শিউলি বসাক নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

শিউলি বসাক নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

শিউলি : সাহিত্য রচনায় এলেন কীভাবে ? 

মলয় : বইপোকা ছিলুম শৈশব থেকে । মার্কসবাদ নিয়ে পড়াশুনায় উৎসাহ দিয়েছিলেন নমিতা চক্রবর্তী, আমার স্কুলের গ্রন্হাগারিক । ওনার গালে টোল পড়ত । যাদের গালে টোল পড়ে তারা চিরকাল আমায় আকর্ষণ করেছেন । যেমন ইমলিতলা পাড়ার কুলসুম আপা, যিনি আমার সঙ্গে গালিব, ফয়েজ ও যৌনতার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । দাদা কলকাতা থেকে প্রচুর কবিতার বই আনতেন আর বাবা কিনে দিতেন ইংরেজি বই । বাড়ির কাজের লোক শিউনন্দন কাহার ‘রামচরিত মানস’ মুখস্হ বলতে পারতো ; বাবার দোকানের কর্মী রামখেলাওন সিং ডাবর বলতে পারতো রহিম, দাদু, কবির । বড়োজ্যাঠা ছিলেন পাটনা মিউজিয়ামের কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার্স । জাঠতুতো দিদিরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতেন ও গাইতেন । আমি বেহালা বাজানো শেখা আরম্ভ করি । এইরকম আবহে লেখালিখির প্রতি আগ্রহ গড়ে ওঠে ।

শিউলি : দেশি-বিদেশি কার কার লেখা পড়তেন আন্দোলন শুরুর আগে?                                                    

মলয়: আমি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়তুম । নমিতাদি আমাকে ব্রাহ্মদের বই পড়তে দিতেন, যদিও উনি বলতেন না যে লেখক ও কবিরা ব্রাহ্ম, কেননা তখনকার দিনে সাধারণ বাঙালি পরিবার ব্রাহ্মদের এড়িয়ে চলতেন । ব্রাহ্ম স্কুলের আগে ক্যাথলিক স্কুলে পড়ার ফলে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ফাদার হিলম্যান ; প্রতি বৃহস্পতিবার বাইবেল ক্লাস হতো, সংলগ্ন চার্চে । যখন দীপক মজুমদারের পরামর্শে ইতিহাসের দর্শন পড়া আরম্ভ করি তখন বিষয়টা সম্পর্কে নানা বই পড়া আরম্ভ করেছিলুম । ইতিহাসের দর্শন নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । মার্কসবাদের উত্তরাধিকার নামে একটা বই লিখেছিলুম, দাদা পাণ্ডুলিপি দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আর আমি দিয়েছিলুম ১৯০০০ টাকা । কিন্তু শক্তি তা মদ খেয়ে উড়িয়ে দেন আর বইটা ভুলভাল নোংরাভাবে প্রকাশ করেন । আমার এতো রাগ হয়েছিল যে ওনার উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে সব কপি জড়ো করে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলুম।

শিউলি : সাহিত্য আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাই বা কেন মনে করলেন সেই সময়ে?    

মলয় : হাংরি আন্দোলন নিছক সাহিত্য আন্দোল ছিল না । আমরা নানা বিষয়ে ইশতাহার প্রকাশ করেছিলুম আর সেই কারণেই আমাদের হেনস্হা করা হয়েছিল । নিছক সাহিত্য আন্দোলন করলে আমাদের ওইভাবে আক্রমণ করা হতো না । আন্দোলন আরম্ভ করেছিলুম শেয়ালদা স্টেশানে উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্কর দুর্দশা প্রতিদিন দেখার পর । দাদা পানিহাটি থেকে সিটি কলেজে যেতো । আমিও পানিহাটি গেলে শেয়ালদা দিয়েই যেতুম । এখনকার শেয়ালদা দেখে অনুমান করা যাবে না তখনকার ভয়াবহ অবস্হা । প্রতিবাদ আর সমাজকে ঢুঁ মারা জরুরি ছিল ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনকে কি দুই পর্বের ধরব ? না কি ’৬৫ তেই শেষ? ‘ক্ষুধার্ত’কে কীভাবে দেখা যেতে পারে? 

মলয় : একটাই পর্ব ধরা উচিত । দুর্ভাগ্যবশত আমি লেখা কিছুকাল বন্ধ রাখার পর শৈলেশ্বর ঘোষ ক্ষুধার্ত আরম্ভ করেছিল, কিন্তু নেতৃত্বের যোগ্যতার অভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পারেনি । এমনকি অলোক গোস্বামীরা উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করলে লোক পাঠিয়ে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল ; সুভাষ ঘোষকে লোক লাগিয়ে মারধর করেছিল যার দরুন সুভাষ ঘোষ ক্ষুধার্ত খবর নামে আলাদা পত্রিকা আরম্ভ করে । যতো পত্রিকা আছে সবই হাংরি আন্দোলনের বলে ধরা উচিত । পরাবাস্তববাদীদের ঝগড়াঝাঁটি হাংরিদের তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়েছিল, অনেকবার দল ভাগাভাগি হয়েছিল । কিন্তু পরাবাস্তব বলতে একটাই আন্দোলন বোঝায় । 

শিউলি : বাজারে যে কয়েকটি ‘ক্ষুধার্ত’ সংকলন পাওয়া যায়, সাধারণ পাঠক সেগুলিকেই হাংরি-সংকলন হিসেবে গ্রহণ করে আসছে, এই ব্যাপারে আপনার অনুভূতি ও মতামত কী ? 

মলয় : জানি । তার কারণ সামগ্রিকভাবে কেউই চেষ্টা করেননি সবাইকে একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করতে । উইকিপেডিয়ায় দেখলুম প্রচুর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে হাংরি আন্দোলনে । আমি অনেককে চিনি না । না চিনলেও আমি তাদের অন্তর্ভু্ক্ত করতে চাইবো । কেউ নিজেকে হাংরি ঘোষণা করলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এটাই ছিল আমাদের পন্হা ।

শিউলি : সাহিত্যক্ষেত্রে ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’ ব্যাপারটিকে  আপনি কীভাবে দেখেন ? 

মলয় : এসট্যাবলিশমেন্ট একটা বিমূর্ত ক্ষমতা । সেই ক্ষমতা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা নির্দিষ্ট ক্যানন চাপিয়ে দিতে চায় । আমি মনে করি সাগরময় ঘোষের কারণে বাংলা সাহিত্যে পাল্প ফিকশানের প্রবেশ । গদ্য নিয়ে যারা কাজ করতে চেয়েছে তাদের সাগরময় ঘোষ পাত্তা দেননি, যেমন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উদয়ন ঘোষকে ।

শিউলি : কবিতায় শব্দচয়ন কীভাবে করেন? ভেবেচিন্তে,  না কি স্বতস্ফূর্ত ? 

মলয় : কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নেই । মনে এলে লিখি, ফেলে রাখি, ঘষামাজা করি, তাই ভাবনা আর স্বতঃপ্রক্রিয়া দুটোই কাজ করে ।

শিউলি : শ্লীলতা ও অশ্লীলতাকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ? 

মলয় : ওই বাইনারি বিভাজন এনেছিল প্রটেস্ট্যান্ট পাদরিরা । তার আগে আমাদের অমন বিভাজন ছিল না । ওদের কারণেই আমাদের রসশাস্ত্র লোপাট হয়ে গেছে । তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে বহুকাল নিম্নবর্গ আর নিম্নবর্ণের মানুষদের দিনানুদৈনিক বুলিকে ঢুকতে দেয়া হয়নি ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনের সময় লেখালেখির পাশাপাশি আরও যে ঘটনাগুলি ঘটেছে, জুতোর বাক্স রিভিউ করতে পাঠানো ইত্যাদি ইত্যাদি; সেগুলি তখন কী মনে করে করা হয়েছিল, এখনই বা আপনি কী মনে করেন?

মলয় : ওগুলো দিয়েই তো সমাজকে ভিত থেকে নাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, বিশেষ করে মুখোশ পাঠানোর ব্যাপারটা । অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিঠি পড়লেই টের পাবে যে এলিট সম্প্রদায় কতোটা আঘাত পেয়েছিল ।

শিউলি : হাংরি আন্দোলনের সময় আপনাদের লেখালেখিকে যেভাবে দেখেছেন, এখনও সেভাবেই দেখেন কি?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময়ে সারা ভারতবর্ষকে দেখিনি যা গ্রামীণ উন্নয়ন আধিকারিকের চাকরির অভিজ্ঞতায় জেনেছি । ১৯৭০ থেকে আমার প্যানারমা বিশাল হয়ে গেছে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে ছিলুম পাটনা শহরের দলিত পাড়া ইমলিতলার ছোটোলোক বর্গের তরুণ ।

শিউলি : নতুন করে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না কখনও ? 

মলয় : আমার মনে হয় আর কোনো সাহিত্য আন্দোলন সম্ভব নয় । বহু তরুণ আমাকে অনুরোধ করেছেন নতুনভাবে আন্দোলন আরম্ভ করার । আমি সবাইকে এই একই কথা বলেছি ।

শিউলি : সমকালীন শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনকে সেই সময়ে কীভাবে দেখেছেন, এখনই বা কীভাবে দেখেন? 

মলয় : ওনারা পুরোপুরি সাহিত্যে কেন্দ্রিত ছিলেন । সমাজকে নাড়া দেবার অন্য উপায়ের কথা ভাবেননি । ওনাদের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না । প্রতিষ্ঠানের চাপানো ক্যানন ভেঙে ফেলার পথ ওনারাও পরের প্রজন্মকে দেখিয়েছেন ।

শিউলি : বাংলা সাহিত্যের ধারায় হাংরি জেনারেশনের গুরুত্ব আপনার চোখে কতখানি ? সমকালীন শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনের গুরুত্ব আপনার চোখে কতটা? 

মলয় : এখন তো হাংরি আন্দোলন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে । পেঙ্গুইন র‌্যানডাম হাউস থেকে বই বেরিয়েছে । ইনটারনেটে প্রচুর রচনা দেখতে পাই, হাংরিদের ইনটারভিউ দেখতে পাই । শ্রুতি আর শাস্ত্রবিরিধিদের তেমন উপস্হিতি নেই । আমার মনে হয় সব কয়টা আন্দোলন নিয়ে ইংরেজিতে একটা বই বের করে যদি কেউ বিশ্বের পাঠকদের সামনে নিয়ে আসেন তাহলে ভালো হয় ।

শিউলি : আপনি সাহিত্য আকাদেমি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কী মনে করে? 

মলয় : আমি কোনো পুরস্কার নিই না । যেকোনো পুরস্কার যিনি বা যাঁরা দেন তাঁর বা তাঁদের মূল্যবোধ বহন করে । তৃণমূল এসেই বাংলা অ্যাকাডেমির সদস্যদের ভাগিয়ে দিল অথচ তাঁরা সবাই জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন । কেন ? কেননা আগের সদস্যরা একটি ভিন্ন মূল্যবোধের বাহক ছিলেন ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi in conversation with Malay Roychoudhury

The Hungryalist Movement in Bengal : A Conversation with Malay Roychoudhury—-

 Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi 

Abstract

হল্যান্ডে মলয় রায়চৌধুরী

 

Malay Roychoudhury (1939) is an Indian Bengali poet, playwright, short story writer, essayist and novelist who founded the Hungryalist movement in the 1960s which changed the course of avant-garde Bengali literature and painting. 

His best-known poetry collections are Medhar Batanukul Ghungur, Jakham and Matha Ketey Pathachhi Jatno korey Rekho; and his novels Dubjaley Jetuku Proshwas and Naamgandho. He has written more than hundred books. He was given the Sahitya Academy award, the Indian government’s highest honour in the field, in 2003 for translating Dharamvir Bharati’s Hindi fiction Suraj Ka Satwan Ghora. However, he declined to accept this award and others. 

This interview has been executed by the exchange of e mails with the activist-author.

 

 

  1.   Allen Ginsberg in a BBC interview spells out his religious and sexual preferences while introducing himself. He says he is certainly a beat poet, certainly Jewish, certainly gay, certainly American practicing meditation. How would Malay Roychoudhury, who spearheaded one of the most important movements in Bengali poetry, introduce himself?

 

Malay : Ginsberg belonged to a very rich country, his father was a poet himself and quite well to do ; Ginsberg thus knew what he should leave for posterity to remember. In whichever country he went he used to send all paper cuttings, magazines etc related to him to his step-mother who used to arrange them country-wise in their basement. He made millions from the sale of these items including his books, poetry readings, photographs and records. Right from the beginning he had friends in the writing world. His friend Burroughs was very rich, Ferlinghetti was a publisher.  As far as I know after returning from India he converted to Tibetan Buddhism and after death was cremated according to Buddhist rites ; his ashes have been placed between the tombs of his parents, given to some Red Indian tribes and sprinkled on Amazon river. 

 

I come from a very poor family of twenty members living in a slum at Patna’s Imlitala locality in which the residents were all poor Mahadalits ( who were called untouchables in my childhood )and remnants from descendants of Harems of Lucknow Nawabs. My father was the only earning member and we did not have any restrictions to enter any house during playing hide and seek. My elder uncle was a menial staff at Patna Museum and I had the opportunity to visit all the rooms of the Museum for free during my holidays. None of the elders in my family had gone to school and my elder brother Samir was the first member to attend school and college. Because of Samir’s interest in literature we started getting poetry books, novels, drama, criticism books from Calcutta ( now Kolkata ) and I was introduced to literature. Not being from a literary family I have not preserved the letters written to me, the Hungryalist bulletins & magazines as well as my books. I never knew that when you meet famous writers you have to get photographed with them. In school ( Ram Mohan Roy Seminary- a non-Hindu school ) I was guided by  lady librarian Namita Chakraborty to read Brahmo Samaj writers. At Imlitala I was introduced to Faiz and Ghalib by a Shia Muslim girl ( I used to visit their house to purchase duck eggs ) who used to recite their poems which I did not understand at that time though I liked her sonorous rendition. This girl was the first who fell in love with me and I was initiated into the secrets of female body. This was the beginning of my heterosexual journey and I still remain a heterosexual. I am a Hindu in the sense that I was born in a Hindu Brahmin family — I call myself an Instinctive Hindu, I used to enjoy Holi and fireworks during Diwali. However, having been educated in a Brahmo school all these things withered away ; my parents also did not have sparable time to devote to religious activities.I am certainly Bengali and certainly Indian. In fact after visiting some foreign countries I have realized that I feel at-home only in India.

 

  1.   How did you conceive the idea of Hungryalist poetry?  How did it become so significant a poetry movement?

 

Malay : I would like to correct you that Hungryalist movement was not limited to poetry. We had novelists, dramatists and painters. Anil Karanjai was awarded Lalit Kala Academy prize for his paintings. Karuna Nidhan Mukhopadhyay drew posters and Subimal Basak sketched some drawings for Hungryalist bulletins which created uproar during Sixties. 

 

It became significant primarily because we started writing against the modern poetry and narrative style of thirties. They had discarded Nazrul Islam and Jasimuddin ; Madhusudan Dutta was also being side-lined. We said that the thirties critics thought in terms of Abrahamic single line progression whereas Brahmo Tagore, Christian Madhusudan and Muslim Jasimuddin had branched out in three different paths ; it was wrong to imagine poetry in terms of Western concepts of literature and history. The English manifestos also reached various literary centres of the World and young writers printed them in their magazines. Lawrence Ferlighetti published our poems in three issues of City Lights Journal. Dick Bakkaen published a special Hungryalist issue of his magazine Salted Feathers. Margaret Randall spread the world in Latin America, Karl Weissner in Germany, George Dowden in England, Gordon Lasslet in Australia. 

 

  1. We would like to know how the movement was conceived.  Did you prepare any manifesto? Was it Calcutta centric only?

 

Malay : Hungryalist movement was conceived at my Patna residence when Samir and Shakti came in 1961 and Debi Roy had also come to visit me. I explained to them the philosophy of Spengler and Chaucer’s line in the background of post-partition nightmare that Bengali society was facing at that time. Refugees protested almost everyday at the then Dalhousie Square, Railway stations were swarming with destitutes and we remembered Henry Louis Vivian Derozio’s radicalism. The first manifesto was published on Samir’s birthday, i.e. 1st November 1961.

 

  Most of the English manifestos were written by me. I was staying at Patna at that time and Bengali press was not available. Obviously the initial manifestoes printed at Patna were in English. I guess I wrote about ten to twelve in English. I used to pack them and send to Debi Roy who used to distribute them in Calcutta Coffee House, Universities, Newspaper offices, periodical editors etc. Since the initial manifestos were in English, we could draw attention of writers of other languages, such as Phanishwar Nath ‘Renu’, Ramdhari Singh ‘Dinkar’, S. H. Vatsayana ‘Ajneya’, Dharmavir Bharati ( whose Suraj Ka Satwan Ghora I translated in Bengali ),Nagarjuna, Kamleswar, Srikant Verma, Khushwant Singh, Umashankar Joshi, Arun Kolatkar, Mudrarakshasa, Dhumil, Sarveshwar Dayal Saxena and others. Hindi, Malayalam, Gujarati, Assamese magazines wrote about our movement and published our photos at that time. Even Nepali newspapers and magazines wrote about us ; we became friends with Nepali poets Parijat, Basu Sashi, Ramesh Sreshtha and others and had visited  Nepal in 1965 for three months on their invitation. We used to stay in a Hippie Colony in Kathmandu.

 

No, it was not Calcutta-centric. Myself and Subimal Basak came from Patna. Anil Karanjai and Karunanidhan Mukhopadhyay from Benaras, Saileswar Ghosh and Subhas Ghose from Balurghat, Pradip Chowdhuri and Arun Banik from Tripura, Aloke Goswami from Siliguri, Abani Dhar and Basudeb Dasgupta from Ashoknagar, Subo Acharya and Ramananda Chattopadhyay from Bankura, Sambhu Rakshit from Midnapur, Samiran Ghosh from Jalpaiguri.

 

  1.     Could you reach out to other cities and villages in Bengal? Any incident you would like to share with us…..

 

Malay : Yes. I have told you just now that the participants came from various places and we could reach out to the districts. Since at Calcutta most of the writers were against us, they would visit the printing presses and tell them not to print our bulletins, books and periodicals. We had to arrange with a Press at Berhampur, Murshidabad for getting them printed and we arranged to bring them to Calcutta. Manish Ghatak, whose nom-de-plume was Jubanashwa resided there and gave a helping hand to identify the press. Manish Ghatak, you might be knowing is Ritwik Ghatak’s elder brother and father of Mahasweta Devi. The press was run by Adrish Bardhan’s elder brother ; Adrish Bardhan is a known writer of detective and children’s books.

 

  1.     ‘Hungry Generation’ was not at all like Richard Huelsenbeck’s random paper knife word. You took the word from Geoffry Chaucer’s “In sowre Hungry times.” Does ‘Hunger’ in the Hungryalist movement have other connotations?

 

Malay : Yes, in later years, during and after the Court case, some of the Hungryalists tried to explain their own viewpoint. Those who became a part of the Left Front explained that Hungryalists talked of hungry people of West Bengal, hunger the refugees were suffering from. Subhas Ghose became a CPM card-holder and brought out Khudharo and Basudeb Dasgupta edited Khudharto Khabor to emphasize hunger or khudha. When I borrowed from Chaucer I was thinking of Hungry Time. TIME was more important.

 

  1.     What was Oswald Arnold Gottfried Spengler’s historiographical theory that Hungryalist movement drew upon? Were there other theorists as well who influenced your movement?

 

Malay : Every culture in the world, according to Spengler, develops like an organism. This idea was completely different from the Abrahamic linier time or progression on which Marxism is based. Spengler  conceived culture as something small, it grows, blooms and strengthens itself, produces geniuses and finally enters a stage of decline and irrevocably withers away. Spengler recognized this organic process in several cultures around the world and throughout history. We developed Hungryalism on the premise that Bengalies  will no longer produce geniuses similar to 19th Century greats of Bengal, say, like Tagore family, Bankimchandra, Vidyasagar, Ram Mohan Roy, Satyendra Nath Bose, Anil Kumar Gain, Prasanta Chandra Mahalanobis, Prafulla Chandra Ray, Debendra Mohan Bose, Jagadish Chandra Bose, Jnan Chandra Ghosh, Gopal Chandra Bhattacharya, Kishori Mohan Bandyopadhyay, Jnanendra Nath Mukherjee and Meghnad Saha and others. and will gradually face a withering socio-cultural economy swarmed by puny politicians. I don’t recollect any other theorists. However, during Left Front rule the stranglehold of CPM became so strong in the suburbs that Basudeb Dasgupta, Subhas Ghose, Saileswar Ghose, Aloke Goswami joined the Left Front. Arun Banik, who joined the CPM in Agartala was murdered by political goons.

 

  1. “I am thinking of my debauched  Sabarna Choudhury ancestors” Tell us something about your ancestors.

 

Malay : My ancestors were Gangopadhyay. Mughal Emperor Jehangir gave the title of Roy and later Akbar gave Choudhury. Lakshmikanto was the first to use the title Roychoudhury in his name instead of Gangopadhyay. Since Gangopadhyays are “savarna gotra”, the family is called Sabarna Choudhury. Like all zamindars the Sabarna Choudhurys also led a life of pleasure with several wives, mistresses  and children and squandered their wealth. They were the original zamindars of the villages which later became Calcutta.The three villages of Sutanuti, Govindapur and Kalikata were part of a khas mahal or imperial jagir or an estate belonging to the Mughal emperor himself, whose jagirdari rights were held by the Sabarna Roychoudhury family. The British settlement was surrounded by thirty-eight villages held by others. Although in 1717, the British East India Company was permitted by the Mughal emperor Farrukhsiyar to rent or acquire zamindari rights in them, it was unable to procure the land from the zamindars or local landlords. Even the Sabarna Roychoudhury family was not keen to allow the British to settle or do trading in these villages, but the British had paid a bribe at the Mughal Durbar to ensure that the deal did not fail. Just prior to their move from Hali Shahar to Barisha, the Roychoudhury family had to transfer their rights over Kalikata in 1698, to the East India Company much against their wishes and protests. The British ultimately got the ‘Right to Rent’ or lease of three villages for an annual rent of Rs. 1,300. The deed was in Persian. A copy of the deed can be seen at the Sabarna Sangrahashala at Barisha.

 After the villages were transferred to the British Sabarna Choudhurys became quite poor. They also sided with Siraj Ud Daulah instead of the British and failed to get gold crumbs from East India Company. Now there are about 30,000 Sabarna Choudhurys all over the world. A large number now belong to lower middle class ; my family was one of them. My grandfather left the clan to try in photography business in Lahore, where my Dad was born.

 

  1. Tell us about the poets you loved reading and the poets who influenced you. Were you influenced by Nicanor Parra’s Anti-poetry?

 

Malay : No, I had not heard or read Nicanor Parra in Sixties when the movement was started. Another Bengali poetry group called ‘Shruti’ drew on Anti-Poetry and Concrete Poetry. Their main poets were Paresh Mandal, Sajal Bandopadhyay, Pushkar Dasgupta etc. I read Parra in Eighties. I gave more importance to saying something and the voice saying it  rather than the look of the printed poem on a page. At Imlitala we had two workers who worked at our home and Dad’s photography shop, Sivnandan Kahar and Ramkhelawan Singh Dabur. They used to admonish us by quoting from Tulasidasa, Kabir, Rahim and Dadu– these two were important influences in my literary life.

 

I loved reading  Jibanananda Das, Shakti Chattopadhyay, Al Mahmud’s Sonali Kabin, Rimbaud’s A Season in Hell ( which I have translated in Bengali ) , Baudelaire’s The Flowers of Evil and Paris Spleen ( which I have translated in Bengali ), Sarveswar Dayal Saxena’s Khution Par Tange Log, Pablo Neruda’s Love Poems. But because of time constraint due various ailments I do not find time to read anymore. My own writing takes up a lot of time. 

 

  1. Did you suffer from any anxiety of influence?

Malay : No, I don’t. However, I get irritated because of the label Hungryalist applied to all my works. I have published more than 100 poetry collections, novels, short story collections, essay collections, drama and have translated several western poets. Unfortunately these are not discussed much by critics.

  1. While your friendship with Allen Ginsberg is widely covered we do not hear much about your meetings with Octavio Paz and Ernesto Cardenal. Can you please tell us more about your interactions with them?

Malay : Friendship with Ginsberg had been discussed because he took up my trial with several influential people in India and abroad which no other writer did in Bengal. Rather Bengali magazines wrote against our movement, which included Sunil Gangopadhyay’s Krittibas and Sagarmoy Ghosh’s Desh. Ginsberg wrote angry letters Abu Sayeed Ayyub, as he was incharge on Indian Congress for Cultural Freedom and refused to help me. 

Octavio Paz was Ambassador at that time and had come to Patna. He was staying in Governor’s house and probably knew that I would not like to visit him there. He came to my residence with a posse of policemen alongwith the District Magistrate of Patna. People in my locality thought I was again being arrested for anti-state activity. Our discussion was limited to Bengali literature and what we were trying to do. I did not correspond with him, neither did he. I was in the midst of my court ordeal at that time and could not devote much time to correspondences. 

I met Ernesto Cardenal in 1987 when he was Culture Minister of Nicaragua. He had come to Mumbai and I met him in his hotel room. He wanted to know about our movement as the news had reached Latin America because of the Spanish and Portugese little magazines there. The Spanish language version of TIME magazine had also printed the same news that appeared in the English version of TIME with our photographs. I wanted to talk about Sandinista but found him reluctant on the subject. I had two long letters from him which I have not preserved. 

 

  1. What are your views on obscenity in art?  Allen Ginsberg has been accused of it. Saadat Hasan Manto has been accused of it. James Joyce, D.H.Lawrence, Gustave Flaubert, Charles Baudelaire, Henry Miller, Arundhati Roy, and many others have faced the annoyance of the authorities. Do you think that society still digs a straw at the ancient perception that art ought to be didactic?

You have openly expressed your dissatisfaction with Ginsberg’s clicking of pictures of  Indian beggars and lepers for the western audience. Do you think that is in a way obscene?

Malay : The problem is that we started thinking about Art in terms of the Western world view, specially Christian after the Britishers introduced their own brand of curriculum in India. We forgot our Alamkarshastra, Rasashastra and the Rasas. The Adi Rasa was condemned by James Long as obscene and because of him what now is known as Battala Sahitya, has vanished. James Long castigated Rasamanjari of Bharatchandra. When Obscenity is discussed, no one talks of Kalidasa, Jayadeva, Vidyapati, Chandidasa and other ancestors. It is no longer possible to go back as we are trapped in symbols, images, sonnets etc. Charges of Obscenity are labelled by powers in the Establishment, not by common readers. All the names you have mentioned were attacked by the Establishment. Buddhadeva Basu’s Raat Bhorey Brishti and Samaresh Basu’s Bibar and Prajapati were hauled to Court on charges of obscenity. Achintya Sengupta had stated that Jibanananda Das lost his lecturer’s job at City College in 1949 on charges of obscenity in his poem Campey. Art ought to be what our ancient Indian ancestors told us ; look at Khajurao ( destroyed by foreign invaders who had a different world view ) Puri temple and  Konarak or the sculptures at Meenakshi temple. Most of the beautiful sculptures were destroyed by invaders. Now they are talking of destroying Taj Mahal as they did in case of Bamiyan Buddha.

Yes, my Dad was very angry with Ginsberg because of those photographs. Ginsberg included them in his India Journals for the consumption of Western readers. Ginsberg proved to be someone of an Orientalist. I would not call it obscene. He saw India through the eyes of a regular Westerner. 

 

  1. How do you think Hungryalists developed a voice of their own? How was it different from the previous voices in poetry? Do you think that  Bengali poetry has considerably changed due to the movement?

Malay : Definitely Bengali poetry has changed. Look at poems written before and after the Hungryalist movement. We did away with the title defining the centre of a poem. The title was now a rubric and poems did not have a centre ; the poem was spread all over the work. We introduced open-endedness, multi-exit, free forms, heterotopia, absence of only one voice in a poem, liminality, break from cannons, spread of meaning, fragmentation, level jumping, logical cracks,. Rhyzomatizm, avoidance of symbols, flux, centrifugality, complexity, micro-narratives, interlocking, hybridization etc.

  1. Do you think idealism is important in life? In art? Do you feel let down by the artists who tune their voices with the people in power from time to time?

Malay :  I would not call it idealism. I would call it opinion ; a writer should have his own opinion on society, politics, economy, culture, writing  and other walks of life. It is not a question of me being let down. I did felt strange when a few Hungryalist like Subhas Ghose became a CPM card holder, started raising their slogans on the streets of Chandannagar, hoarded CPM flags with thick wooden sticks, took up the distribution of CPM newspaper Ganashakti in his area, became an active member of their moholla committee. Similarly Saileswar Ghosh joined the Trinamul Congress at old age and felt happy to be photographed with Education Minister. A large number of writers and poets joined the ruling Establishment — what were they against when they talked about anti-establishment voice ? I consider them fallen, enticed by the Rakshasas.

  1. We know about Unmarga and Wastepaper. Tell us about other little magazines that publish and promulgate hungryalist poetry.

Malay : I edited Zebra, two issues were published. Now ( 2019 ) Avishkar Prakashani has published a combined issue of Zebra. Subimal Basak published Pratidwandi, several issues were published. A letter written by Sandipan Chattopadhyay to all his friends was published in one of the issues which angered Sunil Gangopadhyay. Debi Roy published Chinho. Pradip Chowdhuri published Phooo ; it is still being published though mostly translated works of Pradip’s French poet friends. Pradip was in France for quite sometime. Pradip was rusticated from Visva Bharati for writing a poem dedicated to one of the descendants of Rabindra Nath Tagore. Sambhu Rakshit published Blues, which he renamed Mahaprithibi which is still being published. Aloke Goswami published Concentration Camp. Raja Sarkar published Dritarashtra. A researcer named Samiran Modak is trying to gather all the Hungryalist magazines and bring out an omnibus. Most of our bulletins were one-page leaflets and we did not think of preserving them.

  1. Tell us something about Shakti Chattopadhay leaving the group.

Malay : Shakti was unemployed and lived with Samir at latter’s Chaibasa hutment for three years. During this period he fell in love with Samir’s sister in law Sheela. In fact all his love poems in Hey Prem Hey Noihshabdo was written during this period. Shakti used to spend most of his time in Samir’s in law’s house. Shakti has written a novel Kinnar Kinnari based on his love life during Chaibasa period. Since he was not employed and drunk most of the time, Sheela’s father sent her to Patna to study Master of Arts in Bengali Literature from Patna University. Shakti thought that Samir and his in laws were trying to get Sheela married to me and became very angry. Actually at that time I was in love with a girl who is the centre of the poem for which I was arrested. 

  1. Do you think poetry has the power to change society?

Malay : No. Poetry per se is not going to change the society. When it becomes a potent force for the revolting public it contributes to change. During Bangladesh’s Liberation war poets such as Jasimuddin, Al Mahmud, Samsur Rahaman, Shahid Kadri, Rafiq Azad, Nirmalendu Goon, Rudra Muhammad Shahidullah, Abul Hasan wrote inspiring poems. 

You might be knowing that in 2011 by Michael Rothenberg and Terri Carrion launched a movement called 100 Thousand Poets for change or 100TPC. But they also knew that poetry per se is not going to change the world. The concept of “Change” in the name 100 Thousand Poets for Change refers to social change, but is otherwise broadly defined and dependent on the definitions of individual organizers or poets. 100TPC events do not necessarily share political or philosophical orientation. The 100TPC  describes the “change” as having only to fall “within the guidelines of peace and sustainability. It is held in India also but I do not know about their affairs.

  1. How relevant is your brand of poetry today?

Malay : My poetry has changed over the years. Each of my collection is a turning point in terms of voice, form and breath-span. I could not develop a brand like, say, Tagore, Jibanananda, Shakti or Joy Goswami.

  1. Do you consider the Hungryalist poets as ‘angry’ and ‘fiery’ ?

Malay : When you talk about the society in your writings ‘anger’ obviously enters into a poem’s psyche. Not all Hungryalist poems are ‘angry’ and ‘firey’. Poems written by Subimal Basak and Tridib Mitra are angry. Those written by Subo Acharya and Pradip Chowdhuri are confessional. Sambhu Rakshit Has been continuously experimenting with words and sentences. Debi Roy used level jumping and logical cracks in his poems most of which are socio-political. Views against the Establishment are more sharp in stories and novels, specially those of Subimal Basak, Basudeb Dasgupta, Abani Dhar, Aloke Goswami and Subhas Ghose. 

  1. Any regrets…..

Malay : Yes, I should have brought my ailing father to Mumbai in 1987 which I did not as I thought he was happy with Samir’s family at Patna. But in his last letter he wrote that he was not at all happy and was not being treated well by Samir’s wife and children. Dad felt alone after my mother’s death. He was quite fond of my son.

  1. Would you please share with us a poem that represent you.

Malay : I would like to share the poem for which I had to face 35 months ordeal at Kolkata, without a place to sleep, have food, most of the friends having disappeared due to police action etc. The poem is ‘Stark Electric Jesus’ ( or Prachanda Boidyutik Chhutar in original Bengali )

Oh I’ll die I’ll die I’ll die

My skin is in blazing furore

I do not know what I’ll do where I’ll go oh I am sick

I’ll kick all Arts in the butt and go away Shubha

Shubha let me go and live in your cloaked melon

In the unfastened shadow of dark destroyed saffron curtain

The last anchor is leaving me after I got the other anchors lifted

I can’t resist anymore, a million glass panes are breaking in my cortex

I know, Shubha, spread out your matrix, give me peace

Each vein is carrying a stream of tears up to the heart

Brain’s contagious flints are decomposing out of eternal sickness

other why didn’t you give me birth in the form of a skeleton

I’d have gone two billion light years and kissed God’s ass

But nothing pleases me nothing sounds well

I feel nauseated with more than a single kiss

I’ve forgotten women during copulation and returned to the Muse

In to the sun-coloured bladder

I do not know what these happenings are but they are occurring within me

I’ll destroy and shatter everything

draw and elevate Shubha in to my hunger

Shubha will have to be given

Oh Malay

Kolkata seems to be a procession of wet and slippery organs today

But i do not know what I’ll do now with my own self

My power of recollection is withering away

Let me ascend alone toward death

I haven’t had to learn copulation and dying

I haven’t had to learn the responsibility of shedding the last drops

after urination

Haven’t had to learn to go and lie beside Shubha in the darkness

Have not had to learn the usage of French leather

while lying on Nandita’s bosom

Though I wanted the healthy spirit of Aleya’s

fresh China-rose matrix

Yet I submitted to the refuge of my brain’s cataclysm

I am failing to understand why I still want to live

I am thinking of my debauched Sabarna-Choudhury ancestors

I’ll have to do something different and new

Let me sleep for the last time on a bed soft as the skin of

Shubha’s bosom

I remember now the sharp-edged radiance of the moment I was born

I want to see my own death before passing away

The world had nothing to do with Malay Roychoudhury

Shubha let me sleep for a few moments in your

violent silvery uterus

Give me peace, Shubha, let me have peace

Let my sin-driven skeleton be washed anew in your seasonal bloodstream

Let me create myself in your womb with my own sperm

Would I have been like this if I had different parents?

Was Malay alias me possible from an absolutely different sperm?

Would I have been Malay in the womb of other women of my father?

Would I have made a professional gentleman of me

like my dead brother without Shubha?

Oh, answer, let somebody answer these

Shubha, ah Shubha

Let me see the earth through your cellophane hymen

Come back on the green mattress again

As cathode rays are sucked up with the warmth of a magnet’s brilliance

I remember the letter of the final decision of 1956

The surroundings of your clitoris were being embellished

with coon at that time

Fine rib-smashing roots were descending in to your bosom

Stupid relationship inflated in the bypass of senseless neglect

Aaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaah

I do not know whether I am going to die

Squandering was roaring within heart’s exhaustive impatience

I’ll disrupt and destroy

I’ll split all in to pieces for the sake of Art

There isn’t any other way out for Poetry except suicide

Shubha

Let me enter in to the immemorial incontinence of your labia majora

In to the absurdity of woeless effort

In the golden chlorophyll of the drunken heart

Why wasn’t I lost in my mother’s urethra?

Why wasn’t I driven away in my father’s urine after his self-coition?

Why wasn’t I mixed in the ovum -flux or in the phlegm?

With her eyes shut supine beneath me

I felt terribly distressed when I saw comfort seize Shubha

Women could be treacherous even after unfolding a helpless appearance

Today it seems there is nothing so treacherous as Woman & Aet

Now my ferocious heart is running towards an impossible death

Vertigoes of water are coming up to my neck from the pierced earth

I will die

Oh what are these happenings within me

I am failing to fetch out my hand and my palm

From the dried sperms on my trousers spreading wings

300000 children gliding toward the district of Shubha’s bosom

Millions of needles are now running from my blood in to Poetry

Now the smuggling of my obstinate legs are trying to plunge

Into the death-killer sex-wig entangled in the hypnotic kingdom of words

Fitting violent mirrors on each wall of the room I am observing

After letting loose a few naked Malay, his unestablished scramblings.

( Copyright : Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi )

 

 

 

 

 

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Sunflower Collective in conversation with Malay Roychoudhury

Interview with Malay Roychoudhury

 

 

নাগপুরে মলয় রায়চৌধুরী

নাগপুরে মলয় রায়চৌধুরী

 

 

 

By The Sunflower Collective 

Malay Roychoudhury is an Indian Bengali poet and novelist who founded the Hungryalist Movement in the 1960s. He was awarded a Sahitya Akademy award for translating Dharamvir Bharati’s Suraj Ka Satvan Ghoda in 2003 but he refused to accept it. He spoke to The Sunflower Collective at length about his work, Hungryalist Movement, Allen Ginsberg, other writers associated with the Movement, politics and rifts with other poets, publishers, and the establishment during the Movement. 

The Sunflower Collective: Young poets are calling themselves Hungryalists in West Bengal again, as you said in a recent interview. Jeet Thayil is making a BBC documentary on Ginsberg’s time in India for which he met you. Deborah Baker wrote a book about the same not so long ago. Internationally, several films about the Beats hit the screens in quick succession in recent years. Do you see it as a revival of the two movements that were linked willy-nilly?

Malay Roychoudhury: I don’t think so. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Basudeb Dasgupta had been editing Hungryalist magazines, Kshudharta and Kshudharta Khabor, before they died a few years back. Pradip Choudhuri is still publishing Phoo and Swakal. Rasaraj Nath and Selim Mustafa are still publishing Anarya Sahitya. Ratnamoy Dey is still publishing Hungryalist Folder. Aloke Goswami had published Concentration Camp before he concentrated on writing novels and short stories. Arunesh Ghose continued publishing Giraffe before he died a couple of years back. Since these magazines are in Bengali and they are not active on social media, you don’t hear about them. Pradip Choudhuri has done a lot of translation of Hungryalist work in French.

Prior to Jo Wheeler and Jeet Thayil, another producer, Dominic Byrne, had come and made a radio programme exclusively on our movement. Marina Reza had come from Weslyan University for research on our movement. Daniella Limonella had come from Italy for the same purpose. University of Exeter has published an interview of mine in their Exeposé online newspaper. Mrigankasekhar Ganguly has made a film based on my poem, ‘Stark Electric Jesus.’ A debate is going on for a decade, for and against this poem on a Bangladeshi news portal.

Deborah Baker neither met any Hungryalist nor consulted any written material available at Kolkata’s Little Magazine Library Research Centre. Most of the information is wrong and concocted, though she claims to read and write Bengali. This Research Centre has an exclusive section on Hungryalist periodicals, bulletins, manifesto, and books.

Students at IIT, Kharagpur, Jadavpur University, Rabindra Bharati University, Visva Bharati University, Calcutta University, and Assam University have been doing PhD and M Phil, etc. on our work for more than a decade as a matter of academic routine.

Academic interest in the Beats, especially Allen Ginsberg, continues. He had himself established a Trust to look after the interest of all the Beats and his own work with the million dollars he got from Stanford University by selling his collections. Bill Morgan, one of the Trustees, had visited me when I used to reside at Kolkata.

We, the Hungryalists, have not even been able to bring out an anthology of our work in English and Hindi, as there is no commercial interest in our work from the publishers. And none of us are well to do. Hindi being the prime Indian language, the Sahitya Academy should have evinced interest in bringing out an anthology.

TSC: Ginsberg was concerned that the Beats did not receive the amount of academic attention in America they deserved. Do you feel the same about the Hungryalists, as far as the Indian academia is concerned? In the case of the painter Karanajai, it appears even the critics abandoned him after a while leading to a very embittered existence. What are your thoughts on this?

MRC: Yes, he was worried during his lifetime that the American Establishment is not ready to award them with governmental and academic recognition. However, presently a lot of academic work is being done on the Beats due to the next generation of poets, who took an interest in them. Even if the Beats were anti-Establishment, they were typical products of the American capitalist world. Ginsberg created his trust with a huge fund to carry on his legacy. Kerouac’s manuscript roll was sold for 2.40 million dollars, enough to carry on his legacy by his Trustees for eternity. Ferlinghetti opened City Lights Bookstore on West Front in order to regularly publish the Beats. In Greenwich Village, they had Barney Rosset’s Grove Press, James Laughlin’s New Directions and the Village Voice newspaper for support. They regularly interacted with the digital companies and brought out their recitations and films, etc. They appointed secretaries to enable them to get paid invitations for poetry readings from various European and American cities.

As I told you just now, there has been continuous academic work on Hungryalist poets and writers. Sahitya Academy has awarded prizes to Utpalkumar Basu, Sandipan Chattopadhyay, Binoy Majumdar, Saileswar Ghosh, and Subimal Basak. Since I do not accept literary and cultural prizes, I had refused their award. The point is we do not get publishers like Ferlinghetti or James Laughlin in Kolkata to bring out our works and arrange for distribution. And we do not get translators who would translate and publish our works in Indian periodicals. There is still a strong lobby against us at Kolkata, though it has weakened after Sunil Gangopadhyay’s demise; nevertheless Sunil’s trained disciples are still active.

After receiving the Lalit Kala Academy prize at a young age in 1972, Anil Karanjai started sympathizing with the Naxalite Movement; his studio at Benaras was ransacked by police. To avoid the repression, he married an American lady and went to Wahington DC to live there. He was soon disillusioned with the Western world and came back a few years later after divorcing the lady. He got involved in social activities and avoided the dirty machinations that painters had started resorting to at that time. Karuna Nidhan also fled from Benaras and went to Patna, where my elder brother Samir opened a coloured fishes shop for him. When Anil returned to Delhi, Karuna joined him. Anil married Juliet Reynolds and settled at Dehradun to avoid the Delhi painters’ circus. Anti-Establishment writers and artists in that circuit are rare these days.

TSC: What are your views on Shakti Chattopadhyay leaving the movement?

MRC: Shakti Chattopadhyay testified against me because Shakti had fallen in love with Samir’s sister-in-law, Sheela, at Chaibasa. He felt that he could not marry Sheela because of Samir, who did not want her to get married to an unemployed drunkard. That Sheela was living at our Patna residence at that time for post graduate study at Patna University added fuel to Shakti’s fire.

This, along with instructions from a newspaper group which was against us, and which offered Shakti a sub-editor’s job, forced him to leave the movement. Now, after Sunil Gangopadhyay’s death, when Sunil’s letters to his friends are being published, it is found that Sunil was goading his friends to leave Hungryalist Movement, as Sunil thought that my sole motive in launching the Hungryalist Movement was to destroy his ‘Krittibas’ group. Almost all of these letters spew venom against me. In these letters, Sunil wrote that to be an anti-establishment writer, you have to join the Establishment and work from within.

TSC: Is there something akin to an anxiety of influence which informs the relationship between the two movements? In his Indian Journals, Ginsberg continues to profess adherence to the Blake vision. He mentions the harmonium but there is no indication he first learnt about it through the Hungryalists. At what point do you think he discarded the Blake vision and allowed the Indian influences to play out? Could you give some specific examples? I understand that his use of breath as a measuring unit for verse might be one?

MRC: I don’t think we were bothered about influencing each others’ movements. In an interview to LIFE magazine, Ginsberg had said that the Blake vision departed from him when he was traveling in a train while returning from India and started weeping.

When he had visited Bodhgaya, he had chanced upon a piece of stone wherein small replicas of Buddha were inscribed. He had told me that seated on two stones he was shitting, as at that time the Japanese had not developed Bodhgaya and it was almost a village. He said it was a divine direction from Buddha; thus he became interested in Buddhism and departed from mysticism. Due to archaeological restrictions, he could not carry the stone to USA. He had cleaned that stone with his tooth brush at our Patna residence.

Bill Morgan, one of Ginsberg’s trustees, who visited me, had said that there were more than fifty copies from which edited pages were included in his Indian Journals. Ginsberg was spied upon by the Indian agents and a few of his copies were picked out of his shoulder sling-bag by some of these agents to find out what he was recording. Ginsberg himself told me about it. The harmonium story might have been in one of the fifty copies.

Sunil Gangopadhyay, who was in the USA at the time of editing Indian Journals, tried his best to shut out the Hungryalist Movement from this book. Bill Morgan had told me that Ginsberg regularly mailed packets to his step-mother in New Jersey so that she could arrange the papers in the almirahs of their basement. Ginsberg had country-wise almirahs. He collected most of our manifestos and they are available in Stanford University.

TSC: In his Indian Journals, Ginsberg does not allude to your movement, although he knew about it and took a deep interest. Do you think it was deliberate? Do you think he appropriated your techniques and attitudes regarding poetry and art in general?

MRC: I think I have answered your question just now.

TSC: Ginsberg met poets in Bombay also, including Kolatkar and others. How can then it be said that he was principally influenced by the Hungryalists?

MRC: He met poets of other Indian languages for a day or two ; but he stayed in Kolkata for about two years, attended Bengali poetry readings, went to country liquor den Khalasitola, visited by Bengali poets, Sonagachhi visited by Bengali poets, and smoking joints, visited by Bengali poets.

TSC: You have criticised Ginsberg for clicking pictures of beggars while he was here. Is that part of a larger disenchantment with your old friend? Do you think at the end of the day, he was as superficial as other white tourists?

MRC: Yes, when Ferlinghetti sent me a copy of Indian Journals I felt quite ashamed. I did not show the book to my dad, who had admonished Ginsberg for taking photographs of beggars, lepers, lame men, naked sadhus, etc. I have visited other countries and never thought of making a mockery of poverty of certain people. In his Indian Journal, there is a photograph of Ginsberg himself in the guise of a beggar seated beside a beggar.

Ginsberg had several photo exhibitions in USA, which highlighted Indian beggars, lepers, destitutes, almost naked sadhus, cows on the streets, stray dogs, goats, etc. Cards to these exhibitions were sold to patrons. When he revisited India during the Bangladesh War (1971), he shot photos of refugees fleeing the war zone.

He did have the typical white tourist in him.

Probably my childhood in Imlitala slum taught me to respect the poorest man.

TSC: Could you tell us about the politics of the Hungryalists? Were there direct links back then between the Naxals and the Hungryalists?

MRC: Hungryalist Movement had started in 1961; the Naxalite Movement started in the Seventies. I have already told you about the plight of Anil Karanjai and Karuna Nidhan. My first book was on Marxism. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Aloke Goswami had joined the CPI (M) for literary gains. I was disillusioned with Marxism after I started reading about the activities of the Soviet establishment as well as the activities of the lumpens of CPI (M). Strangely CPI (M) resorted to the same murderous activities of the earlier Bengal governments. Now the new Bengal government has co-opted the same lumpens and are resorting to same murderous activities.

TSC: The Beats were criticised for their lack of gender awareness. How do the Hungryalists fare in your opinion on that count? Were there female hungry gen writers and artists? Also, did the movement display consciousness of caste issues?

MRC: Young bold women writers were rare at that time. We had one lady member, Alo Mitra, who later married Tridib Mitra. They together used to edit two Hungryalist magazines, one in Bengali, named, UNMARGA, another in English named, WASTE PAPER.

We were the first to bring lower and backward class writers and poets in literature. Prior to us, there was not a single poet to be seen on the pages of poetry magazines. Debi Roy, Subimal Basak, Abani Dhar, Rasaraj Nath belong to lower or backward class.

TSC: Tell us a little about your poetic process? What influences and inspires you? Is the process of writing poems that deal with stark reality harder than facing the wrath of audience and editors?

MRC: I was initiated into poetry in a strange way. Being a Brahmin family, at our Imlitala house we were not allowed to eat chicken eggs. I was sent to fetch duck eggs from our Shia Muslim neighbour quite frequently. I was ten. The elder girl of their house whom I called Kulsum Apa was fifteen-years-old. She used to recite Ghalib and Faiz Ahmed Faiz to me, whom I did not understand; but she explained those poems to me. She indirectly, through those poems, told me that she loves me. One day when I asked for the meat being cooked in their house because of the scent, she induced me into a sexual relation. The meat was wonderful and she licked clean my lips with her tongue. After a few days, due to painful scratches on my penis, I got scared and stopped going to Kulsum Apa’s house. However, the impact of the poems remained. I had told about this sexual relation to my grandmother, who told me to never talk about it to anyone in my life. I still miss Kulsum Apa. When I last visited Imlitala, I enquired of the family and was told that they had sold their house and left Imlitala.

My next influence was again a girl of higher class named Namita Chakroborty at the Ram Mohun Roy Seminary, who doubled up as Librarian for the Bengali section. I had a great crush on her. She initiated me into Marxism and introduced me to works of Brahmo writers and poets, including Rabindranath Tagore and Jibanananda Das. One day I had kept a chit on her table in which I had written ‘I love you’. She had preserved the chit and showed it to one of my aunts after several years, when my name started appearing in magazines and papers. Both Kulsum Apa and Namitadi had dimples.

At Imlitala house, we had two servants, Shivnanni and Ram Khelawan, who were paid in kind, that is food, dresses, and shelter. Since they were servants, they could not reprimand us children directly. Shivnanni knew Ramcharitmanas by heart. Ramkhelawan knew dohas of Kabir, Rahim, and Dadu. Both of them reprimanded through quotations and explained the lines as well. Shivnanni used to play a game called, Ramshalaka, that is a metal stick. You have to close your eyes, open a page and put the Ramshalaka on a line. Shivnanni explained how our day will pass based on the line.

Imlitala was considered a bad influence by Dad as we were exposed to free sex, toddy, cannabis, country liquor, etc. He constructed a house in Dariapur and we shifted there. My elder brother Samir was packed off to Kolkata for post-school studies. It helped me. He joined groups of poets and brought lots of poetry collections and periodicals for me. Ginsberg had come to our Dariapur residence. Prior to that Ginsberg and Orlovsky had visited Samir at Chaibasa, Singhbhum and experienced Mahua drink.

I am not bothered about editors in my life. Only when I am requested, do I send my poems and novels to them. Most of the editors are younger to me and they respect me. Yes, dealing with reality is harder. Earlier I used to maintain a bank of images, words, lines, sentences when I wrote with pen on paper, Now, because of arthritis of fingers, especially the thumb, the process has become difficult with the computer. Since I take a lot of medicines, including sleeping pills, I tend to forget these days.

TSC: What is your opinion of the current writing scene in Bangla and English in India? Are there any writers you like in particular?

MRC: I do not have much idea about what is happening in Indian Writing in English. As far as Bengali writing is concerned, lot of exciting things are happening in the little magazine world. Every year a Little Magazine Fair is held apart from the Kolkata Book Fair. Book Fairs are also held at the district headquarters. This gives us a glimpse into a wide range of creative writing.

The poets whom I have noticed recently writing in a new way are Raka Dasgupta, Sridarshini Chakraborty, Mitul Dutta, Barin Ghoshal, Dhiman Chakraborty, Anupam Mukhopadhyay and Bahata Anshumali, to name a few.

TSC: Are you concerned about the general rise of right-wing and other intolerant forces in India and elsewhere?

MRC: Yes, I am very much disturbed by the latest events taking place all over India. It appears that a worthless government run by cheaters was better than one influenced by fundamentalist criminals baying for blood of the meek and helpless. I wonder how this country had once given us Khajuraho, Puri temple, Meenakshi temple, Konarak, Ajanta, Ellora; how kings enjoyed meat and wine after the Ashwamedh Yajna.

TSC: Is Neera in Sunil’s poems and the one whose name appears in your poem, “Please Don’t tell my grandmother”, the same person? Was she real? Was she a writer/publisher who could be associated with the Generation? Is Mala in Debi Roy’s Malar Jonne real? Was she, too, a poet associated with the Generation?

MRC: Yes, she is the same Neera. Sunil Gangopadhyay never asked for a poem from me for his magazine, Krittibas. After his death, his wife Swati Gangopadhyay became the editor of Krittibas, which Sunil used to edit. Krittibas asked me to contribute a poem. I had sent this poem but they were scared to publish it in Krittibas. They did not publish it and told me to replace it. Obviously I had to decline. But the fact became known to the little magazine circle of poets and writers in Kolkata.

No, Debi Roy’s wife Mala was not a poet; she was a housewife. She died recently.

The interview was first published in The Sunflower Collective on 10/11/15 

Bio:

Malay Roy Choudhury is a Bengali poet and novelist, who founded the Hungryalist Movement that took the poetry scene in Bengal by storm in the 1960s. The Hungry Generation was a literary/art movement that Malay Roy Choudhury, along with Shakti

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Turkish writer Dolunay Aker in conversation with Malay Roychoudhury

Dolunay Aker in conversation with Malay Roychoudhury

Dolunay : Malay Roychoudhury, what are the conditions that make up the Hungry Generation?

Malay : The Hungry Generation or The Hungryalist movement was started by me and my elder brother Samir as well as poets Debi Roy and Shakti Chattopadhyay in November 1961. After India’s independence and partition of the country West Bengal, the State to which I belong was flooded with destitute refugees who did not have a place to stay and have even one meal a day. The powers-that-be of the time did not pay any heed to this gargatuan problem. We were very angry and wanted to vent our anguish and rage. I got the word ‘Hungry’ from Geoffrey Chaucer’s line “In the Sowre Hungry Time” and the word Hungry suited for our movement. We also drew from Oswald Spengler’s idea of culture as organic and spreading in various ways, not in a single line. This suited us India is a multicultural and multireligious country. After the first broadside was issued, about 40 writers, poets and artists joined us. Everybody was free to publish his own broadside or bulletin, the only condition being that those are to be distributed free at Coffee Houses, Universities, periodical and newspaper offices. As a result news about the literary movement spread quickly and reached other Indian languages in other states as well. Allen Ginsberg who had come to India collected several Hungryalist broadsides and sent them to other poets and writers in USA, UK, Latin American countries and European countries. TIME magazine of USA wrote about us and we became known in those countries. 

Dolunay :  Stark Electric Jesus poetry is a revolt against the inactivity of the world. The world spoke this poem. You have suffered in India. How did your poem deal with ordinary ideas?

Malay : Right from the start the Establishment newspapers started writing against us. There were editorials castigating our movement. Our manifesto on poetry, politics, religion etc angered the Establishment and Calcutta Police issued arrest warrants against eleven of us in September 1964, six of whom were arrested on charges of conspiracy against the State and Obscenity in literature. Ultimately only I was chargesheeted and a case was framed against my poem Stark Electric Jesus. Others were set free. I was handcuffed and with a rope tied to my waist I was made to walk the street alongwith seven criminals, a couple of whom were murderers. I was jailed for a month by the Calcutta Lower court in 1965 but exonerated by Calcutta High Court in 1967. Yes our poems were mostly protest poems during the 1960s. Samir published a collection of poems titled “Amar Vietnam”. Pradip Chowdhuri was rusticated from Vishwa Bhatari, the University established by Bengali Nobel laureate Rabindra Nath Tagore. Utpalkumar Basu was dismissed from his teaching job at Jogmaya Devi College. 

Dolunay : The Hungry Generation, became a strong reference to world poetry. You have received letters from all over the world. Allen Ginsberg, Octavio Paz, Lawrence Ferlinghetti etc. What do you with associate this united anger?

Malay : In USA City Lights Journal of Lawrence Ferlinghetti published our works in three issues ; in one of them Allen Ginsberg introduced us to American readers. Dick Bakken published special Hungry Generation issue of his magazine Salted Feathers. Carl Weissner published our works in special issue of Intrepid. Margaret Randall in Mexico wrote about us in her magazine El Corno Emplumado. Howard McCord, Professor of English at Washington State University published Stark Electric Jesus as a booklet with an introduction written by him. We all were writing against The System even during Police action as well as thereafter. 

Dolunay : Hunger: the truth of our lives. What happens if the poet breaks away from the reality of hunger?

Malay : I do not think anyone can break away from the fundamentals of Hunger. In India the reality is stark. A large number of India’s population do not get to eat everyday. I have visited hundreds of villages and encountered the plight myself. In several visits my wife accompanied me to enter villager’s hutment kitchens to find out what they were eating and how they were carrying their day to day lives. The problem remains seven decades after India’s Independence.

Dolunay : Which with reality of language, the poet moves away from conformism?

Malay : Post 1960s poets outside the Literary Establishment do not conform to academic canons and have moved far away from the rules laid down by the Academia. I do not know about Turkey, but here in Calcutta in particular and West Bengal in general about 3000 little magazines are published each year. In fact the Little Magazine Explosion started right after we started the Hungry Generation movement. Little magazine editors arrange book fairs at district towns to get out of the clutches of the Establishment. There is a Little Magazine Library and Research Centre at Calcutta wich has been collection almost all literary magazines since 1970.  Some poets are lured though with prizes, posts and money and they start eulogising the powerful people. 

Dolunay : What is the status of poetry  in India? Are the effects of the Hungry Generation going on?

Malay : The poetry scene is very much robust and active. From the annual list of poets published by a fortnightly poetry magazine, there are about 4000 poets in West Bengal alone writing in Bengali language. Similarly there are poets in other Indian languages. Poetry Readings are organised quite frequently in cities all over India. Writers and poets get arrested every now and then. Most of the members of The Hungryalist movement have expired but the subsequent generations have been carrying our voice of protest and dissent. There have been Ph D and M Phill dissertations on our movement. A film titled Baishey Shrabon portrayed the protesting Hungry Generation poet. A film has been made on my poem Stark Electric Jesus. BBC radio also produced two programmes on our movement for their Channel 3 and 4.

Dolunay : What do you think about the poet’s of activist?

Malay : The poet must be an activist. The moment you defy the established canons and the value systems you become an activist, whether you write against the System or not you are forced to be an activist by dint of being a poet. 

Dolunay : Finally, what would you say to your Turkish readers?

Malay : I would like to thank young Turkish readers for evincing interest in our movement as well as what is happening in the literary field in an underdeveloped country like India. In most of the countries poets and writers of the third world who write in their mother tongue remain neglected by the West. I would also like to translate contemporary Turkish poets and introduce them to Indian readers, specially Bengali readers. Other than a few poems Nazim Hikmet and Cemal Suraya, readers are not much aware of the Turkish poetry scene.

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

‘এবং চিলেকোঠা’-র জন্য মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মণিদীপা সেন ও চয়ন দাশ

 

প্রশ্ন : মলয় রায়চৌধুরী এবং বাংলায় হাংরি আন্দোলন একটি সর্বাধিক আলোচিত প্রসঙ্গ । একাধিকবার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই একই প্রসঙ্গে কথা বলতে আপনার ঠিক কেমন লাগে ?

মলয় : বিরক্ত আর অসহায় লাগে । মনে হয় সাক্ষাৎকার যিনি বা যাঁরা নিচ্ছেন তাঁরা আমার প্রায় আশিটা বইয়ের কোনোটাই পড়েননি । কেবল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ পড়েছেন বা বন্ধুদের মুখে শুনেছেন ।

প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনের সময়টুকু বাদ রেখে মলয় রায়চৌধুরীকে যদি জানতে হয় তাহলে তার ছবিটা কেমন ?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময়ে আমার লেখালিখির আউটপুট বেশি নয় । আন্দোলনের পরেই আমার বেশির ভাগ বই প্রকাশিত হয়েছে । সিরিয়াস পাঠক আমার এই পরবর্তী ছবিটার সঙ্গেই পরিচিত । আমার বেশ কিছু পাঠক হাংরি-পরবর্তী পর্বের বইপত্রের জেরক্স সংগ্রহ করে পড়েছেন, তাও তাঁরা জানিয়েছেন ।

প্রশ্ন : City Lights Journal 3 নিয়ে কিছু বলুন ।

মলয় : আমার মামলার সময়ে  আমেরিকার এশিয়া সোসাইটির বনি ক্রাউন আর ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড কলকাতায় এসেছিলেন । বনি ক্রাউন তরুণ বাঙালি কবিদের রচনা আমেরিকায় প্রকাশ করতে চাইছিলেন । সংগ্রহ করে তিনি সিটি লাইটস জার্নল-এর সম্পাদক কবি লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেন । হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড মকদ্দমার  সংবাদ পড়েছিলেন ; তিনি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটার অনুবাদ পুস্তিকাকারে প্রকাশ করতে চাইছিলেন, এবং ভূমিকাসহ কয়েকটা সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন । লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি কবিতাটার অনুবাদ ‘স্টার্ক ইলেকট্রিক জেশাস’ সিটি লাইটস জার্নালে প্রকাশ করতে চান, ম্যাককর্ডের ভূমিকাসহ । আমি ফেরলিংঘেট্টিকে অনুরোধ করেছিলুম যাতে অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের লেখাও তাতে অন্তর্ভুক্ত হয় ।

প্রশ্ন : Stark Electric Jesus লেখার জন্য ১৯৬৬ সালে ব্যাঙ্কশাল কোর্ট আপনার কারাবাস ঘোষণা করে । কবির চোখে কারাবাসের অভিজ্ঞতা জানতে চাইব ।

মলয় : এই ইংরেজি ভার্শানের জন্য মামলা আর দণ্ডাদেশ হয়নি । হয়েছিল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্য । জজ সাহেব কারাদণ্ড দিলেও আমাকে জেল খাটতে হয়নি । হাইকোর্টে অ্যাপিল করে আমি জিতে গিয়েছিলুম । তবে আমাকে গ্রেপ্তার করার সময়ে আর লকাপ থেকে আদালতে নিয়ে যাবার সময়ে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । অন্ধকার লকাপে আমার সঙ্গে সাতজন দাগি অপরাধী ছিল, যারা অবাক হয়েছিল শুনে যে আমি লেখালিখির জন্য গ্রেপ্তার হয়েছি ।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় কবি/লেখক যারা আপনাকে ইন্সপায়ার করেছেন ?

মলয় : ইন্সপায়ার শব্দের বদলে আমি কারা আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন তা বলতে পারি । দুজনেই তরুণী, দুজনের গালেই টোল পড়ত, আমার স্ত্রীর গালেও টোল পড়ে । একজন ইমলিতলা পাড়ার কুলসুম আপা, যিনি ফয়েজ আর গালিবের ভক্ত ছিলেন । আরেকজন আমার ব্রাহ্ম স্কুলের পার্টটাইম গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, ব্রাহ্ম লেখক আর কবিদের বই বেছে-বেছে পড়তে বলতেন, লিখতে প্ররোচিত করতেন, পরে মার্কসবাদের দিকে টেনে নিয়ে যান। এঁরা দুজন আমার প্রথম প্রেমিকা ।

প্রশ্ন : বাংলা সাহিত্যে আপনি Confessional Poetry-র  প্রবক্তা । এই স্টাইলের সম্পর্কে যদি একটু বলেন।

মলয় : প্রবক্তা বলা উচিত হবে না ; আমিই প্রথম কনফেশানাল কবিতা লেখা আরম্ভ করি । অগ্রজ কবিরা লেখার সময়ে কাব্যিক মুখোশ পরে নিতেন । কনফেশানাল কবিতাকে বলা যায় পোয়েট্রি অফ দি পার্সোনাল, কবির জীবনের চরম গোপন মুহূর্তগুলোকে সরাসরি ফাঁস করে দেওয়া, তাঁর ট্রমা, তাঁর যৌনতা, তাঁর আত্মহত্যার চিন্তা, তাঁর হেনস্হা । কনফেশানাল কবিতা লিখতে বসে কবি আর বিব্রত হন না যে পাঠক আমাকে কী ভাববে, ইত্যাদি । তাছাড়া এই কবিতাগুলোয় দ্রুতি খুবই জরুরি ।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কাছে আপনার শ্রেষ্ঠ লেখা ?

মলয় : শ্রেষ্ঠ শব্দটা ব্যবহার করতে চাই না । লিখে আনন্দ পেয়েছি, এরকম কথা বলা যায়, যা এখনও ভালোলাগে । আগে আমি ‘নখদন্ত’ বইটার কথা বলতুম । বইটাতে সব রকম জনারই প্রয়োগ করেছিলুম । এখন আমি বলি ‘নরমাংসখোরদের হালনাগাদ’ নামের নভেলার কথা । এই নভেলাটা টানা একটা বাক্যে লেখা, কোনো দাঁড়ি কমা কোলন সেমিকোলন কিচ্ছু নেই ।

প্রশ্ন : অনেকে বলেন, সারা জীবন এক সরলরেখায় হাঁটা যায় না । মানেন ?

মলয় : তাঁরা ঠিক কথাই বলেন । জীবন ভীষণ আনপ্রেডিক্টেবল ।

প্রশ্ন : একজন সাহিত্যিকের কাছে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ? প্রতিষ্ঠা না প্রতিষ্ঠান ?

মলয় : এর উত্তর দিতে পারব না । আমি তো কবি-লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত নই । আর আমি প্রতিষ্ঠানের ধার ধারি না । হাংরি আন্দোলনের পরে আমার সঙ্গে আমার লেখালিখির যে সম্পর্ক তাকে বলা যায় একাকীত্ব এনজয় করা ।

প্রশ্ন : জীবনের কোন স্মৃতি ভুলে যেতে চান ?

মলয় : হ্যাঁ । আশির দশকের প্রথম দিকে যখন মুম্বাইতে থাকতুম, তখন বাবাকে নিজেদের কাছে এনে রাখা উচিত ছিল । আমি, আমার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, কেউই বাড়িতে থাকতুম না বলে বাবাকে মুম্বাইতে আনিনি। উনি পাটনায় খুবই লোনলি ফিল করতেন, দীর্ঘ চিঠি লিখতেন, আর আমাদের বলতেন তার উত্তর দিদির বাড়ির ঠিকানায় পাঠাতে । প্রচণ্ড আফশোষ হয় । বাবা মারা যেতে আমি ন্যাড়া হইনি, দাদা হয়েছিলেন । মারা যাবার বেশ কিছুকাল পরে একদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাবার জন্য কান্না পেয়ে গেল, সামনে যে সেলুন দেখলুম সেখানে ঢুকে ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিলুম ।

প্রশ্ন : নামি অনামি বেনামি নতুন পুরোনো সব ধরণের লিটল ম্যাগাজিনেই আমরা সব সময় আপনার উপস্হিতি পেয়ে থাকি । সাম্প্রতিক এই লিটল ম্যাগাজিনের জগত এবং বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব সম্পর্কে আপনার মতামত ?

মলয় : এরা আছে বলেই তো লেখালিখি করে যেতে পারছি । নয়তো কোথায়ই বা লিখতুম ? সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরিতে গেলে দেখা যায় এমফিল আর পিএইচডি করিয়ে গবেষকরা তথ্য যোগাড় করার জন্য লিটল ম্যাগাজিন ঘেঁটে চলছেন, জেরক্স নিচ্ছেন । এ থেকেই তো বোঝা যায় এই পত্রিকাগুলোর ভূমিকা বাংলা সাহিত্যে কতো গুরুত্বপূর্ণ ।

প্রশ্ন : শূন্য দশকের কবিদের লেখা পড়েন ? নজর কাড়ে ?

মলয় : কারা-কারা শূন্য দশকের তা-ই তো জানি না । জানলে কয়েকজনের নাম বলতে পারতুম । বেশি পড়ার সুযোগ আমার হয় না, কেননা আরথ্রাইটিসের জন্য লিখতে আমার প্রচুর সময় লাগে । তবে যেটুকু পড়ি, যাদের কবিতা সাড়া জাগায়, তাদের নাম আমি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করি, ইররেসপেকটিভ অফ দশক-বিভাজন ।

প্রশ্ন : একজন ফিল্ড হকি প্লেয়ার এবং একজন লেখক-কবির ব্যক্তিগত জীবনের রসায়নটা ঠিক কেমন ?

মলয় : কম বয়সে যখন তরুণীরা আমার কাছে ঘেঁষতো, তখন আমার স্ত্রী সেসব পছন্দ করতো না । তবে সুবিধা এই যে আমার লেখালিখি সম্পর্কে আমার স্ত্রীর আগ্রহ নেই । কী লিখছি না লিখছি, কাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখছি, তা নিয়ে ওর আগ্রহ নেই । অসাধারণ রান্না করতে পারে, এককালের স্টেট-লেভেল হকি খেলোয়াড় হওয়া সত্বেও ।

প্রশ্ন : এবার খানিকটা র‌্যাপিড ফায়ার প্রশ্ন

ক ) গোটা গ্রন্হাগার না একটা কলম ?

মলয় : কলম, যদিও আমি আর কলম ধরতে পারি না, আরথ্রাইটিসের কারণে । গ্রন্হাগার নিয়ে হবেটাই বা কী ? পড়ার তো সময় হয় না । নাকতলার ফ্ল্যাট ছাড়ার সময়ে অর্ধেক বই দাদার বাড়িতে রেখে এসেছিলুম আর অর্ধেক বিলি করে দিয়েছিলুম ।

খ ) আপনার চোখে প্রেম প্ল্যাটনিক না ফিজিকাল ?

মলয় : ফিজিআল, ফিজিকাল । প্ল্যাটনিক নামে কোনো প্রেম হয় না ।

গ ) সত্যজিৎ রায় না ফেদেরিকো ফেলিনি ?

মলয় : সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালি” আর ফেদেরিকো ফেল্লিনির “ই ভিতেল্লোনি”, দুটো ফিল্মই পাটনার সিনেমাহলে প্রায় একই সময়ে দেখেছিলুম । তবে বিদেশি ফিল্ম দেখে তেমন আনন্দ পাই না, সাব টাইটেলের জন্যে, এক চোখ দিয়ে নিচের সংলাপ পড়া আর অন্য চোখ দিয়ে দৃশ্য দেখা, এটা আমার হয়ে ওঠে না ।

ঘ) ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যদি কারোর নাম বলতে হয়, কার নাম বলবেন ?

মলয় : নিঃসন্দেহে আলিয়া ভাট ।

ঙ ) বিশ্বাসী শত্রু না অবিশ্বাসী বন্ধু ?

মলয় : দুটোর কোনোটই নয় । এদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ ।

প্রশ্ন : সমগ্র আলাপচারিতার পর “এবং চিলেকোঠা” সম্পর্কে কিছু মনে হওয়া ?

মলয় : কেমন যেন মনে হলো, বেশির ভাগ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের মতন “এবং চিলেকোঠা” কর্তৃপক্ষও আমার বইপত্র বিশেষ পড়েননি, তাই বইগুলোর বিষয়, আঙ্গিক, চরিত্রগঠন, নিরীক্ষাপ্রক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন না ।

এর দ্বারা পোস্ট করা আমরা পঞ্চপাণ্ডব এই সময়ে ১১:১৪ PM কোন মন্তব্য নেই:

এটি ইমেল করুনএটি ব্লগ করুন!Twitter-এ শেয়ার করুনFacebook-এ শেয়ার করুনPinterest এ শেয়ার করুন

পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

এতে সদস্যতা: পোস্টগুলি (Atom)

The Hungryalists

Published by Penguin

Two Founding fathers of Hungry Movement

হাংরি আন্দোলনের দুই উদ্যোক্তা সমীর ও মলয়

First Hungry Bulletin was issued from this house in 1961

১৯৬১ সালে এই বাড়ি থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল

Hungry Generation Bulletin

হাংরি জেনারেশন বুলেটিন

Hungry Generation Bulletin

হাংরি জেনারেশন বুলেটিন

কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সুবোআচার্য

এতে সদস্যতা

পোস্টগুলি

সব কটি মন্তব্য

Follow by Email

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

0 28
1 20
2 18
3 78
4 60
5 30
6 45
7 20
8 20
9 33
10 28
11 45
12 43
13 25
14 23
15 38
16 45
17 20
18 20
19 40
20 43
21 38
22 40
23 23
24 40
25 20
26 63
27 43
28 65
29 8

18,164

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

Publisher : Prativas, 18A Gobinda Mandal Road, Calcutta – 700 002, India

Editor: Pranabkumar Chattopadhyay

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর আত্মসাক্ষাৎকার

এই সাক্ষাৎকারের ধারণাটি ‘দাহপত্র’ পত্রিকার সম্পাদক কমলকুমার দত্তর । তিনিই প্রস্তাব দেন যে নিজের সঙ্গে নিজে কারোর সাক্ষাৎকার নেবার নজির সম্ভবত বাংলায় নেই । মলয় রায়চৌধুরীকে তিনি প্রস্তাব দেন যে তিনি নিজের সঙ্গে নিজের একটি সাক্ষাৎকার তৈরি করুন যা তাঁর লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে । তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি সাহিত্যিক মহলে অভাবনীয় সাড়া ফেলেছিল ।কারণ এই ধরণের সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম । সে-কারণে ২০০৪ সালের কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় তিনি এটি গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেন । এখানে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হল।

প্রশ্ন: তুমি তো বহু সাহিত্য পত্রিকায় ইনটারভিউ দিয়েছ । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে দিয়েছ । বহির্বাংলার বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে দিয়েছ। পোস্টমডার্ন সাহিত্যভাবনা সম্পর্কে দিয়েছ । ইংরেজি আর হিন্দি পত্রিকায় দিয়েছ । চাকরি পাবার জন্যে, চাকরিতে পদোন্নতির জন্যে দিয়েছ । তাছাড়া তুমি স্বদেশ সেন, কার্তিক লাহিড়ি, দীপঙ্কর দত্ত আর সুবিমল বসাকের সাক্ষাৎকার নিয়েছ । যখন তুমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর ফয়জাবাদ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ডায়রেক্টর ছিলে, তখন তুমি ক্লার্ক আর অফিসার পদে কর্মী নিয়োগের ইন্টারভিউ নিতে । সাক্ষাৎকার দেবার আর নেবার বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা তোমার হয়েছে । এখন কেউ যদি তোমাকে বলেন যে তুমি নিজের একটা সাক্ষাৎকার নাও, কিংবা তুমি নিজেকে একটা ইন্টারভিউ দাও, তাহলে তোমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? তোমার মনের মধ্যে যা ঘটতে থাকবে, তা তুমি কীভাবে সামাল দেবে ?

উত্তর: বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো, যিনি বা যাঁরা সাক্ষা৭কারগুলো নিয়েছেন, তা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থন যোগাবার জন্যে নেওয়া, বিশেষ করে হাংরি আন্দোলন নিয়ে যে সাক্ষাৎকারগুলো তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা নিয়েছেন, সেগুলো । প্রায় সবই মোটিভেটেদ । সকলেই মোটামুটি একটা হাংরি ইমেজ নির্মাণ বা অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে রচিত আমার লেখাপত্র সম্পর্কে কোনোও বিশ্লেষণভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেননি তাঁরা । অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে আমার বইটই পড়ে নিজেদের প্রস্তুত করেননি । আমার ডিসকোর্সের পরিবর্তে, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা নিজেদের ডিসকোর্সকে জায়গা করে দিতে চেয়েছেন ।ম পোস্টমডার্ন ভাবনা নিয়ে যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি জানার জন্যে, এবং পাঠকদের সঙ্গে বিষয়টির পরিচয় করাবার জন্যে নিয়েছেন । সাকআৎকার কীভাবে নেয়া উচিত, তা স্পষ্ট করে দেবার জন্যেই আমি কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলুম । তবে, বহুল-প্রচারিতদের সাক্ষাৎকার আমি নিইনি, কেননা তাঁরা মিথ্যায় গড়া সাবজেক্ট-পজিশানের কারবার করেন । গ্রামীণ ব্যাঙ্ক দুটোর কর্মী নিয়োগের জন্যে ইন্টারভিউ নেবার জন্যে আমায় নিজেকে পড়াশুনা করে যোগ্য করে তুলতে হয়েছিল । এখন তুমি যেই বললে নিজেই নিজের সাক্ষাৎকার নেবার কথা, আমার মনে হল, ব্যাপারটা অ্যাবসার্ড, কেননা যে নিচ্ছে তার এবং যে দিচ্ছে তার, এই স্হিতিটা তো দুটি সাবজেক্ট পোজিশানের বাইনারি অপোজিট নয় । একাধিক সাবজেক্ট পোজিশান রয়েছে, এবং প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে, যে-অবস্হায় এক্সটেমপোর জিনিস বেরোতে পারে বলে মনে হয় না । ব্যাপারটা আমার কাছে ওই সাবজেক্ট পোজিশানগুলোর ওপনিং আপ প্রক্রয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সমস্যা হল যে, এই ওপনিং আপ তো বিশাল, তাকে তো কিছুক্ষণ বা কয়েকদিনের চিন্তা পরিসরে ছকে ফেলা যাবে না । তার ওপর, যাকে দ্বিপাক্ষিক ডিসকোর্স হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তার মধ্যে দুটি পক্ষই এমনভাবে গড়ে উঠতে পরে যে, সাক্ষাৎকারের বদলে তা হয়ে দাঁড়াবে আত্ম-বিশ্লেষণ । ফলে সাক্ষাৎকারের genreটাকে subvert করে ফেলা হবে । তার মানে, একটা formless সাহিত্য-সংরূপ চাগিয়ে উঠবে, যাকে define করা কঠিন । বিজ্ঞানী মণি ভৌমিক যাকে বলেছেন বুদ্ধিমত্তার manifest শেষাবধি সেরকম একটা আদল-আদরা পাবে ।Syncretism দিয়ে সামাল দিতে হবে, যে প্রক্রিয়ায় জীবনের সবকিছু সামাল দিচ্ছি ।

প্রশ্ন: মাঝে-মাঝে অফিসের কাজে তুমি মুম্বাই থেকে পশ্চিমবাংলায় আসতে । পঁয়ত্রিশ বছর পরে পাকাপাকি কলকাতায় থাকতে এসে তোমার মনখারাপ হয়ে গেল কেন? তোমার আত্মীয় পরিজন, সাবর্ণ চৌধুরী ক্ল্যান, বন্ধুবান্ধব, সবায়ের সঙ্গে আবার দাখাসাক্ষাৎ হল, পাণিহাটি-কোন্নোগর-উত্তরপাড়ার কৈশোরের সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে দেখা হল, তা সত্বেও তোমার মন কেন পীড়িত বোধ করতে লাগল ? মনে হল যে তোমার মস্তিষ্কের মধ্যে আবাল্য লালিত দেশের বাড়িতে তুমি ফেরোনি ?যেখানে ফিরেছ, তা অন্য ভূখণ্ড ? যাদের মাঝে ফিরেছ, তারা সম্পূর্ণ অন্য লোক ? যা লাগবে বলবেন কাব্যগ্রন্হে তুমি এই মননস্হিতি আর্টিকুলেট করলে, কিন্তু বুঝতে পারলে যে, যাদের পক্ষে ওই পাঠকৃতি প্রবেশযোগ্য ছিল, সেই আদি ভূমিজ পশ্চিমবঙ্গবাসী নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে ? এই পীড়া তো নিরাময়ের অতীত ! কী করবে তুমি?

উত্তর: আমার এই দেশাত্মবোধ এতই বিমূর্ত আর জটিল যে, অনেক সময়ে আমার মনে হয়, আমার পীড়া আমারই সৃষ্ট । এ-জিনিসটা দেখনসই বাঙালিয়ানা নয় । কিংবা এমনটাও নয় যা আমার আত্মীয়-জ্ঞাতিরা বলে থাকেন, যে, রিফিউজিরা এসে আমাদের পশ্চিমবাংলাকে ধ্বংস করে দিলে । বস্তুত অন্য শব্দ না পেয়ে আমি দেশাত্মবোধ শব্দটা প্রয়োগ করছি । পাকাপাকি ফিরে আসার পর, মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে মুম্বাইতে বা মেয়ের কাছে আহমেদাবাদে যাই, আমি বুঝতে পারি, আমি এই পীড়া নিজের সঙ্গে নিয়ে বেড়াই । জলাঞ্জলি উপন্যাসের শেষার্ধে এবং নামগন্ধ উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু বোধটা এমনই অ্যাবসট্র্যাক্ট যে অনায়ত্ত রয়ে গেল । ব্যাপারটা পারক্য, এলিয়েনেশন, একাকীত্ব, মন ভালো নেই ধাঁচের নয় । অ্যানুই নয় । একে শেয়ারও করা যায় না । আমার মনে হয় মুম্বাই থেকে মাঝে-মধ্যে পশ্চিমবাংলায় অফিসের কাজে আসার সময়ে আমি এই পীঢ়া-বোধটা পিক আপ করেছি । বাঙালির সঙ্গে বাঙালি মন খুলে কথা বলে না টের পাবার পর আমি এম আর চোওধারি হয়ে হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলতুম । মুর্শিদাবাদ-মালদা জেলায় উর্দুভাষী মুসলমানের মতন কথা বলেছি । দাড়ি রাখার সূত্রপাত এই ক্যামোফ্লেজের প্রয়োজন মেটাতে । সাহিত্যিকদের সঙ্গে পারতপক্ষে মেলামেশা করতুম না । কেউ আমায় চিনত না বলে অসুবিধা হয়নি । এলডিবির ম্যানেজিং ডায়রেক্টর প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ আমার পাশে বসে সরকারি মিটিঙেও জানতে পারেননি । আর কোনও কবি বা লেখক এই পীড়ায় আক্রান্ত কি না জানি না । এ কোনোও অসুখ নয় । একজনকে গভীর ভালোবাসতুম, অথচ এখন দেখে আর তার সঙ্গে বাস করে, বুঝতে পারছি না সে-ই কি না, অথচ তার কাছেই তো এসেছি । বাইরে না গিয়ে টানা এখানে থেকে গেলে এরকমটা হতো না হয়তো । যাঁরা সেই তখন থেকে পশ্চিমবাংলার সাথাসাথা মেটামরফোজড হয়েছেন, বা মেটামরফোসিস প্রক্রিয়াটিতে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের এই পীড়ার বোধটা জন্মায়নি । না লেখকদের, না আলোচকদের । আমার তাই সন্দেহ থেকে যায় যে আমার পাঠকৃতি আর পাঠক-আলোচকদের মাঝে ওই পীড়া একটা অনচ্ছ দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তো ? কেননা, এমনিতেই আমার পাঠকৃতির আগেই আমার ইমেজ—কালীকৃষ্ণ গুহের কাছে একরকম, অনিকেত পাত্রের কাছে একরকম, আবার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে আরেকরকম—পাঠকের কাছে পৌঁছে ভ্যারিয়েবল ইন্টারপ্রিটেশনের সম্ভাবনা গড়ে ফ্যালে, যা আসলে পাঠকের নিজের চাহিদা মেটাবার জন্যে । পাঠকৃতির উদ্দেশে নয় । সম্ভবত গ্রহণ-বর্জনের বৈভিন্ন্যের নিরন্তর টানাপোড়েনে পাঠকৃতি-বিশেষ তার নিজের পরিসর অহরহ গড়ে নিতে থাকে । তার কিনারায় গালে হাত রেখে বসে থাকা ছাড়া আমের কিছু করার নেই ।

প্রশ্ন: তুমি তোমার কবিতা অনুশীলনে ফর্ম, কনটেন্ট, মিঊজিকালিটি এসব নিয়ে প্রথম থেকেই ভেবেছ কী? এগুলো আলাদা-আলাদা ভেবেছ কী ? নাকি একটা কবিতাকে এককসমগ্র উৎসার ভেবে ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠতে দিয়েছ? প্রশ্নটা এই জন্যে করতে হল যে একটা একঘেয়ে আদল না থাকলে সেই কবির কাজগুলোর একঘেয়েমির ছাপ পাঠকের মগজে বসতে পারে না বলে পাঠক তোমার কাব্যজগত সম্পর্কে পাকাপাকি ধারণা তৈরি করার বদলে কনফিউজড হয়ে যান । রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, নজরুল, বিষ্ণু দে, সমর সেন, আলোক সরকার, যাঁর কবিতার দিকে তাকাও, দেখবে যে তাঁরা অনুশীলনের মাধ্যমে নিজস্ব একঘেয়েমি গড়ে তুলেছেন যার ছাঁচে তাঁদের যে কোনোও কাব্যিক ডিসকোর্স ঢালাই করে দিয়েছেন । অথচ তোমার প্রথম কাব্যগ্রন্হ শয়তানের মুখ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্হ জখম একেবারে আলাদা । তারপর প্রকাশিত হল মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর যার সঙ্গে সামান্যতম মিল নেই জখম কাব্যগ্রন্হের । এরপর বেরোল হাততালি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর বইটার কবিতাগুলো থেকে । তোমার সাম্প্রতিক কৌণপের লুচিমাংস পর্যন্ত এই ব্যাপারটা লক্ষ করা গেছে । সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা দখলের জন্যে প্রধান ব্যাপার হল একঘেয়েমি, যাকে ইউরোপে বলা হয়েছে কবির মৌলিক শৈলী । সর্বজনস্বীকৃত সেই পথ অগ্রাহ্য করে তুমি ভুল করে যাচ্ছ না কি ?

উত্তর: ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে আমাদের সংস্কৃত শিক্ষক বলেছিলেন, “আরে ইংরেজদের বুকে অত দম আছে নাকি যে বেদ-উপনিষদের মতন শ্লোক লিখবে বা গীতা মতন কাব্য লিখবে ? শিতের দেশের লোক, চান-টান করে না, একটুতেই দম ফুরিয়ে যায় বলে অমন কবিতা লেখে, যেন ছুটতে ছুটতে দম নিচ্ছে ।” কালিদাসের আড়াল নিয়ে তুমুল আক্রমণ করতেন টেনিসন, কীটস, শেলি প্রমুখকে । তখন অত না বুঝলেও, ব্যাপারটা আমার মাথায় থেকে গিয়েছিল । যখন কবিতা লেখা আরম্ভ করলুম, গোগ্রাস বইপোকা ছিলুম বলে, য়েশ পড়াশোনা করে ফেলতে পেরেছিলুম যাতে পয়ার ফাটিয়ে বেরোতে পারি । আমার মনে হয়, কবিতায় একঘেয়েমি বজায় রাখার জণভে একটা টিপিকাল বাল্যকালীন আত্মপরিচিতির সঙ্গীতজগত দরকার হয়, যা অগ্রজ বাঠালি কবিদের মতন আমার ছিল না । দাদারও ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি, জানোয়ার এবং আমার ভিয়েতনাম কাব্যগ্রন্হ তিনটের মধ্যে একঘেয়েমির মিল নেই, যা দাদার বন্ধু দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপধ্যায় প্রমুখের কবিতায় আছে । বিহারিপাড়ার অন্ত্যজ লোকসঙ্গীত, শিয়া মুসলমানদের গজল, নাথ, কাওয়ালি, মিশনারি স্কুলে চার্চ কয়্যার, রামমোহন রায় সেমিনারিতে ব্রাহ্মসংগীত, বাবার দোকানের কর্মী ডাবরের রহিম-দাদু-কবীর, বাড়ির কাজের লোক শিউনন্নির রামচরিতমানস, বঢ়জ্যাঠার আঙুরবালা-শু্ভলক্ষ্মী, বড়দি-ছোড়দির খেয়াল-ঠুমরি, জ্যাঠাইমার নানারকম পাঁচালিগান, সতীশকাকার চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে মন্ত্রৌচ্চারণ, এই পলিমরফাস মিউজিকালিটিতে আমার বাল্যকাল কেটেছে । এই অধম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় আমি ব্যাপারটাকে চেহারা দেবার চেষ্টা করেছি । একটা পলিসোনিক পরিমণ্ডলে বড় হওয়ায় এক কাব্যগ্রন্হ থেকে পরের গ্রন্হে পরিবর্তনটা মনে হয়েছে অপরিহার্য । তা নইলে একটা নতুন বই বের করার দরকারটাই বা কী? পাঠক নামক একজন অপরকে সামনে দাঁড় করিয়ে, নিজের কাব্য টেক্সটের দশহাজার কিলোর একঘেয়ে হাতুড়ি ঠুকে যাচ্ছি বছরের পর বছর, ওটা আমার ভাষা-প্রযুক্তির অন্তর্গত ছিল না কখনও । কবিতা পড়তে শুরু করে বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখের ভাষা-স্ট্রাকচারকে মনে হয়েছিল আউট অ্যান্ড আউট বুর্জোয়া । ভিরমি খেয়েছিলুম দাদার কাছে শুনে যে ওনারা মার্কসবাদী । তারপর তো নকশাল কবিদের দেখলুম যারা কবিতা লিখেছেন কুলাক-বাড়ির ভাষায় । আসলে সবাই ভেবেছেন কী বলছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । তাই যদি হবে, তো কবিতা লেখা কেন? অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্র্যভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব প্রমুখ বাঙালিরা তো ওসব বলে গেছেন বহুকাল আগে । বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন, “ও ওইসব কালচার-ফালচার নিয়ে থাকে ।” কথাটা আমায় স্ট্রাইক করেছিল । বঙ্গসংস্কৃতির দুটো বর্গ আছে । রবীন্দ্রনাথ থেকে শঙ্খ ঘোষ হয়ে হাল আমলের বহু কবি হলেন কালচারের মানুষ, যাঁদের কবিতায় একঘেয়েমিটা কালচার দ্বারা নির্মিত । আমি আর আমার মতন কেউ-কেউ হলেন ফালচার বর্গের মানুষ, যাঁরা একঘেয়েমি না কাটাতে পারলে পাগল হয়ে যাবেন । ফালচার বলতে আমি ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্পেসটার কথা কেবল বলছি না । আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন ব্রাহ্ম বলে । পিরিলি বাউনদের বজরা উত্তরপাড়ার গঙ্গায় ভাসলে স্নান অর্ধসমাপ্ত রেখে ঠাকুমার পাল্কি ফিরে আসত । সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ ছিল কেননা তা লোচ্চাদের তামাসবিনি । অথচ পাশাপাশি মিশনারি স্কুল আর ব্রাহ্ম স্কুলও ঘটেছে । এই ইরর‌শানালিটি দিয়ে ডিফাইন করতে হবে ফালচার ব্যাপারটাকে । নিজেরা ফালচার বর্গের হয়েও আমি আর দাদা যে লেখালিখি আরম্ভ করলুম, তার কারণ অবশ্য মামার বাড়ির উচ্চমধ্যবিত্ত কালচার । ফালচারজগৎ এবং কালচারজগতের মাঝে যোগসূত্র ছিলেন শৈশবে পিতৃহীন আমার মা । আমি তো আর কোনো কবি-লেখকের কথা জানিনা, যাঁর সাবজেক্ট পোজিশানগুলো এরকম স্পেস আর টাইমে গড়ে উঠেছে । কালচার এমনই এক বাঙালিয়ানা যে-পরিসরে কখনও তুর্কি, কখনও ইরানি, কখনও ব্রিটিশ, কখনও সোভিয়েত, কখনও মারোয়াড়ি তাপের আঁচ কাজ করে গেছে বলে তা বেশ সুশৃঙ্খল । ফালচার জায়গাটার লোকটা বাঙালি বলে তার বিশৃঙ্খলা দিয়ে বাঙালিয়ানা সংজ্ঞায়িত; কোনোও সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় সীমানা নেই । আমার ফিকশানে বহু চরিত্রের নির্গুণ বৈশিষ্ট্য এই সীমাহীনতার বোধ থেকে এসেছে । আমাদের উত্তরপাড়ার বাড়িটা শুনেছিলুম কোনও তুর্কি স্হপতির নকশা অনুযায়ী তৈরি, ইজিয়ান সমুদ্রের পূর্বপাড়ের ভিলাগুলোর আদলে; তিনশ বছর আগে বাড়ির সামনে দিয়ে গঙ্গা বইত । বাড়িটায় পঞ্চমুণ্ডের আসন ছিল; আর সেই জায়গাটায় বসে ছোটোবেলায় বেশ ফালচারি ফিল নেয়া যেত । সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রমুখের সাইকিতে এরকম প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা সম্ভব কি? এই সাবভারসিভ ফালচার? নেই, সম্ভব নয় । তাঁরা সমন্বিত চেতনার ইউনিফায়েড সেল্ফের বাইরে বেরোতে অপারগ । তান্ত্রিক নকশা-আঁকা লাল সিমেন্টের চারকোণা জায়গায় স্রেফ কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থেকে যে নানা সাবজেক্ট পোজিশান স্পষ্ট হয়, ভয়ের, অতীতের, শবের, ধর্মের, নেশার, তন্ত্র নামক অনচ্ছ ধারণার, যৌনতার, এবং এ-ধরণের পাঁচমেশালি ফালচারি পরিচিতি, তা থেকেই তো জেনে গিয়েছিলুম যে শৈলীর একঘেয়েমি চলবে না । একটা বইয়ের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা পুরোনো হয়ে গেলে পরের বইতে যেন বোঝা যায় যে দুটি কাব্যগ্রন্হের মাঝে এক বা একাধিক সাইকো-লিংগুইস্টিক রাপচার্স ঘটে গেছে । আমার সাইকো-লিংগুইস্টিক স্পেসটাও মাইগ্রান্ট, কিন্তু সে মাইগ্রান্সি দেশভাগোত্তর রিফিউজি পরিবারের কবি-লেখকদের থেকে ভিন্ন, কেননা আমার মধ্যে রিরুটিঙের উদ্বেগ ছিল না, নেই । আমার মাইগ্রান্সি বজায় আছে । রিরুটিং পাকা হতেই রিফিউজি পরিবারের কবির মাইগ্রান্সি হাপিস, এবং তাঁরা একঘেয়েমির খপ্পরে । মনে হয় যে একঘেয়েমির ছকে পড়ে গেলে আমার কবিতা লেখা ফুরিয়ে যাবে । কবিতা লেখা বেশ কমে এসেছে । পত্রিকাগুলো চায়, কিন্তু ছকের মধ্যে থেকে যাচ্ছে বলে বাতিল করে দিতে হচ্ছে । একইরকম কবিতা অনেকে হুহু করে দিনের পর দিন কীভাবে লিখে যান, কে জানে! অধিকাংশ বিদ্যায়তনিক আলোচক এখনও ইউরোপে উনিশ শতকে শেখানো লেখককেন্দ্রিক আলোচনাপদ্ধতিতে আটক, আর কেবল সময় সময় সময় সময় বকে যান । আলোচনা যে পাঠবস্তুকেন্দ্রিক হওয়া উচিত, স্পেস স্পেস স্পেসের ভাবনা ভাবা দরকার, তা এখনও খেয়াল করে উঠতে পারেননি আলোচকরা । এখনও তাঁরা ইউরোপীয় অধিবিদ্যার মননবিশ্বের কারাগারে নিজেরা নিজেদের পায়ে বেড়ি হাতে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছেন ।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতা , এই দুটি ধারায় তুমি গ্রেপ্তার হয়েছিলে । তোমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেপ্টেম্বর ১৯৬৪তে । তোমাকে চার্জশিট দেয়া হল আর তোমার বিরুদ্ধে মকদ্দমা আরম্ভ হল মে ১৯৬৫তে । এই নয় মাস কলকাতার মিডিয়া আর কফিহাউস-বুদ্ধিজীবিরা অবিরাম প্রচার চালিয়েছিলেন যে তোমার বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা পোরনোপুস্তক লেখার অভিযোগ উঠেছে । তুমি যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সে খবর মিডিয়া বেমালুম চেপে গিয়েছিল ওই নয় মাস । বিদ্ধদেব বসু এবং সমরেশ বসুর বিরুদ্ধে যে মকদ্দমা হয়েছিল, ওনাদের বিরুদ্ধে কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল না । তোমার বিরুদ্ধে সিরিয়াস অভিযোগ ছিল বলে তোমাকে আর তোমার দাদাকে জেরা করেছিল একটা ইনভেস্টিগেটিং বোর্ড যাতে সদস্য ছিলেন পুলিস, সেনা, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপতরের উচ্চপদস্হ আধিকারিকরা । মামলা রুজু হতে তুমি দেখলে যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নেয়া হয়েছে, এবং চার্জশিট দেওয়া হয়েছে অশ্লীল কবিতা লেখার ধারায় । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নায়া হয়েছে দেখে তোমার মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল কেন? এ-রাষ্ট্র তো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সরকার নয় যে তুমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা করে গর্ববোধ করবে ? তোমার নিজেরই স্বদেশী উত্তরঔপনিবেশিক সরকার ! তোমার তো ভারমুক্ত বোধ করা উচিত ছিল । পরিবর্তে তুমি বিষণ্ণ হলে ?

উত্তর: স্বাধীনতা লাভের পর একজন কবির বিরুদ্ধে প্রথম রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলা হল । সারা ভারতবর্ষে প্রথম । কেবল কবিতা বা গল্প নিয়ে নয়, আমি রাজনীতি আর ধর্ম নিয়েও ম্যানিফেস্টো বের করেছিলুম, যা কোনও বাঙালি কবি তার আগে করেননি । ফলে রাষ্ট্রের টনক নড়ে গেল । রাষ্ট্র তো একটা অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম, যেটা চালায় একদল লোক । সেই লোকগুলো, যারা যখন মসনদে বসে, নিজেদের রাষ্ট্র বলে মনে করে । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলতে প্রখৃত পক্ষে বোঝায় মসনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র । যারা মসনদে বসে, তারা সবসময়ে পায়া টলে যাবার আতঙ্কে ভোগে । মসনদ বিরোধিতাই হল এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতা । আমি তো স্বঘোষিত এসটাবলিশমেন্ট বিরোধী । অভিযোগটা ছিল তার স্বীকৃতি । তাই মন খারাপ লেগেছিল । আসলে আঘাতটা যাঁদের দিয়েছিলুম, সেই সব মন্ত্রী, প্রশাসনিক আমলা আর পুলিসের কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, অভোযোগের প্রমাণ যখন আদালতে পেশ হবে, তখন সাধারণ মানুষ তাঁদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে । মসনদের কেদারায় আসীন লোকগুলোর মগজে আমি অস্হিরতার বোধ চালান করে দিয়েছিলুম, তাঁদের আত্ম্ভরী ক্ষমতায় ঘা মেরে, মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রী, মুখ্য ও অন্যান্য সচিব, জেলাশাসক, পুলিশের কমিশনার ও আই জি, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও বুদ্ধিজীবীদের কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে, রাক্ষস-অসুর-জানোয়ার-জোকার-মিকিমাউসের মুখোশ পাঠিয়ে, যার ওপর ছাপিয়েছিলুম একটি বার্তা: দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন । প্রশাসনের ক্রুদ্ধ নি-জার্ক প্রতিক্রিয়ার কথা পুলিশ কমিশনার নিজে আমাকে আর দাদাকে বলেছিলেন । এখন তো বিরোধীপক্ষের লোকেরা প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে বলছে মুখৌটা বা মুখৌশধারী, বলছে মুখোশ খুলে ফেলুন । অনেকে তখন হ্যা হ্যা হি হি করেছিলেন, কেননা তাঁরা টের পাননি যে এসটাবলিশমেন্টের দাঁতকে শক্ত আর নখকে তারাল করে রেখে গেছে ইংরেজরা । তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন যখন নকশালর আন্দোলনে অংশ নেয়ায় অত্যাচারিত হলেন ও গুমখুন হলেন কবি ও লেখকরা । আরও বেশি করে টের পেলেন এমার্জেন্সির সময়ে যখন পচা আলুর চটের বস্তার মতন জেলের ভেতর নিক্ষিপ্ত হলেন লেখক ও সাংবাদিকরা, আর অশিক্ষিত লোকেদের দ্বারা প্রকাশিতব্য পাঠবস্তু অনুমোদন করাতে হল, কারা গারে দাগি আসামির মতন দাড়ি বাড়াতে হল গৌরকিশোর ঘোষকে, পালাতে গিয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলেন জ্যোতির্ময় দত্ত।মুখোশধারী অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেম যে একই আছে, তা অভিজিৎ সিংহের আত্মহত্যায় আবার প্রমাণিত হল চল্লিশ বছর পর । তাত্বিক বিপ্লব আজকের দিনে বুদ্ধিবৃত্তির ভাঁোতামাত্র জেনেও, অ্যাবসট্র্যাক্ট সিস্টেমের নি-জার্ক প্রতিক্রিয়া যে একই আছে, তা টের পাওয়া যায় মসনদের আতঙ্কবোধ থেকে, যখন তা কচি কচি ছেলেমেয়েদের এসটাবলিশমেন্ট বিরোধিতাকে ভয় পেয়ে মাঝরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে নখদন্ত দেখায় । পচনের এই প্রক্রিয়াকে আমি কিছিটা ধরার চেষ্টা করেছি নখদন্ত সাতকাহনে । বাঙালদের যে নেতারা ১৯৫০ সালে সংবিধান পুড়িয়েছিল, আজ তাদের কুর্সি নড়বড় করছে মনে হলেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ধুয়ো তোলে । নবদ্বীপের গাণ্ডীব পত্রিকায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কনসেপ্টটাকে রিডিকিউল করে টুসকি অবিনির্মাণ শিরোনাঞে একটা পোস্টমডার্ন ছোটগল্প লিখেছি ।

প্রশ্ন: তোমার প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতার বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনের সময়ে অশ্লীলতার আরোপে মামলা হয়েছিল । সাহিত্যে অশ্লীলতা তখন নেতিবাচক ছিল । তোমার লেখালিখিতে অত্যধিক যৌনতা থাকার অভিযোগও উঠেছে । তোমার লেখালিখির জন্যেই তো হাংরি আন্দোলনকে অনেকে বলতেন যৌন ক্ষুধার আন্দোলন । তোমার নান্দনিক অবস্হান আর নৈতিকতা নিয়ে এরকম নেতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও তুমি মনে-মনে আনন্দ পেয়েছ । সমাজকর্তারা, সাহিত্যবেত্তারা, তোমার পাঠকৃতিকে অশ্লীল বললেন, যৌনতার বাড়াবাড়ি বললেন, ইমমরাল বললেন, অথচ গোপনে-গোপনে সে-কারণে তুমি গর্ববোধ করলে ! এটা পারভার্সান ছাড়া কী?

উত্তর: ব্রাহ্ম স্কুলে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল পাঠ্য ছিল । বাংলার শিক্ষক অধিকারীবাবু একদিন সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে জানিয়েছিলেন, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর-এর কোন অংশগুলোকে বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ, জেমস লঙ প্রমুখ অশ্লীল ঘোষণা করেছেন । উনি ভারতচন্দ্রকে ডিফেন্ড করে ব্রাহ্ম এলিটিজমকে আক্রমণ করেন, যা প্রধানশিক্ষকের কানে পৌঁছোলে অধিকারীবাবুকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল । আমি ভারতচন্দ্রের পক্ষে চলে গিয়েছিলুম অন্নদামঙ্গল-এর তৃতীয় অংশ মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান পড়ার সময়ে, কেননা আমার পূর্বজ লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী ছিলেন প্রতাপাদিত্যের প্রধান অমাত্য । আমার লেখায় যৌনতা আরোপিত নয় । কিন্তু অশ্লীলতা-যৌনতার অভিযোগে আমি ভারতচন্দ্রের ডিসকোর্সের পরিসরটা, যা এখন বুঝতে পারি প্রাগাধুনিক-প্রাকঔপনিবেশিক বলে, রিগেইন করে নিতে পেরেছিলুম । ভারতচন্দ্র-এর রচনায় যৌনতাকে আক্রমণের সূচনা করেছিল ব্রিটিশ অধ্যাপকরা । আর সাবর্ণ চৌধুরীরা গরিব হয়ে গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সাম্রাজ্যবাদী ধাক্কায়, যখন ওরা কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর নিয়ে নিল । আমার মধ্যে, অভিযোগগুলো শুনে, বদলা নেবার গোপন গর্ববোধ চাগিয়েছিল । পার্ভারসান যে মনে হয় না, তারও কারণ আছে । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কিপার অব পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার ছিলেন । পরীক্ষা-পরবর্তী স্কুলছুটিতে ওনার সাইকেলের কেরিয়ারে বসে প্রায়ই পাটনা মিউজিয়ামে যেতুম। স্কাল্পচার বিভাগে নানা ঢঙের নগ্ন-ন্গিকা অবাধে দেখে বেড়াতুম । দেখতুম যে পুরুষরা খাঁজকাটা যোনি বা স্তনের বোঁটায় টুক করে হাত দিয়ে নিচ্ছে বা ঠোঁট ঠেকাচ্ছে । মেয়েরা একই ব্যাপার করছে গ্রিক পুরুষের লিঙ্গ নিয়ে । হাত ঠেকিয়ে, চুমু খেয়ে সেসব অংশগুলোকে একেবারে চকচকে করেদিয়েছিল দর্শনার্থীরা । এখন মিউজিয়ামে নানা নিষেরধ হয়েছে যা তখন ছিল না । আমি প্রতাপাদিত্যের চেয়ে প্রাচীন সময়ে চলে যেতুম, যখন মেগাসথিনিস কয়েক হাজার গ্রিক তরুণী এনে পাটনায় তখনকার ক্ষমতাসীনদের বিলিয়েছিলেন, কিংবা যখন গ্রিক সম্রাট মিনান্ডার পাটনা শহরে আগুন ধরিয়ে লন্ডভন্ড করার পর অনুতপ্ত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । অতীতের সঙ্গে আমার যা যোগসূত্র, আমি জানতুম, জানি, অভোযোগকারীদের সেরকম যোগসূত্র নেই । আমার কাছে তারা সদ্যভূমিষ্ঠ । মিউজিয়ামে বড়জ্যাঠার অফিসঘরে একাধিক নিউড পেইনটিং ছিল, যার একটা আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর আঁকা । ঠাকুর্দা ছবি আঁকা আর ফোটো তোলা শিখেছিলেন লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটর জন লকউড কিপলিঙের কাছে । ইনি সম্ভবত রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা, যাঁর সুপারিশে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতা মিউজিয়ামে সহকারী কিউরেটর হয়েছিলেন । ঠাকুর্দার আঙকা নিউডটা সম্পর্কে বড়জ্যাঠার গর্ববোধ ছিল । প্রত্যেক সদ্য-পরিচিতকে বলতেন ছবিটা ওনার বাবার আঙকা । ফলে আমার একটা ঐতিহাসিক সাপোর্ট সিস্টেম রয়েছে । হাংরি মকদ্দমার সময়ে বড়জ্যাঠা-বাবা-কাকারা আমায় টোটাল সাপোর্ট দিয়েছিলেন । বাবা তো পাটনা থেকে আদালতে এসেওছিলেন হিয়ারিঙের সময়ে বারকয়েক । আহিরিটোলা থেকে পিসেমশায়ও আসতেন ।

প্রশ্ন: তুমি তো রান্নাবান্না কর । সাধারণ বাঙালি রান্না রাঁধতে জান । অধিকাংশ কবি-লেখক যখন রান্না করা, বাসন মাজা, ঝুল ঝাড়া ইত্যাদি কাজকে অবমাননাকর মনে করেন, তখন তুমি রান্না-বান্নার কথা খোলাখুলি বলো কোন সাহসে? তাও আবার সংবাদপত্রের শৌখিন রান্না নয়, রোজকার রান্না । বিশুদ্ধ শিল্প, উত্তরণ, নান্দনিক বোধ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে রান্নাবাড়ি ব্যাপারটা কি স্ববিরোধী নয় ? একদিন তুমি যখন ফ্যান গালছিলে, তখন মাঝি পত্রিকার সম্পাদক টেলিফোনে সেকথা শুনে স্তম্ভিত হয়েছিলেন, বিশ্বাস করতে পারেননি । নখদন্ত সাতকাহনের প্রতি পৃষ্ঠায় তোমার রান্নার রেফারেন্স আছে । ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস উপন্যাসে বিসদৃশ মেনু আছে । জলাঞ্জলি উপন্যাসে সেক্সুয়াল অ্যাক্ট বর্ণনা করেছ রান্না প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আর তদ্বারা আক্রমণ করেছ সংবাদপত্রের শ্রখিন রন্ধনকর্মকে । নামগন্ধ উপন্যাসে রান্নাবান্নায় লুকিয়ে থাকা শ্রেণি বিভাজন অন্তত দুবার তুমি স্পষ্ট করেছ । তোমার কবিতাতেও রান্না বা কুইজিনের প্রসঙ্গ থাকে । তোমার আলোচকরা কেউই এই ব্যাপারটা ধরতে পারেননি দেখে তোমার অবাক লাগেনি? রান্না করতে শিখলে কোথায় ?

উত্তর: ইমলিতলায় হিন্দু-মুসলমান সবায়ের হেঁসেলে ঢোকার অবাধ অধিকার ছিল । রান্নাবাড়ির সাংস্কৃতিক পাথফক্যের ব্যাপারটা মগজে স্হান করে নিতে পেরেছিল । কুড়িজনের পরিবারে রান্নাঘরের ইনচার্জ ছিলেন মা। বাবা আর ছোটকাকা বিশুদ্ধ শাকাহারি ছিলেন । ইমলিতলার বাড়িতে কেবল পাঁঠার মাংস, হাঁসের ডিম, আঁশযুক্ত মাছ অনুমোদিত ছিল । প্রতি রবিবার ও ছুটির দিন বড়জ্যাঠা রাঁধতেন ওনার সাবর্ণ চৌধুরী স্পেশাল, যার তিনটে আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে । বাদাম কিসমিস খোয়াসহ যাবতীয় আনাজ দিয়ে সোনামুগ-আতপচালের মিষ্টি ভুনি খিচুড়ি; ঘিয়ে ভাজা তেতো-বর্জিত আনাজ দুধে সেদ্ধ করে ফোড়ন-তেজপাতার ওপর নারকোল কুরো দেয়া মিষ্টি শুক্তো; এবং বাঁধাকপি-ফুলকপি আলুতে ভেটকিটুকরো গরম মশলা দিয়ে মাখোমাখো তরকারি । ইমপ্রেশানিস্টিক মাইন্ড বলতে যা বোঝায়, তাতে এই পুরো সিনারিওটার ছাপ পড়েছে, যেটা ধরার কিছুটা চেষ্টা করেছি এই অথম ওই অধম উপন্যাসে আর ছোটোলোকের ছোটোবেলা স্মৃতিকথায় । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকতে গিয়ে যখন নিষেধ ভাঙার, সীমালঙ্ঘনের, যথেচ্ছাচারের পর্ব শুরু হল, তখন সহপাঠী তরুণ-বারীন-সুবর্ণর সঙ্গে যা ইচ্ছে খাওয়া আর রাঁধার স্বাধীনতা পেয়ে গেলুম । প্রতিবেশি এক মুসলমান চুড়িওয়ালা অনেক পদ রাঁধতে শিখিয়েছিল । আমার স্ত্রী বাড়িতে মারাঠি পদগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে । লখনউতে দেড় বছর তেলেগু আবদুল করিম, পাঞ্জাবি মদন মোহন, কর্ণাটকি শেট্টিখেড়ে প্রভাকরা আর কোংকনিয় কুরকুটে একটা ফ্ল্যাটে ফোর্সড ব্যাচেলর হয়ে নিজেরা পালা করে রাঁধতুম । রান্না ব্যাপারটা যে যৌথজীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ, এবং আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জলবিভাজক, তা পিক আপ করেছি অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তরে । বাঙালি লেখক-শিল্পীরা রান্নাকে ডিসকোর্স হিসেবে নেন না সম্ভবত উনিশ শতকের প্রধান পুরুষদের যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার ফলে। তার ওপর শ্বেতাঙ্গ পিতৃতন্ত্রের যে আদল-আদরা ইংরেজরা আমাদের সাহিত্যে চাপিয়ে গেছে, তাকে ডিকলোনাইজ করার জন্যে আমার মনে হয়েছে রান্নাবান্নার ব্যাপারটা একটা প্রধান হাতিয়ার। দাদা অবশ্য আমার চে্যে ভাল আটপৌরে রান্না জানে, আর বাবার কাছে শাকসব্জি আনাজপাতির আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ শেখার ফলে রান্নাবাড়ির বাঙালিয়ানা ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে। ইমলিতলার রান্নাঘরে কোনবারে আর কোন তিথিতে কী-কী খেতে নেই, তার তালিকা থাকত, আগের বছরের পাঁজির ছেঁড়া পাতা । রান্না ব্যাপারটায় জীবনের সবকিছুই তো আছে ইনক্লুডিং সেক্স । আলোচকদের চোখে পড়েনি তার কারণ তাঁরা কেবল খাবার মধ্যে আটক, তার আগের পর্বের কর্মকান্ডেই যে তাঁদের সমাজটির নিবাস, তা অনুভব করেননি । বুদ্ধিজীবী যদি মাল্টিডিসিপ্লিনারি না হয়, তাহলে সাহিত্যের পুরো এলাকাটা খণ্ডিত করে ফ্যালে ।

প্রশ্ন: পোখরানে আনবিক বোমা ফাটাবার পর অনেক প্রতিবাদ হল, কবিতা লেখালিখি হল, গলা-কাঁপানো বক্তৃতা হল । এবারেই বেশি হল । প্রথমবার যখন ফাটানো হয়েছিল, তখন এতটা চেঁচামেচি হবনি । তুমি কেন আর সবায়ের মতন এর বিরুদ্ধে পদ্য বা গদ্য লিখলে না? ক্যাসেট বের করলে না? প্রথমবারও করোনি । এবারও করোনি। তুমি কি প্রসঙ্গটা থেকে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখছ?

উত্তর: তলিয়ে না দেখে কোনও কিছু ঘতলেই যারা গদ্য-পদ্য-গান-আঁকার মাধ্যমে একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাঁরা ইনটেলেকচুয়াল বাফুন । ভারতের আণবিক বোমা তৈরি নিয়ে আমেরিকান, পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ গবেষক এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লেখা বেশ কিছু বই আছে । প্রতিটিতেই বলা হয়েছেযে, ভারতীয় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের অগোচরে, হোমি ভাবার সময় থেকে, বিজ্ঞানীদের একটা ছোট গোষ্ঠী আণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে নিজেদের জাহির করা । বাজেট বরাদ্দের দাবি ফি-বছর বাড়তে থাকায় পোলিটিকাল এসট্যাবলিশমেন্টের সন্দেহ হতে তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানায় । কেননা বিভাগটা তাঁর অধীনে । প্রতিরক্ষমন্ত্রী ও সেনা জানত না । ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে তরিৎকর্মা বিজ্ঞানীরা তাঁকে নানা তর্কে রাজি করিয়ে ভূগর্ভে বিস্ফোরণ ঘটাল । বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখে বিজ্ঞানীদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা । সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে পড়ায়, চিন নিউট্রন বোমা তৈরি করে ফেলায়, এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে, বিজেপি দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটায় । মানবিকতার দৃষ্টিতে আণবিক বোমার তুলনায় ঘৃণ্য আবিষ্কার দ্বিতীয়টি নেই । কিন্তু রিয়াল পলিটিক ভিন্ন কথা বলে । বাঙালি রাজনীতিকরা ছেঁদো দলাদলির সময়ে রিয়াল পলিটিক করেন, অথচ বিশ্বের ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে বিমূর্ত মানবতাবাদ ফলান । বুশ-ব্লেয়ার মাস্তানি ফলিয়ে যেভাবে ইরাকে যুদ্ধ করতে ঢুকে পড়ল, সাদ্দাম হুসেন চৌসেস্কুর মতন একজন নৃশংস অত্যাচারী তিলে খচ্চর একনায়ক মেনে নিয়েও বলতে হয়, যে, ইরাকের কাছে আত্মরক্ষার অস্ত্র থাকা প্রয়োজন ছিল । ইউ এন ইন্সপেক্টর-ফেক্টর সব ফালতু । বুশ আর তার কুবের বন্ধুরা ইরাক আক্রমণ আর দখলের ছক বহু আগে করে রেখেছিল, এমনকী কে কী পাবে সেটাও । হয়ত কখনও ইরাক দখল করবে ভেবে ওদের আণবিক পরিকাঠামোটাও বোমা ফেলে বহুকাল আগে ওড়ানো হয়েছিল । ভারত আগে থাকতে মিসাইল প্রযুক্তিতে উন্নতি করে তারপর বোমা ফাটিয়ে অন্তত এটুকু হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখতে পেরেছে যে, তার কিছু হলে অন্তত এক হাত দেখে নেবে । চিন যেমন নিউট্রন বোমা বানিয়ে ফেলেছে, ভারতেরও তা তাড়াতাড়ি করে ফেলা দরকার । জেন-এর মিলিটারি ম্যাগাজিন অনুযায়ী, আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিটি দেশের মিসাইল কলকাতার দিকে তাক করা আছে, কেননা একটিমাত্র চোটে সবচেয়ে বেশি নাগরিকে এখানে যেভাবে ছাই করা যাবে, তা অন্য শহরে সম্ভব নয় । ইরাক যুদ্ধের ফলে বহু দেশ এবার গোপনে মারণাস্ত্রের ভাঁড়ার গড়বে, সম্ভবত একজন বয়ে নিয়ে যেতে পারে এমন গণবিদ্ধংসী অস্ত্র । পদ্য-যোগাড়েরা তাদের হেড মিস্ত্রিদের যুগিয়ে যাবে গলা-কাঁপানো পদ্য । আমেরিকার বিশ্ববাজার আছে, তো পদ্য যোগাড়েদের আছে বুকনিবাজার । সম্প্রতি টিভিতে দেখলুম তথাকথিত নকশালপন্হী একদল পাঁচফুটিয়া ছেলেমেয়ে শেক্সপিয়ার সরণিতে একটা দোকানে এই অজুহাতে ভাঙচুর করল যে তারা মার্কিনী জুতো বিক্রি করে । একটি মেয়ে জিন্সের টপ আর টাইটবটম পরে ভাঙচুর করছিল । অর্থাৎ সে নিজেই মার্কিনী পোশাকে ছিল । অর্থনীতি সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই ছেলেমেয়েগুলোর । দোকানটা মারোয়াড়ির, টাকা তার, জুতোগুলো ভারতীয় শ্রমিকরা বানায় । ওসব না করে ওদের উচিত ছিল ফিদাইন হয়ে ইরাকে লড়তে যাওয়া । ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা লড়তে গিয়েছিল । যে নেতার কাজ অপছন্দ হতো, তিনি যে দেশেরই হোন, অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁদের যাচ্ছেতাই চিঠি লিখত ।

প্রশ্ন: তোমার জন্মের এক মাস আগে জার্মানি আর সোভিয়েত রাশিয়া পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল । সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল সেই যুদ্ধে, দু কোটি কেবল সোভিয়েত রাশিয়ার । তুমি যখন ক্যাথলিক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছ, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল যার ফলে তিন লক্ষ মানুষ মারা যান । তোমার যখন এক বছর বয়স, তখন ছাব্বিশ হাজার মানুষকে পোল্যান্ডের কাতি জঙ্গলে স্তালিনের নির্দেশে খুন করা হয়েছিল । ষাট লক্ষ ইহুদিকে বিষাক্ত গ্যাসে আর ইনসিনেটারে পুড়িয়ে মেরেছিলেন হিটলার । কত লক্ষ বিরোধী-নামাঙ্কিত মানুষকে স্তালিন, কাম্পুচিয়ার পল পট, জানারাল পিনোশে, ইদি আমিন, সুহার্তো, ট্রজিলিও, মোল্লা ওমর, দুভালিয়ের, টিক্কা খান, বিদেশের মাটিতে বাবা বুশ ছেলে বুশ মেরে ফেলেছেন । তোমার জীবদ্দশায় লক্ষ-লক্ষ মানুষকে একযোগে মেরে ফেলার জন্যে অ্যানথ্রাক্স, স্মল পক্স, বটুলিনাম, রাইসেন, টুলারেনসিস, নিউমোনিক প্লেগ, মাস্টার্ড গ্যাস, সারিন গ্যাস ইত্যাদি মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও প্রয়োগ হয়েছে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনোও না কোনোও আদশফের নামে গণহত্যাগুলোকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে । সারাটা জীবন অমন দূষণের ভেতরে বাস করে তুমি নিজেও কি দূষিত হয়ে যাওনি? তোমার কি সন্দেহ হয়না যে অমন দূষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাটাই বরং অপরাধ? এরকম আবর্তে বসে কবিতা লিখতে অপরাধ বোধ কর না? কেমন মানুষ তুমি?

উত্তর: হ্যাঁ । নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নৃশংসতার যে সামগ্রিক ডিসকোর্সের সঙ্গে জন্মাবধি পরিচিত হয়ে চলেছি, এবং যেভাবে তা দেশে দেশে রাষ্ট্রীয়, জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, এথনিক, ট্রাইবাল, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, আর্থিক বৈধতা পেয়েছে, তা ব্যক্তির অন্তরাত্মা ধাঁচের ধারণার অ্যাবসার্ডিটিতে আমি আক্রান্ত । হত্যাযজ্ঞ একজনের কর্মকাণ্ড নয় । তা অজস্র মানুষের আনুগত্যের যান্ত্রিক দক্ষতা থেকে উপজাত । জনমুক্তি, মানবতাবাদ, মানুষই পৃথিবীর কেন্দ্র, কমরেড তুমি নবযুগ আনবে, মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ, সততা, উত্তরণ, ধ্রুবসত্য, যুক্তিপ্রাণতা, ইতিহাসের প্রগতি, সার্বভৌম একক মন, ব্যক্তিচেতনা, বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক সুস্হতা ইত্যাদি, গ্রমীণ লিটল ম্যাগাজিনের অজ্ঞান-অবোধ ডিসকার্সিভ স্পেস হিসেবে কেবল টিকে আছে । আমি যে কেবলমাত্র সন্দেহে আক্রান্ত, সেখানেই যে এই প্রবলেম্যাটিকের সমাপ্তি, তা কিন্তু নয় । পশ্চিম বাংলার ম্যাক্রোলেভেল ও মাইখপলেভেল ঘটনাবলীর দ্বারা প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে বাগাড়ম্বরের ইডিয়সি । যারা বলেছিল যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এসট্যাবলিশমেন্টকে ধ্বংস করাটা সাম্যবাদের অভিমুখ, তাদের তো চেয়ারে বসে-বসে ফিসচুলা হয়েগেছে । আমাএ সাবজেক্ট পোজিশান ওই উনিশ শতকীয় এনলাইটেনমেন্টের পৃষ্ঠপটে যদি দূষিত মনে হয় তো তার উৎসসূত্র ওই একই ডিসকোর্স । বদ্ধ উন্মাদ বা খবরের কাগজে ঘটনা-নির্লিপ্ত প্রবন্ধ-লেখকরাই শুধু নিজেদের দূষণমুক্ত মহাপুরুষ বলে মনে করতে পারেন, কেননা তাঁদের যন্ত্রণায় ছটফট করার প্রয়োজন হয় না । আমি তাই আমার এই সাবজেক্ট পোজিশানকে পারক্য আক্রান্ত বা এলিয়েনেটেদ বলব না । কেননা, তুমি যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছ, সে single agent নয়, তার ‘অ্যানোমি’ ঘটা সম্ভব নয় । আমি যে আপোষ করিনা, আর dissenting voice গুলো বজায় রাখতে পেরেছি, তাও কিন্তু আমার সাবজেক্ট পোজিশানকে অবিরাম যাচাই করতে থাকার কারণে । অমন জাগতিক ধ্বংসকাণ্দের মাঝে জন্মাবধি বাস করে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখার নৈতিক প্রয়োজনীয়তার সন্দেহটা থেকেই যায় । সাহিত্য ব্যবসায়ী হলে নিরেট অজ্ঞানতার কোকুনে সন্দেহহীন আরামে থাকতুম । সন্দেহহীন হওয়াটা, আমার মনে হয়, ক্রমিনালের মতন আচরণ হয়ে যাবে । যদিও জানি যে আমার ভাবনাচিন্তার চাপটাই আমার হার্ট অ্যাটাক দুটোর অন্যতম কারণ ।

প্রশ্ন: তুমি যখন থেকে লেখালিখি করছ, তখন থেকেই জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দেবার বিরোধিতা করে আসছ । কলকাতায় ফিরে আসার পর সাবর্ণ চোধুরী পরিবার পরিষদে অংশ নিয়েছ, যাতে জোব চার্ণককে পিতৃত্ব দেয়া নাকচ হয় । প্রথম সাবর্ণ চৌধুরী লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর জীবন নিয়ে লিখেছ কবিতীর্থ পত্রিকায় । নবম শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত নিজের সাবর্ণ চৌধুরী লিনিয়েজ নিয়ে দিশা পত্রিকায় লিখেছ । এটা কি তোমার পোস্টকলোনিয়াল ডিসকোর্স ? নাকি জোব চার্ণককে উৎখাত করার মধ্যমে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলে? কেননা রাধাকান্ত দেবের পরিবার সুতানুটি পরিষদ জোব চার্ণককে কলকাতার পিতৃত্ব দিতে উঠে-পড়ে লেগেছিল । আর রাধাকান্ত দেবের পূর্বজই ক্লাইভকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে, আর্থিক ও স্ট্র্যাটেজিক সাহায্য করেছিল । ইংরেজ ও নবাবপক্ষের অবর্তমানে, তাদের লড়াইটা কি গোপনে কলকাতার দুই আদি পরিবারের মধ্যে আজও চলছে? তুমি কী উদ্দ্যেশ্যে এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে, যার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক নেই?

উত্তর: ইংরেজরা কলকাতার একশ বছর, কলকাতার দুশ বছর চিহ্ণিত করে কোনও উৎসব পালন করেনি । যারা তিনশ বছর পালন করার হুজুগটা করল, তাদের একটা অংশ সেই পরিবারের রেলিকস যারা সিরাজের বিরুদ্ধে ক্লাইভকে সাহায্য করে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় খুঁটি হিসেবে কাজ করেছিল । কিন্তু সবচেয়ে বিরক্তিকর ও অসহ্য লাগল সেইসব লোকগুলোর কাজকারবার, যাঁরা স্বঘোষিত বামপন্হী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী । কলকাতার রাস্তাঘাত, মাঠ-ময়দান সর্বত্র থেকে যখন সাম্রাজ্যবাদীদের মূর্তিগুলো উপড়ে লোপাট করা হয়েছে, তখন আশ্চর্য হয়ে গেলুম দেখে যে স্কুলের পাঠ্যবইতে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট জোব চার্ণকের মূর্তি বসন হয়েছে, এই ফিকশনের মাধ্যমে যে, তিনি কলকাতা শহরের বাবা । আসলে পশ্চিম বাংলায় নিজেদের বৈধ ও ন্যায্য প্রমাণ করার জন্যে পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুরা রাজনৈতিক রিরুটিং হিসেবে এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন । বহিরাগতরা যেখানে গেছে সেখানকার ইতিহাস বিকৃত করেছে । হাওয়া৪৯ এর অপর সংখ্যায় আদি কলকাতার অপর শিরোনামে কৌশিক পরামাণিক ওনার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সরকারি ইতিহাসকাররা কলিকাতার তিনশত বৎসরের জীবনপঞ্জী বইটায় কী কেলো করেছেন । হাওয়া৪৯-এ উত্তরঔপনিবেশিকতা নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার সময়ে তধ্য খুঁজতে বসে রাগ ধরে গেল সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান বইতে জোব চার্ণক আর লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর এন্ট্রি দুটো পড়ে । জোব চার্ণক সম্পর্কে এন্ট্রিটা ভুল তথে্য ঠাসা, এবং গাঁজাখুরি । সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত আর অঞ্জলি বসু কোথা থেকে ওসব জুটিয়েছেন জানি না । তবে ওনাদের সাবজেক্ট পোজিশান যে মোটিভেটেদ তা স্পষ্ট হয়ে গেল আমার পূর্বজের এন্ট্রিটা পড়া । পদবিসহ নাম না দিয়ে লেখা হয়েছে কেবল লক্ষ্মীকান্ত, জন্ম-মৃত্যু সন নেই, তথ্য ভুল এবং ভাসা-ভাসা, যখন কিনা লক্ষ্মীকান্তর উত্তরপুরুষ অতুলকৃষ্ণ রায়ের লেখা এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা বইটা, যার ভূমিকা লিখেছিলেন নিশীথরঞ্জন রায়, তা ওনাদের কাছেই ছিল । এই সময়েই বড়বাড়ি আর সাবর্ণ পাড়ার গোরাচাঁদবাবু, স্মরজিৎবাবু, কানুপ্রিয়বাবু জোব চার্ণককে কলকাতার বাবা বানাবার বিরুদ্ধে মামলা করার তোড়জোড় করছিলেন । সাম্রাজ্যবাদ আসার আগে হিন্দু বাঙালির বাপ-চোদ্দোপুরুষের ইতিহাস খতিয়ান রাখত ঘটক সম্প্রদায় আর পুরীর পাণ্ডারা । ধার্মিক আচার-আচরণের বাইরে তার গুরুত্ব এই ছিল যে, লোকে নিজের ভৌগলিক আর ঐতিহাসিক শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকত, যা তার মধ্যে সক্রিয় রাখত এই বোধ যে, সে পোকা-মাকড় জন্তু-জানোয়ার নয় । কিন্তু ইউরোপীয় মননবিশ্বে নির্মিত নাগরিক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার পারিবারি আর ভৌগলিক স্মৃতি থেকে । আজকের বিশ্বের বহু সমস্যার বীজ ওই উত্তরঔপনিবেশিক স্মৃতিবিপর্যয়, এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদি এনট্রপি । সাহিত্যিক হিসেবে পারিবারিক শেকড়ের স্মৃতিচর্চার মাধ্যমে আমি গভীর বাঙালিত্বে প্রবেশ করি, যা মুর্শিদাবাদ, গৌড়, সরকার সাত গা্ঁ, তাম্রলিপ্তে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আদি বাঙালিত্বের স্পেস তৈরি করে । আমার লেখালিখিতে এই স্পেস হাংরি আন্দোলনের সময় থেকে মোটিভ ফোর্স রূপে আছে । হাংরি বুলেটিন, যেটা আমার জেনারেশনের >কাব্যদর্শন বা মৃত্যুমেধী শাস্ত্র নামে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা মহারাজ প্রতাপাদিত্যকে উৎসর্গ করেছিলুম । পোস্টমডার্ন ভাবনা ও সমাজ বিশ্লেষণে আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর আগ্রহ, এই বিশেষ স্পেসটির সূত্রে । প্রথম যিনি ১৯৩৪ সালে পোস্টমডার্ন শব্দটি প্রয়োগ করেন, নিকারাগুয়ার কবি ফেদেরিকো দ্য ওনিস, তা করেছিলেন প্রক্তন উপনিবেশের মানুষগুলোর স্মৃতি বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে । মুম্বাইতে থাকতে, আর্জেন্টিনার এক তরুণ কবিগোষ্ঠী আমার সম্পর্কে একটি স্প্যানিশ ওয়েবসাইট খুলেছেন খবর পেয়ে, ১৯৮৯ সালে নেট সার্ফিং করতে বসে ফেদেরিকো দ্য ওনিস সম্পর্কে জানতে পারি ।

প্রশ্ন: তোমাকে নিয়ে, তোমার নাম উল্লেখ করে বহু ওয়েবসাইট আছে । বইপত্র তবু কিছুদিন থাকে । কিন্তু ওয়েবসাইট যে থাকবে না, মুছে যাবে, তা কি পীড়িত করে না তোমায়? ইন্টারনেটের কারণে চিঠিপত্র সংগ্রহে রাখাটাও তো সম্ভব নয় । সাহিত্যের যে সাময়িক অবিনশ্বরতা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল । তোমায় হন্ট করে না ?

উত্তর: ওয়েবসাইটগুলোয় যে আমি আছি তা জানতে পারি নেট সার্ফিং শিখতে গিয়ে । আমার সম্পর্কে কে কী লিখেছে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চিঠি বা হাংরি বুলেটিন রেখেছে, কোন গ্রন্হে আমার কবিতা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, সে সব জানার আহ্লাদ আছে । অনেকে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে কবিতা সংকলিত করেন, তাতে আমার কবিতাও থাকে, যদিও তা কয়েকমাসের জন্যে । অনেকে ই-মেল করে গল্প বা কবিতা পড়ার জন্যে পাঠান । আমার তো বাড়িতে ব্যবস্হা নেই, সাইবার কাফেতে ঢুঁ মারতে হয় । আঙুলে ব্যথার জন্যে অসুবিধে হয় । এ ঠায় বসে থাকাও কষ্টকর । অবিরাম পরিবর্তনরত একটা ব্যাপারের মধ্যে আছি, তার মৌজমস্তি উপভোগ করি । কলকাতার সাহিত্যিকি নোংরামির বাইরে বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্হান । সাহিত্যিক অবিনশ্বরতা ব্যাপারটা ফালতু । তরুণ কবি-লেখকরা দেখি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর পড়েন না , অথচ তিনি, ঢাকার আব্দুল হালিম বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলেন । বেঁচে থাকতেই তো দেখছি আমার নামের ইমেজ আমার লেখাপত্রকে ছাপিয়ে যাচ্ছে । মগজের দেয়ালে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো, মিশরের পিরামিড, রোমের কলোসেয়াম, মাম্মালাপুরমের মন্দির, কুমহারারে সম্রাট অশোকের প্রাসাদের পাথরটুকরো ইত্যাদির ছবি টাঙিয়ে রাখলে অযথা দুশ্চিন্তার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় । বড়জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কাজ করতেন বলে আমি স্কুলে পড়ার সময় ছুটির দিনগুলো সেখানেই কাটাতুম । তাই সময় ও সময়হীনতার ধারণা তখন থেকে গড়ে ওঠে । মুছে যাওয়াটা সেহেতু হন্ট করে না ।

প্রশ্ন: তুমি কি নিজেকে হিন্দু বলে মনে করো? হিন্দুদের দেবী-দেবতা, ইষ্টদেবতা আর ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? হিন্দুর উৎসবে অংশ নাও? হিন্দুরা যদি অন্য ধর্মের লোকেদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, যেমন কাশ্মিরি পণ্ডিত রা, তাহলে কি ইন্সটিংক্টলি রিঅ্যাক্ট করো? মরে গেলে ডাক্তারি ছাত্রদের জন্যে তোমার দেহ দান করে দেবে? তুমি কি চাইবে গঙ্গার ধারে, তোমার বাপ-ঠাকুর্দার বসতবাটি উত্তরপাড়ায় তোমার শেষকৃত্য হোক? নশ্বর শবের মাধ্যমে কি ইমেজকে পূর্ণতা দিয়ে যেতে চাও, যেমনটা রাজনীতিক-সাহিত্যিক-শীল্পীরা করেন? বয়েস তো হয়ে গেল, এখনও পর্যন্ত নিজের মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করে কবিতা লেখোনি তো?

উত্তর: হ্যাঁ, আমি একজন হিন্দু । এই জন্যে যে আমি চাই মরে গেলে আমার দেহ পোড়ানো হোক । সবাই জন্মসূত্রে হিন্দু হয় । আমি মৃত্যু সূত্রে । পারিবারিক ইষ্ট দেবতা, সাবর্ণচৌধুরী হবার সুবাদে, কালীঘাটের কালী আর শ্যামরায়, যাঁদের থেকে, ঠাকুমার আমল থেকে, ঠাকুমার মানসিকতা ও দাপটের কারণে, আমার আগের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে গিয়েছিল । বাবাকে কখনও কোনো মন্দিরে যেতে দেখিনি, যদিও উনি পৈতে পরা, গায়ত্রীমন্ত্র, খাবার সময়ে গণ্ডুষ ইত্যাদি সম্পর্কে গোঁড়া ছিলেন, পাঁজি-পুঁথি মানতেন না । মা সেসব কিচ্ছু মানতেন না, এমনকি অন্য ধর্মের মেয়ে বিয়ে করার ওপন পারমিশান দিয়ে রেখেছিলেন উনি । আমার সাবজেক্ট পোজিশানের বহুত্বের উৎস আমার শৈশবের পাড়াগুলো তো বটেই, আমার বাবা-মা, জেঠিমা-জ্যাঠা, কাকিমা-কাকার মতাদর্শের বৈভিন্ন্যের অবদানও তাতে আছে । আমার বয়ঃসন্ধির যৌনউন্মেষ হয়েছিল একজন শিয়া মুসলমান তরুণির সংসর্গে, এবং কবিতার জগতে প্রবেশও । এ-ব্যাপারে আমার একটা কবিতা আছে, প্রথম প্রেম: ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ শিরোনামে । প্রাথমিক স্তরে পড়েছি ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে, তখন প্রতিদিন চার্চে যেতে হত । তারপর ব্রাহ্ম স্কুলে । আমার মস্তিষ্কে ঈশ্বর বিশ্বাসের ওই বীজ অংঙ্কুরিত হতে পারেনি । চেষ্টা করেও না । ডুবজলে যেটুকু প্রশাস-এর অতনু, আর নামগন্ধ উপন্যাসে অরিন্দম এবং যিশু বিশ্বাস চরিত্রগুলোয় আমি এই মনস্হিতি আর্টিকুলেত করার চেষ্টা করেছি । দুটি স্কুলেই হিন্দু উৎসব নিষিদ্ধ ছিল । পাড়ার প্রধান উৎসব ছিল দোলখেলা, যাতে অংশ নিতুম, এখন বয়সের কারণে নিই না । গণহত্যা শুনলেই গাগুলোয়, টিভিতে দেখলেই বন্ধ করে দিতে হয় । পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশানের সামনেই দুজনকে থেঁতলে দেয়ালে গেঁথে দিতে, সঙ্গে-সঙ্গে সরবিট্রেট রাখতে হল জিভের তলায় । ইন্সটিংক্ট এখন এই স্তরে । তবে পাকিস্তান রাষট্রটিকে আমি ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করি । তাদের জণভেই হিন্দিত্ব নামক দানবটি পয়দা হবার সুযোগ পেয়েছে । রাষ্ট্রধর্ম কনসেপ্টটাই দুর্বৃত্তসুলভ । রাষ্ট্রের আবার ধর্ম হয় নাকি? তাহলে তো পথঘাট-লাউকুমড়ো কাক-কোকিলেরো ধর্ম থাকবে । দেহ দান করার ব্যাপারটা নিছক নৌটঙ্কি । গুদামের চেলাকাঠের ডাঁইয়ের মতন মর্গগুলোয় বেওয়ারিশ লাশের পাহাড় জমে থাকে । এসকেপিস্টরা আর যে প্রাক্তন উদ্বাস্তুরা পশ্চিম বাংলার মাটিতে নিজেকে মিশিয়ে দিতে অনিচ্ছুক তাঁরা, ওটা করেন । মরার সময়ে মুম্বাইতে থাকলে চোখদুটো কারোর কাজে লাগবে । উত্তরপাড়ার যে-ঘাটে সাবর্ণচৌধুরীদের শেষকৃত্য হত, সেখানে বহুকাল আগে শবদাহ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে । বেস্ট হবে কিউ না দিয়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢুকতে পারা । মৃত্যুকে গ্লোরিফাই করার সাহিত্যিক ক্যাননটা উপনিবেশগুলোয় এনেছে ইঊরোপ । যার শব পোড়ানো হবে, তার এপিটাফ লেখার মতন ইডিয়টিক ব্যাপার আর দ্বিতীয়টি নেই । মৃতদেহ ঘিরে ফিউনারাল সং গাওয়াটাও বাঙালির সাংস্কৃতিক আচরণ নয় । মৃত্যুর পর স্মরণসভা ব্যাপারটাও আমার অভিপ্রেত নয় । আমি অমন স্মরণসভাগুলো এঢ়িয়ে যাই । লক্ষ-লক্ষ বাঙালির মতন আমিও সাধারণ স্বাভাবিক অবলুপ্তি চাই । আপাতত দুর্গাপুজোর নবমীর দিন বড়বাড়ি আর আটচালায় নানা এলাকা থেকে এসে সাবর্ণচৌধুরীদের যে জমায়েট হয়, ১৬১০ থেকে হয়ে আসছে, তাতে অংশ নেয়া আর খাওয়ায় সীমিত হয়ে গেছে ধর্মকর্ম।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ডক্টর বিষ্ণুচন্দ্র দে

ডক্টর দে: একজন লোক কেন লেখে ? কেন ?

মলয়: সবাই একই কারণে লেখেন না । প্রতিটি লেখা একই কারণে রচিত নয় । একই লোক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বয়েসে একই কারণে লেখেন না । আমার মনে হয়, আমি লেখালিখি শুরু করেছিলুম প্রাকযৌবনের উচ্ছৃঙ্খল সাহিত্যপাঠ, বঙ্গসংস্কৃতিতে আউটসাইডার-বোধ, পারিবারিক গোঁড়ামি, সাবর্ণ চৌধুরী ক্ল্যানের সীমালঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে ।
আমি যে কেন লিখি, এই অমূলক প্রশ্নটা আমার কোনো ভারবাহী জিঞ্জাসাবোধের অন্তর্গত ছিল না যদিও, একটি দার্শনিক সমস্যা হিসাবে প্রতিনিয়ত আমাকে এমনভাবে চিন্তিত রেখেছে যে, প্রশ্নহীনতা, চিন্তাহীনতা, এমনকি চেতনাবোধ গুলিয়ে ফেলেও, আমার লেখার সম্ভাবনা থেকে, লিখিত পাঠবস্তু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার, কোনো সদুত্তর পাই না । আমার মধ্যে আমার লেখার প্রক্রিয়াটি নিজে, ওই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর । আমি কেন লিখি, এই সমস্যাটি, সারাজীবন একই দার্শনিকতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত থাকতে পারে না , কেন না, একজন মানুষের মানসিক অবস্হানগুলোর সুস্পষ্ট জলবিভাজন থাকে না ।
যাঁরা মার্কসবাদী, গান্ধিবাদী, রামকৃষ্ণ অথবা শ্রীঅরবিন্দে বিশ্বাসী, কিংবা রাজ্য সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলেছেন, তাঁদের, মনে হয়, এই সমস্যাটির হাঙরের হাঁ-মুখে পড়তে হয় না । লেখালিখিটা যাঁদের ব্যবসা, তাঁরা তো জানেজই কেন লিখছেন; তাই বলে আমি মনে করি না যে তাঁদের নিজস্ব অবস্হানের জন্যে তাঁদের অশপদ্ধা করতে হবে ।

ডক্টর দে: আপনি কি হিন্দু ?

মলয়: হ্যাঁ, আমি হিন্দু । কিন্তু একেশ্বরবাদ ও অরগ্যানাইজড রিলিজিয়নে বিশ্বাসী নই । আমি প্রকৃতিকে ডিভাইন বলে মনে করি । প্যাগান হিন্দুর মতো জল, আলো, বাতাসকে ডিভাইন মনে করি । তাদের নিয়ে কবিতা লিখি না ।

ডক্টর দে: আপনি হাংরি আন্দোলনের ইশতাহারে বলেছেন ‘ঈশ্বরের মৃত্যুসংবাদ অনেক-কাল আগেই পেয়ে গেছি, এখন আমিই আমার নিয়ন্ত্রক ও কর্ণধার । এখানেই কবিতার শুরু ।’ বিষয়বক্তব্যকে একটু সহজ করে বলুন ।

মলয়: ব্যাপারটা বুঝতে হবে দেশভাগোত্তর বাঙালির উত্তর-ঔপনিবেশিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে, যখন হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হল । ইউরোপে রেনেসাঁসের হর্ষোল্লাসে ঈশ্বর প্রণীত নিয়ম-শৃঙ্খলার ভাঙনকে মুক্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনে বসানো হয়েছিল ব্যক্তি-মানুষকে । পরিবর্তনটি ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল মানব-সমাজে; প্রথমে ইউরোপে, এরপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ যে ভূখণ্ডে গেছে, সেখানে । প্রতিটি ঊপনিবেশে সেখানকার দেবী-দেবতা ও আরাধ্য ইষ্টকে মেরে ফেলতে ইউরোপ যে সফল হয়েছিল শুধু তাই নয়, সেসমস্ত দেশের ইউরোপীয় মূল্যবোধ প্রভাবিত ভূমিপুত্রদের মধ্যে এই চিন্তাচেতনাকে ইতিবাচক গরিমা দিতে পেরেছিল । তার আগে প্রতিষ্ঠা দেবার জণে ব্যক্তি-মানুষকে বলা হত দেবতুল্য, সাক্ষাৎ ভগবতী ।
ওই নবজাগৃতির ভাবকল্পটি ঈতিহ্যগত প্রভূত্ববাদের জায়গায় ‘জোর যার সত্য তার’ এই আধিপত্যবাদকে যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা, ব্যক্তি-এককের ক্ষমতা প্রয়োগের আহ্লাদ ইত্যাদি তর্ক দ্বারা ন্যাজ্যতা দেবার প্রতিপাদ্য গড়ে তুলেছিল, যা শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে আধুনিকতাবাদকে চাপিয়ে প্রকৃতির সৃষ্টিগত জটিলতা ও সমগ্রতা থেকে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল ।
প্রাক-ঔপনিবেশিক বঙ্গসমাজে তাই প্রকৃতি-সংস্কৃতি বাইনারি অপোজিশান ছিল না । বাংলায় প্রকাশিত প্রথম হাংরি ম্যানিফেস্টো দ্যাখো । এই আরণ্যকতার উল্লেখ আছে । ওই বাইনারি অপোজিশান বা বলা যায় সব রকমের বাইনারি অপোজিশান বর্জন করেই কবিতা লেখার কথা বলেছিলুম ।

ডক্টর দে: আপনি বলেছিলেন আত্মার ইরিটেশা থেকে হাংরি কবিতার জন্ম । ‘আত্মার ইরিটেশান’ ভাবকল্পটা একটু সহজ করে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলে কঠিনতা দূর হয় ।

মলয় : ঝিনুকের মধয়ে বালুকণা ঢুকলে যে ইরিটেশান হয়, তার দরুন মুক্ত তৈরি হয় । কবি যেহেতু সর্বব্যাপী এবং নিজেকে নিজে জানেন, তাই আত্মা শব্দটা প্রয়োগ করেছিলুম । আরো জানার প্রক্রিয়া থেকে ইরিটেশান হয়, যার দরুন বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানে প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটান । হাংরি আন্দোলনকারীরা প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটাবার চেষ্টা করলেন সাহিত্যে ।

ডক্টর দে: আপনার কবিতাকে কেন হাংরি বলা হবে ?

মলয়: কেননা আমি কবিতা থেকে কিচ্ছু বাদ দিইনি । কবিতা হাঁ-মুখে ছিল সবই গ্রাহ্য । অমুক হলে কবিতা হবে না, তমুক হলে কবিতা অসফল, এই ধরনের তর্ক সদ্য উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলায় মনে হত বুদ্ধিহীন ।

ডক্টর দে: ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় কিসের ক্ষুধার কথা বলা হয়েছে ?

মলয়: কবিতাটা নিজেই তার হাঁ-মুখে জীবন, যৌবন, মৃত্যু, যৌনতা, প্রেম, বাবা-মা, সমাজ, সময়, ইতিহাস সবাইকে পুরে নিতে চাইছে । এবং তা দ্রুতি- আক্রান্ত ।

ডক্টর দে: আন্দোলনের জন্য ইংরেজি ‘হাংরি’ শব্দটা ব্যবহার না করে ‘ক্ষুধার্ত’ শব্দটা ব্যবহার করলে কি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সঠিক শক্তি পাওয়া যেত না ?

মলয়: না । ক্ষুধার্ত শব্দটায় ব্যক্তির আর্তির লেজুড় রয়েছে । ব্লান্ডার হয়ে যেত । শক্তি চট্টোপাধ্যায় করেছিলেন ‘ক্ষুৎকাতর’; তাও গ্রাহ্য হয়নি । হাওয়া খাওয়া, পালটি খাওয়া, লাথি খাওয়া, গোঁত্তা খাওয়া, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদির মজা ওই আর্তি বা কাতরতায় নষ্ট হয়ে যায় । খাওয়া তো সর্বগ্রাসী ।
এতদিনে হাংরি শব্দের উৎস-সূত্র আর দার্শনিক প্রেক্ষাপট জেনে গেছ নিশ্চই । না খেতে পেয়ে মরা বা যৌন ক্ষুধার সঙ্গে হাংরিকে সম্পর্কিত করেছিলেন প্রধানত সাংবাদিকরা ।
হাংরি শব্দটা আমি পেয়েছিলুম ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে । উনি কালখণ্ডকে হাংরি রুপে চিহ্ণিত করেছিলেন ।
ওই সময়ে আমি হাতে পাই অসওয়াল্ড স্পেংলারের বই দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট । স্পেংলার বলেছিলেন যে সমাজ-সংস্কৃতি হল জৈব প্রক্রিয়া । তা যখন কেবল নিজের সৃজন-ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করে, তার নিত্য-নতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু তার অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয় জখন তার নিজের স্ফূরণ-ক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে; তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন । অথাৎ তখন সমাজ-সংস্কৃতিটি হাংরি । আমার মনে হয়েছিল, দেশ-ভাগোত্তর বঙ্গসমাজ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মণীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় ।
হাংরি আন্দোলন ছিল এই চিন্তাভাবনার ফসল । ‘সম্প্রতি’ পত্রিকায় ১৯৬২ সালে এই কথাগুলোই নিজের মতন করে শক্তিদা বলেছিলেন । প্রশ্ন হল যে পরে কোনো-কোনো আন্দোলনকারী হাংরি শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন । তা খুবই স্বাভাবিক । বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঁকবদলকারী আন্দোলন, যার খবর পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং সব আলো আমার ওপর এসে পড়ছিল । তাই আন্দোলনের মধ্যেই প্রত্যেকে নিজস্ব পরিসর গড়তে চেয়েছেন । প্রচার চেয়েছেন ।

ডক্টর দে: হাংরি আন্দোলনের কবিরা যে ক্ষুধার কথা বলতে চেয়েছেন সেটা অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না । এতে আপনার অভিমত কি?

মলয়: একটু-আধটু পড়াশোনা না করলে বোধগম্য না হতেই পারে । অনেক পাঠকই লেখকের ক্ষুধা খুঁজে মরেন, যখন কি না ক্ষুধাটা ডিসকোর্সের ।

ডক্টর দে: হাংরিয়ালিজমের সঙ্গে ডাডাইজম এবং সুররিয়ালিজমের পার্থক্য কী ?

মলয়: ডাডাইজম ও সুররিয়ালিজম হল সময়-তাড়িত চিন্তাতন্ত্রের ফসল, জুডিও-ক্রিশ্চিয়ানিটির ফসল । হাংরিয়ালিজম হল পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্রের ফসল, বহুত্ববাদী ভাবনার ফসল । ডাডাইজম ও সুররিয়ালিজম লেখককে তার মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করে ভেবেছে । হাংরিয়ালিজম লেখককে একলেকটিক বলে মেনে নিয়েছে । ডাডাবাদী-পরাবাস্তববাদীরা জন্মেছেন আর্ট ফর আর্ট সেক-এর পৃষ্ঠপটে, তাই ভাঙচুর করছেন । হাংরিয়ালিস্টরা ‘আর্ট’ কনসেপ্টটাকেই আক্রমণ করেছেন ।

ডক্টর দে: কোনো একটি কবিতা যে হাংরি সেটা বোঝার জন্য কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ? সাধারণ পাঠক কী করে বুঝবেন যে কবিতা-বিশেষটি হাংরি ?

মলয়: সাধারণ পাঠক কি আর কবিতা পড়েন ? মনে হয় না । পাঢবস্তুটি যদি সাহিত্যের তদানীন্তন উর্ধ ও নিম্ন সীমাগুলো লঙ্ঘন করে, তাহলে টের পাওয়া যেতে পারে । শৈলেশ্বর, প্রদীপ, ত্রিদিব, সুবিমল, দেবী, সুবো, ফালগুনী, উৎপল, সমীর, আমার ওই সময়ের কবিতা পড়ো । মুক্তসূচনা ও মুক্তসমাপ্তির কবিতা, বিষয়কেনদ্রহীন, শিরোনাম দিয়ে বিষয় চিহ্ণিত হয় না, শব্দের ও ছন্দের যথেচ্ছাচার, লজিকাল সিকোয়েন্স বর্জিত, গুরুচণ্ডালি ভাষা, ইন্দ্রিয় পালটা-পালটি, প্রতীক বর্জিত, ছেঁড়া চিত্রকল্প ইত্যাদি । অথাৎ পাঠবস্তুটি বিবেচ্য, লেখক নন ।

ডক্টর দে: এমন অনেক কবিতা হাংরি-পরবর্তী কালে রচিত হয়েছে যেগুলোর মধ্যে যৌন শব্দ, অশ্লীল শব্দ, নতুন শব্দ, নিম্নশ্রেণির শব্দ, অশ্লীল উপাদান, ঘৃণ্য জীবনবোধ ইত্যাদি পাওয়া যায় । সে-ধরণের কবিতাকে কী হাংরি প্রভাবিত কবিতার পর্যায়ে ফেলা যায় ? অথবা অনেকেই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, হাংরি আন্দোলন সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, কিন্তু দেখা যায় হাংরি কবিতার বৈশিষ্ট্য তাঁদের লেখায় রয়েছে । সেগুলোকে কি হাংরি কবিতা বলব না ?

মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময় কাল ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ । ফলে স্বাভাবিক যে তার পরের অনেক কবি প্রভাবিত হবেন । আগের প্রশ্নের উত্তরে যে বৈশিঢ়্ট্যের কথা বললুম সেগুলো যদি থাকে তো অস্বিকার করার কারণ দেখি না । উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরার আনেকে নকশাল আন্দোলনের পর নিজেদের হাংরি ঘোষণা করেছেন । আমি তাঁদের চিনি না, দেখিনি । এটাই তো হাংরির সাফল্য ।

ডক্টর দে: আপনি ১৯৬৫ সালে পালামৌতে সম্বর্ধনায় লেখা ইংরেজি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমি কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চাই” । পেরেছেন কি ?

মলয়: না, পারিনি মনে হয় । বঙ্গসমাজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে, কবিতাহীন হয়ে গেছে । বাজার হয়ে উঠেছে প্রধান ডিসকোর্স । ফলে কবিতা প্রক্রিয়াটাই আজ কাউন্টার-ডিসকোর্সের চেহারা নিতে বাধ্য হয়েছে । কবিরা যেন গোপন সমিতির সদস্য । তার বাইরে বেরোলেই ঢুকতে হবে বাজারা । এখন কবিরাই শুধু কবিতা পড়ে । সে-সময়ে রাজনীতিকরাও কবিতা পড়তেন ।

ডক্টর দে: সমস্ত লেখকই লেখার শুরুতে প্রতিষ্ঠান আঁকড়ে ধরতে চান । তার কারণ প্রচারমুখিতা ।ঔ যে যত প্রচারিত সে তত সার্থক বলে মনে করা হয় । তাহ।এ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব না-পাওয়াই বোঝায় । আপনি কি বলেন ?

মলয়: এসটাবলিশমেন্ট ও অ্যান্টিএসটাবলিশমেন্ট শব্দদুটো বঙ্গসমাজে আমিই প্রথম এনেছিলুম । দুর্ভাগ্যবশত ক্ষমতালোভী বামপন্হীরা শব্দ দুটোর সঙ্গে আনন্দবাজারকে গুলিয়ে দিয়েছিল । মনে রাখতে হবে যে আমরা নাড়া দিতে চেয়েছিলুম প্রশাসনকে, যে অক্টোপাসের একটা আঁকশি ছিল আনন্দবাজার । এখন অন্য আঁকশিগুলোকে গণশক্তি, বাংলা আকাদেমি, তথ্যসংস্কৃতি বিভাগ, নন্দন, আলিমুদ্দিন, মহল্লা কমিটি, পঞ্চায়েত ইত্যাদি দিয়ে সহজে চিহ্ণিত করা যায় । এখন এসটাবলিশমেন্ট আরও ভয়ংকর । তার চাই লাশের পর লাশ ।
রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠান শব্দটার বদলে অচলায়তনের কথা বলেছিলেন । আমাকে নিয়ে মুর্শিদ এ. এম. যে-বইটা প্রকাশ করেছেন, তাতে কলিম খান তাঁর রচনায় গৌতম বুদ্জধ, শংকরাচার্য, রবীন্দ্রনাধ প্রমুখকে বলেছেল প্রতিষ্ঠানবিরোধী ।
যাঁরা লেখালিখির ব্যবসায় ঢুকতে চান তাঁদের জন্যে আনন্দবাজার জরুরি । যাঁরা সরকারি পুরস্কারের জন্যে লালায়িত তাঁরা গণশক্তি পত্রিকায় ঢুকতে চান । প্রচারিত হন তাঁরা । কিন্তু বেশিরভাগই হারিয়ে যান । সকলে ওসব জায়গায় ঢুকতে চায় না, কেউ-কেউ চায় । প্রধানত অন্য ভালো চাকরি জোটা না বলে । তাছাড়া প্রচারের আলোয় থাকার জন্যে অবিরাম লেখা-ব্যাপারটার ঘানি ঘোরাতে হয় । প্রতিষ্ঠান য়ভক্তি-এককের মূল্যবোধ নষ্জট করে । অক্টোপাস তাকে যে আঁকশি দিয়েই আঁকড়ে ধরুক না কেন ।

ডক্টর দে: আমরা জানি হাংরি আন্দোলন যাঁরা শুরু করেছিলেন তাঁরা প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী । এমন কি, প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাব যাঁরা লিখতেন তাঁদেরও কয়েকজন হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করে বুলেটিনগুলোয় লিখতেন । তাহলে স্বীকার করতে হয় এই আন্দোলোনটাই একটা প্রতিষ্ঠান । আপনি স্বীকার করেন কী ?

মলয়: অক্টোপাসের কোনো আঁকশির ক্ষমতাই হাংরি আন্দোলনের ছিল না । শক্তিকে আনন্দবাজারের আঁকশি ধরেছিল, উৎপলকুমার বসুকে এখন ধরেছে । সুভাষ আর বাসুদেবকে ধরেছিল সিপিএমের আঁকশি । সুবিমল সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার নিয়েছে । তাতে হাংরি আন্দোলনের স্ট্রাকচার এবং কাউন্টারডিসকোর্সে রদবদল হয় না । সুররিয়ালিজম আন্দোলন থেকেও অনেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন । আর কীর্তি হিসেবে উৎপলের ‘পুরী সিরিজ’ ও শক্তিদার ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’ এবং বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ তাতে ক্ষুন্ন বা বাতিল হয় না । সাহিত্যিক কাজ য়্যাপারটা প্রতিষ্ঠানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে না । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এখন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী বটে — আনন্দবাজার ও সিপিএম দুটিতেই— এবং আমি তাঁর সমালোচনা করি । কিন্তু কৈশোরকালীন সম্পর্কের দরুন তাঙকে শ্রদ্ধা করি । ওই সম্পর্কের কারণে উনি আমার পক্ষের সাক্ষী ছিলেন; যখন কি না শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ দিয়েছিলেন ।

ডক্টর দে: আধুনিকতা ব্যাপারটা আপনার মতে “একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর” । কী ভাবে ?

মলয় : ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর ‘গ্রন্হে ‘ধ্রুপদী জোচ্চোর’ শিরোনামে আমার কবিতাটা পড়েছ কি ? ‘কবিতা পাক্ষিক’ থেকে ‘আধুনিকতার বিরুদ্ধে কথাবাত্রা’ নামে আমার একটা বই বেরিয়েছিল । ওদের ওয়েবসাইটে দেখলুম এখনও পাওয়া যায় । মডার্ন, মডার্নিটি, মডার্নিজম কিন্তু একই ব্যাপার নয় ।
বঙ্গীয় আধুনিকতা প্রসারিত হয়েছিল ঔপনিবেশিকতার স্ফূরণরূপে । স্বাভাবিক যে উত্তর-ঔপনিবেশিকতায় তার আদল-আদরা পালটাবে । ইউরোপে ঠিক যে-ভাবে ও যে-কারনে আধুনিকতার উদ্ধব ও প্রসার ঘটেছিল, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সে-ভাবে ও সে-কারণে তা ঘটেনি । আমাদের অভিধানে তাই আধুনিকতার অর্থ বর্তমানকালীন, সাম্প্রতিক, হালের, অধুনাতন, নব্য । আসলে, আধুনিকতা হল জীবনের একটি ফর্ম, পরিবর্তিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সামাজিক বিন্যাসের কাঠামো । অন্যরকম আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ, আদান-প্রদানের জীবন উদ্ভূত হয়েছিল, এবং হোতারা তাকে ইতিবাচকতা দিয়েছিলেন ।
জ্ঞান ব্যাপারটা অটীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ওই জীবনবোধে, যা থেকে বিশেষজ্ঞদের আবি্র্ভাব । বিজ্ঞানের এক বিশেষ দৃষ্টি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল জ্ঞান সম্পর্কে অমন ধারণা । এখন তাকে বলা হচ্ছে রিডাকশানিজম বা খণ্ডবাদ । অমন জ্ঞান না থাকাকে আধুনিকতা মনে করেছে মূর্খতা, অর্থাৎ তা খারাপ, অনৈতিক, অজ্ঞতা, আনকালচার্ড । আধুনিক বিজ্ঞানকে তুলে ধরা হয়েছিল একটি সর্বজনীন, মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ জ্ঞান-কাঠামো হিসেবে, এবং মেনে নেয়া হয়েছিলযে ব্রহ্মাণ্ড, জীবন ও সমস্ত কিছু সম্পর্কে তা শেঢ় কথা বলে দিতে পারে । এই যান্ত্রিক প্যারাডাইম বা খণ্ডবাদকে ইউরোপ প্রয়োগ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে; নিজেদের আধিপত্যকে বৈধতা দেবার স্বার্থে । সাম্রাজ্যবাদ, খণ্ডবাদ, আধুনিকতাবাদ, বিজ্ঞানবাদ সবই চলেছে হাতে হাত মিলিয়ে ।
ওই ইউরোপীয় প্যারাডাইমটার জ্ঞানতাত্বিক, এমনকি তত্ববাদী অনুমানগুলো, সমরূপতা বা একরূপতার ধারণার ওপর নি্র্যরশীল, যা মনে করে যে, তাবৎ নিয়ম, ব্যবস্হা, প্রণালী, কাঠামো ইত্যাদির বুনিয়াদি উপকরণগুলোর মধ্যে পার্থক্য নেই । আধুনিক কবিতার প্রতিপাদকরা এই খণ্ডবাদী দর্শনের পথটিকে সমস্ত কবিদের ক্ষেত্রে অবশ্যমান্য করতে চেয়েছে, বেঁধে দিতে চেয়েছে সমরূপতার অনুশাসন, ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী শর্ত অনুযায়ী । জোচ্চুরি ছাড়া আধিপত্য হয় না । তুমি ভেবে দেখো, কেন বহুকাল পর্যন্ত নজরুল আর জসীমুদ্দিনকে একঘরে করে রেখেছিলেন ওই হোতারা । ভাগ্যিস নজরুল মারা গেলেন বাংলাদেশে ।
খণ্ডবাদের অধিযান্ত্রিক উপমাগুলো প্রকৃতি ও সমাজকে, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক স্তরে পুনর্গঠন করেছে নিজেদের স্বার্থে । প্রকৃতির ওপর আরোপ করা হয়েছে যান্ত্রিকতার মেটাফর, যেহেতু তা বিভাজন-সহায়ক এবং স্বকার্যে প্রয়োগযোগ্যতার অনুমানে ভর করে দাঁড়ায় । পক্ষান্তরে, জৈব মেটাফরগুলো মনে করেছে যে পরস্পর-নির্ভরশীলতা এবং আদান-প্রদানের দ্বারা ক্ষমতার বিন্যাস হোয়া দরকার । বাস্তবজগত একটি জীবন্ত ব্যাপার । এই জীবন্ত ব্যাপারটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে খণ্ডবাদ থেকে চাগিয়েছে আর প্রশ্রয় পেয়েছে সন্ত্রাস । বহু আদর্শকে আধুনিকতা মানবসমাজে এনেছিল, এবং সেগুলোকে প্রতিষ্ঠা দেবার প্রধান উপায় করা হয়েছে সন্ত্রাসকে ।

ডক্টর দে: দীর্ঘদিন লেখা থেকে বিরতি ঘটিয়ে যখন দ্বিতীয়বার লেখারজগতে ফিরে এলেন, তখন আপনি বলেছিলেন, নিজেকে ক্ষুধার্ত মনে করি না । কেন? ক্ষুধার্ত প্রজন্মের স্রষ্টা আপনি । তার মানে ক্ষুধা শেষ ? যখন আন্দোলন করেছিলেন, তখনও কি ক্ষুধা ছিল না? কিন্তু অনেকেরি যে ক্ষুধা ছিল এবং রয়েছে ?

মলয়: তুমি আবার পেটের খিদের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে গুলিয়ে ফেলছ । আমলাশোল আর ডুয়ার্সে চাষি আর মজুররা না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে বলে সরকারের তুলোধুনা করব । নিজেকে ক্ষুধার্ত বলতে যাব কেন? হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যারা সিপিএমের ছত্রছায়ায় ঢুকেছিল—যেমন সুভাষ, বাসুদেব, শৈলেশ্বর— তারাই এই গোলমালটা বাধিয়েছে । দিব্বি চাকরি-বাকরি করে আরামে থেকেছে আর নিজেদের বলেছে সর্বহারা ।
নিজেকে সেই সময়ে হাংরি আন্দোলনকারী বলতুম, ক্ষুধার্ত বলতুম না । তাছাড়া, নিজেকে ক্ষুধার্ত মনে না করার বহুবিধ কারণ আছে । যেমন, যাঁরা মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হলেন (সুভাষ ও শৈলেশ্বর), তারাই ‘ক্ষুধার্ত’ নামে পত্রিকা বের করতেন । তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, মূল্যবোধের সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই । অনুপম মুখোপাধ্যায়ের রিভিউ পড়ে জানতে পারলুম, আমার নামে তাতে জাল প্রবন্ধও ছাপা হয়েছে ।
যাঁরা নিজেদের ক্ষুধার্ত বললেন তাঁরা শাসকদল ও তার শিক্ষক সংগঠনে ঢুকলেন । হাংরি আন্দোলনকারীর তো অচলায়তন ভাঙার কথা । তারা তাতে ঢুকে আশ্রয় নেবে কেন? এটা তো জোচ্চুরি । আত্মসন্মানবোধহীনতা ।
উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরায় অনেকে ক্ষুধার্ত ঘোষণা করেছিলেন নিজেদের । দেখলুম তাঁদের চেয়ে আমি সব ব্যাপারেই আলাদা । অভিজ্মতা ও ভাবনাচিন্তায় তো বটেই । আবার যখন লিখতে আরম্ভ করলুম তখন চাকুরিসূত্রে সারা ভারতবর্ষ চষে বেড়াচ্ছি, বিশেষ করে গ্রামে-গ্রামে ।

ডক্টর দে: শিল্পকৃতির জন্যে আন্দোলন জরুরি নয়; শিল্পী ও ভাবুকদের মধ্যে অনেকেই নির্জনে সাধনা করার পক্ষপাতি ল কথাটা আপনি কতটুকু সমর্থন করেন ?

মলয়: মন্দিরের আরাধ্যরা শিল্পকৃতি নন । তাঁদের উপড়ে চুরি করে ইউরোপ-আমেরিকায় কোটি-কোটি ডলারে বিক্রির পর তাঁরা হয়ে যান শিল্পবস্তু । অর্থাৎ তা থেকে ডিভিনিটি নিষ্কাশিত । শিল্প শব্দটা হল আর্ট শব্দের বাংলা, যে কনসেপ্ট এসেছে সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে চেপে ।
কবিতা, উপন্যাস লেখার জন্যে আন্দোলন জরুরি নয়, এটা ঠিক । সে-সময়ে কাউন্টার কালচারাল মুক্তধারা বইয়ে দেবার জন্যে প্যারাডাইম শিফ্ট দরকার ছিল ।
আর নির্জনে একা বা অনেকের মাঝে বসে যারা কখনও সাধনা ব্যাপারটা কী, তা জানার চেষ্টা করেননি, তাঁরা অমন মধ্যযুগীয় অভিব্যক্তি প্রয়োগ করতেন । আমি আচার্য রজনীস (তখন তিনি চন্দ্রমোহন জৈন ছিলেন), রামকৃষ্ণ আশ্রম, বালটিবাবা, মোহন্ত গোরখনাথ, গাঁজাপায়ী নিরক্ষর সন্ন্যাসী, সব সঙ্গ করে দেখে নিয়েছি । লেখা।লিখির জন্যে দরকার বিপুল অভিজ্ঞতা । জীবনানন্দ রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরতেন । রবীন্দ্রনাথ হিল্লি-দিলই করতেন । নানা এলাকার নানা রকম মানুষের সঠ্গে যত বেশি মেশা যায়, একজন লেখক ও ভাবুক তত বেশি সমৃদ্ধ হন । নির্জনে নয় ।

ডক্টর দে: হাংরি আন্দোলন শুরু করার আগে বাংলা-সাহিত্যের কোন কবি-লেখকদের রচনা পড়েছিলেন ? মন্বন্তর,দেশভাগ, উদ্বাস্তু, দাঙ্গা, এগুলো হাংরি আনদোলনের ক্ষেত্রে আপনার চিন্তায় কতটুকু প্রভাব ফেলেছিল ?

মলয়: আমি ভালো পড়ুয়া ছাত্র ছিলুম । বাবাকে আর দাদা সমীরকে বললেই বই কেনা যেত । চাকরি করতে ঢুকে বাড়ির জন্যে খরচ করতে হত না । বই কিনতুম আর অভিজ্ঞতা সংগ্রহে খরচ করতুম । তাই রবীন্দ্রনাথ আর শশধর দত্ত আকযোগে পড়েছি । গোগ্রাস পাঠক ছিলুম । বন্ধু-বান্ধব, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, দাদা ও দাদার কবি-বন্ধুদের মুখে নাম শুনলেই বই যোগাড় করতুম ।
বই পড়ে বা লোকমুখে শুনে যে চিন্তা-প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে তার তুলনায় আভিজ্ঞতা-সঞ্জাত চিন্তা-প্রক্রিয়াকে আমি গুরুত্ব দিই । অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে লিখলে তার লিটেরারি প্রেমাইস থাকে না । ছোটোলোকের ছোটবেলা, এই অধম ওই অধম, অভিমুখের উপজীব্য, ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলি, নামগন্ধ, নখদন্ত বইগুলো পড়লে তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে ।

ডক্টর দে: একজন লেখক, কবি বা চিত্রকর যে হাংরি আন্দোলনের সহযোদ্ধা তা কী করে বোঝা যাবে ?

মলয়: সহযোদ্ধা কথাটায় আমার আপত্তি আছে । ওটা যুদ্ধ ছিল না । বলতে হবে অংশগ্রহণকারী ।
ম্যানিফেস্টোগুলোয় যাঁদের নাম আছে, কোনো না কোনো সময়ে, তাঁরা অঙশগ্রহণকারী ।
হাংরি আন্দোলনের কোনো হেডকোয়ার্টার, পলিটব্যুরো বা হাইকমাণ্ড ছিল না । তাই যিনি চেয়েছেন তিনিই নিজেকে অঙশগ্রহণকারী ঘোষণা করেছেন । যেমন অরুণেশ ঘোষ, অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার, সেলিম মুস্তফা, রসরাজ নাথ, বিকাশ সরকার, অরুণ বণিক, জীবতোষ দাস, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ নিজেদের হাংরি ঘোষণা করেছিলেন, আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার দেড়-দুই দশক পর । ফলে ইমপ্যাক্ট প্রমাণিত ।

ডক্টর দে: শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই আন্দোলনকে বলেছিলেন সর্বগ্রাসী ? কেমন করে ?
মলয়: একটু আগেই তো স্পেংলার ব্যাখ্যা করার সময়ে সে-কথা বললুম ।

ডক্টর দে: দেবেশ রায় বলেছিলেন, “তত্ববিশ্বের ক্ষেত্রে হাংরি আন্দোলন ছিল নকশাল আন্দোলনের প্রথম ধাপ”। আপনার মন্তব্য কী?

মলয়: উনি সরকারি মার্কসবাদী বলেই হয়ত নেতিবাচক দৃষ্টিতে কথাটা বলে থাকবেন । কিউবায় কারোর ফুসকুড়ি হলে ওনারা মিছিল-মিটিং করতেন । আমার পুলিশি হেনস্হার সময়ে এগি্যে আসেননি । মার্কসবাদীদের মধ্যে একমাত্র তরুণ সান্যাল এসেছিলেন, পার্টির দাদাদের নিষেধ সত্বেও । আর যুগান্তর সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন কৃষ্ণ ধর ।

ডক্টর দে: “বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার জটিলতা ও আস্পষ্টতার বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনই ছিল প্রথম পরিকল্পিত বিদ্রোহ” । আধুনিকতার জটিলতা ও অস্পষ্টতা প্রাঞ্জল করে দিলে পাঠকের সামনে ধোঁয়াটে ভাব কেটে যাবে ।

মলয়: আধুনিকতা সম্পর্কে ব্যাপারটাতো একটু আগেই ব্যাখ্যা করেছি । আর হাংরি আন্দোলন যে পরিকল্পনা করেই আমি দাদা, শক্তিদা করেছিলুম তা আজ সবাই জানেন ।

ডক্টর দে: ব্যক্তিগতভাবে হাংরি আন্দোলন নিয়ে সে-সময়ে বিদেশি কাদের সঙ্গে আলোচনা হত ? আজকের দিনে হাংরি আন্দোলন বিষয়ে বিদেশিরা এখনও আলোচনা করেন কি।

মলয়:আলোচনা ধরণের তেমন কিছু হত না । তবে, আন্দোলন আরম্ভ হবার পর দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেছে হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড,অ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ ডাউডেন, ওকতাভিও পাজ, ডেইজি অ্যালডান, আরনেস্তো কার্দেনাল প্রমুখের সঙ্গে । বহু লেখক-কবি-সম্পাদকের সঙ্গে যোপগাযোগ ছিল, যাঁরা ম্যানিফেস্টো, কবিতা ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন, যেমন লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, ডিক বাকেন, মার্গারেট র‌্যানডাল, এরিক মটর‌্যাম, জেরোম রোদেনবার্গ, বার্নে রসেট, ক্যারল বার্জ, কার্ল ওয়েসনার, রবার্ট কেলি, গর্ডন ল্যাসলেট, ড্যান জর্জাকাস, আইডা স্পলডিং, লেরয় জোন্স (হামিরি বারাকা), অ্যালান ডি লোচ, অ্যালেন ভ্যান নিউকার্ক, জেমস লাফলিন, ডায়না ডি প্রিমা, জর্জ বাওয়ারিং, পল ব্ল্যাকবার্ন, অ্যালেন হফম্যান, ক্লেটন অ্যাশলেম্যান, ক্যারল রুবেনস্টিন, অ্যার্মন্ড শোয়েনার, টেড বেরিগ্যান, রবের্তো হুয়ারোজ, লিটা হরনিক প্রমুখ । বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনাদের আরকাইভে আমার চিঠি-কবিতা-ম্যানিফেস্টো যে সংরক্ষিত তা ‘গুগল’ সার্চ করলে পাওয়া যায় ।
হাইকোর্টে মকদ্দমার অকল্পনীয় খরচ মেটাতে অনেকে লেখা ছাপিয়ে সাহায্য করতেন । এখানে কমলকুমার মজুমদার এবং অশোক মিত্র আই এ এস ছাড়া কেউ সাহায্য করেননি । কলকাতায় থাকার জায়গাও ছিল না ।
হাংরিয়ালিজম বা আন্দোলনকারীর নামে নেট সার্চ করলে বোঝা যায় যে অবিরাম আলোচনা-মন্তব্য চলছে । বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ভাষায় ।
ওই সময়ে বেনারস-পাটনা-নেপালে বহু হিপি-হিপিনীদের সঙ্গেও সময় কাটিয়েছি, যাঁরা নেশা-যৌনতার যথেচ্ছচারী জীবন কাটাতে ইউরোপ,আমেরিকা, জাপান থেকে আসতেন । ওই সময়ের এক ঝলক আমি ব্যবহার করছি “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে ।

ডক্টর দে: কোন ধরণের কবিতা অমরত্ব পায় ? অর্থাৎ মৃত্যুর পর শত বছর পরও কোনো-কোনো কবিতা আমরা আবার পড়ি । কেন?

মলয়: অমরত্ব ব্যাপারটা বলতে পারব না । বহু কবিতা অ্যাকাডেমিক চত্বরে পঠিত হব, অথচ জনমানস থেকে লোপাট হয়ে যায় । যেমন চর্যাপদ, শূন্যপুরাণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পদাবলী সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, দৌলত কাজী-সৈয়দ আলাওল, মৈমনসিংহগীতিকা, ভারতচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, সবাই অমর । কিন্তু কলেজের বাইরে কেউ পড়ে না।

ডক্টর দে: আমরা কবিতায় ‘আধুনিক’ শব্দটা প্রয়োগ করি । আসলে ‘আধুনিক’ শব্দটা কবিতার বেলায় কতটুকু প্রযোজ্য ? কবিতার আধুনিকতা প্রকৃতপক্ষে কী?

মলয়: একট আগেই এ-বিষয়ে অনেক কথা বলেছিলুম । বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ হলেন সাহিত্যের জলবিভাজক । তাঁর পূর্বের কবিদের পড়লে আমরা বুঝতে পারি লেখাগুলো প্রাগাধুনিক । তাঁর পরের কবিদের লেখা পড়ে বুঝি যে তা আধুনিক । অতএব শব্দটা যে প্রযোজ্য সে-ব্যাপারে সংশয় থাকা নিরর্থক ।
“বদ্ধসূচনা ও বদ্ধসমাপ্তির মাঝে একটি স্বয়ংসম্পূর্ন ভাষা পরিসর যা একরৈখিক অন্তর্বয়নের মাধ্যমে যুক্তিক্রম মেনে নির্মিত, এবং যার বিষয় কেন্দ্রের মালিকানা কবির নিজস্ব, এবং শিরোনামের দ্বারা তিনি তা ঘোষণা করেন, অবশ্যই গৃহপালিত বাকমণ্ডল ব্যবহার করে”। আধুনিক কবিতার এরকম একটা সংজ্ঞা হতে পারে । আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ আধুনিক কবিতা সম্পর্কে বলেছিলেন, “ইট শুড নট মিন, বাট বি” । দীপ্তি ত্রিপাঠী আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য বলার সময়ে যে পয়েন্টগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো উত্তরআধুনিক কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । ওনার সময়ে উত্তরআধুনিক বা পোস্টমডার্ন ব্যাপারটা আসেনি বলে ওনার বক্তব্য থেকে আমরা বঞ্চিত ।

ডক্টর দে: কোন-কোন উপাদানের সাহায্যে বোঝা যাবে যে একটি কবিতা উত্তরআধুনিক?

মলয়: দাদা সমীর রায়চৌধুরী উত্তরঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিতে আধুনিক এবং উত্তরআধুনিক কবিতার তুলনামূলক তালিকা তৈরি করেছিলেন। সেটা দেখেও, তাহলে দুটোই স্পষ্ট হবে । সমীর চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক, যিনি “আংরি জেনারেশান রচনা সংকলন” বের করেছেন, তাঁর সঢ্গে আমার দাদাকে গুলিয়ে ফেলো না যেন।

ডক্টর দে: অভিযোগমত হাংরি কবিতা যদি অশ্লীল হয়, তাহলে রামায়ণ, মহাভারত, গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মনসামঙ্গল অশ্লীল । কোনারক, খাজুরাহো, পুরীর মন্দির অশ্লীল । সাহিত্য-শিল্পে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদ নিয়ে আপনার বক্তব্য চাইব । অশ্লীলতা বিষয়ক হাংরি বুলেটিনে যা বলা হবেছিল, তাছাড়া আর কোনো বক্তব্য আছে কি?

মলয়: সনাতন ভারতবর্ষে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদ যে ছিল না, তা তোমার উল্লেখ করা কাজগুলো থেকেই স্পষ্ট । সনাতন ভারতবর্ষে দেখা হত কাজটা রসশাস্ত্র-অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী হয়েছে কিনা । শৃঙ্গার-রস ব্যাপারটাই তো আদি রস ।
দুর্ভাগ্যবশত আরবি-তুর্কি-আফগানি বিটকেল মূল্যবোধের প্রথম ঝাপটায় সনাতন ভারত ব্যাপারটা লোপাট হয়ে গেল । প্রচুর ভাঙচুর হল । তারপর এল ভিকটোরীয় খ্রিষ্টধর্মীর দল । যেটুকু বেঁচেছিল তা-ও গেল । ওরা অবসিনিটির আইন র্বিটেন থেকে আমদানি করে কী শ্লীল আর কী অশ্লীল তার র্খিষ্টিয় ফতোয়া দিতে লাগল । ওদের আনা মানদণ্ডের চাকর হয়ে গেল ভারতীয়রা । এত পুরু ঔপনিবেশিকতার চাদর জমে গেছে এদেশের চিন্তা-চেতনায় যে তা সহজে যাবার নয় । তার ওপর, সমাজে যারা ছড়ি ঘোরায়, তারা ইংরেজদের আদল-আদরায় নিজেদের সংস্কৃতিমান মনে করে । এঁরাই হাংরি আন্দোলনে অশ্লীলতা খুঁজে বের করেছিলেন ।

ডক্টর দে: যৌনতা ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । মানুষের যৌনক্ষুধা বিলুপ্ত হয়ে গেলে অনেকটা জড়পদার্থে পরিণত হয়ে যায় । যৌনতা মস্তিষ্কগত, যে-কারনে পশুদের মত মানুষের যৌনতার ঋতু হয় না । বিজ্ঞানমতে যার যৌনশক্তি যত প্রখর, তার তত মেধার জোর, এবং সৃষ্টিশক্তি । তাহলে কাব্য-সাহিত্যে এর প্রকাশকে যাঁরা অপরাধ বলেন, তাঁরা কি ঠিক করেন?

মলয়: তারা সব বাঁজা বা হিজড়ে ।

ডক্টর দে: যারা রাজনৈতিক উগ্রপন্হী, তারা বিভিন্নভাবে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে । আমরা শুনেছি, হাংরি আন্দোলনকারীরা ইশতাহার বুলেটিন পোস্টার হ্যান্ডবিল পত্রপত্রিকা বই ইত্যাদি প্রকাশের বাইরে কিছু আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ করেছিলেন । যেমন, সম্পাদককে জুতোর বাক্স দিয়ে বলা হয়েছিল রিভিউ করতে; টপলেস যুবতীর প্রদর্শনী, সাদা কাগজ গল্প-সম্পাদককে দিয়ে বলা হয়েছিল ছাপাতে । বিয়ের কার্ডে কবিতা পাঠের নিমন্ত্রণপত্র তৈরি করা হয়েছিল । “মুখোশ খুলে ফেলুন” লেখা রাক্ষস, ও পশুর মুখোশ মন্ত্রীদের পাঠানো, মাইকেলের সমাধিতে-খালাসিটোলা-কেওড়াতলা শ্ঞশানে কবিতা পাঠের আয়োজন, বাঁকুড়ায় উলঙ্গ অবস্হায় নদী পারাপার, দুমকায় হাড়িয়ার হাঁড়ি বাজিয়ে দোলের সময় উদ্দাম নৃত্য, হিপিনীদের সঙ্গে নেশা ও যৌনতার বেনারসী-নেপালি অনাচার, গ্রন্হের দাম ১৪৪৩৫০০ টাকা রাখা বা ৫০টি টিয়ি সিল রাখা ইত্যাদি । এখন কথা হচ্ছে, হাংরি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যশিল্পে স্হিতাবস্হা ভাঙা । তা করতে গিয়ে এই সমস্ত কার্যকলাপ কেন? হাংরি আন্দোলনকারীদের এই কার্যকলাপের সঙ্গে ডাডা আন্দোলনকারী এবং বিট জেনারেশানের কার্যকলাপের মিল খুঁজে পান আলোচকরা । তা কতটা সত্য? আমার মনে হয়, কেবল সাহিত্যশিল্প চর্চায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে, হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা-মকদ্দমা-হেনস্হা হত না । অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহের অভিযোগে গ্রেপতার হতেন না । তখনকার সাহিত্যিক, রাজনেতা, প্রশাসক, সাংবাদিক, বণিকরা এবং সমাজের গণ্যমান্যরা বাধ্য হয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-মকদ্দমা হয়, এবং কোর্টে ডাকাত ও খুনিদের পাশাপাশি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অপমান ও কারারুদ্ধ করা হয় । অনেক ক্ষেত্রে আপনাদের এই কার্যকলাপকে বয়স্ক শরিকরা, যাঁরা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ছেড়ে হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, অন্তর দিয়ে সমর্থন করেননি, যতটা করেছিলেন সাহিত্যে সহিতাবস্হা ভাঙার আন্দোলনকে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ওগুলো সস্তায় নাম কেনার চেষ্টা । এই সমস্ত অভিযোগ সম্বন্ধে কী বলবেন ?

মলয়: ডাডা আন্দোলনের ত্রস্তান জারা, মিশেল দুশঁ প্রমুখের প্রয়াস ছিল যুদ্ধোত্তর ইউরোপে শিল্পকৃতিকে রিডিফাইন করার প্রয়াস । অ্যালেন গিন্সবার্গ, উইলিয়াম বারোজ, জ্যাক কেরুয়াক প্রমুখ বিট আন্দোলনকারীরা ম্যাককার্থি-পরবর্তী রক্ষণশীল আমেরিকার দমবন্ধকরা আবহাওয়া কাটিয়ে খোলা হাওয়া আনতে চাইছিলেন । আমাদের কার্যকলাপ ছিল দেশভাগোত্তর বিপর্যয়ে আক্রান্ত উত্তরঔপনিবেশিক বঙ্গসমাজের স্হিতাবস্হায় আঘাত দেয়া । অচলায়তনে ফাটল ধরিয়ে মুক্তধারাকে বের করা । কাগজ কলম নিয়ে ঘরে বসে তিনে কত্তে তিন হাতে রইল পেনসিল নয় ।
হামাকে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ডাকাতদের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটানো হল । প্রদীপ চৌধুরী শান্তিনিকেতন থেকে রাস্টিকেট হল । উৎপলকুমার বসু যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপকের চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেন । আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন । সুবিমল বসাক আর দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেয়া হল । কফিহাউসের সামনে লোহার রড, চেন, হকিস্টিক নিয়ে সুবিমলকে ঘিরে ফেলা হল । এগুলো থেকেই তো প্রমাণ হয় যে স্হিতাবস্হায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল ।
ওসব কার্যকলাপে কেউ আতঙ্কিত হয়েছিল বলে তো শুনিনি । ভিরমি খেয়েছিল বা ঘাবড়ে গিয়েছিল বলা যায় । তখন পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্যিকরা ছিল “আর্ট ফর আর্ট সেক”-এর নৌকোয়, যা হাংরি আন্দোলনের ধাক্কায় ডুবে যায় । বঙ্গসমাজের পচনকে যে হাংরি আন্দোলনকারীরাই শনাক্ত করেছিল, বামপন্হীরা নয়, তা এখনকার পশ্চিম বাংলার দিকে তাকালেই টের পাবে ।
আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহু ধান্দবাজি করে নাম কিনেছেন, এ-ব্যাপারে কিছু বললে বড় মুখে ছোট কথা হয়ে যাবে । ওনার গুণগ্রাহী বিশ্বব্যাপী । শক্তি চট্টোপাধ্যাব আনন্দবাজার চাকরি পাবেন বলে উষ্মা প্রকাশ করেন । শৈলেশ্বর আর সুভাষ যে মুচলেকা দিয়েছিল তা বহু লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে ।

ডক্টর দে: আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি হাংরি আন্দোলন শুরুর কথা ভাবা হয়, তাহলে কীভাবে ভাববেন ? দর্শন ধার করার জন্য স্পেঢলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ বইটির প্রয়োজন হবে কি ? নতুন দর্শন যুক্ত করার প্রয়োজন থাকলে কার দর্শন গ্রহনযোগ্য মনে করেন? প্রথম ইশতাহার শুরু করলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী হবে ? ধরা যাক, প্রথম হাংরি ইশতাহার প্রকাশ পাবে তাতে কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, দশফন, সাহিত্য, স্বাধীনতা, মানুষ, বিজ্ঞান, সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি, ক্ষুধা, সংস্কৃতি, ছবি-আঁকা বিষয়ে আপনার অভিমত কি ১৯৬১-৬৫ সময়ের থেকে ভিন্ন হবে ?

মলয়: আমার ‘পোস্টমডার্ন কালখণ্ড ও বাঙালির পতন’ বইটার আর ‘প্রমা’ পত্রিকাব প্রকাশিত ‘উত্তরদার্শনিকতা’ নামের দীর্ঘ প্রবন্ধের জেরক্স তো তুমি নিয়েছ ? গভীরভাবে পড়লেই টের পাবে যে হাংরি বা ওই ধরনের আর কোনো কাউন্টার-কালচারাল আন্দোলন সম্ভব নয় । বিশ্ব এখন দ্রুতি-আক্রান্ত, প্রযুক্তি তাবৎ অনুমানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে প্রতিটি সমাজের ম্যাক্রো ও মাইক্রো স্তর । যাবতীয় অ্যিধার ভাবসীমা হয়ৈ গেছে পরিধিহীন ।

ডক্টর দে: আন্দোলনের শুরুতে সম্পাদনার দায়িত্ব, প্রচার ও প্রসারের জন্য হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়কে আবিষ্কার করেছিলেন । আজকের দিনে আন্দোলন শুরু করতে গেলে এই কাজের জন্য কাকে খুঁজে আনবেন? নেতৃত্বের জন্যই বা কোন অগ্রজকে চিহ্ণিত করবেন?

মলয়: আর কোনো অমন আন্দোলন যে সম্ভব নয় তা তো একটু আগেই বলেছি । সাব-অলটার্ন কবি-লেখকরা আজ নিজের জোরে সাহিত্য-পরিসর গড়ে নিয়েছেন । তারাই বরং সংখ্যায় বেশি । তাঁরা এনেছেন নিজস্ব শব্দভাঁড়ার, অভিয়ভক্তি, ডিকশন, ভাষাবিন্যাস । এই মুহূর্তে কবিতায় অনিকেত পাত্র আর ফিকশানে অনিল ঘড়াইয়ের নাম মনে পড়ছে ।
হাংরি আন্দোলনে আগে পর্যন্ত তুমি ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ ইত্যাদি পত্রিকা দ্যাখো । নিম্নবর্গের একজন কবির কবিতাও পাবে না, কেননা, ওই শ্রেণির ভাষাকাঠামো অভিজাত সম্পাদকের স্বকৃতি পেত না । ইউরোপ তখন ওনাদের মাথায় চেপে বসেছিল । হারাধন ধাড়া বললে ওঁর অবশ্য খারাপ লাগে, কেন জানি না । তাই পালটে করেছেন দেবী রায় । হয়ত ঠিকই করেছেন ।

ডক্টর দে: ‘হাংরি’ এই যে অভিধা, তা একটি কবিতা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিলে পাঠকদের সুবিধা হয় ।

মলয়: তুমি ‘জখম’ কবিতাটাই নাও না । ওই কালখণ্ডের পুরো বঙ্গসমাজকে নিজের হাঁ-মুখে ঢুকিয়ে নিয়েছে পাঠবস্তুটা । তারপর পংক্তির পর পংক্ত উগরে দিয়েছে পাঠকের সামনে । ওই পাঠবস্তুটি তার সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তখনকার তাবৎ সাহিত্যিক অনুশাসনকে অস্বীকার করে কবিতা হয়ে উঠতে চেয়েছে । পাঠবস্তুটি তার হাঁ-মুখে পোরার জন্যে কোনো বাদবিচার করছে না । পাঠবস্তুটা সে-কারণে বিষয়বস্তুহীন, শিরোনাম দিয়ে বিষয় চিহ্ণিত হচ্ছে না । তার কোনো ব্রেকফাস্ট টাইম, লাঞ্চ টাইম, ককটেল টাইম, ডিনার টাইম, পর্ব নেই । পাঠবস্তুর শুরু ও শেষ দু-ই মুক্ত । তা সর্বগ্রাসের আগে গণ্ডুষ ও শেষে আচমন করছে না । বানানের, শব্দের ও ছন্দের যথেচ্ছাচারে লিপ্ত, দু-হাতে খাবার মতন । সর্বোপরি, ওটি ‘সাওয়ার হাংরি টাইমের ‘ কবিতা । প্রতীক বর্জিত, ছেঁড়াখোঁড়া চেবানো চিত্রকল্প, কোনটা আগে আর কোনটা পরে গ্রাস করার বালাই নেই বলে পাঠবস্তুর পংক্তিরা অনুক্রমহীন ।গোগ্রাস খাবার মতন যেখান থেকে ইচ্ছা পড়া যায় । বাইনারি অপোজিশান বা যুগ্মবৈপরীত্যের মূলকাঠামোকে চুরমার করা হয়েছে, যার দরুন হরেকরকম ‘আমি’ ছড়িয়ে আছে পাঠবস্তু জুড়ে, অর্থাৎ পাঠবস্তুর হাঁ-মুখও অতগুলো । ‘জখম’-এর আগে দীর্ঘ কবিতা হত নদী-প্রবাহের মতো । ‘জখম’, পক্ষান্তরে, তৃণভূমির মতন । টৃণের মতন পংক্তিগুলো পরস্পরের সঙ্গে একযোগে যুক্ত ও বিযুক্ত । তৃণভূমির মতই এর ব্যাপ্তি বিশাল, এবং যতবার পড়বে তার বৃদ্ধি ঘটবে । লক্ষ্য করো, পাঠবস্তুটির হাঁ-মুখে ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, সমায়, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছু নির্বিচারে সেঁধিয়ে যাচ্ছে । ফিকশানে তুমি বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ পড়ো ।

ডক্টর দে: আজকের দিনের কবিতায় হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যকৃতি প্রভাব ফেলতে পেরেছে কি ? অথাৎ আজ বহু প্রকার কবিতা লেখা হচ্ছে । সবারই নিজস্ব বোধভূবন রয়েছে । এই ভুবনে হাংরি কবিতার সাহিত্য-দর্শন বা ক্যানন প্রতিফলিত হয় কি ?

মলয়: কেবল কবিতা কেন, সাহিত্যের সব এলাকায় প্রবেশ করেছে হাংরিয়ালিস্ট ক্যানন, এমন কি পত্রিকার নামকরণেও । ১৯৬১-৬৫-র আগের ও পরের সাহিত্য বিশ্লেষণ করে দ্যাখো, তাহলেই চোখে পড়বে । শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিন পরিসরে তা সীমিত নয়; বাণিজ্যিক লেখকরাও হাংরি আন্দোলন থেকে প্রচুর মাল-মশলা খড়কুটো নিয়েছেন । এই তো কয়েকদিন আগে নারায়ণ ঘোষের চিঠি পেলুম, যাতে উনি বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন । তুমি তো পি এইচ ডি করছ, তুমি আরো ভালো বলতে পারবে। এই কিছুক্ষণ আগেই একটা প্রশ্নে তুমি নিজেই বলছিলে যে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমন অনেকের কবিতায় হাংরি বৈশিষ্ট্য দেখা যায় । তবে?

ডক্টর দে: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ২০০০ সালের শেষে বিশ্ব কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছে, মডার্ন অ্যাণ্ড পোস্টমডার্ন পোয়েট্রি অব দি মিলেনিয়াম শিরোনামে । তাতে বাংলা সাহিত্য থেকে কেবল আপনার কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতার অনুবাদ Stark Electric Jesus, তা কি এই জন্য যে আপনার সঙ্গে প্রধান-প্রধান বিট কবিদের যোগাযোগ ছিল ? ইউরোপ-আমেরিকার পত্রপত্রিকায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি সে সময়ে কী ভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল ? বাঙালি সাহিত্য আলোচকরা তো সে-সময়ে কবিতাটিকে প্রাপ্য সন্মান দিতে কুণ্ঠিত ছিলেন ।

মলয়: কেবল বিটরা নন, অন্যান্য গোষ্ঠির কবিদের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু হয়ে উঠেছিল কবিতাটা, কেননা তাঁদের সাহিত্যের প্রেক্ষিতেও একেবারে নতুন ছিল প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার । আমার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যেমন হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, ডেভিড অ্যানটিন, রবার্ট ক্রিলি, জোয়েল ওপেনহাইমার প্রমুখের যোগাযোগ ছিল, যাঁরা ছাত্রদের ওয়র্কশপে কবিতাটা বিশ্লেষণ করেছেন ।
ড্যান ব্রাউনের ‘দা ভিঞ্চি কোড’ প্রকাশিত হবার পর Stark Electric Jesus একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে । সেটা তুমি গুগল সার্চ করলে নেটে দেখতে পাবে । খ্রিষ্টধর্মীদের মাঝে কবিতাটা অন্য ব্যাখ্যা পাচ্ছে । যিশুকে তাঁরা এখন ‘স্টার্ক’ এবং ‘ইলেকট্রিক’ রূপে দেখছেন, এবং তা সেই সময়ে, যখন তিনি ক্রস নিয়ে প্যাশানে আক্রন্ত । একটি ব্যাখ্যায় কবির প্রেমিকা শুভাকে তুলনা করা হয়েছে মেরি ম্যাগডালেনের সঙ্গে ।
‘কৌরব’ পত্রিকার সম্পাদক আর্যনীল মুখোপাধ্যায়, যিনি আমেরিকায় থাকেন, লিখে জানিয়েছেন যে বহু ইংরেজি-ভাষী কবির কাছে তিনি এই কবিতাটার কথা শুনেছেন । আমার মনে হয় কবিতাটা নানা ভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য বলেই হাজার বছর পূর্তি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । তাছাড়া, কনটেমপোরারি অথর্স অটোবায়োগ্রাফি সিরিজ-এ প্রকাশিত আমার আত্মজীবনী স্নাতক ক্লাসে ‘অটো-এসে’ নামের সেশানে অনেক সময়ে পড়ানো হয় ।

ডক্টর দে: ‘জখম’ কবিতা যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন অনেকে বলেছিলেন রচনাটি গিন্সবার্গের ‘হাউল’ এবং ‘ক্যাডিশ’ এর অনুকরণে লেখা । তারপর আপনি, বিকাশ সরকার, আশেক তুহিন, শুভঙ্কর দাশ বই দুটি অনুবাদ করার পর যখন তাঁদের ভুল ভাঙল, তাঁরা বললেন, ‘জখম’ কবিতা ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘লিভস অব গ্রাস দ্বারা প্রভাবিত । ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকায় (জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৯৯) কেদার ভাদুড়ির সাক্ষাৎকার নেবার সময় আপনি বলেছিলেন যে ‘জখম’ কবিতার টোনাল স্ট্রাকচার গঠনের সময় মাথায় ছিল ফেনটন জনসনের ‘টায়ার্ড’, রিচাডফ রাইটের ‘বিটুইন দি ওয়ার্লড অ্যাণ্ড মি’ এবং ক্রস্টোফার স্মার্টের ‘জুবিলেট অ্যাগনো’ কবিতাগুলো । আপনাদের সময়ে কবিতার যে সংজ্ঞা ছিল তার সঙ্গে ‘জখম’ কিন্তু খাপ খায় না । আপনি কি বলবেন?

মলয়: ‘লিভস অব গ্রাস’, ‘টায়ার্ড’ ‘বিটুইন দি ওয়ার্লড অ্যাণ্ড মি’ আর ‘জুলিয়েট অ্যাগনো’-র গতিময়তা ‘জখম’ থেকে বর্জিত । দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের কাউবয়রা গিটার বাজিয়ে ‘লিভস অব গ্রাস’ গায় । ‘জখম’ তো বাংলা ব্যাণ্ডো গাইতে পারবে না, এমনই আপাত-অনুক্রমহীন ও নিঃছন্দ এর গঠন । বাংলা বাক্য, শ্বাসে ধরে রাখার সঙ্গে ইংরেজি বাক্য ধরে রাখার সময়-পার্থক্য আছে । তবে এটা ঠিক যে, কবিতার সংজ্ঞার আমি তোয়াক্কা করিনি ‘জখম’ লেখার সময় । যা ইচ্ছে, যেমন ভাবে ইচ্ছে, লিখে গেছি । কে কী বলবেন, এসব ভেবে হাংরি আন্দোলনের সময়ও লিখিনি, এখনও লিখি না । কবিতাটা নিজেই কবিতাকে সংজ্ঞাহীন করে দিয়েছে, এরকমও ভাবতে পারো ।

ডক্টর দে: তাহলে কি ধীমান চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, রঞ্জন মৈত্র, প্রণব পাল, অলোক বিশ্বাস, আর্যনীল মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ভাষা বদলের কবিতা, অতিচেতনার কবিতা, ভাষা ভাবনার কবিতা ইত্যাদি আপনাদের খুলে দেয়া সিংহদ্বার দ্বারা উপকৃত?

মলয়; দেশ-কাল-পাত্রের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে লেখালিখি । আমি বাণিজ্যিক বা সরকার-পোষ্য লেখালিখির কথা বলছি না । যাঁরা নিজস্ব ঢঙে লেখালিখি করতে চান, কারোর পরোয়া করেন না, তাঁদের জন্যে একটা খোলা হাওয়ার চত্বর গড়ে দিয়েছে হাংরি, শ্রুতি আর নিমসাহিত্য আন্দোলন । তুমি যাঁদের নাম বললে, তাঁরা আউটস্ট্যান্ডিং কাক করছেন । ওনাদের কবিতা পড়ে মনে হয়, পরের প্রজন্মের জন্যে আর কিছু বাকি রইল না ।

ডক্টর দে: হাংরি, অনেকে বলেন, বাংলা সাহিত্যের জলবিভাজক ঘটনা । কিন্তু হলদিয়ায় প্রতিবছর যে বিশ্ব কবিতা উৎসব হয়, তাতে আপনাকে এবং প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবো আচার্য, ত্রিদিব মিত্র, সুবিমল বসাক প্রমুখকে কখনও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি । কেন?

মলয়: আমরা কারোর প্রতি অনুগত নই বলে । আমাদের কখনও যেতে বলা হয়নি । অথচ কেউ প্রশ্ন তুললে কর্তাব্যক্তিরা বলেন যে, তাঁরা নাকি প্রতিবছর আমন্ত্রণ জানান । ওটা নন্দীগ্রাম-খ্যাত রাজনীতিক লক্ষ্মণ শেঠ মশায়ের মহোৎসব ল বহু কবির জামাকাপড়ে সেসব রক্ত আর অশ্রুজল লেগে আছে ।

ডক্টর দে: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্হ ‘শয়তানের মুখ’-ও একটি সময়-চিহ্ণকারী ঘটনা । হাংরি আন্দোলনের সময়ে–১৯৬৩ সালে– কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল । কৃত্তিবাসের ওয়েবসাইটে আপনার এবং এই কাব্যগ্রন্হের কোনো উল্লেখ নেই । আপনার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’ পখাশিত হয়েছিল কৃত্তিবাস থেকে । তাঁরও উল্লেখ নেই । পঞ্চাশবর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকেও আপনারা দুজন বর্জিত । একে কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মলয়: এটা হাংরি আন্দোলের সাফল্যের স্বীকৃতি । নয়তো দাদাকে তো বাদ দেবার কারণ ছিল না । দাদা তো কৃত্তিবাসের ফণীশ্বরনাথ রেণু সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন । পত্রিকার জন্যে দীপক মজুমদারের সঠ্গে দৌড়ঝাঁপ করতেন । চাইবাসা, দুমকা, ধানবাদ, ডালটনগঞ্জ, লাহেরিয়া সরাই, ভাগলপুর, মুজফফরপুর ইত্যাদি যেখানে-যেখানে দাদার পোস্টিং হয়েছে, শক্তি-সুনীল-সন্দীপন প্রমুখ সেখানে দল বেঁধে গিয়ে দিনের পর দিন থেকেছেন । এসটাবলিশমেন্টের হাজার চেষ্টা সত্বেও হাংরি আন্দোলন যদি ছেয়ে ফেলতে থাকে তো তার দায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ।
এসটাবলিশমেন্ট চিরকালই ইতিহাসকে বিকৃত করতে চায় । শক্তি চট্টোপাধ্যাব দাদার কুঁড়ে ঘরে বছর দু-তিন ছিলেন । উনি দাদার এক শ্যালিকার প্রেমে পড়েছিলেন । সম্প্রতি মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় আর সমীর সেনগুপ্ত চাইবাসা গিয়ে শক্তি সম্পর্কে শুটিং করে এসেছেন । আমাদের সম্পর্কে ভীতি কেন এবং কোন স্তরে কাজ করছে ভেবে দ্যাখো ।

ডক্টর দে: সাহিত্যে প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করলে চিরকালই পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করার কথা অনুমান করা হয় । অনেকে মনে করেন যে হাংরি আন্দোলন, যা ষাট দশকের আন্দোলন, তা ্রভাবিত করেছে পঞ্চাসের দশকের বেশ কয়েকজন কবিকে । আপনিও কি তাই মনে করেন?

মলয়: হ্যাঁ । ১৯৬১ সালের আগে লেখা ওনাদের কবিতা পড়ে দ্যাখো আর পরের কবিতা পড়ে দ্যাখো । পুরোপুরি বদলে গেছে । কবিতায় গুরুচণ্ডালী নিয়ে এলুম আমরা, ছন্দপতন নিয়ে এলুম আমরা, অথচ দাবি করছেন ওনারা । কলকাতা-পাটনা=বেনারস-কাঠমাণ্ডু ইত্যাদি শহরে রাত্রীকালীন হ্যাপেনিং শুরু করলুম আমরা, অথচ সেসব ঘটনা ওনারা নিজেদের লেখালিখিতে ঢুকিয়ে নিলেন । তোমার তো বয়স কম; পরে বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে দেখো, বিশ্লেষণ কোরো । হাংরি আন্দোলন গিন্সবার্গকেও প্রভাবিত করেছিল, সে থত্য তুমি নেট সার্ফ করলেই পাবে ।

ডক্টর দে: রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শক্তি প্রমুখের কবিতায় প্রেমাস্পদকে গবেষকরা চিহ্ণিত করে ফেলেছেন । আমরা জেনেছি তাঁরা সব বাস্তব । কবিরা তাঁদের পাননি । আপনার কবিতায় নারীরা কি বাস্তব? না কি কাল্পনিক?

মলয়: বাস্তব । তবে, আমার প্রেমের কবিতা সেই অর্থে প্রেমের কবিতা নয়, যে অর্থে ওই তিন কবির । আমি ্রেমের মধ্যে থাকাকালীন নিজের মনঃস্হিতিতে নেশাগ্রস্ত থেকেছি । সে-কারণে একজন নারী তিন-চার বছরেই আকর্ষণ হারিয়েছেন । বা বলা যায়, প্রেমের মনঃস্হিতি ক্রমশ উবে গেছে । এটা কলেজে ঢোকার পর থেকে ঘটতে থেকেছে । অনেকে একে অনৈতিক বলবেন, স্বার্থপরতা বলবেন । ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর’ পর্যন্ত আমি আবিরাম প্রেমের মনঃস্হিতিতে থাকতে চেয়েছি । উপন্যাসগুলোয় বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে এই মনঃস্হিতিকে ধরবার চেষ্টা করেছি । ‘মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর’ -এর নারী আমার চায়ে কুড়ি বছরের ছোট ছিলেন । প্রায়ই আত্মহত্যার হুমকি দিতেন । শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করেন, অথচ তখন তাঁর বিয়ে বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেছে ।

ডক্টর দে: আপনি কখনও আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন?

মলয়; হ্যাঁ । ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল আশানুরুপ না হওয়ায় । পটাশিয়াম ফেরিসায়েনাইড খেয়ে, যে কেমিকাল তখনকার দিনে বাবার ফোটোগ্রাফি ব্যবসায় প্রয়োজন হত । পিসেমশায় ধরে ফেলেছিলেন । ওরই বড়ছেলে সেন্টুদা, মানে অজয় হালদার, যাঁর কথা তুমি একবার জানতে চেয়েছিলে । শক্তিদাকে উনিই মদ খেয়ে বেহেড হবার পথে নিয়ে যান । ওই বেহেড হবার কারণেই মারা যান শক্তিদা । আমাকে পিসেমশায় আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে আত্মহত্যা করে মারা যান । ‘অপ্রকাশিত ছোটগল্প’ বইতে ‘তিনকড়ি হালদার’ নামে গদ্যটা ওনাকে কিয়ে লেখা ।

ডক্টর দে: আপনার প্রবন্ধগুলো নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশের কথা ভেবে দেখেছেন?

মলয়: কেউ বের করতে চাইলে বেরোবে । আমার তো কোনো রচনার কপিরাইট নেই। কিছু প্রবন্ধ ফাইলবন্দি হয়ে আছে কবিতীর্থ প্রকাশনীর উৎপল ভট্টাচার্যের কাছে আর কিছু প্রবন্ধ আরেকটা ফাইলে আবিষ্কার প্রকাশনীর মুর্শিদ এ এম-এর কাছে, যিনি প্রচুর পরিশ্রম ও বহু টাকা খরচ করে আমার কবিতাসমগ্র ১৯৬১-২০০৪ বের করেছেন ।

(ঋণস্বীকার: সম্পাদক, স্বপ্ন পত্রিকা,নবীনচন্দ্র কলেজ, ডাক: বদরপুর, অসম ৭৮৮৮০৬ । মোবাইল নং ০৯৮৬৪৯০৮৭৯৯)

[মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ২০০৪-১৯৬১ বইটির প্রকাশক: আবিষ্কার প্রকাশনী, ১২এ বাঁশদ্রোণীঘাট রোড
কলকাতা ৭০০০৭০, ফোন: ০৩৩-২৪১০-৫১৩২, মোবাইল: ০৯৮৩০৩৩১০৯২, দাম: ভারতীয় ১৫০টাকা]
[মলয় রায়চৌধুরীর ছোটোলোকের ছোটোবেলা বইটির প্রকাশক: চর্চাপদ পাবলিকেশন, ১৩বি রাধানাথ মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০০১২, ফোন: ০৩৩-২২৫৭-৩১৪৪, মোবাইল: ০৯৮৩০৩৭৯৮৪২. দাম ভারতীয়: ১৫০টাকা]
[মলয় রায়চৌধুরীর তিনটি উপন্যাস বইটির প্রকাশক: তেহাই প্রকাশনী, এবি ২৯ অটল আবাস, দেশবন্ধুনগর, বাগুইআটি, কলকাতা ৭০০০৫৯, মোবাইল: ০৯৮৩১৫৭৯৮৮২ এবং ০৯০৫১৩৬৮৯০৬. দাম ভারতীয় ২৫০ টাকা]

 
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ

শুনেছি তাঁর মেজাজ মর্জি রাজকীয় । শুনেছি তাঁর প্রতিটি বাক্য কোটেবল । শুনেছি তাঁর কথার ধারে কেটে যায় আপাত নিরীহ জিজ্ঞাসা । দেখলাম তিনি স্ট্রেট ব্যাটে খেলেন । দেখলাম তিনি লোপ্পা ক্যাচ দেন না । দেখলাম তিনি আন্তরিক ডাকে সাড়া দেন স্নেহশীল বর্মের আড়াল থেকেই । দেখলাম তিনি ব্রাত্যজনেরও সখা । তিনি জীবন্ত কিংবদন্তী মলয় রায়চৌধুরী । পড়ুন তাঁর আনএডিটেড সাক্ষাৎকার এবারের শব্দের মিছিল এর ‘একমুঠো প্রলাপ’ এ । শব্দের মিছিল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনায় এক গবলেট চিয়ার্স । 

 
রাষ্ট্রের সাথে আপনার সম্পর্ক তো প্লেটোর তত্ত্বকেই প্রামাণ্য দেয় । কিন্তু প্লেটো যেটা জানতেন না তা হল মলয় রায়চৌধুরী রা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন । আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ব্যাপারটা ? 

না, না । ভুল ধারণা । নিৎশে বলেছেন যে প্ল্যাটোর দর্শনের কারণেই খ্রিস্টধর্ম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল । প্ল্যাটোর শিক্ষক ছিলেন সক্রেটিস এবং ছাত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল । সেইন্ট অ্যাকুইনাস খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য প্ল্যাটোর দর্শনের আশ্রয় নিয়ে ছিলেন । প্ল্যাটোই প্রথম প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনা করেছিলেন অ্যাকাডেমি স্হাপনের মাধ্যমে, যা রোমানদের সময় পর্যন্ত বজায় ছিল । আর এসট্যাবলিশমেন্ট বলতে বোঝায় ক্ষমতার কেন্দ্র । প্ল্যাটো তাঁর দর্শনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন ; আমি কোনও ক্ষমতার কেন্দ্র নই । পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতার কেন্দ্রে কারা । রাজনৈতিক দলগুলো, বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, রামকৃষ্ণ মঠ, বাংলা অ্যাকাডেমি ইত্যাদি । আমি এই সমস্ত ব্যাপারে আউটসাইডার।

 
বিতর্ক কখনোই আপনার পিছু ছাড়ে নি । আপনি কেমন এনজয় করেন এটা ? বিতর্ক কি কিছুটা সচেতন ভাবে আপনার নিজেরই তৈরি না কি এটাকে ভবিতব্য হিসেবে দেখেন ?

বিতর্ক এনজয় করি ঠিকই, কিন্তু বিতর্ক আমার তৈরি করা নয় । আমার বিরোধিদের সংখ্যা প্রচুর, তারাই বিতর্ক বজায় রাখে । সম্ভবত আমি যে ধরণের লেখালিখি করি আমার রচনাবলী বিতর্কিত হতে বাধ্য । আমি মূলত সমাজের পর্যবেক্ষক এবং নিজের মতামত উপস্হাপন করি । তাছাড়া হাংরি আন্দোলনের মামলা, তাতে শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষের রাজসাক্ষী হওয়া, এবং সেই সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হওয়াটাও বিতর্কের কারণ ।

 
জাদুবাস্তবতা বাংলা সাহিত্যে নতুন নয় । কিন্তু এটার সার্থক আধুনিকীকরণ করলেন আপনি । এই ঝোঁকটা কিভাবে কেন এল আপনার মধ্যে বলবেন ?
 

আমি লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভ টেকনিক নেবার বদলে ঠাকুমার ঝুলি আর বেতাল পঞ্চবিংশতির ল্যাবিরিন্হকে অনুসরণ করার প্রয়াস করেছি । শৈশবে বড়ো জেঠাইমা আমাদের গল্প বলতেন অভিনয় করে, লন্ঠনের আলোয়, তার প্রভাব রয়ে গেছে স্মৃতিতে । আমি রাক্ষস-খোক্কোস ইত্যাদিদের এখনকার মানুষ হিসাবে উপস্হাপন করতে চেষ্টা করেছি ; জীবজন্তুদেরও মানুষের চরিত্র দিয়েছি । বস্তুত আমি সচেতনভাবে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা এড়িয়ে গেছি ।

 
মলয় রায়চৌধুরী কথা বলছেন , কিন্তু অ্যালেন গিন্সবার্গের সাথে বন্ধুত্বের প্রসঙ্গ উঠবে না তা হয় না । ‘হাউল’ লিখে ওনার যে পরিণতি হয়েছিল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ এর জন্য আপনারও তাই । আপনি সেকুলার আর উনি পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন । উনি রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে গেলেন অনেকটাই । আপনি ? কি চোখে দেখেন রাজনীতিকে ?
 
গিন্সবার্গ বলতো যে ঈশ্বর নামের কোনো সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি হতে পারে না । উনি তাই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন, হিন্দুধর্মের সমস্যা ছিল যে তাতে জাতপাতের সমস্যা, যখন কিনা ভারতে এসে হিন্দু গুরু আর গডম্যানদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করেছিলেন উনি । আমি নিজেকে ইন্সটিংকটিভ হিন্দু বলি, কিন্তু অরগ্যানাইজড হিন্দুধর্মের প্রতি আমি সমর্পিত নই, তার কারণ আমি সারা জীবন ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছি, এক জায়গায় থাকিনি, ফলে ধর্মের শেকড় গজিয়ে ওঠেনি । আমি যে সেকুলার সেটাও ইন্সটিংকটিভ, কোনো বই পড়ে বা চিন্তাভাবনা করে নয় । রাজনীতি, ভারতবর্ষে, আমেরিকার সঙ্গে তুলনীয় নয় । আমি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ইনভলভড নই, কিন্তু আমার প্রবন্ধগুলো, গল্পগুলো, এমনকি কবিতাও, আমার রাজনৈতিক মতামত বহন করে ।
 
আপনার কবিতা বা হাংরি আন্দোলন নিয়ে জানার গবেষণাধর্মী বই যেমন আছে বাজারে তেমনি আছে হাংরি শিবিরের বিভাজনের মুচমুচে পেজ থ্রি টাইপ স্টোরি । এই বিভাজন কি শুধুই মতাদর্শগত নাকি খানিকটা ইগোর লড়াইও ? অ্যাকাডেমিক ভিউ পয়েন্টের বাইরের চোখ দিয়ে দেখে যদি বলেন …
 

একটু আগে যেমন বলেছি, মামলার সময়ে বন্ধুরা রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছিল, এবং সেই গ্লানি থেকে তারা মুক্ত হতে পারেনি । তারাই বিভাজনটা গড়ে তুলেছিল । আমি তো মাঝে লেখালিখি করতে পারিনি নানা কারণে । কলকাতায় এসে শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপ, সন্দীপন, শক্তি, উৎপল সকলের সঙ্গে দেখা করেছিলুম । কিন্তু বুঝতে পারলুম ওনারা আত্মগ্লানির বিষ ঝেড়ে ফেলতে পারেননি, বরং আমার বিরুদ্ধে ফলাও করে কুৎসিত কথাবার্তা অবিরাম লিখে গেছেন । এটা ইগোর লড়াই নয় । এটা আত্মসন্মানবোধের ব্যাপার । মতাদর্শগত বিভাজনের তো প্রশ্ন ওঠে না কেননা সব কয়টা ইশতাহার আমিই লিখেছিলুম । তবে শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব — ওরা সবাই সিপিএম গদিতে বসতেই সিপিএমে যোগ দিয়েছিল, তাদের মিছিলে ইনক্লাব জিন্দবাদ করে বেড়াতো । এই জিনিসটা আমি মেনে নিতে পারিনি । এ কেমন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ? সিপিএম তো ছিল ভয়ংকর এক অত্যাচারী প্রতিষ্ঠান !

 
জন্ম পটনায় । কর্ম মুম্বাইতেই বেশিটা । এদিকে কোলকাতা কানেকশান একদম শহরের ইতিবৃত্তের সাথে জড়িত । আবার এই কোলকাতাই আপনার জীবনের সাময়িক বিড়ম্বনার কারণ । আপনি কি নিজভূমে পরবাসী রয়ে গেলেন তবে ?
 

না, মুম্বাইতে কর্ম বেশি বলা উচিত হবে না । চাকুরিসূত্রে আমি পাটনা, লখনউ আর কলকাতাতেও অনেকটা সময় কাটিয়েছি । বুড়ো বয়সে মুম্বাই চলে এসেছি প্রধানত চিকিৎসার সুবিধার জন্য । আমার ও আমার স্ত্রীর দুজনেরই নানা রকমের রোগ । অফিসের ডিসপেনসারিও আমাদের বিল্ডিঙের পাশে । কলকাতায় নাকতলা থেকে ট্যাক্সি করে প্রতিবার যেতে হতো পার্ক স্ট্রিট আর প্রচুর টাকা খরচ হতো । কেবল পেনশনে চালানো বেশ কঠিন । কলকাতায় যখন বিভাগীয় প্রধান ছিলুম, আমি স্ত্রীকেও সঙ্গে ট্যুরে নিয়ে যেতুম পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের জীবনের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য । সিপিএমের ক্যাডারদের ভয়ে অনেকে প্রকৃত তথ্য দিতে ভয় পেতো তাই হিন্দি-উর্দু প্রয়োগ করে, অবাঙালি সেজে তথ্য আদায় করতুম । স্ত্রীকে বলতুম চাষি-তাঁতি-জেলেদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে তথ্য যোগাড় করতে । আমার “নামগন্ধ” উপন্যাসের ও “নখদন্ত” ফিকশানের তথ্য এই ভাবেই সংগ্রহ করা । আমি সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্য ঠিকই কিন্তু আমার প্রজন্মে পৌঁছে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল, আমার শৈশবস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে টের পাবে ।

 
হাংরি স্টাইল কি আপনার সাথেই শেষ হয়ে যাবে না কি আছেন কেউ সার্থক ধারক বাহক ? আপনার মুখ থেকেই শুনতে চাই ।
 

বহু তরুন নিজেদের হাংরি আর নিও হাংরি ঘোষণা করে লেখালিখি করছেন । ফেসবুকে কয়েকটা কমিউনিটি পেজও আছে তাঁদের । দেখেছি তাঁদের লাইক সংখ্যা তিনহাজার-চারহাজারে পৌঁছে গেছে । আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নেই । তাঁরা নিজেদের মতো করে যা ইচ্ছা লিখে চলেছেন । জানি না তাঁদের ধারক-বাহক বলা যায় কিনা কেননা আমি পড়ার তেমন সময় পাই না । তবে সামগ্রিকভাবে যে হাংরি আন্দোলনের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে ছায়া ফেলেছে তা অস্বীকার করা উচিত হবে না ।

 
আপনার অনুবাদকর্ম তো প্রচুর । আর সেটা অদ্ভুত একটা কম্বিনেশান । কখনো উইলিয়াম ব্লেকের মত রোম্যান্টিক মুভমেন্টের কবিকে বেছেছেন তো কখনো আঁরত্যুর র্যারবো , আঁন্দ্রে ব্রেটন বা ত্রিস্তান জ্যারা । সবাই এক একটা লিটেরারি মুভমেন্টের জনক বলা যেতে পারে । এই বাছাই কি নেহাতই কাকতালীয় নাকি কোন সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনার ফসল ? 
 
যাঁদের মনে হয়েছে আমার চিন্তাজগতের নিকটবর্তী, আমি তাঁদের অনুবাদ করেছি । কাকতালীয় নয় । আমি র্যাঁমবোর “নরকে এক ঋতু”ও অনুবাদ করে একটি পত্রিকা সম্পাদককে পাঠিয়েছিলুম, কিন্তু তিনি তাঁর কলেজ স্ট্রিটের দপতর বিক্রির সময়ে দপতরে একত্রিত যাবতীয় পাণ্ডুলিপিও ক্রেতাকে হস্তান্তর করে দিয়েছিলেন ; আমি কপি রাখিনি । এই দুঃখটা রয়ে গেল ।
 
 ‘সূরজ কা সাতোয়াঁ ঘোড়া’ অনুবাদের জন্য আপনাকে ‘সাহিত্য অ্যাকাদেমী’ দিতে চাওয়া হয়েছিল , আপনি নিলেন না । আপনার মৌলিক কোন লেখার জন্য যদি আজ আবার প্রস্তাব আসে , নেবেন ?

আমি কোনো পুরস্কার নিই না । পুরস্কার মানেই দাতার মূল্যবোধ তার সঙ্গে জড়িয়ে । ঈশ্বর ত্রিপাঠী আমার বাড়িতে এসে অনুষ্ঠান করে পুরস্কৃত করতে চেয়েছিলেন, আমি রাজি হইনি । আরও কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন আমাকে সম্বর্ধিত করতে চেয়েছিলেন আমি রাজি হইনি । সেই দিক থেকে মুম্বাইতে এসে বেঁচে গেছি ।

 

‘ বাইশে শ্রাবণ’ এ গৌতম ঘোষ কতটা পেরেছেন আপনার ম্যনারিজম ফুটিয়ে তুলতে ? রোলটা কি আপনি নিজেই করতে চান কখনো ? কোন পরিবর্তন হবে তাহলে স্ক্রিপ্টে ?

 

ওটা একটা মোস্ট ইডিয়টিক রিপ্রেজেন্টেশান । গৌতম ঘোষের সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল, শান্তিনিকেতন যাবার ট্রেনে । জানি না উনি কোন হাংরি কবির ম্যানারিজম ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন । আমাদের উত্তরপাড়ার আদিবাড়ি ওই রকম খণ্ডহর হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু আমরা কেউই লেখা ছাপাবার জন্য হাপিত্যেশ করতুম না । নিজেরাই ছাপাতুম আর বিলি করতুম, কোনো লিটল ম্যাগাজিনকে অনুরোধ করতে হয়নি কখনও লেখা ছাপাবার জন্য । কেউ যদি ফিল্ম করতে চায় তাহলে একেবারে প্রথম থেকে হাংরি আন্দোলনকে নিয়ে ফিল্ম করতে হবে । কোনো ফিল্মে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাংরি আন্দোলনকে ঢুকিয়ে দেয়াটা ইডিয়টিক । বিট আন্দোলন নিয়ে, অ্যালেন গিন্সবার্গকে নিয়ে, র্যাঁ বোকে নিয়ে ফিল্ম হয়েছে, কিন্তু কোনোটাই বাইশে শ্রাবণের মতন ইডিয়টিক ফিল্ম নয় ।

 
 
 
 
 

 
   
 
Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোলাম রাব্বানী

দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস: মলয় রায়চৌধুরী

তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। ‘প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি ।

গোলাম রাব্বানী
ফিচার এডিটর
০৫ অক্টোবর ২০১৫, সময় – ১২:৫৩

ছবি সংগৃহীত

ছবি: সংগ্রহ

(প্রিয়.কম) মলয় রায়চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি.দে মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন বিষয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের জন্য পিএচ.ডি. সন্মান দ্বারা ভূষিত হয়েছেন । ২০১৩ সালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক রিমা ভট্টাচার্য । ১৯৯৭ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক উদয়নারায়ণ বর্মা । আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে মলয় রায়চৌধুরী এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ‘প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। শয়তানের মুখ, জখম, ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস,নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র,কৌণপের লুচিমাংস অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি । কলকাতার এই কবি তার কবিতা, হাংরি আন্দোলন, বর্তমান ব্যস্ততা এবং দুই বাংলার সাহিত্য বিষয়ে কথা বলেছেন প্রিয়.কমের ফিচার সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে…

প্রিয় : কেমন আছেন ?
মলয় : শরীরের দিক থেকে বলতে গেলে বলব, ভালো নেই । দুবার হার্ট অ্যাটাক, তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি, একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি, তা সত্ত্বেও আবার হার্ট অ্যাটাক, হাঁপানি, আঙুলের আরথ্রাইটিস, আচমকা অজ্ঞান হবার রোগ সিনকোপি, প্রস্টেট, হার্নিয়া, ডান হাঁটুতে বাত, দুই পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইনস ইত্যাদি । তবে মনের দিক থেকে খুবই ভালো আছি ; প্রচুর ভাবনা মগজে এসে জড়ো হয়, তরুণরা লেখা চান কিন্তু আঙুলের আথ্রাইটিসের কারণে এক আঙুলে কম্পিউটারে যতোটুকু পারি লিখি । চারটে কাব্যনাট্য আর পাঁচটা উপন্যাস তো এক আঙুলেই কম্পিউটারে লিখেছি । তবে প্রবন্ধ আর বিশেষ লিখতে পারি না , মানে ভালো লাগে না লিখতে, প্রকাশকও পাওয়া যায় না।
প্রিয় : এখন সময় কাটান কি করে ? লেখালিখিই তো করছেন নিয়মিত ?
মলয়: ঘুম থেকে উঠে গ্রিন-টি খেয়ে, সামনের চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে রকিং চেয়ারে বসে চিন্তা করতে ভালো লাগে আমার; পরে সেগুলো কবিতা বা উপন্যাসে চালান করি। ক্রেয়ন আর কালার পেনসিল কিনেছি, মাঝেমধ্যে যা ইচ্ছে হয় ডুডলিং করি, আরথ্রাইটিস সত্ত্বেও । ওটস খাবার পর দুপুর বেলায় দশটা থেকে একটা পর্যন্ত কম্পিউটারে লিখি, রিভাইজ করি । দুপুরে খেয়ে-দেয়ে ঘুমোই । সন্ধ্যায় ফেসবুকের  তরুণী পাঠিকা আর আঁকিয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করি, তাঁরাই, সৌভাগ্যবশত, সংখ্যায় বেশি। কোনো-কোনো দিন বিদেশে বসবাসকারী নাতনিদের সঙ্গে স্কাইপে গল্প করি । সাড়ে-আটটা নাগাদ আবার চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে খাওয়া এবং চিন্তা । মদ আর বিশেষ খাই না, কেননা আমি সিঙ্গল মল্ট ছাড়া খাই না, ছেলে বা মেয়ে বিদেশ থেকে আনলে খাই । দশটা বাজলে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় ; ঘুমের ট্যাবলেটে শৈশবের স্বপ্ন বেশি করে আসে। চাকর-চাকরানি রাখা আমার পছন্দ নয়, তাই আমি আর স্ত্রী ভাগাভাগি করে চালিয়ে দিচ্ছি।
প্রিয় : আপনি তো এখন দিল্লিতে থাকেন ?
মলয় : না, আমি ২০০৯ সাল থেকে মুম্বাইয়ের শহরতলি কানডিভালিতে গুজরাটি পাড়ায় একরুমের ফ্ল্যাটে স্ত্রীর সঙ্গে থাকি, প্রধানত চিকিৎসার সুবিধার জন্য। কোনো বাংলা সংবাদপত্র বা পত্রিকা পাওয়া যায় না এ-পাড়ায়। নাকতলার ফ্ল্যাট বিক্রির পর যতো বইপত্র কলকাতায় ছিল সব বিলি করে দিয়েছিলুম ; এখন আর বইপত্র সংগ্রহ করি না, পড়া হয়ে গেলে বিলিয়ে দিই, মানে আমার কোনো ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার নেই । তাই একরুমের ফ্ল্যাটে অসুবিধা হয় না । বইয়ের ধুলোর কারণে হাঁপানি বেড়ে যায় ।
প্রিয় : আপনাদের হাংরি আন্দোলনের যাঁরা এখনও জীবিত, তাঁদের সঙ্গে কি নিয়মিত যোগাযোগ হয় ?

মলয় : হ্যাঁ, কলকাতা নিবাসী সুবিমল বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, রবীন্দ্র গুহ, সুবো আচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ আছে । ত্রিপুরার রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফা, রত্নময় দে, অরূপ দত্তের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে । সকলেই তো প্রায় মারা গেছেন ; উৎপলকুমার বসুও এই সেদিন মারা গেলেন । হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সকলের গদ্যপদ্য নিয়ে একটা সংকলন বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি, কাউকে বাদ দেয়া হবে না । দেখি প্রকাশক পাওয়া যায় কিনা ; সমস্যা হল হাংরি আন্দোলন শুনলে চুনোপুঁটিরাও সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করে দ্যায়
প্রিয় : ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আপনি, এবং ৩৫ মাস ব্যাপী কোর্ট কেস চলে। কলকাতার নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণা হলেও ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে অভিযোগ মুক্ত হন । এত কিছু হয়ে গেল একটি কবিতার জন্য । আমি এই কবিতার জন্মকথা জানতে চাই । কখন, কীভাবে, মাথায় আসে আইডিয়াটা ?
মলয় : হ্যাঁ, এই কবিতাটির জন্য আমাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে সাতজন ডাকাত আর খুনির সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ কেবল অশ্লীলতার ( ধারা ২৯২ ) ছিল না, সাবভার্সানেরও ( ধারা ১২০বি ) ছিল । প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সেরকমটাই নির্দেশ ছিল আমাকে হিউমিলিয়েট করার । কবিতাটিতে আমার নিরীক্ষার আগ্রহে যে ব্যাপারগুলো এই পাঠকৃতি তৈরি করার সময়ে ছিল, তার মধ্যে প্রধান দুটি হল দীর্ঘ কবিতার কাঠামোয় স্পিড বা দ্রুতি আনা, এবং তাকে চিৎকার-নির্ভর করা । এই দুটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা কবিতায় তার আগে, বোধহয় পরেও, বিশেষ কাজ হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল পাঠবস্তুকে ইলেকট্রিফাইং করে তোলা, এবং পাঠককে দ্রুতির তুমূল বৈদ্যুতিক প্রবাহে আটক রাখা, যা থেকে সে ছাড়াবার চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না । ‘ছুতার’ দ্যোতকটি শিল্পবিরোধিতার জন্য ব্যবহৃত। কবিতাটিতে চিৎকারের খেলা বজায় রাখার জন্য অভিব্যক্তিকে শ্বাসপংক্তিতে সংকুচিত ও প্রসারিত করেছিলুম । শেষ তিনটি পংক্তিতে ধাতস্হ করেছি শ্বাসকে, আর স্তিমিত করেছি চিৎকারকে। অর্থাৎ অভিব্যক্তির বিনির্মাণ, কবিতায় বুর্জোয়া অহংবোধের সমাপ্তি, এবং লিখিত শব্দকে ছাপিয়ে যাবার প্রয়াস, হাংরি আন্দোলনের সময়ে যে নিরীক্ষাগুলো করতুম, তা এই কবিতায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলুম। তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত গড়ে-ওঠা পাতি-বুর্জোয়া চেতনার মডেলটি আমি বদলে ফেলতে চেয়েছিলুম আমূল । বাংলা কবিতাকে যে সেন্টিমেন্টাল নার্সিসিজম পেয়ে বসেছিল তখন, তাকে জলাঞ্জলি দিতে চেয়েছিলুম । কবিতার ঐতিহাসিকতাকে এভাবে বিপর্যস্ত করা মনে হয়েছিল শ্রেয় । প্রেম এই কবিতার স্ট্র্যাটেজি, কেন্দ্র নয়, বস্তুত কবিতাটির কোনো কেন্দ্র নেই । না আছে স্বীকৃত আঙ্গিক বা বিষয় বা থিম বা বক্তব্য বা ছন্দ বা প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক । মেইনস্ট্রিম বাংলা কবিতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর প্রান্তিক অবস্হান নির্ধারিত করতে চেয়েছিলুম আমার শৈশবে পাওয়া ইমলিতলা পাড়ার মাগধি ও ভোজপুরি ইথসের সাহায্যে । তখনকার সাহিত্যিকরা এই অ-বাঙালি ইথসকে বরদাস্ত করতে পারেননি । তাঁরা তখন হয় ইউরোপ বা সোভিয়েত দেশের দাপটে পীড়িত ছিলেন । কবিতাটিতে এভাবে ঔপনিবেশিক ও উত্তরঔপনিবেশিক সংঘাতক্ষেত্রটিকে গড়তে চেয়েছিলুম — মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির সংঘাত । প্রতিষ্ঠিত বাইনারি-বৈপরীত্যগুলোকে, ছয়ের দশকের পূর্বেকার বাংলা কবিতা যা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকত, অর্থাৎ ভালো/খারাপ, প্রেম/ঘৃণা, সু/কু, শ্লীল/অশ্লীল, পুরুষ/প্রকৃতি, মিতকথন/অতিকথন, শরীর/মন, শুরু/শেষ, আমি/তুমি, সুন্দর/কুৎসিত ইত্যাদি, সেই দেয়ালকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলুম । ভণ্ডুল করার জন্য প্রয়োগ করেছিলুম যৌনতা আর অন্তর্ভাবাত্মক স্বরধ্বনি । সেসময়ে কবিতায় এভাবে সঘোষ অব্যয় প্রয়োগ অকল্পনীয় ছিল, অস্বাভাবিক ছিল । কবিতাকে শাসন করার বিদ্যায়তনিক অনুশাসনকে ছত্রভঙ্গ করেছি প্রসৃত অব্যয় প্রয়োগে, এবং বিদ্যায়তনিক মানদণ্ডকে বেদখল করে দেবার চেষ্টা করেছি ঐক্য, রৈখিকতা, আদল, আদরা আর আনুমানিক মর্মার্থের মূল্যবোধসমূহের মসনদ থেকে । আবেগ যেহেতু একটি ট্র্যান্সগ্রেসিভ উপাদান, তাকে বারংবার, হাপরের মতন, ব্যবহার করেছিলুম লেখাটাতে । আমার কাছে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ছিল একটি অফুরন্ত আহ্লাদের বহুমাত্রিক প্রোজেক্ট । আর, আমার কবিতার কোনো কন্সটিটুয়েন্সি তখন আদপেই ছিল না । বাকধারা নিয়ে খেলবার অফুরন্ত এলাকা ছিল । খেলেওছি । তা টের পাওয়া যাবে রচনাটির নিজস্ব স্পিড বা দ্রুতি থেকে । কবির দ্রোহ নয়, কবিতার দ্রোহ ব্যক্ত করতে চেয়েছে পাঠবস্তুটি ।
‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এ “আমি” ব্যাপারটিকে অজস্র জিজ্ঞাসা দ্বারা বিগঠিত করতে চেয়েছিলুম । রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত কবিতায়, “আমি” ছিল স্বয়ংসিদ্ধ, সবজান্তা, প্রমাণিত সত্য । তাই “আমি” প্রতিপাদি জ্ঞানকে মনে করা হতো অকাট্য । অথচ অকাট্য ও বিশুদ্ধ জ্ঞান বলে তো কিছুই নেই । আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার ডিসকোর্সকে একযোগে নান্দনিক সন্ত্রাস ও ভাষার সন্ত্রাস হিসেবে রূপায়িত করতে চেয়েছিলুম । কবিতাটিতে “আমি” প্রান্তিক ও সাবভারসিভ, এবং সেকারণে রাজনৈতিক । ১৯৬৩ সালে কবিতাটা লিখতে আমার তিন মাসের মতন লেগেছিল, প্রচুর রিভাইজ করেছিলুম । পাণ্ডুলিপি আর ফেরত পাওয়া যায়নি লালবাজার থেকে ।
প্রিয়: শিল্পে কোনটা শ্লীল মনে হয় আপনার কাছে আর কোনটাকে অশ্লীল বলবেন ?
মলয় : শ্লীল আর অশ্লীল এই যুগ্মবৈপরীত্য বা বাইনারি অপোজিটের মাপকাঠি এনেছিল ইভানজেলিস্ট খ্রিস্টানরা । তার আগে মাপকাঠি ছিল আমাদের রসশাস্ত্র ; তাতে কোথাও শ্লীল-অশ্লীলের বিভাজনের কথা নেই । বস্তুত আদিরসই তো যৌনতা, অথচ শ্রীরামপুরের পাদরিরা তাকে নাকচ করে দিয়ে জেমস লং আর ম্যাকলের মাধ্যমে ভিকটোরীয় মূল্যবোধ চাপিয়ে দিল । ইসলামি শাসকরাও এই বিভাজন চাপায়নি । যুগ্মবৈপরীত্যের মানদণ্ড থাকলে বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস, খাজুরাহো, কোণারক, পুরীর মন্দিরের কাজ, অজন্তা-ইলোরা, মীনাক্ষী মন্দির হতো না । মনসামঙ্গল, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বাৎসায়নের কামসূত্র লেখা হতো না ; এখানে বলে রাখি, কামসূত্রে বলা আছে স্বমেহন কী ভাবে করা উচিত। বর্তমান ভারতে টিকিয়াল আর দাড়িয়াল প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটিগুলো আবার নতুন করে ভিকটোরীয় মানদণ্ড চাপিয়ে দিচ্ছে ; এ থেকে বেরোনো কঠিন। সংস্কৃত সাহিত্যের বাহাত্তরটা অলঙ্কারগুলো ছিল পুরুষের অলঙ্কার ; কবিতাকে নারী বানিয়ে ফেলার পর সংস্কৃত অলঙ্কার সাহিত্য থেকে লোপাট হয়ে গেছে । মোগল সম্রাটরাও এদেশে এসে অলঙ্কার পরা আরম্ভ করেছিলেন। এখন সবই ইউরোপের দেয়া। শ্লীল/অশ্লীলের নির্ণায়ক এখন প্রতিষ্ঠানের টিকিয়াল আর দাড়িয়াল মৌলবাদীরা ।
প্রিয়: ঐ মামলায় আপনার পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিৎ দত্ত । আর বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । যারা আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁরা কি ঠিক ছিলেন ? তাঁদের মধ্যে আর পুলিশের মধ্যে তাহলে পার্থক্য কোথায় ? তাঁদের কি শিল্পী বলা যায় ?
মলয় : কি বলব বলো ? পবিত্র বল্লভকে আমি চিনতুমই না ; কুঁজো লোকটা ছিল পুলিশের ইনফরমার, কফিহাউস থেকে হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন লিফলেট পত্রপত্রিকা নিয়ে গিয়ে জমা দিত লালবাজারে । শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে বলা যায় পিঠে ছুরি মারা বিশ্বাসঘাতক । ওরা দুজনেও গ্রেপ্তার হয়েছিল ; মামলা থেকে রেহাই পাবার জন্য আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে দিলে, আমাকে যখন চার্জশিট দেয়া হল তখন ওদের ঘৃণ্য রূপ বেরিয়ে এলো । ওরা দুজনে  মিলে সারাজীবন আমার বিরুদ্ধে অবিরাম লিখে-লিখে নিজেদের গিল্টি-ফিলিং থেকে ছাড়া পাবার চেষ্টা করে গেছে । ওদের এই দুষ্কর্মে ইন্ধন যোগাতেন শঙ্খ ঘোষ, আমার বিরুদ্ধে যে বই শৈলেশ্বর-সুভাষরা কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের থেকে বের করেছে তাও শঙ্খ ঘোষের দৌলতে ; তাতে শঙ্খ ঘোষকেও হাংরি বলে চালানো হয়েছে । এই প্রকাশকরা আমার বই বের করতে চায় না, শঙ্খ ঘোষের দাপটের কারণে । শক্তি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন কেননা ওনার ধারণা ছিল আমি আর দাদা ষড়যন্ত্র করে দাদার শালি শীলার সঙ্গে ওনার বিয়েটা হতে দিইনি । সন্দীপন আর উৎপল কেন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়েছিলেন তা আজও জানতে পারিনি । উৎপল তো বাংলাদেশে গিয়ে খাতিরযত্ন পেতেন,  ওনার ডিগবাজি খাবার কারণ জিগ্যেস করতে পারতে ।
প্রিয় : আপনার কি মনে হয়েছে মামলাটি হওয়ার ফলে ভালোই হয়েছে ? কারণ এতে হাংরি আন্দোলন আলোচিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী ?
মলয় : ওই পঁয়ত্রিশ মাস, যখন মামলাটা চলেছিল, তখন কলকাতায় আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না । চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হয়ে  টাকার টানাটানি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, কেসে প্রচুর টাকা দরকার হতো । অনেক সময়ে একবেলা খেয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে । সুবিমল বসাকের এক স্যাকরা জ্যাঠামশায় ছিলেন, তাঁর দোকানে রাতে শুতুম আর গোসল করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূর পাল্লার ট্রেনে । দিনের পর দিন স্নান হতো না, জামাকাপড় পালটানো হতো না । একবার কমলকুমার মজুমদার কিছু টাকা দিয়েছিলেন, সেই টাকায় জামা-প্যান্ট কিনে পুরোনোগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিলুম । সৌভাগ্যবশত হাইকোর্টের জন্য করুণাশঙ্কর রায় নামে একজন সাহিত্যানুরাগী ব্যারিস্টার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখনকার নামজাদা ক্রিমিনাল  অ্যাডভোকেট মৃগেন সেনের সঙ্গে, যাঁর তখনকার ফিসই ছিল দিনে এক লক্ষ টাকা । তিনি বলেছিলেন, যা পারো দিও । কেস জিতে যাবার পরে চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে যে থোক টাকা পেয়েছিলুম তা ওনাকে দিই । এই স্মৃতির পৃষ্ঠপটে কি করেই বা বলি মামলাটা হয়ে ভালো হয়েছে ? তবে হ্যাঁ, রাজসাক্ষীরা আলোকিত হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার আর টাকাকড়ি পেয়েছে, মনের মতন প্রকাশক পেয়েছে হাংরি আন্দোলন সেসময়ে ততো আলোচিত হয়নি ; এখন বিবিসির সাংবাদিক, স্কটল্যাণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র, আমেরিকার গবেষক, ইতালির গবেষক এসে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, হাংরি আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পর । পিএই্চ ডি আর এম ফিল করছেন ছাত্র-ছাত্রীরা, তাও বছর দশেক হল । মামলার আগেই আমাদের লেখাপত্র ইউরোপ-আমেরিকার এবং ভারতের হিন্দি-উর্দু-মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল, তার কারণ হিন্দির ফণিশ্বরনাথ রেণু আর রামধারী সিং দিনকর আমায় আর দাদাকে শৈশব থেকে চিনতেন ।
প্রিয় : আপনি কি মনে করেন আপনাদের হাংরি আন্দোলন সফল হয়েছিল ? সফল না হলে এটাকে কনটিনিউ করেননি কেন আপনারা ?
মলয় : কনটিনিউ তো হয়েছে । পাকিস্তানি আমলে সংবাদ সেরকমভাবে হয়তো ওই পারে পৌঁছোয়নি ; এখন বাংলাদেশ হবার পর হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সংবাদ পৌঁছোচ্ছে । জীবিতকালে সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত ‘ক্ষুধার্ত খবর’ আর ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করেছে । অরুণেশ ঘোষ প্রকাশ করেছে ‘জিরাফ’ পত্রিকা । অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেছে ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ । রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফারা এখনও ‘অনার্য সাহিত্য’ প্রকাশ করে চলেছে । প্রদীপ চৌধুরী প্রকাশ করে চলেছে ‘ফুঃ’ এবং ‘স্বকাল’ পত্রিকা । রত্নময় দে প্রকাশ করে চলেছে  ফোল্ডার পত্রিকা । ওনাদের পারস্পরিক সংযোগের অভাবের জন্য তেমন প্রচার করতে পারছেন না বা পারেননি, যেমনটা আমি, সুবিমল বসাক আর দেবী রায় করেছিলুম। যেমনটা ত্রিদিব মিত্র আর আলো মিত্র বুলেটিন বিলি আর পোস্টার মারার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল নিজেদের কাঁধে । তুমি বোধহয় দ্যাখোনি যে ফেসবুকে একদল তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স বিশের কোঠায়,  নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী নামে একটা কমিউনিটি পেজ চালায় । আমি যে-কজনের নাম জানতে পেরেছি তাঁরা হলেন সায়নী সিংহরায়, রাজদীপ দত্ত, রিফাত খান অনীক, সায়ন ঘোষ, অয়ন ঘোষ, অর্ঘ্য দাশগুপ্ত, সুপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, সান্যাল কবীর সিদ্দিকি প্রমুখ । এঁদের কারোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি এখনও । অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ দশক পরও কনটিনিউ করছে । সফলে যে হয়েছে তার প্রমাণ তো আমাদের পরে পত্রিকাগুলোর নামকরণ ; কেউই আর লিটল ম্যাগাজিনের লালটুশমার্কা নামকরণ করে না । দ্বিতীয়ত আমাদের লেখালিখির বৈশিষ্ট্য পরের প্রজন্মগুলো আত্মসাৎ করে নিতে পেরেছে, যেমন পংক্তির যুক্তিফাটল, যা দেবী রায়ের কবিতার প্রধান গুণ । যেমন রচনার মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-আঙ্গিক, মুক্ত-সমাপ্তি । যেমন অফুরন্ত অর্থময়তা, একক আমির অনুপস্হিতি, সংকরায়ণ, লিমিন্যালিটি, শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ, প্লুরালিজম, রাইজোম প্রয়োগ, বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতাকে সরিয়ে দেয়া, শব্দার্থের ঝুঁকি, ভঙ্গুরতাকে স্বীকৃতি, অনবিচ্ছিন্নতা অভিমুখী, কবিতায় ফ্লাক্স প্রয়োগ, বার্তা বর্জন, পংক্তির ইনটারলিংকিঙের পরিবর্তে ইনটারলকিং ইত্যাদি ।
প্রিয় : আপনারা ছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী । প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে কি ভাবে লেখক-কবি হওয়া সম্ভব ? এখনও অনেক তরুণ কবি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার পক্ষে ?
মলয় : বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বলতে কী বোঝায় জানি না । তবে আঁচ করতে পারি যে ব্লগার খুনের চাপাতিবাজরা প্রতিষ্ঠানের টাকায় চলে । ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায়, প্রতিষ্ঠান মানে নরখাদক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক-ধার্মিক-আর্থিক সিসটেমের নাগপাশ । আনন্দবাজার তো বাংলা সাহিত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভূতকিমাকার করে ফেলেছে । আমাদের পোঁদে তো প্রতিষ্ঠানই লেগেছিল, তারপর ওরা নকশাল খতম শুরু করে দিলে । সিপিএম মসনদে বসে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোপাট আরম্ভ করলে । এখন প্রতিষ্ঠান গেছে তৃণমূলের কব্জায়, তারা মসনদে বসতেই সিপিএমএর চামচাদের অ্যাকাডেমি আর সংস্কৃতির মাথা থেকে লাথিয়ে বের করে নিজেদের মালদের বসিয়ে দিলে । লুমপেনরা চিরকাল শাসকদের সঙ্গে থাকে ; সিপিএমএর লুপমেনরা এখন ভিড়ে গেছে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় । এই ক’দিন আগে বিফ খেয়েছে জিগির তুলে উত্তরপ্রদেশে একজনকে কোতল করা হল । ফিদা হুসেনকে দেশে ফিরতে দেয়া হল না । মহারাষ্ট্রে সনাতন ধর্ম নামে একটা সংস্হা তিনজন বুদ্ধিজীবীকে খুন করিয়ে দিলে । তামিলনাডুতে একজন লেখক বাধ্য হয়ে নিজের বই উইথড্র করে নিলে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরোধিতা লেখকরা না করলে কারা করবে ?
প্রিয় : কেউ-কেউ বলেন, হাংরি আন্দোলনের মূল আদর্শ থেকে আপনি সরে গিয়েছিলেন। একথা কতটা সত্য?
মলয় : কেউ-কেউ নয়, ওসব কথা প্রচার করেছে শৈলেশ্বর ঘোষ-সুভাষ ঘোষ আর তাদের চেলারা । নিজেরা তো মুচলেকা দিয়ে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংস্রব অস্বীকার করেছিল, ভয়ে “হাংরি” শব্দটাই ব্যবহার করতো না, তাই “ক্ষুধার্ত খবর” বা “ক্ষুধার্ত” নামে পত্রিকা বের করত, আর আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করত । আমি ১৯৯৪ সালে কলকাতা ফিরে যখন “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লিখলুম তখন ওদের টনক নড়ল, শঙ্খ ঘোষকে ধরে কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশক দিয়ে “হাংরি” নামে চেলাদের নিয়ে বই বের করল, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নাকচ করা । ওদের বেশির ভাগ চেলা তো ছিলই না হাংরি আন্দোলনে ; আমি তাদের বেশির ভাগকে চিনি না, দেখিনি কখনও । তারা নিজেরাই লিখেছে যে ষাটের দশকের হাংরি ম্যানিফেস্টো তারা পড়েনি। সব ম্যানিফেস্টো তো আমারই লেখা , আমি কেমন করেই বা মূল আদর্শ থেকে সরে যাব । ওরাই গিয়ে সিপিএমে ঢুকলো, মিছিলে ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়ালো, মোড়ের অবরোধে অংশ নিল । সিপিএম তখন ভয়ংকর প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে, যাকে ইচ্ছে কেটে মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, ধর্ষণ করাচ্ছে, খেতের ফসল কাটিয়ে নিচ্ছে, রাস্তায় মানুষের ওপর পেটরল ঢেলে পোড়াচ্ছে । আমি এসবের বিরুদ্ধে প্রচুর লিখেছি, অথচ ওরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে স্পিকটি নট হয়ে বসেছিল । আমি তো অ্যাকাডেমির পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেছি ; সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ আর উৎপলকুমার বসুর মতন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে ল্যাজ নাড়াইনি ।
প্রিয় : আপনাদের আন্দোলনের বিনয় মজুমদার সম্পর্কে মূল্যায়ন শুনতে ইচ্ছে করছে ।
মলয় : আমি মনে করি জীবনানন্দের পর পশ্চিমবাংলায় যে দুজন জলবিভাজক কবি এসেছেন তাঁরা হলেন বিনয় মজুমদার ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় ।
প্রিয় : “আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই”, এটা আপনার কবিতার লাইন । নারী বিশ্বাসঘাতকতা করে, মানলাম । কিন্তু শিল্প কীভাবে বিশ্বাসঘাতক হয়, বিষয়টা যদি পরিষ্কার করেন ।
মলয় : কেন লিখেছিলুম, তা এখন আর মনে নেই । পাণ্ডুলিপি থাকলে আন্দাজ করতে পারতুম । তবে শিল্প ধারণাটায় আমি বিশ্বাস করি না ।
প্রিয় : লেখকের জন্য ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কিন্তু অনেকেরই নিজস্ব ভাষা নেই । নিজস্ব ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে কোন উপাদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন ?
মলয় : বাংলা গদ্য খুব বেশি দিনের নয়, ১৮০০ সনে মথি লিখিত সুসমাচারের আগে বাংলা গদ্য বলতে যা বোঝায় তা ছিল না । তাই ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা উচিত হবে না । ওদের তো ওল্ড টেস্টামেন্টের সময় থেকে, রোম সাম্রাজ্য আর গ্রিসের সময় থেকে গদ্য চলে আসছে । ‘ডন কিওটে’ লেখা হয়েছিল ১৬০৫ সালে, তার কতকাল পরে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড’ লেখা হল ভেবে দ্যাখো । বাংলা ভাষারও তেমন সময় দরকার ; আগামী প্রজন্মে ভাষা নিয়ে কাজ হবে নিশ্চয় । সন্দীপন, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, অজিত রায়, রবীন্দ্র গুহ, সুবিমল বসাক, কমল চক্রবর্তী, আজিজুল হক, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নিজেদের গদ্য তৈরি করেছেন । আমি নিজের গদ্য তৈরি করার দিকে খেয়াল দিইনি, কেননা প্রতিটি উপন্যাসের জন্য কাহিনি অনুযায়ী ভাষা বুনতে চেষ্টা করেছি । দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস, মানে পাল্প ফিকশান।
প্রিয় : যদি দুই বাংলার বাংলা সাহিত্য নিয়ে মূল্যায়ন করতে বলা হয়, তাহলে আপনি কী বলবেন ?
মলয় : আমার পড়াশুনা অমন গভীর আর ব্যাপক নয় যে এই বিষয়ে বলার সাহস দেখাব । তবে কবিতায় যে ধরণের কাজ হচ্ছে তাকে আন্তর্জাতিক স্তরের বলতে আমার দ্বিধা নেই ।
প্রিয় : বাংলাদেশের লেখকদের কাদের লেখা আপনার ভালো লাগে ? তরুণদের লেখা পড়েন কি ?
মলয় : হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ আমার পছন্দ । শহীদ কাদরী আর হেলাল হাফিজের কবিতা আমার পছন্দ । তরুণদের লেখা নেটে যা পাই পড়ি । বই আর পত্রিকা তো বিশেষ পাই না ; দুই সরকার ষড়যন্ত্র করে ডাক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে আদানপ্রদান কঠিন হয় ।
প্রিয় : বাংলা সাহিত্য সত্যিকার অর্থে কোন দিকে যাচ্ছে ? আমরা কি উন্নতি করছি, নাকি অবনতির দিকে যাচ্ছি ?
মলয় : নিশ্চয়ই উন্নতি করছি ; কিন্তু তা কমার্শিয়াল লেখালিখির বাইরে, লিটল ম্যাগাজিনের জগতে ।
প্রিয় : আপনাকে ফেসবুকে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ অ্যাকটিভ দেখা যায় । কিন্তু আমি অনেক কবিকেই চিনি যারা ফেসবুক এবং নেট-সংস্কৃতিকে নাক ছিটকায় ! এ বিষয়ে আপনার মতামত কি ?
মলয় : আমি প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে চাই । অনেক কবি এখনও লম্বা দাড়ি, কাঁধে ঝোলা, খাদির পাঞ্জাবিতে পুকুর পাড়ে আটক । যাঁরা নাক ছিটকান তাঁরা সম্ভবত প্রযুক্তির উন্নতি, প্রভাব আর দ্রুতির সঙ্গে পরিচিত নন ; বিদেশে কবি-লেখকরা কী করছেন তার সঙ্গে পরিচিত নন । ফেসবুকে আছি বলেই আমার বই আর নেট-এর লেখালিখি এখন বাংলাদেশ আর পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পৌঁছোয়, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল । কলকাতার বাইরে এবং ঢাকায় আমার বই এখন বিক্রি হচ্ছে, ইনটারনেটের কারণে । প্রচার করার ধান্দা নিয়ে  আমি কোনো সম্বর্ধনা নিই না, কবিতা পাঠে যাই না, সাহিত্যসভায় সভাপতিত্ব করি না বা বক্তৃতা দিই না । পাঠকের কাজ আমাকে খুঁজে নেয়া । বিখ্যাত বিদেশি বই এখন পিডিএফ আকারে নেটে বিনে পয়সায় পড়তে পাওয়া যায় । বাংলা বই এবার কিণ্ডলেও পড়তে পাওয়া যাবে, ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার আর মেইনটেনেন্সের ঝক্কি-ঝামেলা পোয়াতে হবে না ।
প্রিয় : আপনার প্রেম, বিয়ে, সংসারের গল্প জানতে চাই ।
মলয় : পাটনার ইমলিতলা পাড়ায় থাকতে, প্রথম প্রেমে পড়ার আগেই আমার সঙ্গে পনেরো বছরের এক শিয়া মুসলমান তরুণীর যৌন সংসর্গ হয়েছিল, তখন আমার বয়স দশ বছর ; ওনাদের বাড়িতে হাঁসের ডিম কিনতে যেতুম, তরুণীটিকে কুলসুম আপা বলে ডাকতুম, ওনাদের বাড়ির মাংস রাঁধার  গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে প্রায়ই যেতুম । কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুখস্ত বলতে পারতেন । যৌনাঙ্গ ছড়ে যাবার পর যাওয়া বন্ধ করে দিই, তবে এখনও ওনার জন্য মন কেমন করে । পাটনায় ওনার খোঁজে কিছুকাল আগে গিয়েছিলুম, শুনলুম ওনাদের পরিবার বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন । এই ঘটনা আমি কেবল আমার ঠাকুমাকে বলেছিলুম ; উনি উপদেশ দিয়েছিলেন আমি যেন জীবনে কখনও এই ঘটনা বাড়ির কাউকে না বলি ।
স্কুলে ঢুকে ক্রাশ উঁচু ক্লাসের গালে-টোল ছিলেন নমিতা চক্রবর্তি, যাঁর প্রভাবে মার্কসবাদ ও বাংলা সাহিত্যে আকৃষ্ট হই । তারপর আমি তিনবার প্রেমে পড়েছি : স্কুলের সহপাঠিনী অঞ্জলি দাশ, যে আমার কবিতায় শুভা ; দ্বিতীয়বার স্নাতকস্তরের নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা, আর তৃতীয়বার হিপিনী ম্যাডেলিন করিয়েট, যে আমার ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । চতুর্থবার বিয়ে করেছি । আমার স্ত্রী সলিলা ছিলেন মধ্যপ্রদেশ হকি দলের ক্যাপটেন, যখন ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় । অনেক শিল্ড-মেডেল জিতেছে সেসময়ে । কাপ জিতলে তাতে ভরে ওরা রাম খেয়ে উৎসব করত । আলাপের কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের নাগপুরের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলুম । ১৯৬৮ সালে বিয়ে করি । দুজনেই চাকরি করেছি আর নাগপুর, পাটনা, লখনউ, মুম্বাই, কলকাতা শহরে কাজ করেছি ।
আমি প্রথমে ব্যাঙ্ক নোট পোড়াবার চাকরি করতুম, পচা ছাতাপড়া তেলচিটে নোটের বিশাল-বিশাল পাহাড় পোড়াতে হতো তাতে শরীর খারাপ আরম্ভ হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ণের চাকরিতে যোগ দিয়ে সারা ভারত ঘুরেছি ; চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, শ্রমিকদের জীবন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে । আমার মেয়ে অনুশ্রী বড়ো, তার পাঁচ বছরের ছোটো ওর ভাই জীতেন্দ্র । দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সবই লিখেছি, পড়ে দেখতে পারো, যোগাড় করতে পারলে । আমি রাহু আর দাদা কেতু।
প্রিয় : যুগে-যুগে কবিতার ছন্দ নিয়ে দুই দল কবি আলাদা হয়ে ঝগড়া করতে থাকে । কিন্তু কেউ কি আজকাল নতুন ছন্দরীতি তৈরি করতে পেরেছে ?
মলয় : যুগে যুগে বলা উচিত হবে না । বাংলা কবিতা তো এই সেদিনকার, বিদেশিদের সঙ্গে এসেছে । তার আগে আমরা বাঁধা ছন্দে কাব্য লিখতুম । মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে বাংলা ছন্দ নানা আদল-আদরা পেয়েছে । ইউরোপের তুলনায় আমাদের কবিতা বেশ নবীন । নতুন ছন্দরীতি তৈরী হবে নিশ্চয়ই, তার জন্য ধৈর্য চাই । কলকাতায় ধীমান চক্রবর্তী, রাকা দাশগুপ্ত, শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী, মিতুল দত্ত, বারীন ঘোষাল, যশোধরা রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ছন্দে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন ।
প্রিয় : জীবন এখন দ্রুতি-আক্রান্ত । এই সময় কবিতার পাঠক তৈরি করা কি সম্ভব ?
মলয় : যারা কবিতা লিখছেন তাঁরাই তো পাঠক । কবি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই বাংলায় প্রায় ৫০০০ কবি আছেন, ওই বাংলাতেও হয়তো সেরকম সংখ্যকই হবেন । আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার তো হয়ইনি, তো পাঠক পাবে কোথ্থেকে । ইউরোপ-আমেরিকার মতন শিক্ষার প্রসার ঘটেনি এদেশে, লোকেরাও বেশ গরিব, বই কেনার মতন রেস্ত দূরের কথা, খাবার কেনার মতনই টাকাকড়ি জোটে না বেশির ভাগ পরিবারে । যতো দিন যাচ্ছে ভারতে গরিবের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । মধ্যবিত্তরা কবিতার বই কিনতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবাংলার যা আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ, তারা পশ্চিমবাংলা ছেড়ে প্রথম সুযোগেই পালাচ্ছে, তাদের পরের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি থেকে ।
প্রিয় : প্রকাশকরা প্রায় বলে থাকেন কবিতার পাঠক নেই । কবিতার জনপ্রিয়তা নেই । কবিতাকে জনপ্রিয় করলে কবিতার জাত চলে যাবে বলে আপনি মনে করেন কি ?
মলয় : কমার্শিয়াল উপন্যাস ছাড়া আর কিছুই বিকোয় না, প্রবন্ধের আর ছোটোগল্পের বইও বিকোয় না, তো কবিতার বই কোথ্থেকে বিকোবে ! গানের মাধ্যমে কবিতাকে কিছুটা জনপ্রিয় যে করার চেষ্টা হয়নি তা নয়, যেমন করেছেন কবীর সুমন । কিন্তু তারও তো ক্রেতা দরকার । ঘুরেফিরে সেই একই সমস্যায় এসে ঠেকি, অর্থাৎ সাধারণ বাঙালি পরিবারের হাতে তেমন টাকাকড়ি নেই যে কিনবে । প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়তো মোবাইল ফোনে কখনও কবিদের কন্ঠস্বর শোনার আগ্রহ হবে মধ্যবিত্ত শ্রোতার। কবিতা-পাঠ ও আবৃত্তির গ্রামোফোন রেকর্ডও প্রথম বের করেছিলেন ‘সাপ্তাহিক কবিতা’ লিটল ম্যাগাজিনের কবি শান্তি লাহিড়ি । ফেসবুকে এবার ভিডিও পোস্ট করা শুরু হয়েছে, কেউ-কেউ নিজের কবিতা পাঠ করছেন বা গান গেয়ে পোস্ট করছেন । ধৈর্য ধরতে হবে, তাড়াহুড়া করলে চলবে না ।


Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

নীলিমা দেব নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

নীলিমা : ‘মুদ্রিত পত্রিকা’ ও ‘ওয়েব পত্রিকা’ এ-দুটো বিষয়কে আপনি কিভাবে দেখেন ?

মলয় : বাংলা ভাষাসাহিত্যে আপাতত দুটোরই প্রয়োজন রয়েছে, তার কারণ লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রথমত গোষ্ঠীবদ্ধ, দ্বিতীয়ত একটা লিটল ম্যাগাজিন পাঁচশো কপির বেশি ছাপা হয় না বলে তার পাঠক সংখ্যা সীমিত, তৃতীয়ত পত্রিকাগুলো একটা বিশেষ ভৌ্গলিক এলাকায় আটক থেকে যায় । কিন্তু মুদ্রিত পত্রিকাগুলো গবেষকদের সাহায্য করে, সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরিতে গিয়ে গবেষকরা কোনো বিষয়ে প্রয়োজনীয় লেখাগুলো এক জায়গায় পেয়ে যান, ‘ওয়েব পত্রিকা’র ক্ষেত্রে তাঁদের গুগল খুঁজে-খুঁজে বের করতে হবে, প্রিন্ট আউট নিতে হবে, তাতে অনেক সময় নষ্ট হবে তাঁদের । কিন্তু ওয়েব পত্রিকার সুবিধা হলো যা তা সারা পৃথিবীর পাঠক পড়তে পারেন, লেখালিখির ক্ষেত্রেও তাতে গোষ্ঠীবদ্ধতা কম ।

 

নীলিমা : আজকাল বাংলা কবিতায় অন্য ভাষার শব্দযাপন নিয়ে আপনার কি মত ?

মলয় : ইংরেজি কবিতায় বহুকাল থেকে লাতিন, ফরাসি, গ্রিক শব্দ ব্যবহার করা হয় । সে কবিতাগুলো পড়ার সময়ে আমাদের অভিধানের সাহায্য নিতে হয়েছে, ছাত্রাবস্হায় অধ্যাপকদের কাছ থেকে মানে জেনে নিতে হয়েছে। বাংলা কবিতায় অন্য ভাষার শব্দ এইজন্যে আসছে যে প্রতিদিনের কথাবার্তায় কবিরা তা নিজেদের মধ্যে প্রয়োগ করছেন । প্রচুর বাংলা শব্দ আছে যা ফারসি আর আরবি থেকে এসেছে । আবার অনেক শব্দ এমন যেগুলো ইংরেজি বা ফরাসি শব্দকে অনুবাদ করে তৈরি করা, যেমন সিমবল শব্দের বাংলা প্রতীক, অরিজিনালের বাংলা মৌলিক — এই শব্দগুলো হরিচরণের শব্দকোষে পাওয়া যাবে না । জীবনানন্দ ইংরেজি শব্দের অনুবাদ নিজের মতন করে বাংলা করে নিয়েছেন, যেমন আকাশলীনা । বাংলা অভিধানে দেখবে বহু বাংলা শব্দের মানে বোঝানো হয়েছে ইংরেজি শব্দের মাধ্যমে । একই সঙ্গে কথোপকথনের বহু শব্দ হারিয়ে গেছে, ‘কলিকাতা কমলালয়’ পড়লে টের পাবে সেখানে অজস্র শব্দ রয়েছে যা আর প্রয়োগ হয় না ।

 

নীলিমা : শঙ্খ ঘোষকে জ্ঞানপীঠ দেওয়া হলো । আপনার মতে কি সঠিক কবি ও সঠিক কবিতাকে সমর্থন করা হলো ?

মলয় : পুরস্কারগুলো তো বুড়ো না হলে দেয়া হয় না । বাঙালি কবি-লেখকদের মধ্যে উনিই বয়স্ক, তাই ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন ওঠে না । বিনয় মজুমদার যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তাঁর শিমুলপুরের বাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্র পুরস্কার আর অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ।

 

নীলিমা : দেশে নানা রকমের শিল্পী ইনটলারেন্স নিয়ে চিন্তিত । অ্যাও্য়ার্ডও ফিরিয়ে দিচ্ছেন । ইনটলারেন্স নিয়ে আপনার কি মতামত ? অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দেওয়া নিয়েই বা আপনার মতামত কী ?

মলয় : ইনটলারেন্স সঞ্জয় গান্ধির সময়ে ছিল, লালু যাদবের বিহারে ছিল, সিপিএমের পশ্চিমবাংলায় ছিল, তৃণমূলের কার্টুন-বিরোধীতায় ছিল, পাঞ্জাবে গিলের সময়ে ছিল, আসামে বঙ্গাল খেদাওতে ছিল । সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে এখনকার ইনটলারেন্সের পার্থক্য হলো এখন ব্যাপারটা হিন্দুত্ববাদী বিজেপির চাপিয়ে দেওয়া। এটা নতুন ধরণের রাজনৈতিক চাপ যা আমরা আগে দেখিনি । যাঁরা অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই বামপন্হী মতামতের ।  লালু যাদবের গুণ্ডাদের সময়ে, সিপিএমের বিরোধী-নিধনের সময়ে, বঙ্গাল খেদাওয়ের সময়ে ফিরিয়ে দেননি । অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিয়ে শিল্পীরা নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করার প্রয়াস করেছিলেন । আমাকে অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমি যে পুরস্কার দিয়েছিল তা আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলুম, কারণ আমি নীতিগতভাবে কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় ; প্রতিটি পুরস্কারের সঙ্গে পুরস্কারদাতার মূল্যবোধও চাপিয়ে দেয়া হয়, নয়তো তৃণমূল এসেই বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে সিপিএমের বাছাই করা সদস্যদের ভাগিয়ে দেবে কেন ? তাঁরা তো জ্ঞানীগুণী লেখক-অধ্যাপক ছিলেন ।

 

নীলিমা : আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা কবিতার ভবিষ্যত কতোদূর ? আপনার মতে এখন বাংলা কবিতার ট্রেণ্ড কী? কোথায় যাচ্ছে এই কবিতা । কোনো নতুন হাংরি আন্দোলন কি অদূর ভবিষ্যতে দেখতে পাচ্ছেন ?

মলয় : বাংলা ভাষায় যে ধরণের কবিতা লেখা হচ্ছে তাকে আন্তর্জাতিক স্তরেরই বলা যায় । দুর্ভাগ্যবশত বাংলা থেকে ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করার মতো লোক নেই । প্রাইমারি স্তরে ইংরেজি শেখানো বন্ধ করে পশ্চিমবাংলায় একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যারা ইংরেজি-ইল্লিটারেট । তবে ইউরোপীয় ভাষাগুলোয় আর অন্ত্যমিলের বা ছন্দের কবিতা প্রায় লেখাই হয় না ; তাই বাংলায় যাঁরা মিল দিয়ে কবিতা লেখেন তাঁদের কবিতা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করলে সেকেলে মনে করবে পাঠক-পাঠিকারা । টাইমস লিটেরারি সাপলিমেন্ট, প্যারিস রিভিউ, পোয়েট্রি ম্যাগাজিন, লণ্ডন ম্যাগাজিনে কিন্তু বাঙালি কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয়, তাঁরা সরাসরি ইংরেজিতে লেখেন বলে । হাংরি আন্দোলন ছিল একটা বিশেষ সময়ের প্রডাক্ট । আর অমন আন্দোলন সম্ভব নয় ।

 

নীলিমা : মহিলা কবিদের কবিতাকে আপনি ঠিক কীভাবে মূল্যায়ন করেন ?

মলয় : মহিলা বলে তো আর তাঁদের কবিতার জন্য কোনো আলাদা মানদণ্ড নেই । নারীবাদীদের কবিতা ছাড়া, কবির  নামটা সরিয়ে দিলে টের পাওয়া যায় না তা মহিলার লেখা কিনা । তবে তরুণীরা আজকাল অসাধারণ কবিতা লিখছেন, যেমন যশোধরা, মিতুল, তানিয়া, বিদিশা, জয়িতা, স্বাগতা, জপমালা, দেবযানী প্রমুখের নাম করা যায় ।

 

নীলিমা : গদ্য, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কোনটা আজকের দিনে আপনাকে বেশি স্পর্শ করছে ? কেনই বা ?

মলয় : এখন বয়সের কারণে পড়াশুনায় সময় দিতে পারি না । তার ওপর আঙুলে আরথারাইটিসের কারণে নিজের লেখা লিখতেই প্রচুর সময় যায় । শেষ যে উপন্যাস পড়েছিলুম তা নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট । কবিতার বই অনেকেই পাঠান, কিন্তু সেভাবে একাগ্র হতে পারি না । বেশিক্ষণ বসে থাকতেও আজকাল অসুবিধা হয় । শুয়ে পড়তে-পড়তে ঘুম পেয়ে যায় ।

 

নীলিমা : হাংরি আন্দোলন করলেন, কবিতা লিখলেন, উপন্যাস লিখলেন । কি-কি রয়ে গেলো যা আগামী দশ বছরে আপনি করতে চান ?

মলয় : নাটক, কাব্যনাট্য, ডিটেকতিভ উপন্যাস, ছোটো গল্পও লিখেছি । দশ বছর বাঁচবো না । দু’তিন বছর আর বাঁচবো বলে মনে হয়। স্বাস্হ্যের যা অবস্হা, তাও বাঁচবো কিনা ঠিক নেই । দুটো বই লেখার ইচ্ছে আছে । একটা রান্নার রেসিপির বই, যা থেকে বোঝা যাবে যে মায়ের আর স্ত্রীর কাছ থেকে ভালো রাঁধতে শিখেছি । অন্য বইটা কলকাতা নিয়ে। হাংরি আন্দোলনের ইনভেস্টিগেশনের সময়ে মাঝে-মাঝে লালবাজারে যেতে হতো । ফালতু বসে আছি দেখে দিনের বেলা আর রাতের বেলা পুলিশ অফিসাররা আমাকে ওনাদের ভ্যানে বসিয়ে কলকাতার আনডারবেলি দেখাতে নিয়ে যেতেন । দেখি পারি কিনা লিখতে, কেননা স্মৃতি ধ্যাবড়া হয়ে গেছে, কলকাতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান