো পুরস্কার নিই না, কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিই না, সম্বর্ধনা নিই না, সভায় গিয়ে বক্তৃতা দিই না । আমি বহু লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদককেও নিরস্ত করেছি আমাকে পুরস্কার, সম্বর্ধনা ইত্যাদি থেকে । লেখকের একাকীত্ব খুবই দরকার । বস্তুত সেই জন্যই আমি কলকাতার ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে আত্মনির্বাসনে চলে এসেছি মুম্বাইতে

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জয়িতা ভট্টাচার্য

য়িতা : কবিতা না গদ্য– গদ্যের ক্ষেত্রে প্রবন্ধ না গল্প-উপন্যাস —তুমি নিজে কোনটা লিখতে বেশি পছন্দ করো।

মলয় : আমার নিজের তেমন কোনো প্রেফারেন্স নেই । নির্ভর করে মগজের ভেতরে একটা বিশেষ সময়ে কি ঘটছে । প্রবন্ধ লিখি মূলত সম্পাদকদের অনুরোধে । এখন আর প্রবন্ধ লিখতে ভালো লাগে না, প্রাবন্ধিকের সংখ্যা কম বলে সম্পাদকরা প্রবন্ধ চান, এমনকি সম্পাদক নিজে কোনো বিষয় বেছে নিয়ে লিখতে বলেন। তা কি পারা যায় ? এখন তেমন পড়াশোনা করতে বা সমাজ নিয়ে ভাবতেও ভালো লাগে না । ফিকশান লিখি, কোনো একটা ব্যাপার স্ট্রাইক করলে লিখতে থাকি, কেউ চাইলে দিই । কবিতা তো অ্যাডিকশান, যখন নেশাটা পেয়ে বসে তখন না লিখে নিস্তার নেই । সেগুলোও ইমেলের বডিতে লিখে রাখি, কেউ চাইলে পাঠাই । ইন ফ্যাক্ট যে চায় তাকেই পাঠাই, কোনো বাদ বিচার করি না । কবিতার খাতা বলে আমার কোনো ব্যাপার নেই,  ২০০৫ সালের পর থেকে,  আরথ্রাইটিসের কারণে । আরথ্রাইটিসের কারণে লেখালিখির বাইরে চলে যাচ্ছিলুম, সে কষ্ট তুই বুঝতে পারবি না । মগজের ভেতরে লেখা ঘুর্ণি হয়ে পাক খাচ্ছে অথচ কিছুই লিখতে পারছি না । তারপর মেয়ের উৎসাহে কমপিউটার শিখলুম, বাংলা টাইপ করতে শিখলুম, ডান হাতের মধ্যমাটা কম আক্রান্ত, সেটাই টাইপ করতে ব্যবহার করি । ছেলে এই কমপিউটারটা দিয়ে গেছে, ছুটিতে এলে পরিষ্কার করে দিয়ে যায় ।

জয়িতা : তোমার বিভিন্ন উপন্যাস পড়লে দেখা যায় প্রতিটির ন্যারেটিভ টেকনিক ও আঙ্গিক এ ভিন্নতা । ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস থেকে জলাঞ্জলি, নামগন্ধ, ঔরস, প্রাকার পরিখা, সবগুলো একই চরিত্রদের নিয়ে এগিয়েছে, একটাই উপন্যাস বলা যায় তাদের, কিন্তু তুমি প্রতিটির ফর্ম আর টেকনিকে বদল করতে থেকেছো । কেন ? তারপর, অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা উপন্যাসে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন টেকনিক প্রয়োগ করলে, তিন রকমের বাংলা ভাষার খেলা দেখালে। ‘নখদন্ত’ উপন্যাসে বেশ কয়েকটা ছোটোগল্প আর নিজের রোজনামচার অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছ । এই বিষয়ে কিছু বলো । এটা কি সচেতন প্রয়াস?

মলয় : হ্যাঁ । পাঁচটা মিলিয়ে একটা অতোবড়ো উপন্যাস তো কেউ ছাপতো না, তাই আলাদা-আলাদা করে লিখেছিলুম । ‘ডুবজলে’ উপন্যাসটা সহকর্মীদের নিয়ে লেখা, ক্রমে জানতে পেরেছিলুম যে কয়েকজন গোপন মার্কিস্ট-লেনিনিস্ট । পাঁচটা আলাদা উপন্যাস লিখতে পেরে একদিক থেকে ভালোই হলো, সব কয়টায় নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেছি । ব্যাপারটা মগজে এলে বেশ কিছুকাল ভাবি আঙ্গিক নিয়ে, উপস্হাপন নিয়ে, তারপর লেখা আরম্ভ করি । অনেক সময়ে লিখতে লিখতে আপনা থেকেই একটা আঙ্গিক গড়ে ওঠে, যেমন ‘নখদন্ত’ বা ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ । ‘নখদন্ত’ বইটার জন্য চটকল আর পাটচাষ নিয়ে প্রচুর তথ্য যোগাড় করেছিলুম । তেমনিই ‘নামগন্ধ’ লেখার সময়ে আলুচাষি আর কোল্ড স্টোরেজের তথ্য সংগ্রহ করেছিলুম । এই বইদুটোয় বেশ কিছু চরিত্র চোখে দেখা । অভিজ্ঞতার বাইরেও লিখেছি, যেমন .জঙ্গলরোমিও’, একদল ক্রিমিনালের বিস্টিয়ালিটি নিয়ে । টানা একটামাত্র বাক্যে ফিকশান লিখেছি ‘নরমাংসখোরদের হালনাগাদ’, এটাও জাস্ট ইম্যাজিনেটিভ । ‘হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা’ রবীন্দ্রনাথের দাদুর দেহ ইংল্যাণ্ডের কবর থেকে তুলে হৃৎপিণ্ডে কেটে কলকাতায় নিয়ে আসার কাহিনি, রবীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের বাবারও সমালোচনা করেছি ফিকশানটায় । রবীন্দ্রনাথের দাদু যদি আরও দশ বছর বাঁচতেন তাহলে পশ্চিমবাংলার ইনডাস্ট্রি উন্নত হতো ।

জয়িতা : পোষ্টকলোনিয়াল বা কমনওয়েল্থ লিটেরেচারের ক্ষেত্রে সলমন রুশডিকে আদর্শ পোস্টমডার্ন নভেলিস্ট বলে কি তুমি মনে করো ?

মলয় : রুশডি একজন ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ঔপন্যাসিক । আমেরিকার আলোচকরা ম্যাজিক রিয়্যালিজমকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায় না, কেননা টেকনিকটা তাদের দেশে গড়ে ওঠেনি, তাই ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট লেখকদেরও পোস্টমডার্ন বলে চালাবার চেষ্টা করে । পোস্টমডার্ন উপন্যাসের কিছু সূক্ষ্ম উপাদান থাকলেও রুশডির ফিকশানকে পোস্টমডার্ন তকমা দেয়া উচিত হবে না । গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে পোস্টমডার্ন বললে স্প্যানিশ আলোচকরা বুল ফাইটের ষাঁড় লেলিয়ে দেবে ।

জয়িতা : তোমার গদ্যে প্রথাগত প্রেম আসেনা । নেই স্টিরিওটাইপ প্রটাগনিস্ট । সেটা কি সচেতন ভাবে পরিহার করেছো স্বকীয়তা আনতে? ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস উপন্যাসে মানসী বর্মণ, শেফালি, জুলি-জুডি ; নামগন্ধ উপন্যাসে খুশিরানি মণ্ডল, অরূপ তোমার এঁটোকাঁটায় কেকা বউদি, ঔরস-এ ইতু, এরা একজন আরেকজনের থেকে পৃথক এবং কেউই স্টিরিওটাইপ নয় । এমনকি উপন্যাসের শেষে চমক দিয়েছ যে খুশিরানি মণ্ডলকে পূর্ববঙ্গ থেকে তুলে আনা হয়েছিল, সে প্রকৃতপক্ষে জনৈক মিনহাজুদ্দিন খানের নাতনি । আত্মপরিচয় নিয়েও খেলেছো খুশিরানি মণ্ডলের ক্ষেত্রে, সে নিজের উৎস না জেনেই লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ে, ব্রত রাখে, চালপড়ায় বিশ্বাস করে ।মলয়রচনার আঙ্গিক সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাইবো ।

মলয় : তার কারণ আমি প্রথাগত প্রেম করিনি । বয়সে আমার চেয়ে বড়ো নারীরা আমার জীবনে প্রথমে প্রবেশ করেছিলেন । তাই হয়তো যুবকের চেয়ে যুবতীর বয়স বেশি হয়ে যায়। নারী চরিত্রগুলোয় আবছাভাবে কুলসুম আপ আর নমিতা চক্রবর্তীর উপস্হিতি রয়ে যায় । হাংরি আন্দোলনের সময়ে যে যথেচ্ছ জীবন কাটিয়েছি, তার ছাপও নারী চরিত্রদের ওপর রয়ে গেছে । খুশিরানি মণ্ডলের মাধ্যমে দেখিয়েছি যে নিজের আইডেনটিটি ব্যাপারটা কতো ইডিয়টিক । এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ, আইডেনটিটি পলিটিক্সের দরুন সমাজ ভেঙে পড়ছে, প্রতিনিয়ত লাঠালাঠি হচ্ছে, দলিতদের পেটানো হচ্ছে । গোরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে কতো লোকের জীবিকা নষ্ট করা হয়েছে । আইডেনটিটি পলিটিক্স থেকে আমরা পৌঁছে গেছি জিঙ্গোইজমে । আমার বিয়ের কথা বলি ; আমি সলিলাকে বিয়ে করেছি তিন-চার দিনের আলাপের মধ্যেই, দুজনে দুজনকে হঠাৎই ভালো লেগে গিয়েছিল।

জয়িতা : ডুবজলে উপন্যাসে টেবিলের ওপরে রাখা মানসী বর্মণের পাম্প দিয়ে বের করা দুধ অতনু চক্রবর্তী টুক করে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিয়েছিল । এটা কেন ?

মলয় : অতনুর মা সম্প্রতি মারা গিয়েছিলেন, সে কয়েকমাস মিজোরামে জুলি-জুডি নামে দুই সৎবোনের সঙ্গে যৌনজীবন কাটিয়ে পাটনায় ফিরে মানসিক গুমোটের মধ্যে আটক হয়ে গিয়েছিল। দুধটা দেখে আপনা থেকেই মায়ের অনুপস্হিতি তার মনে কাজ করে ওঠে । পরে ঔরস আর প্রাকার পরিখা উপন্যাস দুটোয় মানসী বর্মণ আর অতনু চক্রবর্তীর জটিল যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ওরা তখন ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী জমায়েতে যোগ দিয়েছে ।

জয়িতা : বাংলা সাহিত্যে বিশ্বায়নের প্রভাব কতটা প্রতিফলিত বলে তোমার মনে হয় ? বিশ্বায়নের রেশ ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় তোমার ?

মলয় : এখনকার ব্যাপারটা বলতে পারব না । আমি আর বিশেষ পড়াশুনার সময় পাই না । বুড়ো-বুড়ি মিলে সংসার চালাতে হয় বলে সময়ের বড্ডো অভাব, ঝাড়-পোঁছ, কুটনো কোটা, রান্নায় হেল্প ইত্যাদি । বিশ্বায়নের পর যে সব বাংলা উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তার কিছুই পড়িনি,  বিশ্বায়ন তো বলতে গেলে ব্রেক্সিট আর ট্রাম্পের গুটিয়ে ফেলার রাজনীতির দরুন উবে যেতে বসেছে, কেবল চীনই আগ্রহী ওদের মালপত্তর বিক্রির জন্য, আমাদের দেশের বাজার প্রায় কবজা করে ফেলেছে চীন । তবে ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্য তো ইউরোপের অবদান । বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাস লেখা আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপীয় ফর্মে । মাইকেল অমিত্রাক্ষর আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপের ফর্মে । তিরিশের কবিরা কবিতা লেখা আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপের ফর্মে, এমনকি জীবনানন্দের কবিতায় ইয়েটস, বিষ্ণু দের কবিতায় এলিয়টের উপস্হিতি খুঁজে পান বিদ্যায়তনিক আলোচকরা । ব্রিটিশরা আসার আগে আমাদের সাহিত্যধারা একেবারে আলাদা ছিল । প্রতীক, রূপক, চিত্রকল্প, মেটাফর ইত্যাদি ভাবকল্পগুলো তো ইউরোপের অবদান । আধুনিক সঙ্গীত সম্পর্কে আমার জ্ঞান নেই, কিন্তু অনেকে রবীন্দ্রনাথের গানে ইউরোপের প্রভাব পান, এমনকি হুবহু গানের সুরের নকল ।

জয়িতা :  শূন্যদশকের কবি সাহিত্যিকদের কাছেও পুনরাধুনিক ,উত্তরাধুনিক বা আধুনান্তিক সাহিত্য সম্পর্কে ধোঁয়াশা। এর কারণ কি বলে মনে হয় ? বাংলা সাহিত্য সামগ্রিকভাবে আজকের বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে কতটা সমান্তরাল ?

মলয় : ধোঁয়াশা হলেও তাদের লেখায় ছাপ পাওয়া যাবে । আর সকলেরই মগজে ধোঁয়া ঢুকে আছে বলা যাবে না । অনেকে যথেষ্ট শিক্ষিত । আবার অনেকের আগ্রহ নেই, তারা নিজের মতো করে লিখতে চায় । পুনরাধুনিক, উত্তরাধুনিক, অধুনান্তিক, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্টস্টাকচারালিম, ফেমিনিজম সম্পর্কে না জেনেও দিব্বি লেখালিখি করা যায় । কবিতা সিংহ তো ফেমিনিজমের তত্ব না পড়েও ফেমিনিস্ট কবিতা লিখে গেছেন । বাংলায় এখন যে ধরনের মিল দেয়া কবিতা লেখা হয়, ইউরোপে আর তেমন কবিতা লেখা হয় না, ওদের কবিতায় ছবির ভাঙন অনেক বেশি আর দ্রুত । প্যারিস রিভিউ আর পোয়েট্রি পড়লে দেখা যায় যে অনেকে সহজ ভাষায় কবিতা লিখছেন, জটিলতা বর্জন করে, যখন কিনা বাংলায় বহু তরুণ কবিতাকে জটিল করে তুলছেন ।

জয়িতা : একটু ব্যক্তিগত প্রশ্নে আসি । ছোটোলোকের ছোটোবেলা ও ছোটোলোকের যুববেলায় নিজের বড়ো হয়ে ওঠার কথা লিখেছো ।হাংরি আন্দোলনের সময়কার ঘটনাগুলো  আমরা জানি । কিন্তু পরবর্তী অধ্যায়ে মলয় রায়চৌধুরী বেশ কিছুকাল অপ্রকাশিত । এই সময়টার কথা বলো । সত্যি কি লেখোনি না লিখেছ তা অপ্রকাশে ।এই ট্রান্সিশনাল সময়টার কথা বলো।

মলয় : লিখেছি তো, সবই লিখেছি । ‘আখর’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায় লিখেছি “ছোটোলোকের জীবন” শিরোনামে । ওটা প্রতিভাস থেকে “ছোটোলোকের সারাবেলা” নামে প্রকাশিত হবার কথা ।

জয়িতা : ব্যক্তি মলয় ও লেখক মলয়ের মধ্যে ফারাক কতটা? তুমি নিজেকে কিভাবে দ্যাখো ।

মলয় : কোনো তফাত আছে বলে মনে হয় না । আমিও যেকোনো লোকের মতন বাজার যাই, দরাদরি করি, যৌবনে মেছুনির সঙ্গে ফ্লার্ট করতুম, এখন সন্ধ্যাবেলা সিঙ্গল মল্ট খাই । হাংরি আন্দোলনের সময়ে গাঁজা চরস আফিম এলএসডি বাংলা  খেতুম, এখন আর খাই না । বাড়িতে যে পোশাক পরে থাকি সেটাই অতিথিদের সামনেও পরে থাকি, মহিলারা এলেও । কথা বলার ধাঁচেও কোনো তফাত নেই, যদিও বেশ কিছু সাহিত্যিককে দেখেছি কেমন ক্যালাটাইপের গলায় কথা বলতে । তারা সব বুদ্ধদেব বসুর ছাত্র বা ছাত্রদের ছাত্র ।

জয়িতা : তোমার সমসাময়িক কোনো সাহিত্যিকের কথা বলো যাঁর সঠিক মূল্যায়ন কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য গোষ্ঠি করতে পারেনি যথাযথ ।

মলয় : মূল্যায়নই হয় না, তো আবার সঠিক মূল্যায়ন । এতো বেশি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীবাজি হয় যে বেশির ভাগ প্রতিভাবান লেখক-কবির মূল্যায়ন হয় না, বিশেষ করে যারা গদ্য নিয়ে কাজ করছে তারা অবহেলিত থেকে যায় । পুরস্কারগুলো নিয়ে টানাটানি হয় । সিপিএমের লোকেদের বাংলা অকাদেমি থেকে বিদেয় করে দেয়া হলো ওই একই সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কারণে, তাঁরাও জ্ঞানী-গুণী ছিলেন ।

জয়িতা : জীবনের ইমনকল্যাণে এসে তোমার চেতনায় কোনো পরিবর্তন এসেছে ? জীবন দর্শনের ক্ষেত্রে বলছি ।

মলয়: এখন আমার একাকীত্ব ভালো লাগে, বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না, আমার স্ত্রীও বেশি কথা বলা পছন্দ করে না । আমরা কোনো অনুষ্ঠানে যাই না । খাবার নেমন্তন্ন এড়িয়ে যাই, শরীরের কারণে । এখানে মুম্বাইতে আত্মীয় বলতে আমার এক মামাতো ভায়রাভাই, যার বয়স আমার চেয়ে ছয় বছর বেশি ।  কিন্তু এও মনে হয় যে মরার পর শ্মশানে নিয়ে যাবার লোক জোটানো বেশ কঠিন হবে । বেস্ট হবে দেহ দান করে দেয়া । সেটা মরার পর বডির অবস্হা কেমন থাকে তার ওপর নির্ভর করে । আমার স্ত্রীর আপত্তি নেই । স্ত্রী আগে মারা গেলে আমারও আপত্তি নেই ।

জয়িতা:  তোমার জীবন ও সাহিত্যচর্চার ওপর দেশে বিদেশে গবেষণা হয়।  সে সম্পর্কে কলকাতার পাঠক মহল জানতে চায় ।

মলয়: বছর দশেক আগে থেকে আরম্ভ হয়েছে । প্রথম পিএইচডি করেছিলেন বিষ্ণুচন্দ্র দে আর এমফিল করেছিলেন স্বাতী ব্যানার্জি । আমেরিকা থেকে মারিনা রেজা এসে হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে গেছেন, এখন গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা, রূপসা নামে একটি মেয়ে এমফিল করছে, প্রবোধচন্দ্র দে এম ফিল করছেন । এনারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানি । অনেকে যোগাযোগ না করেই, সন্দীপ দত্তর লাইব্রেরি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে করেছেন, যেমন সঞ্চয়িতা ভট্টাচার্য । উদয়শঙ্কর বর্মা পিএইচডি করেছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি । সুতরাং কে কোথায় গবেষণা করছেন বলা কঠিন ।

জয়িতা:  সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে নানা কাজ করেছো ।কোনো বিশেষ বিষয় নিয়ে কাজ করবার ইচ্ছে আছে ?

মলয়: আপাতত একটা উপন্যাস লেখার কথা ভাবছি । বাউল যুবক যুবতী জুটিকে নিয়ে, যারা তারুণ্যে একজন নকশাল আর একজন কংশাল ছিল । কিন্তু তাদের ঘিরে যে চরিত্ররা থাকবে সেই লোকগুলোকে গড়ে তুলতে পারছি না । এতেও যুবতীর বয়স যুবকের চেয়ে বেশি। পরস্পরকে মা-বাবা বলে ডাকে । সরসিজ বসু অনুরোধ করেছেন একটা গদ্য তৈরি করতে বর্তমান ভারতের জাতীয়তা, দেশপ্রেম, দাঙ্গা, গরুর মাংস খাওয়া, নিম্নবর্গের মানুষকে কোনঠাসা করার চেষ্টা ইত্যাদি নিয়ে । জানি না ব্যাপারটা মগজে কেলাসিত করতে পারব কিনা ।

জয়িতা :তোমাকে প্রাচীন স্পার্টান বীরের মতো মনে হয় ।এই যে নানা ঘাত প্রতিঘাত নিন্দে মন্দ সব কিছুকে অবজ্ঞাভরে কেবল কাজ করে যাওয়া ,এই জীবনিশক্তির মূলমন্ত্র কি। অনুপ্রেরণাদাতা বা দাত্রী কে ?

মলয় : হলিউড-বলিউডের ফিল্ম দেখে বলছিস বোধহয়, সিলভিস্টার স্ট্যালোনের র‌্যামবো, সালমান খানের চুলবুল পাণ্ডে, নাকি ? কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরে সাতজন ক্রিমিনালের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার পর, বন্ধুরা আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবার পর, নিন্দে-মন্দ গায়ে লাগে না, লিখেও তো কতো লোকে গালমন্দ করে, বিশেষ করে রাজসাক্ষীদের ছেড়ে যাওয়া অ্যাণ্ডা-বাচ্চারা । ওতে আমার কিসসু হয় না ।  যখন লেখা আরম্ভ করেছিলুম তখন কুলসুম আপা, নমিতা চক্রবর্তী, বাড়ির চাকর শিউনন্নি, বাবার দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর ছিল, শেষের দুজন রামচরিতমানস আর রহিম কবির দাদু থেকে কোটেশান ঝেড়ে আমাদের বকুনি দিতো , ব্যাপারগুলো ছোটোলোকের ছোতোবেলায় লিখেছি । আমার লেখালিখি নিয়ে আমার স্ত্রী আর ছেলের কোনো আগ্রহ নেই ; মেয়ের আছে, কিন্তু তার হাতে সময় একেবারে নেই । বস্তুত অনু্প্রেরণা বলে সত্যিই কি কিছু হয় ? আমার তো মনে হয় আমি নিজেই নিজের অনুপ্রেরণা।

জয়িতা : তোমার বর্তমান যাপন সম্পর্কে তোমার অনুরাগী পাঠকসমাজকে কিছু জানাও।

মলয়: আমি প্রথমে উঠি, স্ত্রী দেরিতে কেননা ওর রাতে ঘুম হয় না । ফ্রি হ্যাণ্ড এক্সারসাইজ করি । এক গেলাস গরমজল খাই যাতে পেট পরিষ্কার হয় । ব্রেকফাস্ট বানাই, ওটস । তারপর ইজিচেয়ারে কিছুক্ষণ বসে টাইমস অফ ইনডিয়া পড়ি । আমার পাড়ায় বাংলা সংবাদপত্র পাওয়া যায় না, এটা গুজরাটি ফাটকাবাজদের এলাকা, একটা ফাইনানশিয়াল টাইমস কিনে দশজন মিলে শেয়ারের ওঠানামা পড়ে । আমি কখনও শেয়ার-ফেয়ার কিনিনি, তাই কোনো উৎসাহ পাই না ওনাদের সঙ্গে গ্যাঁজাতে । হকারকে বললে চারদিনের বাংলা কাগজ তাড়া করে একদিন দিয়ে যায়। ব্যায়ামের পর চা বানাই গ্রিন টি । ততক্ষণে স্ত্রী উঠে ওটস ভাগাভাগি করে আর আপেল বা কিউই বা যে ফল হোক কাটে । আমি খেয়ে নিই । স্ত্রী এগারোটায় ব্রেকফাস্ট করে । তারপর বাজার যাই । মাছ-মাংস কেনার থাকলে ফোন করে দিলে দিয়ে যায় । ফিরে এসে এগারোটা নাগাদ কমপিউটারে বসি আর ভাবি । ফেসবুক খুলে জিমেল খুলে চোখ বুলিয়ে নিই । তারপর বই আর পত্রিকা পড়ি । একটায় স্নান, খাওয়া ঘুম । তিনটের সময়ে উঠে টিভিতে ফুটবল খেলা দেখি, ইউরোপের, ভারতের থাকলে ভারতের । সাড়ে চারটের সময়ে বিবিসি । ছয়টা থেকে আটটা কমপিউটারে লেখালিখি আর সিঙ্গল মল্ট খাওয়া । তারপর রুটি তরকারি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোবার চেষ্টা আর সেই ফাঁকে লেখার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, কেননা ঘুম আসতে দেরি হয় । ফোন বন্ধ করে দিই, যাতে কেউ ঘুমের দফারফা না করে ।

জয়িতা :আজকাল কবিতাকে দশক হিসেবে ক্যাটিগোরাইজ করা হচ্ছে ; জেলা ও বিষয় ভিত্তিক ক্যাটিগোরাইজ করা হচ্ছে । কতটা প্রাসঙ্গিক বলে তোমার মনে হয় ?

মলয়: এটা এই সময়ের ব্যাপার । সময় আপনা থেকে ঝরিয়ে দেবে যারা প্রাসঙ্গিক নয়, তাদের । প্রতিটি জেলায় কবিদের সংখ্যা তো কম নয় । হয়তো অমন সংকলন বেরোলে জানা যাবে তাদের ওপর জেলা-বিশেষের কথ্যভাষা আর ভূপ্রকৃতির প্রভাব পড়েছে কিনা । আমি নিজে তো জানি না আমি কোন জেলার । পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত এসেছিলেন যশোর থেকে কলকাতায়, তাঁর বংশধররা বেহালা-বড়িশায় ঘাটি গাড়েন । একজন শরিক ১৭০৩ সালে নদীর এপারে উত্তরপাড়ায় চলে আসেন, আমি তাঁর বংশধর । উত্তরপাড়ার জমিদার বাড়ি ভেঙে আবাসন হয়েছে, আমি আমার শেয়ার বেচে দিয়েছি । তারপর ছিলুম নাকতলায় । নাকতলার ফ্ল্যাট বেচে চলে এসেছি মুম্বাই । যে বাসা আমি একবার ছেড়েছি, সেখানে আর দ্বিতীয়বার ফিরে যাইনি । আমি একই ঘরে, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই শহরে সারাজীবন কাটাইনি ।

জয়িতা :অনুকবিতা সাহিত্যপত্র গুলির নতুন আবিষ্কার । তোমার কি মতামত ? কবিতাকে কি সম্পাদক শব্দসীমায় বেঁধে দিতে পারে? কবি অসহায় বোধ করে অনেক সময়ই ।

মলয় : এটা কবির সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে ঘটছে, অনেককে জায়গা দেয়া যায় অনুকবিতা পত্রিকায় । যে কবি অসহায় বোধ করে তার তো লেখাই উচিত নয় অমন সংকলনে । তবে চীনা আর জাপানি কবিতার প্রভাবে এজরা পাউন্ড ‘ইমেজিজম’ নামে অনুকবিতার আন্দোলন করেছিলেন । In a Station of the Metro নামে ওনার একটা দুই লাইনের কবিতা আছে, যাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুকবিতার মান্যতা দেয়া হয়েছে, কবিতাটা শোন :

The apparition of these faces in the crowd ;

Petals on a wet, black bough.
জয়িতা : তোমার আন্তর্জাতিক যোগসুত্র  বিশ্ব পরিচিতি সম্পর্কে বলো ।এখানকার পাঠকদের জানা দরকার। কোন বিদেশী সাহিত্যিকের সঙ্গে আলাপিত হয়ে মুগ্ধ হয়েছো ? কার বন্ধুত্ব নিবিড় হয়েছে । এখন বিদেশে তোমার রচনা নিয়ে বাংলা প্রেমী বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা কতটা সচেতন ?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময়ে হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, ডিক বাকেন, অ্যালেন গিন্সবার্গ, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, মার্গারেট র‌্যানডাল, ডেইজি অ্যালান, ক্যারল বার্জ, ডায়না ডি প্রিমা, কার্ল ওয়েসনার প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত ছিলুম । অ্যারেস্ট করার সময়ে পুলিস ওনাদের চিঠিপত্রের ফাইল নিয়ে চলে গিয়েছিল, আর ফেরত পাইনি । এখন মাঝে-মাঝে প্রিন্ট বা মিডিয়ার সাংবাদিকরা যোগাযোগ করেন, সাক্ষাৎকার নিয়ে যান । স্কটল্যাণ্ডের একটা সংবাদপত্রের পক্ষে নিকি সোবরাইটি নামে এক তরুণী সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন । বিবিসির পক্ষ থেকে দুবার, একবার জো হুইলার আর আরেকবার ডোমিনিক বার্ন সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন । ড্যানিয়েলা লিমোনেলার কথা আগেই বলেছি, যাঁকে আমার স্ত্রীও ভালোবেসে ফেলেছে, ড্যানিয়েলা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান বলতে পারে, হাত দিয়ে ভাত খায় আমাদের বাড়ি এলে । আমি আর নিজে থেকে কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করি না ।

জয়িতা : আমার ও তরঙ্গ পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা । এমন চিরযুবক মলয়দাকে চিরকাল পাশে চাই । ভালো থেকো ।

                                                                       30714387_990645787780298_462373548904677376_n

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান